মাহমুদুর রহমান গ্রেপ্তার হলেন সেদিনই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভুজপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের একাংশের মিছিলে অন্য অংশের লোকেরা হামলা চালায়। ৪/৫ খুন হয়। অনেক মোটরসাইকেল গাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। স্বভাবতই এর দায়ও এসে পড়ে জামায়াতের ওপর।
ভুজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন জামায়াতের। নাম তার শফিউল আলম নূরী। ঘটনা ঘটার পর নূরী ভাই সারাক্ষণ পুলিশের সাথে ছিলেন। উদ্ধারকাজে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ আসে নূরী ভাইকে এরেস্ট করার জন্য। ঠিক তখন নূরী ভাই ওসির সাথে বসে ছিলেন। সারা রাত ওসির রুমে আটকে রাখা হয়। পরদিন কোর্টে চালান করে ও কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
কারাগারে শফিউল আলম নূরী ভাইয়ের সিট বরাদ্দ হয় আমার ওয়ার্ডে অর্থাৎ হালদা ১৮ তে। আহ! হাসি খুশি নূরী ভাই। কয়েকদিন পর রিমান্ডের কল আসলো। ভুজপুরের ঘটনার জন্য নূরী ভাইকে কারাগার থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি অফিসে নিয়ে গেলো। আমরা সবাই আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে গেলাম। ভাইকে যাতে ফেরত পাই। এটা সে সময় যখন রিমান্ডে গেলে অনেকে আর ফেরত আসতো না। ক্রসফায়ারের শিকার হয়ে শাহদাতবরণ করতো। মোশাররফ ভাই নামে সীতাকুন্ডণ্ডের আমার এক জেলমেটকে পুলিশ এভাবে খুন করে।
যাই হোক, ৩ দিন পর আমরা আবার নূরী ভাইকে ফেরত পেলাম। কিন্তু নূরী ভাই শেষ। এমন কোনো অত্যাচার নেই যা তার ওপর চালানো হয় নাই। যেন আবু গারিব কারাগারের টর্চার শেলে ছিলেন নূরী ভাই। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নূরী ভাই যেন স্বীকারোক্তি দেয়, তার নেতৃত্বেই লীগের মিছিলে হামলা হয়েছে। শত নির্যাতনেও নূরী ভাই মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেন নি।
৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ সফল হওয়ায় ডাইনী হাসিনা সরকার বুঝেছে গণজাগরণ মঞ্চ এখন আর তার জন্য সুবিধার কিছু না। ধীরে ধীরে গণজাগরণ মঞ্চ ছোট হয়ে আসছে। তাদের মিটিং-এ এখন জনসাধারণের চাইতে সাংবাদিক বেশি।
এদিকে হেফাজতে ইসলাম সারাদেশে সমাবেশ করে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই বিশাল বিশাল সমাবেশ করে যাচ্ছে। সব বিভাগীয় সমাবেশ ও বড় সমাবেশে আল্লামা শাহ আহমদ শফি যোগ দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি হেলিকপ্টারে করে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটেছেন ১৩ দফার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য।
সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল। আল্লামা শাহ আহমদ শফি জোর দাবি জানাচ্ছেন চলমান সংসদেই ১৩ দফা পাশ করাতে হবে। নইলে ৫ মে ঢাকা অবরোধ করা হবে। আর সেই অবরোধ কঠিন অবরোধ হবে।
হাসিনা সরকার ইসলামপন্থীদের মধ্যে আস্থা আনার ট্রাই করলো। আসিফ মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারকে আটক করেছে। গণজাগরণ মঞ্চ তাদের মুক্তির জন্য কর্মসুচি দিয়েছে কিন্তু তাতে মানুষ আসে নি।
যেসব ইসলামপন্থীরা এতোদিন গণজাগরণ মঞ্চ-এর সাথে একাত্মতা করেছিলো তারাই এখন গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে বড় বড় সমাবেশ করা শুরু করলো। চট্টগ্রামের মাজারপন্থী সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তারাও চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের ফাঁসীর দাবিতে সমাবেশ করেছে। এদের মাঠে নামিয়ে সরকার মূলত হেফাজত থেকে সাধারণ মানুষকে আলাদা করতে চেয়েছে।
আর কওমিদের মধ্যে হাসিনা সরকারের গুটি হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তো ছিলই। সারাদেশের জনসাধারণ তাদের ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের দালাল হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। তবে হেফাজতের নেতৃত্ব পর্যায় থেকে চরমোনাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বরিশালে চরমোনাই হেফাজতের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে। সেখান থেকে পীর রেজাউল করিম বলেন, যারা আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে, তারা বিএনপি - জামায়াতের দালাল।
চরমোনাইয়ের এক নেতা নাম আতিকুর রহমান নান্নু, তিনি একটি পুস্তিকা লিখেন। নাম 'হে আল্লাহ, পীর সাহেব চরমোনাইকে কবুল করো'। এই বইয়ে হেফাজতের বিরুদ্ধে বিষোধগার করা হয়েছে। চরমোনাই কর্মীরা সব হেফাজতের সমাবেশে এই পুস্তিকা বিতরণ করেছে যাতে সাধারণ মানুষ হেফাজতের মিটিং-এ না আসে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিতে থাকলো। মির্জা ফখরুলসহ বেশ ক'জন নেতাকর্মীকে আটক করে হাসিনা। প্রতিবাদে দুদিনের হরতাল করে জোট। আর জামায়াতের সাথে প্রতিদিনই কোন না কোনো জেলায় সংঘর্ষ লেগেই ছিলো। জেলাভিত্তিক হরতাল দিতে থাকে জামায়াত।
সেই দিনগুলোতে প্রথম আলোসহ সব পত্রিকা হরতাল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে থাকে। বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছে তাদের একটা কমন প্যাটার্ন আছে। তারা তাদের বইয়ের এক পৃষ্ঠায় লিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মতো অসহায়, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর পরের পৃষ্ঠায় লেখে বাংলাদেশ স্বাধীন একদিনে হয় নাই। আমরা ১৯৬৫ সাল থেকেই এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। অস্ত্রের ট্রেনিং নিয়েছি। বোমা বানানো শিখেছি। ভারতে গিয়ে রক্ত শপথ করেছি। হাইস্যকর!!
তো বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোও একই কাজ করতো হরতাল নিয়ে। প্রথম আলো বেশ ক'দিন ১ম পৃষ্ঠায় লিখেছে, হরতালের কোনো প্রভাব নেই। রাজধানীতে তীব্র যানজট, শেয়ারবাজার চাঙ্গা, অর্থনীতি চাকা সচল ইত্যাদি। আবার ভেতরের পৃষ্ঠায় লিখতো, হরতালে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে দিচ্ছে বিএনপি জামায়াত। দেশ আগাতে পারছে না হরতালের কারনে। কোনটা ঠিক?
২৪ তারিখ রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ে। শত শত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এতে রাজনৈতিক উত্তাপ কিছুটা কমে। গণজাগরণ মঞ্চ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যায়। হেফাজতের সমাবেশ চলতে থাকে। হেফাজতকে নিউট্রাল করার জন্য ২৮ এপ্রিল হাসিনা বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপের প্রস্তাব দেয়। খালেদা জিয়া সংলাপের শর্ত দেন কেয়ারটেকার সরকার। হাসিনা বলে, এটা আদালতের বিষয়, তার নাকি কিছু করার নেই। কয়েকদিন সংলাপ নিয়ে আলোচনা হয়ে এর অবসান হয়।
হেফাজতের ঢাকা অবরোধ ছিল ৫ মে। ৫ মে তাদের কর্মসূচি ছিলো ভোর থেকে ঢাকার ৬ টি প্রবেশমুখ অবরোধ করবে। বিকেলে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করবে। তাদের কর্মসূচি সফল করতে তার আগের দিন ৪ মে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিলো ১৮ দলীয় জোট। বিশাল সেই সমাবেশে সারাদেশ থেকে লোক জড়ো করে জামায়াত। বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্যে ঘোষণা করেন, আমরা ৪৮ ঘন্টার সময় দিলাম। যদি এর মধ্যে কেয়ারটেকার সরকারের দাবি না মানা হয়, তবে আমরা রাজধানীর যে কোনো স্থানে বসে পড়বো।
৫ মে অবরোধ শুরু হলো। বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশ ও যুবলীগের সাথে হেফাজতের সাথে সংঘর্ষ হয়। বেলা ১২ টা পর্যন্ত প্রায় ৬ জন শাহদাতবরণ করে। শাপলায় হেফাজত নেতাদের আসতে বাধা দেয় ডিজিএফআই। আল্লামা শফি লালবাগ মাদ্রাসা থেকে বের হয়েও আবার ফিরে গেলেন। লাখো মানুষ অপেক্ষা করছিলো শাপলা চত্বরে। তাদের দাবি ছিলো, আল্লামা শফি যদি শাপলায় না আসেন তবে তারা রাস্তা ছাড়বেন না।
এদিকে বিএনপি অপেক্ষা করছিলো ৬ তারিখের। যদি ৫ তারিখ হেফাজত কাম জামায়াত শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসুচি চালিয়ে নিতে পারে তবে তারা নয়া পল্টনে অবস্থান কর্মসূচি নিবে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেলো লোমহর্ষক গণহত্যা। রাত ১২ টার পর পুলিশ শাপলা চত্বর ঘিরে শুয়ে বসা থাকা হাজার হাজার মানুষের ওপর ব্রাশফায়ার করে। তার আগে মতিঝিল এলাকার বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। সমস্ত সাংবাদিকদের সরিয়ে দেয়। তারপরও গণহত্যার বেশকিছু ফুটেজ প্রচার করে দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি। ভোর ৪ টার দিকে সেই দুইটি টিভি বন্ধ করে দেয় হাসিনার সন্ত্রাসীরা।
গণহত্যায় অংশ নেয় ৫৭১২ জন পুলিশ সদস্য, ১৩০০ র্যাব সদস্য এবং ৫৭৬ বিজিবি সদস্য। দেড় লক্ষ রাউন্ড গুলি করা হয়। ৮০ হাজার টিয়ার শেল ছোঁড়া হয়। ১৫ হাজার রাউন্ড শটগানের গুলি করা হয়। ১২ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। রাবার বুলেট ছোঁড়া হয় ৬০ হাজার রাউন্ড। ৩৫০ রাউন্ড রিভলভারের গুলি করা হয়। মাদ্রাসা ছাত্র, সাধারণ মানুষ, জামায়াত-শিবির কর্মীরা প্রায় ৩০০ জনের বেশি শহীদ হন। আহত হন প্রায় ১০ হাজার। শহীদদের মধ্যে ৯৩ জনের নাম পাওয়া গেছে, বেওয়ারিশ দাফন হয়েছে ২২৯ জন।
আমি তো ছিলাম চট্টগ্রাম কারাগারে। 'হালদা বিল্ডিং' ছিল একেবারে সীমানা প্রাচীরের সাথে। আমরা ছিলাম ৫ম তলায়। তাই আমাদের ওয়ার্ডের টেলিভিশনে ডিস কানেক্ট হয়ে যেত। আমরা এন্টেনার সাথে এক্সট্রা কেবল লাগিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দিতাম। ফলে মোটামোটি সব চ্যানেল ধরা পড়তো। অন্যান্য ওয়ার্ড বিটিভি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো।
আমরা সারাদিন দিগন্ত টিভি চালিয়ে বসে ছিলাম। রাত ৯ টার পর থেকে জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের টিভি বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলো। ফজরের সময় উঠে দেখি দিগন্ত টিভিতে সরকারি লোক এসেছে বন্ধ করতে। চোখের সামনে দিগন্ত টিভি হারিয়ে গেলো।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন