১৩ আগস্ট, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৪৮ : ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের দাঙ্গা রাজনীতি

গোলাম সরওয়ার হুসেইনীর বাড়ি ও দরগাহ



সুলতানি ও নবাবি শাসনের পর ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই ভারত বরাবরই ধর্মীয় সহিংসতার দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। মুসলিম সম্ভ্রান্ত আলেম ও জমিদারদের হটিয়ে ইংরেজ ও হিন্দুরা মিলে এদেশের মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার মিশনে নেমে পড়ে। কোম্পানী শাসনের অবসান হয়ে যখন ইংরেজদের সরাসরি শাসন শুরু হয় তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিছটা হ্রাস পায়। 

আবার ১৯০৫ সালে যখন প্রশাসনিক প্রয়োজনে ইংরেজরা বাংলা ভেঙে দুইটি প্রদেশে ভাগ করার পর থেকে আবারো দাঙ্গা হিন্দুস্থানে নিয়মিত ঘটনা হয়ে পড়ে। হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এর একটাই কারণ, আর তা হলো বঙ্গভঙ্গের কারণে ঢাকা বাংলার আরেকটি রাজধানী হবে এবং এতে মুসলিমরা উপকৃত হবে। এরপর হিন্দু প্রভাবাধীন কংগ্রেস এমন সাম্প্রদায়িক আচরন শুরু করে যে, মুসলিমদের আলাদা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। একের পর এক হিন্দুদের অমানবিকতা, চুক্তি ভঙ্গ ও হটকারিতার ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা হিন্দুস্থানে একইসাথে থাকার ব্যাপারে আস্থা হারিয়ে ফেলে।    

মুসলিমদের প্রাণের দাবী হয়ে ওঠে পাকিস্তান রাষ্ট্র। এর দাবীতে মুসলিম লীগ নানান ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে এগিয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন যখন মুসলিম লীগের সাথে প্রতারণা করে তখন মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবীতে ১৬ আগস্ট ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালন করে। এই দিবসের কর্মসূচী ছিল তারা রাষ্ট্রকে সহায়তা করবে না; অফিস আদালত, দোকান-পাট বন্ধ রাখবে। 

তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে সামনে রেখে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ সেদিন যেসব অঞ্চলে মুসলিমরা ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালন করেছিল সেসব অঞ্চলে উগ্রবাদী হিন্দুদের উস্কে দিয়েছিল। এর ফলে হিন্দুরা মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা হয় কলকাতায়। অথচ কলকাতায় প্রাদেশিক শাসনভার ছিল মুসলিম লীগের হাতে। মুসলিম লীগ সরকার সেদিন বাংলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। 

আগস্টের ১৬ তারিখ শুরু হয়েছিল এ দাঙ্গা। দিনটি ছিল বসন্তকালের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও কষ্টকর দিন। সেদিন কলকাতায় মুসলমানরা তাদের বিরাট সমাবেশে যখন নেতাদের বক্তব্য শুনছিল, তখনই শুরু হয় এ গণহত্যা। হিন্দুরা আক্রমণ করে সেই সমাবেশে। হিন্দু ও মুসলমানরা ধারালো ছুরি নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়। কলকাতায় মুসলমানদের হত্যার খবর পূর্ববাংলা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা তৈরি হয়। এর কিছুদিন পর সেপ্টেম্বরে বিহার, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে দাঙ্গা শুরু হয়। এরপর অক্টোবরে নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হয়।

কলকাতার এ ভয়ঙ্কর নরহত্যা ও ধ্বংসকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে স্টিফেনস লিখেছেন, শ্যামপুর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মানুষের মৃতদেহের স্তূপ নিকটবর্তী বাড়িগুলোর দোতলার মেঝে বরাবর উঁচু হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর হিসাবমতে প্রায় ৫০ হাজার লোক সে সময় হতাহত হয়েছিল। মেননের মতে, ৫০ হাজার নিহত ও ১৫ হাজার আহত হয়েছিল। স্টেটসম্যানের হিসাব অনুযায়ী হতাহতের সংখ্যা ২০ হাজার কিংবা কিছু বেশি ছিল। প্রথম বাহাত্তর ঘন্টায় একচেটিয়া মুসলিমরা আক্রান্ত হয়। 

এরপর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দির নির্দেশে বিশেষভাবে শেখ মুজিব ও তাদের দল পাড়ায় পাড়ায় মুসলিম যুবকদের সংগঠিত করে পাল্টা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করায় সাম্যবস্থা তৈরি হয়। যদিও কলকাতায় মুসলিমদের অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে প্রচুর নিরীহ মুসলিমকে হত্যা করা হয় তারপরও মুসলিমদের পাল্টা প্রতিরোধে কলকাতায় লড়াইটা অনেকটাই সমানে সমান হয়। কিন্তু বিহার, উত্তর প্রদেশ, আসাম ও পাঞ্জাবে মুসলিমরা প্রচুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। সেপ্টেম্বরে বিহারে আর্য সমাজের সদস্যদের নেতৃত্বে ৩০,০০০ হিন্দুর একটি দল প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পরের মাস থেকে মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চালানো শুরু করে। লক্ষ লক্ষ বিহারি বাড়িহারা হয়ে পড়ে। কলকাতা থেকে দাঙ্গা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মুসলিম উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে এবং উদ্বাস্তুদের ঢল পূর্ব বাংলায় নামতে থাকে।

যেহেতু বাংলায় মুসলিম লীগ ক্ষমতায় তাই বেশিরভাগ উদ্বাস্তু মুহাজির মুসলিম এসেছিল পূর্ববাংলায়। দাঙ্গা বন্ধ ও শরনার্থীদের মৌলিক চাহিদার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয় বাংলার সোহরাওয়ার্দি সরকার। এর পাশাপাশি কংগ্রেসের উগ্র বর্ণহিন্দুরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েই যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাজ শুরু করেন তৎকালীন নোয়াখালীর সাবেক এমএলএ (এমপি) গোলাম সরওয়ার হুসেইনী। তিনি ১৯৩৭ সালে শেরে বাংলার রাজনৈতিক দল কৃষক প্রজা পার্টির নমিনেশনে নির্বাচিত হন। পরে ১৯৪৬ সালে শেরে বাংলার রাজনৈতিক ইমেজ ধ্বংস হওয়া এবং পাকিস্তান দাবির প্রতি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুবাদে সরওয়ার হুসেইনী পরাজিত হন মুসলিম লীগের কাছে। 

সরওয়ার হুসেইনী শাহ মখদুমের অধস্তন পুরুষ ছিলেন। তাই তার পরিবার পীর বংশ হিসেবে আলাদাভাবে প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় ছিল। এছাড়া সরওয়ার সাহেব কলকাতা বারের এডভোকেট ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে কৃষকের খাজনা মওকুফ, ঋণ সালিশি বোর্ড থেকে সুদখোর ব্যবসায়ীদের উৎখাত করা এবং জমিদারি বাজার বয়কট করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তৎকালীন নোয়াখালীর ক্ষমতাধর হিন্দু জমিদার এবং মহাজনদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন। একইসাথে দরিদ্র হিন্দু ও মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। 

যাই হোক সরওয়ার হুসেইনী দাঙ্গা বন্ধ ও শরনার্থীদের অবর্ণনীয় মানবেতর জীবন যাপনের চিত্র তুলে ধরে ও এর আশু সমাধানের জন্য মুসলিম লীগের প্রাদেশিক নেতা সোহরাওয়ার্দি, কেন্দ্রীয় নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা নেহেরু এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কাছে পত্র পাঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার চিঠির গুরুত্ব কেউ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। এদিকে তৎকালীন রায়পুরের জমিদার রায় চৌধুরী কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন। রায় চৌধুরীও দাঙ্গার সময় নতুন করে ঝামেলা শুরু করেছেন। তিনি নোয়াখালীতে শরনার্থীদের ঢুকতে বাধা দিচ্ছিলেন ও মুসলিমদের নানানভাবে উত্যক্ত করছিলেন। 

এই প্রসঙ্গে গোলাম সরওয়ার হুসেইনী কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতা এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কাছেও চিঠি পাঠিয়ে জমিদারের অত্যাচারের কথা জানান এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। এর বাইরে পত্রিকায় বক্তব্য বিবৃতি ও পার্টি প্রধান শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে সাথে নিয়ে কংগ্রেসের সন্ত্রাসী ও সোহরাওয়ার্দি তথা মুসলিম লীগের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনসমাবেশে সোচ্চার হন। শরনার্থীদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি সেচ্চাসেবক বাহিনী মিয়ার ফৌজ তৈরি করেন।   

এদিকে অক্টোবর মাসে খোদ নোয়াখালীতেই সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের পরিকল্পনা করে। সরওয়ার হুসেইনী নিজের এলাকা রামগঞ্জে ঘটে এক নজিরবিহীন ঘোষণা। লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে রামগঞ্জের জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে ভারত সেবাশ্রম সংঘের এক সন্ন্যাসী এসে উঠেছেন। তার নাম সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ। তিনি ঘোষণা করেছেন, পূজার জন্য ছাগবলির বদলে এবার তিনি মুসলমানের রক্ত দিয়ে দেবীকে প্রসন্ন করবেন। সাধু রামগঞ্জের মুসলিমদের আক্রমণ করতে ও পূজার আগেই রক্ত সংগ্রহের আদেশ দেন।  

এই খবর শুনে সরওয়ার হুসেইনী দ্রুতই রামগঞ্জের মুসলিমদের পাশে থাকতে নিজের বাড়িতে চলে আসেন। ১০ই অক্টোবর ভোরবেলা চৌকিদারের মারফৎ রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাজেন্দ্রলাল চৌধুরী সরওয়ার হুসেইনীকে পাত্তা দেননি। উল্টো তার অনুসারীদের মুসলিম উচ্ছেদের আহ্বান জানান। 

কারো থেকে সাহায্য ও সাড়া না পেয়ে গোলাম সারোয়ার হুসেইনী পরদিন শাহ্‌পুর বাজারে তার অনুগত ভক্ত, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মুসলমানদের এক সমাবেশ ডাকেন। বস্তুত নোয়াখালীর মুসলিমরা এমন একটি সমাবেশের জন্য আগ্রহী ছিল। কারণ তারা নিরাপত্তা সংকটে ভুগতে ছিলেন। জনসভায় বক্তৃতাকালে সরওয়ার সাহেব মুসলমানদের সেই সময়কার অবস্থান তুলে ধরেন এবং হিন্দু জমিদারকে উৎখাত করার ডাক দেন।

সমাবেশ চলাকালে আক্রমণ করে জমিদার ও তার অনুগত পাইক পেয়েদারা। তারা জনসভায় গুলি করে এবং কয়েকজন মুসলিমকে হত্যা করে। কিন্তু অল্প সময় পরেই ঘুরে দাঁড়ায় মুসলিমরা। ইট, পাথর, লাঠি ইত্যাদি ছিল মুসলিমদের অস্ত্র। উত্তেজিত মুসলিম জনতা জমিদারের লোকদের পরাস্ত করে। জমিদারের লোকদের গুলি ফুরিয়ে গেলে পালাতে থাকে তারা। অল্প সময়ে রামগঞ্জের জমিদার বাড়ির নিয়ন্ত্রণ উত্তেজিত মুসলিমদের হাতে চলে আসে। জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরী উত্তেজিত জনতার হাতে নিহত হন। সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। 

রায়পুরের জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরীর সাথে তো আগে থেকে বিরোধ চলে আসছিল সরওয়ার হুসেইনীর সাথে। তিনি নোয়াখালীতে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তিকে গোড়া থেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। রাজেন্দ্রলাল হত্যার প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসেন রায়পুরের জমিদার রায় চৌধুরী। এদিকে সরওয়ার হুসেইনীকে সহায়তা করেন রায়পুরের স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা আবুল কাশেম।  

সরওয়ার হুসেইনীর অনুসারীরা 'মিয়ার ফৌজ' নামে এবং আবুল কাশের অধীন 'কাশেম ফৌজ'র সদস্যদের সাথে খন্ডযুদ্ধ হয় রায় চৌধুরীর সাথে। এখানেও জমিদার পরাজিত হন। দুই বাহিনী জমিদার বাড়ি অবরোধ করেন। রায় চৌধুরী পরাজয় নিশ্চিত জেনে আত্মহত্যা করেন। তার আগে তিনি নিজে তার পরিবারের সদস্যদের খুন করেন।

সরওয়ার হুসেইনীর কার্যক্রম এই দুইটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এসব ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়লে নোয়াখালী জেলার রায়পুর, রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া এবং পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা (বৃহত্তর কুমিল্লা) জেলার চাঁদপুর, চৌদ্দগ্রাম, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ এবং লাকসাম থানার বিশাল এলাকাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হিন্দুরা তাদের দুইপ্রভাবশালী জমিদারের করুণ কাহিনী শুনে এসব এলাকা থেকে পালাতে থাকে। 

বিহার, কলকাতা, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের উল্টো ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। এই প্রথম হিন্দুরা শরনার্থী হতে শুরু করে। এতদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হলেও টনক নড়েনি গান্ধীর। কেবল নোয়াখালীর ঘটনায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন ৬ই নভেম্বর। পরদিন নোয়াখালীর চৌমুহনীতে যোগেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে দুই রাত কাটিয়ে ৯ই নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি তার শান্তির লক্ষ্যে পদযাত্রা শুরু করেন।

নোয়াখালীতে এসে গান্ধী গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর সাথে দেখা করতে চান। কিন্তু গোলাম সরওয়ার হুসেইনী ততদিনে গান্ধীর ওপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই তিনি প্রথম দিকে সাক্ষাতে রাজী ছিলেন না। পরে গান্ধীর অনুরোধে নোয়াখালীর চাটখিলে দুজনের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে সরওয়ার হুসেইনী গান্ধীকে বলেন যে, দাঙ্গার সূত্রপাত নোয়াখালীতে নয়। এবং বার বার চিঠি দিয়েও তিনি এর প্রতিকার পাননি। কলকাতা ও বিহারে যখন দাঙ্গা থেমে যাবে তখন নোয়াখালীতেও হানাহানি বন্ধ হবে উল্লেখ করেন সরওয়ার সাহেব। গোলাম সরওয়ার নোয়াখালীতে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নিতে রাজি হন তবে তার আগে শর্ত হিসেবে কলকাতা, বিহার ও উত্তর প্রদেশে দাঙ্গা বন্ধ হওয়া ও মুসলিমদের নিরাপত্তার দাবি জানান। 

গান্ধী রাজি হন ও দাঙ্গা বন্ধ করতে কংগ্রেস নেতাদের সাথে আলোচনা শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই হলো করমচাঁদ গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের নমুনা। যতদিন মুসলিমরা আক্রান্ত হচ্ছিলো ততদিন তার কোন বিকার ছিল না। তিনি এরপরও নোয়াখালী থেকে চলে যাননি। প্রায় তিনমাস তিনি নোয়াখালী অবস্থান করেছেন। এখানেও ছিল তার রাজনীতি। তিনি নোয়াখালী থেকে বিশ্ববাসীদের জানান দিচ্ছিলেন দাঙ্গায় হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। দাঙ্গা বন্ধ হওয়ার পর তার এই অবস্থান ও নানান বক্তব্য বিবৃতি আবারো বর্ণহিন্দুদের উত্তেজিত করে। আবারো উগ্রবাদী হিন্দুরা বিহারে দাঙ্গা তৈরি করে।   

এবার মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ গান্ধীকে নোয়াখালী ত্যাগ করতে বলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক গান্ধীকে নোয়াখালী থেকে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এরপর গান্ধী বিহারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। যদিও হিন্দুরা এক ভারত প্রতিষ্ঠার জন্য এমন দাঙ্গা বাধায়। তারা ভেবেছিল তাদের আক্রমণে মুসলিম লীগ ভয়ে পাকিস্তান আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাবে। তবে বাস্তবে এটা তাদের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। মুসলিম ও হিন্দুরা একসাথে থাকা যে অসাধ্য এবং কংগ্রেসের এই দাবী যে অবান্তর তা দাঙ্গার ঘটনায় আরো স্পষ্ট হয়। এই দাঙ্গার ফলে পাকিস্তান দাবী আরো যৌক্তিক হয়ে ওঠে এবং পাকিস্তান সৃষ্টি ত্বরান্বিত হয়। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন