২৯ আগস্ট, ২০২১

পর্ব : ৩৬ - মুসলিমরা কা'বার কর্তৃত্ব অধিকার করলো

৮ম হিজরি। রামাদান মাসের দশ তারিখ দশ হাজার সাহাবি নিয়ে মুহাম্মদ সা. রওনা হলেন মক্কার উদ্দেশ্যে। এ সময় আবু রাহাম গিফারিকে মদিনায় রাসূল সা.-এর প্রতিনিধি নিয়োগ করা হলো। যেহেতু রোজার মাস। সাহাবারা সবাই রোজা রেখেছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর মুহাম্মদ সা. রোজা ভঙ্গ করলেন একইসাথে সবাইকে রোজা ভঙ্গ করতে বললেন। সাহাবারা সবাই রোজা ভঙ্গ করে খাবার দাবারের আয়োজন শুরু করলো।

মুহাম্মদ সা. কুরাইশদের ভড়কে দিতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন যুদ্ধ না করে তারা যাতে ভয়ে আত্মসমর্পন করে। এজন্য তিনি দশহাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী সাথে নিয়েছেন। মুহাম্মদ সা. সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন প্রত্যেকে যাতে আলাদা চুলায় রান্না করে খায়। এতে হাজার হাজার চুলা তৈরি হয়। ঐসময়ে গোয়েন্দারা চুলা দেখে সৈন্যবাহিনীর আনুমানিক হিসেব করতো। মুহাম্মদ সা. চেয়েছেন যাতে সৈন্য সংখ্যা যা আছে তার চাইতেও বেশি বুঝা যায়। এতে করে কুরাইশরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকবে।

এভাবে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে। মাররুজ জাহরানে পৌঁছার পর রাসূলের চাচা আব্বাস রা. একটি সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রাসূল সা.-এর মক্কায় প্রবেশের আগেই কুরাইশরা তাঁর কাছে এসে নিরাপত্তার আবেদন জানান।

এদিকে আবু সুফিয়ান কয়েকজনকে সাথে নিয়ে খবর নেওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হলেন। আবু সুফিয়ান ও আব্বাস রা.-এর মধ্যে দেখা হয়ে যায়। আব্বাস রা. আবু সুফিয়ানকে আত্মসমর্পনে রাজি করালেন ও জীবনের নিরাপত্তার ওয়াদা দিলেন। এরপর তাকে নিয়ে আব্বাস রা. মহানবী সা.-এর তাঁবুর দিকে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে পাহারায় থাকা উমার রা. আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে উল্লসিত হলেন ও তাকে নিয়ে দ্রুত নবী সা.-এর কাছে গেলেন। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার জন্য বার বার রাসূল সা.-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। আব্বাস রা. জানালেন তিনি আবু সুফিয়ানের নিরাপত্তার ওয়াদা করেছেন।

নবী সা. আবু সুফিয়ানের সাথে কথা বলে তাকে ইসলাম কবুলের জন্য আহ্বান জানালেন। সে প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে ইসলাম কবুল করে। আল্লাহর রাসূল সা. তখন তাকে সম্মানিত করলেন। মক্কার মূল নেতা আবু সুফিয়ানের নিরাপত্তার ঘোষণা দিলেন এবং বললেন, আবু সুফিয়ান নিরাপদ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখেবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ।

১৭ রমাদান মুসলিম বাহিনী মাররুজ জাহরান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। এই যাত্রায় মক্কার বাইরের ও ভেতরের কোনো গোত্র যাতে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয় সেজন্য সেনাবাহিনীর সামনে আবু সুফিয়ানকে রাখা হয়। আবু সুফিয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে আছে এটা দেখে যারা প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলো তারাও মনোবল হারিয়ে ফেললো।

মক্কার উপকণ্ঠে এসে আব্বাস রা. বললেন, আবু সুফিয়ান এবার তুমি কওমের কাছে যাও এবং তাদের বুঝাও। আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় গিয়ে পৌঁছলো এবং উচ্চকন্ঠে বললো, হে কুরাইশগণ! মুহাম্মদ তোমাদের কাছে এতো সৈন্য নিয়ে এসেছে যে, মোকাবেলা করা অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানে ঘরে প্রবেশ করবে, সি নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা উঠে এসে আবু সুফিয়ানের গোঁফ নেড়ে বললো, তোমরা এই বুড়োকে মেরে ফেলো। খারাপ খবর নিয়ে আসা এই বুড়োর অকল্যাণ হোক।

আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের সর্বনাশ হোক! দেখো তোমাদের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে এই মেয়েলোক তোমাদের যেন ধোঁকায় না ফেলে। মুহাম্মদ এতো বিরাট বাহিনী নিয়ে এসছে যার মোকাবেলা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ। লোকেরা বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আমরা কয়জন তোমার ঘরে যেতে পারবো?

আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর এবং মসজিদে হারাম অর্থাৎ কাবাঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। মক্কার কিছু মুশরিক মুসলিমদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো।

মুহাম্মদ সা. সৈন্য সমাবেশ করলেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-কে নিজের ডানদিকে রাখলেন। তাকে মুহাম্মদ সা. নির্দেশ দিলেন যেন মক্কার ঢালু এলাকায় প্রবেশ করেন। খালেদকে বললেন, যদি কুরাইশদের কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে হ্ত্যা করবে। এরপর তুমি সাফায় গিয়ে আমার সাথে দেখা করবে। যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা.-কে বামদিকে রাখলেন। তাঁর হাতে ছিলো ইসলামের পতাকা। মুহাম্মদ সা. তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ কোদায় প্রবেশ করেন এবং হাজুনে তাঁর দেয়া পতাকা স্থাপন করে মুসলিম বাহিনীর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। পদব্রজে যারা এসেছিলেন তাদের পরিচালনা দায়িত্ব পালন করছিলেন আবু ওবায়দা রা.। মুহাম্মাদ সা. আদেশ দিলেন, তিনি যেন প্রান্তরের প্রান্তসীমার পথ ধরে অগ্রসর হন এবং মক্কায় প্রবেশ করেন। নির্দেশ পাওয়ার পর সেনাপতিরা নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন।

খালিদ রা. এবং তাঁর সঙ্গীদের পথে যেসব পৌত্তলিক আসছিলো, তাদের সাথে মোকাবেলা করে তাদের হত্যা করা হলো। সেখানে ১২ জন মুশরিক মৃত্যুবরণ করলো। দুইজন মুসলিম বাহিনী থেকে একটু আলাদা হয়ে যাওয়ায় ঐ দুইজন শাহদাত বরণ করলেন। খালিদ রা. খান্দামায় শত্রুদের মোকাবেলার পর মক্কার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাফায় ‍গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে মিলিত হলেন। আর কোনো স্থানে কেউ বাধা দেয় নি। সবাই বিনা বাধায় মক্কায় প্রবেশ করলো।

এরপর মুহাম্মদ সা. আনসার ও মুহজিরদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন। প্রথমে তিনি হাজরে আসওয়াদ চম্বুন করলেন। এরপর কাবাঘর তওয়াফ করলেন। সে সময় মুহাম্মদ সা.-এর হাতে একটি লাঠি ছিলো। কাবাঘরের আশেপাশে এবং ছাদের ওপর সেই সময় বহু মূর্তি ছিলো। তিনি তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে সেসব মূর্তিকে গুঁতো দিচ্ছিলেন আর উচ্চারণ করছিলেন, "জায়াল হাক্কু ওয়া জাহাকাল বাতিলু ইন্নাল বাতিলা কানা জাহুকা" (সত্য এসছে, অসত্য চলে গেছে, নিশ্চয় অসত্য চলে যাওয়ার মতো)।

মুহাম্মদ সা. তাঁর উটনীর উপর বসে তওয়াফ করলেন। তওয়াফ শেষ করার পর উসমান ইবনে তালহা রা.-কে ডেকে তাঁর কাছ থেকে কাবা ঘরের চাবি নিলেন। কাবাঘর খোলা হলো। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন অনেকগুলি ছবি। এসব ছবির মধ্যে ইবরাহীম আ. এবং ইসমাইল আ.-এর ছবিও ছিলো। তাঁদের হাতে ছিলো ভাগ্য গণনার তীর। এ দৃশ্য দেখে মুহাম্মদ সা. বললেন, আল্লাহ তায়ালা এই সব মুশরিককে ধ্বংস করুন। আল্লাহর শপথ, এই দুই জন পয়গম্বর কখনোই গণনায়-এর তীর ব্যবহার করেননি। মুহাম্মদ সা. কাবাঘরের ভেতর কাঠের তৈরি একটি কবুতরও দেখলেন। নিজ হাতে তিনি সেটি ভেঙ্গে ফেললেন। তাঁর নির্দেশে ছবিগুলো নষ্ট করে ফেলা হলো।

এরপর মুহাম্মদ সা. ভেতর থেকে কাবাঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। উসামা রা. এবং বিলাল রা. ভেতরেই ছিলেন। তিনি সেখানে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে তিনি কাবাঘরের ভেতরের অংশ ঘুরলেন। সকল অংশে তকবীর এবং তাওহীদের বাণী উচ্চারণ করলেন। এরপর পুনরায় কাবা ঘরের দরজা খুলে দিলেন। মুশরিকরা সামনে অর্থাৎ মসজিদে হারামে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলো। মুহাম্মদ সা. কোরায়শদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণে তিনি বললেন,

‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা সত্য করে দেখিয়েছেন। তাঁর বান্দাদের মাধ্যমে তিনি একাই সকল বিরুদ্ধ শক্তিকে পরাজিত করেছেন। শোনো, কাবাঘরের তত্ত্বাবধান এবং হাজীদের পানি পান করানো ছাড়া অন্য সকল সম্মান বা সাফল্য আমার এই দুই পায়ের নীচে। মনে রেখো, যে কোন রকমের হত্যাকান্ডের দায়িত্ব বা ক্ষতিপূরণ একশত উট। এর মধ্যে চল্লিশটি উট হবে গর্ভবতী।

হে কুরায়শরা, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মধ্যে থেকে জাহেলিয়াত এবং পিতা ও পিতামহের অহংকার নিঃশেষ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ আদমের সন্তান আর আদম মাটি থেকে তৈরি। এরপর তিনি কুরআন থেকে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে, তোমরা এক অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকি। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।

এরপর তিনি বললেন, হে কোরায়শরা, তোমাদের ধারণা, আমি তোমদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো? সবাই বললো, ভালো ব্যবহার করবেন, এটাই আমদের ধারণা। আপনি দয়ালু। দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। এরপর তিনি বলেন, তাহলে আমি তোমাদেরকে সেই কথাই বলছি, যে কথা হযরত ইউসুফ আ. তাঁর ভাইদের বলেছিলেন, ‘লা তাছরিবা আলাইকুমুল ইয়াওমা।’ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।

কাবাঘরের চাবি আগে যে পরিবারের কাছে ছিল তাদের হাতেই ন্যাস্ত করা হয়েছে। রাসূল সা. উসমান ইবনে তালহাকে চাবি দিয়ে বললেন, এই চাবি সব সময়ের জন্যে নাও। তোমাদের কাছ থেকে এ চাবি যে কেড়ে নেবে সে জালিম। হে উসমান! আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তার ঘরের তত্ত্বাধায়ক নিযুক্ত করেছেন। এরপর বিলাল রা.-কে কা'বার ছাদে উঠে আজান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেদিন মুহাম্মদ সা. উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে গিয়ে গোসল করলেন। এরপর সেখানে আট রাকাত শুকরানার নামায আদায় করলেন।

মুহাম্মদ সা. মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এরপরেও নয় ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন। এরা ছিল ইসলামের চরম দুশমন। তারা মক্কার মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতন করেছিল। তাই তাদের ক্ষমা করা হয় নি। এরা হলো ১. আবদুল ওজ্জা ইবনে খাতাল ২. আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবু সারাহ ৩. ইকরামা ইবনে আবু জাহেল ৪. হারিস ইবনে নুফায়েল ইবনে ওয়াহাব ৫. মাকিস ইবনে সাবাবা ৬. হাব্বাব ইবনে আসওয়াদ ৭ সারাহ ৮. এবং ৯. ইবনে খাতালের দুই দাসী।

আবদুল্লাহ ইবনে সা’দকে উসমান ইবনে আফফান রা. রাসূল সা. কাছে নিয়ে তার প্রাণভিক্ষার সুপারিশ করলেন। মুহাম্মদ সা. প্রাণভিক্ষা দিয়ে তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নিলেন। কিন্তু এর আগে তিনি কিছুক্ষণ নীরব ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলিনে যে, ইতিমধ্যে কোন একজন সাহবী আবদুল্লাহকে হ্ত্যা করুক। কেননা এই লোকটি আগেও একবার ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলো। কিন্তু পরে মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে এসেছিলো। দ্বিতীয়বার ইসলাম গ্রহণের পর অবশ্য তিনি ইসলামের ওপর অটল অবিচল ছিলেন।

ইকরামা ইবনে আবু জাহেল ইয়েমেনের পথে পালিয়ে গিয়েছিলো। তার স্ত্রী রসূল মুহাম্মদ সা.-এর কাছে স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইলো। রসূল সা. তা মঞ্জুর করলেন। এরপর সেই মহিলা ইকরামাকে ফিরিয়ে আনলো। এরপর ইকরামা ইসলাম গ্রহণ করে। ইবনে খাতাল কাবাঘরের পর্দা ধরে ঝুলছিলো। তাকে সেখানেই হত্যা করা হলো। হারিস ও মাকিসকে হত্যা করা হলো। হাব্বাব মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। ফিরে আসলে তাকে ক্ষমা করা হয়। সারাহ'র প্রাণভিক্ষা মঞ্জুর করা হয়। ইবনে খাতালের দুইজন দাসীর মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয়। অন্যজন ইসলাম গ্রহণ করেন ও তাকে ক্ষমা করা হয়। মোট ৯ জনের মধ্যে ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় বাকীরা ক্ষমা পায়।

মক্কা বিজয়ের পরদিন ১৮ রমজান মুহাম্মদ সা. ভাষণ দেওয়ার জন্যে দাঁড়লেন। তিনি মক্কার গুরুত্ব ও এর পবিত্রতা সম্পর্কে কথা বলেন। মক্কায় সব রক্তপাত নিষিদ্ধ করেন। এর পবিত্রতা রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে বলেন। তাঁর এই ভাষণের পর মদিনার আনসার সাহাবীরা সংশয়ের মধ্যে পড়ে যান। তারা কেউ কেউ ভেবেছেন মুহাম্মদ সা. আর মদিনায় ফিরে যাবেন না। তারা দুঃখিত ও মনে কষ্ট পেলেন। পরে তারা মুহাম্মদ সা.-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর করেন, আমার জীবন মরণ তোমাদের সাথে। এরপর তারা সংশয়মুক্ত হলো এবং খুশি হলো।

এরপর রাসূল সা. কা'বা, মক্কা ও তার আশেপাশের মুর্তি ভাঙার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে পাঠানো হলো নাখলায় উজ্জার মুর্তিকে ধ্বংস করার জন্য। কুরাইশ এবং সমগ্র বনু কেনানা গোত্র এ মূর্তির পূজা করতে। এটি ছিলো তাদের সবচেয়ে বড় মূর্তি। বনু শায়বান গোত্র এ মূর্তির তত্ত্বাবধান করতো। খালিদ রা. ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। এভাবে অন্যান্য মূর্তিগুলোও ভেঙ্গে ফেলা হয়।

মক্কা বিজয়ই ছিল আরবে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দারুণ বিজয়। আর এই বিজয়ের দ্বার উন্মোচন হয়েছে হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা তাই হুদায়বিয়ার সন্ধির কূটনৈতিক বিজয়কেই বড় বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা কা'বার ওপর অধিকার লাভ করেছে। যাকে কেন্দ্র করে মুসলিমরা নামাজ পড়ে সেই কেন্দ্র কা'বাকে শিরকের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো মক্কা বিজয়ের সূচনা বা ভূমিকা। এ সন্ধির ফলে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা গেছে। মানুষ একে অন্যের সাথে খোলাখুলি আলাপ করার সুযোগ পাচ্ছিলো। ইসলাম সম্পর্কে তারা মতবিনিময় ও তর্ক বিতর্ক করছিলো। মক্কায় যেসব লোক গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তারাও দ্বীন সম্পর্কে মত বিনিময়ের সুযোগ পেলো। ফলে বহু লোক ইসলামে দীক্ষিত হলো। ইতিপূর্বে বিভিন্ন যু্দ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা তিন হাজারের বেশী ছিলো না। অথচ মক্কা বিজয়ের সময় তাদের সংখ্যা ছিলো ১০ হাজার। এছাড়াও সন্ধির সময়ে সারা পৃথিবীতে মুহাম্মদ সা. নবুয়্যত ও ইসলামের দাওয়াত জানিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন