৬ ডিসেম্বর, ২০২০

মুসলিমরা যেভাবে যুদ্ধের অনুমতি পেল


এই যুদ্ধের অনুমতি মানে সশস্ত্র প্রতিরোধ করার অনুমতি। মক্কায় থাকাকালীন ১৩ বছরে আল্লাহর রাসূল বহু নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। সাহাবাদের কঠিন ও ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে। কয়েকজনকে শহীদ করা হয়েছে। শারিরীক আঘাত নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। এই আঘাত থেকে বাঁচতে পারেন নি স্বয়ং মুহাম্মদ সা.। সব সাহাবীই কোনো না কোনো শারিরীক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর তিন বছর মুসলিমদের শিয়াবে আবু তালিবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো। 


সাহাবারা নির্যাতিত হয়ে মুহাম্মদ সা.-এর কাছে এসে বলতেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি আমাদের জন্য কিছুই করবেন না? আমরা তো বড় অসহায় হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর রাসূল সেসময় ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতেন, পূর্বেকার নবীদের নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। আল্লাহর সাহায্যের আশ্বাস দিতেন। হজরত ওমর রা. ইসলাম গ্রহণ করার পর দাওয়াতী কাজ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে শুরু করলেও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র প্রতিরোধ করা হয় নি। এর কারণ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অনুমতি দেননি। 


এর কারণ ছিল আল্লাহর রাসূলের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। কোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব তার কাছে ছিল না। কোনো নিরাপদ এলাকা ছিল না। এমতাবস্থায় সশস্ত্র প্রতিরোধ মানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, যে ক'জন মুমিন আছেন তাদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জানা অপরিহার্য। অস্ত্র কখন হাতে তোলা যাবে তার একটা গাইডলাইন সীরাতে রয়েছে। জেএমবি, আল কায়েদা, আইএস এসব সংগঠনের উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালা জানেন। তবে তাদের কর্মপদ্ধতি সীরাতসম্মত নয়। আল্লাহর রাসূল তাঁর মাক্কী জীবনে নির্যাতনে পর নির্যাতন সহ্য করেছেন কিন্তু কখনোই পাল্টা প্রতিরোধ করেননি। 


এরপর মদিনায় যখন মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল তখন তারা আল্লাহর রাসূল সা.-কে মদিনায় আহ্বান করলেন। মুহাম্মাদ সা.-এর কাছে তারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ও ইসলামের অনুগত থাকার শপথ নিলেন। এরপর আল্লাহর নির্দেশে মুহাম্মদ সা. তাঁর সকল সাহাবীদের নিয়ে মদিনায় চলে গেলেন। সেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। মদিনার মূল দুটি গোত্র আওস ও খাজরাজের সবাই ইসলাম গ্রহণ না করলেও অধিকাংশ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তবে মদিনার সবাই মুহাম্মদ সা.-কে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নিয়েছে।       


এদিকে মক্কার মুশরিকরা মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষেপে গিয়েছে। মুসলমানরা তাদের কবল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো এবং মদীনায় তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এটা কাফেরদের ক্রোধ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা মুসলিমদের ফেলে যাওয়া সম্পদ, বাড়িঘর, জমিজমা ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করেছে। যেসব মুসলিম পালাতে পারেনি মক্কা থেকে তাদের আটক করে রেখেছে।


আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। মদিনায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলো আনসারদের নেতা। মক্কার পৌত্তলিকরা আবদুল্লাহকে হুমকিপূর্ণ একটি চিঠি লিখলো। সেই সময় মদিনায় আবদুল্লাহর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো। এমনকি নবী সা. যদি মদিনায় না যেতেন, মদিনাবাসীরা তাকে তাদের বাদশাহ হিসাবে গ্রহণ করতো। মক্কার পৌত্তলিকরা তাদের হুমকিপূর্ণ চিঠিতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তাদের পৌত্তলিক সহযোগিদের উদ্দেশ্যে লিখলো যে, আপনারা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়েছেন, তাই আমরা কসম খেয়ে বলছি যে, হয়তো আপনারা তার সাথে লড়াই করুন অথবা তাকে মদিনা থেকে বের করে দিন। যদি না করেন তবে আমরা সর্বশক্তিতে আপনাদের উপর ঝঁপিয়ে পড়ে যোদ্ধা পুরুষদের হত্যা এবং আপনাদের নারীদের সম্মান বিনষ্ট করবো।


এই চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মক্কার পৌত্তলিকদের নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হলো। মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মনে আগে থেকেই ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিলো। কেননা নবী সা.-এর কারণে সে মদিনার বাদশাহ হতে পারেনি। সে মনে করতো মুহাম্মদ সা. রাজমুকুট তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন। মক্কার পৌত্তলিকদের চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং মদিনার তার সহযোগিরা রাসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। 


মুহাম্মদ সা. এ খবর পেয়ে আবদুল্লাহর কাছে গিয়ে তাকে ও তার সঙ্গীদের বললেন, কুরাইশদের হুমকিতে যথেষ্ঠ প্রভাবিত হয়েছো মনে হচ্ছে। শোনো, তোমরা নিজেরা নিজেদের যতো ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছো, মক্কার কোরায়শরা তার চেয়ে বেশি ক্ষতি তোমাদের করতে পারবে না। তোমরা কি নিজেদের সন্তান এবং ভাইয়ের সাথে নিজেরাই যুদ্ধ করতে চাও? নবী সা.-এর এ কথা শোনার পর যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত আবদুল্লাহর সহযোগিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। 


সমর্থক ও সহযোগীরা ছত্রভঙ্গ হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনকার মতো যুদ্ধ থেকে বিরত হলো। কিন্তু কুরাইশদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত ছিলো। কেননা এই দুর্বৃত্ত মুসলমান ও কাফেরদের সাথে সংঘাতের কোন ক্ষেত্রেই নিজের জড়িত হওয়ার সুযোগকে হাতছাড়া করেনি। উপরন্তু মুসলমানদের বিরোধিতার শক্তি অর্জনের জন্যে ইহুদীদের সাথেও সে যোগাযোগ রক্ষা করতো যেন, প্রয়োজনের সময় ইহুদীরা তাকে সাহায্য করে। 


এদিকে মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মদ সা.-কে বেদ্বীন আখ্যা দিয়ে মুহাম্মদ সা. ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য হজ্ব করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। শুধু তাই নয়, মুসলিম হয় নি এমন মদিনাবাসীদের জন্যও বাধা তৈরি করে। মদিনার সা’দ বিন মা’য (রা.) তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় গিয়ে উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হন। নিবিষ্ট চিত্তে হযরত সা’দকে তওয়াফ করতে দেখে আবু জেহেল উমাইয়াকে বললো, আবু সফওয়ান, তোমার সঙ্গে আসা এই লোকটির পরিচয় কী? উমাইয়া বললো, এ হচ্ছে সা’দ ইবনে মা’য। আবু জেহেল হযরত সা’দকে সরাসরি সম্বোধন করে বললো, আপনি বড় নিবিষ্ট মনে তওয়াফ করছেন দেখছি। অথচ আপনারা বেদ্বীনকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন। আপনারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। খোদার কসম, আপনি যদি আবু সফওয়ানের মেহমান না হতেন, তবে আপনাকে নিরাপদে মদীনায় ফিরে যেতে দেওয়া হতো না। একথা শুনে হযরত সা’দ (রা.) উচ্চস্বরে বললেন শোনো, তুমি যদি আমাকে তওয়াফ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো, তবে আমি তোমার বাণিজ্য মদিনার কাছ দিয়ে যেতে দেবো না। সেটা কিন্তু তোমার জন্যে গুরুতর ব্যাপার হবে। 


কুরাইশরা নানানভাবে মদিনাবাসীদের উত্যক্ত করতে থাকলো যাতে তারা ভয় পায়। এদিকে আবু জাহেল মুসলমানদের খবর পাঠালো যে, তোমরা মনে করো না যে, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে। বরং মদিনায় পৌঁছে আমরা তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বো। এটা শুধু হুমকি ছিলো না। রাসূল সা. নানা সূত্রে কোরায়শদের ষড়যন্ত্র এবং অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনো সারারাত জেগে কাটাতেন, আবার কখনো সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত্রি যাপন করতেন। 


পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্যে নির্দিষ্ট ছিলো না। বরং অব্যাহতভাবেই তা রাখতে হয়েছিলো। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাত্রিকালে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য পাহারার ব্যবস্থা করা হতো। অতঃপর পবিত্র কুরআনের এই আয়াত নাযিল হলো- ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মানুষদের থেকে হেফাযত রাখবেন।’ এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবী সা. জানালায় মাথা বের করে বললেন, ‘হে লোকেরা! তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তায়ালা আমাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।’ 


নিরাপত্তাহীনতার আশংকা শুধুমাত্র রাসূল সা. পর্যন্ত সীমাব্দ্ধ ছিলো না। সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই ছিলো এটা প্রযোজ্য। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সা. এবং তাঁর সাহাবারা মদিনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। এতে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। ফলে মদিনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত্রি যাপন করতেন না এবং সকালেও তাদের কাছে অস্ত্র থাকতো।


এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, মুসলিমরা নিরাপদ আশ্রয়ে এসেও আতংকে দিন কাটাতে লাগলো। সারাক্ষণ একটি আতংক মুসলিমদের স্বাভাবিক কাজের বাধা হয়ে দাঁড়ালো। 

মদিনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতা ছিলো বিশেষ হুমকি। অন্য কথায় বলা যায় যে, এটা ছিলো তাদের টিকে থাকা না থাকার জন্যে বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে বুঝে ফেলেছিলেন যে, কুরায়শরা মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে সংকল্প থেকে বিরত হবে না। 


এমনি সময়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমাদের যুদ্ধ করার অনুমতি দিলেন। সূরা হজ্বের ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, //যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম।//


যুদ্ধের অনুমতি পাওয়ার পর মুসলিমরা অত্যন্ত খুশি হলো। এতোদিনের একতরফা আক্রমণের অবসান হলো। আর এই অবসানের কারণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এর দ্বারা বুঝা যায় 'ইকামাতে দ্বীন' অর্থাৎ যে কাজের জন্য মুহাম্মদ সা.-কে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় নিযুক্ত করেছেন, সেই ইকামাতে দ্বীনের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। রাষ্ট্র ছাড়া দ্বীন বা ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হয় না। প্রসঙ্গত বলে রাখি আজকাল অনেক বিভ্রান্ত ব্যক্তি যারা আলেম নামে সমাজে পরিচিত তারা বলতে চান ইকামাতে দ্বীন নাকি বিদআত! আউজুবিল্লাহ! অথচ আল্লাহ তায়ালা সূরা আত তাওবার ৩৩ নং আয়াত, সূরা ফাতহ'র ২৮ নং আয়াত এবং সূরা আস সফের ৯ নং আয়াতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যই রাসূল প্রেরণ করেছেন। এসব আলেম নামধারীরা কি কুরআন পড়ে না? আজিব!  


এরপর যুদ্ধ করার গ্রাউন্ড হিসেবে আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী আয়াতে বলেন, //যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’। আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।//


এখানে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি মাঝে মাঝে ছাড় দেন তবে তাঁর নাম ঘোষণার স্থানসমূহকে অটুট রাখতে তিনি ইসলামপন্থীদের সাহায্য করবেন ও বিজয় দিবেন। যারা আল্লাহর পক্ষ হয়ে কাজ করে অর্থাৎ আল্লাহর বিধিবিধান বাস্তবায়নে সাহায্য করে আল্লাহ অবশ্যই তাদের সাহায্য করবেন। এরপর আল্লাহ সাহায্য করে ইসলামপন্থীদের যদি বিজয় দান করেন তবে তাদের বেসিক কাজ কী হবে তার নির্দেশনা পরবর্তী আয়াতে ঘোষণা করেন। 


আল্লাহ তায়ালা সূরা হজ্বের ৪১ নং আয়াতে বলেন, //এরা এমন সব লোক যাদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে এরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজে নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহর হাতে।// মহান প্রভু এখানে ইসলামী রাষ্ট্রের ৪ দফা কাজের কথা উল্লেখ করেছেন।  


আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের অনুমতি পেয়ে আতংকে থাকা মুসলিমরা ডিফেন্সিভ কৌশল থেকে বের হয়ে এসে অফেনসিভ কৌশল গ্রহণ করলো। মুসলিমরা দেখলো মক্কার মুশরিকরা ভৌগলিকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। এ কারণে মুহাম্মদ সা. শুরার সাথে আলোচনা করে কিছু প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিলেন ও বাস্তবায়ন করলেন। 


১- মুসলমানরা নিজেদের নিয়ন্ত্রনের সীমানা অর্থাৎ মদিনার সীমানা বৃদ্ধি করলেন। বৃদ্ধি করে মক্কা থেকে সিরিয়ার মধ্যবর্তী পথকে মদিনার অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। 

২- ১ম সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করার জন্য মক্কা থেকে সিরিয়া ও মদিনার যাতায়াতকারী বাণিজ্য কাফেলার পথের পাশে যেসব গোত্র রয়েছে তাদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করলেন।

৩- মক্কা থেকে সিরিয়ার যাওয়ার মহাসড়কে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ।

৪- কুরাইশদের ও আরবের বিভিন্ন গোত্রের গতিবিধি ও তথ্য জানার জন্য গোয়েন্দা নিয়োগ।  


এর ফলে যুদ্ধের মোড় অন্যদিকে চলে যায়। আগে আতঙ্কে থাকতো মুসলিমরা অর্থাৎ মদিনাবাসীরা। এখন আল্লাহর রাসূলের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে আতঙ্কে পড়ে যায় মক্কার কুরাইশরা। তাদের ব্যবসা বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ে। তাদের সিরিয়া ও ইরাকে অবাধে যাওয়া বন্ধ হয়ে পড়ে। মক্কার কুরাইশরা বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যখনই রওনা হতো তখনই আল্লাহর রাসূলের টহল বাহিনী তাদের ধাওয়া দিত। এভাবে তাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। 


এখন তাদের সামনে দুটি অপশন তৈরি হয়, এক- ইসলামী রাষ্ট্র মদিনার সাথে সন্ধি করে ব্যবসায়ের পথ পরিষ্কার করা। দুই- মদিনার সাথে যুদ্ধ করে মুসলিমদের পরাজিত করে ব্যবসায়ের পথ পরিষ্কার করা। তারা ২য় অপশনটিকেই বেছে নিলো। 


মহাম্মদ সা. গোয়েন্দাদের মাধ্যমে খবর পেলেন মুসলিমদের থেকে দখল বিশাল সম্পত্তি নিয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত করেছে মুশরিকরা। মহানবী সা. এবার শুধু ধাওয়া নয়, যুতসই অভিযান চালিয়ে সেই বাণিজ্য কাফেলা দখলের সিদ্ধান্ত নিলেন। মুশরিকদের কাফেলার প্রধান ছিল আবু সুফিয়ান। সে পরিস্থিতি আন্দাজ করতে পেরে মক্কায় খবর পাঠায়। আল্লাহর রাসূল সা. আবু সুফিয়ানের কাফেলা আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে নিজেই ২০০ জন সাহাবী নিয়ে রওনা হন।


আবু সুফিয়ানের দূত মক্কায় খবর পৌঁছালে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আবু জাহেল তৎক্ষণাৎ ১৩০০ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। আবু জাহেলের প্রস্তুতির খবর মদিনায় পৌঁছলে মুহাম্মদ সা. শুরার মিটিং ডাকেন। সেখানে করণীয় ঠিক করেন, অতঃপর বদর প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হয়।    

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন