৬ মে, ২০২৬

শাপলা গণহত্যার আদ্যোপান্ত, পর্ব ০৩


২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি দারুণ কাজ করতে সক্ষম হয়। 

হেফাজতের উত্থানের সাথে সাথে জামায়াত বিপদ থেকে বেঁচে যাচ্ছে এটা তারা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এদিকে আওয়ামী লীগও বুঝেছে শাহবাগীরা মিডিয়ায় স্ট্রং হলেও আপামর জনগণ তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। অতএব ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোকে হাতে রাখতে হবে। 

২২ তারিখের হেফাজতের কর্মসূচিতে দেশের মানুষের ঢল দেখে চরমোনাই এর বিহিত করতে চেয়েছে। তারা কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে জামায়াতবিরোধী জোট গঠন করার চেষ্টা শুরু করে। সেই চেষ্টা সফল হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি। জামায়াত ও হেফাজতকে সাইড করে 'ঈমান ও দেশরক্ষা আন্দোলন' নামে নতুন এক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। 

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন করে এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহসভাপতি ও ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমির মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী এ জোটের আহ্বায়ক। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, 'আমরা সম্পূর্ণ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শবিরোধী।' তিনি জানান, আজ বৃহস্পতিবার জামায়াতের ডাকা হরতালেও তাঁদের জোটের সমর্থন নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস (ইসহাক), খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান), নেজামে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলন ও খেলাফতে ইসলামী এই জোটের অংশ হয়। মোটকথা তারাও শাহবাগবিরোধী তবে তারা এক ছাতার নিচে থাকবে না, কারণ তাতে জামায়াতের উপকার হয়ে যাবে। 

যদিও এই জোট সুবিধা করতে পারে নি, তবে এই জোটের উদ্যোগ নেওয়ায় পুরো আওয়ামী শাসনামলে চরমোনাই পীর সুবিধা পেয়ে এসেছেন এবং তারা বাংলাদেশে মোটামোটি প্রভাব রাখার মতো বড় দলে পরিণত হতে পেরেছে। এই সুযোগ নিয়ে যখন তারা তাদের প্রশ্রয়দাতা আওয়ামী লীগের সাথেই ক্ষমতার চ্যালেঞ্জে গিয়েছে আওয়ামী লীগ ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে।      

যাই হোক, ২২ ফেব্রুয়ারি হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভের পর সারাদেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। পুলিশের গুলিতে প্রতিদনই জামায়াত-শিবিরের কেউ না কেউ শহীদ হচ্ছিলেন। 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা সাঈদীকে ফাঁসীর রায় দেওয়া হয়। রাজধানী ছাড়া দেশ পুরোটাই কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাওহীদবাদী লক্ষ লক্ষ মানুষ সারাদেশে নেমে পড়ে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে খুন করে। এটা এতবড় ঘটনা ছিল যে, চরমোনাই জোট অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। 

জামায়াত চেয়েছিলো, বিএনপি এই অবৈধ ও প্রহসনমূলক রায়ের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেবে। এজন্য জামায়াত বেগম জিয়াকে অনুরোধও করেছে। আল্লামা সাঈদীর রায়ের ব্যাপারে বিএনপি মন্তব্য করতে রাজি হয় নি, রিজভী আহমেদ বলেছেন, আমরা রায়ের বিষয়ে কোনো কথা বলবো না, এটা আদালতের বিষয়। তবে বিএনপি সারাদেশে পুলিশী গণহত্যার বিরুদ্ধে বোল্ড স্টেটমেন্ট দিয়েছে।

১ মার্চ ২০১৩ তারিখে বেগম জিয়া সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগকে হুঁশিয়ার করে বলেন, গণহত্যা চালালে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই সংবাদ সম্মেলনে ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়া আর সব কথা বলেছেন বেগম জিয়া। তিনি শাহবাগের মব কালচারের বিরুদ্ধে, ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে, আল্লাহ তায়ালা ও নবী সা.এর অবমাননার বিরুদ্ধে শক্ত কথা বলেছেন। জামায়াত বিরুদ্ধে চলা হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে হরতালের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু গণহত্যা বন্ধ করেনি শেখ হাসিনা। এই গণহত্যা চলে ৬ মার্চ পর্যন্ত।   

আমি তখন ছিলাম চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরের হাসপাতালে। মার্চের ১ম সপ্তাহে প্রতিদনই অনেক ভাই গুরুতর আহত অবস্থায় কারাগারে এসেছেন। কার হাত ভাঙ্গা, কারো পা, বেশিরভাগ ভাইয়ের মাথা ফাটা। কোনো কোনো ভাই এতো ভয়ানকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যে, তাদের চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজেই ছিলাম অসুস্থ। শুধু দোয়া করা ছাড়া কোনো কিছুই করার সামর্থ ছিল না।  

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী নেতা রফিউর রাব্বির ছেলে ত্বকীকে কেউ খুন করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই নিয়ে শুরু হয় মিডিয়া ট্রায়াল। জামায়াত শিবিরের ডজন খানেক নেতাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় এই মামলায়। পরে আওয়ামী আমলেই প্রমাণ হয়, এই খুনে শামীম ওসমানের সন্ত্রাসীরা জড়িত। এভাবে সংঘর্ষময় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিজেদের কোন্দলের হিসাব নিকেশ করে জামায়াতের ওপর দায় দিয়ে দিত।   

আল্লামা সাঈদীর রায়ের পর হেফাজতে ইসলাম ১১ মার্চ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ৬ এপ্রিলের ঢাকামুখী লংমার্চ।   

এই লংমার্চ ঘিরে চলেছে নতুন উত্তেজনা। প্রতিদিনই সংঘর্ষ হচ্ছিলো। গণজাগরণ মঞ্চের কেন্দ্র ছিল শাহবাগ। আর হেফাজতের কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। হেফাজত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা মানে গণজাগরণ মঞ্চ দখল করতে আসা। এমন সিনারিও তৈরি হয়েছিলো। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ২২ ঘন্টার অবরোধ দিয়েছে। বাম দলগুলো হরতাল আহবান করেছে। সকল পরিবহন আওয়ামী চাপে হরতালের সমর্থনে গাড়ি বন্ধ রেখেছে। 

স্থানে স্থানে আওয়ামী গুন্ডাদের সাথে হেফাজতের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছিলো। সব বাধা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, গুলি উপেক্ষা করে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল মতিঝিল শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নানান বাধার পরও মুফতি আহমদ শফি মহাসমাবেশে উপস্থিত হন এবং লাখো মানুষের সামনে ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করেন। এটাই ছিল হেফাজতের ঐতিহাসিক ১৩ দফা।   

১৩ দফাতে যা ছিলো, 
১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা।
২. আল্লাহ্, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস।
৩. কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।
৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
৬. সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৭. মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।
৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।
৯. রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
১১. রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা।
১২. সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।
১৩. অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।  

এই ১৩ দফা ঘোষিত হওয়া, লং মার্চ সফল হওয়া ইত্যাদি কর্মকান্ডে পাগল হয়ে গেছে সেক্যুলার সমাজ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, এতোটাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়েছে তারা ঢাবি ভিসি আআমস আরেফিন সিদ্দিকী সাংবাদিকদের স্টেটমেন্ট দিচ্ছে, ১৩ দফা দাবি মেনে নেওয়া হবে না। মনে হচ্ছে যেন এটা তার দায়িত্ব! 

যাই হোক, পুরো বিষয়ের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা মাহমুদুর রহমানকে দায়ি করে। নানান নাটক করে ১১ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ও ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়। তার ওপর চলতে থাকে ভয়াবহ নির্যাতন... 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন