২৬ জুলাই, ২০২২

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

খুররম জাহ মুরাদ। ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানের ২য় নাজিম-ই-আলা বা কেন্দ্রীয় সভাপতি। খুররম জাহ মুরাদ এশিয়ার একজন বিখ্যাত প্রকৌশলী। একই সাথে তিনি ছিলেন দা’য়ী, সংগঠক, ছাত্রনেতা, হাদীস বিশারদ, ইসলামিক চিন্তাবিদ। তাঁর জন্ম হয়েছে ভারতের ভূপালে। ৪৭-এর দেশভাগের সময় তার পরিবার ভূপাল থেকে লাহোরে চলে আসে। 

পড়লেখা শেষে তিনি সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬৫ সালে মাতুয়াইল, মুসলিম নগর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানাসহ ৫৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যামুক্ত এলাকা গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডিএনডি বাঁধ। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন খুররম জাহ মুরাদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৭৫ সালে করা কা'বা ঘরের এক্সটেনশন। তিনি জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমীর ছিলেন।  

সব পরিচয়ের পাশাপাশি খুররম জাহ মুরাদ একজন ভালো লেখকও ছিলেন। তাঁর একটি আর্টিকেল ১৯৫৮ সালে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিলো মাওলানা মওদূদী সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকা 'তরজুমানুল কুরআনে'। নাম ছিল, তেহরিকে ইসলামী মেঁ কারকুনো কি বেহমি তা'লুকাত। প্রবন্ধটি খুবই জনপ্রিয় হয় তাই পরে এটি বই আকারে পাবলিশ হয়। এই দারুণ বইটি পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনুবাদ হয়। বাংলায় এর নাম হয়, 'ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক'। অনুবাদ করেন মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান। 

বইয়ের নাম শুনে বুঝা যাচ্ছে এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় কী। বইটিতে ভ্রাতৃত্বকে জোর দেওয়া হয়েছে। একটি সফল ইসলামী আন্দোলনের জন্য এর বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নং আয়াতে বলেন, “আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের ঘোরতর দুশমন, তখন তিনিই তোমাদের হৃদয়কে জুড়ে দিলেন এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহ ও মেহরবানীর ফলে ভাই-ভাই হয়ে গেলে। (নিঃসন্দেহে) তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের তীরে দাঁড়িয়ে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে নাজাত দিলেন"। ইসলামের একটি বেসিক শিক্ষাই হলো মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। বংশ, গোত্র, বর্ণ, জাতি, সম্পদ ইত্যাদির ব্যবধান দূর করে পরস্পর ভাই হয়ে যাওয়া। 

খুররম জাহ মুরাদ ৪ টি অধ্যায়ে এই বইটি লিখেছেন। ১ম অধ্যায়ে তিনি পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তি, তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে একজন মুসলিমের ভালো চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৩য় অধ্যায়ে যেসব বদ্গুণ সম্পর্কের অবনতি ঘটায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। শেষ অধ্যায়ে সম্পর্ক ভালো করার পন্থা ও ভালো গুণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

১. পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিঃ তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
লেখক এখানে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ঈমানকে উল্লেখ করেছেন, কারণ সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “মু’মিনেরাতো পরস্পরের ভাই”। এরপর ভ্রাতৃত্বকে তিনি ঈমানের অনিবার্য দাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর এই অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেছেন বিশ্বব্যাপী আমরা যে ইসলামী বিপ্লবের কাজ করছি তার জন্য ভ্রাতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই, এটি অপরিহার্য। এরপর খুররম জাহ মুরাদ ভ্রাতৃত্বের দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই ভ্রাতৃত্ব আমাদের কাছে কী চায়! ভ্রাতৃত্বের ফলে আমরা আখিরাতে কী সুবিধা পাবো তা নিয়েও তিনি এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। 

২. চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য 
লেখক বলেছেন, ইসলাম পারস্পারিক সম্পর্কের যে মান নির্ধারণ করেছে তাকে কায়েম ও বজায় রাখার জন্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) পারস্পারিক অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি বিধি-বিধানও তৈরী করে দিয়েছেন। সেই বিধি-বিধানকে অনুসরণ করে এ সম্পর্ককে অনায়াসে দ্বীন-ইসলামের অভীষ্ট মানে উন্নীত করা যেতে পারে। এ বিধি-বিধানের ভিত্তি কতিপয় মৌলিক বিষয়ের ওপর স্থাপিত। লেখকের মতে এই মৌলিক বিষয়গুলো হলো আটটি, কল্যাণ কামনা, আত্মত্যাগ, ইনসাফ, ইহসান, রহমত, ক্ষমা, নির্ভরতা ও মর্যাদা। লেখক এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন ২য় অধ্যায়ে। 

৩. সম্পর্ককে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার উপায়
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেকার সম্পর্ককে বিকৃত করতে ও নষ্ট করার জন্য কিছু বদ্গুণ দায়ি। লেখক এখানে ১৫ টি বদগুণ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো আমাদের সম্পর্ককে নষ্ট করে। ৩য় অধ্যায়ে লেখক এসব বদ্গুণের ব্যাপারে ও কুফল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেকটি বদগুণের ব্যাপারে ইসলামের বিধান বর্ণনা করেছেন। 

৪. সম্পর্ক দৃঢ়তর করার পন্থা
পূর্বের অধ্যায়ে বর্ণিত সম্পর্কের বিকৃতি ও অনিষ্টসাধনকারী এ জিনিসগুলো থেকে বারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যেগুলো গ্রহণ ও অনুসরণ করার ফলে সম্পর্ক দৃঢ়তর ও স্থিতিশীল হয়, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং যার ফলে দুটো হৃদয়ের মধ্যে এক হাতের দু’টি অংগুলির মতোই ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়, আল্লাহ্ ও রাসূল (সঃ) সেগুলোও আমাদেরকে সুনির্দিষ্টরূপে বলে দিয়েছেন। এর ভেতর কতকগুলো জিনিসকে অত্যাবশ্যকীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথবা বলা যায়, সেগুলোকে অধিকার (হক) হিসেবে পেশ করা হয়েছে। আবার কতকগুলো জিনিসের জন্যে করা হয়েছে নসিহত। এগুলো হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের পর্যায়ভূক্ত। লেখক এরকম ১৮ টি গুণের কথা কথা উল্লেখ করে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।  

খুররম জাহ মুরাদের লেখার সাথে যারা পরিচিত তারা বিষয়টা জানেন। তিনি তাঁর লেখায় প্রচুর কুরান-হাদীসের রেফারেন্স ইউজ করেছ। প্রতিটি বিষয়ে তিনি ইসলামের নির্দেশনার আলোকে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন। যারা এই বইটি এখনো পড়েননি, পড়ে নিন। সর্বস্তরের মানুষের সাথে আপনার মুয়ামেলাত সুন্দর করার একটি দারুণ গাইডলাইন পাবেন।  

চরিত্র গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মানুষ রাতারাতি অর্জন করতে পারে না। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে: চরিত্র গঠনের গোটা পরিকল্পনাটিকে বুঝে নিয়ে এক একটি জিনিসকে মনের মধ্যে খুব ভালো মতো বদ্ধমূল করে নেয়া, তারপর তাকে গ্রহণ ও অনুসরণ করার চেষ্টা করা এবং এভাবে প্রথমটির পর দ্বিতীয়টির পর তৃতীয়টিকে গ্রহণ করা। ধীরে ধীরে ভালো গুণগুলো প্র্যাকটিস করা ও বদগুণগুলো আমাদের আচরণ থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। তবেই এই বই পড়া সার্থক হবে। ইনশাআল্লাহ।  

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক
লেখক : খুররম জাহ মুরাদ
অনুবাদক : মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান  
প্রকাশনী : আইসিএস
পৃষ্ঠা : ৯৬
মুদ্রিত মূল্য : ৪০
জনরা : আত্মউন্নয়ন ও মোটিভেশন

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন