৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

গাজী খান জাহানের ক্যান্টনমেন্টে একদিন



বন্ধুবর মঈন সাহেবের বিয়ে। খুলনায় যেতেই হবে। তার একদিন পর আবার আরেক কলিগের বিয়ে সাতক্ষীরায়। সেখানেও যেতে হবে। এদিকে পকেট প্রায় ফাঁকা। কী যে করি! সুন্দরবনে যাবো অনেক দিন ধরেই ভাবছি। তবে নানান প্রতিবন্ধকতায় সুন্দরবনে যাওয়া হয়নি। যাই হোক পকেটের অংকের সাথে জরুরী প্রয়োজনের হিসেব কোনদিনেই মিলে না।

অবশেষে প্ল্যান করলাম খুলনা-সাতক্ষীরা থেকে ঘুরে আসে। সাথে বাগেরহাট ও সুন্দরবনও একনজর দেখে আসি।

একজন দুজন করে সাতজন জুটে গেলো। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ফোরকাস্ট করলো আগামী কয়েকদিন শীত বেড়ে যাবে, কুয়াশা হবে প্রচুর, শৈত্যপ্রবাহ সাথে বৃষ্টিও থাকবে।

রাতে রওনা হলাম। পরদিন দুপুরে বিয়ে। যেহেতু আবহাওয়া সুবিধের না, ভেবেছি আমাদের পৌঁছাতে সকাল গড়িয়ে যাবে। বাসে উঠে গল্প-গুজব শেষ করে যেই চোখটা একটু লেগে আসলো তখনই মাওয়া ঘাটে আমাদের বাস থকে নামিয়ে ফেরিতে উঠানো হলো। ফেরিতে বসা পরের কথা দাঁড়ানোরও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। অবশেষে পদ্মা নদীর ঐ পাড়ে পৌঁছলাম।

ভোগান্তি ছাড়াই ঐ পাড়ে দাঁড়ানো কানেক্টিং বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লাম। এই সময় এক সহযাত্রীর হাঁক ডাকে ঘুম টুটে গেলো। সে আমাদের সবাইকে চিৎকার করে জানালো গাড়ি খুলনা শহর পার হয়ে চলে যাচ্ছে। তখনো সুবহে সাদিকও হয়নি। শিরোমনি বাজারে নামলাম। সেখান থেকে আবার সোনাডাঙায় ফেরত এলাম। ঘুমে থাকার কারণে কিছু টাকা খরচ হলো। কিন্তু খরচেই চাইতেই যেটা বেশি গায়ে লেগেছে তা হলো ঠান্ডা। সোনাডাঙা বাস স্টেশনে ফেরত আসতে গিয়ে জমে গেছি।

নামাজ ও নাস্তা শেষ করে রওনা হলাম বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদের উদ্দেশ্যে। প্রথমে গেলাম গাজী খান জাহান আলীর মাজারে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যেসকল ওলী-আউলিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে স্মরণীয় একটি নাম হযরত খান জাহান আলী (র)। একাধারে তিনি ছিলেন একজন যোদ্ধা, সাধক, ধর্ম প্রচারক ও সুশাসক। জীবনের একটা বিশাল সময় তিনি ব্যয় করেন ইসলামের সেবায়। দক্ষিণবঙ্গে খান জাহান আলী খলিফাতাবাদ নামে ইসলামী শাসন চালু করেন। খান জাহান আলীর প্রকৃত জন্ম তারিখ জানা যায় না। তিনি প্রায় ৪০ বছর দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম প্রচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

হজরত খান জাহান আলী (রহ.) ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি। খান জাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লির বিখ্যাত অলি ও কামেল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন।

খান জাহান আলী ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের গভর্ণর পদে যোগ দেন। পরবর্তী জীবনে নানা ধাপ পেরিয়ে জৈনপুর থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশে আগমন করেন। তার এই বাহিনীতে কয়েকজন সূফি ও প্রকৌশলী ছিল। তিনি তদানীন্তন বাংলার রাজধানীর দিকে না যেয়ে সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে আসেন এবং এখানে ইসলামী শাসন কায়েম করেন।

তিনি এই বৃহৎ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। নোনা পানির এই অঞ্চলে মিঠা পানির ব্যবস্থা করেন অসংখ্য বিশাল বিশাল দীঘি খনন করে, যার অনেকই খাঞ্জালির দীঘি নামে পরিচিত। অনেক রাস্তা-ঘাট, বাজার, সরাইখানা (হোটেল) নির্মাণ করেন। তার নির্মিত রাস্তা খাঞ্জালির জাঙ্গাল নামে অভিহিত। তিনি এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা ও খানকাহ স্থাপন করেন।
খান জাহান আলী (রহ.) এই অঞ্চলে পাথরের তৈরি মসজিদ নির্মাণ করেন। দূর-দূরান্ত থেকে পাথর নিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে অনেক কিংবদন্তি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এখনও শোনা যায়।

খান জাহান আলীর আগমনকালে দক্ষিণবঙ্গের বেশিরভাগ জায়গা ছিল বনাঞ্চল। বন-জঙ্গল সাফ করে তিনি ও তার অনুসারীরা দক্ষিণবঙ্গকে বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। পুরো দক্ষিণাঞ্চল একরকম তার রাজ্য ছিল। কোনো বাধা ছাড়াই এই এলাকা তিনি শাসন করতে থাকেন। জনগণও তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। তবে আঞ্চলিক শাসক হলেও প্রকট শাসকসুলভ জীবনযাপন কখনোই করেননি খান জাহান আলী। স্বাধীন বাদশাহদের মতো তিনি চলতেন না। এমনকি নিজের নামে কোনো মুদ্রার প্রচলনও তিনি করেননি। এছাড়া গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময় তার সনদ নিয়ে দক্ষিণবঙ্গ শাসন করেছেন তিনি। খান জাহান আলীর মৃত্যুর পরে তার প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদেই গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক টাকশাল। পরবর্তী ৪০/৫০ বছর এই টাকশাল থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রা তৈরি হতো। বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল তার দরবারগৃহ। ষাট গম্বুজ মসজিদ হতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল খান জাহান আলীর বসতবাড়ি। এখন সেটির কোনো অস্তিত্বই নেই, সেটি আসলেই দুর্বল স্থাপনা ছিলো অথচ তার পাবলিক স্থাপনাগুলোর ভিত ছিলো শক্তিশালী। যেগুলো এখনো বর্তমান।

খান জাহান আলী তার দীর্ঘ শাসনামলে এই অঞ্চলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। প্রায় ২০/২৫টি গ্রাম নিয়ে তার রাজধানী খলিফাতাবাদ গড়ে উঠেছিল। এখানে তিনি থানা, কাচারি, বিভিন্ন সরকারী দফতর, বিচারালয়, সেনানিবাস ইত্যাদি নির্মাণ করেন। প্রশাসনিক সুবিধার্থে দক্ষিণবঙ্গকে তিনি ভাগ করেন কয়েকটি ভাগে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন সুশাসন। তার এই ছোটখাট রাজ্যে তিনি কায়েম করেন ইসলামী হুকুমত। খলিফাতাবাদ বা বাগেরহাট এলাকায় ইসলাম প্রচারের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুদের বাধার সম্মুখীন হন খান জাহান আলী। তাদের বিরোধিতার কারণে ঐ এলাকার রণবিজয়পুর, ফতেহপুর, পিলঙ্গজ প্রভৃতি স্থানে হিন্দুদের সাথে যুদ্ধ হয় মুসলিমদের। খান জাহান আলী তাদের পর্যুদস্ত করে নিজের শাসনক্ষমতা কায়েম করতে সমর্থ হন।

প্রায় ৪০ বছর স্বাচ্ছন্দ্যে দক্ষিণবঙ্গে রাজত্ব করেন খান জাহান আলী। এই পুরো এলাকায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন এই মহান সাধক। তাঁর সুশাসন ও বিনয়ী স্বভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে এই এলাকার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। জীবনের শেষ দিনগুলো দরগায় বসে আল্লাহর ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন তিনি। অনেক মূল্যবান বাণী তিনি দিয়ে যান নিজের প্রজ্ঞা ও সাধনালব্ধ জ্ঞান থেকে। এই মহান শাসক ও ধর্ম প্রচারক ৮৬৩ হিজরীর ২৬ জিলহজ্জ, ইংরেজি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

খান জাহান আলীর মাজার সংশ্লিষ্ট বিশাল দিঘী যা ঠাকুরদিঘী নামে পরিচিত সেখানে খান জাহান একজোড়া কুমির ছেড়েছিলেন। কথিত আছে এই কুমির জোড়া তার বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই কুমিরের বংশধররা সাতশ বছর ধরে কালাপাহাড় এবং ধলাপাহাড় নামে ছিল। তাদের সর্বশেষ বংশধর ২০১৫ সালে মারা গিয়েছে। এই কুমিরগুলোর ব্যতিক্রম হলো এরা কখনোই হিংস্রতা দেখায়নি। একেবারেই শান্ত ছিলো। মানুষ তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতো। এখনো সেই দিঘীতে কুমির আছে। তাদের পরে এনে ছাড়া হয়েছে এখানে। এরা শুরুতে কিছুটা হিংস্র থাকলেও এখন শান্ত আচরণ করে। তবে তারা আগের কুমিরদের মতো মানুষবান্ধব নয়।

গাজী খান জাহান আলী রহ. -এর মাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেই আছে তাঁর অফিস ও ক্যান্টনমেন্ট। এখান থেকেই তিনি খলিফতাবাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। আমরা মাজার পরিদর্শন করে ওনার অফিস পরিদর্শনের জন্য বের হলাম। যা ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। দশটাকা করে ভাড়া দিয়ে ষাট গম্বুজে যাওয়ার জন্য ব্যাটারি চালিত টমটম আছে। যদিও ষাট গম্বুজ মসজিদ বলা হয় তবে এর গম্বুজ সংখ্যা ৮১ টি। মসজিদের ছাদে ৭৭ টি গম্বুজ। চারটি মিনারের উপর চারটি। সবমিলিয়ে ৮১ টি।

আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। তবে সাধারণভাবে মসজিদটিতে একাশিটি গম্বুজ পরিলক্ষিত হয়। নামকরণের ব্যাপারে দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ মসজিদ হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু সময় পরিক্রমায় এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুসারে, মসজিদের বিশাল গম্বুজ-ছাদের ভারবহনকারী মসজিদ অভ্যন্তরের ষাটটি স্তম্ভ সম্ভবত একে ‘ষাট খামবাজ’ (খামবাজ অর্থ স্তম্ভ) হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। এটি অসম্ভব নয় যে, এই ‘খামবাজ’ শব্দটিই পরবর্তীকালে বিকৃতরূপে ‘গম্বুজ’-এ পরিণত হয়ে মসজিদটিকে ষাটগম্বুজ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্ভবত বেশি গ্রহণযোগ্য। নামকরণের এই ব্যাখ্যা বাংলাপিডিয়ার।

খানজাহান (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ষাট গম্বুজ মসজিদ। পিরোজপুর-রূপসা মহাসড়কের পাশে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে সুন্দরঘোনা গ্রামে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে পাকা সড়ক, পশ্চিম পাশে ঐতিহাসিক ঘোড়াদীঘি। এই দিঘীটির আয়তন প্রায় ৪০ একর। কথিত আছে এই দিঘী খনন করার পর বহুদিন এখানে পানি উঠে নি। এরপর খান জাহান আলী ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে দিঘীতে নামেন এবং পানিপূর্ণ হওয়ার জন্য দোয়া করেন। এরপর পানি উঠতে থাকে। একারণে এই দিঘীর নাম ঘোড়াদিঘী।

ষাট গম্বুজের স্থাপত্য কৌশল আর লাল পোড়া মাটির উপর সুনিপুণ লতাপাতার অলঙ্করণে নানারূপে কারুকার্যখচিত মসজিদের ভেতর-বাইরে অভাবনীয় সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটেছে। বাংলাদেশে এতবড় ঐতিহাসিক মসজিদ আর নেই। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। আর এর উচ্চতা ২২ ফুট। এর দেয়াল প্রায় ৯ ফুট পুরু। পূর্ব-পশ্চিমে ৭টা করে ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে মাঝের এক সারিতে ৭ গম্বুজের উপরিভাগ চৌকোণা, বাকি ৭০টির উপরিভাগ গোলাকার। মসজিদের ভেতরে পূর্ব-পশ্চিমে ১০টি সারিতে ৬টা করে মোট ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে। স্থানীয় লবণাক্ত জলবায়ুর প্রভাবে যাতে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে মসজিদের স্তম্ভের নিচে ৪ ফুট পর্যন্ত চারপাশে পাথরের আন্তরণ দেয়া হয়েছে। এসব পাথর বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছিল। মসজিদের ভেতর এমন জ্যামিতিক পদ্ধতিতে স্তম্ভগুলো বিন্যাস করা হয়েছে যে ইমাম সাহেবের দৃষ্টি মসজিদের যে কোনো প্রান্ত পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই পৌঁছতে পারে।

মসজিদে দরজা আছে মোট ২৫টি। এর একটি দরজা রয়েছে পশ্চিম দিকে, যা সম্ভবত জানাজার নামাজ পড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। ছাদ থেকে প্রায় ১৩ ফুট উঁচু মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার আছে। সামনের মিনার দুইটির ভেতর দিয়ে ওপরে যাওয়ার জন্য ঘোরানো সিঁড়িপথ রয়েছে। এ দুইটি মিনারের ভেতরে খিলানের সাহায্যে নির্মিত একটি করে ছোট কক্ষ রয়েছে। এ কক্ষ দুইটির নাম ‘আন্ধার মানিক’ ও ‘শলক মালিক’। মিনার দুইটি আজান দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো বলে মনে হয় এবং একইসাথে এসব মিনারে চড়ে খানজাহানের সৈন্যরা পাহারা দিতেন, বহিঃশত্রুর চলাচলের ওপর নজর রাখতেন।

খানজাহান (রহ.) জৌনপুরের দক্ষ নির্মাণ শিল্পী এনে এই সুবিশাল সুরম্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে কত সময় এবং কত লোক এর নির্মাণ কাজ করেছেন তা জানা যায়নি। এ মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার লোক এক সঙ্গে নামায পড়তে পারে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে অযত্নে অবহেলায় মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯০৪ সালে ইংরেজ শাসনামলে পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এটি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এরপর মসজিদটিকে কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের চারপাশে সীমানা প্রাচীর রয়েছে। পূর্ব দিকে ছিল প্রবেশ তোরণ। তোরণের দু'পাশের দু'টি কক্ষ ছিল কিন্তু এখন তার কোন অস্তিত্ব নেই।

এটি শুধু মসজিদ ছিল না, খানজাহান (রহ.) এর দরবার ও সেনা ছাউনি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এখান থেকেই তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলীয় স্বাধীন-সার্বভৌম ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র হাবেলী পরগণা বা খলিফাতাবাদ রাষ্ট্র পরিচালনা করা হতো। বর্তমান ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো জাদুঘর। ১৯৯৩ সালে এখানে জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। জাদুঘরে ২৮টি গ্যালারি রয়েছে। এখানে খানজাহান (রহ.)- এর আমলের শতাধিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।

আমাদের দুপুরে মঈন সাহেবের বিয়ের দাওয়াত ছিলো। তাই এখানে বেশি সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পাইনি। একটার মধ্যেই খুলনায় ফেরার তাগিদ থেকে অনুপম এই নিদর্শন থেকে বিদায় নিই। ষাট গম্বুজের ঠিক উল্টোপাশেই রয়েছে সিঙ্গাইর মসজিদ। ধারণা করা হয় এটি মুঘল আমলে তৈরি করা হয়। ষাট গম্বুজের এতো কাছে আরেকটি ছোট মসজিদের কেন প্রয়োজন হয়েছিলো এই উত্তর আমি কারো কাছ থেকে পাইনি।

ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মধ্যযুগীয় এই মসজিদটি অবস্থিত। এটি একগম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ। বর্গাকার এক গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদ সম্পূর্ণরূপে ইটের তৈরি। বাইরের পরিমাপ ১২.১৯ মি। এর দেওয়ালগুলি প্রায় ২.১৩ মি পুরু। মসজিদ ইমারতটির পূর্বদিকে তিনটি খিলানপথ আছে, আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আছে একটি করে। পূর্বদিকের মাঝের প্রবেশপথটি পার্শ্বদেশে অবস্থিত প্রবেশপথের চেয়ে বড়। কিবলা দেওয়ালের ভেতরে আছে খাজকৃত খিলান মিহরাব যার বাইরের দিকে রয়েছে একটি আয়তাকার।

সিঙ্গাইর মসজিদ দেখে এসে বাসে করে আবার খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ইতোমধ্যে আকাশের অবস্থা পাল্টে গেলো। রোদযুক্ত আকাশ কুয়াশাছন্ন হয়ে পড়লো। যতই খুলনার দিকে আগাচ্ছি ততই শীত জেঁকে বসা শুরু করেছে। সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের পাশেই আমরা হোটেল খুঁজতে থাকলাম। খুলনায় হোটেল ভাড়া চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের তুলনায় অনেক সস্তা। আমরা একটি বড় কক্ষ যেখানে তিনটি ডাবল বেড সেট করা আছে এমন একটি কক্ষ মাত্র ১৫০০ টাকায় ভাড়া করলাম। অর্থাৎ সাত জন থাকলাম ১৫০০ টাকায়। হোটেলের সার্ভিসও খারাপ ছিলো না।

হোটেলে ফ্রেশ হয়ে ও ব্যাগ রেখে দুটোর সময় গেলাম কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে আরো অনেক পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হলো। বরের সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে পেট পুরে খেলাম। খাওয়া শেষে বের হলাম চা খাবো বলে। খুলনায় একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছে। এখানে হোটেলগুলোতে চা পাওয়া যায় না। একটি হোটেলে চা চেয়েছি। ম্যানেজার বললেন এটা তো হোটেল, চা দোকান না। চা পাওয়া যায় টং দোকানগুলোতে।

টং দোকানে চা খাওয়ার পর আমার সহযাত্রীরা শহর ঘুরেছেন। আর আমি আইলসা মানুষ। হোটেলে এসে ঘুম দিয়েছি। এই শীতের মধ্যে শহরে ঘোরাঘুরি আমার পছন্দ হয়নি।

২৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-২২ : অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বিদ্রোহ



ইংরেজরা বাংলা দখল করেই তাদের দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে। দালালদের নানাবিদ সুযোগ সুবিধা দিয়ে গোটা ভারতবাসীকে শাসন-শোষণ করার ভিত্তি পাকাপোক্ত করে নেয় ইংরেজ। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীজ বপন করে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ভেঙ্গে দেয়। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে কেরানী বানানোর জন্য, শিক্ষানীতিসহ বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন করতে থাকে। বাংলার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য ইংরেজ তার স্বার্থের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করে।

ইংরেজ শাসনকে শাসন না বলে বলা বলা উচিত লুটপাট, অরাজকতা শোষণ, ত্রাস, নিপীড়ন ও নির্যাতন। এই বাংলায় ইংরেজদের লুটপাট শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তারা বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই বিদ্রোহ হয়েছে একেবারেই যারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় তাদের দ্বারা। পলাশী যুদ্ধের মাত্র তিন বছর পরই শুরু হয় ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। ফকিরদের এই বিদ্রোহের মূল কারণ ছিলো লাখেরাজ সম্পত্তি ও নবাব কর্তৃক অনুদান। বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরু থেকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিলো অসাধারণ। হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের ধর্মীয় পণ্ডিতরা লাখেরাজ সম্পত্তি ও অনুদান পেতেন। এটি সুলতানি আমল থেকেই চলমান ছিলো। লাখেরাজ সম্পত্তি মানে হলো করহীন ভূমি। ইংরেজরা তাদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রথমে অনুদান বাতিল করে এবং পরে লাখেরাজ সম্পত্তি বাতিল করে। এতে ফকির সন্ন্যাসীদের জীবন ও স্বাভাবিক কর্ম বাধাগ্রস্থ হয়।

সম্মিলিত হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ধার্মিক ফকিরদের একটা বৃহৎ গোষ্ঠী যাঁরা পবিত্রস্থান দর্শনের উদ্দেশ্যে উত্তর ভারত থেকে বাংলার বিভিন্নস্থান ভ্রমণ করতেন। যাওয়ার পথে এসব সন্ন্যাসী-ফকিরগণ গোত্রপ্রধান, জমিদার অথবা ভূস্বামীদের কাছ থেকে ধর্মীয় অনুদান গ্রহণ করতেন যা তখন রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্ষমতা লাভ করে তখন থেকে করের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। ফলে স্থানীয় ভূস্বামী ও গোত্রপ্রধানগণ সন্ন্যাসী-ফকিরদেরকে ধর্মীয় অনুদান প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়ে। উপরন্তু ফসলহানি, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যাতে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। এই কারণে সন্ন্যাসী-ফকিরেরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে এবং যার ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠে 'ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ'।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নায়ক ও সংগঠক ছিলেন ফকির মজনু শাহ। এই বিদ্রোহের অন্যান্য নেতৃত্বের মধ্যে ছিলেন তাজশাহ, চেরাগ আলী শাহ, মুছা শাহ, পরাগল শাহ, করম শাহ প্রমুখ। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নায়ক ভবানী পাঠক। ১৭৬০ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার পুতুল নবাব মীর জাফর আলী খানকে সরিয়ে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মীর জাফর আলী খানের জামাতা মীর কাসেম আলী খানকে বাংলার নবাবের গদিতে বসান। পলাশী যুদ্ধের (১৭৫৭) তিন বছর পর বাংলায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে মজনু শাহ- এর নেতৃত্বে ১৭৬০ সালে ফকির বিদ্রোহ শুরু হয়। উত্তরবঙ্গে, বিশেষ করে রংপুরে এ বিদ্রোহ কালক্রমে ব্যাপক রূপ ধারণ করে।

কোম্পানির শোষণ ও অপশাসনের হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সনাতন অধিকার ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সমন্বয়ে জ্বলে ওঠে এই ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আগুন। টমাস ব্রস্টনের তথ্য মতে, হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ফকির সন্ন্যাসীদের দল। এরা এদেশের স্থায়ী অধিবাসী এবং ধর্ম সম্প্রদায় হিসেবে জীবনযাপন করলেও জীবিকার্জনে নির্দিষ্ট পেশা ছিল তাঁদের। কোম্পানির শাসনের ফলে তাঁদের স্বাধীন চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। ক্ষুন্ন হয় তাঁদের ধর্মপালনের অধিকার। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তাঁরা বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ফকিরদের নেতা ফকির মজনু শাহ গড়ে তোলেন দুর্বার ফকির বিদ্রোহ এবং ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকে অবিভক্ত বাংলার নানা স্থানে এই বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর বগুড়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহে ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ বেগবান হয়ে ওঠে'।

ফকির মজনু শাহের জন্ম তারিখ জানা যাননি। তিনি মীরাটের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর জন্ম দিল্লীর কাছাকাছি হলেও আমৃত্যু তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল বাংলায়। ফকির মজনু শাহ ছিলেন মাদরিয়া সম্প্রদায়ের সূফিসাধক বা ফকির। তাঁর বংশ ও পরিচয় প্রায় অজ্ঞাত। তাঁর আসল নামও অজ্ঞাত। কখন মজনু শাহ বুরহানা বা মজনু ফকির নামে পরিচিত হলেন সেটাও জানা যায়নি। তবে তিনি ফকির মজনু শাহ নামেই সমাধিক পরিচিত ছিলেন বলে জানা যায়। বাংলার মাদরিয়া সূফিসাধক সুলতান হাসান সুরিয়া বুরহানার মৃত্যুর পর তিনি মাদরিয়া তরিকা গ্রহণ করেন। মজনু শাহ সাধারণত দিনাজপুর জেলার বালিয়াকান্দিতে বসবাস করতেন।

বগুড়া জেলার বারো মাইল দক্ষিণে গোয়াইল নামক স্থানের নিকট সদরগঞ্জ ও মহাস্থানগড় ছিল তাঁর কাজের প্রধান কেন্দ্র। বিহারের পশ্চিম প্রান্ত থেকে বাংলার পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে তিনি বিচ্ছিন্ন কৃষক ও কারিগর বিদ্রোহীদের ঐক্যবদ্ধ করে একটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিচালনাধীনে আনবার চেষ্টা করেছিলেন। এই বিদ্রোহে তিনি কখনও সৈন্য সংগ্রহকারী, কখনও প্রধান সেনাপতি হিসেবে আবার কখনও সমগ্র বঙ্গদেশ ও বিহারের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহীদের সংঘবদ্ধ করতে ব্যস্ত ছিলেন।

১৭৬৩ সালে মজনু শাহ এবং ফকিরদের নেতৃত্বে ইংরেজ কোম্পানীর ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাঁর সঙ্গে ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে হিন্দু সন্ন্যাসীগণও যোগ দেয়ায় এ বিদ্রোহ ব্যাপকতর রূপ লাভ করে। ১৭৬৩ সালে ফকির বিদ্রোহীরা বরিশাল এবং ঢাকায় ইংরেজদের কোম্পানীর কুঠি আক্রমণ করে দখল করে নেন। ১৭৬৩, ১৭৬৪ সালে ফকির সিপাহীগণ রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্য কুঠি আক্রমণ করে। এ বাণিজ্য কুঠিগুলো শুধুমাত্র জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার ছিল না, এগুলো ছিল অস্ত্রের কেল্লাও। ওই সময় থেকে ঢাকাসহ বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, পুর্ণিয়া, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর ও যশোর জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণের তীব্রতা ছিল মারাত্মক। ১৮০০ সাল পর্যন্ত তা চলে প্রায় অব্যাহতভাবে। ঢাকা জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন বা বিদ্রোহ শুরু হয় ১৭৬৩ সাল থেকে। ১৭৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার স্থানীয় প্রশাসন হয়ে পড়ে প্রায় অবরুদ্ধ। ১৭৭১ সালের ২৮ মার্চ এক যুদ্ধের মাধ্যমে ফকির-সন্ন্যাসীর হাত থেকে ঢাকা মুক্ত হয়। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের বড় আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা কালেক্টর জানান হনুমানগিরির নেতৃত্বে বহু সংখ্যক বিদ্রোহী সন্ন্যাসী ঢাকার পাকুল নামক স্থানে জড়ো হয় এবং তাঁরা জনৈক জমিদারের গোমস্তা রামলোচন বসুকে অপহরণ করে। এ সময় তাঁরা রামলোচন বসুর কাছ থেকে ৪,২০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু কোম্পানির সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ময়মনসিংহের দিক তাঁরা চলে যান। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের সর্ববৃহৎ আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের মার্চ মাসে। তখন দলবদ্ধ আক্রমণে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডকে তাঁরা হত্যা করেন।

১৭৬৯ সালে ফকিররা রংপুর আক্রমণ করেন। সেনাপতি লেফটেনেন্ট কিং সৈন্যসহ বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য রংপুর গমন করেন। যুদ্ধে কোম্পানীর সৈন্য পরাজিত হয় এবং সেনাপতি লেফটেনেন্ট কিং নিহত হন। ১৭৭১ সালে মজনু শাহের নেতৃত্বে আড়াই হাজার বিদ্রোহী সৈন্য (ফকির) বিরাট ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হলে তিনি মহাস্থানগড়ের সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নেন। পরে বিদ্রোহের প্রয়োজনে বিহার যান। ১৭৭১ সালে ১৫০ জন ফকিরকে হত্যা করে ইংরেজরা। যা প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এ ক্ষোভ পরবর্তীকালে ভয়াবহ রূপ নেয়।

১৭৭২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নাটোর অঞ্চলে মজনু শাহের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁরা এই অঞ্চলের অত্যাচারী ধনী ও জমিদারদের এবং ইংরেজ শাসকের অনুচরদের ধনসম্পদ দখল করে নিতেন এবং তা কৃষকদেরকে দিতেন। এভাবে তাঁরা কৃষকের উপর ইংরেজদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেন। ১৭৭২ সালের ৩০ জুন রংপুরের শ্যামগঞ্জে ১৫০০ ফকির বিদ্রোহী জমায়েত হন। ফকির সন্ন্যাসীরা একত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বর্শা, তরবারি, বন্দুক, ত্রিশূল, গাদা বন্দুক, পিতলের বাঁটঅলা লাঠি এসবই ছিল তাঁদের প্রধান অস্ত্র। তাঁদেরকে দমন করার জন্য ক্যাপ্টেন টমাস একদল সৈন্য নিয়ে শ্যামগঞ্জ আসেন। ফকির বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে কোম্পানীর সৈন্যরা পরাজিত হয় এবং ক্যাপ্টেন টমাস নিহত হয়। ময়মনসিংহের শেরপুরে ফকির করম শাহ এবং তাঁর পুত্র টিপু শাহের নেতৃত্বে শেরপুরের কৃষকেরা ইংরেজদের আধিপত্য অস্বীকার করে বিদ্রোহ করে। গারো ও হাজং উপজাতীয়রাও এই যুদ্ধে ফকিরদের সহযোগিতা করে।

বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংরেজরা নতুন নতুন আইন প্রবর্তন করে। বিদ্রোহীদের গোপন সংগঠন, গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চলাচল সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য জমিদারদের এমনকি কৃষকদেরও আইন দ্বারা বাধ্য করা হয়েছিল। ইংরেজ শাসনের প্রথম থেকেই, সন্ন্যাসী ও ফকিরদের তীর্থ ভ্রমণের ওপর নানারকম কর বসিয়ে তাঁদের ধর্মানুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হত। ইংরজে শাসকরা এমন কতকগুলো আইন তৈরি করে যার ফলে তীর্থভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা যাতে বিপদের সময় পাশের ভুটান রাজ্যে আশ্রয় না নিতে পারেন সেজন্য ১৭৭৪ সালে ভুটানের রাজার সঙ্গে ইংরেজরা একটি চুক্তি করে। এতে বলা হয় ইংরেজ শাসকরা যাদের শত্রু বলে মনে করবে তাদের ভুটানে আশ্রয় দেওয়া চলবে না। প্রয়োজনে ইংরেজ বাহিনী ভুটানে প্রবেশ করে পলাতক বিদ্রোহীদের বন্দী করতে পারবে।

১৭৭৪ সালের শেষ ভাগ থেকে কয়েকটি অঞ্চলের বিদ্রোহী দলগুলি বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো আক্রমণ শুরু করলেও প্রকৃত সংগ্রাম আরম্ভ হয় ১৭৭৬ সালের শেষ দিক থেকে। এই সময় মজনু শাহ উত্তরবঙ্গে ফিরে এসে ছত্রভঙ্গ বিদ্রোহীদের আবার সঙ্ঘবদ্ধ করার ও নতুন লোক সংগ্রহের চেষ্টা করেন। দিনাজপুর জেলায় মজনু শাহের উপস্থিতির খবরে ইংরেজ শাসক এতই ভীত হয়েছিল যে, অবিলম্বে জেলার সব জায়গা থেকে রাজস্বের সংগৃহীত অর্থ দিনাজপুর শহরের সুরক্ষিত ঘাঁটিতে স্থানান্তরিত করে রাজকোষের রক্ষীবাহিনীর শক্তি বাড়ানো হয়। অন্যদিকে মজনু শাহ বগুড়া থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একটা প্রকাণ্ড ইংরেজবাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে আপাতত যুদ্ধ এড়াবার জন্য করতোয়া নদী এবং ময়মনসিংহ জেলার সীমান্ত পার হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঘাঁটি স্থাপন করেন।

১৭৭৬ সালের ১৪ নভেম্বর একটি ইংরেজ সৈন্যদলের সঙ্গে মজনু শাহ'র বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। ইংরেজদের গুলির হাত থেকে বাঁচতে মজনু শাহ সদলবলে জঙ্গলের মধ্যে পালাতে বাধ্য হন। শত্রুরা তাঁদের পিছু নিলে বিদ্রোহীরা হঠাৎ পিছন ফিরে ইংরেজ সৈন্যদলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই আক্রমণে কয়েকজন ইংরেজ সেনা নিহত হন এবং সেনাপতি লেফটেনান্ট রবার্টসন গুলির আঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়েন। এরপর মজনু শাহ সদলে জঙ্গলে আত্মগোপন করেন।

এই সময় সন্ন্যাসী ও ফকিরদের আত্মকলহ সশস্ত্ররূপ ধারণ করে ১৭৭৭ সালে বগুড়া জেলায় একদল সন্ন্যাসীর সঙ্গে মজনু শাহের ফকির সম্প্রদায়ের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এরপর প্রায় তিনবছর ধরে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে মজনু শাহ সন্ন্যাসী ও ফকিরদের আবার সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে বগুড়া, ঢাকা এবং ময়মনসিংহের বহু অঞ্চলের জমিদারদের কাছ থেকে 'কর' আদায় ও বহু স্থানে ইংরেজ সরকারের কোষাগার লুট করেন। অনুচরদের ওপর তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল, তাঁরা যেন জনসাধারণের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার বা বলপ্রয়োগ না করেন এবং জনগণের স্বেচ্ছার দান ছাড়া কোনও কিছুই গ্রহণ না করেন। ইংরেজদের বিদ্রোহ দমনের বিপুল আয়োজন সত্ত্বেও তিনি ও তাঁর অনুচররা সমগ্র উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন জায়গায় প্রবল বিক্রমে কাজ চালিয়ে যান।

উপরে ফকীর বিদ্রোহের কিছু বিবরণ দেয়া হলো। তবে ফকীরদের সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা ইংরেজ লেখক ও ইতিহাসকারদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা অনুমান করার যথেষ্ট কারণ আছে। ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁদেরকে বেদুইন বলেছেন, আর হান্টার বলেছেন ‘ডাকাত’। তাঁদের আক্রমণ অভিযানে কয়েক দশক পর্যন্ত নব প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশরাজ এখানে টলটলায়মান হয়ে পড়েছিল, সম্ভবতঃ সেই আক্রোশেই তাদের ইতিহাস বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন মজনু শাহ ভারতের গোয়ালিয়র রাজ্যের মেওয়াত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কানপুরের চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত মাকানপুরে অবস্থিত শাহ মাদারের দরগায় মজনু শাহ বাস করতেন। সেখান থেকেই হাজার হাজার সশস্ত্র অনুচরসহ তিনি বাংলা বিহারের বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ ও অত্যাচারী জমিদারদে বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তাঁর কার্যক্ষেত্র বিহারের পুর্ণিয়া অঞ্চল এবং বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, রাজশাহী, মালদহ, পাবনা ময়মনসিংহ ছিল বলে বলা হয়েছে।

১৭৭২ সালের প্রথমদিকে মজনু শাহ বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র অনুচরসহ উত্তর বংগে আবির্ভূত হন। তাঁর এ আবির্ভাবের কথা জানতে পারা যায় রাজশাহীর সুপারভাইজার কর্তৃক ১৭৭২ সালের ২২শে জানুয়ারী তারিখে কোম্পানীর কাছে লিখিত এক পত্রে। তাতে বলা হয়, তিনশ’ ফকীরের একটি দল আদায় করা খাজনার এক হাজার টারা নিয়ে গেছে এবং আশংকা করা যাচ্ছে যে, তারা হয়তো পরগণা কাচারীই দখল করে বসবে। তলোয়ার, বর্শা, গাদাবন্দুক এবং হাউইবাজির হাতিয়ারে তারা সজ্জিত। কেউ কেউ বলে তাদের কাছে নাকি ঘূর্ণায়মান কামানও আছে।

১৭৭৬ সালে মজনু শাহ বগুড়া মহাস্থান আগমন করে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। সে সময় বগুড়া জেলার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মিঃ গ্লাডউইন। তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে প্রাদেশিক কাউন্সিলের কাছে সৈন্য সাহায্য চেয়ে পাঠান। ১৭৮৬ সালের আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ফকীর সর্দারকে (মজনু শাহ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে পর পর দু’টো সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ফকীরদের পক্ষে যেমন কিছু লোক হতাহত হয়, ইংরেজদেরও অনুরূপভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়।  

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে অনুমিত হয় যে, এরপর গঙ্গা পাড়ি দিয়ে মজনু শাহ দেশে চলে যান। আর কোন দিন তাকেঁ বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর সৈন্যসহ বগুড়া জেলা থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা করার পথে কালেশ্বর নামক স্থানে মজনু শাহ ইংরেজ বাহিনীর সম্মুখীন হন। এই যুদ্ধে মজনু শাহ মারাত্মকভাবে আহত হন। ১৭৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিহারের মাখনপুর গ্রামের এক গোপন ডেরাতে ফকির বিদ্রোহের এই নায়কের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। আনুমানিক ১৭৮৭ সালে কানপুর জেলার মাখনপুর এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে সরকারী সূত্রে জানা যায়। তাঁর মৃতদেহ সেখান থেকে তাঁর জন্মভূমি মেওয়াঁতে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

১৭৮৭ সালে ফকির মজনু শাহ মৃত্যুবরণ করার পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বকস, করিম শাহ প্রমুখ ফকির নেতা প্রাণপণ চেষ্টা করেও ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি। যে কারণে ফকির আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। আপাত ব্যর্থ মনে হলেও ফকির বিদ্রোহই ছিলো এই অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী মানুষদের প্রেরণার স্থল। যেই প্রেরণা থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বারংবার বিদ্রোহী হয়েছে বাঙালীরা।

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডাকাত থেকে মন্ত্রী : একটি মোটিভেশনাল গল্প



বাংলাদেশকে আলাদা করে একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা হয়েছিলো ৭১ এর অনেক আগেই। যার নাম নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াস ছিলো গোপন সংগঠন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সিরাজুল আলম খান যাদেরকে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য যোগ্য মনে করতেন তাদেরকে বামপন্থী আদর্শে উজ্জীবিত করতেন এবং গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসে অন্তর্ভুক্ত করে নিতেন।

১৯৬৬ সালে সেই নিউক্লিয়াসের সদস্য হন একজন ছাত্রলীগ নেতা। যাকে হাত পাকানোর জন্য নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে ডাকাতি করতে বলা হয়। তার কাজ ছিলো ধনী মানুষদের থেকে ডাকাতি করে সম্পদ আহরণ করা এবং তা নিউক্লিয়াসের ফান্ডে জমা দেয়া। ১৯৭১ সালে সারাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে দেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনা তারা করে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জয়দেবপুরে একটি সশস্ত্র কমিটি তৈরি করে। এই নিয়ে ডাকাতের মুখে শুনুন সেই কাহিনী

//২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশু পালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব মোঃ হাবিব উল্ল্যাহ এক সর্বদলীয় সভা আহবান করেন। সভায় আমাকে আহবায়ক করে এবং মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা জনাব নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন সর্বজনাব আয়েশ উদ্দিন, মোঃ নুরুল ইসলাম, মোঃ আঃ ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা) থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মোঃ শহীদ উল্লাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. সাঈদ বকস্ ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাই কমান্ড (উপদেষ্টা) হন জনাব মো. হাবিব উল্ল্যাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম এ মুত্তালিব এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নেতা বাবু মনিন্দ্রনাথ গোস্বামী (মরহুম)।

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পূর্বেই আমরা এ কমিটি গঠন করেছিলাম। পেছনের ইতিহাস এই যে, আমি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’ -এর সাথে সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দ্যেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা। যা ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেই সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। যার বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানিদের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্ব-ঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দায়ের করা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলায় যা বিখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সাথে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ।// (১)

এই কমিটি শুধু জয়দেবপুর নয়, সারাদেশে আওয়ামীলীগ এই কমিটি গঠন করে যার অগ্রভাগে ছিলো নিউক্লিয়াস নামের জঙ্গী সংগঠন। ৩ মার্চ থেকে সারাদেশে বিহারীদের উপর গণহত্যা চলতে থাকে। এরপরও পাকিস্তান সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ও আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো অভিযানে নামে নি। ওরা সেনাবাহিনীকে ক্ষেপাতে না পেরে সেনাবাহিনীর উপরই আক্রমণ চালানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নেই। ঢাকায় কয়েকটি স্থানে অনেকজন সেনাসদস্য বেসামরিক অবস্থায় আওয়ামীলীগ কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়। মার্কিন দূতাবাসে হামলা করে নিউক্লিয়াস।

সারাদেশে সেনাবাহিনীর উপর বিনা উস্কানীতে আক্রমন করেছিলো বাঙ্গালীদের একটা অংশ। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে জয়দেবপুরে ঐ ডাকাতের নেতৃত্বে। গাজিপুরে সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে একদল সৈন্য সেখানে পৌঁছানোর আগে আওয়ামীলীগ কর্মীরা জয়দেবপুরে ব্যরিকেড সৃষ্টি করে। ব্যরিকেডের জন্য তারা একটি ট্রেনের বগি ব্যবহার করে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাহানজেবের নেতৃত্বে সৈন্যদল। তারা ব্যরিকেড সরিয়ে সেখানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখে জাহানজেব আরবাব আবার যখন হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন বিশৃংখলাকারীরা সৈন্যদলকে আবারো ঘিরে ফেলে। বন্দুক, শর্টগান, লাঠি, বোমা ইত্যাদি নিয়ে হামলা চালায়। জাহানজেব বাঙ্গালী অফিসার লে. ক. মাসুদকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিলেন। মাসুদ ইতস্তত করলে অপর বাঙ্গালী অফিসার শফিউল্লাহ তার সৈন্যদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন চালালে কিছু মানুষ নিহত হয় বাকীরা পালিয়ে যায়। মাসুদকে পরে ঢাকায় এসে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। এই পরবর্তিতে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। শেখ মুজিব খুন হওয়ার সময় তিনি সেনাপ্রধান ছিলেন।

সেই ঘটনার বর্ণনা শুনুন ডাকাতের মুখেই,
//রেল গেইটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য ২য় ইস্ট বেঙ্গলের রেজিমেন্টকে বিগ্রেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেয়। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান নিয়ে মেজর শফিউল্লাহকে জনতার উপর গুলি বর্ষণের আদেশ দেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের উপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে সামনে আসতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের উপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর উপর গুলি বর্ষণ শুরু করি। শফিউল্লাহর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা, আহত হন চত্বরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর জনতা। পাক বাহিনী কার্ফু জারি করে এলোপাথারি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিস্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যেকে পেছন দিয়ে আক্রমণ করে। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেই। কিন্তু পেছনে আর এক পাঞ্জবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করে হুরমত সেখানেই শাহাদাৎ বরণ করেন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাষ্কর্য স্থাপিত হয়েছে।// (১)

পরদিন শেখ মুজিব আলোচনা চলাকালে পাক বাহিনীর আক্রমণে ১৯ মার্চের নিহতের কথা উল্লেখ করলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান উল্লেখ করে যে, জয়দেবপুর জনতা সেনাবাহিনীর উপর আধুনিক অস্ত্র ও চাইনিজ রাইফেল দিয়ে আক্রমণ করেছে এবং এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সৈন্য আহত হয়েছে। তিনি আওয়ামী কর্মীদের কাছে এই অস্ত্র কোথা থেকে এসেছে? কারা দিয়েছে? কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে? কেন সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ হয়েছে যেখানে আমরা আলোচনার টেবিলে? এমনসব প্রশ্ন রাখেন। মুজিব উত্তর করতে ব্যর্থ হন ও প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চান।

এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেক্টর কমান্ডার কে এম শফিউল্লাহ বলেন,
//১৯ মার্চ সকাল দশটায় তার ইউনিটকে জানানো হয় ব্রিগেড কমান্ডার মধ্যহ্নভোজে আসছেন এবং নিকটবর্তী গাজিপুর সমরাস্ত্র কারখানা পরিদর্শন করবেন। কিন্তু জনতা প্রায় ৫০০ ব্যরিকেড বসিয়ে সৈন্যদের আটকে দেয়। এগুলো সরিয়ে তারা আসলেও ফিরে যাওয়ার সময় জয়দেবপুরে মজবুত ব্যরিকেড সৃষ্টি করলে লে. ক. মাসুদ তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমন সময় দুজন বাঙ্গালী সৈনিক জাহানজেবকে জানায় তাদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে, অস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েছে। এবার জাহানজেব গুলি করার নির্দেশ দিলে মঈন তার সৈন্যদের গুলি করতে বলে। তবে বাংলায় বলে দেয় ফাঁকা গুলি করার জন্য। এরপরও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রনে না এলে এবার জাহানজেব কার্যকরভাবে গুলি করার নির্দেশ দেন। তারাও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। দু’জন নিহত হয়। শফিউল্লাহ আরো জানান, গাজিপুরের পরিস্থিতিও ছিল উত্তেজনাকর। রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল। সমরাস্ত্র কারখানার আবাসিক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাকে আটকে ফেলে বাঙ্গালীরা। আবাসিক পরিচালককে উদ্ধার করতে আমরা সেনা প্রেরণ করেছিলাম।// (২)

সেই থেকে উত্থান শুরু হয় ঐ ডাকাতের। মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক তান্ডব চালায় সারা জয়দেবপুর মহকুমাসহ সারা গাজীপুরে। বহু আলেম-ওলামা, মসজিদের ইমাম তার হাতে খুন হয়। তার নিজস্ব ডাকাত বাহিনী বড় হতে থাকে। যুদ্ধের পর তার ক্ষমতা বাড়তে থাকে, একইসাথে বাড়তে থাকে তার অত্যাচার। মুক্তিযোদ্ধা ডাকাতেরা সারাদেশেই অত্যাচার চালাতে থাকে। তবে আমি যে ডাকাতের কথা নিয়ে আলোচনা করছি সে ডাকাত ছিলো বিখ্যাত। তার সন্ত্রাসের কিছু কথা উল্লেখ আছে সাংবাদিক Anthony Mascarenhas- এর বই Bangladesh : Legacy of Blood বইতে। আরো উল্লেখ আছে হুমায়ুন আহমেদের দেয়াল বইতে।

এক নবদম্পতি গাড়ীতে করে যাচ্ছিল। টঙ্গীর আওয়ামীলীগ নেতা ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোজাম্মেল দলবলসহ গাড়িটি আটক করে। ড্রাইভার আর নববধূর স্বামীকে হত্যা করে, মেয়েটিকে সবাই মিলে ধর্ষণ করে, অতঃপর তিনদিন পর তাঁর লাশ পাওয়া যায় টঙ্গি ব্রীজের নীচে। পৈশাচিক এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয় সর্বত্র। বিশেষ অভিযানে দায়িত্বরত মেজর নাসেরের হাতে মোজাম্মেল ধরা পড়ে। (৩) মোজাম্মেল মেজরকে বলে- ঝামেলা না করে আমাকে ছেড়ে দিন, আপনাকে তিন লাখ টাকা দেবো। বিষয়টা সরকারি পর্যায়ে নেবেন না। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি ছাড়া পাবো। আপনি পড়বেন বিপদে। আমি তুচ্ছ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে জড়াতে চাই না। মেজর নাসের হুঙ্কার ছাড়লেন, এটা তুচ্ছ বিষয়? আমি অবশ্যই তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবার ব্যবস্থা করবো। তোমার তিন লাখ টাকা তুমি তোমার গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়ে রাখো!
এরপরের কাহিনী অতি সরল।

হুমায়ুন আহমেদ বলেন,
//কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোজাম্মেলের বাবা, দুই ভাই গেল বঙ্গবন্ধুর কাছে। তিনি ঢোকা মাত্র মোজাম্মেল এর বাবা ও দুই ভাই কেঁদে মুজিবের পায়ে পড়লো। টঙ্গি আওয়ামীলীগের সভাপতিও পায়ে ধরার চেষ্টা করলেন। পা খুঁজে পেলেন না। পা মোজাম্মেলের আত্মীয় স্বজনের দখলে!
বঙ্গবন্ধু বললেন, ঘটনা কি বল?
টঙ্গি আওয়ামী লীগের সভাপতি বললেন, আমাদের মোজাম্মেলকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে। মেজর নাসের তাকে ধরেছে। নাসের বলেছে ৩ লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দিবে।
মিথ্যা মামলাটা কি?
মোজাম্মেল এর বাবা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, খুনের মামলা লাগায়া দিছে।
মুজিব জিজ্ঞাসিলেন, ঘটনা কি ?
টঙ্গি আ’লীগের সভাপতি বললেন, আমাদের সোনার ছেলে মোজাম্মেল মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে।
মেজর নাসির তাকে ধরে নিয়ে গেছে। বলেছে তিন লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দিবে। কাঁদতে কাঁদতে আরো বললো, এই মেজর আ’লীগের নাম শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। সে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে, টঙ্গিতে আমি আ’লীগের কোন শূয়োর রাখবো না। বঙ্গবন্ধু, আমি নিজেও এখন ভয়ে অস্থির! টঙ্গিতে থাকি না। ঢাকায় চলে আসছি। (ক্রন্দন)

এবার হুঙ্কার ছাড়লেন মুজিব, কান্দিস না। কান্দার মত কিছু ঘটে নাই। আমি এখনো বাইচ্যা আছি তো, মইরা যাই নাই। এখনি ব্যবস্থা নিতাছি। অতঃপর মোজাম্মেলকে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মেজর নাসেরকে টঙ্গি থেকে সরিয়ে দেবার জরুরী আদেশ দেয়া হলো। মোজাম্মেল ছাড়া পেয়ে মেজর নাসেরকে তার বাসায় পাকা কাঁঠাল খাওয়ার নিমন্ত্রন করেছিল।// (৪)

শেখ হাসিনা এখনো মুজিবের মতো সেই টাইপের সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি যে, একজন ধর্ষককে হুংকার ছেড়ে ছেড়ে দিবে। আপনারা যারা শেখ মুজিবরে আব্বা ডাকেন এটা তাদের জন্য। আর সেই ডাকাতের নাম আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন তার নাম মোজাম্মেল। যে এখন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী। হাসিনা তাকে মন্ত্রী বানিয়েছে।

সূত্র :
১- মুুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ১৯ মার্চ ’৭১/ ভোরের কাগজ/ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
২- ডেড রেকনিং/ শর্মিলা বসু/ পৃ- ৪২
৩- Bangladesh Legacy of Blood/ Anthony Mascarenhas/ p 48
৪- দেয়াল/ হুমায়ুন আহমেদ/ পৃ- ৮৫-৮৬

২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডলার কূটনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে চার মুসলিম নেতা



১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মূলত ডলার কূটনীতি কার্যকরভাবে ফাংশন করতে শুরু করলো। বেচাকেনার একদম শুরুতে এটা ছিল স্রেফ দ্রব্যাদির বিনিময়। তারপর আবিস্কৃত হলো যে স্বর্ণের সর্বজনীন আকর্ষণ আছে, এবং ভার-ভারিক্কি দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থার বদলি হিসাবে এটা সুবিধাজনক। দ্রব্য ও সেবার বিনিময়ের সুবিধে করে দিল স্বর্ণ, পাশাপাশি যারা দুর্দিনের জন্য সঞ্চয় করতে চাইতো তাদের জন্য স্বর্ণ মূল্যের মজুদ হয়েও থাকতে পারে। ওদিকে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই অর্থ ক্রমান্বয়ে বিকশিত হতে থাকলো। ক্ষমতার ওপর সরকারের দখল বাড়ার সাথে সাথে তারা অর্থের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বসলো। স্বর্ণের গুণগত মান এবং ভেজালমুক্ততা নিশ্চিতকরণে সরকারগুলো কখনো কখনো সফল হলেও, এটা নিয়ে তারা খুশী ছিল না। একসময় তারা নিজেদের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্য উপায় শিখে ফেললো। নতুন কর আরোপ কিংবা করের হার বৃদ্ধি সবসময়ই জনগণকে নাখোশ করে। সুতরাং শাসকরা শিখলো যে কিভাবে প্রতিটি চাকতির স্বর্ণের পরিমাণ কমিয়ে নিজেদের মুদ্রার পরিমাণ স্ফীত করা যায়।

যখন স্বর্ণ বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হতো এবং আইন-কানুন সৎ বাণিজ্যের সুরক্ষা দিতো, তখন উৎপাদনশালী দেশ বিস্তার লাভ করতো। যখনই সম্পদশালী জাতিসমূহ-- যাদের শক্তিশালী সব সেনাদল ও স্বর্ণসম্ভার ছিলো-- যারা শুধু সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এবং নিজের দেশে কল্যানমূলক খরচ করতে ব্যতিব্যস্ত ছিলো-- তারা জাতি হিসাবে ব্যর্থ হতে লাগলো। নীতিসমূহ আজও আগের মতোই আছে, কিন্তু প্রক্রিয়া একেবারেই বদলে গেছে। স্বর্ণ আর মুদ্রা নয়, মুদ্রা হচ্ছে কাগজ। অন্তত এই সময়ের জন্য সত্য হচ্ছে, ‘যে টাকা ছাপায় সে শাসন করে’। স্বর্ণের ব্যবহার না থাকলেও আর্থিক লাভের ব্যাপার আগের মতোই আছে; অন্য দেশগুলোকে উৎপাদন করতে এবং তাদের সামরিক শক্তি কমাতে বাধ্য করো এবং নিজেদের মুদ্রাব্যবস্থার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমাও। যেহেতু কাগুজে মুদ্রা হলো স্রেফ প্রতারণা, ‘প্রকৃত মূল্যহীন’, সুতরাং যেই দেশ আর্ন্তজাতিক মুদ্রার মালিক হবে সেই দেশের অবশ্যই প্রচুর সামরিকশক্তি থাকতে হবে যাতে করে পুরো ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখা যায়।

মূলত বিশ্ব-মুদ্রা বলতে যা বোঝায়, সেই মুদ্রার মালিক দেশের জন্য এটা একটা সম্পদ বা বিত্ত বাড়ানোর একটি চমৎকার ও চিরস্থায়ী পদ্ধতি। কংগ্রেস ১৯১৩ সালে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম চালু করে। এরপর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নিরাপদ মুদ্রা’র নীতি পদ্ধতিগতভাবেই অবহেলা করা হয়েছে। এই পুরোটা সময়জুড়ে যুদ্ধে অর্থের যোগান দেয়া ও অর্থনীতিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো চালানোর জন্য খুব সহজ একটি কাজ করেছে ফেডারেল রিজার্ভ-- তারা যখন ইচ্ছে তখনই বাজারে মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর্ন্তজাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের আধিপত্য একলাফে বহুগুণ বেড়ে যায়।

আমেরিকা দুনিয়ার অনেক দেশে বিধ্বংসী হামলা চালায়, ওই দেশগুলো দুর্ভোগের শিকার হয়, কিন্তু তাদের স্বর্ণে মার্কিন সিন্দুকগুলো ভরপুর হযে ওঠে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো দেশ স্বর্ণমান ভিত্তিক পদ্ধতিতে ফিরতে আগ্রহী হয় নি। দেনা পরিশোধের লক্ষ্যে কর আদায় করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় খরচ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে কাগুঁজে মুদ্রা ছাপানোর সিদ্ধান্ত তখন অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাতে করে অল্প মেয়াদে উপকার পাওয়া গিয়েছিল সত্য কিন্তু দশকের পর দশক ধরে এই ভারসাম্যহীনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তিতে ব্রিটিশ পাউন্ডের বদলে দুনিয়ার প্রধানতম রিজার্ভ মুদ্রা হিসাবে ডলারকে ধার্য করা হয। মূলত মার্কিন রাজনৈতিক শক্তি, সামরিক শক্তি ও তাদের হাতে থাকা প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণের প্রতি খেয়াল রেখেই দেশগুলো ডলারের পক্ষ নেয়। প্রতি ৩৫ ডলার হচ্ছে ১ আউন্স স্বর্ণের সমমূল্য- এই হারে। ডলারকে বলা হলো ‘স্বর্ণের মতো সুবর্ণ’ এবং ১/৩৫ হারে দুনিয়ার যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলার বিনিময়ের সুযোগ হলো। স্বর্ণ বিনিময়ের এই ১/৩৫ হার থেকেই পতনের যাত্রা শুরু হলো। সবাই যা আন্দাজ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ঠিক তা-ই করলো। বিপরীতে কোনো স্বর্ণ গচ্ছিত না রেখেই সে ডলার ছাপাতে থাকলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৬০ সালে নতুন প্রশ্ন না ওঠানো পর্যন্ত দুনিয়া ওই ডলারের ওপর রাজি-খুশি ছিল। ১৯৬০ সালে ফ্রান্স এবং আরো কয়েকটি দেশ দাবি করলো; আমাদের ট্রেজারিতে তাদের জমা দেয়া প্রতি ৩৫ ডলারের বদলে ১ আউন্স করে স্বর্ণ দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি মার্কিনিরা দিয়েছিলো তা যেন তারা ফিরিয়ে দেয়। ওই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ বাইরে চলে গেল এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো ‘কাল্পনিক স্বর্ণমান’ ব্যবস্থা ধাক্কা খেলো।

১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট ওই ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটালো আমেরিকা। নিক্সন সেদিন স্বর্ণ বিনিময় বন্ধ করে দিলেন এবং কোষাগারে অবশিষ্ট ২৮০ মিলিয়ন আউন্স স্বর্ণ হতে আর কোনো পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকার করলেন। যে অস্বীকৃতির মূল কথা হলো; আমেরিকা তাদের অস্বচ্ছলতা ও প্রতারণার ঘোষণা দিলো এবং সব দেশই উপলদ্ধি করলো যে মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্য কোনো মুদ্রব্যাবস্থা সাজাতে হবে। বিস্ময়করভাবে এমন এক নতুন ব্যবস্থা সাজানো হলো; যে ব্যবস্থায় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই দুনিয়ার প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসাবে কাগুজে ডলার ছাপানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি পেয়ে গেল-- কাল্পনিক স্বর্ণমানে ডলার রূপান্তরযোগ্য হবে কিংবা এ ধরনের কোনো শর্ত ছাড়াই! ১৯৭১ সালে ঘোষণা করলো তারা আর ব্রিটন উডস সিস্টেম মানবে না, তারা নির্দিষ্ট কোন ডলার রেটে স্বর্ণ বেচাকেনা করবে না। স্বর্ণের দাম হবে অনির্দিষ্ট। মানে মার্কেট অটোমেটিকালী স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করবে। সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ডলার হয়ে গেলে ভাসমান মুদ্রা, এর এখন থেকে গোল্ডের উপর কোন ডিপেন্ডেন্সি নাই। ডলার তখন থেকে স্বর্ণ হতে স্বাধীনতা পেল।

এই নতুন ব্যবস্থা যদিও আগেকারটির চেয়ে আরো বেশি দুর্বল ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও এর ফলেও ডলার-আধিপত্য বিস্তারের দরজা খুলে দিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার প্রতি দেশগুলোর সংশয়ভাব রয়েছে এবং সবাই নতুন কিছু একটা চাইছে এটা বুজতে পরে শীর্ষ মুদ্রা ব্যবস্থাপকরা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জোর সমর্থন পেয়ে একটা আচানক কাজ করে বসলো। তারা ওপেক-এর সাথে চুক্তি করলো যে, দুনিয়াজুড়ে তেল বেচা-কেনার ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ডলারকেই বিনিময় মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা হবে। দুনিয়ার মুদ্রাগুলোর মধ্যে ডলারকে একটা বিশেষ জায়গা করে দিল এই চুক্তি। ডলার তেলের ওপর উঠে দাঁড়াল। চুক্তিতে এই সুবিধার বদলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিল যে, তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দেশগুলোকে অন্য রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে সুরক্ষা দেবে। এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে প্রচুর লাভবান করার মাধ্যমে ডলারকে কৃত্রিম শক্তি যোগাল। যার ফলে বিশ্ববাজারে ডলারের প্রভাব বাড়লো এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশাল ছাড়কৃত মূল্যে তেল ও অন্যান্য দ্রব্যাদি আমদানি করে নিজেদের মুদ্রাস্ফীতি রপ্তানি করার সুযোগ পেলো।

১৯৮০ তে সত্যিকারের ‘ডলার আধিপত্যের’ জমানা শুরু হলো। যে জমানা এখনো শেষ হয় নি। সব দেশকে ফরেইন রিজার্ভ আগে রাখতে হতো গোল্ডে। এখন সবাই রাখে ডলারে। গোল্ড থাকে আমেরিকায়। আমাদের ভল্টে থাকে শুধুই ডলার, যাহা কাগজ ছাড়া কিছুই নয়। এখন মনে করুন, বাংলাদেশে ফরেইন রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রকৃত মূল্য ধরে নিন ২ টন গোল্ড। এখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ধার-দেনা, যুদ্ধব্যায়ে তাদের ইচ্ছেমতো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপায়, এরপর এই ডলার সারাদুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ডলার ছাপানোয়, ডলারের মান কমে যায়, ব্যাপক ইনফ্লেইশন হয়। ফলে মনে করেন, মাত্র দশ মাসের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মূল্য কমে মাত্র ১ টন গোল্ড হয়ে যেতে পারে। মানে অন্য কথায়, যেকোন পণ্যের দাম ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাতে পারে। মানে আপনার জমাকৃত অর্থের মূল্য বিপদজনকভাবে কমে যেতে পারে এবং তা কমছেও। এটা বড় ধরনের জুলুম। যা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীবাসী ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ভার বহন করে আসছে।

এটার বিপরীতে নিজেকে আলাদা করে রেখেছে ইরান। তারা আন্তর্জাতিক ব্যবসা করে স্বর্ণ বা পণ্যের মাধ্যমে। সম্প্রতি কুয়ালালামপুর সামিটে চার মুসলিম নেতা নিজেদের মধ্যে ব্যবসায়ে কাগুজে মুদ্রার পরিবর্তে স্বর্ণ ও পণ্যের বিনিময়ে বেচাকেনা শুরুর চিন্তাভাবনা করছে। দেশগুলো হলো ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও কাতার। এই জোটে শামিল হওয়ার কথা ছিলো পাকিস্তানেরও। কিন্তু সৌদি হুমকির কারণে অন্যতম আয়োজক হওয়া সত্ত্বেও এটেইন করতে পারেনি ইমরান খান। দেখা যাক তারা ডলার কূটনীতিকে কীভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

মাওলানা আজিজুল হক ও হরকাতুল জিহাদ প্রসঙ্গ



সম্প্রতি একটি টেলিভিশন (যমুনা) আজিজুল হককে হুজির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এর বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছে কওমী সমাজ। বিশেষত আজিজুল হকের ছেলে মাওলানা মমিনুল হক ও তাদের সংগঠন। তারা ইতোমধ্যে বিক্ষোভ করেছে ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
কিন্তু যমুনা টিভির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলাকালে অনলাইন ও অফলাইনে কওমী আলেমরা হুজির ব্যাপারে যে মনোভাব দেখিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে হুজির লোকেরা কাফের বা জাহেল। তারা যেন জীবনেও হুজি দেখেন নাই, হুজির সাথে মিশেন নাই অথবা হুজিকে চিনেনই না। যমুনা অবশ্যই ভালো কাজ করে নাই আজিজুল হক সাহেবকে হুজির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা। তবে তাদের কাছে যদি কোনো প্রমাণ থাকে তবে তাদের সেটা উপস্থাপন করা দরকার।
তবে এর মানে এই না আজিজুল হক সাহেব হুজির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না। এদেশের সকল কওমী মাদ্রাসা ও কওমী আলেমরাই হুজির পৃষ্ঠপোষক। হুজি গোপনে প্রতিষ্ঠা হয়নি। প্রেসক্লাবে ঘটা করে তাদের প্রতিষ্ঠা হয়। হুজি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আজিজুল হকের মাদ্রাসা মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়াতে হুজির নিয়মিত সমাবেশ হতো। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত কওমী মাদ্রাসাগুলোতে ব্যানার টানিয়ে হুজি নিয়মিত প্রোগ্রাম করতো ও সদস্য সংগ্রহ করতো। আফগান যুদ্ধ চলাকালে এ দেশ থেকে প্রকাশ্যে মুজাহিদ সংগ্রহ করা হয়েছিল। তখন ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে ব্যানার টানিয়েও সদস্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। হুজি ছিলো কওমী অঙ্গনের স্বপ্নের সংগঠন। কওমী ছাত্ররা শিক্ষার্জন শেষে মুজাহিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতো হুজির মাধ্যমে।
১৯৮৪ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময় আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের খোস্ত রণাঙ্গনে দেওবন্দি যোদ্ধাদের নেতৃত্বে হুজির জন্ম হয়েছিল। তাদের বেসিক উদ্দেশ্য ছিল, যেখানে বা যে দেশে জিহাদ হবে, সেখানে মুজাহিদ পাঠানো। বাংলাদেশে এই সংগঠনটির শাখা খোলা হয়েছিল মিয়ানমারের আরাকানে স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা মুসলমানদের হয়ে লড়াই করার জন্য। বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালানো হয়েছে পরে বিভিন্ন এজেন্সির প্ররোচনায় ও বিপথগামী কিছু হুজি নেতার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যশোরের মনিরামপুরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকী। কিন্তু ওই বছরই আফগানিস্তানের খোস্তে মাইন অপসারণের সময় মাওলানা ফারুকী নিহত হন। এর পরে দীর্ঘদিন আর দেশে সংগঠনটির কাজ পরিচালিত হয়নি। পরে ১৯৯২ সালে ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে হুজির বাংলাদেশ শাখা। আফগানফেরত মুজাহিদদের বেশির ভাগই এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা ছিলেন এ দেশে ভারতের দেওবন্দ ধারার মাদ্রাসায় শিক্ষিত এবং হানাফি মাজহাবের। আফগান যুদ্ধের সময় তাঁরা গেরিলাযুদ্ধ ও ভারী অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে জিহাদী মনোভাব জাগ্রত করার জন্য এই সংগঠনের ভূমিকা অসাধারণ।
হুজিকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেতে কোন বেগ পেতে হয়নি। বাংলাদেশের সবক'টি কওমী মাদ্রাসা ছিলো এদের একেকটি শাখা। সংগঠনের আফগানফেরত মুজাহিদরা ছিলেন এ দেশে দেওবন্দ ধারার কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের কাছে বিরাট শ্রদ্ধার পাত্র। আর সেই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা আরাকানের ‘মজলুম মুসলমানদের’ পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন। তারা কওমী মাদ্রাসাগুলোতে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতেন আর তাতেই জিহাদী চেতনায় উজ্জিবিত হয়ে কওমী ছাত্র শিক্ষকরা তাদের সংগঠনে একটিভ হয়ে যেতেন। হুজি নেতারা এসব সদস্যদের মধ্যে বাছাই করা সদস্যদের জন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। এসব প্রশিক্ষণকেন্দ্র নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে নানা খবর বের হয়েছিল। যেভাবে তাঁরা সদস্য সংগ্রহ করতেন একইভাবে তাঁরা টাকাও সংগ্রহ করতেন। যারা সদস্য হতে পারতেন না তারাও দুই হাতে টাকা বিলিয়ে হুজিকে সাপোর্ট করতেন। অল্প কয়দিনের মধ্যেই হুজি একটি বিশাল ও সম্পদশালী সংগঠনে পরিণত হয়। তারা রোহিঙ্গাদের সাথে কাজ করতে শুরু করে। তাদের জিহাদের দিকে আহ্বান করে।
ইতিহাস থেকে দেখা যায় এসব সংগঠন বিশেষ করে কওমী আলেমদের সংগঠন কখনো এক্ত্র থাকতে পারে না। তারা খুবই নেতৃত্বলোভী। এ কারনে কওমীদের সব ধরনের সংগঠন বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর সেটা যদি কোনো সফল সংগঠন হয় তবে তা ভেঙ্গে পড়া আবশ্যক। হুজির ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। ১৯৯৮-৯৯ সালে হুজি তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, যার একাংশের নেতৃত্বে ছিলেন গোপালগঞ্জের মুফতি আবদুল হান্নান। আরেক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন মাদারীপুরের মুফতি আবদুর রউফ। আর হুজির মূলধারাটি আবদুস সালাম, সিলেটের হাফেজ ইয়াহিয়া, কিশোরগঞ্জের মুফতি শফিকুল ইসলাম, কুমিল্লার আবদুল হাই, খুলনার শেখ ফরিদদের নেতৃত্বে ছিল।
এর মধ্যে আব্দুর রঊফের সংগঠন নাম পরিবর্তন করে অন্য সংগঠনে পরিণত হয় ও তাদের কার্যক্রম কমে যায়। আব্দুল হান্নান তাদের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে মিয়ানমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজ দেশে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। আব্দুস সালামের মূলধারা রোহিঙ্গাদের সাথেই কাজকে প্রাধান্য দেন। আরাকানে হুজিরা মোটেই সফলতা পায়নি, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জিহাদে আগ্রহী করতে সমর্থ হয়নি ফলে তাদের উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। আব্দুল হান্নান সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে দেশে কার্যক্রম শুরু করলে ও কিছু গেরিলা আক্রমণ চালালে হুজির সদস্যরা তার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার দল মূল দলে পরিণত হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৯৯ সাল পর্যন্ত হুজি নিজেদের মজবুতি অর্জন করে। ২০০৩ সাল থেকে মুফতি হান্নান তার ভাষায় এদেশের সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, মওদুদীবাদী ও কাদিয়ানী রাজনীতিবিদদের হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার (!) একটি স্বপ্ন দেখে। কিছু গেরিলা হামলা ও হত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে জোট সরকার তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
অনেকে বলে থাকেন হুজি বাংলাদেশে প্রথম ইসলামী যোদ্ধাদের সংগঠন। কিন্তু তা সঠিক নয়, এর আগে মেজর মতিউর নামে একজন মুসলিম মিল্লাত বাহিনী নামে একটি সংগঠন কায়েম করেন। ১৯৮৬ সালে এই বাহিনী গঠন করেন চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা মতিউর রহমান। এর কয়েক বছর আগে কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি ফিলিস্তিনে গিয়েছিলেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে লড়াই করতে। এ জন্য তাঁরা ভাতাও পেয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাত বাহিনীর প্রধান চাকরিচ্যুত মেজর মতিউর রহমান মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে এসে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার শিমুলিয়ায় নিজ গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। সেখানেই তিনি তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন।
পাকুন্দিয়ার ওই আস্তানায় সদস্যদের থাকার জন্য ১৩১টি ঘর ও বেশ কিছু তাঁবু এবং ৬১টি পরিখা (বাংকার) তৈরি করা হয়েছিল। ছিল নিজস্ব জেনারেটরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা। একটা মাদ্রাসাও করা হয়েছিল সেখানে। নাম ‘শিমুলিয়া ফরজে আইন মাদ্রাসা’। তার ফরজে কেফায়া বিভাগে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হতো। যতদূর জানা যায় তারা দেওবন্দি আকিদার ছিলেন না। তারা ওয়াহাবি মতবাদের অনুসারী ছিলেন। যারা বর্তমানে আহলে হাদীস ঘরানার। আরো স্পষ্ট করতে চাইলে বলা যায় জেএমবি মতাদর্শের সংগঠন ছিলো।
১৯৮৯ সালের ১২ ডিসেম্বরে পুলিশ পীর মেজর (অব.) মতিউর রহমানের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। আড়াই দিন ধরে চলে ওই যুদ্ধ। এতে পুলিশের দুই সদস্যসহ ২১ জন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মর্টারের গোলাবর্ষণও করতে হয়েছিল। আহত অবস্থায় পালাতে গিয়ে পীর মতিউর ও তাঁর বহু সঙ্গী গ্রেপ্তার হন। তাঁর আস্তানা থেকে রাইফেল, রিভলবার, বন্দুক, তীর-ধনুক, বল্লম, লাঠি, তলোয়ারসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গুলি, খাকি পোশাক ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।