১১ জুলাই, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৪৫ : কোণঠাসা কংগ্রেসের সাথে মুসলিম লীগের কতক ঐক্য প্রচেষ্টা



হিন্দুস্থানে মুসলমানদের প্রতি কংগ্রেসের হিংসাত্মক মনোভাব এবং তাদের নির্মূল করে অথবা অন্তত অধীনস্ত করে রেখে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছিলো। ফলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে পরেছিলো। কংগ্রেসের পলিসি অনেকটা এরকম ছিল যে, যে কোন ব্যাপারে যদি দেখা যায় যে মুসলমানগণ সামান্য কিছু সুযোগ সুবিধা লাভ করছে, তখন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভংগ করার ন্যায় কংগ্রেস তা কিছুতেই হতে দেবে না। ক্রিপসের প্রস্তাবে কিছুটা পাকিস্তান বা ভারত বিভাগের গন্ধ আবিস্কার করে কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করেছে। অতঃপর যুদ্ধে ব্রিটিশের পরাজয় অবধারিত মনে করে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন তথা ভারতের সর্বত্র বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে চরম ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড শুরু করে। 

তারা আশা করেছিল, জাপানীরা ভারতের একাংশ দখল করে নিতে পারলে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের দাবী মানতে বাধ্য হবে এবং সারা ভারতে সে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। এই বিষয়ে তারা অত্যন্ত আশাবাদী ছিলো। তাই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা দূরে থাক উল্টো সমঝোতা যা হয়েছে পূর্বে তা বাতিল করে দিলো গান্ধি-নেহেরুরা। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো। পুরো বিষয়টা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে গেছে। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন কোন মহলই সমর্থন করেনি। এমনকি হিন্দু মহাসভা ও কমিউনিষ্ট পার্টি পর্যন্ত এর তীব্র সমালোচনা করেছে। আজীবন ইংরেজদের অনুকূলে থাকা কংগ্রেস নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক। গান্ধীসহ সকল কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর যাদের ওপর ভরসা করে এতো আয়োজন সেই জাপানীরা ভারত দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে। 

কংগ্রেসের এই পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগ মুসলিম প্রধান প্রদেশগুলোতে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে গেছে। ১৯৪৩ এবং ১৯৪৪ সালে বাংলা, আসাম, সিন্ধু ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা বলবৎ ছিল। পাঞ্জাবে মুসলিম ইউনিয়নিষ্ট পার্টির মন্ত্রীসভাও মুসলিম লীগ ও ভারত বিভাগ সমর্থন করতেন। ফলে জনগণের সাথে গভীর যোগাযোগ থাকার কারণে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং পাকিস্তান আন্দোলনও শক্তিশালী হতে থাকে। এতে করে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে গান্ধী ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলের কাছে লিখিত এক পত্রে বলেন, তিনি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে যুদ্ধ প্রচেষ্টায় ব্রিটিশদের পূর্ণ সহযোগিতা করার জন্যে কংগ্রেসকে পরামর্শ দিতে চান। এর অর্থ হলো কংগ্রেস আগের মতো ব্রিটিশদের সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে গান্ধী শর্ত জুড়ে দেন, সহযোগিতা করা হবে যদি দ্রুতই ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং যুদ্ধ চলাকালে ভারতের উপর কোনো আর্থিক বোঝা চাপানো না হয়।

ভাইসরয় এ পত্রের জবাব দেন ১৫ই আগষ্টে। বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সর্বসম্মত শাসনতন্ত্র প্রণীত হলে ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে প্রস্তুত আছেন। তারা পূর্বে বৃটেনের সাথে একটি চুক্তিও সম্পাদিত হতে হবে। গান্ধীর দাবী অনুযায়ী কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের নিকট দায়ী একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে হলে বর্তমান শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করতে হবে। তা এখন কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে ভাইসরয় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রচলিত শাসনতন্ত্রের অধীন একটি পরিবর্তনকালীন সরকার গঠনে সহযোগিতা করার জন্যে সকলের প্রতি আহবাদ জানাচ্ছি। সকল দল ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পন্থা পদ্ধতি নিয়ে নীতিগতভাবে একমত হলে প্রস্তাবিত সরকার ভাল কাজ করতে পারবে। গান্ধী তার স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ব্রিটিশ সরকার ৪০ কোটি মানুষের উপর যে শাসন ক্ষমতা লাভ করে আছেন, তা ততোক্ষণ পর্যন্ত হস্তান্তর করতে রাজী নন, যতোক্ষণ না ভারতবাসী তা ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষমতা লাভ করেছে।

গান্ধীর এ কথায় আরো একটি সহিংহ আন্দোলনের হুমকি প্রচ্ছন্ন ছিল। যাহোক ভাইসরয়ের নিকট থেকে নৈরাশ্যজনক জবাবে কতিপয় কংগ্রেস নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে যোগাযোগ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁদের ধারণা, কংগ্রেস তার প্রচেষ্টায় সরকারের সাথে একটা সমঝোতায় আসতে পারলে তো খুবই ভালো হতো। কিন্তু তা যখন সম্ভব নয়, তখন মুসলিম লীগের সাথেই একটি সমঝোতা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

সি আর ফর্মুলা
কংগ্রেসের এ ধরনের মনোভাব পরিবর্তনের পূর্বে প্রবীণ কংগ্রেসী নেতা চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারিয়া এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, শাসনতান্ত্রিক অবলাবস্থায় অবসানের জন্যে ভারত বিভাগ অপরিহার্য। তিনি এ বিষয়ে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে সম্মত করার জন্যে জনসভায় তার মনোভাব ব্যক্ত করতে থাকেন। তেতাল্লিশের এপ্রিলে মাদ্রাজের এক জনসভায় তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পক্ষে। কারণ আমি এমন রাষ্ট্র চাই না, যেখানে আমাদের হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের কোন মান সম্মান নেই। মুসলমান পাকিস্তান লাভ করুক। ব্রিটিশ সরকার অসুবিধা সৃষ্টি করলে তার মুকাবিলা আমরা করবো। ...আমি পাকিস্তানের পক্ষে, তবে আমি মনে করি কংগ্রেস এতে রাজী হবে না। 

রাজা গোপালাচারিয়া আরও বলেন, আমরা ব্রিটিশ শাসনের অবসান চাই। হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক মতানৈক্যও আমরা মিটাতে চাই। মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বশীল হিসাবে মুসলিম লীগকে আমাদের মেনে নিতে হবে। তারা চায় যে আমরা তাদের দাবি মেনে নিই। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবী পাকিস্তান। রাজা গোপালচারিয়া ১৯৪৩ সালে একটি ফর্মূলা তৈরি করেন যা সি আর ফর্মূলা নামে অভিহিত। ফর্মূলাটি কংগ্রেস লীগের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন। কারাগারে গান্ধীর অনশনরত অবস্থায় তার সাথে সাক্ষাৎ করে ফর্মূলাটি তাঁকে দেখানো হয় এবং গান্ধী তা অনুমোদন করেন। অতঃপর ১০ই জুলাই ১৯৪৩, ফর্মূলাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।



কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিস্বরূপ ফর্মূলাটি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মেনে নিয়ে তাঁরা যথাক্রমে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগকে মেনে নেয়ার জন্যে চেষ্টা চালাবেন। ফর্মুলার বিষয়বস্তু নিম্নরূপ : 
১। স্বাধীন ভারতের শাসনতন্ত্র সম্পর্কে নিম্নোক্ত শর্তাবলী সাপেক্ষে মুসলিম লীগ ভারত স্বাধীনতার দাবী সমর্থন করছে এবং পরিবর্তনশীল সময়ে একটি সাময়িক মধ্যবর্তী সরকার গঠনে কংগ্রেসের সাথে সহযোগিতা করবে।
২। ভারতের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে, যেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে সীমানা নির্ধারণের জন্যে একটি কমিশন নিয়োগ করা হবে। তারপর সে সব অঞ্চলে বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং গণভোট দ্বারা ভারত থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি মীমাংসি হবে। ভারত থেকে পৃথক একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সপক্ষে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়া যায় তাহলে সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তবে সীমান্তের জেলাগুলোর যে কোন রাষ্ট্র যোগদানের অধিকার থাকবে।
৩। গণভোট অনুষ্ঠানের পূর্বে সকল দলের বক্তব্য পেশ করার অধিকার থাকবে।
৪। ভারত থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তের পর প্রতিরক্ষা, ব্যবসাবাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যে পারস্পরিক চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।
৫। অধিবাসী স্থানান্তর হবে সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত ও ঐচ্ছিক।
৬। ভারত শাসনের জন্যে বৃটেন কর্তৃক সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের বেলায় ফর্মুলার শর্তাবলী অবশ্য পালনীয় হবে।

মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ফর্মুলাটি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব জিন্নাহর উপর অর্পিত হয়। বিষয়টি নিয়ে গান্ধী-জিন্নাহর মধ্যে বহু পত্রবিনিময় হয়। জিন্নাহ কতকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেন। গান্ধী সকল প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হন। অবশেষে চক্রবর্তী রাজা গোপালচারিয়ার  উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। 

সি আর ফর্মুলার ব্যর্থতার কারণ
এই সমঝোতা চেষ্টার ব্যর্থতার মূল কারণ গান্ধী ও তাদের পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব। গান্ধী মুসলমানদের পাকিস্তান দাবী কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। টু-নেশন থিওরি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একমাত্র কংগ্রেসকেই তিনি সকল ভারতবাসীর প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বলে বিশ্বাস করেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাসীকে দেখানো যে তিনি একটা সমঝোতায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সি আর ফর্মুলায় অনুমোদন করার কারণ আগের মতোই মুসলিম লীগের ঠুনকো চুক্তি করা। যাতে প্রয়োজনের সময় মুসলিম লীগকে কাছে পাওয়া যায় আর প্রয়োজন শেষে সমঝোতা বাতিল করা যায়। কিন্তু জিন্নাহ যখন প্রতিটি পদক্ষেপ যাচাই করছিলেন তখন গান্ধীর পাকিস্তান মেনে না নেয়ার বিষয়টি সামনে চলে আসে ও আলোচনা ভেস্তে যায়।   

সাপ্রু প্রস্তাব
সি আর ফর্মূলা ব্যর্থ হওয়ার পর তেজবাহাদুর সাপ্রু কতিপয় প্রস্তাব পেশ করেন কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। সাপ্রু নির্দলীয় সম্মেলনের স্ট্যান্ডিং কমিটি ১৯৪৪ সালের ৩রা ডিসেম্বর এলাহাবাদে মিলিত হয় এবং একটি কমিটি গঠন করেন। তার সদস্য হলেন, স্যার তেজবাহাদুর সাপ্রু (চেয়ারম্যান), এম, আর জয়াকর (তিনি হাজির হননি), বিশপ ফস ওয়েস্টকট, এস রাধাকৃষ্ণ, স্যার হোসি মোদী, স্যার মহারাজ সিংহ, মুহাম্মদ ইউনুস, এন আর সরকার, ফ্ল্যাংক এন্টনী এবং সন্ত সিংহ। অতঃপর সাপ্রু ১০ ডিসেম্বর জিন্নাহর নিকটে লিখিত পত্রে গঠিত কমিটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বর্ণনা করে সাক্ষাতপ্রার্থী হন।

জিন্নাহ ১৪ই ডিসেম্বর পত্রের জবাবে বলেন, তিনি কোন নির্দলীয় সম্মেলন অথবা তার স্ট্যান্ডিং কমিটিকে কোনরূপ স্বীকৃতি দানে নারাজ। সাপ্রু পরের বছর, ১৯৪৫ সালের ৮ এপ্রিল তার কমিটির প্রস্তাবগুলির ঘোষণা দেন। কমিটির প্রস্তাবগুলোতে তার মনোভাবই পরিস্ফুট হয়েছে। প্রস্তাবের প্রথম দফায় দৃঢ়তার সাথে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করা হয়েছে। পৃথক নির্বাচন রহিত করারও প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবগুলো মুসলমানদের নিকটে যে কিছুইতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা তা বলার প্রয়োজন করে না। জিন্নাহ এ কমিটিকে কংগ্রেসের গৃহ চাকরানীর সাথে তুলনা করে বলেন, এ কমিটি গান্ধীর সুরে সুর মিলিয়েই কথা বলছে।

দেশাই-লিয়াকত চুক্তি
১৯৪৫ সাল। ভারত ছাড় আন্দোলনের দায়ে তখনও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কারাগারে। ভারতের পত্রপত্রিকায় কংগ্রেস-লীগের মধ্যে চুক্তির খবর বা গুজব প্রকাশিত হতে থাকে। কেন্দ্রীয় আইনসভার কংগ্রেস সদস্যগণ কয়েক মাস ধরে নিয়মিত আইনসভায় যোগদান করতে থাকেন এবং আইনসভার মুসলিম লীগ সদস্যদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে থাকেন। কংগ্রেস পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা ভুলাভাই দেশাই লীগ দলের নেতা লিয়াকত আলী খানের সাথে পুরোপুরি একমত হয়ে কাজ করছেন বলে শোনা যায়। একটি সাময়িক জাতীয় সরকারের সংবিধান নিয়ে উভয় নেতা একটি সমঝোতায় উপনীত হয়েছেন বলেও শোনা যায়। দেশাই ১৩ই জানুয়ারী ভাইসরয়ের প্রাইভেট সেক্রেটারী স্যার ইভান জেনকিন্সের সাথে এবং ২০শে জানুয়ারী ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাতে দেশাই-লিয়াকতের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে বলে ভাইসরয়কে অবহিত করা হয়। দেশাই বলেন, এ চুক্তির প্রতি গান্ধীর সমর্থন আছে। তিনি আরও বলেন যে, লিয়াকত আলীর সাথে আলোচনার বিষয় সম্পর্কে জিন্নাহ অবহিত আছেন এবং তিনি এ কথিত চুক্তি অনুমোদন করেন।

কথিত চুক্তি অনুসারে কংগ্রেস এবং লীগ একমত যে তারা কেন্দ্রে একটি মধ্যবর্তী সরকারে যোগদান করবেন। সরকার গঠিত হওয়ার পর তা ভারত সরকার আইনের (১৯৩৫) অধীন কাজ করতে থাকবে। মন্ত্রীসভা যদি কোন বিশেষ কর্মপন্থা বা ব্যবস্থা আইনসভার দ্বারা পাশ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে গভর্ণর জেনারেল বা ভাইসরয়ের বিশেষ ক্ষমতার শরণাপন্ন হয়ে তা বলবৎ করতে যাবেনা। এতে করে ভাইসরয়ের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ হবে।

এ বিষয়েও কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে ঐকমত্য হয় যে, এ ধরনের সাময়িক সরকার গঠিত হলে তার প্রথম কাজ হবে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যগণকে কারামুক্ত করা। এ চুক্তির ভিত্তিতে গভর্ণর জেনারেলকে অনুরোধ করা হবে তিনি যেন সরকারের নিকটে এ ধরনের প্রস্তাব পেশ করেন যে, কংগ্রেস ও লীগের চুক্তির ভিত্তিতে একটি সাময়িক সরকার গঠনে তিনি আগ্রহী।

গভর্ণর জেনারেল দেশাই-লিয়াকত চুক্তির প্রস্তাবগুলো ভারত সচিবকে জানিয়ে দেন। তিনি এ সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করে তার ব্যাখ্যা দাবি করেন। গভর্ণর জেনারেল দেশাই ও লিয়াকত আলীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন এমন সময় জিন্নাহ এক বিবৃতির মাধ্যমে বলেন, তিনি চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। দেশাই হতাশ না হয়ে চুক্তির বৈধতা সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রকাশ করতে থাকেন। গভর্ণর জেনারেল বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্যে বোম্বাই-এর গভর্ণর স্যার জন কোলভিনকে জিন্নাহর সাথে দেখা করে অনুরোধ করতে বলেন যে জিন্নাহ তার সাথে দিল্লীতে দেখা করলে খুশি হবেন। জিন্নাহ বলেন, তিনি দেশাই-লিয়াকত চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না এবং এ চুক্তি মুসলিম লীগের অনুমতি ব্যতিরেকেই করা হয়েছে। এদিকে গান্ধীর অনুমোদন থাকলেও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ দেশাই-এর সমালোচনা করেন। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েই চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করে।

ওয়াবেল পরিকল্পনা 
দেশাই-লিয়াকত চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার জন্যে ভাইসরয় মে মাসে লন্ডন গমন করেন। অতঃপর তিনি সরকারের পক্ষ থেকে অচলাবস্থা দূরীকরণের জন্যে একটি প্রস্তাব নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। ভারত সচিব ১৪ জুন হাউস অব কমন্সে এক বিবৃতির মাধ্যমে ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধানকল্পে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। 

প্রস্তাবে বলা হয়, ভাইসরয় তাঁর কার্যকরী কাউন্সিল এমনভাবে পুনর্গঠিত করবেন যাতে তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে কিছু লোককে তাঁর কাউন্সিলর মনোনীত করতে পারেন। এতে প্রধান সম্প্রদায়গুলোর ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব থাকবে মুসলমান ও বর্ণহিন্দুর সমানুপাতে। এ কাউন্সিলে ভাইসরয় ও সেনাপ্রধান ব্যতীত সকলে হবেন ভারতীয়। এ কাউন্সিল পুর্গঠনে সকলের সহযোগিতা লাভের পর সকল প্রদেশ থেকে ৯৩ ধারা প্রত্যাহার করা হবে যাতে জনপ্রিয় মন্ত্রীসভা গঠিত হতে পারে। একই দিনে এ প্রস্তাব ব্যাখ্যা করে ভাইসরয় লর্ড ওয়াবেল দিল্লী থেকে এক বেতার ভাষণ দান করেন। গান্ধী এবং কংগ্রেস কাউন্সিলে মুসলমান ও বর্ণহিন্দুর সমসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করেন।

শিমলা সম্মেলন
ভাইসরয় তাঁর চেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্যে ২৫শে জুন শিমলার সকল দলের সম্মেলন আহ্বান করেন। সম্মেলনে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, এবং অন্যান্য দলের একুশ জন যোগদান করেন। যাদের মধ্যে মুসলিম লীগের জিন্নাহ ও লিয়াকত আলীসহ ছয় জন ছিলেন। সম্মেলনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে চরম মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এমন কোন ব্যবস্থা, সাময়িক বা স্থায়ী হোক, কংগ্রেস মেনে নিতে পারেনা, যা তার জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে, এক জাতীয়তাবাদের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করে এবং কংগ্রেসকে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করে। 

জিন্নাহ বলেন, পাকিস্তান ব্যতীত অন্য কোন কিছুর ভিত্তিতে গঠিত শাসনতন্ত্র মুসলিম লীগ মেনে নিতে পারে না। ২৬ এবং ২৭ তারিখেও আলোচনা অব্যাহত থাকে। ইউপি-এর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জিবি পন্তের সাথে জিন্নাহর আলাপ আলোচনা চলছিল বিধায় ২৭ তারিখের বৈঠক অল্প সময় পর মুলতবী করা হয়। অতঃপর ২৮ ও ২৯ তারিখে সম্মেলনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। জিন্নাহ-পন্ত আলেচনা ব্যর্থ হয় বলে জানা যায়। ভাইসরয় আলোচনার একটা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে সম্মেলনে যোগদানকারী প্রত্যেক দলকে একটি করে নামের তালিকা দাখিল করতে অনুরোধ করেন যারা হবেন ভাইসরয়ের কাউন্সিলের সদস্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েরই ৮ জন থেকে ১২ জনের নামের একটি করে তালিকা পেশ করবেন।

তেসরা জুলাই কংগ্রেস তার নামের তালিকা ভাইসরয়ের নিকটে প্রেরণ করে। ৬ই জুলাই মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে পরদিন জিন্নাহ ভাইসরয়-এর কাছে নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করেন :

১। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে নামের তালিকা গ্রহণ করার পরিবর্তে ভাইসরয়-এর সাথে জিন্নাহর ব্যক্তিগত আলোচনার পর কাউন্সিলের জন্যে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে।
২। কাউন্সিলের সকল মুসলিম সদস্য মুসলিম লীগ বেছে নেবে।
৩। কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্ত থেকে মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে ফলপ্রসূ রক্ষাকবচের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শেষবারের মতো ১১ই জুলাই ভাইসরয় ও জিন্নাহর মধ্যে আলাপ আলোচনার পর জিন্নাহ যখন বুঝতে পারেন ভাইসরয় কংগ্রেসের চাপে পাকিস্তান দাবির পক্ষে না, তখন তিনি বলেন মুসলিম লীগ ব্রিটিশ সরকারের সাথে কাউন্সিল গঠনে সহযোগিতা করতে পারেনা। অতএব ভাইসরয়-এর শিমলা সম্মেলনও ব্যর্থ হয়।

শিমলা সম্মেলনের ব্যর্থতার কারণ বলতে গিয়ে আব্বাস আলী খান বলেন, শিমলা সম্মেলনের ব্যর্থতার একই কারণ যা কংগ্রেস-লীগ সমঝোতার সকল প্রচেষ্টা বানচাল করে দিয়েছে। তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাসী মানুষ, তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাত অস্বীকারকারীর সাথে মিলে এক জাতি হতে পারে না কিছুতেই। তাই মুসলমানগণ একটি স্বতন্ত্র জাতি –মুসলীমলীগের এ দাবী অকাট্য সত্য যা এ উপমহাদেশের বুকে অসংখ্য ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত। 

অতএব জিন্নাহ যদি দাবী করেন যে, যেহেতু মুসলমানগণ একটা স্বতন্ত্র জাতি, সেহেতু ভাইসরয়-এর কাউন্সিলে মুসলিম প্রতিনিধি মনোনয়নের অধিকার মুসলিম জাতির প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন মুসলিম লীগের, তাহলে তা নীতিগতভাবে সকলের মেনে নেয়া উচিত। আর মুসলমাগণ একটি স্বতন্ত্র জাতি হওয়ার কারণেই তাদের জন্যে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবী করা হয়েছে এবং তার জন্যে সংগ্রাম অব্যাহত আছে। কিন্তু কংগ্রেসের অন্যায় ও অবাস্তব দাবী হচ্ছে উপমহাদেশের সকল হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এক জাতি এবং তার প্রতিনিধিত্বকারী কংগ্রেস। দেশের ভবিষ্যৎ শাসন ক্ষমতা কংগ্রেস দাবী করে এবং তা হতে পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনের অধীনে মুসলমানদের নির্মূল করা যাবে। মুসলমানদের এ আশংকা কল্পনাপ্রসূত নয়, প্রমাণিত সত্য। এ সত্য কংগ্রেস মেনে নিতে রাজী নয়। ভাইসরয় ও কংগ্রেসের দাবীর সমর্থনে জিন্নাহর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে সম্মেলন ব্যর্থ হয়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন