১১ নভেম্বর, ২০২১

ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু রহস্য


এখন থেকে ১৭ বছর আগে, ২০০৪ সালে অনেকটা হুট করে মারা গিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত। তিনি সেসময় প্রায় দুই বছর ধরে রামাল্লায় ফাতাহর অফিসে অবরুদ্ধ ছিলেন। ২৫ অক্টোবর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অফিস সবসময় ইসরাঈলী সেনা দ্বারা অবরুদ্ধ থাকতো। বাইরে থেকে ডাক্তাররা এসে তার সব পরীক্ষা নিরিক্ষা করালেন। কিন্তু তারা কিছু বুঝতে পারেন নি।

তারা তাকে অধিকতর চিকিৎসার জন্য ফিলিস্তিনের বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ইসরাঈলও এতে বাধ সাধেনি। তবে ইয়াসির আরাফাত নিজেই যেতে চাননি। তার আশংকা ছিল তিনি কোনোভাবে ফিলিস্তিনের বাইরে গেলে তাকে আর দেশে ফিরতে দিবে না ইসরাঈল।

মাহমুদ আব্বাস সেসময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি জানতেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শিরাকের সাথে ইয়াসির আরাফাতের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। ফ্রান্সের সাথে এই সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আরাফাতের খ্রিস্টান স্ত্রী সুহার মাধ্যমে। যাই হোক মাহমুদ আব্বাস ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের কাছে ইয়াসিরের জন্য চিকিৎসা সাহায্য চাইলে তিনি সানন্দে রাজি হন। এবার মাহমুদ ইয়াসিরকে ফ্রান্সে যেতে অনুরোধ করলে ইয়াসির আরাফাত রাজি হন। কারণ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট শিরাক তাকে আবার ফিলিস্তিনে ফেরার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন বলে আরাফাতের বিশ্বাস ছিল।

ক'দিন পর তাকে বিমানে করে প্যারিসের কাছে একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার দেহে এমন কোন পরীক্ষা বাকি ছিল না যা ফ্রান্সের ডাক্তাররা করান নি। কিন্তু কোনো সংক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায় নি। ডাক্তাররা বলছিলেন, মনে হচ্ছে যেন তার দেহে বাইরে থেকে কিছু একটা 'অনুপ্রবেশ' করেছে কিন্তু তা যে কি এবং কীভাবে তা ডাক্তাররা বের করতে পারেন নি। তিনি পেটে কিছু রাখতে পারছিলেন না। ভীষণ ডায়রিয়া, দেহে পানিশূন্যতা, কিছু খেতে পারছেনও না।

হাসপাতালে তার প্রথম পাঁচ দিন পর্যন্ত আরাফাত বেশ ভালোই ছিলেন। তিনি বিছানার ওপর উঠে বসেছিলেন, তিউনিসিয়ায় থাকা তার মেয়ের সাথে কথা বলেছিলেন। বিদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফোন ধরছিলেন। এমনকি রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মচারীদের বেতন দেবার ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী সালাম ফায়াদকে নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তার পরিপাকতন্ত্র পুরোটাই সংক্রমিত হলো। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ইয়াসির আরাফাতের গলা থেকে অন্ত্র পর্যন্ত ভেতরটা মনে হচ্ছে যেন পুড়ে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন তিনি এমন কিছু খেয়েছেন যাতে তার পরিপাকতন্ত্রটার ভেতর দিকটা পুড়ে গেছে।

নভেম্বরের ৩ তারিখ ইয়াসির আরাফাত সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। তবে ডাক্তাররা এমন কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না যা রোগীকে অচেতন করে ফেললো। কোন বিষক্রিয়া ঘটেছে কিনা তার পরীক্ষা করার জন্য বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞও আনা হয়েছিল। একমাত্র সমস্যা দেখা গিয়েছিল তার রক্তের প্লাটিলেট কমে গিয়েছিল, কিন্তু তার জন্য তার দু বার ডায়ালিসিস করা হয়েছিল, প্লাটিলেট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দু'দিন পর নতুন রক্তেরও একই অবস্থা হলো।

তিনি পুরোপুরি 'কোমা'য় চলে গেলেন। তার দেহের প্রতিটি প্রত্যঙ্গ একের পর এক অকেজো হয়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতি থেকে তিনি আর ফিরে আসতে পারেন নি। ফ্রান্সে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ নভেম্বর ভোরবেলা মারা যান ইয়াসির আরাফাত।

মৃত্যুর আগে ৮ দিন কোমায় ছিলেন তিনি। মৃত্যুর কারণ হিসেবে ইয়াসির আরাফাতের ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছিল, "নির্ণয় করা যায় নি এমন এক কারণে তার মৃত্যু ঘটেছে।"

ইয়াসির আরাফাতের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও ফ্রান্সে নিযুক্ত তৎকালীন ফিলিস্তিনী দূত লায়লা শহীদ বলেছেন আমি যখন তাকে (ইয়াসির আরাফাত) দেখি ফ্রান্সের সামরিক বিমানবন্দরে তখন তার ত্বক ছিল পুড়ে যাওয়া রোগীদের মতো তামাটে। যেন সারা শরীরে ফোস্কা হয়ে গেছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি খালি গায়ে রোদে বসে ছিলেন কেন?'

তিনি বললেন, 'কি বলছো লায়লা! আমি দু বছর ধরে আমার অফিসে বন্দী, রোদ কোথায় পাবো?' তখন আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম। ভাবলাম হয়তো তিনিই তার চামড়ার সমস্যাটা ঠিক বুঝতে পারেন নি। হাসপাতালে যাবার পর আমি ডাক্তারকে বললাম, তার এই যে ত্বকের সমস্যাটা দেখছি এটা তো তিন মাস আগে ছিল না।"

তার মৃত্যু নিয়ে অনেক গুঞ্জন তৈরি হয়। অনেককে সন্দেহ করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি সন্দেহের শিকার হন তার স্ত্রী সুহা। সংশয় কাটাতে ৯ বছর পর ২০১৩ সালে তার দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে সুইজারল্যান্ডে পরীক্ষা করানো হয়। তখন তাতে উচ্চমাত্রার তেজষ্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যা লায়লার কথার সাথে মিলে যায়। তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাবে ত্বক এভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

তবে তাকে কারা হত্যা করেছে এটা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ইয়াসির আরাফাত তার জীবনের শুরুর দিকে ফিলিস্তিনীদের হিরো হিসেবে আবির্ভাব হয়েছেন। তবে পশ্চিমাদের টোপ গিলে তিনি ফিলিস্তিনীদের ভাগ্যকে বরবাদ করেছেন একইসাথে নিজের জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। তিনি নিজেও তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি ১৯৮৫ সাল সাল থেকে পশ্চিমা বিশ্বের অনুগত হয়ে পড়েন। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে তিনি অসলো শান্তিচুক্তি করেন। ১৯৯৪ সালে এই ভাঁওতা চুক্তির জন্য ইয়াসিরকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।

চুক্তির ফলে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজায় আরাফাতের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। তবে এই সরকারের কোনো সার্বভৌমত্ব ছিল না। ইসরাঈলী সেনারা সবসময় ফিলিস্তিনে থাকতো এবং নতুন নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করতো। যাকে ইচ্ছে তাকে উচ্ছেদ ও এরেস্ট করতো। সবই হয়েছে চুক্তি অনুসারে। আরাফাত বুঝেছিল সে ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে। অসলো চুক্তির কারণে মূলত সমগ্র মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে ইসরাইলী সেনাবাহিনীর নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয়েছে। মুসলিমরা আরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

তিনি এসবের প্রতিবাদ করেছেন। চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। শেষ জীবনে গৃহবন্দী ছিলেন। আজ তাঁর ১৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সম্মানিত করুন। তাঁর ভুল ত্রুটি ক্ষমা করুন এবং ফিলিস্তিনবাসীকে মুক্ত করুন।


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন