৭ আগস্ট, ২০২২

হাসিনাকে কেন তেলের দাম বাড়াতে হলো?

 


বাংলাদেশের জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির বেসিক কারণ হলো রিজার্ভ সংকট। আর রিজার্ভ সংকটের কারণ হলো মেগাপ্রজেক্টের নামে মেগাদুর্নীতি। সরকারের আমলা ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে বড় কাজ সব স্থানে হরিলুট চালিয়েছে।

যে সড়কের মেরামতে লাগার কথা এক কোটি টাকা সেখানে ব্যয় করেছে ১০ কোটি টাকা। একেকটা বালিশ কিনেছে ৫৫ হাজার টাকায়। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু ৪০ হাজার কোটি টাকায়। এভাবে এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সরকারি অর্থের হরিলুট হয় নাই। সরকারের কোনো কেনাকাটা বাজারদরের দশগুণের চাইতে কম হয়নি। এসব কারণে জনগণের ওপর বার বার ট্যাক্স আরোপ করেও রিজার্ভ সংকট কাটানো যায়নি।

এছাড়া যেসব কারণে রিজার্ভ বাড়ার কথা সেসব খাতে সরকারের কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। প্রবাসী কল্যাণে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। নতুন নতুন দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। তৈরি পোষাক ও চামড়া শিল্পের বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ভারতকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। ইত্যাদি বহু কারণে রিজার্ভ সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ। সেগুলো পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো পরিকল্পনা।

এমতাবস্তায় অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারী সরকার IMF-এর কাছে ঋণ চেয়েছে। IMF সাধারণত যে শর্তগুলো দেয় তার একটি হলো জ্বালানী খাতে ভর্তুকি না দেওয়া। IMF তাদের ঋণ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা যাচাই করে। সে অনুযায়ী শর্তারোপ করে এবং ঋণ দেয়। বাংলাদেশ এখনো ঋণ দাতা গোষ্ঠীগুলোর সাথে বৈঠক করেনি। বৈঠকের আগেই হাসিনা সরকার তেলের মূল্য বড় আকারে বাড়িয়ে IMF ও দাতা গোষ্ঠীকে বুঝাতে চায়, শুধু জ্বালানীতে ভর্তুকি বন্ধ নয়, জ্বালানী তেল থেকে লাভ করেও আমরা ঋণ পরিশোধে সক্ষম।

মহাদুর্নীতি ও হরিলুটের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি ডলার ঋণ নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু এ সংস্থা থেকে ঋণের প্রধানতম শর্তই হলো জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে নেয়া। এখন বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, সরকার যে ঋণ চেয়েছে সংস্থাটির কাছ থেকে তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগেই তেলের দাম বাড়িয়ে তাদের শর্ত পূরণ করে নিলো।

বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা যে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার বড় অংশই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য। গত মাসে আইএমএফ'র একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছিলো এবং সে সময় সরকারকে এ ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যত সরকার এসেছে তারা সবাই জ্বালানীতে ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হাসিনা সরকার। ২০১৪ সালে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই মাত্র ছয় মাস তারা কিছুটা সাবসিডি বা ভর্তুকি দিয়েছে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে। ৭ বছরের লাভ তারা লুট করে ফেলেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি জানিয়েছে ছয়মাসে জ্বালানি তেল বিক্রয়ে ৮০১৪.৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

বিশ্ব বাজারে তেলের দাম নজিরবিহীন কমে আসায় ২০১৪-১৫ অর্থ বছর থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করেই সংস্থাটি মুনাফা করেছিলো প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এটা তাদের হিসাব। কিন্তু এখানে ব্যাপক গড়বড় রয়েছে। এত কম হওয়ার কথা নয়। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন ডিজেলের দাম ১১৪ টাকা নির্ধারণের পরও নাকি তাদের সাবসিডি দিতে হচ্ছে। এটা ডাহা মিথ্যা কথা।

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানী নিয়ে বার বার মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে। গত জুলাই মাসে হাসিনাও মিথ্যা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। এমনকি IMF-এর ঋণ নিয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন তাদের নাকি ঋণের দরকার নেই। আবার এখন ঋণের জন্য জ্বালানী তেলের মূল্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

গত সপ্তাহের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলার। বাংলাদেশের ডলার রেট ৯৫ টাকা। এই হিসেবে অপরিশোধিত তেলের ক্রয়মূল্য ৫২ টাকা লিটার প্রতি। এটাকে পরিশোধন করতে ২ টাকা যুক্ত হয় লিটার প্রতি। বাকী, এলসি, পরিবহন, ভ্যাট-ট্যাক্স ইত্যাদি মিলে সর্বোচ্চ ৮ টাকা যুক্ত হতে পারে লিটার প্রতি। ডিজেলের মূল্য সর্বোচ্চ হতে পারে ৬২-৬৫ টাকা। ভর্তুকি বন্ধ করলেও ৭০ টাকায় ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল পাওয়ার কথা। এটা বর্তমান রেট। কিন্তু গত ৭ বছরে ব্যারেল প্রতি দাম ছিল মাত্র ২২-২৭ ডলার এবং ডলার রেট ছিল ৮৫ টাকা প্রায়। তাহলে অনুমান করুন জ্বালানী তেলে কী পরিমাণ হরিলুট করেছে সরকার।

সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে দুইটা বিষয়কে টার্গেট করে। প্রথমত IMF থেকে ঋণ বাগিয়ে নেওয়া, দ্বিতীয়ত জ্বালানী তেল থেকে মুনাফা করে তাদের লুট জনিত ঘাটতি কিছুটা ব্যাকআপ দেওয়া। সরকারের লুটের দায় জনগণকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

৬ আগস্ট, ২০২২

মদিনায় লুট, খুন ও ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনা!

 

মক্কা ও মদিনাবাসী শুরু থেকেই ইয়াজিদের প্রতি অনুগত ছিল না। বিভিন্ন চাপে পড়ে তারা আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু যখন হুসাইন রা.-কে ইয়াজিদের বাহিনী খুন করে তখন মদিনাবাসী ক্ষিপ্ত হয় এবং ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াত প্রত্যাহার করে। তারা আব্দুল্লাহ ইবন হানযালাকে নেতা নির্বাচন করল। তারা সকলে মসজিদে নববীর মিম্বরের কাছে জমায়েত হল।

তখন তাদের মধ্যে হতে একজন বলতে লাগলেন, আমি এ পাগড়ীকে প্রত্যাহার করলাম এ বলে সে মাথা থেকে পাগড়ীটি ফেলে দিল। অন্য একজন বলল, আমি ইয়াযীদকে প্রত্যাহার করলাম যেমন আমি আমার এ জুতা প্রত্যাহার করলাম,। এ বলে সে তার জুতা ছুঁড়ে মারলো। এভাবে একজনের পর একজন বলতে লাগল ও এরূপ করতে লাগল। ফলে সেখানে অনেক পাগড়ী ও জুতার স্তুপ হয়ে গেল। তারপর তারা তাদের মধ্যে থেকে ইয়াজিদের গভর্নরকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে একমত হল। তিনি হলেন উসমান ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু সুফিয়ান, ইয়াযীদের চাচাতো ভাই। বনূ উমাইয়ার সদস্যদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করার ব্যাপারেও তারা একমত হলো।

অবস্থা বেগতিক দেখে বনু উমাইয়ার লোকেরা মারওয়ান ইবন হাকাম-এর ঘরে একত্রিত হলো। আর মদীনাবাসীরা তাদেরকে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে রাখল। কিন্তু কিশোর আলী ইবনুল হুসাইন ওরফে জয়নুল আবেদীন এবং নবী পরিবারের নারী সদস্যরা এই আয়োজনের সাথে ছিলেন না। তারা নিজ ঘরে নিশ্চুপ ছিলেন।

মদিনার লোকদের আনুগত্য অস্বীকারের খবর ও বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরুদ্ধ হওয়ার খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছলো। তিনি মুসলিম ইবনে উকবাকে সেনাপতি বানিয়ে বললেন, “মদিনার সম্প্রদায়কে তুমি তিনবার আহবান করবে, যদি তারা বশ্যতা স্বীকার করে তাহলে তুমি তাদের থেকে আনুগত্য গ্রহণ করবে এবং তাদের থেকে বিরত থাকবে, অন্যথায় তুমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যদি তুমি তাদের উপর বিজয় লাভ করো তবে মদিনায় তিনদিন হালাল ঘোষণা করবে (যা ইচ্ছা তা করবে, হারাম কাজও হালাল বলে গণ্য হবে)। তারপর বিরত হবে। আলী ইবন হুসাইনের প্রতি নযর রাখবে, তার থেকে বিরত থাকবে এবং তার কল্যাণ কামনা করবে, তাকে মজলিসে ডেকে নিবে। মদীনার কাজ সমাপ্ত করে মক্কা অবরোধ করবে।

ইতপূর্বে ইয়াজিদ উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে আদেশ দিয়েছিলেন, সে যেন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.-কে মক্কায় অবরোধ করার জন্য সেখানে গমন করে। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তার আদেশ অমান্য করে এবং বলে আল্লাহর শপথ! আমি ইয়াজিদের ন্যয় এরূপ ফাসিক লোকের জন্য দুইটি মারাত্মক কাজ একত্রে করতে পারবো না। একটি হল রাসূল সা. এর নাতিকে হত্যা করা এবং দ্বিতীয়টি হল মহাসম্মনিত বাইতুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। তার মা মারজানা তাকে ইমাম হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের সময় বলেছিলেন, দুর্ভাগ্য তোর! অভিশপ্ত তুই! তুই কী করেছিস! তুই কীসের দায়িত্ব নিয়েছিস? হুসাইন রা.-এর শাহদাতের পর তার আত্মীয়রা তাকে তিরস্কার করলে সে কিছুটা হীনমন্যতায় পড়ে যায়।

মুসলিম ইবনে উকবা তার সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনার দিকে রওয়ানা হলো, সেনাবাহিনী যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো, মদীনাবাসীরা বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরোধে কঠোরতা অবলম্বন করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের সকলকে এখনই হত্যা করবো। যদি তোমরা আমাদেরকে এমন একটি চুক্তিনামা লিখে দাও যে, তোমরা সিরিয়ার সৈন্যদেরকে আমাদেরকে চিনিয়ে দেবে না, আমাদের সাথে যুদ্ধে তাদের সহায়তা করবে না এবং আমাদের প্রতি তাদেরকে উসকানিও দিবে না। তখন বনূ উমাইয়ার লোকেরা তাদেরকে এ ব্যাপারে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করলো।

যখন ইয়াজিদ বাহিনী মদিনায় পৌঁছল তখন বন্ উমাইয়ার লোকেরা তাদের সাথে সাক্ষাত করলো। সেনাপতি তাদের খবরাখবর সম্বন্ধে জিজ্ঞাস করলো, তখন তাদের কেউ তাকে কোন সংবাদ দিল না। আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান সেনাপতির কাছে আসলো এবং বললো, যদি আপনি তাদের উপর জয়ী হতে চান তাহলে আপনি মদিনার পূর্বদিকে হাররায় সেনাবাহিনী নিয়ে অবস্থান নিন। যখন শত্রুরা আপনার দিকে আসবে তখন সূর্যের তাপ থাকবে তাদের চোখে মুখে। এমন সময় আপনি তাদেরকে আপনার বাধ্যতা স্বীকার করতে আহবান জানাবেন। যদি তারা আপনার আহবানে সাড়া দেয় তাহলে ভাল কথা, অন্যথায় তাদেরকে হত্যা শুরু করবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন। কেননা তারা দেশের ইমাম তথা খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং তার অবাধ্য হয়েছে।

এ পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুসলিম ইবন উকবা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তিনি যেদিকে ইঙ্গিত করলেন তা তিনি পরোপুরি পালন করলেন। তিনি পূর্ব মদীনার হাররায় অবতরণ করেন এবং মদীনাবাসীদেরকে তিনদিনের অবকাশ দিলেন। মদিনাবাসী তাদেরকে অন্যায়ের পথ ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসার আহবান জানালেন। তারা অবৈধ শাসকের আনুগত্যের বিপরীতে শাহদাতকে আপন করে নেয়ার শপথ নিলেন। প্রতিদিন তারা বশ্যতা স্বীকার না করে যুদ্ধ ও মুকাবিলার কথা পুনরাবৃত্তি করলেন।

যখন তিনদিন শেষ হয়ে গেল তখন সেনাপতি তাদরকে চতুর্থ দিন অর্থাৎ ৬৩ হিজরীর জুলহাজ্জ মাসের ২৮ তারিখ বুধবার দিন বললো, হে মদীনাবাসীগণ! তিনদিন অতিবাহিত হলো, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে বলেছিলেন যে, তোমরা তার আত্মীয়স্বজন। তাই তিনি তোমাদের রক্তপাতকে খারাপ মনে করেন। তিনি আমাকে হুকুম দিয়েছেন আমি যেন তোমাদেরকে তিন দিনের সময় দেই। তিনদিন শেষ হয়ে গেল। এখন তোমরা কি করবে? তোমরা কি আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে, না সন্ধি করবে? তারা বললেন, যুদ্ধ করবো।

মুসলিম আবার বললো, যুদ্ধ করো না বরং সন্ধি করো তাহলে আমরা ঐ বিদ্রোহী ব্যক্তিকে (আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.) দমন করার জন্য সর্বশক্তি ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করতে পারব। তারা বললেন, “হে আল্লাহর দুশমন! তোমার যদি এটাই ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলে আমরা কখনোই তোমার সহযোগী হবো না। আমরা কি তোমাদেরকে ছেড়ে দিব যে, তোমরা বাইতুল্লাহ গিয়ে যথেচ্ছা আচরণ করবে? তারপর তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিল।

মদিনাবাসী বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিখা খনন করে নিলেন। তারা নিজেদের সৈন্যদেরকে চার ভাগে ভাগ করে নেয় এবং প্রতিটি ভাগের জন্য একজন আমীর নিয়োগ করে। সবচাইতে সুবিন্যস্থ ভাগের আমীর হলেন আবদুল্লাহ ইবন হানযালা। তারপর তারা প্রচণ্ড যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পরাজয়বরণ করলেন। দু'পক্ষ থেকেই বহু সর্দার ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নিহত হলেন। এই ঘটনাকে ইতিহাসে 'আল হাররা'র যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।

তারপর এক জঘন্য ঘটনার অবতারণা হলো মদিনায়। মুসলিম ইবন উকবা তার নেতা ইয়াজিদের নির্দেশমতে মদিনায় তিন দিন যাবত লুটতরাজ করার নির্দেশ দিলো। সে এ তিন দিনে মদীনার বহু সাহাবি, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের পাইকারিভাবে হত্যা করতে শুরু করলো। মদিনায় জঘন্যতম লুট, ধর্ষণ, নির্যাতন ও উৎপীড়নের অজস্র ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে হতে সাতশত জন গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাদের দাস-দাসী এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে দশ হাজার নিহত হয়েছিল। বহু সম্মানিত মুসলিম নারী ধর্ষিত হয়েছেন ইয়াজিদের বাহিনীর দ্বারা।

জালিম ইয়াজিদ তিনদিনের জন্য মদিনাকে লুটপাটের লক্ষ্যে মুসলিম ইবন উকবাকে নির্দেশনা দিয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে। যার দরুন সাহাবায়ে কিরামের একটি বিরাট দল ও তাদের সন্তানগণ নিহত হন। বহু সম্মানিত নারী ধর্ষিত হয়েছেন। সা'দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, “যদি কেউ মদীনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে তাহলে লবন যেভাবে পানিতে গলে নিঃশেষ হয়ে যায় সেও এভাবে গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।” ইমাম মুসলিমও আবু আবদুল্লাহ সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যদি কোন ব্যক্তি মদীনাবাসীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামে এমনভাবে গলাবেন যেমন সীসা আগুনে গলে যায় কিংবা লবণ যেভাবে পানিতে গলে যায়।”

কিছু অর্বাচীন ও জ্ঞানপাপীকে দেখা যায় নানানভাবে ইয়াজিদকে শাসক এমনকি আমিরুল মুমেনিন হিসেবে আখ্যায়িত করতে। যে পাইকারীভাবে খুন ও ধর্ষণ করার নির্দেশ দেয় সে মুসলিমদের নেতা হওয়া তো দূরের কথা তাকে মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করাও তো কঠিন। তার আক্রমনের পর মদিনার সমস্ত সাহাবী হয় খুন হয় নাহয় জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সাহাবাদের সাথে যার এই আচরণ সে জালিম ও ফাসিক, এটাই তার পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করুন। আমিন।

বি. দ্র. ঘটনার বর্ণনা আল্লামা ইবনে কাসীরের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া'-এর ৮ম খন্ড (৪০০-৪১৫) থেকে নেওয়া হয়েছে।

হিন্দু জনসংখ্যা কমার আসল কারণ কী?

 

বাংলাদেশে আদমশুমারি হয়ে গেল। যদিও অনেক বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। টোটাল সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকলনা মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন আদমশুমারি কিছুটা সমস্যা থাকতে পারে। এই বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। আজকে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে। আর সেটা হলো বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এই নিয়ে প্রায় সব মিডিয়া অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। কেউ কেউ ইতিহাস টেনে নিয়ে অনেক বিশ্লেষণী রিপোর্ট করেছে। এসব বিষয় এতটা গুরুত্ব না পেলেও বুয়েটের শিক্ষক এনায়েত চৌধুরীর গত বুধবারের ভিডিও বরাবরের মতোই ভাইরাল হয়। তিনি হিন্দু কমে যাচ্ছে এই নিয়ে ভিডিও তৈরি করেছেন।

তিনি তার বিশ্লেষনে কয়েকটি বিষয়কে ফাইন্ড আউট করেছেন যার দ্বারা হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
১। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে মাইগ্রেশন (মুসলিমরা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করছে)
২। এনিমি সম্পত্তি দখলের ফলে মাইগ্রেশন (আবুল বারাকাতের মতে হিন্দুদের জমি দখল করার কারণে এটা হয়)
৩। ফার্টিলিটি রেইট (এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে ছেড়ে দিয়েছেন। এনায়েত এই কারণকে গুরুত্ব দেননি)

এনায়েত চৌধুরীর ভাষ্যমতে বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বেসিক কারণ হলো ভারতে মাইগ্রেশন। কিন্তু আসলে কি তা হয়?

এদেশে হিন্দুদের অবস্থা, জীবন যাপন প্র্যাকটিসিং মুসলিমদের চাইতে অনেক ভালো। হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৮% শতাংশ হলেও সরকারি চাকুরিতে হিন্দুদের পরিমাণ প্রায় ২২%। এখান থেকে সাধারণত হিন্দুরা যায় না। যারা মাইগ্রেশন করে তারা মূলত এখানে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে এবং যাদের কালো টাকা আছে তারা ভারতে সেগুলো পাচার করে ও এক পর্যায়ে নিজেদের মাইগ্রেশন করে। এই সংখ্যাটা নিতান্তই কম। এটা ধর্তব্য নয়।

ধরে নিলাম এনায়েতের বিশ্লেষণ ঠিক। পাকিস্তানেও হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বৌদ্ধপ্রধান শ্রীলংকায়ও হিন্দুদের পার্সেন্টেজ কমে যাচ্ছে। এনায়েতের হিসাবকে সত্য হিসেবে ধরে নিলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে দলে দলে মানুষ ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। এদিকে ভারতের হিন্দুদের তো মাইগ্রেশনের ঝামেলা নেই।

এনায়েত ও বারাকাতের হিসেবে ভারতে হিন্দুদের পার্সেন্টেজ লাফিয়ে বাড়ার কথা। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে সেখানে? ভারত থেকে দাঙ্গা কিংবা এনিমি সম্পত্তি দখলের কারণে মাইগ্রেশন নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার হিন্দুরা সেখানে যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে নেপাল থেকেও কেউ কেউ ভারতে মাইগ্রেশন হচ্ছে।

এত হিন্দু চারদিক থেকে ভারতে এলেও ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমি যে ছবিটি শেয়ার করেছি সেটা ভারতের ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার তুলনামূলক চিত্র। এটি দ্য হিন্দু পত্রিকা থেকে নিয়েছি। এখানে দেখা যাচ্ছে ভারতে ১৯৫১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪%। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯%এ। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে ৫% কমে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার!

এনায়েত ও বারাকাতেরা মাইগ্রেশনে যে চিত্র দেখিয়েছে তা যদি সঠিক হতো তবে কি ভারতে হিন্দুদের জনসংখ্যা কমে যেত? অন্যদিকে খেয়াল করুন ভারতে মুসলিমদের পার্সেন্টেজ বেড়ে গেছে। ১৯৫১ সালে তা মুসলিমরা ছিল ৯.৮%। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৪.২%। প্রায় সাড়ে ৪% বেড়ে গেছে।

ভারতে মুসলিমদের সুযোগ সুবিধা কয়েকটি স্থানে কিছুটা ভালো। বাকী পুরো ভারতে মুসলিমদের যুদ্ধ করে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। ভারত থেকে কিছু মুসলিম মাইগ্রেশন হয় মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপে। কিন্তু তারপরও সেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা বাড়ছে ও হিন্দুদের জনসংখ্যা কমছে।

একপাক্ষিক ও পূর্ব ধারণা মাথায় রেখে বিশ্লেষণ করার কারণে এনায়েত চৌধুরির বিশ্লেষণের মৌলিক ত্রুটি দেখা গেছে। যদি মাইগ্রেশনই মূল সমস্যা হতো তবে ভারতে হিন্দু সংখ্যা বেড়ে যেত।

হিন্দুরা জনসংখ্যার দিক দিয়ে ১ম দেশ ভারতে, এরপর নেপালে এবং ৩য় দেশ বাংলাদেশ। অবাক করা ব্যাপার হলো এই তিন দেশেই জনসংখ্যা কমছে। ভারত ও নেপালে মাইগ্রেশন সমস্যা নেই। তবুও কেন কমছে?

এর বেসিক কারণ হলো ফার্টিলিটি রেট। যে বিষয়টা এনায়েত উল্লেখ করেও গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে গেছে। অথচ এটাই হচ্ছে বেসিক কারণ।

হিন্দুদের ফার্টিলিটি রেট বা জন্মহার কমে যাওয়ার কারণ দুইটি
১। জন্মনিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় প্রভাব নেই
২। তাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

ফার্টিলিটি রেট জলবায়ু ও অঞ্চলের ওপর বেশি নির্ভর করে। আমাদের অঞ্চলের চাইতে আফ্রিকায় ফার্টিলিটি রেট বেশি। একই এলাকার দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এর পার্থক্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুই কারণে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে।

আমাদের উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা প্ররোচনায় প্রচার করা হচ্ছে জনসংখ্যাই আমাদের সমস্যা। এজন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই প্রচারণার সাথে একমত হয় নি মুসলিমরা। কিন্তু হিন্দুদের তাতে সমস্যা ছিল না। মুসলিম সমাজের মসজিদে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে হামেশাই বক্তব্য দেওয়া হয়। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদূদী এই নিয়ে বই লিখেছেন 'ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ'।

এই বইটি উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে ও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টটা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে অল্প কয়েকদিন হচ্ছে জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু হিন্দু সমাজে এটা গোড়া থেকেই জনপ্রিয় ছিল। তারা পশ্চিমা প্রচারণায় কান দিয়েছে। তাই তাদের জন্মহার কমে গিয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো তাদের খাদ্যাভ্যাস। এই উপমহাদেশের হিন্দুরা লাল গোশত খুবই কম খায়। গরু ছাগলের গোশত কম খাওয়ায় তাদের ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে। গরু ছাগলের গোশতে (রেড মিট) প্রচুর জিংক থাকে। যা সন্তান জন্মদান ও গর্ভধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘসময় ধরে গোশত না খাওয়ায় ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে।

তাই শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব স্থানে, সব দেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায় হিন্দু সংখ্যা কমছে। এই বিষয় নিয়ে ভারতের লোকেরাও গবেষণা করেছে। তারা এই ফার্টিলিটি রেটকেই ফাইন্ড আউট করেছে কারণ হিসেবে।