২৭ অক্টোবর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩১ : উসমান রা.-এর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের গভর্নরগণ

 


খুলাফায়ে রাশেদার মধ্যে উসমান রা. সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিলেন। উসমান রা.-এর সময়ে রাষ্ট্রের সীমানাও ছিল অনেক বেশি। ফলে পুরো রাষ্ট্রটিকে অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত করতে হয়েছিল। প্রতিটি প্রদেশ একজন ওয়ালী বা গভর্নরের অধীনে শাসিত হত। কোন কোন সময় এক প্রদেশ ভেঙ্গে একাধিক প্রদেশ করা হতো, আবার কখনো বা কোন প্রদেশের মর্যাদা বিলুপ্ত করে সেটিকে অন্য প্রদেশের সাথে একীভূত করা হত। 

প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার প্রধানত তিনটি অঙ্গ ছিল: 
১) বিচার বিভাগ, যা সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। খালীফা নিজেই প্রদেশসমূহের কাজী বা বিচারক নিয়োগ করতেন। কখনো বা গভর্ণর প্রাদেশিক বিচারক নিয়োগ দিতেন। মাঝে মাঝে গভর্ণরকে বিচারকের দায়িত্বও পালন করতে হতো। 
২) প্রশাসন বিভাগ, রাজ্য পরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্ব ছিল এই বিভাগের ওপর। ওয়ালী বা গভর্ণর হলেন প্রদেশ প্রধান, তিনি সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ওয়ালীর সেনাপতিত্বে প্রতি প্রদেশে পৃথক সেনাবাহিনী ছিল। তারা সংশ্লিষ্ট প্রদেশের সন্নিহিত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করতেন। প্রাদেশিক রাজধানীর কেন্দ্রীয় মসজিদে সালাতের ইমামতি করা ছিল গভর্ণরের অন্যতম দায়িত্ব। 
৩) বাইতুল মাল বা রাজস্ব বিভাগ, প্রাদেশিক গভর্ণর সাধারণত রাজস্ব বিভাগ বা বাইতুল মালের তত্ত্বাবধান করতেন। তবে কখনো কখনো খালীফাগণ দ্বৈত ব্যবস্থা চালু রাখতেন। 

নিম্নে প্রদেশ ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিবরণ দেওয়া হলো :

মক্কা :
দ্বিতীয় খলীফা উমার রা.-এর শাহাদাতের সময় মক্কার গভর্ণর ছিলেন খালিদ ইবনুল আস রা.। তৃতীয় খালীফা উসমান রা. তাকে কিছুদিন মাক্কার গভর্ণর পদে বহাল রাখেন। তারপর তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়। অপসারণের কোনো কারণ জানা যায় না। খালিদ ইবনুল আসের কীর্তি বা অবদান সম্পর্কেও বিশেষ কিছু জানা যায় না। খালিদকে অপসারণের পর আলী ইবনু রাবী'আহকে মক্কার গভর্ণর পদে নিয়োগ করা হয়। তবে তার দায়িত্বপালনও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর আরো কয়েকজন মক্কার গভর্নর হন। তৃতীয় খলীফার শাসনামলের শেষদিকে বিভিন্ন প্রদেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখা দিলেও মাক্কায় এর কোন প্রভাব পড়েনি। প্রাচীন এই জনপদে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল।

মদিনা :  
মাদীনাতুল মুনাওয়ারা ছিল খিলাফাতের রাজধানী। খলীফার বাসভবন ও খিলাফাতের সদর দপ্তর ছিল এই শহরে। শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ এই শহরে অবস্থান করতেন। এখানে আলাদা কোনো প্রশাসক ছিলেন না। খলিফা নিজেই মদিনার তত্ত্বাবধান করতেন। হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় গমন করলে উসমান রা. বিশিষ্ট কোন সাহাবীর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করতেন। বেশিরভাগ সময় যায়িদ ইবনু সাবিত রা.-এর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হতো।

আল-বাহরাইন : 
‘উমার রা.-এর শাহাদাতের সময় বাহরাইনের গভর্ণর ছিলেন উসমান ইবনু আবিল ‘আস আস-সাকাফী। উসমান রা.-এর খিলাফাতের প্রথম কয়েক বছরও তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন। হিজরী সাতাশ সনে তিনি বাহরাইন হতে বিশাল এক বাহিনী নিয়ে বসরা বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণ করেন। বসরা ও বাহরাইনের এই সংহতি পরবর্তীতে আরো বৃদ্ধি পায়, এক পর্যায়ে বাহরাইনের স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা বিলুপ্ত করা হয় এবং এটি বসরা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চলে পরিণত হয়। পরবর্তীতে বসরার গভর্ণর ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমিরকে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিয়োগ দিতে দেখা যায়। উসমান রা.-এর শাসনামলে যাঁরা বাহরাইন শাসন করেছেন তাদের মধ্যে ছিলেন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ও আবদুল্লাহ ইবনু সাওয়ার আল-“আবদী।

আল-ইয়ামান ও হাদরামাউত:
উমার রা.-এর শাহাদাতের সময় ইয়ামানের গভর্ণর ছিলেন ইয়ালা ইবনু মুনইয়াহ। খালীফার নির্দেশ পেয়ে তিনি মাদীনার পথে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে তিনি তৃতীয় খালীফা উসমান রা.-এর পত্র পান, যাতে ‘উমার রা.-এর শাহাদাত ও “উসমান রা.-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সংবাদ ছিল। ঐ পত্রবলেই ইয়ালাকে সান'আ শহরের শাসক নিয়োগ করা হয়। তিনি উসমান রা.-এর শাহাদাত পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে ইয়ামানের আল-জুদ শহরের শাসক ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু রাবী'আহ।

ইয়ামানের একদল ইয়াহুদী উসমান রা.-এর আমলের শেষদিকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছে। ঐ ষড়যন্ত্রকারী ইয়াহুদীদের মূল হোতা ছিল আবদুল্লাহ ইবনু সাবা। উসমান রা.-এর শাহাদাতের পর ইয়ালা ইবনু মুনইয়াহ ও আবদুল্লাহ ইবনু রাবীআহসহ ইয়ামানের কয়েকজন শাসক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভূমিকা পালনের জন্য নিজেদের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে হিজাযে চলে আসেন।

সিরিয়া (শাম): খালীফা হিসেবে উসমান রা.-এর অভিষেকের সময় সিরিয়ার বড় অংশের (দামেশক ও জর্দান) শাসক ছিলেন মুআরিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান রা.। সেসময় সিরিয়ার কিছু অংশ তার কর্তৃত্বের বাইরে ছিল। তৃতীয় খালীফা উসমান রা.- তাঁকে স্বপদে বহাল রাখেন। কয়েক বছর যেতে না যেতেই মু'আবিয়া রা. সমগ্র সিরিয়ার শাসকে পরিণত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘটনাবলি তাঁর এই অর্জনের পথে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় খালীফা উমার রা.-এর আমলে মু'আবিয়া প্রথমে শুধু দামেশকের শাসক ছিলেন। তাঁর ভাই ইয়াযীদ ছিলেন জর্দানের শাসক; তিনি মারা গেলে "উমার রা. জর্দান অঞ্চল মু'আবিয়া রা.-এর অধীনে ন্যস্ত করেন। 

হিমস ও কিন্নাসরিন অঞ্চলের শাসক ছিলেন উমাইর ইবনু সা'দ আল-আনসারী; মারাত্মক অসুস্থ ও শয্যাশায়ী হয়ে তিনি খালীফা উসমান রা.-এর কাছে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি চান। উসমান রা. তার আবেদন মঞ্জুর করেন এবং হিমস ও কিন্নাসরিন মু'আবিয়ার অধীনে ন্যস্ত করেন। আলকামাহ ইবনু মিহরায় ছিলেন ফিলিস্তিনের শাসনকর্তা। তাঁর মৃত্যু হলে খালীফা তদস্থলে নতুন কোন শাসক নিয়োগ না দিয়ে ফিলিস্তিনও মু'আবিয়ার অধীনে ন্যস্ত করেন। এভাবে দু'বছরের মাঝে মু'আবিয়া সমগ্র সিরিয়ার (দামেশক, হিমস, কিন্নাসরিন, ফিলিস্তিন ও জর্দান) একমাত্র শাসকে পরিণত হন। উসমান রা.-এর শাহাদাত পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তৃতীয় খালীফার আমলে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় প্রদেশের সর্বাধিক প্রতাপশালী গভর্ণর।

মিশর:
উমার রা.-এর ‘আমলে মিসরের গভর্ণর ছিলেন আমর ইবনুল আস রা.। উসমান রা.-ও কিছুদিন তাকে স্বপদে বহাল রাখেন। কোন কোন অঞ্চলে 'আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ ইবনু আবি সারাহ গভর্ণর আমরকে রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করতেন। 'আবদুল্লাহ ছিলেন 'আমর ইবনুল আসের দীর্ঘ অভিযানের সাথী। 'আমর ফিলিস্তিন হতে শুরু করে মিসর পর্যন্ত যে দীর্ঘ বিজয়াভিযান পরিচালনা করেন তাতে ‘আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ ছিলেন তার যোগ্য সহযোদ্ধা। উমার রা. আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে মিশরের কিছু অংশের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। এই ব্যবস্থা উসমান রা.-এর আমলের শুরুর দিকেও বহাল ছিলো। কিছুদিন পর মিসরের কতিপয় অধিবাসী শাসক হিসেবে আমরের কঠোরতার ব্যাপারে উসমান রা.-এর কাছে অভিযোগ করে। 

তাছাড়া আমর রা.-এর আমলে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দেয়। তাই উসমান রা. গভর্ণর আমরের কর্তৃত্ব খর্ব করে তাকে শুধু সালাতে ইমামতির দায়িত্ব দেন এবং আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে প্রতিরক্ষা ও রাজস্ব বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। শীঘ্রই এই নিয়োগের সুফল পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ দায়িত্ব গ্রহণের পর মিসরের রাজস্ব আয় বেড়ে যায়। তবে কিছুদিনের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে আমর ও ‘আবদুল্লাহর মাঝে মনোমালিন্য হয়। তখন আমর ইবনুল আস রা. মাদীনায় এসে খালীফাকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে অপসারণের অনুরোধ করেন। উসমান রা. এই বলে 'আমর রা.-এর অনুরোধ উপেক্ষা করেন যে, আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে পূর্ববর্তী খালীফা উমার রা. নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া এমন কোন নৈতিক পদস্খলনের ঘটনা ঘটেনি যে, তাকে অপসারণ করতে হবে। আমর আবারো অনুরোধ করলেন, খালীফাও যথারীতি প্রত্যাখ্যান করলেন। 'আমর তার দাবিতে অটল, খালীফাও তার সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত উসমান রা. মনে করলেন ‘আমরকে সরিয়ে ‘আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে মিসরের গভর্ণর পদে নিয়োগ করাই যথার্থ। কার্যত তিনি তাই করলেন; মিসরের গভর্ণর পদে পদচ্যুত ‘আমর ইবনুল 'আসের স্থলাভিষিক্ত হলেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ ইবনু আবি সারহ।।

ইতোমধ্যে মিসরে বিরাট দুর্যোগ সৃষ্টি হয়ে গেল। রোমানরা আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে ব্যাপকহারে মুসলিম নিধন করেছে। রোমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য 'আমর ইবনুল 'আসের চেয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কেউ ছিল না। তাই খালীফা 'আমরকে পুনরায় মিসরে প্রেরণ করলেন, তবে এবার গভর্ণর হিসেবে নয় বরং সেনাপতি হিসেবে। ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা সুরক্ষিত করার স্বার্থে আমর এই গুরুদায়িত্ব পালন করলেন এবং রোমান বাহিনীকে পরাজিত করে আলেকজান্দ্রিয়া পুনর্দখল করলেন। যুদ্ধশেষে উসমান রা. মিসরে দ্বৈত-কর্তৃত্ব ব্যবস্থা চালু করতে মনস্থির করেন। তিনি আমর ইবনুল আসকে সেনাপতি ও আবদুল্লাহ ইবনু সা'দকে রাজস্ব বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমর আংশিক কর্তৃত্ব গ্রহণে রাজি হননি। ফলে আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ মিসরের পূর্ণ গভর্ণর হিসেবে বহাল থাকেন।

বসরা : 
দ্বিতীয় খলীফা উমার রা.-এর আমলেই বসরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। আরবের বিভিন্ন প্রান্ত হতে অনেক গোত্রের লোক বসরায় হিজরত করে। বসরায় ছিল বিশাল সেনাবাহিনী, যার সদস্যরা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাচ্যমুখী সম্প্রসারণের অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। বিভিন্ন বিজয়াভিযানে ধৃত বিপুল সংখ্যক বন্দীর আবাসস্থলও ছিল বসরা। ফলে সত্যিকার অর্থে বসরা একটি বহুজাতিক আন্তর্জাতিক নগরীতে পরিণত হয়েছিল। 

বসরার গুরুত্ব উপলব্ধি করে উমার রা. আবু মূসা আল-আশ'আরী রা.-কে বসরার গভর্ণর নিয়োগ করেছিলেন এবং পরবর্তী খালীফাকে ওসিয়ত করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বসরার গভর্ণরকে যেন কমপক্ষে চার বছর স্বপদে বহাল রাখা হয়। গভর্ণর হিসেবে আবু মূসা আল-আশ'আরী রা. বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। উমার রা.-এর আমলে তিনি খিলাফাতের প্রাচ্যমুখী সম্প্রসারণে বিপুল অবদান রাখেন। তিনি পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন এবং বিজিত অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। বসরার অবকাঠামোগত উন্নয়নেও আবু মূসার অবদান রয়েছে। নগরবাসীর সুপেয় পানির প্রয়োজন মেটাতে তিনি নালা কেটে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। তবে এই কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি অপসারিত হন। উসমান (রা.)-এর অধীনে ছয় বছর কাজ করার পর তাকে অপসারণ করা হয়। হিজরী উনত্রিশ সনে বসরার গভর্ণরের পদ হতে আবু মূসা আল-আশ'আরী রা.-কে প্রত্যাহার করে তদস্থলে ‘আবদুল্লাহ ইবনু 'আমির ইবনি কুরাইযকে নিয়োগ করা হয়। আবু মূসা আল-আশ'আরীর অপসারণের কারণ সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো তার একটি সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের বিরাগভাজন হন। 

কুফা : 
উমার রা.-এর শাহদাতের সময় কুফার গভর্নর ছিলেন মুগিরা বিন শুবা রা.। তিনি তখন মদিনায় ছিলেন। উমার রা. অসিয়ত করেন কুফায় যেন সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.-কে গভর্নর করা হয়। সা'দ ছিলেন কুফা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা। অসিয়ত অনুসারে উসমান রা. তাঁকে গভর্নর নিয়োগ করলেন। তবে তিনি সেখানে দ্বৈত-শাসন চালু করলেন। সা'দ রা.-কে সেনাবাহিনী প্রধান ও ইমামতির দায়িত্ব দিলেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে দিলেন বাইতুল মাল বা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব।  

কুফায় গভর্ণর সা'দ রা.-এর কার্যকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজস্ব প্রধান আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.-এর সাথে মতবিরোধের প্রেক্ষিতে মাত্র দেড় বছর পর সা'দ রা. অপসারিত হন। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গভর্ণর সা'দ রা. বাইতুল মাল হতে কিছু অর্থ কর্জ করেছিলেন। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তিনি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন। ইবনু মাসউদ রা. তাঁর কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। এই সময় দু'জনের মাঝে তর্ক হয়, যা উপস্থিত জনতা প্রত্যক্ষ করে। বিষয়টি খলীফার কাছে উপস্থাপিত হলে তিনি সা'দ রা.-কে অপসারণ করেন এবং ইবনু মাসউদ রা.-কে স্বপদে বহাল রাখেন। সা'দ রা.-কে অপসারণের পর আল-ওয়ালীদ ইবনু উকবা ইবনি আবি মু'আইতকে কুফার গভর্ণর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আবু বাকর রা.-এর আমলে বাহিনী প্রধান হিসেবে জর্দানে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। উমার রা. তাঁকে “আরব আল-জাযীরায় সরকারী কাজে নিযুক্ত করেছিলেন।

আল ওয়ালিদের বিরুদ্ধে মদ্যপানের অভিযোগ আসলে তাকে অপসারণ করে সাঈদ ইবনুল আস রা.-কে কুফার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। কুফাবাসী বার বার শাসককদের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে লাগলো। তারা এবার সাঈদ অবনুল আসের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে আবু মুসা আল-আশ'আরী রা.-কে নিয়োগ দেয়ার জন্য দাবী করলো খলিফার কাছে। খলিফা উসমান রা. তাদের এই দাবিও পূরণ করেন। কুফায় আবু মুসা আল-আশ'আরী রা.-কে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।  

আর্মেনিয়া:
উসমান রা.-এর আমলে বিজিত অঞ্চলগুলোর অন্যতম হল আর্মেনিয়া। খলীফার নির্দেশে সিরিয়ার গভর্ণর মু'আবিয়া সেনাপতি হাবীব ইবনু মাসলামা আল ফিহরীর নেতৃত্বে আট হাজার সৈন্যের একটি দল আর্মেনিয়ায় প্রেরণ করেন। হাবীব আর্মেনিয়ার অনেকগুলো অঞ্চল জয় করেন। তারপর রোমানদেরকে আর্মেনিয়াবাসীর সমর্থনে এগিয়ে আসতে দেখে খলীফার কাছে অতিরিক্ত ফৌজ চাইলেন। কুফা থেকে সালমান ইবনু রাবী'আহ-এর নেতৃত্বে ৬ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী আর্মেনিয়ায় পৌঁছল। কুফা ও সিরিয়া ব্রিগেডের যৌথবাহিনী খাযার রাজ্যের অনেকাংশ জয় করলেন। পরবর্তীতে খাযার রাজ তিন লক্ষ সৈনিকের এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলে দশ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী সালমান ইবনু রাবী'আহ-এর নেতৃত্বে মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধে সালমান শহীদ হন এবং মুসলিম বাহিনী চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়।

কিছুদিন পর উসমান রা. সেনাপতি হাবীবকে আবার আর্মেনিয়ায় প্রেরণ করেন; তিনি কিছু এলাকা জয় করেন এবং স্থানীয়দের সাথে অনেকগুলো চুক্তি করেন। আজারবাইজানের শাসক ছিলেন হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান। উসমান রা. তাকে আর্মেনিয়ারও শাসক নিযুক্ত করেন। তিনি খাযার অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে কিছু এলাকা জয় করেন। এক বছর পর হুযাইফাকে প্রত্যাহার করে আল-মুগীরা ইবনু শু'বাকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের গভর্ণর নিযুক্ত করা হয়। উসমান রা.-এর শাহাদাতের সময় আল-মুগীরা স্বপদে বহাল ছিলেন। 

এছাড়া তায়েফের গভর্নর ছিলেন আল কাসিম ইবনু রাবিআ, কারকাসিয়ায় জারির ইবনু আব্দুল্লাহ, হালাওয়ানে উতবা ইবনু নাহাস, হামাজানে আন নাসীর, ইস্ফাহানে আস সাইব ইবনুল আকরা এবং মাসাবযানে ঘাবিশ সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। 


২২ অক্টোবর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩০ : নতুন শাসকের প্রতি উমার রা.-এর নসিহা

উমার রা. তাঁর মৃত্যুর আগে নতুন খলিফার প্রতি একটি নসীহতমূলক বক্তব্য দিয়ে যান। যাতে করে নতুনভাবে নির্বাচিত খলিফার পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ হয় ও তিনি একটি গাইড লাইন পান। এই বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে নতুন খলিফার নিকট পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, 

“আমি আপনাকে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি, যার কোনো শরিক নেই। প্রথমদিকের হিজরতকারীদের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখবেন, তাদের অগ্রগামিতার কথা মনে রাখবেন। আনসারদের সাথে উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি; তাদের মধ্যে যারা ভালো কাজ করবে তাদের প্রতি সমর্থন দেবেন, কেউ কোনো ভুল করলে ক্ষমা করে দেবেন। 

সীমান্তবর্তী শহরগুলোর বাসিন্দাদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ দিচ্ছি; কেননা তারাই শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের ঢালস্বরূপ, সম্পদের উৎস। উদ্বৃত্ত অংশ ছাড়া তাদের সম্পদ থেকে কিছু নেবেন না। মরুভূমির লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন, কেননা তারাই আরবের শেকড় এবং ইসলামের প্রাণ। তাদের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে যা আদায় করবেন তা আবার তাদেরই গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেবেন।

অমুসলিম জিম্মি নাগরিকদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি, প্রয়োজনে যুদ্ধ করে হলেও যেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। তাদের ওপর আরোপিত জিযিয়া যদি তারা আদায় করে দেয়, অনুগত থাকে, তবে তাদের ওপর যেন সাধ্যাতীত বোঝা চাপানো না হয়।

ওসিয়ত করছি আল্লাহকে ভয় করার; তাঁর (হকের) ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন; তাহলে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারবেন। মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার এবং আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে ভয় না করার উপদেশ দিচ্ছি। 

আমি আরও উপদেশ দিচ্ছি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন, জনসাধারণের দেখাশোনা ও তাদেরকে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করবেন। কখনোই গরিবদের ওপর ধনীদের প্রাধান্য দেবেন না। আল্লাহর ইচ্ছায় এটা আপনার অন্তরের সুস্থতা বজায় রাখবে, গুনাহের বোঝা হালকা করবে; শেষ বিচারের দিন আপনার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে; যেদিন তিনিই বিচারক হবেন; যিনি আপনার গোপন সবকিছু জানেন, যিনি আপনার ও আপনার অন্তরের মাঝে পর্দা হয়ে থাকেন।

কাছের হোক কিংবা দূরের—আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি সকলের ক্ষেত্রেই আল্লাহর বিধান ও তাঁর সীমারেখার ব্যাপারে কঠোর থাকার। কাউকে তার অন্যায়ের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো নম্রতা দেখাবেন না। সকলকে সমান চোখে দেখবেন, অধিকার আদায়ের ব্যাপারে দ্বিধা করবেন না; আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবেন না। আল্লাহ যে সম্পদ দিয়েছেন তা বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাতিত্ব করবেন না, তাহলে অন্যায় অবিচারে লিপ্ত হয়ে পড়বেন। আর পরিণতিতে আল্লাহ যে প্রশস্ততা আপনার জন্য বরাদ্দ করেছিলেন তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন।

আপনার অবস্থান হলো দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে। যদি এ পৃথিবীতে আপনার দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করেন, কোনো অবিচার না করেন, তবে আখিরাতে শান্তি পাবেন। আর যদি কুপ্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেন তবে আল্লাহর শাস্তি অবধারিত। আমি নাসীহাত করছি, আপনি নিজে কিংবা আপনাদের কেউ যেন যিম্মিদের কোনো ক্ষতি না করে। এবং এর বিনিময়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতই আশা করবেন।

আমি আপনাকে সেই নাসীহাতই করেছি যা আমি আমার নিজেকে বা আমার সন্তানকে করতাম। এগুলো মেনে চললে প্রভূত কল্যাণ লাভ করবেন। আর যদি এগুলোকে কোনো গুরুত্ব না দেন বা আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক কাজ না করেন, তবে সেটা হবে এক চরম ব্যর্থতা ও নিষ্ঠাহীনতার জ্বলন্ত প্রমাণ। এটা হবে প্রবৃত্তির অনুসরণ। 

ইবলিস হলো সকল পাপের উৎস, সে মানুষকে পাপের দিকে ডাকে, সব সময় মানুষকে জাহান্নামেই নিতে চায়। পূর্ববর্তীদের অনেককে সে পথভ্রষ্ট করে জাহান্নামে নিয়ে গিয়েছে। কতই-না নিকৃষ্ট ঠিকানা সে জাহান্নাম। আল্লাহর শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে নেওয়া কতই-না নিকৃষ্ট এক কাজ! যে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ডাকে। সত্যের সাথে থাকুন, সব সময় সত্যকে মানার চেষ্টা করুন, নিজের ভুলত্রুটি নিয়ে সতর্ক পর্যালোচনা করুন। 

আল্লাহর শপথ করে অনুরোধ করছি—মুসলিমদের প্রতি অনুগ্রহশীল থাকবেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করবেন, যুবকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, জ্ঞানীদের সম্মান করবেন। তাদের কোনো ক্ষতি করবেন না, অপমান করবেন না। সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখবেন না, এটা মানুষের মধ্যে ক্রোধ উসকে দেবে। যথাসময়ে বেতন-ভাতা দিয়ে দেবেন; কাউকে তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করবেন না, তাহলে তারা দরিদ্র হয়ে পড়বে। দীর্ঘ সময়ের জন্য কাউকে অভিযানে নিয়োজিত রাখবেন না, তাহলে শেষ পর্যন্ত তারা সন্তানহীন থেকে যাবে। 

ধন-সম্পদ যেন শুধু ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। দুর্বল জনসাধারণের জন্য সরাসরি আপনার কাছে আসার দরজা বন্ধ করবেন না, তাহলে ক্ষমতাশালীরা দুর্বলদেরকে শেষ করে ফেলবে। আপনার প্রতি এগুলো আমার উপদেশ, আর আপনার ব্যাপারে আল্লাহকেই আমি সাক্ষী রাখলাম। আপনার প্রতি আমার পক্ষ থেকে সালাম।

একনজরে উপদেশগুলোর সামারি 

১. সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভয় করো।

২. সকলের ওপর আল্লাহর দন্ডবিধি প্রয়োগ করবে। 

৩. ইসলামের ওপর অবিচল থাকবে।  

৪. সর্বক্ষেত্রে ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে 

৫. ইসলামের অগ্রণী ব্যক্তিদের যোগ্য সম্মান করবেন 

৬. সেনাবাহিনীর প্রতি যথাযথ নজর রাখবে। তাদের সুবিধা ও ছুটির দিকে খেয়াল রাখবে 

৭. সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও জনগণের ভাতা যথাসময়ে পরিশোধ করবে। 

৮. জিম্মীদের অধিকারের ব্যাপারে খেয়াল রাখবে 

৯. উদ্বৃত্ত সম্পদের বাইরে কোনো সম্পদের ওপর যাকাত আরোপ করা যাবে না। জনগণকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলা যাবে না। 

১০. অধীনস্থ ও সকল জনগণের সাথে ভালো আচরণ করবে।

১৯ অক্টোবর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-২৯ : উমার রা.-এর নেতা নির্বাচন পদ্ধতি

 

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি নিয়ে উমার রা. চিন্তিত ছিলেন। বিশেষভাবে মুহাম্মদ সা.-এর ইন্তেকালের পর নেতৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট ঝামেলা ওনাকে কষ্ট দিয়েছে। তাই তিনি ইসলামের মূলনীতির মধ্যে থেকে একটি নেতা নির্বাচন পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছেন। যাতে মুসলিমরা বিনা ঝামেলায় তাদের নেতা নির্বাচন করে নিতে পারেন। এতে তাঁর ঈমানের গভীরতা, মুসলিম জাতির কল্যাণ কামনায় তার আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থপরতারই প্রমাণ মেলে। মুমূর্ষ অবস্থায়, যখন তাঁর খাদ্যনালী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তখন তিনি পরবর্তী নেতা নির্বাচন নিয়ে পেরেশানীতে ছিলেন।

ইসলামিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে তার বাস্তব ও স্বচ্ছ ধারণারই প্রতিফলন তাঁর এই পদ্ধতিতে। আল্লাহর রাসূলের মৃত্যুর পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব কে দেবেন তা রাসূল সা. স্পষ্ট করে মৃত্যুর পূর্বে জানিয়ে যাননি। তবে তিনি ইশারা করে গেছেন। আল্লাহর রাসুল সা.-এর জীবনের শেষভাগে কোন কোন সাহাবী মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করেন। তার পর কে নেতা হবেন এটাই ছিল তাদের জিজ্ঞাসা। জবাবে আল্লাৱহর রাসূল সা. বলেন,

তোমরা যদি আবু বকরকে আমীর বানাও তাকে পাবে আমানতদার, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ এবং আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট। তোমরা যদি উমারকে আমীর বানাও তাকে পাবে শক্তিধর, আমানতদার এবং আল্লাহর ব্যাপারে সে কোন নিন্দুকের নিন্দায় পরোয়া করবে না। আর যদি আলীকে আমীর বানাও- আমার মনে হয় না তোমরা তা করবে- তাহলে তাকে পাবে পথ প্রদর্শনকারী ও পথ প্রাপ্ত ব্যক্তি। সে তোমাদেরকে সঠিক পথ চালাবে।” মুসনাদে আহমাদ
এখান থেকে আল্লাহর রাসূল সা. কিছু ব্যক্তিকে সাজেশন এটাই নির্দেশ করেছেন যে, মুসলিমরা নিজেরাই তাদের নেতা বানিয়ে নেবে বা নির্বাচন করে নেবে। এটা তাদের দায়িত্ব। নেতা নির্বাচনে এটাই মূলনীতি যে, মুসলিমরা নিজেরাই তাদের মধ্যেকার যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচিত করবে।

নেতা নির্বাচনে নেতার যোগ্যতা কী হবে?
হযরত আবু মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। (মুসলিম)

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তিন ব্যক্তি হবে, তখন যেন তাদের মধ্য হতে একজন নেতৃত্ব দেয় এবং নেতৃত্বের অধিকার তার, যে কুরআন অধিক ভাল পড়ে। (মুসলিম)

এরকম যতগুলো হাদীস এসেছে তা সবই এই হাদীসদ্বয়ের অনুরূপ।

হাদীসটিতে রাসূল সা. নেতা হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ বা যোগ্যতাগুলো যে ক্রম অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
ক. শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
খ. সুন্নাহ তথা হাদীসের জ্ঞান থাকা,
গ. হিজরত করা এবং
ঘ. বেশি বয়স/ প্রাজ্ঞতা/ অভিজ্ঞতা

অনেক স্কলার হিজরতের ব্যাখায় বলেছেন ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যারা গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মদীনার প্রাথমিক সময়ে হিজরত ছিল সবচেয়ে বড় আমল যা করতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। হিজরত করেছেন তারা যারা দ্বীন কায়েমের জন্য তাদের সকল সহায় সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন বিসর্জন দিয়েছেন। এখনো আমাদের দেশে যারা দ্বীন কায়েমের পথে নিয়োজিত আছেন, শ্রম দিচ্ছেন, ত্যাগ স্বীকার করছেন তারা নেতা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য। যাই হোক এগুলো হল নেতার গুণাগুণ।

নেতা নির্বাচনে নেতার অযোগ্যতা কী হবে? অথবা কোন কারণে নেতা তার যোগ্যতা হারাবে?
ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না। যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ)

আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, ‘হে আবদুর রহমান ইবনে সামুরা! তুমি নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না। কেননা চাওয়ার পর যদি তোমাকে দেওয়া হয়, তবে তার দায়-দায়িত্ব তোমার ওপরই বর্তাবে। আর যদি চাওয়া ছাড়া তোমাকে দেওয়া হয়, তবে এ ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করা হবে। (বুখারি)

আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার গোত্রের দুই ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে এলাম। সে দুজনের একজন বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে আমির নিযুক্ত করুন। অন্যজনও অনুরূপ কথা বলল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যারা নেতৃত্ব চায় এবং এর লোভ করে, আমরা তাদের এ পদে নিয়োগ করি না।’ (বুখারি)

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট কোন ব্যক্তির নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকার পরও দুই কারণে নেতৃত্বের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন
১. অধিকাংশ মুসলিমদের ভোট বা সমর্থন না থাকলে তিনি ইমামতি তথা নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারান।
২. তিনি নেতৃত্বের প্রত্যাশী হলে নেতৃত্বের যোগ্যতা হারান

আবু বাকর রা. কী করেছেন?
আবু বাকর রা. তাঁর মৃত্যুর সময় শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সাথে আলোচনা করে ‘উমারকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত করেন। যখন আবু বাকর রা. ‘উমারকে নিযুক্ত করেছিলেন, তখন সাহাবারা জানতেন, আবু বাকরের মৃত্যুর পর সবচেয়ে শক্তিশালী ও দায়িত্ব পালনের যোগ্য উমারই ছিলেন। সুতরাং আবু বাকর সিনিয়র সাহাবিদের সাথে আলোচনা করে ‘উমারকেই খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। এতে কেউ অমত করেনি। সবার মাঝে ঐকমত্য ছিল এবং সবাই উমারের কাছে অকুণ্ঠচিত্তে আনুগত্যের বাইআত দিয়েছিল।

উমার রা.-এর পদ্ধতি
উমার রা. ভেবেছেন সব সময় নেতৃত্বের জন্য সর্বগ্রহণযোগ্য লোক হয়তো পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে কী করা যাবে? তাই উমার রা. পরিস্থিতিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেন। খলীফা নিযুক্ত করার জন্য উমার রা. যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল প্রখ্যাত কয়েকজন সাহাবির সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন। তিনি রাসূলের ছয়জন সাহাবির সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। তারা প্রত্যেকে ছিলেন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবি। রাসূল সা. আমৃত্যু তাদের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলির অধিকারী হলেও তারা সবাই ছিলেন খলীফা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য। কীভাবে খলীফা নির্বাচিত হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সময়কাল কতটুকু হবে, খলীফা হওয়া জন্য কতজনের সমর্থন লাগবে সবকিছু ‘উমার নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

এছাড়াও তিনি আবার কয়েকজন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা পরিষদের পর্যবেক্ষক, পাহারাদার ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী হিসেবে নিযুক্ত করে দিয়ে যান। তারা সভার কার্যবিধি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং সমন্বিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণকারীদের শায়েস্তা করবেন। কোনো বিশৃঙ্খলা যেন না হয়, সেজন্য তিনি এ নিয়মও করেছিলেন যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সেই সভায় অন্য কেউ প্রবেশ করবে না, ভেতরের আলোচনা বাইরের কেউ শুনতে পারবে না।

উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ছয়। তারা হলেন, ‘আলি ইবনু আবু তালিব, উসমান ইবনু আফফান, ‘আবদুর-রাহমান ইবনু আউফ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, যুবাইর ইবনুল-আওয়াম এবং তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ। এরা সবাই ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত। সাঈদ ইবনু যায়েদ ইবনু নুফাইল জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবির একজন হওয়া সত্ত্বেও তাকে অন্তর্ভুক্ত না করেননি উমার রা.। কারণ তিনি ছিলেন উমারের নিজ গোত্র বানু আদির লোক।

উমার উপদেষ্টা কমিটিকে নির্দেশ দেন, তাদের যেকোনো একজনের বাড়িতে তারা একত্রিত হবেন এবং পরবর্তী খলীফা নিযুক্তির বিষয়ে পরামর্শ করবেন। তাদেরকে তিনদিনের সময় বেঁধে দেন। উমার রা. সর্বোচ্চ তিনদিনের সময় নির্ধারণ করে দেন। বস্তুত নির্বাচনের জন্য এটা ছিল যথেষ্ট। যদি এর চেয়ে বেশি সময় লেগে যায়, তাহলে বোঝা যাবে তাদের ভেতর চরম দ্বন্দ্ব চলছে। এজন্য উমার বলেন, “চতুর্থ দিন আসার আগেই তোমরা তোমাদের মধ্যের একজনকে নেতা নির্বাচিত করবে। আর এই তিন দিন রাষ্ট্রের অন্তর্তীকালীন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করবেন ও সালাতের ইমামতি করবেন সুহাইব আর রুমি রা.। মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ এবং আবু তালহা আনসারি এ সভার কার্যবিধি পর্যবেক্ষণ করবেন। তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন কিনা এবং কেউ বাড়াবাড়ি করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করবেন।

আমিরুল মু'মিনিন উমার রা. ভারপ্রাপ্ত শাসক সুহাইব রা.-কে বললেন, “তিন দিন তাদের জামাআতে তুমি ইমামতি করবে, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের এক বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করবে। তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর যদি কেউ যদি বিশৃঙ্খলা করে তবে তার শাস্তির ব্যবস্থা করবে। উমার রা. আরও বলেন, ৬ জনের মধ্যে অধিকাংশের রায় হবে চূড়ান্ত। যদি উভয়পক্ষে ৩ জন করে মত দেয় তাহলে অতিরিক্ত হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রায় নেবে। তাতে একদল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে। যদি আব্দুল্লাহর রায় পছন্দ না হয়, তবে আব্দুর রহমান ইবনে যেই রায়ের পক্ষে থাকবেন তা চূড়ান্ত হবে। এরপর আবদুর-রাহমান ইবনু আউফকে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “কতই-না জ্ঞানী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ তিনি। তিনি হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত। তার কথা তোমরা শুনবে। সুহাইব রা.-কে নির্দেশ দিয়ে একদল সৈনিককে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে নিযুক্ত করেন।

উমার আবু তালহা আনসারিকে ডেকে বলেন, “হে আবু তালহা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তোমার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করেছেন। পঞ্চাশজন আনসারের সমন্বয়ে একটি বাহিনী গঠন করো। উপদেষ্টা পরিষদের সাথে থাকো, তাদের মধ্য থেকে একজনকে খলীফা মনোনয়ন করার কাজটি পর্যবেক্ষণ করো।” তিনি মিকদাদ ইবনুল-আসওয়াদকে বলেন, “আমাকে দাফন করার পর খলীফা মনোনয়নের জন্য এ ছয় জনের পরিষদটিকে একটি বাড়িতে একত্র করবে।” এরপর উমার রা. ইন্তেকাল করেন। ভারপ্রাপ্ত শাসক সুহাইব রা. জানাজার নামাজের ইমামতি করেন।

এরপর ৬ জনের উপদেষ্টা পরিষদ একত্রিত হন। তারা একে অপরকে যোগ্য মনে ভোট দিলেন। ৬ জন থেকে পরামর্শের মাধ্যমে ৩ জনে নেমে এলো। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা., আলী রা. এবং উসমান রা.। আব্দুর রহমান রা. বলেন, আমি নিজেকে প্রত্যাহার করলাম খিলাফতের দায়িত্ব থেকে। আপনারা যদি আমাকে দায়িত্ব দেন তাহলে আমি মদিনাবাসীর পরামর্শ নিয়ে বাকী দুইজনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জনকে বাছাই করতে পারবো। বাকী ৫ জন সাথে সাথেই রাজি হলেন এবং তার সিদ্ধান্তই মেনে নিবেন বলে সম্মত হন। আব্দুর রহমান প্রথমে আলী রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন কে উপযুক্ত খিলাফতের জন্য? তিনি বললেন, উসমান রা.। একইকথা উসমান রা.-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আলী রা.-কে উপযুক্ত বলেন।

এরপর আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. শুরা বৈঠক শেষ করে মদিনার জনগণের সাথে পরামর্শ করতে লাগলেন। সমস্ত সাহাবা, সমস্ত গোত্রপ্রধান, মুসলিমদের সাথে পৃথক পরামর্শ, দলবদ্ধ পরামর্শ গ্রহণ করতে থাকলেন। সারা মদিনায় একটা নির্বাচনী উতসব বিরাজ করতে থাকলো। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ মদিনায় আগমণকারী বাইরের ব্যবসায়ী দলের কাছ থেকেও পরামর্শ নিলেন। বিশিষ্ট মহিলাদের থেকেও পরামর্শ নিলেন আমীর নির্বাচনের ব্যাপারে। শুধু তাই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিলেন। বেশিরভাগ লোকজন উসমান রা.-এর প্রতি তাদের পরামর্শ ব্যক্ত করলেন।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আব্দুর রহমান রা. সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করেছেন। এরপর তিনি নতুন আমীর ঘোষণার সময় জানালেন। মসজিদ ভর্তি মানুষ। তিল ধারণের জায়গা ছিল না। উসমান রা. ও আলী রা.-কে ডেকে নিয়ে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. মিম্বরে দাঁড়ালেন। সাথে সুহাইব রা.-এও উপস্থিত ছিলেন। সবার উপস্থিতিতে তিনি উসমান রা.-এর পক্ষে বেশিরভাগ মানুষের সমর্থনের কথা জানালেন। এরপর হাত ধরে বললেন, আপনি কি আল্লাহর কিতাব, রাসূল সা.-এর সুন্নাহ, আবু বকর ও উমারের কর্মপন্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গিকার করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এভাবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে উসমান রা.-এর শপথ গ্রহণ হলো।

এরপর আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. উসমান রা.-এর হাত ধরে উপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো (তিন বার)। আমার জিম্মায় খেলাফতের নেতৃত্ব বাছাইয়ের যে দায়িত্ব ছিল তা উসমানের জিম্মায় দিলাম। আলী রা. প্রথমে উসমান রা.-কাছে আনুগত্যের বাইয়াত নিলেন। উপস্থিত সবাই এবার উসমান রা.-এর কাছে আনুগত্যের বাইয়াত নিতে থাকলেন। উমার রা.-এর প্রচেষ্টায় নেতা নির্বাচনের একটি দারুণ পদ্ধতি দাঁড়িয়ে গেল যার মূলনীতি গ্রহণ করা হয়ে রাসূল সা.-এর হাদিস থেকেই এবং প্রসিদ্ধ সাহাবাদের হাত ধরেই এই পদ্ধতি ডেভেলপ হয়েছে।

বলাবাহুল্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতা নির্বাচনের এই পদ্ধতিকে গ্রহণ করেছে নিজ দলের জন্য এবং বাংলাদেশে যাতে এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরি হয় তার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি প্রস্তাবনা জামায়াত থেকে এসেছে।


খিলাফত পর্ব-২৮ : আমীরুল মু'মিনিন উমার রা.-এর শাহদাত

আমাদের নেতা উমার রা. আগে থেকে জানতেন তিনি শাহদাতবরণ করবেন, অর্থাৎ তাঁকে খুন করা হবে। আনাস ইবনু মালিক রা. বলেন, “আল্লাহর রাসূল সা. আবু বকর রা., উমার রা. ও উসমান রা.-কে সাথে নিয়ে একদিন উহুদ পর্বতে আরোহণ করলেন। পাহাড়টি কেঁপে উঠলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘স্থির হও, হে উহুদ। তোমার ওপরে একজন রাসূল, একজন সিদ্দীক ও দুইজন শহিদ রয়েছেন।” তখন থেকেই উমার রা. ও উসমান রা. জানতেন তাঁরা শহীদ হবেন।


শুধু জেনে ক্ষান্ত ছিলেন শাহদাতের মৃত্যুর জন্য উমার রা. দোয়া করতেন। যাইদ ইবনু আসলাম রা. বলেন, ২৩ হিজরিতে হজ্জের সময় উমার রা. বলেছেন, “হে আল্লাহ! তোমার পথে আমাকে শাহাদাহ দিয়ে ধন্য করো; আর আমার মৃত্যু তোমার নবীর শহরে দান করো।” তিনি প্রায়ই বলতেন, “হে আল্লাহ! তোমার পথে শাহাদাহ, তোমার নবির শহরে আমার মৃত্যু দাও।” এটা অনেকটা প্যারাডক্সিকেল দোয়া ছিল, কারণ মদিনার মতো নিরাপদ শহরে কে আসবে উমার রা.-কে খুন করার জন্য। সারা পৃথিবী যেখানে উমার রা.-এর করতলে এমন শাসককে কারা এসে মদিনা আক্রমণ করে মারবে এটা বোধগম্য ছিল না। উমার রা.-এর এই দোয়াতে সাহাবারা বলতে এটা কীভাবে সম্ভব? মদিনায় কীভাবে আপনি শহীদ হবেন? তিনি বলতেন, আল্লাহ চাইলে সম্ভব।

আউফ ইবনু মালিক রা. বলেন, “আবু বকরের খিলাফাতের সময় আমি এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম আকাশ থেকে একটি রশি ঝুলে আছে। মানুষেরা সেটি ধরার চেষ্টা করছে। উমার ছিলেন অন্য সবার চেয়ে তিন হাত বেশি লম্বা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এমন কেন? লোকেরা বলল, কারণ, তিনি হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফাদের একজন। তিনি কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করেন না এবং তিনি শহিদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন।

পরদিন সকালে আমি আবু বকরের কাছে গিয়ে তাকে এ সম্পর্কে জানালাম। তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দা, আবু হাফসার (উমার রা.) কাছে যাও, তাকে ডেকে নিয়ে এসো। যখন তিনি আসলেন আবু বকর আমায় বললেন, “হে ‘আউফ! তুমি যা স্বপ্নে দেখেছ তা বলো। যখন আমি ‘উমারকে বললাম, তিনি আল্লাহর খলীফাদের একজন। উমার বললেন, একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি কি সবকিছু দেখে? আবু বকর তাকে বললেন, ‘তাকে সবকিছু জানাও। উমার শুনতে চাইলেন না, এসব কথা কারো কাছে বলতেও নিষেধ করেন।

এরপর যখন ‘উমার সত্যিই খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন তিনি একবার সিরিয়ার জাবিয়াতে আসলেন। সেখানে বক্তৃতা দেওয়ার সময় আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং পাশে বসতে বললেন। বক্তৃতা শেষ হওয়া পর বললেন, তোমার সেই স্বপ্নের কথাটা আবার একটু বলো। আমি বললাম, আপনি তো আমাকে এ সম্পর্কে কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বললেন, “আমি কিন্তু সেটা বোঝাইনি। বরং আমি আবু বকরের (জীবিত থাকা অবস্থায় তার সামনে খিলাফাত-সংক্রান্ত কথা বলার) ব্যাপারে লজ্জাবোধ করছিলাম।' তারপর তাকে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করার পর তিনি বললেন, ‘খিলাফাতের ব্যাপারে যা তুমি দেখেছ তা আমাকে ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় না করার ব্যাপারে বলবো, আমি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাই না। আমি আশা করি, আমার এ কথা সঠিক। আর শহিদ হওয়া ব্যাপারে বলবো, আরব উপদ্বীপে থাকা অবস্থাতেই আমি শাহাদাহ লাভ করব।”

উমার রা. তার শেষ জুমআর খুতবায় বলেছিলেন, “আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি, আমার মনে হয় এ স্বপ্ন আমার মৃত্যুর ইঙ্গিত বহন করছে। আমাকে একটি মোরগ দুবার ঠোকর দিচ্ছে এবং মানুষেরা নতুন খলীফা নিযুক্ত করতে বলছে। আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বা তাঁর খিলাফাতকে ধ্বংস হতে দেবেন না, আবার তিনি আর কোনো নবিও প্রেরণ করবেন না। যদি আমি মারা যাই, খলীফা নিযুক্ত হবে এই ছয় সদস্যের পরামর্শ পরিষদের মাধ্যমে। তাদের ওপর রাসূল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন।” উমার রা. বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। খিলাফতের ব্যপারে তিনি চিন্তা ও গবেষণা করতেন। রাষ্ট্রের নেতা নির্বাচনকে রাসূল সা.-এর মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি একটি কাঠামো বা সিস্টেম তৈরি করেছিলেন। তিনি এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। যেহেতু তিনি শাহদাতের কথা জানতেন এবং মৃত্যুর ব্যপারে ইঙ্গিত পেয়েছেন তাই তিনি পরবর্তী শাসক নির্বাচনের রূপরেখাও তৈরি করে ফেলেছেন।

যুদ্ধবন্দিদের মাদীনায় বসবাসের ব্যাপারে উমার রা. পছন্দ করতেন না। এটা মদিনার নিরাপত্তার জন্যই। বিজিত রাষ্ট্র থেকে যেসব বন্দি এসেছিল, খিলাফাতের রাজধানী মাদীনাতে তাদেরকে রাখার ব্যাপারে খলীফা উমার রা. নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। ইরাক ও পারস্যের অগ্নি-উপাসক, সিরিয়া ও মিসরের খ্রিষ্টানদেরকেও মাদীনায় থাকার অনুমতি উমার রা. দেননি। কেবল ইসলাম গ্রহণ করলেই তারা মদিনাতে অবস্থান করতে পারত। খলীফার এ সিদ্ধান্ত তার প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করে। কারণ পরাজয় বরণ করা এ মানুষগুলোর মধ্যে ইসলামের প্রতি ছিল ঘৃণা। তাই স্বাভাবিক কারণেই তারা মুসলিমদের মধ্যে থেকেও তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতো। তার এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত মুসলিমদের অনেক অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

তবে কোনো কোনো সাহাবির অধীনে খ্রিষ্টান ও অগ্নি-উপাসকদের মধ্য থেকে আসা কিছু দাস ছিল। তাই সাহাবাদের কেউ কেউ এ দাসদের মাদীনায় থাকার ব্যাপারে ‘উমারকে অনুমতি দিতে বলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘উমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের কাউকে কাউকে থাকার অনুমতি দেন। ফলে তিনি যা ভেবেছিলেন ও যে সম্পর্কে আশঙ্কা করেছিলেন সেই পরিস্থিতির মুখোমুখিই উমার রা.-কেই হতে হয়েছে। এক অমুসলিম দাস আবু লু'লু উমার রা.-এর প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ে নামাজের মধ্যে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে।

উমার রা. সেদিন ফজরের নামাজে দাঁড়িয়ে কাতার সোজা করছিলেন। এমন সময়ে কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা আবু লু'লু হঠাত চড়াও হয়ে ছুরি দিয়ে উমার রা.-কে আঘাত করতে থাকে। উমার রা. চিৎকার করে বললেন, কুকুরটা আমাকে মেরে ফেললআক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি এ কথা বলে উঠলেন। ঘাতক অগ্নিপূজক পালানোর চেষ্টা করছিল। তার সাথে থাকা দু-পাশ ধারালো খঞ্জর দিয়ে সে যাকেই সামনে পাচ্ছিল তাকেই আঘাত করছিল। একে একে সে তেরো জনকে ছুরিকাঘাত করে, তার মধ্যে সাতজনই মৃত্যুবরণ করেন।

একজন মুসলিম এই বেগতিক অবস্থা দেখে তার দিকে বড় একটি কাপড় ছুড়ে দিয়ে তাকে ঢেকে ফেলল। যখন সে বুঝতে পারল যে, সে ধরা পড়ে গিয়েছে, তখন সে আত্মহত্যা করল। ‘উমার রা. ‘আবদুর-রাহমান ইবনু আউফের হাত ধরে তাকে ইমামের স্থানে এগিয়ে দিলেন সালাত পড়ানোর জন্য। যারা ‘উমার রা.-এর কাছের কাতারগুলোতে ছিলেন, কী ঘটছে তারা তা চোখেই দেখেছিলেন, কিন্তু যারা দূরের কাতারে ছিলেন তারা বুঝতে পারছিলেন না কী হচ্ছে! ‘উমারের তিলাওয়াতও তারা শুনতে পারছিলেন না। তাই তারা ‘সুবহান আল্লাহ’ বলছিলেন। আবদুর-রাহমান খুব সংক্ষেপে সালাত শেষ করেন।

উমার বললেন, “হে ইবনু আব্বাস, দেখে এসো তো কে আমাকে আঘাত করেছে। তিনি দেখে এসে বললেন, ‘মুগীরার দাস। “উমার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেই কারিগর?’ তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমার বললেন, তার ওপর আল্লাহর লানত। আমি তার মনিবকে বলেছিলাম যেন তার জন্য ভালো ব্যবস্থা করে। সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে মুসলিম দাবিদার কারও হাতে মৃত্যু দেননি। তুমি ও তোমার বাবা (মানে ‘আব্বাস ও তার ছেলে আবদুল্লাহ) বেশি বেশি বিধর্মীকে মাদীনায় আনতে চেয়েছিলে!

আবু লু'লু ছিল মুগীরা ইবনু শু’বার দাস। সে জাঁতা তৈরি করতো। মুগীরা প্রতিদিন তার থেকে চার দিরহাম করে আদায় করতেন। এটা আবু লু'লু'র কাছে জুলুম মনে হয়েছে। তাই সে উমার রা.-এর সাথে দেখা করে বলেছিল, হে আমীরুল মু'মিনীন, মুগীরা আমার ওপর অনেক বেশি ধার্য করেছে। তাকে কমাতে বলুন। উমার তাকে বললেন, আল্লাহকে ভয় করো, তোমার মনিবের প্রতি বিশ্বস্ত হও।' এই কথা বলে তাকে বিদায় দিয়ে উমার রা. মুগীরা রা.-এর সাথে কথা বলে এটা কমানোর জন্য বলেছেন।

এদিকে আবু লুলু রেগে গেল। সে বলল, “আমি ছাড়া সবার সাথে সে (“উমার) ন্যায়বিচার করতে পারে। তার এই রাগকে কাজে লাগিয়েছে বাধ্য হয়ে মুসলিম হওয়া সাবেক পার্সিয়ান কমান্ডার হরমুজান। সে আবু লু'লুর রাগকে উস্কে দিয়ে উমার রা.-কে হত্যা করার প্ল্যান তার মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আবু লু'লু দুই দিকে ধারালো একটি ছুরি তৈরি করে তাতে বিষ মাখাল। হরমুজানকে দেখিয়ে বলল, এটা কেমন? সে বলল, যাকে এটা দিয়ে আঘাত করা হবে, সে অবশ্যই মারা যাবে। হরমুজান তাকে সাহস দিল। হরমুজানের কথা ২৫ নং পর্বে আলোচনা করেছি।

এরপর উমার রা.-কে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে কিছু খাদ্য দেওয়া হলো, তিনি তা পান করলেন, কিন্তু তা তার উদর থেকে বেরিয়ে এল। তাকে কিছু দুধ এনে দেওয়া হলো, তা পান করলেন কিন্তু তাও তার ক্ষতস্থান দিয়ে বেরিয়ে এল। সবাই বুঝতে পারল, তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন। আমরা তার ঘরে প্রবেশ করলাম, অন্যরাও তার ঘরে প্রবেশ করল এবং তার প্রশংসা করতে লাগলো। উমার রা. তার ছেলে আবদুল্লাহকে বললেন, ‘আবদুল্লাহ, দেখো তো, আমার কত ঋণ আছে। তারা হিসাব করে দেখলেন মোট ৮৬ হাজার দিরহামের মতো। উমার বললেন, যদি আমার পরিবার এ ঋণ শোধ করার সামর্থ্য রাখে, তবে তাদের থেকে যা পাবে তা দিয়ে শোধ করবে। না হলে বানু উদাই ইবনু কা'বের কাছে চাইবে। তাও যদি বাকি থাকে তবে কুরাইশদের থেকে চাইবে। তবে এরপর আর কারও কাছে চাইবে না। আমার পক্ষ থেকে দ্রুত এ ঋণগুলো পরিশোধ করে দাও।

আব্দুল্লাহকে আরো নির্দেশ দিলেন, উম্মুল-মু'মিনীন আয়িশা রা.-এর কাছে যাও, তাকে বলবে, “উমার আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। আমীরুল-মু'মিনীন’ বলবে না। কারণ, আজ থেকে আমি আর আমীরুল মু'মিনীন নই। তাকে বলবে, “উমার ইবনুল-খাত্তাব তার দুই সঙ্গীর সাথে থাকার জন্য আপনার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমার ‘আয়িশাকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি দেখলেন “আয়িশা কাঁদছেন। তিনি বললেন, ‘উমার ইবনু খাত্তাব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং তার দুইজন সঙ্গীর পাশে তাকে শায়িত করার জন্য অনুমতি চেয়েছেন।

“আয়িশা বললেন, ‘জায়গাটা আমি আমার জন্য রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আজ তাকে আমার ওপর প্রাধান্য দিলাম। আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার ফিরে এসে বললেন, ‘হে আমীরুল-মু'মিনীন, আপনি যা চেয়েছেন সেরূপ অনুমতি তিনি দিয়েছেন। ‘উমার বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহর, এ বিষয় নিয়েই আমি সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলাম। যখন আমি মারা যাবো তখন তোমরা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বলবে, “উমার ইবনুল-খাত্তাব প্রবেশের জন্য অনুমতি চাচ্ছেন। অনুমতি দিলেই কেবল আমাকে ভেতরে নিয়ে যাবে। আর না দিলে আমাকে মুসলিমদের (সাধারণ) কবরস্থানে নিয়ে যাবে। এরপর উমার রা. নতুন শাসক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন।

উমার রা. ইন্তেকাল করার পর জানাযা শেষে মুসলিমরা তার মৃতদেহ নিয়ে আয়িশা রা.-এর ঘরে উপস্থিত হলেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার সালাম দিয়ে বললেন, উমার ইবনুল-খাত্তাব প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। আয়িশা বললেন, তাকে ভেতরে নিয়ে আসুন। তাকে ভেতরে আনা হলো এবং তার দুইজন প্রিয় সঙ্গী মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা.-এর পাশে তাকে কবর দেওয়া হলো।