২৬ অক্টোবর, ২০২০

লুকমান ও তাঁর উপদেশমালা


জাহেলি যুগে আরবরা এক জ্ঞানী ব্যক্তির নাম জানতেন। তাকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর নাম লুকমান। বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী হিসেবে আরবে লুকমান বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি আরবদের কাছে লুকমান হাকিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জাহিলী যুগের কবিরা যেমন ইমরাউল কায়েস, লবিদ, আ'শা, তারাফাহ প্রমুখ তাদের কবিতায় তার কথা বলা হয়েছে। আরবের অনেকের কাছে "সহিফা লুকমান" নামে তার উপদেশগুলোর একটি সংকলন পাওয়া যেতো। 

মদিনায় হিজরতের তিন বছর পূর্বে মদীনার সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি নবী সা.-এর দাওয়াতের প্রভাবিত হন তিনি ছিলেন সুওয়াইদ ইবনে সামেত। তিনি হজ্ব সম্পাদন করার জন্য মক্কায় যান। সেখানে নবী করীম সা. নিভৃতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত হাজীদের আবাসস্থলে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। সুওয়াইদ ইবনে সামেত যখন নবী সা.-এর বক্তৃতা শুনেন, তাকে বলেন, আপনি যে টাইপের কথা বলেছেন সে টাইপের একটি জিনিস আমার কাছেও আছে। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি? তিনি জবাব দেন সেটা লুকমানের পুস্তিকা। 

তারপর নবী করীমের সা.-এর অনুরোধে তিনি তার কিছু অংশ পাঠ করে তাকে শুনান। রাসূল সা. বলেন, এটা বড়ই চমৎকার কথা! তবে আমার কাছে এর চেয়েও বেশি চমৎকার কথা আছে। এরপর তিনি কুরআন থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে সুওয়াইদ রা. স্বীকার করেন, নিসন্দেহে এটা লুকমানের পুস্তিকার চেয়ে ভালো। এই সুওয়াইদ ইবনে সামেত তার যোগ্যতা, বীরত্ব, সাহিত্য ও কাব্য মনীষা এবং বংশ মর্যাদার কারণে মদীনায় "কামেল" নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু নবী সা.-এর সাথে সাক্ষাতের পর যখন তিনি মদীনায় ফিরে যান তার কিছুদিন পর বুয়াসের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং তাতে তিনি মারা যান। তার গোত্রের লোকদের সাধারণভাবে এ ধারণা ছিল যে, নবী সা.-এর সাক্ষাতের পর তিনি মুসলমান হয়ে যান।

লুকমানের জন্মপরিচয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। লোকমুখে প্রচলিত কবিতা ও স্মৃতিকথা অনুসারে অনেকে হযরত লুকমানকে আদ জাতির অন্তর্ভুক্ত ইয়েমনের বাদশাহ মনে করতো। মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদবী এসব বর্ণনার ওপর নির্ভর করে তার "আরদুল কুরআন" গ্রন্থে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, আদ জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নাযিল হবার পর হযরত হুদ আ.-এর সাথে তাদের যে ঈমানদার অংশটি বেঁচে গিয়েছিল লুকমান ছিলেন তাদেরই বংশোদ্ভূত। ইয়েমেনে এ জাতির যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অন্যতম শাসক ও বাদশাহ। 

কিন্তু কতিপয় প্রবীণ সাহাবী ও তাবেঈদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্য বর্ণনাগুলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, লুকমান ছিলেন একজন হাবশি গোলাম। হযরত আবু হুরাইরা রা., মুজাহিদ, ইকরিমাহ এসব গবেষকরাও এই কথাই বলেন। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী রা. বলেন, তিনি ছিলেন নূবার অধিবাসী। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবের উক্তি হচ্ছে, তিনি মিশরের কালো লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ তিনটি বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করছে। কারণ আরবের লোকেরা কালো বর্ণের মানুষদেরকে সেকালে প্রায়ই হাবশি বলতো। আর নূবা হচ্ছে মিসরের দক্ষিণে এবং সুদানের উত্তরে অবস্থিত একটি এলাকা। তাই তিনটি উক্তিতে একই ব্যক্তিকে নূবী, মিসরীয় ও হাবশী বলা কেবলমাত্র শাব্দিক বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থের দিক দিয়ে এখানে কোন বিরোধ নেই। 

লুকমান নবী ছিলেন না এই ব্যাপারে মোটামুটি সব গবেষকই একমত। তিনি ছিলেন একজন বিশ্বাসী, পরহেযগার, ওলী এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একজন হাবশি ক্রীতদাস ও ছুতার ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব বলেন, তাঁকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল, কিন্তু নবুয়্যত দেওয়া হয়নি। লুকমান সম্পর্কে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “তিনি ছিলেন বেঁটে, উঁচু নাক ও মোটা ঠোঁট বিশিষ্ট একজন জ্ঞানী ব্যক্তি।”

হযরত খালিদ রাবি রহ. বলেন, হযরত লুকমান ছিলেন একজন হাবশী ক্রীতদাস ও ছুতার। একদিন তার মনিব তাঁকে বলেন, “তুমি একটি বকরি যবেহ করো এবং ওর গোশতের উৎকৃষ্ট দু’টি টুকরা আমার কাছে নিয়ে এসো।” তিনি হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা নিয়ে আসলেন। কিছুদিন পর পুনরায় তাঁর মনিব তাঁকে এই আদেশই করলো এবং বকরির গোশতের নিকৃষ্ট দু’টি খণ্ড আনতে বললো। তিনি এবারও উক্ত দুটি জিনিসই নিয়ে আসলেন। তার মনিব তখন বললো: “ব্যাপার কী? এটা কী ধরনের কাজ হলো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ দু’টি যখন ভালো থাকে তখন দেহের কোনো অঙ্গই এ দু’টির চেয়ে ভাল নয়। আবার এ দুটি জিনিস যখন খারাপ হয়ে যায় তখন সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস এ দু’টোই হয়ে থাকে।” 

একদা হযরত আবু দারদা রা. হযরত লুকমান হাকিমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, হযরত লুকমান কোনো বড় পরিবারের লোক ছিলেন না এবং ধনী ও সম্ভ্রান্ত বংশেরও ছিলেন না। তবে তাঁর মধ্যে বহু উত্তম গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি ছিলেন চরিত্রবান, স্বল্পভাষী, চিন্তাশীল ও দূরদর্শী। তিনি দিনে শয়ন করতেন না, লোকজনের সামনে থুথু ফেলতেন না, মানুষের সামনে প্রস্রাব, পায়খানা ও গোসল করতেন না, বাজে কাজ হতে দূরে থাকতেন। তিনি হাসতেন না এবং যে কথা বলতেন তা জ্ঞানপূর্ণ কথাই হতো। তাঁর ছেলে মারা গেলে তিনি ক্রন্দন করেননি। তিনি বাদশাহ ও আমীরদের দরবারে একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই গমন করতেন যে, যেন চিন্তা-গবেষণা এবং শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সুযোগ লাভ হয়। এ জন্যেই তিনি পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে লুকমানের কথা উল্লেখ করে আরবদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু তারা আগে থেকে লুকমানকে শ্রদ্ধা করতো তাই লুকমানের উপদেশগুলো তিনি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। লুকমানকে দেওয়া অনুগ্রহের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা লুকমানের ১২ নং আয়াতে বলেন, আমি অবশ্যই লুকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেতো তা করে নিজের জন্য এবং কেউ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহতো অভাবমুক্ত, চির প্রশংসিত।

মক্কার কাফেরদের আল্লাহ তায়ালা লুকমানের উপদেশমালা থেকে কিছু উপদেশ শুনিয়েছেন। যাতে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই উপদেশগুলো লুকমান তার ছেলের উদ্দেশে করেছেন।  

শিরক : 

আর স্মরণ করো, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয়ই শিরক হল বড় জুলুম। (লুকমান ১৪)

আল্লাহর পরিচয় : 

'হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয় তা (পাপ- পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থেকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা যমীনে, আল্লাহ্ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সুক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। (লুকমান ১৬)

সালাত : 

'হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ করো, আর তোমার উপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এটা অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (লুকমান ১৭)

অহংকার :

আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না, মুখ ফিরিয়ে নিও না। এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (লুকমান ১৮)

শিষ্টাচার :

‘আর তুমি তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো; নিশ্চয় শব্দের মধ্যে গর্দভের শব্দই সবচেয়ে অপ্রীতিকর। (লুকমান ১৯)

সর্বশেষ উপদেশের ক্ষেত্রে কোনো কোনো মুফাসসির এর এই অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, "দ্রুতও চলো না এবং ধীরেও চলো না বরং মাঝারি গতিতে চলো।" কিন্তু উস্তাদ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী লিখেছেন, এখানে ধীরে বা দ্রুত চলা আলোচ্য বিষয় নয়। ধীরে বা দ্রুত চলার মধ্যে কোন নৈতিক গুণ বা দোষ নেই এবং এ জন্য কোন নিয়মও বেঁধে দেয়া যায় না। কাউকে দ্রুত কোনো কাজ করতে হলে সে দ্রুত ও জোরে চলবে না কেন! আর যদি নিছক বেড়াবার জন্য চলতে থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে ধীরে চলায় ক্ষতি কি? মাঝারি চালে চলার যদি কোনো মানদণ্ড থেকেই থাকে, তাহলে প্রত্যেক অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাকে একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত কঠিন।

এখানে মূলত চাল-চলনের কথা বলা হয়েছে যার সাথে বেশভূষা, ভঙ্গিমা ইত্যাদি নির্ভর করে। যেমন এমনভাবে না চলা যাতে অহংকার বা অহমিকা প্রকাশ পায়। এমন চালচলনও না হওয়া যা দ্বারা দীনতা ও হীন মনোভাব ফুটে ওঠে। অনেকে কৃত্রিম বিনয় নিয়ে চলে তা থেকেও দূরে থাকা। লুকমানের উপদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজের মনের এসব অবস্থার পরিবর্তন করো এবং একজন সোজা-সরল- যুক্তিসঙ্গত ভদ্রলোকের মতো চলো। যেখানে নেই কোনো অহংকার ও দম্ভ এবং কোনো দুর্বলতা অথবা লোক দেখানো বিনয় ও ত্যাগ। 

উস্তাদ মওদূদী একটি ঘটনা উল্লেখ করেন, হযরত উমর রা. একবার এক ব্যক্তিকে মাথা হেঁট করে চলতে দেখলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন, "মাথা উঁচু করে চলো। ইসলাম রোগী নয়।" আর একজনকে তিনি দেখলেন যে কুঁকড়ে চলছে। তিনি বললেন, "ওহে জালেম! আমাদের দ্বীনকে মেরে ফেলছো কেন? 

এ দুটি ঘটনা থেকে জানা যায় , হযরত উমরের কাছে দীনদারীর অর্থ মোটেই এটা ছিল না যে, পথ চলার সময় রোগীর মতো আচরণ করবে এবং অযথা নিজেকে দীনহীন করে মানুষের সামনে পেশ করবে। বরং কোনো মুসলমানকে এভাবে চলতে দেখে তার ভয় হতো, এভাবে চললে অন্যদের সামনে ইসলামের ভুল প্রতিনিধিত্ব করা হবে এবং মুসলমানদের মধ্যেই নিস্তেজ ভাব সৃষ্টি হয়ে যাবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন