২১ মে, ২০২৬

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব

 

পাকিস্তান আমল থেকেই বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টা চলে আসছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনাকালে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে স্পষ্টভাবে বলা হয়: "রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ আলাদা করার বিষয়টি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৭২ সালে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হয়। 

সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে আলাদা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। তদুপরি ১৯৭৪ সালে বাকশাল গঠনের প্রাক্কালে পুরো আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি তথা শেখ মুজিব নিজের কাছে নিয়ে নেয়। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। বিচার বিভাগ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রপ্রধানের একটি অস্ত্র। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হলেও এই মূল ক্ষমতা আর সুপ্রিম কোর্টকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। 

এরপর ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান। প্রেসিডেন্ট জিয়া সেনাশাসক হওয়ায় কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ছিলো। নানান পক্ষ থেকে দাবি উঠেছিল বিচার বিভাগকে পৃথক করে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার। অতঃপর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এক সামরিক ফরমানের (Proclamation Order) মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সাথে "সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে" শব্দগুলো যুক্ত করা হয়। এটা ছিল আসলে একটা আইওয়াশ।

এরপর এরশাদের শাসন আসে। হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ও খালেদা নেতৃত্বাধীন বিএনপি বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি জানায়। কিন্তু এরশাদ কর্ণপাত করে না। 

এরপর আসে খালেদা জিয়ার শাসন। ১৯৯১ সালে এই প্রথম বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শাসন পায়। সবাই ভেবেছিলো, এতোদিন খালেদা যে দাবিগুলো নিয়ে মাঠে ছিল সেগুলো এবার বাস্তবায়িত হবে। না, হলো না। খালেদার শাসনামলেও বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি খালেদা বাস্তবায়ন করে নি। কেয়ারটেকার সরকারও মানে নি খালেদা। অথচ এটা ছিল ৯১ এর নির্বাচনের আগে খালেদার ওয়াদা। ১৯৯৪ সালে জেলা জজ ও জুডিশিয়াল এসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন বিভাগ পৃথকীকরণের জন্য একটি মামলা করেন। 

১৯৯৬ সালে খালেদার বেঈমানির প্রতিবাদে মানুষ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনে। ধুর্ত হাসিনাও বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি মানতে চায়নি। ১৯৯৯ সালে হাসিনার আমলে মাসদার হোসেনের মামলার রায় দেওয়া হয়। সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে "নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ" নিশ্চিত করার যে কথা বলা আছে, এই রায়ের মাধ্যমে সেটিকে কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। হাসিনা ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকলেও আদালতের নির্দেশ মানে নি। 

অতঃপর ২০০১ সালে এলো কেয়ারটেকার সরকার। প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ অধ্যাদেশ করতে চাইলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামীলীগ সরাসরি বিরোধীতা করে। তারা বলে এটা রাজনৈতিক সরকারের এখতিয়ার। বিএনপি সফটলি বাধা দেয়। খালেদা জিয়া লতিফুর রহমানকে এই অধ্যাদেশ করার ক্ষেত্রে বিরত থাকতে বলেন। একইসাথে জাতির কাছে ওয়াদা করেন, তিনি ক্ষমতায় এলে মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করবেন। 

কিন্তু খালেদা ২য় বারের মতো জনগণের সাথে বেঈমানি করলেন। বিএনপি সরকার জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করে বিষটিকে ঝুলিয়ে রাখলেন। তিনি বিচার বিভাগ থেকে আলাদা করার ব্যপারে বার বার আদালত থেকে সময় চেয়েছেন। জামায়াত সেসময় তাদের সহযোগী সংগঠন ল'ইয়ার্স কাউন্সিল দিয়ে সরকারকে চাপ দিলেও প্রকাশ্যে মাসদার হোসেন মামলার রায় ঝুলিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে কোনো বক্তব্য বিবৃতি দেয়নি। 

২০০১-২০০৬ মেয়াদে মাসদার হোসেন মামলার রায় ঝুলিয়ে রাখার যে রাজনৈতিক দায় চারদলীয় জোট সরকারের ওপর বর্তায়, জামায়াতে ইসলামী সেই সরকারের অংশ হিসেবে সেই দায়ের অংশীদার। তবে খালেদা জিয়া কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ করেছেন যা অসদাচার।

২০০৭ সালে এলো সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) সংশোধন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করেন।  

২০০৭ সালের ১ নভেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পরিচালিত হচ্ছেন। তবে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ (যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত) এখনো বহাল থাকায় বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।

২০০৯ সালে হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৮ সালের সেই সামরিক ফরমানের রূপটিকেই সংবিধানে পাকাপোক্ত করা হয়, যা আজ পর্যন্ত বহাল আছে। এখানে মজার বিষয় হলো, হাসিনা ৭২ এর সংবিধানে ফিরতে চায় কিন্তু সেই সংবিধানের 'বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে' এটা মানতে চায় না। এক্ষেত্রে সেনাশাসক জিয়ার পদ্ধতিই তার বেশ পছন্দ। 

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির সম্পূর্ণ ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি পৃথক 'জুডিশিয়াল সেক্রেটারিয়েট' বা বিচারিক সচিবালয় গঠন করতে হবে এই দাবি উঠেছে। খালেদা জিয়া নিজেই আবার এই দাবি তুলেছে। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের নিয়ন্ত্রণ নেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ড. মুহাম্মদ ইউনুস মাসদার হোসেন মামলার রায় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য কমিটেড ছিলেন। ২৪ সালের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগ আলাদা করার উদ্দেশ্যে বহুল আকাঙ্খিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এটার জন্য দীর্ঘদিন খালেদা জিয়া আন্দোলন করেছিলেন। 

২০২৬ সালের ১৯ মে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান (হতে চাওয়া স্বৈরাচার) খালেদা জিয়ার দাবির ফসল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে আইন মন্ত্রনালয়ের অধীনে নিয়ে আসেন। ১৯ মে বিচার ব্যবস্থার ওপর কালো দিন নেমে এলো। যেভাবে ১৯৭৪ সালে ফ্যসিস্ট মুজিব বিচার বিভাগকে গ্রাস করেছিলে তারেক রহমান তারই অনুসরণ করেছে। 


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন