২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মুসলিম পূনর্জাগরনের অগ্রদূত জামাল উদ্দিন আফগানী


স্বচ্ছ পানির ঝরনাধারা আর বিশাল পর্বতমালার দেশ আফগানিস্তান। নানান দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রে আজ দেশটি সারা পৃথিবীর অন্যতম যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশ। রুশদের বর্বর আক্রমণ, উপুর্যপুরি মার্কিন হামলা ও ষড়যন্ত্র, প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদ আফগানিস্তানের ভাগ্যকে নির্মম পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। 

এই দেশটির ইতিহাস অতি প্রাচীন। এখানে ইসলাম আসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সঃ এর ইন্তেকালের এর অল্প কিছু পরই। ১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানী আধুনিক আফগানিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করলেও আফগান জাতির আবাসভূমি হিসেবে ‘আফগানিস্তান’ শব্দটার প্রচলন ছিল অনেক আগ থেকেই।

উনিশ শতকে মুসলিম জাহান যখন এক অস্থিরতার আবর্তে দিশেহারা, খিলাফতের স্বর্ণযুগের স্মৃতি রোমান্থন করে টিকে থাকা ওসামানিয়া খিলাফত বয়সের ভারে ন্যুজ তেজী বৃদ্ধের মত দাঁড়িয়ে ছিল, নানান প্রকার ইসলাম বিরোধী শক্তির রক্তচক্ষু ক্রমেই তার লাল রঙ বৃদ্ধি করছিল, তাদের সেই চক্ষুর রোষানলে পুড়ছিল একের পর এক ইসলামী সাম্রাজ্য, হিন্দুস্থানে জেঁকে বসেছে বৃটিশ উপনিবেশ, গোটা ইউরোপ ইসলামকে মুছে দিতে একের পর এক নিত্যনতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামছিলো তখন আফগানিস্তানে ফুটলো এক নতুন আলোর প্রদীপ। এই আলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ধ্রুবতারার মত জ্বলতে থাকে। 

এই আলো ছিলেন আফগানিস্তানের সিংহপুরুষ সৈয়দ মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন হুসায়নী আল-আফগানী। তিনি মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করতে বৈশ্বিক ইসলামিজম বা প্যান ইসলামিজমের আহ্বান জানান। তিনি জামালুদ্দিন আফগানী নামেই সমাধিক পরিচিত। 

পাশ্চাত্যদের সামরিক ও আর্থিক শক্তি এবং সার্বিক প্রভাব ব্রিটিশ শাসিত হিন্দুস্থান এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উপর সর্বগ্রাসী আকারে আপতিত। মুসলিমরা শুধু শোষিতই হচ্ছিল না বরং তাদের উপর পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, আদর্শ ও চিন্তাধারার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, ইসলামী আদর্শ ধরে রাখা বা বজায় রাখা দুষ্কর। জড়বাদী ও নাস্তিক্যবাদী মতবাদ এবং এর প্রভাব ইসলাম ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ডারউইনের মতবাদ ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ধ্বংস ও চরিত্র হননের কারণ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। এই দুঃসময়ে জামাল উদ্দিন আফগানী তার বক্তব্য ও লেখনীর দ্বারা মুসলিমদের পূনর্জাগরণের প্রচেষ্টা গ্রহন করেন। তার কর্মক্ষেত্র ছিল আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স। 

মুসলিম বিশ্বের আভ্যন্তরীণ দূর্বলতা দূর করার জন্য তিনি যেমন সচেষ্ট ছিলেন তেমনি পাশ্চাত্য শক্তির প্রভাব বলয় থেকে মুসলিম বিশ্বকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি চিন্তা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জাগরণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম দেশসমূহের পরাধীনতা থেকে মুক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য যা প্যান ইসলাম নামে বহুল পরিচিত। 

বৈদেশিক নিয়ন্ত্রন হতে মুক্তির জন্য ইরান, তুর্কি ও মিসরের যুবশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করেন। এই কাজ মোটেই সহজ ছিল না তার জন্য। প্রথমেই এই কাজের বিরোধীতা আসে আধিপত্যবাদের দোসর ও আপোষকামী এবং ইসলামী চেতনা বিবর্জিত মুসলিম শাসকদের পক্ষ হতে। এজন্য তাকে সংস্কার পরিপন্থী শাসকের বিরুদ্ধেও কথা বলতে হয়। তিনি একক খিলাফতের অধীনে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। তার এই আন্দোলনে তিনি যুগপৎ পাশ্চাত্য ইসলাম বিরোধী শক্তি এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কায়েমী স্বার্থপুষ্ট মহলের কোপানলে পতিত হন। এজন্য তিনি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন কেন্দ্র থেকে তার আন্দোলন চালানো এবং আদর্শ প্রচার করার সুযোগ পাননি। 

তারপরও তার ক্ষুরধার বক্তব্য যুবকদের আকৃষ্ট করে। তাঁর যুক্তি আদর্শ ও আধুনিক চিন্তাধারা সহজেই জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতো। মানব সমাজে ধর্মের গুরুত্ব এবং জড়বাদের অসারতা তিনি সহজেই মানুষের উপস্থাপন করতে পারতেন। তারা ভাষা জ্ঞানের যে পরিচিতি মিলে তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তিনি একই সাথে ইংরেজী, ফরাসী, আরবী, উর্দু, ফারসী ভাষায় সমান দক্ষ ছিলেন। সব ভাষায় তিনি বক্তব্য রাখতেন। 

তার আকীদা বিশ্বাস নিয়ে কোন বিতর্ক চলে না। এই বিষয়ে তিনি ছিলেন বিতর্কের উর্ধ্বে। যে ব্যাক্তি কায়রো, কাবুল, ইস্তাম্বুল, দিল্লী সর্বত্র ইসলামের দায়ি হতে পারেন, পৌঁছতে পারেন শিয়া মতে বিশ্বাসীদের উচ্চ দরবারে আবার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র বানাতে পারেন সুন্নীদের খলীফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ সহ অন্যান্য সুন্নী নেতাদের দরবারে তাকে শিয়া বা সুন্নী গন্ডির মধ্যে আটকানো যায় না। তিনি শিয়া-সুন্নী বিরোধ মেটাতে ছিলেন আন্তরিক। একক খিলাফতের যে ধারণা নিয়ে তিনি আদর্শ প্রচার করতেন তা সুন্নী ধারাকে সমর্থন করে। আবার তিনি ইমামতকে অস্বীকার করেছেন এমন প্রমান মিলে না। তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি কালেমার সূত্রকেই ঐক্যের ভিত ভেবেছেন। তাওহীদ এবং রাসূল সঃ এর আদর্শই ছিল তার সকল প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ধারা বিভক্তি, মাজহাব অত্যন্ত গৌণ। 

জামাল উদ্দিন কথিত সাধুপুরুষ ছিলেন না, ছিলেন না রাজনৈতিক নেতাও, তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান সংগঠক। যিনি কাজ করেছে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতাকামী মানুষ তৈরীতে, ইসলামে মূল শিক্ষা মুসলিমদের মধ্যে প্রসার ঘটাতে, অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দিতে, সর্বোপরি মুসলিমদের মধ্যে পূনর্জাগরণ ঘটাতে। 

তিনি মূলত পাঁচটি বিষয়কে লালন করতেন [১]

১- ইসলামের রসম রেওয়াজের উর্ধ্বে যে প্রাণশক্তি সেটাই তার কাছে অধিকতর মূল্যবান। অন্যকথায় বলতে গেলে প্রতিটি রসম রেওয়াজের উদ্দেশ্যকেই তিনি বেশী গুরুত্ব দিতেন। 

২- মুসলিম সমাজে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল চরম অন্যায় এবং আলেমগন এই রাজতন্ত্রকে সাপোর্ট করা ছিল মহাভুল এবং এর কারণের মুসলিমদের অধঃপতন ঘটছে। 

৩- ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরুপ তুলে ধরতে হবে জাতির সামনে। নইলে ইউরোপীয় ও জড়বাদী আগ্রাসন ঠেকানো যাবে না। আর পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না। 

৪- মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা অভিন্ন এবং সমাধানও অভিন্ন বলেই তিনি মনে করতেন। 

৫- মুসলিমদের মধ্যে চালু হওয়া কুসংস্কার, বিকৃতি তাকে আহত করতো। তিনি মনে করতেন এর সংস্কার না হলে বর্তমান মুসলিমদের মহানবী সঃ এর উম্মত বলা যাবে না। 

তিনি তাঁর বিশ্বাস নিয়ে কাজ করতেন। এক জায়গায় ব্যর্থ হলে অন্য যায়গায় গিয়ে আবার দাওয়াত দেয়া শুরু করতেন। এভাবে তিনি সারা পৃথিবীতে তার অনুসারি সৃষ্টি করেছেন। যার ভাবাদর্শে এখনো পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন। 

মুসলিম দেশসমূহ এবং মুসলমানদের অধঃপতনের জন্য তিনি তিনটি সমস্যা চিহ্নিত করেন।[২] 

প্রথমত, অনৈক্যঃ বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু অনৈক্যের কারণে তারা দ্বিধাভিবক্ত ও শক্তিহীন। তারা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে সেজন্য সাম্রাজ্যবাদের দোসররা মুসলিমদের মধ্যে পারষ্পরিক সন্দেহ, সংশয়, দ্বন্দ্বের প্রাচীর তৈরী করেছে। 

দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদঃ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বৈদেশিক শাসন ও প্রভাবকে তিনি মুসলিম সমাজের দুরাবস্থার জন্য দায়ী করেন। এদের বিরুদ্ধে সচেতন করা এবং ঐক্য গড়ার কাজ তিনি সারা জীবনব্যপী করেছেন। 

তৃতীয়ত, অশিক্ষা-কুশিক্ষাঃ মুসলিম সমাজে সঠিক শিক্ষার অভাব এবং কুসংস্কারের বিস্তারের কারণে তারা স্বধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যদের বর্বর ও পরিবার ধ্বংসকারী সংস্কৃতি তাদের কাছে হয়ে উঠে চকচকে। 

আফগানী তার একতা গ্রন্থে বলেছেন, ‘একথা বলছি না, সমগ্র মুসলিম দেশের উপর কোন একক ব্যক্তির আধিপত্য মেনে নেয়া হোক। এমন প্রস্তাব দুঃসাধ্য মনে করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি অবশ্যই চাইযে, এদের সবার উপর কুরআনী আহকামের আধিপত্য থাকুক এবং সবাই ইসলামকে নিজের ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে পরিণত করুক।’ [৩] 

তিনি আরো বলেছেন, ঐক্য ও নেতৃত্ব ইসলামী সুউচ্চ প্রাসাদের দুটি প্রধান স্তম্ভ। এগুলোকে অটুট রাখার জন্য চেষ্টা করা ইসলামের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ব্যক্তির উপর ফরয। [৪]

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, বেশীরভাগ দ্বীনি হুকুম জারী করা একটা সুসংগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। [৫]

তিনি তার যুগের মুসলিম উম্মাহর মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন ঐক্য না থাকায় এই সমস্যাগুলো হচ্ছে। দ্বিতীয় সমস্যা হলো সঠিক নেতৃত্বের। এছাড়াও জ্ঞানের অভাব, ভ্রাতৃত্ব এবং বীরত্বের কথাও বলেছেন। আফগানীর এই কথাগুলো আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। 

তথ্যসূত্রঃ 
১- জামাল উদ্দিন আফগানী, তথ্য সন্ত্রাসে আক্রান্ত এক কালজয়ী মহাপুরুষ/ মাসুদ মজুমদার
২- সৈয়দ জামাল উদ্দিন আফগানীঃ ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব/ মুহাম্মদ মতিউর রহমান। 
৩- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৪৩ 
৪- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৪৬ 
৫- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৫৩ 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন