১২ জুলাই, ২০১৭

বাবিলের হারূত ও মারূতের কাহিনী


ইরাকের বাবিল/ব্যাবিলন শহরে আল্লাহ তায়ালা দুইজন ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন যাদু শেখাতে। যাতে করে মানুষ মু'জিজা ও যাদুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। এই ব্যাপারটা সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াতে বর্ণিত আছে। এই দুইজন ফেরেশতার নাম হারূত আর মারূত। এই দুইজন নিয়ে আরো চমকপ্রদ ঘটনা আছে যা আমরা অনেকেই শুনেছি।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছেনঃ “যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর সন্তানেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অতঃপর তারা আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকে, তখন ফেরেশতাগণ পরষ্পর বলাবলি করেন- “দেখ এরা কত দুষ্ট প্রকৃতির লোক এবং এরা কতই না অবাধ্য! আমরা এদের স্থলে থাকলে কখনও আল্লাহর অবাধ্য হতাম না।

তখন আল্লাহ তা'আলা। তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্য হতে দু'জন ফেরেশতাকে নিয়ে এসো; আমি তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তার পরে দেখা যাক তারা কি করে।’ তারা তখন হারূত ও মারতকে হাজির করেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে বলেনঃ “দেখ, বানী আদমের নিকট তো আমি নবীদের মাধ্যমে আমার আহ্কাম পৌঁছিয়ে থাকি; কিন্তু তোমাদেরকে মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আমি বলে দিচ্ছি, আমার সাথে কাউকেও শরীক করবে না, ব্যভিচার করবে না, মদপান করবে না। 

তখন তারা দু'জন পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে আল্লাহ তা’আলা যুহরাকে একটি সুন্দরী নারীর আকারে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। তারা তাকে দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তার সাথে ব্যভিচার করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে বলেঃ "তোমারা শিরক করলে আমি সম্মত আছি।’ তারা উত্তর দেয়ঃ "এটা আমাদের দ্বারা হবে না।” সে চলে যায়। আবার সে এসে বলেঃ তোমরা যদি এই শিশুটিকে হত্যা কর তবে আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্মত হবো।” তারা ওটাও প্রত্যাখ্যান করে। সে আবার আসে এবং বলেঃ "আচ্ছা, এই মদ পান করে নাও। তারা ওটাকে ছোট পাপ মনে করে তাতে সম্মত হয়ে যায়। এখন তারা নেশায় উন্মত্ত হয়ে ব্যভিচারও করে বসে এবং শিশুটিকে হত্যা করে ফেলে।

তাদের চৈতন্য ফিরে আসলে ঐ স্ত্রীলোক তাদেরকে বলেঃ যে যে কাজ করতে তোমরা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলে তা সবই করে ফেলেছাে।” তারা তখন লজ্জিত হয়ে যায়। তাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি বা আখেরাতের শাস্তির যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার শাস্তি পছন্দ করে। সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদ-ই-আহমাদ, তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে এ হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের এ বর্ণনাটি গরীব। ওর মধ্যে একজন বর্ণনাকারী মুসা বিন যুবাইর আনসারী রয়েছে। ইবনে আবি হাতিমের (রঃ) মতে সে নির্ভরযোগ্য নয়। 

যুহরা ফেরেশতাদের সাথে শর্ত করে বলেছিলঃ “তোমরা আমাকে ঐ দো’আটি শিখিয়ে দাও যা পড়ে তোমরা আকাশে উঠে থাকো। তারা তাকে তা শিখিয়ে দেয়। সে এটা পড়ে আকাশে উঠে যায় এবং তথায় তাকে তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। কতকগুলো মারফু' বর্ণনায় এটা আছে। অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, এ ঘটনার পূর্বে তো ফেরেশতাগণ শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, কিন্তু এর পর তারা সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন।

কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, যখন এই ফেরেশতাদ্বয় হতে এ অবাধ্যতা প্রকাশ পায় তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ স্বীকার করেন যে, বানী আদম আল্লাহ পাক হতে দূরে রয়েছে এবং তাঁকে না দেখেই ঈমান এনেছে, সুতরাং তাদের ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐ ফেরেশতাদ্বয়কে বলা হয়ঃ “তোমরা দুনিয়ার শাস্তি গ্রহণ করে নাও, অথবা পরকালের শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাও।' তারা দু'জন পরামর্শ করে দুনিয়ার শাস্তিই গ্রহণ করে। কেননা, এটা অস্থায়ী এবং পরকালের শাস্তি চিরস্থায়ী। সুতরাং বাবিলে /ব্যবিলনে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।

ইবনে কাসীর তার তাফসীরে এই ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেছেন ওটা মুনকার ও বে-ঠিক। এটা ইসরাঈলীয়াত হতে পারে। তবে আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহর রাসূলের সঃ সময় সাহাবীরা আহলে কিতাবদের কাছ থেকে নানান ঘটনা শুনতো। নবী সঃ এর নবুয়্যত প্রাপ্তির আগেও এসব ঘটনা আরবে জনশ্রুতি ছিল। কিন্তু কোন সহীহ হাদীসে এসব ঘটনা আল্লাহর রাসূল থেকে বর্ণনা হয়নি। আমরা লোকমুখে প্রচারিত কোন ঘটনাকে সত্য হিসেবে ধরে নিতে পারি না। তাছাড়া এটা ইসলামের মূলনীতির সাথেও যায় না। আমরা যতটুকু ঘটনা কুরআন ও রাসূল সঃ এর কাছ থেকে জানতে পারবো ততটুকুতেই বিশ্বাস রাখবো। 

হারূত-মারূতের ঘটনাঃ  

প্রথমেই আমরা জেনে নিই এই প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কী ইতিহাস জানিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, অর্থাৎ আর তারা এমন সব জিনিসের অনুসরণে মেতে ওঠে, যেগুলো শয়তানরা পেশ করতো সুলাইমানী রাজত্বের নামে। অথচ সুলাইমান (আঃ) কোন দিন কুফরী করেননি। কুফরী করেছে সেই শয়তানরা, যারা লোকদেরকে যাদু শেখাত। তারা বাবিল শহরে দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল তা আয়ত্ব করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। অথচ তারা (ফেরেশতারা) যখনই কাউকে এর শিক্ষা দিতেন, তাকে পরিষ্কার ভাষায় এই বলে সতর্ক করে দিতেন যে, সাবধান! আমরা নিছক একটি পরীক্ষা মাত্র, খবরদার! তুমি কুফরীতে লিপ্ত হইও না। এরপরও তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিখতো, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এনে দিত। একথা সত্য যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া এ পন্থায় তারা কাউকে ক্ষতি করতে পারত না। কিন্তু এ সত্ত্বেও তারা এমন জিনিস শিখত যা তাদের নিজেদের জন্য লাভজনক ছিল না বরং ক্ষতির কারণ ছিল। তারা ভালো করেই জানত, তারা যা ক্রয় করেছে (এ কাজগুলো করার মাধ্যমে) তাদের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। কতই না নিকৃষ্ট জিনিসের বিনিময়ে তারা বিকিয়ে দিল নিজেদের জীবনকে!! হায়, যদি তারা একথা জানতো!
-(সুরা বাকারা:১০২)

এই আয়াত থেকে আমরা যা পাই... 

১- বনী ইসরাঈলের লোকেরা সুলাইমান আঃ এর মৃত্যুর পর যাদু নামক শয়তানী কর্মকান্ডে নিমজ্জিত হয়েছিল।
২- আর এই যাদু তারা প্রচার করতো নবী সুলাইমান আঃ এর নামে। তারা প্রচার করতো সুলাইমান আঃ নিজেই যাদুকর ছিলেন।
৩- আল্লাহ সুলাইমান আঃ কে নিষ্কলুষ এবং নিরাপরাধ ঘোষনা করেন।
৪- কুফরি করেছে শয়তানেরা।
৫- বাবিল শহরে আল্লাহ তায়ালা দুজন ফেরেশতা পাঠিয়েছেন।
৬- তারা ছিল পরীক্ষাস্বরুপ। তারা যাদু শিক্ষা দিত কিন্তু সাথে সাথে সতর্ক করে দিত। 
৭- বনী ইসরাঈলের লোকেরা যাদু দিয়ে খারাপ কাজ করতো। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এনে দিত।
৮- এই কাজ ছিল তাদের জন্য ক্ষতির কারণ।

কেন হারূত মারূতকে পাঠানো হয়েছিল? 

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নিকট একটি আংটি ছিল। টয়লেটে গেলে তিনি ওটা তার স্ত্রীর নিকট রেখে যেতেন। হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর পরীক্ষার সময় এলে একটি শয়তান জীন তার রূপ ধরে তাঁর স্ত্রীর নিকট আসে এবং আংটি চায়। তা তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সে তা পরে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনে বসে যায়। সমস্ত জীন, মানব ও শয়তান তার খিদমতে হাজির হয়। সে শাসন কাৰ্য চালাতে থাকে। এদিকে হযরত সুলাইমান (আঃ) ফিরে এসে তাঁর স্ত্রীর নিকট আংটি চান। তাঁর স্ত্রী বলেনঃ “তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি সুলাইমান (আঃ) নও। সুলাইমান (আঃ) তো আংটিটি নিয়েই গেছেন।”
হযরত সুলাইমান (আঃ) বুঝে নেন যে, এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর পরীক্ষা। এ সময়ে শয়তানরা যাদু বিদ্যা, জ্যোতিষ বিদ্যা এবং ভবিষ্যতের সত্য-মিথ্যা খবরের কতকগুলো কিতাব লিখে এবং ওগুলো হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর সিংহাসনের নীচে পুঁতে রাখে। হযরত সুলাইমান (আঃ) । এর পরীক্ষার যুগ শেষ হলে পুনরায় তিনি সিংহাসন ও রাজপাটের মালিক হয়ে যান। স্বাভাবিক বয়সে পৌঁছে যখন তিনি রাজত্ব হতে অবসর গ্রহণ করেন, তখন শয়তানরা জনগণকে বলতে শুরু করে যে, হযরত সুলাইমানের (আঃ) ধনাগার এবং ঐ পুস্তক যার ক্ষমতাবলে তিনি বাতাস ও জীনদের উপর শাসনকার্য চালাতেন তা তাঁর সিংহাসনের নীচে পোঁতা রয়েছে। জীনেরা ঐ সিংহাসনের নিকটে যেতে পারতো না বলে মানুষেরা ওটা খুঁড়ে ঐ সব পুস্তক বের করে। সুতরাং বাইরে এর আলোচনা হতে থাকে এবং প্রত্যেকেই এ কথা বলে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের রহস্য এটাই ছিল। এমনকি জনগণ হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নবুওয়াতকেও অস্বীকার করে বসে এবং তাকে যাদুকর বলতে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা সেসময় হারূত ও মারূতকে বনী ইসরাঈলের নিকট পাঠান। তারা যাতে যাদু ও মু'জিজার মধ্যে পার্থক্য বুঝাতে পারে। এটাও জানানোর জন্য যে, যাদু শুধুমাত্র একটা কৌশল এবং যে কেউ তা আয়ত্ব করতে পারে।

সংক্ষিপ্ত করলে জানা যায় হারূত মারূতের পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো
১- "সুলাইমান আঃ একজন বড় যাদুকর ছিলেন" শয়তানদের এমন মিথ্যা দাবী খন্ডন করার জন্য।
২- মু'জিজা ও জাদুর মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে মু'জিজা ও জাদু উভয়ের বৈশিষ্ট্য জানা জরুরী। কিন্তু, মানুষের কাছে জাদুর বৈশিষ্ট্য অজানা ছিল। তাই, তাদেরকে জাদুর বৈশিষ্ট্য শেখানোর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।
৩- মানুষকে আল্লাহমুখী ও তাওহীদপন্থী করার জন্য পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু যারা শয়তান তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না। তারা কোন ভালো উপদেশবানীকেও খারাপ কাজে ব্যবহার করে। এই ধরণের মানুষ সেসময় যেমন ছিল এখনও আছে। আজও বহু মানুষ কুরআন দিয়ে এসব অনাচার করে অথচ কুরআন নাজিল হয়েছে এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য।

যুহরা ও ফেরেশতাদ্বয়ের কাহিনীর অসারতা   

১- কুরআনে বর্ণিত ঘটনার সাথে মিল নেই। এই ধরণের ঘটানার কোন ইঙ্গিতও নেই।
২- আল্লাহর রাসূল সঃ এই যুহরার সম্পর্কে কোন কথা বলেছেন এমন সহীহ রেওয়ায়েত নেই।
৩- এই ঘটনাকে বিখ্যাত তাফসীরকারকগণ মুনকার বলে উল্লেখ করেছেন।
৪- ফেরেশতাগণ সমস্ত প্রকার গুণাহ থেকে পবিত্র। ফেরেশতারা কখনোই আল্লাহর অবাধ্য হন না। হতে পারেন না। (দ্রঃ সূরা তাহরিম-৬ এবং সূরা আম্বিয়া-১৯,২০)
৫- গল্পটিতে বলা আছে, "দুনিয়া এবং আখিরাতের শাস্তির মধ্যে একটি বেছে নিতে" এটাও গ্রহনযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা বেছে নিতে বললে বলার কথা তাওবা এবং শাস্তি। আর দুনিয়া তো বিচারের জায়গা নয়, পরীক্ষার জায়গা। বিচার হবে আখিরাতে।

এই প্রসঙ্গে রাসায়েল মাসায়েলে মাওলানা মওদুদী বলেছেন,
এ গল্পটি কিছু পুস্তকে লেখা থাকলেও সরাসরি রসূল সা.-এর মুখ থেকে কেউ শুনেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় না। হাফিয ইবনে কাসীর, অধ্যাপক আহমদ মুহাম্মদ শাকের, সাইয়েদ রশীদ রেজা এবং অন্যান্য বিজ্ঞজন এর বিস্তারিত সমালোচনা করেছেন। আসলে এ কিসাসটি প্রধানত কা'ব আহবার থেকে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যমে অনেক ইহুদি কল্পকাহিনী আমাদের ইতিহাস ও তাফসীরের গ্রন্থাবলীতে ঢুকে গেছে। অথচ এ সবের আদৌ কোনো ভিত্তি নেই। এ কিসসা তাওরাত বা অন্যান্য লিখিত ইহুদি সাহিত্যেও নেই।

পবিত্র কুরআন থেকে এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, ফেরেশতারা আল্লাহর কোনো হুকুম লংঘন করতে পারেননা। একথা সত্য যে, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে এমন কাজের নির্দেশ দিতে পারেন, যা মানুষের জন্য শাস্তি বা পরীক্ষার রূপ ধারণ করে। কিন্তু তারা আল্লাহর কোনো আদেশের বিরুদ্ধাচরণ বা নৈতিক দিক দিয়ে কোনো অশালীন কাজ করতে পারেন- এটা অকল্পনীয় কেননা তারা প্রকৃতিগত ভাবেই নিষ্পাপ এবং যৌন আবেদন থেকে মুক্ত। তাদের মধ্যে সন্তান প্রজনন বা বংশ বিস্তারের ধারাও চালু নেই। তবু ধরে নেয়া হয় যে, খোদা না করুন, তাদের কারো দ্বারা এমন গুরুতর নাফরমানী হতো এবং সে জন্য এমন কঠিন সাজা দেয়া হতো, তহলে কুরআনে তার উল্লেখও থাকতো।

হাদীসের নামে জালিয়াতী গ্রন্থে ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন,
এ বিষয়ক অনেক গল্প কাহিনী হাদীস নামে বা তাফসীর নামে তাফসীরের গ্রন্থগুলিতে বা সমাজে প্রচলিত। কাহিনীটির সারসংক্ষেপ হলো, মানবজাতির পাপের কারণে ফিরিশতাগণ আল্লাহকে বলেন, মানুষের এত অপরাধ আপনি ক্ষমা করেন কেন বা শাস্তি প্রদান করেননা কেন? আল্লাহ তাদেরকে বলেন, তোমরাও মানুষের প্রকৃতি পেলে এমন পাপ কাজ করতে। তারা বলেন, কক্ষনো না। তখন তারা পরীক্ষার জন্য হারূত ও মারূত নামক দুইজন ফিরিশতাকে নির্বাচিত করেন। তাদেরকে মানবীয় প্রকৃতি প্রদান করে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। তারা যোহরা নামক এক পরমা সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়ে মদপান, ব্যভিচার ও নরহত্যার পাপে জড়িত হন। পক্ষান্তরে যোহরা তাদের নিকট মন্ত্র শিখে আকাশে উড়ে যায়। তখন তাকে একটি তারকায় রূপান্তরিত করা হয়। এই গল্পগুলি মূলত ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনীমালা। তবে কোনো কোনো তাফসীর গ্রন্থে এগুলি হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ক সকল হাদীসই অত্যন্ত দুর্বল ও জাল সনদে বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস বিভিন্ন সনদের কারণে কয়েকটি বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন। অনেক মুহাদ্দিস সবগুলিই জাল ও বানোয়াট বলে মত দিয়েছেন।

আল্লামা কুরতুবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস ও মুফাসসির উল্লেখ করেছেন যে, এ সকল গল্প ফিরিশতাগণ সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বাসের বিপরীত। ইহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য অনেক ধর্মে ফিরিশতাগণকে মানবীয় প্রকৃতির বলে কল্পনা করা হয়। তাদের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্তশক্তি আছে বলেও বিশ্বাস করা হয়। ইসলামী বিশ্বাসে ফিরিশতাগণ সকল প্রকার মানবীয় প্রবৃত্তি, নিজস্ব চিন্তা বা আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদের প্রবৃত্তি থেকে পবিত্র। তাঁরা মহান আল্লাহকে কিছু জানার জন্য প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা আল্লাহর কোনো কর্ম বা কথাকে চ্যালেঞ্জ করবেন এরূপ কোনো প্রকারের প্রকৃতি তাদের মধ্যে নেই। কাজেই এ সকল কাহিনী ইসলামী আকীদার বিরোধী।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আল্লাহর নাফরমানী এবং রাসূল সঃ এর নামে বানোয়াট কথা বলা ও ছড়ানো থেকে রক্ষা করুন।

সহায়ক গ্রন্থ
১- তাফসীরে ইবনে কাসীর
২- তাফহীমুল কুরআন
৩- রাসায়েল মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
৪- হাদীসের নামে জালিয়াতী 

৫টি মন্তব্য:

  1. জাযাকাল্লাহ, আশাকরি এর ধারাবাহিকতা অব্যহত থাকবে

    উত্তরমুছুন
  2. মায়া শা আল্লাহ। অনেক কিছু জানলাম। আল্লাহ লেখকের মেধাকে আরো প্রসারিত করুন।

    উত্তরমুছুন
  3. আসসালামুআলাইকুম ও... ভাই আপনার ব্লগ সবসময় কি ভাবে পড়তেপারি?

    উত্তরমুছুন