১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-১৩ : বাংলায় ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন ও গণেশের উত্থান



বাংলার ধারাবাহিক ইতিহাস নিয়ে 'বঙ্গকথা' নামে একটা সিরিজ লেখা লিখছিলাম। কিন্তু নানান ব্যস্ততায় গত দু'মাস লিখতে পারিনি। আজ আবার চেষ্টা করেছি। গত পর্বে আমরা স্বাধীন বাংলার প্রথম সুলতান ইলিয়াস শাহকে নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজ তারপর থেকে শুরু করতে চাই।

১৩৫৮ সালে সুলতান শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহ মৃত্যুবরণ করলে তার সুযোগ্য পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাসে দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন। দীর্ঘ ৩৫ বছরের শাসনে তিনি বাংলার মুসলিম শাসনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন।

তার শাসনামলে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা জয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাক্তন শাসক ফখরুদ্দিন মোবারক শাহর জামাতা পারস্য বংশোদ্ভূত ব্যক্তি জাফর খান ফারস বাংলা থেকে পালিয়ে দিল্লী পৌছান। ফিরোজ শাহ তাকে বাংলার ন্যায়সঙ্গত শাসক বলে ঘোষণা করেন। তার প্ররোচণায় ১৩৫৯ সালে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৪৭০ হস্তী ও বড় আকারের পদাতিক বাহিনীর বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সেনাবাহিনীকে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। পিতার মত সিকান্দার শাহও একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। ফিরোজ শাহ প্রাসাদ অবরোধ করেন। শেষপর্যন্ত ফিরোজ শাহ বাংলা থেকে তার বাহিনী ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন এবং সিকান্দার শাহর সাথে সন্ধি করেন। প্রকৃতঅর্থে ফিরোজ শাহের দ্বিতীয় অভিযানও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর ফলে সিকান্দার শাহ স্বাধীনভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ শাসন করেন।

সুলতান সিকান্দার শাহ করিতকর্মা ও প্রজাবৎসল শাসক ছিলেন। তিনি দায়ি, সুফী ও দরবেশদের শ্রদ্ধা করতেন। তার শাসনামলের উজ্জ্বল কীর্তি হযরত পান্ডুয়ার বিখ্যাত আদিনা মসজিদ। প্রায় দশ বছর ধরে [১৩৭৪-৮৪] এই মসজিদ নির্মিত হয়। এটি বাঙালিদের কাছে পৃথিবীর আশ্চর্যতম ইমারত ছিল। পাথর ও পোড়া মাটির নকশাকরা এই বৃহৎ মসজিদটি বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের অনবদ্য দৃষ্টান্ত। এছাড়া ১৩৬৩ খৃস্টাব্দের দিকে সিকান্দার শাহ দিনাজপুরের দেবকোটে মোল্লা আতার দরগাহে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তার রাজদরবারে বহু সুফী, দরবেশের সমাগত ঘটে। এদের মধ্যে শেখ আলাউল হক ও শেখ সরফউদ্দীন ইয়াহিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রজাহিতৈষী ও সুশাসক সুলতান সিকান্দার শাহের শেষ জীবন সুন্দর ছিলো না। সিকান্দার শাহের দুই স্ত্রী ছিল। ১ম স্ত্রীর ছিলো ১৭ জন পুত্র ছিলো আর দ্বিতীয় স্ত্রীর একজন পুত্র ছিলো। সেই পুত্র গিয়াসউদ্দীন বিমাতার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। গিয়াস উদ্দিন শাসনকার্যে ও যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। সেই কারণে সিকান্দার শাহ তাকেই পরবর্তী শাসক নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বিমাতা তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুললেন ও সিকান্দার শাহকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। অবশেষে গিয়াস উদ্দিন রাজধানী পান্ডুয়া ত্যাগ করে সোনারগাঁয়ে চলে যান। সেখানে তিনি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সিকান্দার শাহও একটি সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে পুত্রের মোকাবিলা করলেন। ১৩৯৩ খৃস্টাব্দে গোয়ালপাড়ায় পিতা-পুত্রের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং যুদ্ধে সুলতান সিকান্দার শাহ পুত্র গিয়াসউদ্দীনের কাছে পরাজিত হন।

গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ নামধারণ করে বাংলার শাসন ক্ষমতায় আসে। তিনি ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ সাল পর্যন্ত শাসন করেছেন। রাজ্যের বিস্তৃতির চেয়ে তিনি রাজ্যকে সুদৃঢ় করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। তিনি তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকে শুধু কামরূপে অভিযান করে তা দখল করেন এবং কামরূপের উপর কয়েক বছর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ তাঁর আদর্শ চরিত্র, শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা এবং সুশাসনের জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। আইনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তার বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকরা কাজীর কাছে মামলা করার অধিকার রাখতো। তার বিরুদ্ধে বলার মতো অভিযোগ হলো তিনি তার পিতা ও সৎ ভাইদের শাস্তি দিয়েছেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ নিজে বিদ্বান ও কবি ছিলেন। তিনি বিদ্বান লোকদের খুব সমাদর করতেন। মাঝে মাঝে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। একবার তিনি হাফিজের নিকট কবিতার একটি চরণ লিখে পাঠান এবং কবিতাটিকে পূর্ণ করার জন্য কবিকে অনুরোধ জানান। তিনি তাঁকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণও জানান। হাফিজ দ্বিতীয় চরণটি রচনা করে কবিতাটি পূর্ণ করে পাঠান। তিনি সুলতানের নিকট একটি গজলও লিখে পাঠান। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ বাংলা সাহিত্যের উন্নতির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ মুহম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘ইউসুফ জোলেখা’ রচনা করেন।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ তাঁর পিতা (সুলতান সিকান্দার শাহ) ও পিতামহের (সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ) মতোই আলেম ও সুফিদের অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বিদ্বান ও ধার্মিকদের উদার পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে শেখ আলাউল হক ও নূর কুতুব আলম খুবই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি বিহারের শেখ মুজাফফর শামস বলখীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। মুজাফফর শামস বলখীর সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। তিনি পবিত্র মক্কা ও মদীনার তীর্থযাত্রীদের সব ধরনের সাহায্য দিতেন। তিনি একাধিকবার মক্কা ও মদীনা শহরের অধিবাসীদের জন্য প্রচুর উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন। তিনি ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের জন্য বাংলায় প্রচুর মাদরাসা ও খানকাহ স্থাপন করেছেন। এছাড়া মক্কার উম্মে হানির ফটকে একটি এবং মদীনার ’বাব আল-সালামে’র (শান্তির দ্বার) নিকটে অপর একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করান। এ প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য তিনি প্রয়োজনীয় অর্থও প্রদান করেন। এ দুটি মাদ্রাসা ’গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত। তিনি আরাফায় পানির বন্দোবস্তের জন্য ত্রিশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রেরণ করেন।

বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য গিয়াসউদ্দীন বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকবার মক্কা ও মদীনায় দূত পাঠিয়েছিলেন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ জৌনপুরের সুলতান খাজা জাহানের নিকট দূত প্রেরণ করেন এবং উপঢৌকন স্বরূপ তাঁকে কয়েকটি হাতিও পাঠান। তিনি সমসাময়িক চীন সম্রাট ইয়ংলোর সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে চীনে দূত পাঠিয়েছিলেন। চীন সম্রাট দূতদেরকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান এবং প্রতিদানে তিনিও বাংলার সুলতানের নিকট দূত ও উপঢৌকন প্রেরণ করেন।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, তাঁর সময় হিন্দুরা তাঁর দরবারে বেশ প্রাধান্য লাভ করে ছিল। এর ফলে ভাতুরিয়ার বর্তমান দিনাজপুরের জমিদার রাজা গণেশের উত্থান ঘটে। ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ এর মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় রাজা গণেশ সুলতানকে হত্যা করে। রাজা গণেশ পনের শতকের প্রারম্ভে ইলিয়াস শাহী বংশের দুর্বল সুলতানের নিকট থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলার রাজা হন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে ফিরুজাবাদের (পান্ডুয়া) ইলিয়াসশাহী রাজদরবারে যেসকল অমাত্য প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, গণেশ তাদের অন্যতম। তিনি সাইফুদ্দীন হামজাহ শাহ, শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে বাংলার রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা পালন করেন এবং কম করে হলেও চার বছর (১৪১০-১৪১৪) রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতা তার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি রাজ্যের শাসন কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করেন এবং বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক গোলযোগের সুযোগে আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহকে হত্যা করে ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সিংহাসন দখল করে।

গণেশের বাংলার সিংহাসনে আরোহণ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও গভীর ষড়যন্ত্রের ফল। গণেশ ও তার সমমনা হিন্দু সামস্তবর্গ বাংলায় মুসলমানদের শাসন মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। যদিও বিগত দুই শতকের ইতিহাসে মুসলিম শাসকগণ কর্তৃক অমুসলমানদের প্রতি কোনপ্রকার উৎপীড়নের নজীর পাওয়া যায়না, তারপরও মুসলিম শাসনকে তারা হিন্দুজাতির জন্যে চরম অবমাননাকর মনে করতো। তাই গণেশ সিংহাসনে আরোহণ করার পর মুসলিম নির্মূলে আত্মনিয়োগ করেন। এভাবে মুসলমানদের প্রতি তার বহুদিনের পুঞ্জিভূত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

ইসলাম প্রচারক শায়খ বদরে ইসলাম এবং তাঁর পুত্র ফয়জে ইসলাম গণেশকে অবনত মস্তকে সালাম না করার কারণে তিনি উভয়কে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, বহু মুসলমান ওলী দরবেশ, মনীষী, পন্ডিত ও শাস্ত্রবিদকে গণেশ নির্মমভাবে হত্য করেন। মুসলিম নিধনের এ লোমহর্ষক কাহিনী শ্রবণ করে শায়খ নূর কুতুবে আলম মর্মাহত হন এবং জৌনপুরের গভর্ণর সুলতান ইব্রাহীম শর্কীকে বাংলায় আগমনের আহ্বান জানান। সুলতান ইব্রাহীম বিরাট বাহিনীসহ বাংলা অভিমুখে যাত্রা করে ফিরোজপুরে শিবির স্থাপন করেন। রাজা গণেশ জানতে পেরে ভীত হয়ে কুতুবে আলমের শরণাপন্ন হন এবং নিজেকে মুসলিম দাবী করেন। শুধু তাই নয় তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেন তার পুত্র যদুর কাছে। যদু ইতিমধ্যে মুসলিম হয়ে জালাল উদ্দিন নামধারণ করেছেন।

শায়খ নূর কুতুবে আলম গণেশের এই চালাকি ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি সুলতান ইবরাহীম শর্কিকে ফেরত যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। ইবরাহীম শর্কি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফেরত চলে যান। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর মাত্র গণেশ জালালউদ্দীনের নিকট থেকে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। গণেশ সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার পর সুবর্ণধেনু অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মচ্যুত যদুর শুদ্ধিকরণ ক্রিয়া সম্পাদন করে। অর্থাৎ একটি নির্মিত সুবর্ণধেনুর মুখের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে তার মল ত্যাগের দ্বার দিয়ে হিন্দু শাস্ত্রের বিশেষ ধর্মীয় পদ্ধতিতে বহির্গত হওয়াই হলো শুদ্ধিকরণ পদ্ধতি। এই শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানের পর গণেশ দেশ থেকে মুসলমানদের মূলোৎপাটনের কাজ পুনরায় শুরু করে। সে পূর্বের চেয়ে অধিকরত হিংস্রতার সাথে মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকেন। সে কুতুবে আলমের পুত্র শায়খ আনওয়ারকে হত্যা করে ও পৌত্র শায়খ জাহিদকে নির্বাসনে পাঠায়। যদু প্রকৃত অর্থেই মুসলিম হয়েছিলেন। তিনি তার পিতার অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। নরহত্যার অভিযোগে তিনি তার পিতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন