৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

কে ছিলেন দুই শিংওয়ালা শাসক?



রাসূল সা.-এর সময় আরবের মধ্যে ইহুদীরা পড়াশোনা ভালো করতো। তাদের অনেক জানাশোনা ছিল। রাসূল সা.-এর আগমন ও তাঁর দাওয়াতের সংবাদ যখন সবদিকে ছড়িয়ে পড়লো তখন ইহুদীরা মহানবীর সত্যতা বুঝতে চাইলো। তারা ভেবেছিল শেষ নবী তাদের মধ্য থেকেই আসবে কারণ তাদের তাওরাতে মহানবী সা.-এর ভবিষ্যতবাণী নিয়ে আলোচনা আছে। 

মক্কার কাফিরদের থেকে তারা যখন জানলো মহানবী সা. শিক্ষাগ্রহণ করেননি, তিনি নিরক্ষর। তাই তারা মহানবী সা.-কে আটকানোর জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্ন উত্থাপন করলো। যেগুলো মহানবী সা.-এর জানার কথা না। এর মধ্যে ছিল আসহাবে কাহফ ও যুলকারনাইন। ইহুদীদের থেকে জেনে মক্কার কাফিররা মহানবী সা.-কে প্রশ্ন করতে থাকলো যুলকারনাইন কে ছিলেন? 

এখানে প্রসঙ্গত বলে রাখি, মহানবী সা. জ্ঞানী ছিলেন, বিচক্ষণ ছিলেন, আমানতদার ছিলেন, সৎ মানুষ ছিলেন এই প্রত্যেকটি বিষয় তার নবুয়্যত পাওয়ার আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তিনি এই পৃথিবীর কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেননি বিধায় তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। এই বিষয়ে সূরা জুময়াতে উল্লেখ রয়েছে। মহানবী সা. যে উম্মী অর্থাৎ অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন অনেকবার হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ছিল এটা একটা মুজিযা। তিনি পড়তে পারতেন না বিধায় কোনো প্রাচীন গ্রন্থ থেকে তার জ্ঞান আহরণের কোনো সুযোগ ছিল না। 

যারা মহানবী সা. নিরক্ষর ছিলেন এই কথা স্বীকার করেন না তারা মূলত সীরাত ও তাফসীর সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন না। সূরা আম্বিয়ার ৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর তার তাফসীরে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন যা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থেও এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি রাসূল সা.-এর কাছে এমন মুজিযা দেখতে চাইলেন যেরকম আগের নবীদের ছিল। তখন মহানবী সা. জবাবে বললেন, আমার মতো নিরক্ষর ব্যক্তির কাছে কুরআনের মতো জ্ঞানময় কুরআন আছে। এটাই তো সবচেয়ে বড় মুজিযা। 

হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় সন্ধিপত্রে যখন লেখা হলো ‘এই সন্ধি আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর তরফ থেকে তখন কোরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল প্রতিবাদ জানিয়ে বলল : ‘আল্লাহর রসুল’ কথাটি লেখা যাবে না; এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে।’ এ কথায় সাহাবিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। সন্ধিপত্র লেখক হজরত আলী (রা.) কিছুতেই এটা মানতে রাজি হলেন না। কিন্তু হজরত (সা.) নানাদিক বিবেচনা করে সুহাইলের দাবি মেনে নিলেন। এরপর আলী রা.-কে বললেন কোথায় আল্লাহর রাসূল লেখা আছে আমাকে দেখিয়ে দাও। আলী রা. দেখিয়ে দিলে তিনি হাতে ‘আল্লাহর রসুল’ কথাটি কেটে দিয়ে বললেন : ‘তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রসুল।’

যাই হোক কাফিরদের অব্যাহত প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সূরা কাহফের ৮৩ - ৯৮ নং আয়াতে যুলকারনাইন সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

//আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। বল, ‘আমি এখন তার সম্পর্কে তোমাদের নিকট বর্ণনা দিচ্ছি’। আমি তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দান করেছিলাম এবং সব বিষয়ের উপায়- উপকরণ দান করেছিলাম। অতঃপর সে (পশ্চিমে) একটি পথ অবলম্বন করলো। অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত পানির ঝর্ণায় ডুবতে দেখতে পেল এবং সে এর কাছে একটি জাতির দেখা পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন, তুমি তাদেরকে আযাবও দিতে পার অথবা তাদের ব্যাপারে সদাচরণও করতে পার’।

সে বলল, ‘যে ব্যক্তি যুলম করবে, আমি অচিরেই তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর তাকে তার রবের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হবে। তখন তিনি তাকে কঠিন আযাব দেবেন’। ‘আর যে ব্যক্তি ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার। আর আমি আমার ব্যবহারে তার সাথে নরম কথা বলবো’।

তারপর সে আরেক পথ (পূর্বে) অবলম্বন করলো। অবশেষে সে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি। প্রকৃত ঘটনা এটাই। আর তার নিকট যা ছিল, আমি সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত।

তারপর সে আরেক পথ অবলম্বন করলো। অবশেষে যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছল, তখন সেখানে সে এমন এক জাতিকে পেল, যারা তার কথা তেমন একটা বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, ‘হে যুলকারনাইন! নিশ্চয় ইয়া’জূজ ও মা’জূজ যমীনে অশান্তি সৃষ্টি করছে, তাই আমরা কি আপনাকে এ জন্য কিছু খরচ দেব যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটা প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন’?

সে বলল, ‘আমার রব আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, সেটাই উত্তম। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব’। ‘তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও’। অবশেষে যখন সে দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা সমান করে দিল, তখন সে বলল, ‘তোমরা ফুঁক দিতে থাক’। অতঃপর যখন সে তা আগুনে পরিণত করল, তখন বলল, ‘তোমরা আমাকে কিছু তামা দাও, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই’।

এরপর তারা (ইয়া’জূজ ও মা’জূজ) প্রাচীরের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারল না এবং নিচ দিয়েও তা ভেদ করতে পারল না। সে বলল, ‘এটা আমার রবের অনুগ্রহ। অতঃপর যখন আমার রবের ওয়াদাকৃত সময় আসবে তখন তিনি তা মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন। আর আমার রবের ওয়াদা সত্য’।//

আল্লাহর দেওয়া এই বর্ণনা থেকে যা জানা যায় তা হলো, যুলকারনাইনকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি পশ্চিমে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিজয় করেছেন। সেখানে তিনি সূর্যকে কর্দমাক্ত পানিতে ডুবে যেতে দেখেছেন। তার মানে সমুদ্রের দ্বারে উপস্থিত হয়েছেন। পশ্চিমে জয়ী হওয়ার পর তিনি সেখানে যারা ঈমান এনেছে তাদের প্রতি সদয় হয়েছেন। আর যারা জালিম তাদের শাস্তি দিয়েছেন। এরপর তিনি পূর্বদিকে অভিযান পরিচালনা করেছেন। এমন জাতির নিকট গিয়ে পৌঁছেছেন যারা সূর্যকে আড়াল করার মতো যোগ্যতা হাসিল করেনি।   

এরপর তিনি আরেকদিকে অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে তিনি দুই পর্বতের মাঝামাঝি একটি স্থানে এসে পৌঁছলেন। সেখানে যারা থাকতো তাদের ভাষার সাথে যুলকারনাইনের ভাষার মিল ছিল না। তারা ইয়াজুজ মাজুজ নামে এক জাতির অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। তাই যুলকারনাইনের সহায়তায় ওই জাতি একটি প্রাচীর নির্মাণ করলো যাতে ইয়াজুজ মাজুজ আর আসতে না পারে। তবে একসময় এই প্রাচীর আল্লাহর ইচ্ছায় ভেঙ্গে পড়বে। আর যুলকারনাইন শব্দের অর্থ দুই শিংওয়ালা। এই নামেই আরবের ইতিহাস ও প্রাচীন কবিতাতে যুলকারনাইনের বর্ণনা পাওয়া যেত। 

এখন প্রশ্ন হলো কে ছিলেন এই শিংওয়ালা?   

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা চারটি ক্লু পাই যা দ্বারা আমরা বিবেচনা করতে পারবো কে ছিলেন যুলকারনাইন। 

প্রথমত- যেহেতু কুরআনের এই অংশ কাফিরদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে। তাই নিশ্চিত করে বলা যায় যুলকারনাইনের নাম ইহুদীরা আগেই জানতো। এখন প্রশ্ন হলো ইহুদীরা পূর্বের কোন দিগ্বিজয়ী শাসককে দুই শিংওয়ালা হিসেবে অভিহিত করতো?   

দ্বিতীয়ত- এমন শাসক যিনি ছিলেন তাওহীদবাদী, ন্যায়বিচারক, ঈমানদার ও মুসলিম। 

তৃতীয়ত-  এমন শাসক যিনি পূর্বে ও পশ্চিমে অভিযান পরিচালনা করেছেন ও জয়ী হয়েছেন। কুরআন নাজিলের আগে এমন শাসক পাওয়া যায় তিনজন মোটে। আলেকজান্ডার, সাইরাস ও হিমায়ার। তিনজনের মধ্যে হিমায়ার ও আলেকজান্ডার মুশরিক ছিলেন বিধায় তারা আলোচনা থেকে বাদ পড়ে যান। কুরআনের বর্ণনা অনুসারে কোনো মুশরিক যুলকারনাইন হতে পারেন না। বাকী থাকেন একজন যিনি আরবি উচ্চারণে কুরুশ আর ইউরোপিয় উচ্চারণে সাইরাস। 

চতুর্থত- এমন শাসক যিনি পার্বত্য পথে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন ও ইয়াজুজ মাজুজকে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রথম ক্লু সহজেই সাইরাসের বেলায় প্রযোজ্য। কারণ বাইবেলের দানিয়েল পুস্তকে দানিয়েল নবীর যে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করা হয়েছে তাতে তিনি ইরানীদের উত্থানের পূর্বে মিডিয়া ও পারস্যের যুক্ত সাম্রাজ্যকে একটি দু’শিংওয়ালা মেষের আকারে দেখেন। এই দুই সাম্রাজ্যের মানচিত্র দেখতে দুই শিংওয়ালা মেষের অনুরূপ। ইহুদীদের মধ্যে এ “দু’শিংধারী”র বেশ চর্চা ছিল। কারণ তার সাথে সংঘাতের ফলেই শেষ পর্যন্ত বেবিলনের সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় এবং বনী ইসরাঈল দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্তি লাভ করে। তাই তারা যুলকারনাইনকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতো। 

দ্বিতীয় ক্লু সাইরাসের সাথেই ভালোভাবে মিলে যায়। তিনি তাওহীদবাদী ছিলেন। তার শত্রুরাও তার ন্যায়বিচারের প্রশংসা করেছে। তিনি ন্যায়বিচারক ও আল্লাহভীরু ছিলেন। সাইরাস সিলিন্ডার নামে কিউনিফর্ম হরফে লেখা একটি সনদ পাওয়া যায় যেখানে সাইরাস মানবাধিকারের ঘোষণা দিয়েছেন। এটা এখন পর্যন্ত সর্বপ্রথম মানবাধিকার ঘোষণা বলে পৃথিবীব্যাপী বিবেচিত। 

তৃতীয় ক্লু'ও মোটামুটি আংশিক মিলে যায়। তার বিজয় অভিযান নিঃসন্দেহে পশ্চিমে এশিয়া মাইনর ও সিরিয়ার সমুদ্রসীমা এবং পূর্বে বলখ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু উত্তরে বা দক্ষিণে তার কোন বড় আকারের অভিযানের সন্ধান এখনো পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়নি। অথচ কুরআন সুস্পষ্টভাবে তার তৃতীয় একটি অভিযানের কথা বর্ণনা করছে। তবুও এ ধরনের একটি অভিযান পরিচালিত হওয়া অসম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস থেকে দেখা যায়, সাইরাসের রাজ্য উত্তরে ককেশিয়া অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

চতুর্থ ক্লু'র ব্যাপারে কোনো কিছু নিশ্চিত করে বলা যায় না। সাইরাসের নির্মিত কোনো প্রাচীরের সন্ধান প্রচলিত ইতিহাসে নেই।

একনজরে সাইরাস : 

সাইরাস ছিলেন ইরানী হাখমানেশি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এই সাম্রাজ্যটি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা—এই তিন মহাদেশে বিস্তৃত ছিল। ইরান ছাড়াও বর্তমান কালের আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়ার অংশবিশেষ, আনাতোলিয়া (তুরস্ক), গ্রিস, কৃষ্ণ সাগরের উপকূল, ইরাক, সৌদি আরবের উত্তরাংশ, জর্দান, প্যালেস্টাইন, লেবানন, সিরিয়া, প্রাচীন মিশরের সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং লিবিয়া এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলির একটি। তার রাজকীয় উপধিগুলো ছিল মহান রাজা, পারস্যের রাজা, অ্যানসানের রাজা, মিডিয়ার রাজা, ব্যাবিলনের রাজা ও সুমেরের রাজা। তার আরেকটি উপাধি ছিল পৃথিবীর চতুর্কোণের রাজা। 

এছাড়াও ৫৩৯ এবং ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বের মাঝামাঝি কোনো এক সময় সাইরাস সিলিন্ডারের ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বৈশ্বিক মানবাধিকার ঘোষণা করেছিলেন যা বিশ্বের ইতিহাসে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম মানবাধিকারের সনদ। সাইরাসের শাসনকাল আনুমানিক ৩১ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। সাইরাস তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন প্রথম মিডিস সাম্রাজ্য দখলের মাধ্যমে, তারপর লিডিয় সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে ব্যাবিলন সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন। 

অনেক তাফসীরকারক যুলকারনাইন বলতে সাইরাসকে বুঝিয়ে থাকেন। উস্তাদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদীও তার ব্যতিক্রম নন। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন