২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আদম সৃষ্টির হাকিকত

 

শহীদ গোলাম আযম তখন তাবলীগ জামায়াতের আন্দোলনের সাথে জড়িত। ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতো। কিন্তু তিনি এর যুৎসই জবাব পেতেন না। এর জবাবের জন্য তিনি হন্যে হয়ে বই পুস্তক পড়তেন। তেমনি একটি বিষয় ছিল আদম আ.-এর ইতিহাস। ওয়াজ মাহফিলে ও ধর্মীয় মুরুব্বিদের কাছ থেকে পাওয়া ভুল ব্যাখ্যা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল।

১৯৫৫ সালে এমন পরিস্থিতিতে তার হাতে পড়ে মাওলানা মওদূদী রহ.-এর লেখা তাফহীমুল কুরআনের সূরা বাকারার তাফসীর। তিনি মাওলানার ব্যাখ্যা পড়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। এরপর তিনি মাওলানা মওদূদীর প্রতি আগ্রহী হন। তাঁর কিতাবাদি ও পত্রিকা পড়তে থাকেন। অল্প সময়ের তিনি ইকামাতে দ্বীনের কাজে যুক্ত হয়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

এরপর তো বহু ঘটনা পার হলো। ১৯৮৯ সালে তাঁর প্রস্তাবিত 'কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা' মেনে নিয়ে সমস্ত বিরোধীদল আন্দোলন শুরু করলো এরশাদের বিরুদ্ধে। এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হলো। ১৯৯১ সালে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে সরকারের গঠনের জন্য আরো কিছু সিট তাদের প্রয়োজন ছিল। জামায়াত একটি সুন্দর জনগণের সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়ে বিএনপিকে বিনাশর্তে সমর্থন জানালো।

কিন্তু বিএনপি সে মর্যাদা রাখতে সক্ষম হয়নি। ১৯৯২ সালে প্রথম আঘাতটা আসে জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে। তাঁর নাগরিকত্ব নেই এই মর্মে 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' একটি আন্দোলন শুরু করে অধুনা শাহবাগের আদলে। জামায়াত সরকারের অংশ হওয়ার পরও বহুস্থানে ঘাদানিক জামায়াত-শিবিরের ওপর হামলা করে। অফিস ভাংচুর করে। অন্তত তিরিশজনকে হত্যা করে। বিএনপি সরকার এর বিহিত করা তো দূরের কথা উল্টো ঘাদানিকের প্ররোচনায় অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করে ও আদালতের মুখোমুখি করে।

যাই হোক, আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। কারাগারে যাওয়ার পর শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম আবার তাঁর পুরনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি কারাগারে একটি বই লিখেন 'আদম সৃষ্টির হাকিকত' নামে। এই বইতে তিনি আদম আ.-এর সৃষ্টি এবং কারণ নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেন। বইটির ভূমিকাতে তিনি বলেন, সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার কারণেই মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম একটি আচার সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে পরিচিত হয়েছে। এর সঠিক ব্যাখ্যা ছাড়া কুরআনের বিপ্লবী দাওয়াত ও রাসূল সা.-এর সংরামী জীবনের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব।

সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুতে মূলত আদম আ.-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে তাঁর কাজ অর্থাৎ মানবজাতির কাজ উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনে মোট আটটি সূরায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আদম আ.-এর সৃষ্টির ইতিহাস ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। 'আদম সৃষ্টির হাকিকত' বইয়ের লেখক শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম বইয়ের শুরুতেই আটটি অংশের সরল অনুবাদ করেছেন। এরপর তিনি টোটাল ঘটনা ও উদ্দেশ্যের একটি সামারি টেনেছেন।

এরপর তিনি সূরা বাকারা কেন পরে নাজিল হয়েও আগে স্থান পেয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা দেন। লেখকের মতে সূরার বাকার ৪র্থ রুকুর গুরুত্বের কারনেই এমনটা হতে পারে।

এরপর তিনি সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর ভুল ব্যাখ্যা যা সমাজে চালু রয়েছে সেগুলো নিয়ে বর্ণনা ও আলোচনা করেন। এসব ব্যাখ্যা যে ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক তা আলোচনা করেন।

লেখক গোলাম আযম এরপর সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর সঠিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি এখানে ১১ টি পয়েন্টে কথা বলেন।
১. খলিফা ও খিলাফত
২. খিলাফতের দায়িত্ব কী?
৩. ফেরিশতাদের সহযোগিতা
৪. ফেরেশতাদের আশংকা
৫. তাসবিহ ও তাকদিস
৬. আদম আ.-কে জ্ঞান দান
৭. আদম আ.-কে সিজদা করার বিষয়
৮. ইবলিসের নাফরমানি থেকে শিক্ষা
৯. আদম আ.-কে কেন বেহেশতে পাঠানো হলো?
১০. আদম আ.-এর তওবা
১১. জান্নাত থেকে আদম আ.-এর বিদায়

এরপর শহীদ গোলাম আযম এই ইতিহাস বর্ণনার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। একই কাহিনী থেকে ৫ টি শিক্ষা উল্লেখ করেন ও সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

১. দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনই আমাদের বড় কর্তব্য
২. এই কর্তব্যকে উপেক্ষা করে অন্য লক্ষ্যের কাজ মূলত ইবলিসের কুমন্ত্রণা।
৩. ইবলিস ও তার প্রতিনিধিরা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।
৪. লজ্জাশীলতা ও পর্দা মানুষের স্বাভাবিক আচরণ। ইবলিস এটা নষ্ট করে দিতে চায়।
৫. মানুষের জন্য ভুল করা স্বাভাবিক, কিন্তু ভুলের পর তওবা করা আবশ্যক।

এরপর লেখক মানুষের মর্যাদার কারণ নিয়ে আলোচনা করেন। খিলাফতের দায়িত্বের কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরার মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

লেখক উল্লেখ করেন, মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর খিলাফত অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। আর এই দায়িত্বে ব্যর্থ হওয়া মানেই ইবলিসের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব করা। সমগ্র মানুষ মূলত দুইটি দলে বিভক্ত। এক. আল্লাহর খলিফা, দুই. ইবলিসের খলিফা।

বইটির শেষে তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আনেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন বাংলাদেশে কি আল্লাহর খিলাফত কায়েম আছে? বাংলাদেশ বহু মুসলিমের দেশ হলেও এদেশে আল্লাহর আইন প্রচলিত নয়। যারা এই বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে না, চিন্তা ও ফিকির করছে না তাদেরকে দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান করেন।

অনেক আলেম ওলামা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বকে দেখা যায় তারা ব্যক্তিগতভাবে খুবই ইসলামপ্রিয় ও তাকওয়াবান। কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নে অর্থাৎ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে তাদের সচেষ্ট দেখা যায় না। বরং তাদেরকে বর্তমান প্রচলিত অনৈসলামিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে দেখা যায়। তাদের কথা উল্লেখ করে লেখক বলেন আল্লাহর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন না করা মানেই শয়তানের প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করা। এই কথা লেখক আমাদের সকলকে মনে করিয়ে দেন। এই নিয়ে সতর্ক করেন। আমাদের প্রতি আহবান করেন, আমরা যেন আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্য অর্থ্যাৎ আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

#বুক_রিভিউ
বই : আদম সৃষ্টির হাকিকত
লেখক : অধ্যাপক গোলাম আযম
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ৬৬
মুদ্রিত মূল্য : ২৫
জনরা : ইডিওলজি



0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন