ইসলামী আইনে সম্পদ হস্তান্তরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো হেবা, অসিয়ত ও মিরাস। এগুলোর প্রকৃতি, নিয়ম ও প্রয়োগক্ষেত্র ভিন্ন।
১. হেবা (দান / উপহার)
হেবা হলো জীবিত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে মালিকানাসহ দান করা।
শর্তাবলি:
• দাতা সাবালক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে
• দাতার সম্মতি ও ইজাব (প্রস্তাব) থাকতে হবে
• গ্রহীতার কবুল (গ্রহণ) থাকতে হবে
• সম্পত্তির প্রকৃত দখল (কবজা) হস্তান্তর হতে হবে, শুধু মৌখিক ঘোষণায় হেবা সম্পূর্ণ হয় না
হেবার বৈশিষ্ট্য:
• হেবা জীবদ্দশায় কার্যকর হয়, মৃত্যুর পর নয়
• ওয়ারিশ-অনারিশ যে কাউকে হেবা করা যায় (তবে সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা উত্তম বলে হাদিসে নির্দেশনা আছে)
• হেবার জন্য মিরাসের নির্দিষ্ট অংশের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নয়। সম্পূর্ণ সম্পত্তিও হেবা করা যায় (যদিও কিছু ফকিহ অসুস্থ অবস্থায় অতিরিক্ত হেবা সীমিত করার মত দেন)
• সন্তানদের মধ্যে হেবায় বৈষম্য না করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন (হাদিস: নুমান ইবনে বাশিরের ঘটনা)
২. অসিয়ত (উইল)
অসিয়ত হলো মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তে নিজের সম্পত্তি থেকে কাউকে কিছু দেওয়ার নির্দেশনা।
শর্তাবলি ও সীমা:
• অসিয়তকারী সাবালক ও জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে
• মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) পর্যন্ত অসিয়ত করা যায়। এর বেশি করতে হলে সকল ওয়ারিশের সম্মতি প্রয়োজন
• নির্ধারিত ওয়ারিশদের (যারা মিরাসে অংশ পাবে) জন্য অসিয়ত বৈধ নয়। কারণ হাদিসে এসেছে: "কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত নেই" (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)। শর্ত সাপেক্ষে কিছু বিশেষজ্ঞ বৈধ বলেছেন। শর্ত হলো সব ওয়ারিশ একমত হতে হবে।
• অসিয়ত অ-ওয়ারিশ ব্যক্তি, আত্মীয়, দরিদ্র, বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য করা যায়
উদ্দেশ্য: যারা মিরাসের হকদার নন কিন্তু সাহায্যের যোগ্য (যেমন এতিম নাতি-নাতনি, যারা বাবা-মা মারা যাওয়ায় দাদার সম্পত্তি থেকে সরাসরি বঞ্চিত হয়), তাদের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কার্যকারিতা: অসিয়ত মৃত্যুর পর, ঋণ পরিশোধের পর কিন্তু মিরাস বণ্টনের আগে কার্যকর হয়।
৩. মিরাস (উত্তরাধিকার)
মিরাস হলো ব্যক্তির মৃত্যুর পর কুরআন-নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তার সম্পত্তি নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হওয়া। এটি স্বয়ংক্রিয় ও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত — ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়।
মূল সূত্র: সূরা আন-নিসার ৪:১১, ৪:১২ ও ৪:১৭৬ আয়াতে বিস্তারিত অংশ নির্ধারিত আছে।
বণ্টনের ক্রম (মৃত্যুর পর সম্পত্তি থেকে যে ক্রমে কাটা হয়):
• দাফন-কাফনের খরচ
• মৃতের ঋণ পরিশোধ
• অসিয়ত (সর্বোচ্চ ১/৩ পর্যন্ত)
• অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন
বিএনপি কর্তৃক পাশকৃত আইনে কী বলা আছে?
গতকাল (৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ (সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল) নামের একটি আইন কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।
এই নতুন সংশোধিত আইনের মূল বিষয়বস্তু হলো— কোনো ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি সন্তান বা নির্দিষ্ট স্বজনদের নামে দান বা হস্তান্তর করলেও, তিনি নিজে যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন সেই সম্পত্তি ভোগদখল ও ব্যবহারের আইনি অধিকার নিজের কাছেই রাখতে পারবেন। এটি 'লাইফটাইম ইউসুফ্রাক্ট রাইটস' (Lifetime Usufruct Rights) বা আজীবন ভোগস্বত্বের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এই আইনের সমস্যা কী?
১। ইসলাম দ্বারা স্বীকৃত হেবা পদ্ধতি বাতিল হয়ে যাবে। সন্তানদের হেবা বা দান করার প্রয়োজন হলে তা করা যাবে না।
২। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া মানে হল এটা অসিয়তের মতো। এটা অসিয়তকে ভায়োলেট করবে। অসিয়ত যেখানে তিন ভাগের একভাগ সম্পত্তি করা যায়। নতুন আইনের মাধ্যমে সমুদয় সম্পত্তি উইল করা যাবে। এর মাধ্যমে নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
৩। হাদিস অনুযায়ী যারা ওয়ারিশ তাদের জন্য অসিয়ত বৈধ নয়, এই আইনের মাধ্যমে তা বৈধ হয়ে যায়।
৪। যে সমস্যা সমাধানে এই আয়োজন সেই সমস্যা সমাধান হবে না। যারা বাবার কাছ থেকে সম্পদ লিখে নেয় তারা বাবার কাছ থেকে কিনে নিয়েছে এমন দলিলও করতে পারবে।
৫। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিবর্তন করা। যা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শামিল।
এই আইনের মাধ্যমে কী পিতা মাতার সমস্যার সমাধান হবে?
না, হবে না। বরং সমস্যা বাড়বে।
যারা যারা বাবার কাছ থেকে সম্পদ লিখে নেয় তারা বাবার কাছ থেকে কিনে নিয়েছে এমন দলিলও করতে পারবে। সেক্ষেত্রে তাদের ওপর এই আইন প্রযোজ্য হবে না। এছাড়াও এই আইনের সুবিধা নিয়ে এক ওয়ারিশ সমুদয় সম্পত্তি লিখে নিয়ে অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার সুযোগ পাবে।
জামায়াত কী চায়?
জামায়াত চায় এই স্পর্শকাতর ও ইসলামী শরিয়তের বিষয়ে অবশ্যই যেন আলেমদের সাথে পরামর্শ করা হয়। আলেমদের ঐক্যমতের ওপর ভিত্তি করে শরিয়াহভিত্তিক সমাধান বের করা হয়।
কিন্তু বিএনপি ইসলামী শরিয়াহর ধার ধারে না। তাই তারা হেবা বন্ধ করে দিয়েছে। একইসাথে অসিয়তকে ভায়োলেট করেছে।
১. হেবা (দান / উপহার)
হেবা হলো জীবিত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে মালিকানাসহ দান করা।
শর্তাবলি:
• দাতা সাবালক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে
• দাতার সম্মতি ও ইজাব (প্রস্তাব) থাকতে হবে
• গ্রহীতার কবুল (গ্রহণ) থাকতে হবে
• সম্পত্তির প্রকৃত দখল (কবজা) হস্তান্তর হতে হবে, শুধু মৌখিক ঘোষণায় হেবা সম্পূর্ণ হয় না
হেবার বৈশিষ্ট্য:
• হেবা জীবদ্দশায় কার্যকর হয়, মৃত্যুর পর নয়
• ওয়ারিশ-অনারিশ যে কাউকে হেবা করা যায় (তবে সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা উত্তম বলে হাদিসে নির্দেশনা আছে)
• হেবার জন্য মিরাসের নির্দিষ্ট অংশের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নয়। সম্পূর্ণ সম্পত্তিও হেবা করা যায় (যদিও কিছু ফকিহ অসুস্থ অবস্থায় অতিরিক্ত হেবা সীমিত করার মত দেন)
• সন্তানদের মধ্যে হেবায় বৈষম্য না করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন (হাদিস: নুমান ইবনে বাশিরের ঘটনা)
২. অসিয়ত (উইল)
অসিয়ত হলো মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তে নিজের সম্পত্তি থেকে কাউকে কিছু দেওয়ার নির্দেশনা।
শর্তাবলি ও সীমা:
• অসিয়তকারী সাবালক ও জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে
• মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) পর্যন্ত অসিয়ত করা যায়। এর বেশি করতে হলে সকল ওয়ারিশের সম্মতি প্রয়োজন
• নির্ধারিত ওয়ারিশদের (যারা মিরাসে অংশ পাবে) জন্য অসিয়ত বৈধ নয়। কারণ হাদিসে এসেছে: "কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত নেই" (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)। শর্ত সাপেক্ষে কিছু বিশেষজ্ঞ বৈধ বলেছেন। শর্ত হলো সব ওয়ারিশ একমত হতে হবে।
• অসিয়ত অ-ওয়ারিশ ব্যক্তি, আত্মীয়, দরিদ্র, বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য করা যায়
উদ্দেশ্য: যারা মিরাসের হকদার নন কিন্তু সাহায্যের যোগ্য (যেমন এতিম নাতি-নাতনি, যারা বাবা-মা মারা যাওয়ায় দাদার সম্পত্তি থেকে সরাসরি বঞ্চিত হয়), তাদের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কার্যকারিতা: অসিয়ত মৃত্যুর পর, ঋণ পরিশোধের পর কিন্তু মিরাস বণ্টনের আগে কার্যকর হয়।
৩. মিরাস (উত্তরাধিকার)
মিরাস হলো ব্যক্তির মৃত্যুর পর কুরআন-নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তার সম্পত্তি নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হওয়া। এটি স্বয়ংক্রিয় ও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত — ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়।
মূল সূত্র: সূরা আন-নিসার ৪:১১, ৪:১২ ও ৪:১৭৬ আয়াতে বিস্তারিত অংশ নির্ধারিত আছে।
বণ্টনের ক্রম (মৃত্যুর পর সম্পত্তি থেকে যে ক্রমে কাটা হয়):
• দাফন-কাফনের খরচ
• মৃতের ঋণ পরিশোধ
• অসিয়ত (সর্বোচ্চ ১/৩ পর্যন্ত)
• অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন
বিএনপি কর্তৃক পাশকৃত আইনে কী বলা আছে?
গতকাল (৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ (সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল) নামের একটি আইন কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।
এই নতুন সংশোধিত আইনের মূল বিষয়বস্তু হলো— কোনো ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি সন্তান বা নির্দিষ্ট স্বজনদের নামে দান বা হস্তান্তর করলেও, তিনি নিজে যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন সেই সম্পত্তি ভোগদখল ও ব্যবহারের আইনি অধিকার নিজের কাছেই রাখতে পারবেন। এটি 'লাইফটাইম ইউসুফ্রাক্ট রাইটস' (Lifetime Usufruct Rights) বা আজীবন ভোগস্বত্বের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এই আইনের সমস্যা কী?
১। ইসলাম দ্বারা স্বীকৃত হেবা পদ্ধতি বাতিল হয়ে যাবে। সন্তানদের হেবা বা দান করার প্রয়োজন হলে তা করা যাবে না।
২। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া মানে হল এটা অসিয়তের মতো। এটা অসিয়তকে ভায়োলেট করবে। অসিয়ত যেখানে তিন ভাগের একভাগ সম্পত্তি করা যায়। নতুন আইনের মাধ্যমে সমুদয় সম্পত্তি উইল করা যাবে। এর মাধ্যমে নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
৩। হাদিস অনুযায়ী যারা ওয়ারিশ তাদের জন্য অসিয়ত বৈধ নয়, এই আইনের মাধ্যমে তা বৈধ হয়ে যায়।
৪। যে সমস্যা সমাধানে এই আয়োজন সেই সমস্যা সমাধান হবে না। যারা বাবার কাছ থেকে সম্পদ লিখে নেয় তারা বাবার কাছ থেকে কিনে নিয়েছে এমন দলিলও করতে পারবে।
৫। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিবর্তন করা। যা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শামিল।
এই আইনের মাধ্যমে কী পিতা মাতার সমস্যার সমাধান হবে?
না, হবে না। বরং সমস্যা বাড়বে।
যারা যারা বাবার কাছ থেকে সম্পদ লিখে নেয় তারা বাবার কাছ থেকে কিনে নিয়েছে এমন দলিলও করতে পারবে। সেক্ষেত্রে তাদের ওপর এই আইন প্রযোজ্য হবে না। এছাড়াও এই আইনের সুবিধা নিয়ে এক ওয়ারিশ সমুদয় সম্পত্তি লিখে নিয়ে অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার সুযোগ পাবে।
জামায়াত কী চায়?
জামায়াত চায় এই স্পর্শকাতর ও ইসলামী শরিয়তের বিষয়ে অবশ্যই যেন আলেমদের সাথে পরামর্শ করা হয়। আলেমদের ঐক্যমতের ওপর ভিত্তি করে শরিয়াহভিত্তিক সমাধান বের করা হয়।
কিন্তু বিএনপি ইসলামী শরিয়াহর ধার ধারে না। তাই তারা হেবা বন্ধ করে দিয়েছে। একইসাথে অসিয়তকে ভায়োলেট করেছে।

0 comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন