৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মুমিনের সাংগঠনিক গুণাবলী, পর্ব ০২


সংগঠন সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (অর্থাৎ ইসলামকে) আঁকড়ে ধর”-আল ইমরান ১০৩
তাই মুমিনদের সাংগঠনিক জীবন এক অপরিহার্য জীবন। এই জীবনে যে গুনগুলো থাকা প্রয়োজন তা নিয়েই আলোচনা এখানে।
১ম পর্ব পড়ুন   

৫। মজলিশে শূরা (পরামর্শ সভা) থেকে ওয়াক আউট করা যাবে না 
এই বিষয়ে আমরা নির্দেশনা পাই সূরা নূরের ৬২ নং আয়াতে। সেখানে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা বলেন, 
“মুমিন তো আসলে তারাই যারা অন্তর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মানে এবং যখন কোন সামষ্টিক কাজে রসূলের সাথে থাকে তখন তার অনুমতি ছাড়া চলে যায় না”। 
কোন নায়েবে রাসূলের পরিচালিত জামায়াতের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। এছাড়াও মজলিশে শূরা প্রত্যেকের কাছে আমানত। এর সিদ্ধান্ত অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন তিনটি মজলিশ ছাড়া সব মজলিশ আমানত। তিনটি হল অবৈধভাবে রক্তপাত ঘটানো, ব্যাভিচার সংগঠন, এবং অবৈধভাবে কালো অর্থসম্পদ লুন্ঠনের জন্য মজলিশ। 

৬। আন্তরিকভাবে নেতার আনুগত্য করতে হবে 
মহান রাব্বুল আলামীন সূরা আন নিসার ৫৯ নং আয়াতে বলেছেন,
হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং সেসব লোকেরও যারা তোমাদের মধ্যে সামগ্রিক দায়িত্বসম্পন্ন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাপারে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃতই খোদা ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। এটাই সঠিক কর্মনীতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও এটাই উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মুসলমানদের উপর নেতার আদেশ শোনা ও মানা অপরিহার্য কর্তব্য। চাই সে আদেশ তার পছন্দনীয় হোক, আর অপছন্দনীয় হোক। তবে হ্যাঁ, যদি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোন কাজের নির্দেশ হয় তবে সেই নির্দেশ শোনা ও মানার কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবু অলিদ ওবাদা ইবনে ছামেত (রা.) বলেন, আমরা নিম্নোক্ত কাজগুলোর জন্যে রাসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলাম: ১. নেতার আদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে- তা দুঃসময়ে হোক,আর সুসময়ে হোক। খুশীর মুহূর্তে হোক, আর অখুশীর মুহূর্তে হোক। ২. নিজের তুলনায় অপরের সুযোগ-সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ৩. ছাহেবে আমরের সাথে বিতর্কে জড়াবে না, তবে হ্যাঁ, যদি নেতার আদেশ প্রকাশ্য কুফরীর শামিল হয় এবং সে ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যথেষ্ঠ দলিল প্রমাণ থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। ৪. যেখানে যে অবস্থাতেই থাকি না কেন হক কথা বলতে হবে। আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের ভয় করা চলবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল সঃ বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। যেই ব্যক্তি আমাকে অমান্য করলো সে আল্লাহকে অমান্য করলো। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করলো সে আমারই আনুগত্য করলো। যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করলো সে আমাকে অমান্য করলো। (বুখারী)

আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, সন্তুষ্টিতে, অসন্তুষ্টিতে, তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও তোমার কর্তব্য হচ্ছে নেতার নির্দেশ শোনা ও মানা। (মুসলিম)

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন, যে আনুগত্যের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায় এবং জামায়াত থেকে বিছিন্ন হয়ে যায় অতঃপর মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হয় জাহেলীয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) রাসূলে (সঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আনুগত্যের বন্ধন থেকে হাত খুলে নেয়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে তার বলার কিছুই থাকবে না। আর যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহেলীয়াতের মৃত্যু।(মুসলিম) 

এখানে আল কুরআন এবং হাদিসের আলোকে আনুগত্যের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা আমরা বুঝতে পারি। ক্ষুদ্র একটা পরিবার থেকে শুরু করে বিভিন্নমুখী প্রতিষ্ঠানের গঠনমূখী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ঠ লোকদের আনুগত্যের উপরই নির্ভরশীল। বিশেষ যে কোন আন্দোলনের, সংগঠনের জন্যে আনুগত্যই চালিকাশক্তি বা প্রাণশক্তির ভূমিকা পালন করে। আনুগত্যই সাংগঠনিক শৃংখলার মূল উপাদান। 

৭। অনুগামী এবং সহকর্মীদের প্রতি দরদপূর্ণ এবং কোমল হতে হবে 
দায়িত্বশীলকে অবশ্যই পারস্পরিক নম্র ও কোমল আচরণ করতে হবে। সংগঠন বা সংঘবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীলের অন্যতম কাজ হল, কর্মীদেরকে একে অন্যের সাথে জুড়ে দেয়া, নিজেদেরকে পারস্পারিক দৃঢ়, মজবুত বন্ধনে আবদ্ধ করা, সংঘবদ্ধ ও সু-সংহত করা। ইসলামী আন্দোলনের সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম দায়িত্বশীল রাসূল সঃ কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, (হে নবী) আল্লাহর মেহেরবাণীতে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি তাদের প্রতি রূঢ় হতেন তাহলে তারা আপনার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। (সূরা আল ইমরান: ১৫৯) 

দায়িত্বশীলদের সামগ্রিক আচরণ হবে সাহাবায়েকেরাম রা. এর মত। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তাঁর সাথিবর্গ কাফেরের মোকাবেলায় অত্যন্ত কঠোর কিন্তু তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহমর্মী। (সূরা ফাতাহ: ২৯) 

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল, তিনি সকল কাজে কোমলতা পছন্দ করেন। (বুখারী ও মুসলিম)

আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল এক সাহাবাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট দায়িত্বশীল ঐ ব্যক্তিরা যারা অনুগামীদের প্রতি কঠোর। সাবধান তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। (বুখারী ও মুসলিম) 

৮। সহকর্মীদের সাথে একে অপরের আয়নাস্বরূপ হওয়া
আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন, মুমিন তার ভাইয়ের আয়নাস্বরুপ। এক মুমিন আরেক মুমিনের ভাই। সে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পদের হিফাযাত করে। (আল আদাবুল মুফরাদ)

আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, মুমিন তার ভাইয়ের আয়নাস্বরুপ। সে তার মাঝে কোন ত্রুটি দেখতে পেলে তা সংশোধন করে দেয়। (আল আদাবুল মুফরাদ)

একজন মুমিনের ভুলত্রুটি যদি অন্যজনের দৃষ্টিগোচর হয়, সংশোধনের নিয়তে তিনি সেটি ঐ মুমিন ভাইকে ধরিয়ে দিবেন। অন্য কারো কাছে সেই ভুল ত্রুটির কথা বলে বেড়াবেন না। আর ভুল ধরিয়ে দেয়ার এই কাজটি করতে হবে আন্তরিকভাবে, মোলায়েম ভাষায়। একটির ব্যাপারে বলতে গিয়ে অতীতের অন্য কোন ভুলকে টেনে আনা ঠিক হবেনা। একেবারেই খুঁটিনাটি বিষয়কে ইহতেসাবের বিষয় না বানানো উচিত। এমন বিষয় আনা দরকার যা দ্বারা ব্যাক্তি নিজে অথবা সংগঠনের ভাব-মর্যাদা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

ব্যক্তিগতভাবে বারকয়েক ইহতেসাব দেয়ার পরও সংশোধিত না হলে বিষয়টি ফোরামে উপস্থাপন করা যাবে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত কোনভাবেই ইহতেসাব অনুষ্ঠান যাতে বিতর্ক অনুষ্ঠানে পরিণত না হয়। 

৯। একান্ত আভ্যন্তরীণ বিষয় অন্যদের জানানো যাবে না 
সূরা আলে ইমরানের ১১৮ নং আয়াতে এই বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা বলেন, 
হে ঈমানদারগণ, নিজেদেরকে ছাড়া অন্য লোকদেরকে তোমাদের একান্ত আভ্যন্তরীণ বিষয়ের শরিক বানাবে না। তারা তোমাদের ক্ষতি করার কন সুযোগই হাতছাড়া করবে না। 

অতএব এই বিষয়টা মুমিনদের বিবেচনায় রাখতে হবে। কোন ভাবেই যাতে সংগঠনের কোন আভ্যন্তরীণ তথ্য যা শত্রু পক্ষ জানলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে এমন বিষয় কারো সাথে শেয়ার না করা। 

১০। দায়িত্বশীল এবং অনুগামীগন পরষ্পরের জন্য দোয়া করা
আওফ ইবনু মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেছেন, তোমাদের উত্তম নেতা তারা যাদেরকে তোমরা ভালোবাস এবং তারাও তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ কর, তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। পক্ষান্তরে তোমাদের অধম নেতা তারা যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দিয়ে থাক এবং তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দিয়ে থাকে। (সহীহ মুসলিম)

১১। কারো মান-সম্মানের প্রতি আঘাত হানা যাবে না। 
আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তাকে মিথ্যা বলবে না এবং তাকে হেয় করবে না। প্রত্যেক মুসলিমের মান-সম্মান, অর্থ সম্পদ ও রক্ত অন্য মুসলিমের জন্য হারাম। (জামে আত তিরমিযি)

আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেন, তোমরা পরষ্পরের ভাই ভাই এবং আল্লাহর বান্দা হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করতে পারে না। তাকে হেয় করতে পারে না এবং তাকে অপমানিত করতে পারে না। 

একজন মুমিনের সাংগঠনিক জীবনে এই গুণগুলো বেসিক গুণ। আভ্যন্তরীণ শৃংখলা বজায় রাখার জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গুণও বটে। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা তিনি যেন আমাদের এই গুণগুলো অর্জন করার তাওফীক দান করেন। আমীন। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন