১১ আগস্ট, ২০২০

যে নারীর ফরিয়াদ আল্লাহ তৎক্ষণাৎ শুনেছেন!

একদিন মদিনার এক আনসার বয়স্ক মহিলা আল্লাহর রাসূল সা.-এর নিকট এসেছেন। তিনি তার স্বামীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। মহানবীর কাছ এসে খুবই নিচুকণ্ঠে তার অভিযোগের কথা বলছিলেন। এই প্রসঙ্গে আয়িশা রা. বলেন, মহিলাটি এসে নবী সা.-এর সাথে এতো চুপে চুপে কথা বলতে শুরু করে যে, আমি ঐ ঘরে থাকা সত্ত্বেও মোটেই শুনতে পাইনি।  

তিনি তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমার যৌবনতো তার সাথেই কেটেছে। এখন আমি বুড়ি হয়ে গেছি এবং আমার সন্তান জন্মদানের যোগ্যতা লোপ পেয়েছে, এমতাবস্থায় আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে। এখন আমি কী করবো? আমার কী অবস্থা হবে? হে আল্লাহ! আমি আপনার সামনে দুঃখের কান্না কাঁদছি।

যিহার সম্পর্কে ইসলামের বিধান আসার আগ পর্যন্ত আরবে বিধান ছিল যে স্ত্রীর সাথে যিহার করা হয় সে মা হয়ে যায়। আর তার সাথে বিবাহ বিচ্ছিন্ন তালাক হয়ে যায়। মহিলাটির স্বামী মহিলাটির সাথে যিহার করেছিল। এতে তিনি কষ্ট পেয়ে এর ব্যাপারে ইসলামের বিধান জানতে চেয়েছিলেন। তার স্বামীর নাম ছিল হযরত আউস ইবনে সামিত রা.। 

আরবে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতো যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে স্বামী ক্রোধান্বিত হয়ে বলতো "তুমি আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত"। এর প্রকৃত অর্থ হলো, আমার তোমার সাথে সহবাস ঠিক আমার মায়ের সাথে সহবাস করার মত। এটি স্পষ্ট বার্তা ছিল যে, স্বামী এখন আর তাকে স্ত্রী মনে করে না, বরং যেসব স্ত্রীলোক তার জন্য হারাম তাদের মতো মনে করে। এরূপ করাকেই "যিহার" বলা হয়। 

আরবদের কাছে যিহার তালাক বা তার চেয়ে অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা বলে মনে করা হতো। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এর অর্থ ছিল এই যে, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কই ছিন্ন করছে না, বরং তাকে নিজের মায়ের মত হারাম করে নিচ্ছে। এ কারণে আরবদের মতে তালাক দেয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যেতো। কিন্তু "যিহার" প্রত্যাহার করার কোন সুযোগই থাকতো না।  

আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে যিহারের ব্যাপারে কোনো আলাদা বিধান ছিল না। তাই তিনি ঐ মহিলাকে কোনো সমাধান দিতে পারেন নি। কান্না করতে করতে মহিলাটি ফিরে যেতে উদ্যত হয়েছিলেন, ততক্ষণে মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর ফরিয়াদ শুনেছেন। তখনো মহিলাটি ঘর হতে বের হয়নি ইতোমধ্যেই হযরত জিবরাঈল আ. যিহারের ব্যাপারে সিদ্ধান্তসহ ওহি নিয়ে হাজির হন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা মুজাদালাহর ১-৬ নং আয়াত এই ঘটনা প্রসঙ্গে নাজিল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ১ ও ২ নং আয়াতে বলেন, 

//আল্লাহ অবশ্যই সে মহিলার কথা শুনছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার কাছে কাকুতি মিনতি করেছে, এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছে। আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন। তিনি সবকিছু শুনে ও দেখে থাকেন। তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে “যিহার” করে তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা কেবল তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে। এসব লোক একটা অতি অপছন্দনীয় ও মিথ্যা কথাই বলে থাকে। প্রকৃত ব্যাপার হলো, আল্লাহ মাফ করেন, তিনি অতীব ক্ষমাশীল।// 

এখানে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি কোনো স্ত্রীর সাথে যিহার করা হয় তবে ঐ স্ত্রী তার মা হয়ে যায় না। মা কেবল একজনই। আর তিনি হলেন জন্মদাত্রী মা। অতএব যিহার একটি অপছন্দনীয় মিথ্যে কথা। কখনোই স্ত্রী মা হতে পারে না। আর তাই কারো সাথে যিহার করলে বিয়ে ভঙ্গ বা তালাক হয়ে যায় না। তবে এই ন্যাক্কারজনক কাজের প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবে। এই বিষয়ে পরের দুই আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

//যারা নিজের স্ত্রীর সাথে “যিহার” করে বসে এবং তারপর নিজের বলা সে কথা প্রত্যাহার করে এমতাবস্থায় তারা পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে। এর দ্বারা তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে। তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। যে মুক্ত করার জন্য কোন ক্রীতদাস পাবে না সে বিরতিহীনভাবে দুই মাস রোযা রাখবে। উভয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বেই। যে তাও পারবে না সে ষাট জন মিসকিনকে খাবার দেবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এ জন্য যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ওপর ঈমান আনো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত ‘হদ’। কাফিরদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।//

এই আয়াত দ্বারা মূলত যিহারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও যারা যিহার করে ফেলবে তারা কাফফারা আদায় করবে। এরপর আল্লাহ বলেছেন কাফফারার এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে ঈমান আনা হয়। এখানে ঈমান আনা বলতে আল্লাহর ওপর ঈমান আনা বুঝানো হয়নি। কারণ এই নির্দেশ তো কেবল মুসলিমদের জন্যই। এখানে ঈমান আনা বলতে বুঝানো হয়েছে মুসলিমরা যাতে জাহেলি এসব কালচার আর চর্চা না করে। কারণ এসব জাহেলী চর্চা ঈমানের সাথে বেমানান। ৪ নং আয়াতের সর্বশেষে আল্লাহ বলেছেন, কাফিরদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। এখানে কাফির বলতে যারা এই নির্দেশকে ভায়োলেট করবে তাদেরকে এড্রেস করা হয়েছে। 

৫ ও ৬ নং আয়াতে যিহারের মতো অমানবিক ও জাহেলি কালচারে যারা লিপ্ত থাকবে এবং এই সম্পর্কিত বিধি বিধানের যারা অমান্য করবে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

//যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের বিরোধীতা করে তাদেরকে ঠিক সেইভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হবে যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়েছে। আমি পরিস্কার ও স্পষ্টভাবে সব নির্দেশ নাযিল করেছি। কাফেরদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি। (এই অপমানকর শাস্তি হবে) সেই দিন যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে জীবিত করে উঠাবেন এবং তারা কী কাজ করে এসেছে তা জানিয়ে দেবেন। তারা ভুলে গিয়েছে কিন্তু আল্লাহ তাদের সব কৃতকর্ম সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত।// 

যে মহিলা সম্পর্কে এ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের খাওলা বিনতে সা'লাবা রা.। তিনি তার ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্ত পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন। একইসাথে খুশি হলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ফরিয়াদ তৎক্ষণাৎ শুনেছেন। এজন্য তিনি মদিনায় বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। সাহাবীরা তাকে এই কারণে আলাদাভাবে সম্মানের চোখে দেখতেন। 

একবার হযরত উমর রা. কিছুসংখ্যক সঙ্গী-সাথীর সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক বৃদ্ধা মহিলার সাথে দেখা হলে সে তাঁকে থামতে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলেন। মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় তার কথা শুনলেন এবং সে নিজে কথা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। সংগীদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলো, হে আমীরুল মু'মিনীন, এ বুড়ির জন্য আপনি আমাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রেখেছেন কেন? 

তিনি বললেন, তোমরা কি জানো, তিনি কে? এ যে, খাওলা বিনতে সা'লাবা! এ তো সে মহিলা, সাত আসমানের ওপরে যার ফরিয়াদ গৃহীত হয়েছে। আল্লাহর কসম, তিনি যদি আমাকে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখতেন তাহলে আমি সারা রাতই দাঁড়িয়ে থাকতাম। শুধু নামাযের সময় ওজর পেশ করতাম। 

খাওলা রা. উমর রা.কে নসিহতের উদ্দেশ্যে বলেন, একসময় তুমি লাঠি হাতে নিয়ে বকরি চরিয়ে বেড়াতে। তখন তোমাকে উমর নামে ডাকা হতো। অতঃপর এমন এক সময় আসলো যখন তোমাকে 'আমীরুল মু'মিনীন' বলে সম্বোধন করা শুরু হলো। জনগণের ব্যপারে অন্তত কিছুটা আল্লাহকে ভয় করো। মনে রেখো, যে আল্লাহর আযাব সম্পর্কিত সাবধানবাণীকে ভয় পায় দূরের মানুষও তাঁর নিকটাত্মীয়ের মত হয়ে যায়। আর যে মৃত্যুকে ভয় পায় তার ব্যাপারে আশংকা হয় যে, সে এমন জিনিসও হারিয়ে ফেলবে যা সে রক্ষা করতে চায়। 

হযরত উমরের রা. সাথে ছিলেন জারুদ আবদী। একথা শুনে তিনি খাওলা রা.-কে থামাতে চাইলে হযরত উমর বললেন, তাকে বলতে দাও। তার কথা তো সাত আসমানের ওপরে গৃহীত হয়েছিল। উমরকে তো অবশ্যই তার কথা শুনতে হবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন