২৩ আগস্ট, ২০২০

আল্লাহ মুহাম্মদ সা. কে যেভাবে মহাবিজয় দান করেছেন

 

একবার আমাদের প্রিয় নবী সা. স্বপ্ন দেখছিলেন! তিনি দেখলেন তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মদীনা থেকে মক্কায় চলে গেলেন এবং সেখানে উমরা পালন করলেন। নবীর স্বপ্ন নিছক একটি স্বপ্ন নয় বরং সেটিও একধরনের ওহী। আল্লাহই তাকে এ স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। এটা ৬ষ্ঠ হিজরির ঘটনা। তখন এমন অবস্থা ছিল না যে মহানবী চাইলেই মক্কায় যেতে পারেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে আসার পর থেকেই মক্কার সাথে শুরু হলো একের পর এক যুদ্ধ। সেখানে উমরার চিন্তাই দুঃসাধ্য। 

কুরাইশরা ছয় বছর যাবত মুসলমানদের জন্য বায়তুল্লাহর পথ বন্ধ করে রেখেছিল এবং এ পুরো সময়টাতে তারা হজ্জ ও উমরাহ আদায়ের জন্য পর্যন্ত কোন মুসলমানকে হারাম এলাকার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। এখন উমরার জন্য ইহরাম বেঁধে যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম সাথে নিয়ে বের হওয়ার অর্থ যুদ্ধ ডেকে আনা এবং নিরস্ত্র হয়ে যাওয়ার অর্থ নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করা। এ পরিস্থিতিতে স্বপ্নের আদেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়লেন মহানবী সা.। 

রাসূল সা. তার স্বপ্নের কথা দ্বিধাহীন চিত্তে সাহাবীদের বললেন এবং সফরের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। আশপাশের গোত্রসমূহের মধ্যেও ব্যাপকভাবে ঘোষণা করলেন, আমরা উমরা আদায়ের জন্য যাচ্ছি। যারা আমাদের সাথে যেতে ইচ্ছুক তারা যেন এসে দলে যোগ দেয়। বাহ্যিক কার্যকরণসমূহের ওপর যাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তারা মনে করলো এরা মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে। তাদের কেউই তার সাথে যেতে প্রস্তুত হলো না। কিন্তু যারা সত্যি সত্যিই আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করতো পরিণাম সম্পর্কে তারা কোন পরোয়াই করেছিলো না। তাদের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল যে, এটা আল্লাহ তা’আলার ইংগিত এবং তাঁর রাসূল সা. এ নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। নবীর সা.-এর সাথে এ বিপজ্জনক সফরে যেতে ১৪শ সাহাবী প্রস্তুত হলেন।

৬ষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসের শুরুতে মহানবী সা. তাঁর দল নিয়ে মদিনা থেকে যাত্রা করলেন। সাথে কুরবানির জন্য ৭০ টি উট ছাড়া যুদ্ধের আর কোন উপকরণ সঙ্গে নিলেন না। এভাবে তাঁদের কাফেলা লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ধ্বনি তুলে বায়তুল্লাহ অভিমুখে যাত্রা করলো। বি’রে আলীতে এসে ইহরাম বাঁধলেন। মদীনার হাজীগণ এখান থেকেই হজ্জ ও উমরার ইহরাম বেঁধে থাকেন।

গত বছরই ৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে কুরাইশরা বিভিন্ন আরব গোত্রের সম্মিলিত শক্তি নিয়ে মদীনার ওপর চড়াও হয়েছিল যার কারণে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কুরাইশদের সাথে শত্রুতা তখনো চরমে। তাই রসূলুল্লাহ সা. যখন এত বড় একটা কাফেলা নিয়ে শত্রুর এলাকার দিকে যাত্রা করলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই গোটা আরবের দৃষ্টি এ বিস্ময়কর সফরের প্রতি নিবদ্ধ হলো। তারা এও খেয়াল করলো যে, এ কাফেলা লড়াই করার জন্য যাত্রা করেনি বরং পবিত্র মাসে ইহরাম বেঁধে কুরবানীর উট সাথে নিয়ে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় বাইতুল্লাহ তাওয়াফের জন্য যাচ্ছে।

নবী সা. এ পদক্ষেপ কুরাইশদেরকে মারাত্মক দ্বিধায় ফেলে দিল। যে পবিত্র মাসগুলোকে শত শত বছর ধরে আরবে হজ্জ ও বায়তুল্লাহর যিয়ারতের জন্য পবিত্র মনে করা হতো জিলকদ মাসটি ছিল তার অন্যতম। যে কাফেলা এ পবিত্র মাসে ইহরাম বেঁধে হজ্জ অথবা উমরার জন্য যাত্রা করেছে তাকে বাধা দেয়ার অধিকার কারো ছিল না। এমনকি কোন গোত্রের সাথে যদি তার শত্রুতা থেকে থাকে তবুও আরবের সর্বজন স্বীকৃত আইন অনুসারে সে তাকে তার এলাকা দিয়ে অতিক্রম করতেও বাধা দিতে পারে না। কুরাইশরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লো যে, যদি তারা মদিনার এ কাফেলার ওপর হামলা করে মক্কা প্রবেশ করতে বাধা দেয় তাহলে গোটা দেশে হৈ চৈ শুরু হয়ে যাবে। আরবের প্রতিটি মানুষ বলতে শুরু করবে এটা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়। 

প্রতিটি গোত্রই এ ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়বে যে ভবিষ্যতে কাউকে হজ্জ ও উমরা করতে দেয়া না দেয়া কুরাইশদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। আজ যেমন মদীনার জিয়ারতকারীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে তেমনি যাদের প্রতিই তারা অসন্তুষ্ট হবে ভবিষ্যতে তাদেরকেই বাইতুল্লার জিয়ারত করতে বাধা দেবে। এটা হবে কুরাইশদের এমন একটা ভুল যার কারণে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে তারা যদি মুহাম্মাদ সা.কে এত বড় কাফেলা নিয়ে নির্বিঘ্নে তাদের শহরে প্রবেশ করতে দেয় তাহলে গোটা দেশের সামনেই তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিনষ্ট হবে। লোকজন বলবে, কুরাইশরা মুহাম্মাদ সা.-এর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত অনেক চিন্তা-ভাবনা ও বিচার-বিবেচনার পর তাদের জাহেলী আবেগ ও মানসিকতাই তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করলো এবং তারা নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য যে কোন মূল্যে এ কাফেলাকে শহরে প্রবেশ করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো।

এদিকে মুহাম্মদ সা. এক ব্যক্তিকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠিয়েছেন যাতে সে যথাসময়ে তাঁকে কুরাইশদের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করতে পারে। গুপ্তচর জানায় কুরাইশরা মুসলিমদের গতি রোধ করার জন্য খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে দুই শত অশ্বারোহীসহ অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছে। কুরাইশদের পরিকল্পনা ছিল কোনো না কোনো উপায়ে নবী সা.-এর কাফেলাকে উত্যক্ত করে উত্তেজিত করা এবং তার পরে যুদ্ধ সংঘটিত হলে গোটা আরবে একথা প্রচার করে দেওয়া যে, উমরা আদায়ের বাহানা করে এরা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ করার জন্যই এসেছিলো এবং শুধু ধোঁকা দেয়ার জন্যই ইহরাম বেঁধেছিল।

এ খবর পাওয়ামাত্র মহানবী সা. রাস্তা পরিবর্তন করলেন এবং ভীষণ কষ্ট স্বীকার করে অত্যন্ত দুর্গম একটি পথ ধরে হারাম শরীফের একেবারে প্রান্ত সীমায় অবস্থিত হুদাইবিয়ায়  গিয়ে পৌঁছলেন। এখানে খুযআ গোত্রের নেতা বুদায়েল ইবনে ওয়ারকা তার গোত্রের কতিপয় লোককে সাথে নিয়ে নবী সা.-এর কাছে আসলো এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? 

নবী সা. বললেন, “আমরা কারো বিরুদ্ধে লড়াই করতে আসিনি। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু বাইতুল্লাহর জিয়ারত ও তাওয়াফ। তারা গিয়ে কুরাইশ নেতাদের একথাটিই জানিয়ে দিল । তারা তাদেরকে এ পরামর্শও দিল যে, তারা যেন হারামের জিয়ারতকারীদের পথরোধ না করে। কিন্তু তারা তাদের জিদ বজায় রাখলো এবং নবীকে ( সা) ফিরে যেতে রাজি করানোর জন্য আহাবিশদের নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে তাঁর কাছে পাঠালো। কুরাইশ নেতাদের উদ্দেশ্য ছিলো, মহানবী সা. তার কথা না মানলে সে অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে আসবে এবং এভাবে আহাবিশদের শক্তি তাদের পক্ষে থাকবে। 

কিন্তু হুলাইস এসে যখন দেখলো, গোটা কাফেলা ইহরাম বেঁধে কুরবানির উটগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং এ মানুষগুলো লড়াই করার জন্য নয় বরং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করার জন্য এসেছে তখন সে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে কোন কথাবার্তা না বলেই মক্কায় ফিরে গিয়ে কুরাইশ নেতাদের স্পষ্ট বলে দিল যে, তারা বায়তুল্লাহর মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে তা যিয়ারত করতে এসেছে। তোমরা যদি তাদের বাধা দাও তাহলে আহাবিশরা কখনো তোমাদের সহযোগিতা করবে না। 

অতঃপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে মাসউদ সাকাফী আসলো এবং সেও নিজের পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সা.-কে ভালো-মন্দ সব দিক বুঝিয়ে তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করার সংকল্প থেকে বিরত রাখতে চাইলো। মুহাম্মদ সা. বনী খুযআ গোত্রের নেতাকে যে জওয়াব দিয়েছিলেন তাকেও একই জওয়াব দিলেন। অর্থাৎ আমরা লড়াই করার উদ্দেশ্যে আসিনি, বাইতুল্লাহর মর্যাদা প্রদর্শনকারী হিসেবে একটি ধর্মীয় কর্তব্য পালন করার জন্য এসেছি। 

দূতদের আসা যাওয়া ও আলাপ-আলোচনা চলাকালে কুরাইশরা গোপনে নবী সা.-এর সেনা শিবিরে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের উত্তেজিত করা এবং যুদ্ধের অজুহাত কাজে লাগিয়ে মহানবীকে ঠেকানো যায়। কিন্তু মুসলিমদের ধৈর্য এবং মুহাম্মদ সা.-এর বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি তাদের সমস্ত অপেচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তাদের চল্লিশ পঞ্চাশজন লোকের একটি দল একদিন রাতে মুসলমানদের তাঁবুর ওপরে পাথর নিক্ষেপ ও তীর বর্ষণ করতে থাকে। মুসলিমরা তাদের সবাইকে বন্দী করে নবী সা.-এর সামনে হাজির করেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা. তাদের সবাইকে ছেড়ে দেন। অপর এক ঘটনায় ঠিক ফজর নামাযের সময় তানঈমের দিক থেকে ৮০ ব্যক্তির একটি দল এসে আকস্মিকভাবে হামলা করে বসে। তাদেরকেও বন্দী করা হয়। মুহাম্মদ সা. তাদেরকেও মুক্ত করে দেন। 

অবশেষে মুহাম্মদ সা. নিজের পক্ষ থেকে হযরত উসমান রা.-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান এবং তাঁর মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদের জানিয়ে দেন যে, আমরা যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয় বরং বাইতুল্লাহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও কুরবানী করে ফিরে যাব। কিন্তু এরপরও তারা উমরা করতে দিতে সম্মত হলো না উপরন্তু হযরত উসমানকে রা.-কে মক্কাতে আটক করলো। 

এ সময় তারা এই খবর ছড়ালো যে, হযরত উসমানকে রা.-কে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর ফিরে না আসায় মুসলমানরাও নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, খবরটা সত্য। এখন আর সংযম প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই। মক্কা প্রবেশের ব্যাপারটি ছিল ভিন্ন জিনিস। সে জন্য শক্তি প্রয়োগের কোন চিন্তা আদৌ ছিল না। কিন্তু যখন দূতকে হত্যা করার ঘটনা পর্যন্ত ঘটলো তখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া ছাড়া মুসলমানদের আর কোন উপায় থাকলো না।

মুহাম্মদ সা. তাঁর সমস্ত সাহাবীকে একত্রিত করলে এবং তাদের নিকট থেকে এ মর্মে বাইয়াত গ্রহণ করলেন যে, আমরা এখন এখান থেকে আমৃত্যু পিছু হটবো না। অবস্থার নাজুকতা বিচার করলে যে কেউ উপলব্ধি করবেন যে, এটা কোন মামুলি বাইয়াত ছিল না। মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪শত। কোন যুদ্ধ সরঞ্জামও তাদের সাথে ছিল না। নিজেদের কেন্দ্র থেকে আড়াই শত মাইল দূরে একেবারে মক্কার সীমান্তে অবস্থান করেছিলেন তারা। সেখানে শত্রু তার পুরো শক্তি নিয়ে আক্রমণ করতে পারতো এবং আশপাশের সহযোগী গোত্রগুলোকে ডেকে এনে তাদের ঘিরে ফেলতে পারতো। এসব সত্ত্বেও সাহাবারা মুহাম্মদ সা.-এর হাতে হাত রেখে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত হয়ে গেল। এটিই ইসলামের ইতিহাসে “বাইয়াতে রিদওয়ান” নামে খ্যাত।

পরে জানা গেল যে, হযরত উসমান রা.-কে হত্যা করার খবর মিথ্যা ছিল। হযরত উসমানকে নিজেও ফিরে আসলেন এবং কুরাইশদের পক্ষ থেকে সন্ধির আলোচনা করার জন্য সুহাইল ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলও নবী সা. শিবিরে এসে পৌঁছলো। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর যেসব শর্তের ভিত্তিতে সন্ধিপত্র লেখা হলো তা হলো,

(১) মুসালমানগণ এ বছর উমরাহ না করেই মদিনায় ফিরে যাবে।

(২) আগামী বছর উমরার জন্য এসে তারা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে এবং তাদের অবস্থানকালে কুরাইশরা মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবে।

(৩) কুরাইশদের এবং মুসলমানদের মধ্যে আগামী দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।

(৪) কুরাইশদের কেউ মদীনায় আশ্রয় নিলে তাকে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু মদীনার কোন মুসলমান মক্কায় আশ্রয় নিলে, তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।

(৫) আরবের যেকোন গোত্রের লোক মুসলমানদের বা কুরাইশদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে।

(৬) মক্কায় ব্যবসায়ীরা নিরাপদে মদীনার পথ ধরে সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশে ব্যবসা করতে পারবে।

( ৭) মক্কায় বসবাসকারী মুসলিমদের জান মালের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

(৮) চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় একে অপরেরে সম্পদকে সম্মান করবে।

(৯) মক্কায় প্রবেশকালে মুসলিমরা বর্শা বা ফলা আনতে পারবে না। আত্মরক্ষার জন্য শুধু কোষবদ্ধ তলোয়ার আনতে পারবে।

যে সময় এ সন্ধির শর্তসমূহ নির্ধারিত হচ্ছিলো তখন মুসলমানদের পুরা বাহিনী অত্যন্ত বিচলিত বোধ করেছিলেন। যে মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে মুহাম্মদ সা. এসব শর্ত মেনে নিচ্ছিলেন তা কেউই বুঝে উঠতে পারছিলো না। কুরাইশরা এই চুক্তিকে তাদের সফলতা মনে করেছিলো আর মুসলমানরা বিচলিত হচ্ছিলো এই ভেবে যে, তারা কেন অবমাননাকর শর্তাবলী গ্রহণ করবে? 

এমন কি হযরত উমর রা.-এর মত গভীরদৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞানীজনের অবস্থা ছিল এই যে, তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে কখনো আমার মনে কোন সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু এ যাত্রায় আমিও তা থেকে রক্ষা পাইনি। তিনি বিচলিত হয়ে হযরত আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, “তিনি কি আল্লাহর রসূল নন? আমরা কি মুসলমান নই? এসব লোক কি মুশরিক নয়? এসব সত্ত্বেও আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এ অবমাননা মেনে নেব কেন?” 

তিনি জবাব দিলেন, “হে উমর! তিনি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ কখনো তাঁকে ধ্বংস করবেন না”। এরপরও তিনি ধৈর্যধারণ করতে পারলেন না। মুহাম্মদ সা.-এর কাছে গিয়ে তাঁকেও এ প্রশ্নগুলো করলেন। পরে হযরত উমর রা. মুহাম্মদ সা.-এর সাথে যে কথাবার্তা বলেছিলেন তার জন্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত ছিলেন। তাই তিনি অধিক পরিমাণে দান-খয়রাত এবং নফল নামায আদায় করতেন। যাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে মাফ করে দেন ।

এ চুক্তির দু’টি শর্ত মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে বেশী অসহনীয় ও দুর্বিসহ মনে হচ্ছিলো। প্রথমত যে জিনিসটি মুসলিমদের মনে দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হচ্ছিলো সেটি ছিল সন্ধির প্রথম শর্ত। মুসলমানগণ মনে করেছিলেন, এটি মেনে নেয়ার অর্থ হচ্ছে গোটা আরবের দৃষ্টিতে আমরা যেন ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছি। তাছাড়া এ প্রশ্নও মনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল যে, মুহাম্মদ সা. তো স্বপ্নে দেখেছিলেন, আমরা মক্কায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছি। অথচ এখানে আমরা তাওয়াফ না করেই ফিরে যাওয়ার শর্ত মেনে নিচ্ছি। এর ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ সা. বললেন, চুক্তির শর্ত অনুসারে এ বছর যদি না-ও হয় তাহলে আগামী বছর ইনশায়াল্লাহ তাওয়াফ হবে।

দ্বিতীয়ত চার নং শর্ত সম্পর্কে মুসলিমগণ হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। এটি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হলো এটি অসম শর্ত। মক্কা থেকে পালিয়ে আসা লোকদের যদি আমরা ফিরিয়ে দেই তাহলে মদিনা থেকে পালিয়ে যাওয়া লোকদের তারা ফিরিয়ে দেবে না কেন? এর জবাবে মুহাম্মদ সা. বললেন, যে আমাদের এখান থেকে পালিয়ে তাদের কাছে চলে যাবে সে আমাদের কোন কাজে লাগবে? আল্লাহ যেন তাকে আমাদের থেকে দূরেই রাখেন। তবে যে তাদের ওখান থেকে পালিয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে তাকে যদি আমরা ফিরিয়েও দেই তাহলে তার মুক্তিলাভের অন্য কোন উপায় হয়তো আল্লাহ সৃষ্টি করে দেবেন। 

তাছাড়া একটি ঘটনা মুসলিমদের অন্তরকে কষ্টে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। যখন সন্ধি চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হচ্ছিলো ঠিক তখন সুহাইল ইবনে আমরের পুত্র আবু জান্দাল কোন প্রকারে পালিয়ে নবীর সা.-এর কাছে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এই অপরাধে তার পিতা ও মক্কার কাফেররা তাকে বন্দি করে রেখেছিলো। এ সময় তাঁর পায়ে শিকল পরানো ছিল এবং দেহে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। তিনি মুহাম্মদ সা.-এর কাছে আবেদন জানালেন, আমাকে এ অন্যায় বন্দীদশা থেকে মুক্ত করুন। এ করুণ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কিরামের পক্ষে ধৈর্যধারণ করা কঠিন হয়ে পড়লো। কিন্তু তার পিতা সুহাইল ইবনে আমর বললো, চুক্তিপত্র লেখা শেষ না হলেও চুক্তির শর্তাবলী সম্পর্কে আপনার ও আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। অতএব এ ছেলেকে আমার হাতে অর্পণ করুন। মুহাম্মদ সা. তার যুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হলেন এবং আবু জান্দালকে জালেমদের হাতে তুলে দিলেন।

সন্ধি চুক্তি শেষ করে মুহাম্মদ সা. সাহাবীদের বললেন, এখানেই কুরবানী করে মাথা মুড়ে ফেলো এবং ইহরাম শেষ করো। কিন্তু কেউ-ই তাঁর জায়গা থেকে একটুও নড়লেন না। নবী সা. তিনবার আদেশ দিলেন কিন্তু উমরাহ করতে না পারার কারণে এবং অসম চুক্তিতে স্বাক্ষরের কষ্ট সাহাবীদের ওপর এমন প্রবল প্রভাব বিস্তার করেছিলো যে, তারা যার যার জায়গা হতে একটু নড়াচড়া পর্যন্ত করলেন না। মুহাম্মদ সা. সাহাবাদের আদেশ দিচ্ছেন কিন্তু তারা তা পালনের জন্য তৎপর হচ্ছেন না এমন বিষয় এই একটি ঘটনা ছাড়া নবী সা.-এর গোটা নবুয়্যত জীবনে আর কখনো ঘটেনি। এতে তিনি অত্যন্ত দুঃখ পেলেন। 

মহানবী সা. তাঁর তাঁবুতে গিয়ে উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালমার কাছে নিজের মনের কষ্টের কথা প্রকাশ করলেন। হযরত উম্মে সালামা বললেন, আপনি চুপচাপ গিয়ে নিজের উট কুরবানি করুন এবং মাথা মুড়ে ফেলুন। তাহলে সবাই স্বতস্ফূর্তভাবে আপনাকে অনুসরণ করবে। উম্মে সালামার কথাই সত্য হলো। সাহাবারা মহানবী সা.-কে এরূপ করতে দেখে সবাই কুরবানি করলো, মাথা মুড়ে কিংবা চুল ছেঁটে নিল এবং ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসলো। কিন্তু দুঃখ ও মর্ম যাতনায় তাদের হৃদয় চৌচির হয়ে যাচ্ছিলো।

এরপর মুসলিমরা সবাই মদিনার দিকে যাত্রা শুরু করলো। মক্কা থেকে ২৫ মাইল দূরে যাওয়ার পর আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ওহী নাজিল করে মুসলিমদের সান্তনা দিয়েছেন। আল্লাহ মুসলমানদের জানিয়ে দেন যে, এ সন্ধিচুক্তি যাকে তারা পরাজয় মনে করেছে তা প্রকৃতপক্ষে বিরাট বিজয়। তিনি সূরা ফাতাহর ১-৩ নং আয়াতে বলেন, 

//হে নবী, আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ তোমার আগের ও পরের সব ক্রটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন, তোমার জন্য তাঁর নিয়ামতকে পূর্ণতা দান করেন। তোমাকে সরল সহজ পথ দেখিয়ে দেন এবং অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে সাহায্য করেন।// 

এ সূরা নাযিল হওয়ার পর মুহাম্মদ সা. মুসলমানদের একত্রিত করে বললেন, আজ আমার ওপর এমন জিনিস নাযিল হয়েছে যা আমার জন্য দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও বেশী মূল্যবান। তারপর তিনি এ সূরা তেলাওয়াত করলে এবং বিশেষভাবে হযরত উমরকে ডেকে তা শুনালেন। কেননা, তিনিই সবচেয়ে বেশি মনোকষ্ট পেয়েছিলেন। 

ঈমানদারগণ যদিও আল্লাহ তা’আলার এ বাণী শুনেই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন। তবুও খুব বেশি সময় যেতে না যেতেই এ চুক্তির সুফলসমূহ এক এক করে প্রকাশ পেতে থাকলো এবং এ চুক্তি যে সত্যিই একটা বিরাট বিজয় সে ব্যাপারে আর কারো মনে কোন সন্দেহ থাকলো না।

১. এ চুক্তির মাধ্যমে আরবে প্রথমবারের মতে ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নেয়া হলো। এর পূর্ব পর্যন্ত আরবদের দৃষ্টিতে মুহাম্মাদ সা. এবং তাঁর সাহাবাদের মর্যাদা ছিল শুধু কুরাইশ ও আরব গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী একটি গোষ্ঠী হিসেবে তারা তাদের সমাজচ্যুত বলেই মনে করতো। 

২. কুরাইশরা এ যাবত ইসলামকে ধর্মহীনতা বলে আখ্যায়িত করে আসছিলো। কিন্তু মুসলমানদের জন্য বায়তুল্লাহ জিয়ারতের অধিকার মেনে নিয়ে তারা আপনা থেকেই একথাও মেনে নিল যে, ইসলাম কোন ধর্মহীনতা নয় বরং আরবে স্বীকৃতি ধর্মসমূহের একটি এবং অন্যান্য আরবদের মত এ ধর্মের অনুসারীরাও হজ্জ ও উমরার অনুষ্ঠানসমূহ পালনের অধিকার রাখে। কুরাইশদের অপপ্রচারের ফলে আরবের মানুষের মনে ইসলামের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিলো এতে সে ঘৃণাও অনেকটা হ্রাস পেল।

৩. দশ বছরের জন্য যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হওয়ার ফলে মুসলমানগণ নিরাপত্তা ও শান্তি লাভ করলেন। মুসলিমরা গোটা আরবের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এত দ্রুত ইসলামের প্রচার চালালেন যে, হুদাইবিয়ার সন্ধি পরবর্তী দু’বছর যতো লোক মুসলমান হলো সন্ধি পূর্ববর্তী পুরো ১৯ বছরেও তা হয়নি। সন্ধির সময় যেখানে নবীর সা. সাথে মাত্র ১৪ শত লোক ছিলেন। সেখানে মাত্র দুই বছর পরেই কুরাইশদের চুক্তিভংগের ফলে নবী সা. যখন মক্কায় অভিযান চালান তখন দশ হাজার সৈনিকের এক বিশাল বাহিনী তাঁর সাথে ছিল। এটা ছিল হুদাইবিয়ার সন্ধির সুফল।

৪. কুরাইশদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নবী সা. তাঁর অধিকারভুক্ত এলাকায় ইসলামী সরকারকে সুদৃঢ় করার এবং ইসলামী আইন-কানুন চালু করে মুসলিম সমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও সংস্কৃতি হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ লাভ করেন। এটিই সেই মহান নিয়ামত যা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা সূর মায়েদার ৩ নং আয়াতে বলছেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের জন্য আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের দীন হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করলাম।“ 

৫. কুরাইশদের সাথে সন্ধি হয়ে যাওয়ার পর দক্ষিণ দিক থেকেও সুফল পাওয়া গেল। মুসলমানগণ উত্তর ও মধ্য আরবের সমস্ত বিরোধী শক্তিকে অতি সহজেই বশীভূত করে নেয়। হুদাইবিয়ার সন্ধির মাত্র তিন মাস পরেই ইহুদীদের সবচেয়ে বড় দুর্গ খায়বার বিজিত হয় এবং তারপর ফাদাক, ওয়াদিউল কুরা, তায়ামা ও তাবুকের মত ইহুদী জনপদেও একের পর এক মুসলমানদের কর্তৃত্বধীনে চলে আসে। তারপর মধ্য আরবের যেসন গোত্র ইহুদী ও কুরাইশদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছিলো তার সবগুলোই এক এক করে মুসলমানদের শাসনাধীন হয়ে পড়ে। 

৬. সন্ধিচুক্তির যে বিষয়টি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বেশী অপছন্দনীয় ছিল এবং কুরাইশরা তাদের বড় বিজয় বলে মনে করেছিলো তা হচ্ছে, মক্কা থেকে পালিয়ে মদিনায় আশ্রয় গ্রহণকারীদের ফিরিয়ে দেয়া হবে কিন্তু মদিনা থেকে পালিয়ে মক্কায় গমনকারীদের ফিরিয়ে দেয়া হবে না। কিন্তু অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই এ ব্যাপারটিও কুরাইশদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ালো। 

সন্ধির কিছুদিন পরেই মক্কার একজন মুসলমান আবু বাসীর কুরাইশদের বন্দীত্ব থেকে পালিয়ে মদীনায় চলে আসেন। কুরাইশরা তাকে ফেরত দেয়ার দাবী জানালো এবং নবী সা. চুক্তি অনুযায়ী মক্কা থেকে যারা তাকে বন্দী করে নিয়ে যেতে এসেছিলো তাদের কাছে হস্তান্তর করলেন। কিন্তু মক্কা যাওয়ার পথে সে আবার তাদের বন্দীত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে এবং লোহিত সাগরের যে পথ ধরে কুরাইশদের বাণিজ্য বহর যাতায়াত করতো সে পথের একটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে যে মুসলমানই কুরাইশদের বন্দিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করার সুযোগ করতে পারতো সে-ই মদীনায় যাওয়ার পরিবর্তে আবু বাসীরের আশ্রয়ে চলে যেত। এভাবে সেখানে ৭০ জনের সমাবেশ ঘটে এবং তারা কুরাইশদের কাফেলার ওপর বারবার অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে তাদের অবস্থা শোচনীয় করে তোলে। অবশেষে তাদেরকে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কুরাইশরা নিজেরাই নবী সা.-এর কাছে আহবান জানায়। এভাবে হুদায়বিয়ার চুক্তির ঐ শর্তটি আপনা থেকেই রহিত হয়ে যায়। 

যে সন্ধি চুক্তিকে মুসলমানগণ তাদের ব্যর্থতা আর কুরাইশরা তাদের সফলতা মনে করেছিলো সে সন্ধিচুক্তি থেকেই তারা এসব সুফল ও কল্যাণ লাভ করে। হুদাইবিয়ার এই সন্ধিচুক্তিই ছিল মূলত মক্কা বিজয়ের সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন