২৫ ডিসে, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-২২ : অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বিদ্রোহ



ইংরেজরা বাংলা দখল করেই তাদের দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে। দালালদের নানাবিদ সুযোগ সুবিধা দিয়ে গোটা ভারতবাসীকে শাসন-শোষণ করার ভিত্তি পাকাপোক্ত করে নেয় ইংরেজ। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীজ বপন করে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ভেঙ্গে দেয়। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে কেরানী বানানোর জন্য, শিক্ষানীতিসহ বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন করতে থাকে। বাংলার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য ইংরেজ তার স্বার্থের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করে।

ইংরেজ শাসনকে শাসন না বলে বলা বলা উচিত লুটপাট, অরাজকতা শোষণ, ত্রাস, নিপীড়ন ও নির্যাতন। এই বাংলায় ইংরেজদের লুটপাট শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তারা বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই বিদ্রোহ হয়েছে একেবারেই যারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় তাদের দ্বারা। পলাশী যুদ্ধের মাত্র তিন বছর পরই শুরু হয় ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। ফকিরদের এই বিদ্রোহের মূল কারণ ছিলো লাখেরাজ সম্পত্তি ও নবাব কর্তৃক অনুদান। বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরু থেকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিলো অসাধারণ। হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের ধর্মীয় পণ্ডিতরা লাখেরাজ সম্পত্তি ও অনুদান পেতেন। এটি সুলতানি আমল থেকেই চলমান ছিলো। লাখেরাজ সম্পত্তি মানে হলো করহীন ভূমি। ইংরেজরা তাদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রথমে অনুদান বাতিল করে এবং পরে লাখেরাজ সম্পত্তি বাতিল করে। এতে ফকির সন্ন্যাসীদের জীবন ও স্বাভাবিক কর্ম বাধাগ্রস্থ হয়।

সম্মিলিত হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ধার্মিক ফকিরদের একটা বৃহৎ গোষ্ঠী যাঁরা পবিত্রস্থান দর্শনের উদ্দেশ্যে উত্তর ভারত থেকে বাংলার বিভিন্নস্থান ভ্রমণ করতেন। যাওয়ার পথে এসব সন্ন্যাসী-ফকিরগণ গোত্রপ্রধান, জমিদার অথবা ভূস্বামীদের কাছ থেকে ধর্মীয় অনুদান গ্রহণ করতেন যা তখন রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্ষমতা লাভ করে তখন থেকে করের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। ফলে স্থানীয় ভূস্বামী ও গোত্রপ্রধানগণ সন্ন্যাসী-ফকিরদেরকে ধর্মীয় অনুদান প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়ে। উপরন্তু ফসলহানি, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যাতে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। এই কারণে সন্ন্যাসী-ফকিরেরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে এবং যার ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠে 'ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ'।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নায়ক ও সংগঠক ছিলেন ফকির মজনু শাহ। এই বিদ্রোহের অন্যান্য নেতৃত্বের মধ্যে ছিলেন তাজশাহ, চেরাগ আলী শাহ, মুছা শাহ, পরাগল শাহ, করম শাহ প্রমুখ। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নায়ক ভবানী পাঠক। ১৭৬০ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার পুতুল নবাব মীর জাফর আলী খানকে সরিয়ে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মীর জাফর আলী খানের জামাতা মীর কাসেম আলী খানকে বাংলার নবাবের গদিতে বসান। পলাশী যুদ্ধের (১৭৫৭) তিন বছর পর বাংলায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে মজনু শাহ- এর নেতৃত্বে ১৭৬০ সালে ফকির বিদ্রোহ শুরু হয়। উত্তরবঙ্গে, বিশেষ করে রংপুরে এ বিদ্রোহ কালক্রমে ব্যাপক রূপ ধারণ করে।

কোম্পানির শোষণ ও অপশাসনের হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সনাতন অধিকার ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সমন্বয়ে জ্বলে ওঠে এই ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আগুন। টমাস ব্রস্টনের তথ্য মতে, হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ফকির সন্ন্যাসীদের দল। এরা এদেশের স্থায়ী অধিবাসী এবং ধর্ম সম্প্রদায় হিসেবে জীবনযাপন করলেও জীবিকার্জনে নির্দিষ্ট পেশা ছিল তাঁদের। কোম্পানির শাসনের ফলে তাঁদের স্বাধীন চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। ক্ষুন্ন হয় তাঁদের ধর্মপালনের অধিকার। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তাঁরা বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ফকিরদের নেতা ফকির মজনু শাহ গড়ে তোলেন দুর্বার ফকির বিদ্রোহ এবং ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকে অবিভক্ত বাংলার নানা স্থানে এই বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে থাকে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর বগুড়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহে ফকির সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ বেগবান হয়ে ওঠে'।

ফকির মজনু শাহের জন্ম তারিখ জানা যাননি। তিনি মীরাটের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর জন্ম দিল্লীর কাছাকাছি হলেও আমৃত্যু তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল বাংলায়। ফকির মজনু শাহ ছিলেন মাদরিয়া সম্প্রদায়ের সূফিসাধক বা ফকির। তাঁর বংশ ও পরিচয় প্রায় অজ্ঞাত। তাঁর আসল নামও অজ্ঞাত। কখন মজনু শাহ বুরহানা বা মজনু ফকির নামে পরিচিত হলেন সেটাও জানা যায়নি। তবে তিনি ফকির মজনু শাহ নামেই সমাধিক পরিচিত ছিলেন বলে জানা যায়। বাংলার মাদরিয়া সূফিসাধক সুলতান হাসান সুরিয়া বুরহানার মৃত্যুর পর তিনি মাদরিয়া তরিকা গ্রহণ করেন। মজনু শাহ সাধারণত দিনাজপুর জেলার বালিয়াকান্দিতে বসবাস করতেন।

বগুড়া জেলার বারো মাইল দক্ষিণে গোয়াইল নামক স্থানের নিকট সদরগঞ্জ ও মহাস্থানগড় ছিল তাঁর কাজের প্রধান কেন্দ্র। বিহারের পশ্চিম প্রান্ত থেকে বাংলার পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে তিনি বিচ্ছিন্ন কৃষক ও কারিগর বিদ্রোহীদের ঐক্যবদ্ধ করে একটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিচালনাধীনে আনবার চেষ্টা করেছিলেন। এই বিদ্রোহে তিনি কখনও সৈন্য সংগ্রহকারী, কখনও প্রধান সেনাপতি হিসেবে আবার কখনও সমগ্র বঙ্গদেশ ও বিহারের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহীদের সংঘবদ্ধ করতে ব্যস্ত ছিলেন।

১৭৬৩ সালে মজনু শাহ এবং ফকিরদের নেতৃত্বে ইংরেজ কোম্পানীর ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাঁর সঙ্গে ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে হিন্দু সন্ন্যাসীগণও যোগ দেয়ায় এ বিদ্রোহ ব্যাপকতর রূপ লাভ করে। ১৭৬৩ সালে ফকির বিদ্রোহীরা বরিশাল এবং ঢাকায় ইংরেজদের কোম্পানীর কুঠি আক্রমণ করে দখল করে নেন। ১৭৬৩, ১৭৬৪ সালে ফকির সিপাহীগণ রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্য কুঠি আক্রমণ করে। এ বাণিজ্য কুঠিগুলো শুধুমাত্র জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার ছিল না, এগুলো ছিল অস্ত্রের কেল্লাও। ওই সময় থেকে ঢাকাসহ বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, পুর্ণিয়া, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর ও যশোর জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণের তীব্রতা ছিল মারাত্মক। ১৮০০ সাল পর্যন্ত তা চলে প্রায় অব্যাহতভাবে। ঢাকা জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন বা বিদ্রোহ শুরু হয় ১৭৬৩ সাল থেকে। ১৭৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার স্থানীয় প্রশাসন হয়ে পড়ে প্রায় অবরুদ্ধ। ১৭৭১ সালের ২৮ মার্চ এক যুদ্ধের মাধ্যমে ফকির-সন্ন্যাসীর হাত থেকে ঢাকা মুক্ত হয়। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের বড় আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা কালেক্টর জানান হনুমানগিরির নেতৃত্বে বহু সংখ্যক বিদ্রোহী সন্ন্যাসী ঢাকার পাকুল নামক স্থানে জড়ো হয় এবং তাঁরা জনৈক জমিদারের গোমস্তা রামলোচন বসুকে অপহরণ করে। এ সময় তাঁরা রামলোচন বসুর কাছ থেকে ৪,২০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু কোম্পানির সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ময়মনসিংহের দিক তাঁরা চলে যান। ঢাকায় ফকির-সন্ন্যাসীদের সর্ববৃহৎ আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৭৭৩ সালের মার্চ মাসে। তখন দলবদ্ধ আক্রমণে ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডকে তাঁরা হত্যা করেন।

১৭৬৯ সালে ফকিররা রংপুর আক্রমণ করেন। সেনাপতি লেফটেনেন্ট কিং সৈন্যসহ বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য রংপুর গমন করেন। যুদ্ধে কোম্পানীর সৈন্য পরাজিত হয় এবং সেনাপতি লেফটেনেন্ট কিং নিহত হন। ১৭৭১ সালে মজনু শাহের নেতৃত্বে আড়াই হাজার বিদ্রোহী সৈন্য (ফকির) বিরাট ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হলে তিনি মহাস্থানগড়ের সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নেন। পরে বিদ্রোহের প্রয়োজনে বিহার যান। ১৭৭১ সালে ১৫০ জন ফকিরকে হত্যা করে ইংরেজরা। যা প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এ ক্ষোভ পরবর্তীকালে ভয়াবহ রূপ নেয়।

১৭৭২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নাটোর অঞ্চলে মজনু শাহের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁরা এই অঞ্চলের অত্যাচারী ধনী ও জমিদারদের এবং ইংরেজ শাসকের অনুচরদের ধনসম্পদ দখল করে নিতেন এবং তা কৃষকদেরকে দিতেন। এভাবে তাঁরা কৃষকের উপর ইংরেজদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেন। ১৭৭২ সালের ৩০ জুন রংপুরের শ্যামগঞ্জে ১৫০০ ফকির বিদ্রোহী জমায়েত হন। ফকির সন্ন্যাসীরা একত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বর্শা, তরবারি, বন্দুক, ত্রিশূল, গাদা বন্দুক, পিতলের বাঁটঅলা লাঠি এসবই ছিল তাঁদের প্রধান অস্ত্র। তাঁদেরকে দমন করার জন্য ক্যাপ্টেন টমাস একদল সৈন্য নিয়ে শ্যামগঞ্জ আসেন। ফকির বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে কোম্পানীর সৈন্যরা পরাজিত হয় এবং ক্যাপ্টেন টমাস নিহত হয়। ময়মনসিংহের শেরপুরে ফকির করম শাহ এবং তাঁর পুত্র টিপু শাহের নেতৃত্বে শেরপুরের কৃষকেরা ইংরেজদের আধিপত্য অস্বীকার করে বিদ্রোহ করে। গারো ও হাজং উপজাতীয়রাও এই যুদ্ধে ফকিরদের সহযোগিতা করে।

বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংরেজরা নতুন নতুন আইন প্রবর্তন করে। বিদ্রোহীদের গোপন সংগঠন, গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চলাচল সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য জমিদারদের এমনকি কৃষকদেরও আইন দ্বারা বাধ্য করা হয়েছিল। ইংরেজ শাসনের প্রথম থেকেই, সন্ন্যাসী ও ফকিরদের তীর্থ ভ্রমণের ওপর নানারকম কর বসিয়ে তাঁদের ধর্মানুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হত। ইংরজে শাসকরা এমন কতকগুলো আইন তৈরি করে যার ফলে তীর্থভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা যাতে বিপদের সময় পাশের ভুটান রাজ্যে আশ্রয় না নিতে পারেন সেজন্য ১৭৭৪ সালে ভুটানের রাজার সঙ্গে ইংরেজরা একটি চুক্তি করে। এতে বলা হয় ইংরেজ শাসকরা যাদের শত্রু বলে মনে করবে তাদের ভুটানে আশ্রয় দেওয়া চলবে না। প্রয়োজনে ইংরেজ বাহিনী ভুটানে প্রবেশ করে পলাতক বিদ্রোহীদের বন্দী করতে পারবে।

১৭৭৪ সালের শেষ ভাগ থেকে কয়েকটি অঞ্চলের বিদ্রোহী দলগুলি বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো আক্রমণ শুরু করলেও প্রকৃত সংগ্রাম আরম্ভ হয় ১৭৭৬ সালের শেষ দিক থেকে। এই সময় মজনু শাহ উত্তরবঙ্গে ফিরে এসে ছত্রভঙ্গ বিদ্রোহীদের আবার সঙ্ঘবদ্ধ করার ও নতুন লোক সংগ্রহের চেষ্টা করেন। দিনাজপুর জেলায় মজনু শাহের উপস্থিতির খবরে ইংরেজ শাসক এতই ভীত হয়েছিল যে, অবিলম্বে জেলার সব জায়গা থেকে রাজস্বের সংগৃহীত অর্থ দিনাজপুর শহরের সুরক্ষিত ঘাঁটিতে স্থানান্তরিত করে রাজকোষের রক্ষীবাহিনীর শক্তি বাড়ানো হয়। অন্যদিকে মজনু শাহ বগুড়া থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একটা প্রকাণ্ড ইংরেজবাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে আপাতত যুদ্ধ এড়াবার জন্য করতোয়া নদী এবং ময়মনসিংহ জেলার সীমান্ত পার হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঘাঁটি স্থাপন করেন।

১৭৭৬ সালের ১৪ নভেম্বর একটি ইংরেজ সৈন্যদলের সঙ্গে মজনু শাহ'র বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। ইংরেজদের গুলির হাত থেকে বাঁচতে মজনু শাহ সদলবলে জঙ্গলের মধ্যে পালাতে বাধ্য হন। শত্রুরা তাঁদের পিছু নিলে বিদ্রোহীরা হঠাৎ পিছন ফিরে ইংরেজ সৈন্যদলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই আক্রমণে কয়েকজন ইংরেজ সেনা নিহত হন এবং সেনাপতি লেফটেনান্ট রবার্টসন গুলির আঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়েন। এরপর মজনু শাহ সদলে জঙ্গলে আত্মগোপন করেন।

এই সময় সন্ন্যাসী ও ফকিরদের আত্মকলহ সশস্ত্ররূপ ধারণ করে ১৭৭৭ সালে বগুড়া জেলায় একদল সন্ন্যাসীর সঙ্গে মজনু শাহের ফকির সম্প্রদায়ের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এরপর প্রায় তিনবছর ধরে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে মজনু শাহ সন্ন্যাসী ও ফকিরদের আবার সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে বগুড়া, ঢাকা এবং ময়মনসিংহের বহু অঞ্চলের জমিদারদের কাছ থেকে 'কর' আদায় ও বহু স্থানে ইংরেজ সরকারের কোষাগার লুট করেন। অনুচরদের ওপর তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল, তাঁরা যেন জনসাধারণের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার বা বলপ্রয়োগ না করেন এবং জনগণের স্বেচ্ছার দান ছাড়া কোনও কিছুই গ্রহণ না করেন। ইংরেজদের বিদ্রোহ দমনের বিপুল আয়োজন সত্ত্বেও তিনি ও তাঁর অনুচররা সমগ্র উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন জায়গায় প্রবল বিক্রমে কাজ চালিয়ে যান।

উপরে ফকীর বিদ্রোহের কিছু বিবরণ দেয়া হলো। তবে ফকীরদের সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা ইংরেজ লেখক ও ইতিহাসকারদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা অনুমান করার যথেষ্ট কারণ আছে। ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁদেরকে বেদুইন বলেছেন, আর হান্টার বলেছেন ‘ডাকাত’। তাঁদের আক্রমণ অভিযানে কয়েক দশক পর্যন্ত নব প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশরাজ এখানে টলটলায়মান হয়ে পড়েছিল, সম্ভবতঃ সেই আক্রোশেই তাদের ইতিহাস বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন মজনু শাহ ভারতের গোয়ালিয়র রাজ্যের মেওয়াত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কানপুরের চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত মাকানপুরে অবস্থিত শাহ মাদারের দরগায় মজনু শাহ বাস করতেন। সেখান থেকেই হাজার হাজার সশস্ত্র অনুচরসহ তিনি বাংলা বিহারের বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ ও অত্যাচারী জমিদারদে বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তাঁর কার্যক্ষেত্র বিহারের পুর্ণিয়া অঞ্চল এবং বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, রাজশাহী, মালদহ, পাবনা ময়মনসিংহ ছিল বলে বলা হয়েছে।

১৭৭২ সালের প্রথমদিকে মজনু শাহ বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র অনুচরসহ উত্তর বংগে আবির্ভূত হন। তাঁর এ আবির্ভাবের কথা জানতে পারা যায় রাজশাহীর সুপারভাইজার কর্তৃক ১৭৭২ সালের ২২শে জানুয়ারী তারিখে কোম্পানীর কাছে লিখিত এক পত্রে। তাতে বলা হয়, তিনশ’ ফকীরের একটি দল আদায় করা খাজনার এক হাজার টারা নিয়ে গেছে এবং আশংকা করা যাচ্ছে যে, তারা হয়তো পরগণা কাচারীই দখল করে বসবে। তলোয়ার, বর্শা, গাদাবন্দুক এবং হাউইবাজির হাতিয়ারে তারা সজ্জিত। কেউ কেউ বলে তাদের কাছে নাকি ঘূর্ণায়মান কামানও আছে।

১৭৭৬ সালে মজনু শাহ বগুড়া মহাস্থান আগমন করে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। সে সময় বগুড়া জেলার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মিঃ গ্লাডউইন। তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে প্রাদেশিক কাউন্সিলের কাছে সৈন্য সাহায্য চেয়ে পাঠান। ১৭৮৬ সালের আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ফকীর সর্দারকে (মজনু শাহ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে পর পর দু’টো সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ফকীরদের পক্ষে যেমন কিছু লোক হতাহত হয়, ইংরেজদেরও অনুরূপভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়।  

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে অনুমিত হয় যে, এরপর গঙ্গা পাড়ি দিয়ে মজনু শাহ দেশে চলে যান। আর কোন দিন তাকেঁ বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর সৈন্যসহ বগুড়া জেলা থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা করার পথে কালেশ্বর নামক স্থানে মজনু শাহ ইংরেজ বাহিনীর সম্মুখীন হন। এই যুদ্ধে মজনু শাহ মারাত্মকভাবে আহত হন। ১৭৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিহারের মাখনপুর গ্রামের এক গোপন ডেরাতে ফকির বিদ্রোহের এই নায়কের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। আনুমানিক ১৭৮৭ সালে কানপুর জেলার মাখনপুর এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে সরকারী সূত্রে জানা যায়। তাঁর মৃতদেহ সেখান থেকে তাঁর জন্মভূমি মেওয়াঁতে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

১৭৮৭ সালে ফকির মজনু শাহ মৃত্যুবরণ করার পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, সোবহান শাহ, মাদার বকস, করিম শাহ প্রমুখ ফকির নেতা প্রাণপণ চেষ্টা করেও ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি। যে কারণে ফকির আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। আপাত ব্যর্থ মনে হলেও ফকির বিদ্রোহই ছিলো এই অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী মানুষদের প্রেরণার স্থল। যেই প্রেরণা থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বারংবার বিদ্রোহী হয়েছে বাঙালীরা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন