২২ অক্টোবর, ২০২১

খাদিজা রা. ও মুহাম্মদ সা.-এর বিয়ে


খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি লোকজনকে নির্দিষ্ট বেতনে ও লভ্যাংশের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে নিয়োগ করতেন। ব্যবসায়ী গোত্র হিসেবে কুরাইশদের নাম-ডাক ছিল। মুহাম্মদ সা.-এর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক মহত্ত্বের কথা জানতে পেরে তিনি তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁর পণ্যসামগ্যী নিয়ে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বললেন যে, এজন্য তিনি অন্যদেরকে যা গিয়ে থাকেন তার চেয়ে উত্তম সম্মানী তাঁকে দেবেন। মাইসারাহ নামক এক গোলামকেও তাঁর সাহায্যের জন্য সঙ্গে দিতে চাইলেন। মুহাম্মদ সা. এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং খাদীজার পণ্য সামগ্রী ও দাস মাইসারাহকে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন।

সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি জনৈক খ্রিস্টান ধর্মযাজকের গীর্জার নিকটবর্তী এক গাছের নীচে বিশ্রাম করলেন। মুহাম্মদ সা.-এর নিকট নবুয়ত আসার আগে খ্রিস্টানরাই ছিল মুসলিম। ধর্মযাজক মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছটির নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি কে?” মাইসারাহ বললেন, “তিনি হারামের অধিবাসী একজন কুরাইশ বংশীয় ব্যক্তি।” ধর্মযাজক কললেন, “তিনি শেষ নবী ছাড়া আর কেউ নন!”

মুহাম্মদ সা. তাঁর আনীত পণ্য বিক্রি করে দিলেন এবং নতুন কিছু জিনিস ক্রয় করলেন। অতঃপর তিনি মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। পথে যেখানেই দুপুর হয় এবং প্রচণ্ড রৌদ্র ওঠে, মাইসারাহ দেখতে পায় যে, একটি ছায়া তাদেরকে রৌদ্র থেকে রক্ষা করেছে। মক্কায় পৌঁছে মুহাম্মদ সা. খাদিজাকে তাঁর পণ্যদ্রব্য ও অর্থ বুঝিয়ে দিলেন। প্রায় দ্বিগুণ লাভ হলো খাদিজার। খাদিজা এত লাভ দেখে অবাক হলেন। মাইসারাহ খাদিজাকে যাজকের বক্তব্য ও মুহাম্মদ সা.-কে ছায়াদানের বিষয় অবহিত করলেন।

খাদীজা ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বুদ্ধিমতি ও সম্ভ্রান্ত মহিলা। মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এসব শুনে মনে মনে তাঁকে পছন্দ করে ফেললেন। এর আগে বড় বড় সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। মনের গোপন ইচ্ছার কথা খাদিজা রা. তাঁর বান্ধবী নাফিসার কাছে ব্যক্ত করলেন। নাফিসা গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে কথা বললেন। মুহাম্মদ সা. তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করলেন।

তাঁর চাচারা এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলেন। চাচা হামজা রা. খাদিজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদের সাথে আলোচনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। এরপর ২০ টি উট মোহরানা ধার্য হয়ে বিয়ে হলো। এ বিয়েতে বনি হাশেম এবং মুজার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষ করে ফিরে আসার দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

মুহাম্মদ সা.-এর সাথে খাদিজা রা.-এর বিয়ের সময় বয়স কত ছিল তা নিয়ে দু'টি মত রয়েছে। একটি মতামত হচ্ছে মশহুর মানে প্রসিদ্ধ, আর সেটা হলো ৪০ বছর। অন্যটি অপ্রসিদ্ধ তবে অধিকতর সঠিক, আর সেটা হলো ২৭/২৮। ইসলামের ১ম গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে বিয়ের সময় তাঁর বয়স ২৭/২৮ ছিল।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য সেটা হলো যারা সীরাত রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে দুটি দল রয়েছে। একদল মুহাম্মদ সা.-এর ব্যাপারে আবেগাক্রান্ত হয়ে সীরাত রচনা করেছেন। অন্য দল যুক্তি ও দলিলের নিরিখে ইতিহাস রচনা করেছেন। ১ম দল খাদিজা রা.-এর বিয়ে নিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর মহানুভবতা ফুটিয়ে তুলতে চান। তারা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেন মুহাম্মদ সা. বয়স্ক খাদিজা রা.-কে বিয়ে করে তাঁর প্রতি করুণা করেছেন।

কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়, বরং উল্টো। দুইবারের বিধবা খাদিজা রা.-কে বিয়ে করার জন্য মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী মানুষ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু খাদিজা রা. সবাইকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। বরং মক্কার মানুষ অবাক হয়েছে মুহাম্মদ সা.-এর মতো দরিদ্র যুবককে তিনি বিয়ে করেছেন বলে। ২য় দল নানানভাবে গবেষণা করে তাঁর বয়স ২৭/২৮ বলেছেন। আলেমগণ এই মতামতকে অধিকতর সহীহ বলে জানিয়েছেন।

নবুয়তের তিন বছর পর খাদিজা রা.-এর সবশেষ সন্তান আব্দুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। যদি খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ হয় তবে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় তাঁর বয়স হয় ৫৮ বছর। আর যদি ২৭/২৮ বছর হয় বিয়ের বয়স তাহলে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় খাদিজা রা.-এর বয়স হয় ৪৫/৪৬। ৫৮ বছর বয়সে সন্তান জন্মদান, এটা খুবই রেয়ায় বা অলৌকিক ঘটনা। যদি তাই হতো তবে এটা নিয়ে আলাদা আলোচনা তৈরি হতো।

যাই হোক, খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ ছিল এটি ভুল বলা যাবে না, কারণ সঠিক কথা আমরা কোনো হাদিসে পাই না। তবে ২৭/২৮ হওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বাকী আল্লাহ ভালো জানেন।

খাদিজার গর্ভে মুহাম্মদ সা.-এর একজন সন্তান ছাড়া বাকি সবার জন্ম হয়। কাসিম, তাহির তাইয়েব, যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আব্দুল্লাহ। কাসিমের নামানুসারে মুহাম্মদ সা. আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম ও তাহির জাহেলিাতের যুগেই মারা যান। আব্দুল্লাহ নবুয়তের ৩য় বছরে জন্ম নেন ও ৫ম বছরে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সাথে হিজরত করেন। খাদিজা রা. নবুয়তের দশম বছরে ইন্তেকাল করেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন