২৯ নভেম্বর, ২০২১

খিলাফত পর্ব-০১ : রাশিদুন খিলাফতের যুগ শুরু হলো যেভাবে


মুহাম্মদ সা.-এর মৃত্যুর পর বনু সাঈদা গোত্রে খাজরাজদের একদল লোক সমবেত হলো। তারা সা'দ বিন উবাদার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। আলী রা.-এর ঘরে ছিল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.। তারা এখন এসব ঝামেলায় জড়াতে চাননি। একদল লোক তাদের আনুগত্য করলো। তারা সম্ভবত আলী রা.-কে পরিবারের সদস্য হিসেবে নেতা মানতে চেয়েছিল।

আওস গোত্রের শাখা আব্দুল আশহাল গোত্রের নেতা উসাইদ বিন হুদাইর রা.-এর নেতৃত্বে কিছু সাহাবী আলাদা হয়ে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। অল্প সময়ের মধ্যে সাহাবারা তিনভাগ হয়ে গেল। সা'দ বিন উবাদা রা.-এর নেতৃত্বে বেশি মানুষ জমায়েত হলো। তিনজন নেতা দেখা দিলেও মদিনার বেশিরভাগ সাহাবী এই তিনদলের কারো সাথেই যুক্ত হননি। মুহাজিররা সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য আবু বকর রা.-এর কাছে হাজির হলো।

এই প্রসঙ্গে উমার রা. বলেন, //রাসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকালের পর আমরা খবর পেলাম আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা বনু সাঈদা গোত্রের চত্বরে তাঁদের গণ্যমান্য মুরব্বীদের নিয়ে সমবেত হলেন। আলী রা., তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. ও তাঁদের সহচরগণ আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলেন। আর আবু বকর রা.-এর কাছে জমায়েত হলেন মুহাজিরগণ। আমি আবু বকরকে বললাম, “আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আনসার ভাইদের কাছে চলুন।” বনু সাঈদা গোত্রের কাছে যাওয়ার পথে আনসারদের দু’জন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হলো। তারা আনসারদের মনোভাব জানালেন। অতঃপর আমরা বনু সাঈদা গোত্রে গেলাম। আমরা সেখানে বসলে তাঁদের এক বক্তা আল্লাহর একত্ব ও রাসূলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে এবং আল্লাহ যথোচিত প্রশংসা করে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। বললেন, “আমরা আল্লাহর আনসার এবং ইসলামের বীর সেনানী। আর হে মুহাজিরগণ! আপনার আমাদেরই একটি দল। আপনাদের একটি শান্তশিষ্ট মরুচারী দল আমাদের সাথে এসে ইতোমধ্যেই যোগদান করেছে।” উমার বলেন, আমরা দেখতে পেলাম, তারা আমাদেরকে আমাদের মূল আদর্শ থেকেই বিচ্যুত করতে চাইছে এবং তার ওপর জোরপূর্বক নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছে। আমি এর জবাবে চমৎকার একটা বক্তৃতা তৈরি করলাম এবং তা আমার নিজের কাছে অত্যন্ত যুৎসই মনে হয়েছিল। আমি আবু বকরকে শোনাতে চাইলাম। আবু বকরের মধ্যে এক ধরনের তেজস্বিতা ছিল যার জন্য তাঁকে আমি খুবই ভয় পেতাম এবং যথাসম্ভব তাঁর মনরক্ষা করে চলার চেষ্টা করতাম। আবু বকর বললেন, “উমার। তুমি কিছু বলো না।” তিনি তাঁদের কথার এত সুন্দরভাবে জবাব দিলেন যে, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি যে বক্তব্য তৈরি করে এটি ছিল তার চাইতেও অনেক সুন্দর। তিনি বললেন, “তোমরা নিজেদের মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী ও অবদান সম্পর্কে যা বলেছো তা যথার্থ বলেছো। আবার এ কথাও অনস্বীকার্য যে, এই কুরাইশ গোত্রের অবদান না থাকলে আরবরা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতো না। তারা আরবদের মধ্যে মধ্যম ধরনের বংশীয় মর্যাদার অধিকারী এবং তাদের আবাসিক এলাকাও সমগ্র আরব জাতির মধ্যস্থলে অবস্থিত। আমি তোমাদের সবার জন্য এই দুইজনের যেকোনো একজনকে পছন্দ করি। তোমরা এদের মধ্যে যাকে পছন্দ করো তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হও ও বাইয়াত করো।” এই বলে তিনি আমার ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর হাত ধরলেন। তাঁর এই শেষের কথাটি ছাড়া আর কোনো কথা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছিল, আবু বকর থাকতে অন্য মুসলমান নেতা হতে পারে না। আবু বকরের এই ভাষণের পর আনসারদের একজন বললেন, “আমরা আরবদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তায় যেমন নির্ভরযোগ্য, মান মর্যাদায়ও তেমনি শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমাদের পক্ষ থেকে একজন এবং তোমাদের (কুরাইশদের) তরফ থেকে আরো একজন আমীর হোক।” এরপর প্রচুর বাকবিতন্ডা হলো এবং বেশ চড়া গলায় কথা কথাবার্তা হতে লাগলো। আমার আশংকা হলো যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের দুই গোষ্ঠী মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে একটা বিভেদ বা কলহের সৃষ্টি হয়ে না যায়। আমি (সকল বিতর্কের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে) তৎক্ষণাৎ বললাম, “হে আবু বকর! আপনার হাতখানা বাড়িয়ে দিন।” তিনি বাড়িয়ে দিলেন। আমি তার হাত ধরে বাইয়াত করলাম। এরপর মুহাজিররা বাইয়াত করলেন। তারপর আনসাররাও বাইয়াত করলেন। এরপর আমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে বকাঝকা করতে আরম্ভ করলাম। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের একজন বললেন, “তোমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলে।” আমি বললাম, “আল্লাহই সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলেন।”// নেতা নির্বাচন নিয়ে ঘটে যাওয়া এসব কাণ্ডের কারনে সোমবার গত হয়ে যায়। মঙ্গলবারের রাত চলে আসে। আরবি ক্যালেন্ডার অনুসারে দিন শুরু হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে। মঙ্গলবার সকালে আবু বকর রা. নামাজ শেষে মিম্বরে বসলেন। রাসূল সা. অসুস্থ থাকতেই মসজিদে নববিতে আবু বকর রা. ইমামতি করতেন। আমীর হিসেবে বাইয়াত নেওয়ার পরও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। আবু বকর রা. কিছু বলার আগে উমার রা. তার অনুমতি কিছু বলার জন্য দাঁড়ালেন। আল্লাহর প্রশংসা করে তিনি বলেন, “হে জনতা! গতকাল আমি তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম [অর্থাৎ মুহাম্মদ সা. মারা যাননি, তিনি মুসা আ. মত সাময়িকভাবে অন্তর্ধান হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি] তা আমি কুরআন থেকে পাইনি এবং রাসূলুল্লাহু সা.ও আমাকে তা বলেননি। আমার ধারণা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের সমষ্টিগত জীবনের সকল দিক পুরোপুরিভাবে গুছিয়ে দিয়ে সবার শেষে ইনতিকাল করবেন। কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়। আল্লাহর যে কিতাব দ্বারা তাঁর রাসূল সা.কে নিজের মনোনীত লক্ষ্যে পরিচালিত করেছেন সে কিতাব আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বহাল রেখেছেন। এই কিতাবকে যদি তোমরা আঁকড়ে ধর তাহলে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যেদিকে পরিচালিত করেছেন সেদিকে তোমাদের চালিত করবেন। আজ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠতম তাঁর কাছেই তোমাদের নেতৃত্ব সমর্পণ করেছেন। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্যতম সঙ্গী, সওর পর্বত গুহায় তাঁর একনিষ্ঠ সহচর। অতএব তোমরা তাঁর কাছে বাইয়াত করে তাঁকে খলিফা বা আমীর হিসাবে গ্রহণ করো।” উমার রা.-এর এই কথার পর সাহাবার একযোগে সবাই বাইয়াত করলো। যারা গতকাল করেছিল তারাও আজ আবার আনুগত্যের শপথ করলো। অতঃপর আবু বকর রা. বক্তব্য রাখলেন। প্রথমে আল্লাহর যথোচিত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, “হে জনতা! আমাকে তোমাদের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। আসলে আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি যদি ভাল কাজ করি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি অন্যায় করি তাহলে আমাকে শুধরে দেবে। সত্যবাদিতাই বিশ্বস্ততা। আর মিথ্যাবাদিতা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের কাছে যে দুর্বল বিবেচিত হয়ে থাকে সে আমার শক্তিশালী যতক্ষণ আমি আল্লাহর ইচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না দিতে পারবো। আর তোমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী বিবেচিত হয়ে থাকে তার কাছ থেকে যতক্ষণ প্রাপ্য হক আদায় না করবো ততক্ষণ সে আমার কাছে দুর্বল। মনে রেখ কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ তাকে লাঞ্চনা গঞ্জনা ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেন। আর অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামি যে সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করে সে সমাজকে আল্লাহ বিপদ মুসিবত ও দুর্যোগ দিয়ে ভরে দেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করবো ততক্ষণ তোমরা আমার কথামতো চলবে। কিন্তু যখন আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবো তখন তোমাদের আনুগত্য আমার প্রাপ্য হবে না। তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান থেকো আল্লাহ তোমাদের ওপর রহমত নাজিল করুন।” এই বাইয়াতের সময় গতকালের মতবিরোধের কোনো প্রভাব বিদ্যমান ছিল না। মুসলিমরা আবারো পরস্পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। প্রায় ৩৩ হাজার মুসলিম আবু বকর রা.-এর কাছে আনুগত্যের শপথ করলেন এবং তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এরপর মুসলিমদের নেতা হিসেবে আবু বকর রা.-এর তত্ত্বাবধানে মুহাম্মদ সা. দাফন সম্পন্ন হয়। শুরু হলো মুসলিমদের নতুন যুগ। যাকে রাশিদুন খিলাফত বলা হয়। এর পারিভাষিক মানে হলো রাসূল সা. নির্দেশিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এর সময়কাল প্রায় তিরিশ বছর। যে চারজন শাসকের সময়কে রাশিদুন খিলাফত বলা হয় তাদের একত্রে খুলাফায়ে রাশিদা বলা হয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন