২৬ ফেব, ২০২১

একজন নীরব, নিরলস, নিরহংকার ও নিবেদিত প্রাণ নেতা


২০০৫ সাল থেকে ২৯ বছর আগে কেন্দ্রিয় ইউনিটে তদানীন্তন আমীরে জামায়াত মাওলানা আবদুর রহীম ও সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফসহ আমরা ৮ জন রুকন ছিলাম। অন্যরা হলেন জনাব আবদুল খালেক, জনাব বদরে আলম, মাষ্টার শফিকুল্লাহ, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী, জনাব আমিনুর রহমান মঞ্জু ও আমি মাযহারুল ইসলাম। (উল্লেখ্য, কেন্দ্রিয় ইউনিটের রুকন সংখ্যা বর্তমানে ৯৬ জন, এর মধ্যে মহিলা ১৩ জন)। প্রথম থেকেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী কেন্দ্রিয় দায়িত্বশীলদের মধ্যে ছিলেন একজন। 

’৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জয়েন্ট সেক্রেটারী এবং ’৮৪ সাল থেকে অন্যতম সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, প্রকাশনা বিভাগ, সফর সূচি প্রণয়ন, কেন্দ্রিয় অফিস বিভাগ সহ বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রিয় দায়িত্ব ছিল তার উপর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে নিরবে তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তক্রমে আমাকে (গ্রন্থকারকে) কেন্দ্রিয় দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। আর সেই সুবাদে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী সাহেবের সাথে আমার নিত্য দিনের নিবিড় সাংগঠনিক ও দাপ্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে যা মরহুমের মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।


গত দীর্ঘ ২৮ বছরে যাদের সাথে একত্রে বৈঠক করেছি, সংগঠনের বিভিন্ন কাজ এক সাথে করেছি, তাদের অনেকেই আজ এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআলার এটা অমোঘ বিধান যে, কেউই চিরদিন বাঁচবে না। আমি, আপনি সকলকেই এ দুনিয়া থেকে চলে যেতে হবে। কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাওত- সকল মানুষই মরণশীল। কিন্তু আমার দুঃখ এই যে--এ মৃত্যুগুলো আমি কাছ থেকে দেখেছি, কিংবা সর্বপ্রথম আমিই মৃত্যু সংবাদটি পেয়েছি এবং আপনজনদেরকে বেদনাদায়ক খবরটি পৌছিয়েছি। এটা যে কত বেদনাদায়ক তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে মরমে মরমে উপলব্ধি করা কঠিন।


সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী গত ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৩ সালে ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। সাংগঠনিক কাজে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে গুরুতরভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে চান্দিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি তাঁর মাতা, স্ত্রী, দুই ভাই, পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে ও অসংখ্য আত্নীয়-স্বজন ও হিতাকাঙক্ষী রেখে যান। 


অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী ছিলেন একজন নীরব, নিরলস,নিরহংকার ও নির্লোভ এবং নিবেদিত প্রাণ নেতা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। ২৮ বছর বিভিন্ন অফিসিয়াল ও সাংগঠনিক কাজের সমন্বয় করার জন্য আমি তাঁর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত ছিলাম। কিন্তু কোন সময় তাঁকে আমি রাগ করে কথা বলতে দেখিনি। কোন জুনিয়র ব্যক্তি তাঁকে কোন কড়া কথা বললেও তাঁকে কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেখিনি। তিনি ছিলেন একজন মাটির মানুষ। ছাত্র জীবনে মাটির মানুষ দিয়ে বাক্য রচনা করেছি। বাস্তবে মাটির মানুষ দেখেছি অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাহেবকে।


আমি নিজে কখনো কখনো কোন কোন সময় শক্ত কথা বলেছি-কিন্তু তাঁকে দেখেছি একদম শান্ত থাকতে। একদিন একজন জুনিয়র দায়িত্বশীল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী সাহেবের সাথে কোন এক প্রসঙ্গে যেভাবে রূঢ় কথা বললেন, তিনি অনেক সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও কোন কথা না বলে একদম চুপচাপ থাকলেন। চোখে মুখে তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না।


’৮৫ সালের কোন একদিন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী, অধ্যাপক আবদুল খালেক (অধ্যাপক আবদুল খালেক ছিলেন আরেক মর্দে মুজাহিদ। তিনি ছিলেন তখন জামায়াতের কেন্দ্রিয় কর্মপরিষদ সদস্য ও জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালক) এবং আমি শেরপুর জিলার শ্রীবরদীতে যাই এক জনসভায়। শেরপুর থেকে শ্রীবরদীর মাঝামাঝি পথে গিয়ে বাস আর যাচ্ছিলো না। শুনলাম সামনে ব্রীজ ভেঙে গেছে। সেখানে কোন রিকশাও নেই। আজ-কালের মত রাস্তাও তত উন্নত ছিল না। খুবই খারাপ রাস্তা। ব্যাগ পেটরা হাতে নিয়ে তিনি পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। ব্যাগটা অন্য কাউকে তিনি নিতে দিলেন না।


কেন্দ্রিয় অফিসে এক সময় কোন গাড়ী ছিল না। ’৭৭ সালের দিকে একটি মাত্র পুরানো মডেলের গাড়ি কেনা হয়। আগেই বলেছি দেশের রাস্তা ঘাট তখন উন্নত ছিলো না। আন্তঃজেলা এক্সপ্রেস ট্রেন ছিলনা। অত্যাধুনিক তো দূরের কথা, ডাইরেক্ট কোন বাস সার্ভিসও ছিলনা। অথচ সে সময় নেতৃবৃন্দ যেভাবে বিভিন্ন জেলায় সফর করতেন-- তা আজকের প্রেক্ষাপটে ভাবতে অনেকের কাছেই রূপকথার মতো লাগবে। শহরগুলোতে রিকশায় বা সাইকেলে চড়ে, মফস্বল এবং গ্রামগুলোতে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে তারা কাজ করেছেন। আন্দোলনের কাজকে সংগঠিত করেছেন। মগবাজার কেন্দ্রিয় অফিস থেকে তার বাসা ছিল দূরে। বাসা থেকে যেতে আসতে প্রায়ই গাড়ীর দরকার হতো। যেদিন গাড়ী পাওয়া যেতো না তিনি বেবী টেক্সীতে চলে আসতেন। বহুবার তিনি আমাকে বলেছেন যে, গাড়ী না থাকলে আমাকে একটু আগে জানাবেন, আমি রোডের বেবীতে চলে আসবো।


জন্ম ও শিক্ষা:

জনাব ইউসুফ আলী গাজীপুর জিলার কালীগঞ্জ থানাধীন বড়গাঁও-এ ১ মার্চ ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঢাকাস্থ ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজ (বর্তমানে কবি নজরুল কলেজ) থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চতুর্দশ স্থান অধিকার করেন এবং ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে ঊপড়হড়সরপ বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন। অতপর ১৯৬২ সালে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।


কর্মজীবন:

১৯৬৩ সালে অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাংবাদিক হিসেবে ‘সাপ্তাহিক ইয়ং পাকিস্তানে’ কাজ শুরু করেন। অতপর সাংবাদিকতা ছেড়ে ১৯৬৪ সালে মৌলভীবাজার ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর একই বছরে তিনি নরসিংদী ডিগ্রি কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত উক্ত কলেজে অধ্যাপনা করেন।


ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন:

অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রায় চার যুগ ধরে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শাহ আবদুল হান্নানের নিকট থেকে (বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব) সর্বপ্রথম ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পান। অতপর এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ খুররম জাহ্ মুরাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে যান এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘে যোগদান করেন। ১৯৬১-৬২ সেশনে ঢাকা মহানগরীর ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক ইসলামী ছাত্র সংঘের মজলিসে শুরার সদস্য নির্বাচিত হন।


ছাত্র জীবন শেষে তিনি ১৯৬৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং একই বছরে জামায়াতের রুকন হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিভাগের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর যুগ্ম সেক্রেটারী এবং ১৯৮৮ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীল প্রকাশনী এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পরিচালনা বোর্ডের ব্যবস্থাপনার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ইকোনমিক্স রিসার্চ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক প্রকাশনীর সাথেও তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন।


সমাজসেবা:

সমাজ কর্মী হিসেবে কালীগঞ্জ থানায় তিনি ছিলেন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসা ও ইয়াতিমখানার সাথে জড়িত ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি ঢাকার তা’মিরুল মিল্লাত ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী, গাজীপুর ইসলামী ট্রাস্ট এবং কালীগঞ্জ আল-ইসলাহ ট্রাস্টের সভাপতি ছিলেন।

উল্লেখ যে, বাংলাদেশের বিখ্যাত মাদরাসা ‘তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা’ তা’মীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান।

এছাড়াও তিনি তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মাঝে অন্যতম।


লেখক হিসেবে:

অধ্যাপক ইউসুফ আলী আল্লাহর দ্বীন কায়েমের আন্দোলনের সাথে সাথে লেখার কাজও করেছেন এবং বেশ কিছু বই লিখেছেন। তার মধ্যে- (১) অর্থনৈতিক সাম্য ও ইসলাম (২) মু’মিন জীবনের বৈশিষ্ট্য (৩) বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত (৪) ইসলামী আন্দোলনমুখী পরিবার গঠন (৫) ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তির আত্নগঠন (৬) ইসলামী বিপ্লব সাধনে সংগঠন (৭) কুরআনের আলোকে মানব জীবন ও (৮) মু’মিনের পারিবারিক জীবন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার লেখা বইগুলো খুবই সহজপাঠ্য।


অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭৯ ও ১৯৮২ সালে দু’বার হজ্জব্রত পালন করেন। রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত করাচীতে আন্তর্জাতিক ইসলামিক অধিবেশনে তিনি যোগদান করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাহেবের স্ত্রী ও ২ ছেলে জামায়াতের রুকন। তার দুই ছোট ভাই কৃষিবিদ ইদরীস আলী এবং কবি আসাদ বিন হাফিজও জামায়াতের রুকন।


ইন্তেকাল:

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী ২০০৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লায় সাংগঠনিক সফরকালীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।

- মাযহারুল ইসলাম, সাবেক কেন্দ্রীয় অফিস সেক্রেটারি  

২৫ ফেব, ২০২১

জেএমবি, কর্নেল গুলজার ও পিলখানা হত্যাকাণ্ড


২০০২ সালের পর থেকে দেশে জঙ্গী কার্যক্রমের কিছু নজির পাওয়া যাচ্ছিল। এর মধ্যে কওমী মাদ্রাসাগুলোতে হরকাতুল জিহাদ একটিভ ছিল। হরকাতুল জিহাদের একটি ছেলে তাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে নোয়াখালী জিলা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল আমাদের ক্লাসে। তাদের টার্গেট ছিল এই ছেলেকে ডাক্তার বানানো। পরে শুনেছি সে জার্মানী চলে গেছে। ডাক্তার সে হতে পারেনি। 


একইসাথে আহলে হাদিস/সালাফি ঘরানার মধ্যে গড়ে ওঠে জেএমবি। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে জেএমবি সারা দেশে বোমা হামলার মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানান দেয়। তারা বোমা মেরে সরকার পতন করে দিবে। বিচারপতিদের টার্গেট করে খুন করতে শুরু করে। একইসাথে সাধারণ মানুষও খুন হতে থাকে। 


তখন র‍্যাবের গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন কর্নেল গুলজার। স্বভাবতই চৌকস বাহিনী হিসেবে র‍্যাবের ওপরই দায়িত্ব আসে জঙ্গী দমনের। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা জঙ্গী নামের এই সন্ত্রাসীদের অঙ্কুরেই বিনাশ করতে সক্ষম হয়েছিল।  না, কোনো ক্রসফায়ার নয়, প্রতিটি সন্ত্রাসীকে ধরে ধরে আইনের কাছে সোপর্দ করেছে র‍্যাব।   


প্রতিটি জঙ্গী ধরতে কী পরিমাণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে র‍্যাব তা সন্ত্রাসী প্রধান আব্দুর রহমানের এরেস্টের বর্ণনায় দেখতে পাবেন। দেশের শীর্ষ জঙ্গিনেতা শায়খ আবদুর রহমান ধরা পড়েছিলেন ২০০৬ সালের ২ মার্চ। পরের বছরের (২০০৭) ৩০ মার্চ ফাঁসিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সিলেটের একটি বাড়ি থেকে ৩৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে র‌্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করেছিলেন আবদুর রহমানকে। সেই চূড়ান্ত অভিযানের আগেও চলে দীর্ঘ গোয়েন্দা তৎপরতা। 


২০০৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেএমবির সামরিক প্রধান আতাউর রহমান সানি ধরা পড়ার পর র‌্যাবের পরবর্তী টার্গেট হন শায়খ আবদুর রহমান। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর কোনো হদিস মেলে না। সানিকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর র‌্যাব জানতে পারে, ঢাকার বনশ্রীর বাড়ি থেকে পালিয়ে শায়খ রহমান আশ্রয় নেন তাঁর পল্লবীর বাসায়। র‌্যাব সেখানে হানা দেওয়ার একটু আগেই তিনি চম্পট দেন। তবে সানির কাছ থেকে পাওয়া যায় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লু—জেএমবির মজলিশে শুরা সদস্য হাফেজ মাহমুদ জানে আবদুর রহমান সম্পর্কে অনেক তথ্য। ব্যস, শুরু হয়ে যায় হাফেজ মাহমুদকে গ্রেফতার অভিযান।


র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক কষ্টে তাঁরা জানতে পারেন, হাফেজ মাহমুদ নারকেল ব্যবসায়ী সেজে যশোরে অবস্থান করছে। কর্মকর্তারা তার ফোন নম্বর জোগাড় করেন। কিন্তু ফোনে কথা বলতে চায় না হাফেজ। র‌্যাবের সোর্স অন্য পরিচয়ে নানা টোপ ফেলতে থাকে। দীর্ঘ দুই মাস চলে ইঁদুর-বেড়াল খেলা। একপর‌্যায়ে র‌্যাবের সোর্স বিদেশি এনজিওর লোক পরিচয় দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখায়। বলা হয়, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি এনজিও অর্থ সাহায্য দিতে চায়। এবার বরফ গলে। হাফেজ মাহমুদ রাজি হয়ে যায়।


হাফেজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর থেকেই তার মোবাইল ফোনে তীক্ষ্ণ� নজর রাখা হয়। দেখা যায়, র‌্যাবের সোর্সের সঙ্গে কথা বলার পরপরই হাফেজ অন্য একটি নম্বরে ফোন করে। কিন্তু তাদের কথা হয় সাংকেতিক ভাষায়। কিছুই বোঝা যায় না। একেক সময় ওই ব্যক্তির অবস্থান থাকে একেক জায়গায়। তবে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়—ওই ব্যক্তিই শায়খ রহমান। কিন্তু তার আগে ধরা দরকার হাফেজ মাহমুদকে।


র‌্যাব সোর্সের টোপ গিলে হাফেজ রাজি হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগারে আলোচনায় বসা হবে। র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল গুলজার ফাঁদ পাতেন ওই পাঠাগার ও তার আশপাশে। ওই দিন ভোরবেলা হাফেজ মাহমুদ যশোর থেকে নৈশকোচে ঢাকায় এসে নামে, সে খবরও পেয়ে যায় র‌্যাব। শুরু হয় গোয়েন্দাগিরির খেলা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন পাঠাগারের সিঁড়ি ও প্রবেশমুখে র‌্যাব সদস্যরা হকার সেজে, টুপিবিক্রেতা সেজে বসে পড়েন।


বেলা সাড়ে ১১টার সময় দাড়িহীন, রঙিন চশমা আঁঁটা, সবুজ শার্ট পরা হাফেজ মাহমুদ আসে পাঠাগারের কাছে। সোর্সের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাঠাগারের ভেতরে। সেখানে ঘিরে ফেলেন কর্নেল গুলজার ও মেজর আতিক। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয় নিচে রাখা গাড়ির কাছে। একফাঁকে পালানোরও চেষ্টা করে হাফেজ। কিন্তু ব্যর্থ হয়।


তখনই শুরু হয় প্রবল জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু হাফেজ অটল। শায়খ রহমানের অবস্থান সে কিছুতেই জানাবে না। একপর‌্যায়ে শায়খের ফোন নম্বর জানাতে রাজি হয় সে। তার হাত থেকে মোবাইল সেট কেড়ে নিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা দেখেন, একটি নম্বরে বারবার কথা বলা হয়েছে। র‌্যাবের আইটি শাখার মেজর জোহা খোঁজ করে দেখেন, এই নম্বরটি সিলেটের এমসি কলেজ টাওয়ার থেকে আসছে এবং টাওয়ারের আট বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই ফোনটির অবস্থান। র‌্যাব মহাপরিচালক আবদুল আজিজ সরকারকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি সিলেটে র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোমিনকে নির্দেশ দেন, টাওয়ার থেকে আট বর্গকিলোমিটার দ্রুত ঘেরাও করে ফেলতে। কর্নেল মোমিন, মেজর শিব্বির ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়দার তখনই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।


ঢাকা থেকেও রওনা হয় র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের একটি দল। ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে তাঁরা ঢাকা থেকে বের হয়ে সিলেট পৌঁছান রাত আটটায়। ওই দলে আরও ছিলেন মেজর আতিক, মেজর মানিক, মেজর জাভেদ, মেজর ওয়াসি, ক্যাপ্টেন তানভির ও ক্যাপ্টেন তোফাজ্জল। তাঁরা পৌঁছানোর আগেই সিলেট র‌্যাবের প্রায় আড়াই শ সদস্য নগরের টিলাগড় ও শিবগঞ্জের ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রতিটি সড়ক ও গলিতে অবস্থান নেন। 


এদের সঙ্গে ঢাকার বাহিনী যোগ দিয়ে রাত ১০টা থেকে শুরু করে চিরুনি অভিযান। আস্তে আস্তে পরিধি কমিয়ে এনে টিলাগড়, শাপলাবাগ, কল্যাণপুর, কালাশিল ও বাজপাড়া এলাকার প্রতি বাড়িতে শুরু হয় তল্লাশি। তল্লাশি চলাকালে র‌্যাবের হাতে থাকে শায়খ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের ছবিসংবলিত লিফলেট। রাত ১২টার দিকে সিলেট নগর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে টুলটিকর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় আবদুস সালাম সড়কের ২২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে প্রথম বাধা পায় র‌্যাব। এক ব্যক্তি ছুরি হাতে তেড়ে এসে বলে, এগোলে খারাপ হবে। এরপর যা বোঝার বুঝে ফেলে র‌্যাব। গোটা অভিযান তখন কেন্দ্রীভূত হয় এই বাড়ি ঘিরে। এই বাড়ির নাম ‘সূর্য্যদীঘল বাড়ী’।


র‌্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘিরে ফেলেন সূর্য্যদীঘল বাড়ী। আশপাশের বাড়িতেও অবস্থান নেন অনেকে। নিয়ে আসা হয় ভারী অস্ত্র ও লাইফ সাপোর্ট জ্যাকেট। রাত পৌনে একটার দিকে মাইকে সূর্য্যদীঘল বাড়ীর লোকজনকে বেরিয়ে আসতে বললেও কেউ সাড়া দেয় না। আশপাশের বাড়ির লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে সূর্য্যদীঘল বাড়ির মালিক লন্ডনপ্রবাসী আবদুল হকের ছোট ভাই মইনুল হককে বাইরে থেকে ডেকে আনা হয়। তিনি মুখে মাইক লাগিয়ে ওই বাড়ির ভাড়াটে হূদয়ের নাম ধরে ডেকে দরজা খুলতে বলেন। তাতেও কাজ না হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য নূরুন নবীকে দিয়ে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না।


রাত দুইটার দিকে একবার বাড়ির পেছনে দরজা খোলার শব্দ হয়। র‌্যাব সদস্যরা সচকিত হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধও হয়ে যায়। রাত দুইটা ১০ মিনিটে হঠাৎ করে বাড়ির ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মানুষ ভারী গলায় দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন। কর্নেল গুলজার তখন আবদুর রহমানের নাম ধরে ডাক দিলে ভেতর থেকে ভারী গলার আওয়াজ আসে, ‘ওই কাফের! তোর মুখে আমার নাম মানায় না, আমাকে মুজাহিদ বল।’


এভাবে শেষ হয় প্রথম রাত। বুধবার সকাল থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার চেষ্টা। ততক্ষণে ঢাকা থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা সিলেটে হাজির হয়েছেন। টেলিভিশনে শুরু হয়েছে ‘লাইভ’ সম্প্রচার। টিভি সেটের সামনে বসে থাকে সারা দেশ। প্রথমে কিছুক্ষণ কাঁদানে গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে অবস্থা বোঝার চেষ্টা চলে। তাতে কাজ হয়নি। এরপর ডাকা হয় সিলেটের দমকলকে। তারা এসে পানি ছিটাতে থাকে বাড়ির ভেতরে। পুরো বাড়ি ভেসে যায় ফায়ার ব্রিগেডের পানিতে। কিন্তু আব্দুর রহমান অনড়। কাহিনি আরও লম্বা হতে থাকে। দিন গড়িয়ে রাত আসে।


কাহিনির ভেতরেও থাকে অনেক চমকপ্রদ ঘটনা। র‌্যাব ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সারা রাত ধরে চেষ্টা চালিয়ে, একাধিকবার দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়েও শায়খ রহমানকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে পারেন না। ততক্ষণে ভোরের আলো ফোটে গেছে। বুধবার সকাল নয়টা সাত মিনিটে বাড়ির ভেতরে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। 


পর পর চার-পাঁচটা বিস্ফোরণ ঘটে। দ্রুত নিয়ে আসা হয় দালান ভাঙার যন্ত্রপাতি। সাড়ে নয়টার দিকে ভাঙা হয় দক্ষিণের একটি জানালা। বৈদ্যুতিক কাটার এনে ছাদ ফুটো করা হয়। প্রথমে আয়না লাগিয়ে, পরে রশি দিয়ে ক্যামেরা নামিয়ে দেখা হয়, ভেতরে কী আছে। দেখা যায়, একটা বিছানা থেকে তার বেরিয়ে আছে। শুরু হয় হইচই—নিশ্চয় সারা বাড়িতে বোমা পাতা আছে। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা নিয়ে আসেন বড় বড় বড়শি। ফুটো দিয়ে নামিয়ে বিছানা টেনে তুলে দেখেন, সব ভুয়া—সাজানো আতঙ্ক।


দুপুরের দিকে র‌্যাবের কাঁদানে গ্যাসে টিকতে না পেরে বেরিয়ে আসেন শায়খের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা। সিলেটের জেলা প্রশাসক এম ফয়সল আলম শায়খের স্ত্রী রুপাকে বলেন, ‘আপনি আপনার স্বামীকে বেরিয়ে আসতে বলুন।’ রুপা বলেন, ‘আমার কথা শুনবেন না। উনি কারও কথা শোনেন না।’ জেলা প্রশাসক পীড়াপীড়ি করলে শায়খের স্ত্রী মুখে মাইক লাগিয়ে বলেন, ‘উনারা বের হতে বলছেন, আপনি বের হয়ে আসেন।’ স্ত্রীর কথায়ও কান দেন না শায়খ।


বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট জেলা প্রশাসক চূড়ান্ত হুমকির সুরে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানালে অবশেষে জানালায় এসে উঁকি দেন শায়খ রহমান। এর মধ্যে শুরু থেকেই বিদ্যুৎ, টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। টিয়ার সেল নিক্ষেপ হতে থাকে কিছুক্ষণ পর পর। অবশেষে আব্দুর রহমান বেরিয়ে আসতে রাজি হন।


আমি যখন জেলে ছিলাম তখন সেখানে থাকা জেএমবি সদস্যদের থেকে জেনেছি কীভাবে তাদের অস্ত্র, বোমা নিয়ে আসা ও প্রশিক্ষণে তারা ভারতের মাটি ব্যবহার করেছে। তারা বলতো সেখানে বিএসএফ তাদের সহায়তা করতো। ভারত আমাদের দেশে জঙ্গী ঢুকিয়ে এদেশের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিতে চেয়েছে, যেভাবে আমেরিকা আল-কায়েদাকে ব্যবহার করে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। 


কিন্তু তাদের সেই কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্টে ছাই ছিটিয়ে দিয়েছে র‍্যাবের নেতৃত্বে থাকা এদেশের সেনা অফিসাররা। ভারত তখন ভিন্ন পরিকল্পনা করে ২০০৭ সালের জানুয়ারির ১১ তারিখ সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদকে দিয়ে ক্ষমতা দখল করায়। এরপর ২০০৮ সালে পাতানো নির্বাচন দিয়ে হাসিনাকে ক্ষমতায় বসায়। এই বিষয়ে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব তার আত্মজীবনীতে ইঙ্গিত করে। 


ক্ষমতায় এসে হাসিনা সরকারের সাথে ষড়যন্ত্র করে তারা বিডিআর বিদ্রোহের নামে পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আর এই হত্যাকাণ্ডে যার লাশ সবচেয়ে বেশি বিকৃত করা হয় তিনি হলেন কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ। কারণ এই গুলজারের গোয়েন্দা পরিকল্পনাতেই সমন্ত জঙ্গী নেতা জীবিত এরেস্ট হয়। শায়খ আব্দুর রহমানের স্ত্রী রূপা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা মীর্যা আযমের বোন। 


এছাড়াও আমরা স্মরণ করতে পারি, ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বিডিআর-বিএসএফ যুদ্ধে ১৫০ জন বিএসএফ নিহত হয়। এর আগে পাদুয়ায় নিহত হয় ১৫ বিএসএফ। বিডিআর সেই সময়ের ডিজি মেজর জেনারেল এ এল এম ফজলুর রহমানের নির্দেশে ঐ যুদ্ধে অংশ নেয় বিডিআর জওয়ানরা।


ওই ঘটনার পর ভারতের সেই সময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশবন্ত সিং উত্তপ্ত লোকসভায় জানান, ‘এ ঘটনার বদলা নেয়া হবে।’ এই বদলা কি সেই বদলা কিনা তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ওই ঘটনা দমনে কেন সেনাবাহিনী ডাকা হলো না এ নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। অনেক সাবেক সমর বিশেষজ্ঞ তখন বলেছিলেন, সেনাবাহিনী সেখানে মুভ করা হলে প্রাণহানির মত ঘটনা আরো কমানো যেত। কিন্তু সেনাবাহিনী মোতায়েন না করায় সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সেই সময়ের আলোচিত সেনা প্রধান মইন উ আহমেদ। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, তখন তিনি নাকি নিজের ইচ্ছায় চাইলেও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাহলে ইচ্ছাটা কার ছিল? এটাও একটা বড় প্রশ্ন হিসেবেই থেকে গেল। 


পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ভারত ও আওয়ামীলীগ জেএমবি নিধনের প্রতিশোধ নেয়। মির্জা আজম এখানেই থেমে থাকে না। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে সেই হাফিজ মাহমুদকেও কারাগার থেকে বের করে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে খুন করে। যে হাফিজ মাহমুদের মাধ্যমে গ্রেফতার হয়েছিল শায়খ আব্দুর রহমান।

২৩ ফেব, ২০২১

ফতওয়ার কিতাবের শেষ পাতা



এক গ্রামে এক কৃষক ছিলেন। তিনি সকাল বেলা তার ক্ষেতে চারা লাগাচ্ছিলেন। যোহরের আজান হলো। আজান শুনে তিনি বাড়ি গেলেন। গোসল করে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে দেখলেন তার ক্ষেতে ঢুকে একটি গরু সব চারা খেয়ে ফেলেছে। তিনি অত্যন্ত কষ্ট পেলেন। যাই হোক তিনি গরুটিকে তাড়িয়ে নামাজে গেলেন। নামাজ শেষে তিনি ইমাম সাহেবকে বললেন,
 
- হুজুর একটা বিষয়ে ফতওয়া দরকার। আপনি মেহেরবানী করে ফতওয়া দিন। 
- কী বিষয়ে ফতওয়া? বলো।
- হুজুর, কারো গরু যদি অন্য কারো ক্ষেতে ঢুকে ফসল খেয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে বিচার কী হবে?
- ওহ এইটা? এটা তো সহজ ব্যাপার! যার গরু সে ক্ষতিপূরণ দিবে।
- হুজুর, তাহলে শুনুন। আপনার গরু আমার সব চারা খেয়ে ফেলেছে। আমি সকাল থেকে অনেক পরিশ্রম করে এগুলো লাগিয়েছি।
- ওহ তাই নাকি। একটু অপেক্ষা করুন। আমি একটু ফতওয়ার কিতাব খুলি। আমার এখনো শেষ পাতা পড়ার বাকী আছে।
(হুজুর উঠে দাঁড়ালেন। আলমিরা থেকে ফতওয়ার আরবি কিতাব বের করে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। অবশেষে এক পাতায় এসে বললেন)
- পেয়েছি! পেয়েছি! এখানে শর্তসাপেক্ষ ব্যাপার আছে।
- হুজুর, এখানে আবার কী শর্ত?
- শোনো মিয়া! শর্ত হলো ক্ষেতের ফসল খেয়ে যদি গরু অসুস্থ হয় তবে ক্ষেতের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর যদি অসুস্থ না হয় তবে মামলা শেষ। আর গরুর মালিক কখনোই ক্ষেতের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কারণ গরু অবুঝ প্রাণী। তার কোনো হিসাব-নিকাশ নাই। ক্ষেতের নিরাপত্তা বিধান করা কৃষকের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কারো কিছু করার নেই।
- (হতভম্ব হয়ে) আমি এখন কী করবো হুজুর?
- তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করো আমার গরু যাতে সুস্থ থাকে। নইলে গরুর দাম দিতে হবে।
 
এটা একটা গল্প। যারা নিজেদের ব্যাপারে আসলে রায় উলটে দেয় তাদের জন্য। এই গল্পটা ছোটবেলায় আমার মাতৃভাষায় খুব শুনতাম। আমি এখানে প্রমিত উচ্চারণে লিখিত রূপ দিলাম। যাই হোক এই গল্প হুজুরদের বিরুদ্ধে। হুজুররা নিজেদের ইচ্ছেমত ইসলামকে তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। অথবা শাসকদের দালালি করার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। আজকে এমন একজন হুজুর সম্পর্কে আলোচনা করবো।
 
তখন কোটা আন্দোলন চলছিল। সারাদেশের ছাত্ররা উত্তাল। সেসময় একদিন এক হুজুরের ভিডিও ভাইরাল হলো। তিনি ঘোষণা করলেন ছাত্র আন্দোলন হারাম। এই ফতওয়া দিলেন বাংলাদেশ আহলে হাদিস জামায়াতের নেতা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ। তিনি ইমাম বুখারির একটি মন্তব্য নিয়ে এই ফতওয়া দিলেন। ওনার ভাষ্যমতে ইমাম বুখারি বলেছেন কথা ও কর্মের পূর্বে বিদ্যা। এটা খুবই জরুরি কথা। আমি যে বিষয়ে কথা বলবো ও কাজ করবো সে বিষয়ে যদি আমার জ্ঞান না থাকে তবে কেমনে হবে?
 
কিন্তু এর মানে তো এই না, ছাত্র অবস্থায় সে দ্বীনের দাওয়াত দিতে পারবে না। ছাত্র অবস্থায় সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না। ন্যায় অন্যায় বুঝতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শেষ করতে হবে এটা কেমন কথা! আর বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও তো অনেকে ন্যায় অন্যায় বুঝে না। ইমাম বুখারির এই কথা বৃহত্তর অর্থে। এক কথায় বলতে গেলে যে বিষয়ে আমি জানিনা সে বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রজীবন শেষ করলে একজন ব্যক্তি সব বিষয় জেনে ফেলবেন ও মতামত দিতে পারবেন এটা মহা ভুল কথা।
 
যাই হোক তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করলেন, "যে কোনো ছাত্র আন্দোলন হারাম"। এই কথা তিনি তিনবার বললেন। পরে এই কথাও বললেন "ছাত্র আন্দোলন মানুষ করে না, পশু করে"। আব্দুর রাজ্জাকের এই ফতওয়া সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ব্যক্তিত্ব ও ভুঁইফোঁড় পেইজ ফেসবুকে ডলার খরচ করে সেই বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক এভাবে জুলুমের প্রতিবাদকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছেন মাফিয়ার মা হাসিনার হয়ে।
 
অথচ তিনি সংগঠন করেন সেই সংগঠনের ছাত্র আন্দোলন আছে। সেই ছাত্র আন্দোলনের নাম বাংলাদেশ আহলে হাদিস ছাত্র সমাজ। এছাড়াও তার ছেলে ছাত্র অবস্থায় থেকেই ওয়াজ মাহফিল করে বেড়াচ্ছে। এই বিষয়টা তার ফতওয়ার বিপরীতে যাচ্ছে। তার ছেলে কেন বিদ্যা শেষের পূর্বে কথা বলছে। তাদের ছাত্র সংগঠন কেন বিদ্যের পূর্বে সংগঠিত হলো।
 
ভোলায় আল্লাহর নবী সা.-এর বিরুদ্ধে কটুক্তি হয়েছে। এর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে তৌহিদী জনতা। এই সমাবেশকে কটাক্ষ করেছেন আব্দুর রাজ্জাক। ওনার দাবি কটুক্তির শাস্তি দিবে সরকার, এর দায়িত্ব সরকারের। যদি সরকার দায়িত্ব পালন না করে তবে আমাদের কিছু করার নাই। এর জন্য সমাবেশ করা যাবে না। তিনি ভোলার তৌহিদী জনতাকে কটাক্ষ করে বলেছেন, এই যুবক তুমি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠো কেন? তোমার সমস্যা কী? অর্থাৎ নবী সা.-এর অপর আঘাত এলে ক্ষিপ্ত হওয়ার দরকার নেই। উনি আরো বলেছেন, যে সমাবেশে পুলিশ বাধা দেবে সে সমাবেশে যাওয়াই হারাম।
 
এর আগেও তিনি ইকামাতে দ্বীন, মিছিল, হরতাল ইত্যাদি নিয়ে জামায়াতে ইসলামকে কটাক্ষ করেছেন। অথচ তাকে ইসলামী নেতৃবৃন্দকে খুন, ক্রসফায়ার, গণহত্যা, গুম, লুটপাট ইত্যাদি বিষয়ে জোরালে ভূমিকা রাখতে দেখি নি।
 
কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে ওনার ওপর হামলা হলো সিলেটে। এরপর দেখলাম তার প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবাধীন মাদ্রাসার ছাত্ররা তার ওপর হামলার প্রতিবাদে মিছিল করছে, সমাবেশ করছে। ছাত্ররা ক্ষিপ্ত হয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, রাজশাহীতে এই ধরণের ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদী সমাবেশের ছবি ও ভিডিও আমি দেখলাম।
 
উপরে যে গল্প উল্লেখ করেছি, আমি ভেবেছি এগুলো শুধু গল্পেই হয়! অথচ দেখুন আহলে হাদীসদের আইকন হয়ে এই হুজুর কীভাবে নিজের প্রয়োজনে ইসলামকে ব্যবহার করছে। এরা সুবিধাবাদী ও অত্যাচারী শাসকদের দালাল। এদের থেকে সাবধান থাকুন। এরা নবীর ওপরে আঘাত এলে ক্ষিপ্ত হতে নিষেধ করে আর নিজের ওপরে আঘাত এলে ছাত্রদের লেলিয়ে দিচ্ছে। এদের থেকে সাবধান থাকুন।


২০ ফেব, ২০২১

ইসলামী কমিউনিজম ও তমদ্দুনে মজলিশ

তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাশেম
বিগত বিংশ শতাব্দির শুরু থেকে ইসলামী সভ্যতার পতন শুরু হয়। এর মাধ্যমে মুসলিমরা একের পর এক ভূমি হারাতে থাকে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় ও খিলাফত ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে ইসলামের শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহ'র বিপরীতে পশ্চিমারা ভাষা ও বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটায়। এই জাতিবাদী তুর্কিরা খিলাফত ধ্বংস করে মুসলিমদের পরাজয় তরান্বিত করে। মুসলিম বিশ্ব ছোট ছোট দেশে পরিণত হয়। আর্থিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য জাতীয়তাবাদ হয়ে ওঠে ট্রেন্ডি আদর্শ।   

বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে সমাজতন্ত্র বা সোশ্যালিজমের আবির্ভাব হয়। এর একটু আপডেট ভার্সন হলো সাম্যবাদ বা কমিউনিজম। কমিউনিজম হলো শ্রেণীহীন, শোষণহীন, ব্যক্তি মালিকানাহীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতবাদ যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার স্থলে উৎপাদনের সকল মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ (ভূমি, খনি, কারখানা) রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। সাম্যবাদীরা নিজেদের সমাজতন্ত্রের একটি উন্নত এবং অগ্রসর রূপ বলে মনে করে। 

উভয়েরই মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তিমালিকানা এবং শ্রমিক শ্রেণীর উপর শোষণের হাতিয়ার পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো। কার্ল মার্কস যে মতাদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন সেই মতে সাম্যবাদ হল সমাজের সেই চূড়ান্ত শিখর, যেখানে পৌঁছাতে হলে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য স্থাপন করতে হবে এবং সেই ক্রান্তিকালে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, সমাজে সামগ্রী ও সেবার অতিপ্রাচুর্য সৃষ্টি হবে। কোনো দেশে সাম্যবাদ থাকলে সেখানে ধনী গরীবের ব্যবধান থাকবে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব সরকার নেবে।

সাম্যবাদী বা কম্যুনিস্টরা নিজেদেরকে প্রগতিবাদী ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে উপস্থাপন করে। আর বাকি সব মতবাদকে সেকেলে ও কুসংস্কারচ্ছন্ন বলে অভিহিত করে। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া থেকে এর বিস্তার শুরু হয়। এদের নান্দনিক উপস্থাপনা পরাজিত মুসলিম বিশ্বকে বেশ আন্দোলিত করে। মুসলিম যুবকরা ইসলামকে পরাজিত আদর্শ ভেবে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়, গ্রহণ করে কমিউনিজমকে। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র সমরখন্দ, বুখারা, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও তুরস্কে এই মতবাদের বিপুল প্রসার হয়। এই অঞ্চলের যুবকেরা সাম্যবাদ গ্রহণ করে ধর্মহীন হয়ে পড়েছে। 

তবে হিন্দুস্থান, পাকিস্তান ও বাংলায় এর সর্বগ্রাসী আক্রমণ কিছুটা রোধ করা গেছে। এই মতবাদের বিরুদ্ধে যুক্তি ও ইসলামের মাহাত্ম্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন গত শতাব্দির শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি এই মতবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম যুবকদের ফিরিয়ে আনতে রিসালায়ে দ্বীনীয়াত নামে একটি বই লিখেন। এটি পৃথিবীর প্রায় সব জনপ্রিয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বাংলায় এর অনুবাদ হয়েছে ইসলাম পরিচিতি নামে। ইংরেজিতে Towards Understanding Islam নামে অনুবাদ হয়েছে। এভাবে বক্তব্য, বিবৃতি ও দল গঠনের মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী আল্লাহর ইচ্ছেয় এই মতবাদকে ইসলামের মহান আদর্শ দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছেন। 

পাকিস্তান গঠনের সাথে সাথেই কিছু অপরিণামদর্শি মুসলিম বুদ্ধিজীবী সাম্যবাদকে ইসলামেরই অংশ হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। তারা ইসলামী কমিউনিজমের প্রচার করেন। এমন একটি ভ্রান্ত মুসলিমরা মিলে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করেন। এদের কাজ ছিল কম্যুনিস্টরা যা করে তারাও তাই করবে শুধু আল্লাহর নাম নিয়ে করবে। গান-বাজনা, থিয়েটার, পথনাটক, সভা, পাঠচক্র ইত্যাদি ছিল তাদের কাজ। এক পর্যায়ে তারা ইসলামের সংস্কারে লেগে পড়েন। তারা বলতে চান ১৪০০ বছর আগের নিয়ম এখন আর কার্যকর নয়। কিছু কিছু সংস্কার করলেই ইসলাম হয়ে উঠবে যুগপোযোগী। এজন্য নারী-পুরুষে সমান অধিকার ও কর্ম, পর্দার শিথিলতা, ইসলামকে ব্যক্তিপর্যায়ে সীমিত করা ইত্যাদি প্রজেক্ট তারা হাতে নেয়।   

এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে সেই অতিবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা গঠন করে তমদ্দুনে মজলিশ। ইসলামী সাম্যবাদ আদর্শাশ্রয়ী একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নামকরণ হয় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ। তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠায় অধ্যাপক আবুল কাশেমের অগ্রণী সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক এ.এস.এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, আবদুল গফুর, বদরুদ্দীন উমর, হাসান ইকবাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় সিনিয়র ছাত্র। প্রফেসর আবুল কাশেম ছিলেন পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯৪৯ সালে মজলিশের সভাপতি নির্বাচিত হন।

তমদ্দুন মজলিশের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ:
১. কুসংস্কার, গতানুগতিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দূর করে ‘সুস্থ ও সুন্দর’ তমদ্দুন গড়ে তোলা;
২. যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত সর্বাঙ্গ সুন্দর ধর্মভিত্তিক সাম্যবাদের দিকে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়া;
৩. মানবীয় মূল্যবোধ ভিত্তিক সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা;
৪. নিখুঁত চরিত্র গঠন করে গণজীবনের উন্নয়নে সহায়তা করা।

প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম পর্বে তমদ্দুন মজলিশের ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। মজলিশের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় সারা বছর আলোচনা সভা, সেমিনার, বিতর্ক, নাট্যাভিনয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। এর নিয়মিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তক-পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বাজিমাত করে তারা। ভাষা আন্দোলনের নামে মুসলিম উম্মাহ'র বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিবাদের বিষ রোপণ করে তারা।  

উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বস্ত্তত তমদ্দুন মজলিশই প্রথম প্রতিবাদ উত্থাপন করে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ভাষা আন্দোলনের সূচনায় পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তমদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে অধ্যাপক আবুল কাশেম সম্পাদিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ ঐতিহাসিক পুস্তিকায় সন্নিবেশিত নিবন্ধগুলোতে এদের লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলাকে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম, অফিস ও আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও তুলে ধরেন। এই মূল পুস্তিকার মুখবন্ধে, পুস্তিকার সম্পাদক আবুল কাশেম কর্তৃক প্রণীত একটি সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনাও ছিল বাংলা ভাষার অনুকূলে। 

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার অধ্যাপক নূরুল হক ভুইয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাবিবুল্লাহ বাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক আবুল কাসেম, কবি জসীমউদ্দিন, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মওলানা আকরম খাঁসহ কয়েকশ চিন্তাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও ছাত্রনেতাদের স্বাক্ষরসহ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করা হয়। 

এদিকে উর্দু সমর্থক আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বনামখ্যাত মৌলানা দ্বীন মোহাম্মদ সাহেব প্রমুখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল্লায় ও মফস্বলের বহুস্থানে উর্দুকে সমর্থন করে বহু সভা করা হয়। এরা কয়েক লাখ দস্তখত যোগাড় করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এক মেমোরেণ্ডাম পেশ করেন। পথেঘাটে ইস্টিমারে এ স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ চলে। স্বাক্ষর সংগ্রহের পর কয়েকজন নামকরা ব্যক্তি করাচীতে গিয়ে সরকারের কাছে পেশ করে আসেন।"  

যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে ছিলেন তারা কেউ কিন্তু অবাঙালি ছিলেন না। তাদের যুক্তি হলো পূর্ব পাকিস্তানে যদি বাংলাকে অফিসিয়াল ভাষা করা হয় তবে অন্যান্য অঞ্চল যেমন পাঞ্জাব, সিন্ধ, বেলুচ, কাশ্মীরে তাদের নিজস্ব ভাষা চালু হবে। এক্ষেত্রে বাঙালিদের সেসব অঞ্চলে কাজ করা ও শিক্ষাগ্রহণ করা কঠিন হবে। অন্যদিকে বাংলায় অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির পাকিস্তানীরা আসবে না। ফলে দীর্ঘদিনের ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শোষণের ফলে পিছিয়ে থাকা বাংলা আরো পিছিয়ে যাবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংহতি বিনষ্ট হবে। এজন্য বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো রাজনৈতিক নেতা রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন না। 

রাষ্ট্রভাষার পক্ষে দেওয়া অধ্যাপক আবুল কাশেমের বিবৃতিগুলো ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদে ছাপা হতো। কলকাতার ঐ পত্রিকা এ বিষয়ে পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করে ও বাঙালি নির্যাতনের অভিযোগ রিপোর্ট করতো। ওই পত্রিকায় কপি ঢাকায় নিয়ে এসে প্রচারণা চালায় তমদ্দুনে মজলিশেরর কর্মীরা। এই ঘটনা ঢাকাবাসীর মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তাদের আগের ধারণা সত্য হয়েছে বলে তারা মনে করেন। নতুন একটি ইসলামী ভাবধারার রাষ্ট্রে ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্যই মুশরিকরা কিছু ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়েছে। এরকমটাই ভাবতে থাকেন ঢাকাবাসী। ঢাকাবাসী তমদ্দুনের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেন। 

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ছিলেন। একমাত্র চারজন হিন্দু ছাড়া আর কোনো পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেননি। ফরিদপুরের নেতা তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে গণপরিষদের সকল বাঙালি নেতা একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ঢাকার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, “পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক, আমরা সবাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চাই।” পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে”। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথের সংশোধনী প্রস্তাব ভোটে বাতিল হয়ে যায়। 

গণপরিষদে বাংলার রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাব বাতিল হওয়ার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। তবে বাংলার একজন রাজনৈতিক নেতারও প্রত্যক্ষ সমর্থন না পাওয়াও ভাষা আন্দোলন গণভিত্তি তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। যাই হোক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ও মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনকারীরা খুবই সহিংস হয়ে ওঠে। তারা সচিবালয়ে ঢুকে সরকারি কর্মকর্তাদের হেনস্তা করতে থাকে। এর প্রতিরোধে মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা রাস্তায় নামে। ফলে পালিয়ে যায় ভাষা আন্দোলনকারীরা। মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা ঢাকা মেডিকেল ও ঢাবির হলে হামলা চালায়। পুলিশ দুই পক্ষের লোকদেরই ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এতে ভাষা আন্দোলনকারীরা ক্ষেপে যায় এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্যোগ নেয়। তমুদ্দুনের নেতৃত্বে কিছু ছাত্র জিন্নাহর সাথে দেখা করেন। জিন্নাহ তাদের বুঝান কেন একটি ভাষাই পাকিস্তানের সংহতির জন্য জরুরি। এরপর ২৪ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বক্তব্যে বলেন, “Let me make it very clear to you that the state language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead the people is really the enemy of the state. Without one state language no state can remain tied up solidly together and function.”

Let me restate my views on the question of a state language for Pakistan. For official use in this province, the people of the province can choose any language they wish... There can, however, be one lingua franca, that is, the language for inter-communication between the various provinces of the state, and that language should be Urdu and cannot be any other...

The state language, therefore, must obviously be Urdu, a language that has been nurtured by a hundred million Muslims of this subcontinent, a language understood throughout the length and breadth of Pakistan and, above all, a language which, more than any other provincial language, embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and is nearest to the languages used in other Islamic countries.  

তখন তার এই বক্তব্য করতালি দিয়ে স্বাগত জানায় ছাত্ররা। প্রচলিত ইতিহাসে আমাদের জানানো হয়েছে ছাত্ররা ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো সে ‘নো নো’ শব্দ শোনা যায় নি। হতে পারে তারা সত্যই বলেছেন। কিছু ছাত্র হয়তো ‘নো’ বলেছেন। কিন্তু অধিকাংশ বাঙালি ছাত্র করতালি দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। এই ব্যাপারটা আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে অস্বীকার করা হয়েছে। 

যাই হোক জিন্নাহ ভাষা আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী হন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহ্‌'র সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাসেম, তাজউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল ইসলাম। বৈঠকে জিন্নাহ একক রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন, পাকিস্তান নিয়ে তার চিন্তা ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। 

জিন্নাহ তাদের বুঝাতে সক্ষম হন কেন উর্দু জরুরি এবং এতেই কল্যাণ রয়েছে বাঙালিদের। প্রতিটা প্রদেশে আলাদা ভাষা থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাঙ্গালিরাই। জিন্নাহ ছাত্রদের বুঝিয়ে ভাষা আন্দোলন থেকে সরে আসার অনুরোধ করেন। ভাষা আন্দোলনের নেতারা জিন্নাহর যুক্তির কাছে হার মানে এবং আন্দোলন থেকে সরে আসার মৌখিক স্বীকৃতি দেয়। অবশ্য জিন্নাহ তাদের কাছ থেকে লিখিত কোনো ডকুমেন্টস চাননি। তিনি আন্তরিকভাবে বুঝিয়ে ছাত্রদের ভুল আন্দোলন থেকে ফিরতে বলেছেন। 

আন্দোলন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে তমদ্দুন মজলিশ। দ্বিধান্বিত নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব কেড়ে নেয় বামাদর্শের ছাত্রনেতা কমরেড তোয়াহা এবং এই আন্দোলনকে কমিনিস্টদের আন্দোলনে পরিণত করেন। নেতৃত্ব হারানোর পর পরবর্তীতে তমদ্দুন মজলিশ আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবার জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করে একটি বিবৃতি প্রদান করে এবং পরে তারা আস্তে আস্তে আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসে। ভাষা আন্দোলন ইসলামী কমিউনিস্টদের থেকে চলে যায় সাচ্চা কমিউনিস্টদের কাছে। 

তমদ্দুনের আদর্শিক নেতা ছিলেন বেঙ্গল মুসলিম লীগের নেতা আবুল হাশেম। তিনিও একইসাথে ইসলামী ভাবধারা ও কমিউনিজম লালন করতেন। তিনি ১৯৫৩ সালে খেলাফতে রব্বানী পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তমদ্দুনের নেতারা এই পার্টির সাথে সংযুক্ত হন এবং তমদ্দুন হয়ে পড়ে খেলাফতে রব্বানীর কালচারাল উইং।  

খেলাফতে রব্বানীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল হাশিম

    

১৫ ফেব, ২০২১

বিশ্বাসীদের কবি 'কবি আল মাহমুদ'



হিদায়াত বড় অমূল্য সম্পদ। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের এই সম্পদ দান করেন। সারাজীবন নাস্তিকতা লালন করে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে হিদায়াতের দেখা পাওয়া বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। এমন ভাগ্যবান আমাদের বিশ্বাসের কবি 'কবি আল মাহমুদ'।

আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। অসংখ্য কবির ভিড়ে তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সনাক্তযোগ্য একজন কবি হিসাবে আধুনিক বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ভুবনে নিজের আসন চিহ্নিত করে স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় আধুনিকতার সাথে সনাতন ঐতিহ্য ও গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশের এক স্বচ্ছন্দ সংমিশ্রণ ঘটেছে। যে কারণে তাঁর কবিতার আবেদন হয়েছে অনেকটা সর্বজনীন ও যুগান্তকারী।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে যিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি কবি আল মাহমুদ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিও তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক তিনি।

প্রত্যেক মৌলিক কবিরই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। এ বৈশিষ্ট্য সবসময় এক রকম হয় না। কিন্তু যার যে রকম বৈশিষ্ট্যই থাক না কেন, প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে আমরা সহজে তাঁকে চিহ্নিত করতে পারি। গোলাপ, বেলী, বকুল- প্রত্যেকেই তার নিজস্ব রং, গঠন ও গন্ধেই সুপরিচিত। প্রত্যেক কবিও তেমনি তাঁর নিজস্ব ভাব, ভাষা, শিল্পনৈপুণ্য ও কাব্যিক আবেদনের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জল। আল মাহমুদ তাঁর নিজস্ব ভাষা-রীতি, শিল্প-নৈপুণ্য, উপমা-রূপকল্পের ব্যবহার ও বিষয়-ভাবনার দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছেন।

বাংলা কাব্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব ঊনিশ শতকের ষাটের দশকে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে ১৯৩৬ সনের ১১ জুলাই তাঁর জন্ম। পিতার নাম মীর আবদুর রব, মাতা রওশন আরা মীর। পিতামহ মীর আবদুল ওয়াহাব আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ভাষা জানতেন। তিনি গ্রামের মসজিদের ইমামের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এম. ই. স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নের পর জর্জ হিক্সথ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। অতঃপর ব্রাক্ষণবাড়িয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার আগেই তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন ও গৃহত্যাগ করেন।

বিভিন্ন স্থানে ঘুরেফিরে অবশেষে তার ঠাঁই হয় ঢাকায়। ১৯৫৪ সাল থেকে কালক্রমে এটাই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী আস্তানা। ঢাকায় আসার আগেই স্কুল-জীবনে তিনি কবিতা লেখার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কবিতা লেখার কলা-কৌশল জানার জন্য তিনি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার অন্য আরেকজন খ্যাতনামা এবং তাঁর অগ্রজ কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজ উলাহর সান্নিধ্যে যান এবং বাংলা কবিতার ছন্দ সম্পর্কে তাঁর নিকট তালিম গ্রহণ করেন। আল মাহমুদ তাঁর আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় এসে তিনি ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ কবিদের সাথে পরিচিত হন এবং তাঁদের সান্নিধ্যে কবিতা চর্চায় মেতে উঠেন।

ঢাকায় এসে আল মাহমুদ ১৯৫৪ সনে প্রথমে ‘দৈনিক মিলাত’ পত্রিকায় প্রুফ রীডার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৫ সনে মিল্লাত ছেড়ে তিনি ‘কাফেলা’য় যোগ দেন সহ-সম্পাদক হিসাবে। সেখান থেকে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’এ প্রুফ রীডার হিসাবে যোগ দেন ১৯৬৩ সনে। পরে সেখানে তিনি মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সনে সাময়িকভাবে ‘ইত্তেফাক’ বন্ধ হলে তিনি চট্টগ্রামে ‘বই ঘর’-এর প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। এ সময়ই অর্থাৎ ১৯৬৮ সনের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁর বিখ্যাত ‘সোনালী কাবিনে’র সনেটগুলো রচিত হয়। অতঃপর দৈনিক ইত্তেফাক পুনরায় চালু হলে তিনি তাতে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের ৮ নং থিয়েটার রোডে প্রতিরক্ষা বিভাগের স্টাফ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি গ্রুপ ঢাকাস্থ র‌্যাঙ্কিং স্ট্রীট অফিসে ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ প্রকাশ করলে আল মাহমুদ তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। গণকন্ঠ পত্রিকার লোকেরা দৈনিক সংগ্রাম অফিস দখল করে পত্রিকা চালু করে। যাই হোক সরকার-বিরোধী র‌্যাডিক্যাল পত্রিকা হিসাবে গণকন্ঠ মুজিব সরকারের রোষানলে পতিত হয় এবং আল মাহমুদ কারারুদ্ধ হন। এর তিন দিন পর গণকন্ঠও বন্ধ হয়ে যায়। দশ মাস জেলে থাকার পর তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সনে নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীতে সহকারী পরিচালক নিযুক্ত করেন। 

১৮ বছর চাকরি করার পর তিনি ১৯৯৩ সনের ১০ জুলাই শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে তিনি তার গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত হন। নাস্তিক থেকে হয়ে ওঠেন বিশ্বাসের কবি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগত-রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কোরানে এসে উপনীত হয়েছি।” (আল মাহমুদঃ কবিতার জন্য বহুদূর, পৃ. ৩২-৩৩)। 

সরকারি চাকুরি থেকে অবসরের পর তিনি ‘দৈনিক সংগ্রামের’ সহকারী সম্পাদক হিসাবে কয়েক বছর কাজ করেন। একদা যে সংগ্রামের সম্পত্তি কবি দখল করেছিলেন সেই সংগ্রামেই কবির ঠাঁই হয়। একটি কবিতায় ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু কথা থাকায় দৈনিক সংগ্রাম থেকে কবির চাকুরি চলে যায়। তবে বিশ্বাসীদের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রাম কবির পাশে ছিলো কবির মৃত্যু পর্যন্ত। 

চট্টগ্রাম থেকে জামায়াত সমর্থিত ‘দৈনিক কর্ণফুলি’ প্রকাশিত হলে সম্পাদক হিসাবে সেখানেও কাজ করেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকার লেখক ও কলামিস্ট হিসাবে তিনি কাজ করেন। সমকালীন বাংলা কাব্যে তিনি অন্যতম প্রধান শক্তিমান কবি হিসাবে পরিচিত। তবে কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত হলেও গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সাহিত্যেও তাঁর উলেখযোগ্য অবদান রয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আল মাহমুদ এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

কবি খুবই স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের কথা উচ্চারণ করেন,
“...আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহলোকেই আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ্ববিনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবক্রমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম। এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার কবিস্বভাবকে আমি উৎসর্গ করেছি। ... আল্লাহ প্রদত্ত কোন নিয়মনীতিই কেবল মানবজাতিকে শান্তি ও সাম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে। আমার ধারণা পবিত্র কোরানেই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে। এই হলো আমার বিশ্বাস। আমি এ ধারণারই একজন অতি নগণ্য কবি।” (পূর্বোক্ত, পৃ.৩৩)।

কবি অন্যত্র বলেন, “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অলৌকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। মার্কসবাদ সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়ে। (আল মাহমুদ : কবির আত্মবিশ্বাস, পৃ ১১)।

আধুনিক বিভিন্ন মতবাদ, প্রচলিত প্রধান ধর্মসমূহ ইত্যাদি গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে ঐশী গ্রন্থ আল কুরআনের সাথে তা মিলিয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হন কবি। তাই প্রচলিত ধারণা ও অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে নয়, গভীর প্রত্যয়ের সাথে মুক্ত মন ও উদার যুক্তিপূর্ণ মানসিকতা থেকেই তিনি ইসলামকে একমাত্র সত্য ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাই তিনি অবিচল বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের সঙ্গে 'আমাদের মিছিল' কবিতাটি লিখতে পারেন। বলতে পারেন

"আমাদের হাতে একটি মাত্র গ্রন্থ আল কুরআন,
এই পবিত্র গ্রন্থ কোনদিন, কোন অবস্থায়, কোন তৌহীদবাদীকে থামতে দেয়নি।
আমরা কি করে থামি?"
- আমাদের মিছিল

অন্য কবিতায় তিনি বলেন,
উদিত নক্ষত্র আমি। শূন্যতার বিরুদ্ধগামী, পূর্ণ করে তুলেছি বিস্তার।
আমি আলো, দীপ্ত করে তুলেছি পৃথিবী।
আমি তাল মাত্রা বাদ্যযন্ত্র ছাপিয়ে ওঠা আত্মার ক্বেরাত।
আরম্ভ ও অস্তিমের মাঝখানে স্বপ্ন দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত
আগুনের বিনীত গোলক।
নবী ইব্রাহিমের মত অস্তগামীদের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।
আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না।
কে তুমি চির বিরাজমান। তোমাকে সালাম। তোমার প্রতি
মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। এই আমার রুকু, এই আমার সেজদা।
(হে আমার আরম্ভ ও শেষ : দোয়েল ও কবিতা)

এখানে কবির বিশ্বাস ও প্রত্যয়দীপ্ত আত্মসমর্পিত চিত্তের গভীর আকুতি নিঃসংশয় প্রার্থনার মত অভিব্যক্ত হয়েছে। কবির এ বিশ্বাস ও প্রত্যয় তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, অন্তরের একান্ত গভীর উপলব্ধি থেকে সঞ্জাত। অতএব, ধরে নেয়া যায় তা নিখাদ ও অকৃত্রিম। কবির বিশ্বাসের সাথে বিষয়, বিষয়ের সাথে ঐতিহ্য-চেতনা ও বিষয়-বৈভবের দিক থেকে তাঁর পূর্বসূরী নজরুল-ফররুখের সাথে ঘনিষ্ঠ অন্বয় থাকলেও কবি-কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গীর দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, ভিনড়ব স্বাদ ও মেজাজের। এ বৈশিষ্ট্যের গুণেই আল মাহমুদকে সহজে চেনা যায়। ঐতিহ্য ধারণ করে ঐতিহ্যের ছড়ে নতুন ঝংকার সৃষ্টি করার মধ্যেই মৌলিকতার প্রকাশ। আল মাহমুদের মধ্যে সে মৌলিকতা সুস্পষ্ট।

কবি আল মাহমুদ শুধুমাত্র কবি হিসেবেই নয়, তিনি একাধারে একজন শক্তিমান গাল্পিক,ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সাহিত্যের অনেক শাখাতেই তার অবাধ বিচরণ। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। তার সৃষ্টির পরিধি সাহিত্যের বিশাল এলাকা জুড়ে। কিন্তু এত কিছু ছাড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি এবং শুধুই কবি। একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে বলতেই পারি, বাংলা কবিতা মানেই আল মাহমুদ, আর আল মাহমুদ মানেই বাংলা কবিতা।

বাংলা কবিতা যাঁদের হাত ধরে আধুনিকতায় পৌঁছেছে, কবি আল মাহমুদ তাঁদের অগ্রগণ্য। আল মাহমুদের কলম বাংলা সাহিত্যকে করেছে আরো উর্বর। সাহিত্যের সকল শাখাতেই তাঁর সমান পদচারণা। তাঁর লেখনীর ব্যতিক্রম স্বাদের জন্য তিনি বারবার আলোচিত হয়েছেন। হয়েছেন অসংখ্যবার পুরস্কৃত। ১৯৬৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ 'সোনালি কাবিনের' জন্য।

কবি আল মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। কবিতা, গল্প,উপন্যাস সহ শ’খানেকের মতো গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তাঁর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-

কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতর নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ, তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, ইত্যাদি।

গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ূরীর মুখ, নীল নাকফুল, কলংকিনী জ্যোতির্বলয়, গন্ধ বণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত, আল মাহমুদের গালগল্প, ইত্যাদি।

উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, চেহারার চতুরঙ্গ, নিশিন্দা নারী, ইত্যাদি। ল

শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে

প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন, আল মাহমুদের প্রবন্ধসমগ্র

ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র।

আত্মজীবনী- যেভাবে বেড়ে উঠি।

পুরস্কার : বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলাকাব্যে অনবদ্য বহুমাত্রিকতার সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কবি আল মাহমুদ দেশের জাতীয় পদকসহ বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। সেগুলো হলো- বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, জয়বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার,ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার, সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক, লেখিকা সংঘ পুরস্কার, হরফ সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার ইত্যাদি।

২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কবি পাড়ি জমান মহাকালে, যে কালের কোনো অন্ত নেই। মহান প্রভুর দয়া ও সান্নিধ্যে আমাদের বিশ্বাসের কবি সালামতে থাকবেন ইনশাআল্লাহ। কবির জন্য দোয়া, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

১৪ ফেব, ২০২১

শহীদ মাওলানা আবদুস সুবহান : একজন গণমানুষের নেতা



আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলাকে গড়তে যারা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এমন একজন মহামানবের আজ শাহদাতবার্ষিকী। পাবনার মাওলানা আবদুস সুবহান এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি ইতিহাস। ১৯৬২ সাল থেকে এ জনপদের জনগণ তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন, যা পাবনার অন্য কোন নেতার ক্ষেত্রে হয়নি।

তাঁর জীবনের মিশনই ছিল জনকল্যানমূলক কাজ; শিক্ষা, সেবা ও বৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকার জনসাধারনকে শিক্ষিত করে তোলা এবং বেকারত্ব দূর করা।

এমন একজন জনপ্রিয় আলেমে দ্বীনকে সহ্য করতে পারেনি কোনো স্বৈরাচারী সরকার। আইয়ুব, শেখ মুজিব, হাসিনা প্রতিটি মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন। বিনিময়ে ভয়ংকর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দীর্ঘদিন হাসিনা তাঁকে বন্দি রেখে, বিনা চিকিৎসায় অত্যন্ত নির্দয়ভাবে পাবনার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাকে ২০২০ সালে খুন করেছে। আজ মাওলানা আবদুস সুবহানের ১ম শাহদাতবার্ষিকী।

জন্ম ও শৈশব
মাওলানা আবদুস সুবহান ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাবনা জেলার সুজানগর থানার তৈলকুন্ডু (বর্তমান মমিনপারা) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলবী নাঈম উদ্দিন আহমেদ একজন দ্বীনদার পরহেজগার আলেম ছিলেন। ১৯৬৫ সাল থেকে পাবনা শহরের গোপালপুর (পাথরতলা) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। বর্তমানে তাঁর পরিবার-পরিজন সেখানেই বসবাস করছে।

শিক্ষা জীবন
তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সুজানগরের রামচন্দ্রপুর মক্তবে পরে তিনি মানিকহাট ও মাছপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন ১৯৪১ সালে তিনি উলাট মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং প্রায় সাত বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে ১৯৪৭ সালের জুনিয়র পাস করেন তিনি শিবপুর মাদ্রাসা থেকে। ১৯৫০ সালে আলিম পাস করেন তিনি সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে, ১৯৫২ সালে ফাজিল, ১৯৫৪ সালে কামিল পাস করেন। মাওলানা আবদুস সোবহান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি জুনিয়র মেট্রিকুলেশন আলিম ও ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। কামিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ড থেকে হাদিস গ্রুপে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

কর্মজীবন
মাদ্রাসা বোর্ড থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৫২ সালে হেড মাওলানা হিসাবে পাবনা আলিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন অতঃপর তিনি গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউট আরিফপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় সুপারিনটেনডেন্ট ও মাগুরা জেলার বররিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। সবশেষে তিনি আরিফপুর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি টেনে সক্রিয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবন
মাওলানা আবদুস সুবহান ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার পাবনা জেলার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং পর্যায়ক্রমে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘদিন পাবনা জেলা আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তিনি ১৯৬১ সালে গয়েশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দলের সিনিয়র ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে বিপুল ভোটে পাবনা সদর আসনের এমপি নির্বাচিত হন। তিনি প্রথম সর্বোচ্চ ভোটে জয়লাভ করেন এবং সংসদে জামায়াতে ইসলামের উপনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আবারো এমপি নির্বাচিত হন। মাওলানা আদুস সোবহান ২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ড
ছাত্রজীবন থেকেই মাওলানা আবদুস সোবহান সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৬ সালে তিনি আঞ্জুমানে রফিকুল ইসলাম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ১৯৬৮ সালে তিনি জালালপুর জুনিয়ার হাই স্কুল ও বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ নামের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। মাওলানা আবদুস সুবহানের আরো একটি বড় অবদান হচ্ছে পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল। ১৯৬৭ সালে পাবনার জালালপুরে তিনি এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমানে স্কুলটি পাবনা ক্যাডেট কলেজে উন্নীত হয়েছে। তিনি পাবনা দারুল আমান ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত পাবনা ইসলামিয়া মাদ্রাসা ইসলামিয়া এতিমখানা ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার হেফজখানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

ইমাম গাজ্জালী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, কিন্ডার গার্ডেন স্কুল কলেজ, আল-কোরআন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনি পাবনা সদর গোরস্থান কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহ-সভাপতি ছিলেন। উল্লেখ্য তিনি নিজের জমি লিখে দিয়ে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ। এই কলেজের আগের নাম ছিল ইসলামিয়া কলেজ। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব এই কলেজের নাম পরিবর্তন করে। শেখ মুজিব এভাবে সকল প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেন যেগুলোর নামে ইসলাম বা মুসলিম ছিল।

এছাড়াও মাওলানা আবদুস সুবহান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ এবং ঈশ্বরদি সরকারি কলেজ (প্রাক্তন জিন্নাহ কলেজ)সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ হাতে গড়েছেন। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে পাবনার অসংখ্য রাস্তা-ঘাট ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ করে তিনি পাবনার মানুষের কষ্ট লাঘব করেছেন। তার গড়া দারুল আমান ট্রাস্ট বর্তমান শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত, সেখানে তার ব্যক্তিগত প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদে তাকওয়া নামে একটি অত্যাধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

পাবনা ক্যালিকো কটন মিল তাঁর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও তিনি বহু মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। তিনি এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়নের কাজ করেছেন। পাবনা ক্যাডেট কলেজ হতে গয়েশপুরের রাস্তা, কালিদহ হতে ভাঁড়ারা রাস্তা, কুচিয়ামোড়ার তেমাথা হতে সাদুল্লাপুর রাস্তা, ৮ মাইল হয়ে টিকরী-দাপুনিয়া রাস্তা তাঁর কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর বহন করে। মাওলানা আদুস সুবহান পুরাতন পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে কোমরপুর পদ্মা নদীর তীর পর্যন্ত রাস্তা পাকা করেছেন, যা পাবনার চর এলাকার মানুষের কাছে একসময় ছিল কল্পনাতীত।

বাংলাদেশ চাষিকল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ তাঁতি কল্যাণ সমিতির তিনি সহ সভাপতি ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি পাবনা মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। মাওলানা আদুস সুবহান ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির আজীবন সদস্য, ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি মুসলিম এইড লন্ডন এর বাংলাদেশ শাখার চেয়ারম্যান ছিলেন এবং ইসলামিক ‘ল’ রিসার্চ সেন্টার এবং লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ-এরও চেয়ারম্যন ছিলেন। তিনি জাতীয় শরীয়াহ কাউন্সিলের সদস্য এবং আল আমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্রিকা ইসলামী আইন ও প্রচার পত্রিকার তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক।

লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
একজন সুলেখক হিসেবেও মাওলানা আব্দুস সুবহানের পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি চিন্তাশীল প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। একসময় তিনি সাংবাদিকতার সাথেও জড়িত ছিলেন। মাওলানা আদুস সুবহান বাংলা ছাড়াও আরবী, উর্দু, ফার্সি, ইংরেজি সহ বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। একজন সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংস্কৃতিসেবী হিসেবেও মাওলানা আব্দুস সুবহানের সুনাম রয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলেন। গান ও বক্তৃতা প্রতিযোগীতায় পুরস্কারও পেয়েছেন বহুবার।

মাওলানা আদুস সুবহানেবর কৃতিত্ব বলে শেষ করার মত নয়। তিনি আওয়ামী মাফিয়া সরকারের তথাকথিত মানবতা বিরোধী মামলায় ফাঁসীর রায়ে দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে আবদ্ধ থেকেও তিনি কল্যাণময় কাজে পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি তার সম্পত্তির একটি বড় অংশ বিক্রয় করে পাবনার প্রাণকেন্দ্র দারুল আমান ট্রাস্ট তথা ইসলামিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এতে প্রায় ৩ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। মসজিদটিতে একসাথে প্রায় ৩ হাজার নামাজি নামাজ আদায় করতে পারেন।

শুধু তাই নয় মাওলানা সাহেবকে কারাগারের মধ্যে যে ভাইটি সেবা যত্ন করতেন তার ব্যাপারে তিনি সন্তানদের কাছে অসিয়ত করে গেলেন - মামুন নামের ছেলেটি কারাগার থেকে বের হলে আমি জীবিত থাকি আর মারা যাই তোমরা আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলেটিকে ওমরা হজ্জ পালন করার ব্যাবস্থা করে দিবে।

শাহাদাত
মাওলানা আবদুস সুবহানকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ঢাকা থেকে পাবনা যাওয়ার পথে যমুনা সেতু এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে জালিম হাসিনা সরকার। এরপর তথাকথিত মানবতাবিরোধী মামলায় দীর্ঘদিন জালিম সরকারের মিথ্যা রায়ে কারাগারে আবদ্ধ থেকেছেন। প্রবীণ এই জিন্দাদিল মুজাহিদ কখনো জালিমের কাছে মাথানত করেননি। ফলস্বরুপ প্রতিটি জালিম আইয়ুব, শেখ মুজিব ও হাসিনা তাকে জুলুম নির্যাতনের মুখোমুখি করে। তিনি প্রতিটি মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন। বিনিময়ে ভয়ংকর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেখ হাসিনা এই অসুস্থ নেতাকে চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাও করেননি। অবশেষে তিনি যখন মৃত্যুমুখে পতিত হন তখন তাঁকে বেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে হাসপাতালে এনে চিকিৎসার নামে আর বেশি নির্যাতন শুরু করে।

অবশেষে হাজারও ঈমানী পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান রবের মন জয় করে সেই রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। জালিমদের আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ সুযোগ দেন। ছাড় দেন তবে অবশ্যই ছেড়ে দেন না। ইনশাআল্লাহ হাসিনা ও তার মাফিয়া গ্যাং অবশ্যই ফেরাউনের পরিণতি বরণ করবে।

১২ ফেব, ২০২১

শহীদ হাসান আল বান্না : ইসলামী রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠ ইমাম



বিংশ শতাব্দির শুরু থেকেই একের পর এক ভূমি হারাতে থাকে মুসলিমরা। সংকীর্ণ হতে থাকে মুসলিম বিশ্ব। এমন এক মুহুর্তে আবির্ভাব হয় ইমাম হাসান আল বান্নার। তিনি মুসলিম যুব সমাজকে জাগাতে কাজ করতে থাকেন। কিন্তু তার এই কাজের বাধা হয়ে দাঁড়ায় মুসলিম শাসকগোষ্ঠী। যারা ইংল্যান্ডের স্বার্থকেই বেশি দেখতো মুসলিম কিংবা মিশরিয়দের স্বার্থের চাইতে। আর তারা এমন কাজ করবে না কেন, কারণ ব্রিটিশদের তাবেদারি করেই তারা ক্ষমতায় আছে। 

আরব ভূমির ইসলামী রেনেসাঁর সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলেমিনের প্রতিষ্ঠাতা। মিশর থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইখওয়ানুল মুসলেমিনের বিপ্লবী বার্তা ছড়িয়ে পড়ে আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। পতনের অপেক্ষায় থাকা মুসলিমরা তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে নতুনভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যয় পায়। মুসলিম সমাজের এই জাগরণ স্বাভাবিকভাবেই চক্ষুশূল হয় ব্রিটিশ ও তাদের দালালদের। নানানভাবে ইমাম হাসান আল বান্নাকে হেনস্তা করতে চায় তারা। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে দমাতে পারেনি শাসকগোষ্ঠী। বার বার কারা নির্যাতন লেগেই ছিল। অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইমামকে তারা খুন করে। 

তারা ইমামকে খুন মিশর থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু আল্লাহ তাঁর পথে জীবন দেয়া শহীদকে বাঁচিয়ে রাখেন। ইমাম হাসান আল বান্না তাই আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন সারা পৃথিবীতে। আজ পুরো পৃথিবীতে তাঁর থেকে প্রেরণা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে লাখো যুবক।  

জন্ম ও শৈশব
১৯০৬ সালে ইমাম হাসান আল বান্না মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আব্বা আবদুর রাহমান আল বান্না একজন উঁচু মাপের ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আট বছর বয়সে ইমাম হাসান আল বান্না'র আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাদরাসা আর রাশাদ আদ দ্বীনিয়াহ নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। একইসাথে তিনি আল কুরআন হিফয করতে থাকেন। কিছুকাল পর তিনি মাহমুদিয়ার মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র হন। বছর খানেকের মধ্যেই শায়খ হাসানুল বান্না দামানহুর টিচার্স ট্রেনিং স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পান। এই স্কুলে লেখাপড়া কালে তিনি দামানহুরের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিদের নিকট যাতায়াত করতেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি দ্বীনের শিক্ষা লাভ করেন। এই সময় ব্যাপকভাবে ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের দিকেও তিনি মনোযোগ দেন।

অতঃপর তিনি কায়রো যান এবং আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দারুল উলুমে ভর্তি হন। এই সময় তাঁর আব্বা সপরিবারে মাহমুদিয়া থেকে কায়রোতে স্থানন্তরিত হন। কায়রোতে অবস্থানকালে শায়খ হাসানুল বান্না মিসরের অন্যতম সেরা ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ মাহমুদ কর্তৃক পরিচালিত জামিয়াতুল মাকারিমিল আখলাক আল ইসলামিয়াহ নামক সংস্থার সদস্য হন। এখানে তার আমর বিল মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) তৎপরতার হাতেখড়ি। ১৯২৭ সনের জুলাই মাসে দারুল উলুম থেকে তিনি ডিপ্লোমা লাভ করেন। এখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

কর্মজীবন
১৯২৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে শায়খ হাসানুল বান্না সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয় ইসমাঈলিয়াতে। ইসমাঈলিয়া সুয়েজখালের সাথে সংযুক্ত তিমসাহ ঝিলের সন্নিকটে অবস্থিত একটি শহর। স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্তব্য পালন করতে থাকেন। আর সময় সুযোগ মতো তিনি নিকটবর্তী ক্লাব ও কফি হাউসে গিয়ে দ্বীনি বক্তব্য পেশ করা শুরু করেন।

আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন
ইমাম হাসান আল বান্না'র সংক্ষিপ্ত অথচ জ্ঞানগর্ভ ইসলামী ভাষণ চিন্তাশীল লোকদেরকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। ১৯২৮ সনের মার্চ মাসে ছয়জন ব্যক্তি তাঁর বাসায় আসেন তাঁর সাথে আলাপ করতে। হাসান আল বান্না তাঁদের সামনের তাঁর চিন্তাধারা পেশ করেন এবং সমাজ অংগনের সর্বত্র ইসলামের প্রধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।

এই মিটিংয়ে আগত ছয়জন ব্যক্তি হচ্ছেন- ১. হাফিয আবদুল হামীদ, ২. আহমাদ আল হাসরী, ৩. ফুয়াদ ইবরাহীম, ৪. আবদুর রাহমান হাসবুল্লাহ, ৫. ইসমাইল ইযয ও ৬. যাকী আল মাগরিবী। আলোচনা শেষে একটি সংগঠন কায়েমের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন’। আর এর আলমুরশিদুল আম নির্বাচিত হন শায়খ হাসানুল বান্না। এইভাবে ১৯২৮ সনের মার্চ মাসে মিসরের অন্যতম শহর ইসমাঈলিয়াতে সাতজন সদস্য নিয়ে আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন গঠিত হয়। উল্লেখ্য যে তখন শায়খ হাসানুল বান্না ছিলেন ২২ বছরের একজন দীপ্তিমান যুবক।

শায়খ হাসানুল বান্না ভালো করেই জানতেন যে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল জিহাদু ফিল ইসলাম বা ইসলামী আন্দোলনের প্রধান কাজ হচ্ছে আদ্‌দা’ওয়াতু ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে লোকদেরকে ডাকা। এই কাজ করতে হলে লোকদের সামনে প্রথমেই তুলে ধরতে হয় আল্লাহর পরিচয়, তারপর আল্লাহর পথের তথা ইসলামের পরিচয়। এরপর তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হয় ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধান অনুসরণের সাথে সাথে সামষ্টিক জীবনে আল্লাহর বিধান কায়েম করার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে।

ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রসার
ইমাম হাসান আল বান্না ইসমাঈলিয়া শহর চষে বেড়াতে থাকেন। তিনি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লোকদের সাথে আলাপ করতেন ও ইসলামের আলো ছড়াতেন। এইভাবে কাজ চলে তিনটি বছর। বেশ কিছু লোক তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। ইখওয়ানের সদস্যগণ তাঁদের নেতার অনুকরণে লোকদের বাড়িতে বাড়িতে যেতেন। বিশিষ্ট সদস্যগণ মাসজিদে সমবেত লোকদের সামনে বক্তব্য পেশ করতেন। তাঁরা কফি-খানাতেও যেতেন। উপস্থিত লেকাদেরকে নিজেদের বক্তব্য শুনাতেন। সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে তাঁরা যেতেন, তাদের সাথে মিশতেন, তাদের কথা শুনতেন ও তাদেরকে দীনের কথা শুনাতেন।

মাত্র চার বছরের মধ্যেই আল ইখওয়ান খুবই পরিচিত একটি সংগঠনে পরিণত হয়। ইসমাঈলিয়াতে অনেকগুলো শাখা কায়েম হয়। আর নিকটবর্তী শহর পোর্ট সাঈদ, সুয়েজ, আবু সুয়াইর ও সুবরাখিতেও শাখা সংগঠন কায়েম হয়। তখন ইসমাঈলিয়াতেই অবস্থিত ছিলো আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এখানে নির্মাণ করা হয় একটি মসজিদ। 

কিছুকাল পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে বালকদের জন্য একটি ও বালিকাদের জন্য আরেকটি স্কুল স্থাপিত হয়। এই স্কুলগুলোতে এমন শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয় যাতে একজন শিক্ষার্থী পার্থিব বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের সাথে সাথে ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠে। আরো কিছুকাল পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সন্নিকটে গড়ে তোলা হয় ক্লাব। এই ক্লাবে শরীর চর্চা ও নির্মল আনন্দদানের বিভিন্ন আয়োজন ছিলো। লোকদের কর্মসংস্থানের জন্য নিকটেই গড়ে তোলা হয় কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিলো মডেল। শাখা-সংগঠনগুলো শক্তিশালী হতেই মাসজিদ নির্মাণ, শিক্ষালয় স্থাপন, ক্লাব গঠন ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতো।

রাজা ফুয়াদের বাঁকাদৃষ্টি
এই সময় মিসরের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন কিং ফুয়াদ। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইসমাঈল সিদকী পাশা। আল ইখওয়ান তখনো কোন শক্তিধর সংগঠন ছিলো না। তথাপিও শাসকগোষ্ঠী এইটিকে বাঁকা চোখে দেখতেন।

শায়খ হাসানুল বান্না একটি সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা শরু হলো এই বলে যে তিনি সরকারী টাকা খরচ করে দল গঠন করেছেন। তাঁরা কার্যাবলী পরীক্ষা করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত করে আপত্তিকর কিছুই পেলোনা। আসলে তাঁকে হয়রানি করার ছিলো এই অভিযোগের আসল উদ্দেশ্য। সরকারি মহল থেকে প্রচারণা শরু হলো যে হাসানুল বান্না কিং ফুয়াদকে ক্ষমতাচ্যুত করা ও রাজতন্ত্র খতম করার জন্য এই সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

কায়রোতে বদলি
১৯৩২ সনের অক্টোবর মাসে শায়খ হাসানুল বান্না কায়রোতে বদলি হন। এই বদলি আল ইখওয়ানের জন্য কল্যাণকর হয়েছিলো। আল ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় কায়রোতে। এখানে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হয়। বুঝা যাচ্ছিলো, আগামী দিনগুলোতে আল ইখওয়ান একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উল্লেখ্য যে কায়রোতে বদলি হওয়ার পর শায়খ হাসানুল বান্না বিয়ে করেন। একটি মাসজিদে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সিদকী পাশা আল ইখওয়ানের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখছিলেন। কিন্তু তিনি আল ইখওয়ানকে ভালো চোখে দেখতেন না। তবে নৈতিক ভাবে দুর্বল করে ফেলার জন্য তিনি আল ইখওয়ানকে অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব করেন। বিচক্ষণ শায়খ হাসানুল বান্না এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

শায়খ হাসানুল বান্না কেন্দ্রীয় কার্যালয়টিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন। স্কুলে যাবার আগে তিনি কার্যালয়ে আসতেন। সেই দিনের করণীয় কাজের ফিরিস্তি তৈরী করে সহকারীদের হাতে দিয়ে যেতেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি আবার আসতেন কার্যালয়ে। বিকালের সময়টাতে সাধারণত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। এই সভায় তিনি আল কুরআনে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে বক্তব্য রাখতেন। এভাবে ইখওয়ান মজবুতি অর্জন করতে থাকে। 

অতি বিপ্লবী কিছু লোকের ভূমিকা
দাওয়াতী কাজে বেশ সফলতা লাভ করে ইখওয়ান। তাই ইখওয়ানের একটি অতি বিপ্লবী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠে। এরা মনে করলো যে বিপ্লবের সময় এসে গেছে। এখন দেরি করা কাপুরুষতার নামান্তর। ক্ষমতা দখল করে নিলেই হয়। তারা যুক্তি দেখালো যে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, ‘‘যদি তোমাদের কেউ কোন গর্হিত কাজ হতে দেখে তবে সে তার হাত দ্বারা তার প্রতিরোধ করবে, যদি তা করতে সক্ষম না হয় তবে জবান দ্বারা তার প্রতিবাদ করবে, যদি তাও করা সম্ভব না হয় তা হলে হৃদয়ে তার প্রতিরোধের চিন্তা-ভাবনা করবে। অবশ্য শেষটি হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম পর্যায়।’’

এদের বক্তব্যের জবাবে শায়খ হাসানুল বান্না আল কুরআনের আয়াত বিশেষের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘‘তুমি লোকদেরকে তোমার রবের পথে ডাক হিকমাহ ও সুন্দর বক্তব্য সহকারে। আর তাদের সাথে আলাপ কর অতীব সুন্দর পদ্ধতিতে। তোমার রব জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিভ্রান্ত হয়েছে, আর জানেন কে হিদায়াত অনুসরণ করে চলেছে।’’

এই আয়াত উদ্ধৃতির মাধ্যমে ইমাম হাসান আল বান্না ইসলামী বিপ্লবের সুস্থ ও স্বাভাবিক পদ্ধতি কী তা তাদের সামনে তুলে ধরেন। ইমাম হাসান আল বান্না হাওয়ার দোলায় আন্দোলিত হবার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি স্রোতের সাথে ভেসে যাবার পাত্র ছিলেন না। হঠকারিতার পরিণতি কী হতে পারে তাও তিনি বুঝতেন। তাই তিনি স্বীয় মতে অটল থাকেন। কিছু লোক সংগঠন ছেড়ে চলে যায় একটি গুপ্ত জঙ্গী সংগঠন তৈরি করে।

সরকারের ওপর ইংরেজদের ও ইখওয়ানের চাপ
১৯৩৯ সনে শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। গ্রেট ব্রিটেন চাইছিলো মিসর তার পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক। অথচ গ্রেট ব্রিটেনের পক্ষাবলম্বন করার মানে ছিলো তুর্কীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। অর্থাৎ মুসলিম সৈন্যগণ মুসলিম সৈন্যদেরকে আহত ও নিহত করা। এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ ব্যাপার ছিলো না। ইমাম হাসান আল বান্না এই বিষয়ে সরকারকে আগেই হুঁশিয়ার করে দেন।

প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশা ও প্রধান সেনাপতি জেনারেল আযীয আলী আল মিসরীও ইংরেজ তোষণ নীতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। ইংরেজদের বিরাট স্বার্থ তখন সুয়েজে। মিশরের স্বাধীনচেতা সরকার গ্রেট বৃটেনের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ নিতে পারে, এই আশংকা তাদেরকে পেয়ে বসে। ইংরেজগণ গোপনে কিং ফারুকের ওপর কুটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। দুঃখের বিষয়, কিং ফারুক ইংরেজদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন।

১৯৪০ সনে কিং ফারুক প্রধান সেনাপতি জেনারেল আযীয আলী আল মিসরীকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠিয়ে দেন। এই ছুটি আর কোনদিন শেষ হয়নি। কিছুদিন পরে আলী মাহির পাশাকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। মিসরে ইংরেজদের কূটনীতি বিজয় লাভ করে। ১৯৪০ সনের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন হাসান সাবরী পাশা। তাঁর নেতৃত্বে মিসর আফ্রিকার রণাঙ্গনে ইংল্যান্ডের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ঐ বছরের নভেম্বর মাসে হাসান সাবরী পাশা মৃত্যুবরণ করলে নতুন প্রধানমন্ত্রী হন হুসাইন সিররী পাশা।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশা ও প্রাক্তন প্রধান সেনাপতি আযীয আলী আল মিসরী গ্রেট বৃটেনের তাবেদারী করতে প্রস্তুত ছিলেন না। জনগণের ওপর তাঁদের বেশ প্রভাব ছিলো। পাছে ইমাম হাসান আল বান্না তাঁদের সাথে মিলিত হয়ে সরকার বিরোধী কোন ঐক্য গড়ে তোলেন এই আশংকায় ইমাম হাসান আল বান্নাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। গৃহবন্দী করা হয় আলী মাহির পাশাকে। আর গ্রেফতার করা হয় আযীয আলী আল মিসরীকে।

ইমাম হাসান আল বান্না প্রথম কারাবরণ
অল্প কাল করেই ইমাম হাসান আল বান্না কায়রোতে আসেন ইংরেজ বিরোধী জনমত গড়ে তোলার জন্য। সরকার আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সরকার ইমাম হাসান আল বান্না ও সংগঠনের সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল হাকীম আবিদীনকে মুক্তি দেয়। ইংল্যান্ড বরাবরই ইসলামের প্রতি বৈরি মনোভাব পোষণ করে আসছিলো। মিশরে ক্রমবর্ধমান ইসলামী জাগরণ তাদের শংকিত করে তোলে। কূট-কৌশলের মাধ্যমে ইসলামী শক্তিকে বশে আনা যায় কিনা সেই চেষ্টাও তারা করে। ইংল্যান্ডের দূতাবাস থেকে ইমাম হাসান আল বান্না সাথে যোগাযোগ করা হয়। দূতাবাসের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের লক্ষ্য, কর্মসূচী ও কর্মপদ্ধতি জানতে চান। তাঁকে সব জানানো হয়।

সব শুনে তিনি বাহ্যতঃ সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি আল ইখওয়ানকে আর্থিক সাহায্যের প্রস্তাব দেন। বিচক্ষণ শায়খ হাসানুল বান্না ধন্যবাদ সহকারে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্রধানমন্ত্রী হুসাইন সিররী পাশা নির্বিঘ্নে শাসন চালাতে পারছিলেন না। ইংরেজদের সাথে তাঁর মাখামাখি জনমনে ক্রোধের সঞ্চার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে হুসাইন সিররী পাশা পদত্যাগ করেন। কিং ফারুক ওয়াফদ পার্টির নেতা মুসতাফা আন্‌নাহাস পাশাকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।

এই সময় সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তারা একদিকে কিং ফারুক ও অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী পরিচালিত প্রশাসনের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদেরকে বিরক্ত করে তোলে। কিছু সংখ্যক তরুণ অফিসার ‘‘ফ্রি অফিসারস’’ নামে একটি গোপন সংস্থা গড়ে তোলে। তারা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আঁটছিলো। এই অফিসারগণ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। আনোয়ারুস সা’দাত ও আবদুন মুনীম আবদুর রউফ শায়খ হাসানুল বান্নার সাথে যোগাযোগ করেন।

শর্ত সাপেক্ষে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো
এই দিকে প্রধানমন্ত্রী মুসতাফা আন্‌ নাহাস পাশা পার্লামেন্টের নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। আল ইখওয়ান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিতে থাকে। সিদ্ধান্ত হলো ইমাম হাসান আল বান্না ইসমাঈলিয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রধানমন্ত্রী মুসতাফা আন নাহাস পাশা দেখলেন যে আল ইখওয়ান নির্বাচনে নামলে তাঁর দল ওয়াফ্‌দ পার্টি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই জন্য তিনি শায়খ হাসানুল বান্নাকে তাঁর কাছে ডেকে নেন এবং আল ইখওয়ান যাতে নির্বাচনে না নামে তার জন্য চাপ দেন। অনেক বাদানুবাদ হয়। অবশেষে কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে আল ইখওয়ান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে সম্মত হয়। প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা করেন যে আল ইখওয়ানকে নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যেতে দেয়া হবে। মদ ও বেশ্যাবৃত্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আল ইখওয়ানের পত্র-পত্রিকাগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।

১৯৪২ সনের শেষ ভাগে প্রধানমন্ত্রী মুসতাফা আন্‌ নাহাস পাশা বেঁকে বসেন। আল ইখওয়ানের প্রতি তিনি আবার বৈরি মনোভংগি দেখাতে শুরু করেন। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা আল ইখওয়ানের শাখাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। কেবল কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়।

মুস্তাফা আন্‌ নাহাস পাশার সরকার ইংরেজদের সমর্থনপুষ্ট ছিলো। এই সরকার ইমাম হাসান আল বান্নাকে তাদের পথে সবচে’ বড় কাঁটা মনো করতো। শুনা যাচ্ছিলো, শায়খ বান্নাকে অচিরেই কোথাও নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তিনি এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকেন। আর একটি সার্কুলার লেটারের মাধ্যমে তিনি কর্মীদের জন্য বিশেষ হিদায়াত পাঠান। তবে শেষ পর্যন্ত ইমাম হাসান আল বান্নাকে নির্বাসিত করা হয়নি। 

পার্লামেন্ট নির্বাচনে আল ইখওয়ান
১৯৪৫ সনের জানুয়ারী মাসে মিসরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্লামেন্ট গঠনের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন অংশগ্রহণ করে। ইমাম হাসান আল বান্না ইসমাঈলিয়া থেকে ও অন্য নেতৃবৃন্দ অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জনমত এতোখানি অনুকূল ছিলো যে নেতৃবৃন্দের সকলেই নির্বাচিত হওয়ার কথা। চরম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বহুমুখী কারসাজি করে ইমাম হাসান আল বান্না ও তাঁর সহকর্মীদের নিশ্চিত বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তরিত করা হয়। আহমাদ মাহির পাশার দলকে জয়ী করা হয়।

শায়খ হাসানুল বান্নার দ্বিতীয় কারাবরণ
নির্বাচনের পর আহমাদ মাহির পাশা শক্ত হয়ে বসেন। তিনি ইংরেজদের ইচ্ছা পূরণের উদ্যোগ নেন। সিদ্ধান্ত নেন জার্মেনী ও তুর্কীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার। ১৯৪৫ সনের ২৪ শে ফেব্রুয়ারি আহমাদ মাহির পাশা যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত সম্বলিত ঘোষণাটি পাঠকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। প্রচার করা হলো, এটি আল ইখওয়ানের কাজ। শায়খ হাসানুল বান্না, আহমাদ আশ্‌ শুককারী ও আবদুল হাকী আবিদীনকে গ্রেফতার করা হয়।

আততায়ী ধরা পড়েছিলো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে স্বীকার যে সে ন্যাশনালিস্ট পার্টির লোক। অতপর শায়খ হাসানুল বান্না ও তাঁর দুইজন সহকর্মীকে মুক্তি দেয়া হয়। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হন মাহমুদ ফাহমী আন্‌ নুক্‌রাশী পাশা। শায়খ হাসানুল বান্না তাঁর সাথে দেখা করেন। আহমাদ মাহির পাশার হত্যাতে দুঃখ প্রকাশ করেন। এই সুযোগে তিনি তাঁকে আল ইখওয়ানের লক্ষ্য কর্মসূচী ও কর্মপদ্ধতি অবহিত করেন। মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশা আল ইখওয়ানকে ঘৃণা চোখে দেখতেন। শায়খ হাসানুল বান্নার সাক্ষাত ও আলাপের পরও তাঁর মনোভংগির কোনই পরিবর্তন হয়নি। বরং তিনি আল ইখওয়ানের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি আরো বাড়িয়ে দেন। 

মিসরের জনমত ছিলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সুয়েজ খালে ইংরেজদের অবস্থান জনগণ মেনে নিতে পারছিলো না। গ্রেট ব্রিটেনের প্রতি নতজানু নীতি দেশের গণ-মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তরুণ সমাজ সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা মুসতাফা মুমিনের নেতৃত্বে ছাত্রগণ প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতার মুখে মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশা পদত্যাগ করেন। ‍উল্লেখ্য যে মুস্তাফা মুমিন আল ইখওয়ানের ছাত্র-শাখার একজন নেতা ছিলেন।

১৯৪৬ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন ইসমাইল সিদকী পাশা। তিনিও ইংরেজদের আজ্ঞাবহ ছিলেন। আল ইখওয়ান ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ও আপোসহীন মনোভাব গ্রহণ করার জন্য সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে। এই দাবি উত্থাপিত হয় ছাত্র ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। দেশে দারুণ রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এই অবস্থাতেই ইসমাইল সিদকী পাশা ইংরেজদের সাথে চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশ করেন। মিসরের গণ-মানুষ বিক্ষোভের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করে। ৮ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশা আবার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

ফিলিস্তিন যুদ্ধে ইখওয়ানুল মুসলেমিন
১৯৪৭ সনের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন বিভক্তকরণের প্রস্তাব গ্রহীত হয়। ফিলিস্তিনের বুকে একটি ইয়াহুদী রাষ্ট্র পত্তনের জন্যই গৃহীত হয় এই প্রস্তাব। দুনিয়ার মুসলিমদের পক্ষে এই প্রস্তাব মেনে নেয়া সম্ভব ছিলো না। ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতী আমীন আল হুসাইনী ইয়াহুদীদের মুকাবিলার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। আল ইখওয়ানের অন্যতম সদস্য ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার মাহমুদ লাবীব। ইমাম হাসান আল বান্না তাঁকে ফিলিস্তিন পাঠান। 

মাহমুদ লাবীব মুফতী আল হুসাইনীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে ফিলিস্তিনী যুবকদের সমন্বয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। তিনি এই কাজ বেশি দিন করতে পারেননি। ইংরেজগণ তাঁকে ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এই সময় আরব লীগের উদ্যোগে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছিলো। আল ইখওয়ানের কর্মীগণ ব্যাপক হারে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেয়।

১৯৪৮ সন। মুসলিম উম্মাহর জন্য এটি ছিলো আরেকটি কঠিন বছর। ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনে জেঁকে বসে। ইসলামী চিন্তা নায়কগণ জিহাদের ডাক দেন। এই দুর্দিনে ফিলিস্তিনের মুসলিম ভাইদের পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য ছিলো দুনিয়ার সকল মুসলিমের। শায়খ হাসানুল বান্না মিসর থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনের সদস্যদেরকে ফিলিস্তিন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আহমাদ আবদুল আযীযের কমাণ্ডে একদল স্বেচ্ছাসেবক অচিরেই আল আরিস গিয়ে পৌঁছে। সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা কামালুদ্দীন হুসাইন ও সালাহ সালিম স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগদান করেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ইয়াহুদীদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

ফালুজা অঞ্চলে মিসরীয় সেনাবাহিনীর একটি দল ইয়াহুদীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গিয়েছিলো। আল ইখওয়ানের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তাদের সাহায্যে এগিয়ে যায়। যুদ্ধে আল ইখওয়ানের বীরত্ব ও দেশময় তাদের জনপ্রিয়তা দেখে ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলো ইংরেজদের প্রিয়পাত্র প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশা। রাজা ফারুকের মনেও ভয় ঢুকে গেলো। এই বুঝি আল ইখওয়ান গোটা মিসর দখল করে বসে!

ফিলিস্তিন যুদ্ধে ইখওয়ানের স্বেচ্ছাসেবকগণ বীরের মতো লড়ছিলো ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে। ইয়াহুদীরা এদেরকে ভীষণ ভয় করতো। দুঃখের বিষয় তাদের সাফল্যই তাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো। একদিন রাতে মিসরের সেনাবাহিনী স্বেচ্ছাসেবকদের শিবিরগুলো ঘিরে ফেলে। প্রধান সেনাপতি ফুয়াদ সাদিক তাদেরকে নির্দেশে দেন অস্ত্র ত্যাগ করে দেশে ফিরে যেতে অথবা সরাসরি মিসরীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডে থেকে যুদ্ধ করতে। ক্ষুণ্ন মনে কেউ দেশে ফিরে গেলো। কেউ বা কোন না কোনভাবে যুদ্ধের ময়দানে থেকে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করলো।

ইখওয়ানুল মুসলিমুন নিষিদ্ধ ঘোষণা
ইতোমধ্যে সারাদেশে আল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের শাখা সংখ্যা দুই হাজারে উন্নীত হয়। জনশক্তির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় বিশ লাখ। আল ইখওয়ানের অব্যাহত শক্তি বৃদ্ধি সরকারকে ভীত-শংকিত করে তোলে। মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশা আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনকে বে-আইনী ঘোষণার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে শুরু করেন। বিভিন্ন স্থানে বোমা ও অস্ত্রশস্ত্র রেখে বলা হতে থাকে যে এইগুলো আল ইখওয়ানের কাণ্ড। বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তি আততায়ীর হাতে প্রাণ হারায়। বলা হলো, এইসব হত্যাকাণ্ড আল ইখওয়ান সংঘটিত করেছে।

১৯৪৮ সনের ৮ ই ডিসেম্বর। রাত এগারোটা। শায়খ হাসানুল বান্না তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে কায়রোতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে রেডিওতে প্রচারিত খবর শুনছিলেন। খবর প্রচারিত হলো, আল ইখওয়ানুল মুসিলিমূনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হলো যে আল ইখওয়ান দেশে একটি সশস্ত্র বিপ্লব ঘটাবার প্রস্তুতি নিয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে পুলিশের গাড়ি। উপস্থিত সবাইকে গ্রেফতার করা হলো। গ্রেফতার করা হলো না শুধু শায়খ হাসানুল বান্নাকে। আল ইখওয়ানের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। আল ইখওয়ান পরিচালিত স্কুল, ক্লাব, হাসপাতাল, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডিসেম্বর মাসে ঘটে আরেক ঘটনা। আবদুল মাজীদ আহমাদ হাসান নামক ২৩ বছর বয়সী একজন ছাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী আন্‌নুকরাশী পাশাকে হত্যা করে। এবারও উদোরপিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়। আল ইখওয়ানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার তীব্রতর করা হয়।

নতুন প্রধানমন্ত্রী হন ইবরাহীন আবদুল হাদী। আল ইখওয়ান তো দূরে থাক, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তবুও শায়খ হাসানুল বান্না তাঁর সাথে দেখা করেন। তাঁকে নানাভাবে বুঝাতে থাকেন যাতে আল ইখওয়ানের ওপর থেকে তিনি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। কিন্তু কোন ফল হলো না। ইমাম হাসান আল বান্না আশা ছাড়লেন না। সরকারী মনোভাব পরিবর্তনের জন্য তিনি ধৈর্যসহকারে প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন।

সারাদেশ থেকে ইখওয়ানের লোকদেরকে গ্রেফতার করা হয়। বন্দীদের সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়ায়। জেলখানায় তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রাম-পর্যায়ের সদস্যদেরকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু শায়খ হাসানুল বান্নাকে গ্রেফতার করা হয়নি। ইমাম হাসান আল বান্না বলতেন, তাঁকে গ্রেফতার না করার অর্থ হচ্ছে যে তাঁর মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়েছে।

ইমাম হাসান আল বান্নার শাহাদাত
১৯৪৯ সনের ১২ই ফেব্রুয়ারী। এই দিন কায়রোতে ইয়াং মুসলিমস এসোসিয়েশানের একটি মিটিংয়ে শায়খ হাসানুল বান্না মেহমান বক্তা হিসেবে আসেন। মিটিং শেষে তিনি উক্ত সংস্থার কার্যালয় থেকে বের হন। রাস্তায় নেমে তিনি ট্যাকসীতে উঠতে যাচ্ছিলেন এমন সময় আততায়ীর গুলি এসে বিঁধে তাঁর বুকে। রক্ত রঞ্জিত দেহ নিয়ে শায়খ হাসানুল বান্না ঢলে পড়েন। সংগীরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহর দীনের সৈনিক আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে চলে যান।

লাশ পাঠানো হয় তাঁর বাসায়। পুলিশ এসে বাড়ির চারদিক ঘেরাও করে ফেলে। নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কাউকে ঢুকতে দেয়া হলোনা তাঁর বাড়িতে। ট্যাংক বাহিনী ও সাঁজোয়া বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীসহকারে তাঁর লাশ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ দূরে অবস্থান করে অশ্রু বিসর্জন করতে থাকে। সরকার তাদেরকে তাঁর জানাযা ও দাফন কাজে অংশগ্রহণ করতে দিলোনা। 

আলহামদুলিল্লাহ! তারা ইমামকে মিশর থেকে মুছে দিয়ে চেয়েছিল কিন্তু ইমাম ছড়িয়ে পড়েছেন সারাবিশ্বে। 

১০ ফেব, ২০২১

দেওবন্দীদের সাথে মাওলানা মওদূদীর বিরোধ যেভাবে শুরু হয়

ছবি : মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী 

বছর কয়েক আগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (ইআবা) সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুল করীম তার এক বক্তব্যে বলেন, রাজনীতিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য একটি ভুলই যথেষ্ট। সেখানে জামায়াত করেছে অনেক ভুল। সেখানে তিনি জামায়াতের ভুল হিসেবে যেগুলো আবিষ্কার করেন তা হলো, 

১. ১৯৪৭ সালে জামায়াত দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে ছিল 
২. ১৯৭১ পাকিস্তান ভাগের বিপক্ষে ছিল 
৩. ১৯৮৬ সালে হাফেজ্জি হুজুরের পক্ষে ইলেকশন না করা। 
৪. ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সাপোর্ট দেওয়া 
৫. ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা 
৬. ২০০৮ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা 
৭.  ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। 

এসব ভুলগুলো বলার পরে তিনি বলেছেন, তার কথা রেকর্ড হচ্ছে। কেউ যাতে তার ভুল হলে ধরিয়ে দেয়। এবং চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন কেয়ামত পর্যন্ত তার কথা শুনে যেতে হবে কারণ এগুলোর জবাব কেউ দিতে পারবে না। 

যাই হোক এখানে আমি চরমোনাই নেতা ফয়জুল করিমের ১ম অভিযোগ নিয়ে কথা বলবো শুধু। এই দেশে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়। আর সেটা যদি জামায়াত হয় তবে তার ওপর দোষ চাপানো পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ও আরামদায়ক কাজ। যেমন এদেশে ১৯৭১ সালে গণহত্যা গণধর্ষণ করেছে বাঙালি সৈনিক ও আওয়ামী নেতা-কর্মীরা। কিন্তু এর দায় চাপিয়ে খুন করা হয়েছে জামায়াত নেতাদের। এভাবেই চলে আসছে। এই সম্পর্কে জানতে পড়ুন

মেজর জিয়াউর রহমান ও গণহত্যা প্রসঙ্গ
১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও সত্যাসত্য প্রসঙ্গ

মাওলানা মওদূদী বা জামায়াত কি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপক্ষে ছিলেন?
এর উত্তর হচ্ছে 'না'। মুফতি(!) ফয়জুল অনরেকর্ড মিথ্যে কথা বলেছেন। বরং ওয়ান নেশন থিওরির পক্ষে ছিলেন ইআবা'র আকাবির হুসাইন আহমেদ মাদানী।   

মূলঘটনা হলো ১৯৩৫ সাল থেকে বারংবার মুশরিকদের হিংসা ও আক্রমনের শিকার হয়ে মুসলিমরা নিজেদের জন্য আলাদা আবাসভূমির কথা ভাবছিল। তার প্রেক্ষিতে লাহোর প্রস্তাব ও পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়। তখন হিন্দু নেতাদের সাথে সুর মিলিয়ে কিছু মুসলমান ব্যক্তিত্বও পাকিস্তান আন্দোলনের সমালোচনায় নেমে পড়লেন। মুসলমান ব্যক্তিত্বের অন্যতম ছিলেন দেওবন্দিদের প্রধান নেতা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আমীর মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী।

১৯৩৭ সালে ভারতে ১ম নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভালো ফলাফল করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ ছিল হুসাইন আহমেদ মাদানী মুসলিম লীগ ও দ্বিজাতিত্ত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং প্রচারণা চালান। তিনি মুসলিমদেরকে মুসলিম লীগে ভোট না দিয়ে মুশরিকদের সংগঠন কংগ্রেসকে ভোট দিতে বলেন। এভাবে মুসলিমদের মধ্যে বড়সড় দ্বিধা ও বিভাজন তৈরি করতে সক্ষম হয় দেওবন্দি আলেমরা। তাদের এই প্রচারণার কারণে সিলেটের করিমগঞ্জ ভারতের সীমানায় চলে গেছে। আজকে সেখানে করিমগঞ্জের মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।    
 
১৯৩৮ সালে হুসাইন মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে  সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত  যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হলো। 

১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য  এ জাতিগত  ঐক্যের চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি,  বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আর এক ধাপ  এগিয়ে বলেন,“ আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে। এতএব হিন্দু মুসলিম এক জাতি, আমরা সবাই ভারতীয়”

ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসার আলেমদেরকে তো দেওবন্দীরা পাত্তাই দিত না। 

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত গবেষণানির্ভর বই লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার  সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

মাওলানা মওদূদী রহ. বলেন, অমুসলিম জাতি সমূহের সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্কের দু’টি দিক রয়েছে। প্রথমটি এই যে মানুষ হওয়ার দিক দিয়ে মসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। আর দ্বিতীয়টি এই যে, ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য হেতু আমাদেরকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে দেয়া হয়েছে। প্রথম সম্পর্কের দিক দিয়ে মুসলিমরা তাদের সাথে সহানুভূতি, দয়া ঔদার্য ও সৌজন্যের ব্যবহার করবে।  

কারণ মানবতার দিক দিয়ে এরূপ ব্যবহারই তারা পেতে পারে। এমনকি তারা যদি ইসলামের দুশমন না হয়, তাহলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব, সন্ধি এবং মিলিত উদ্দেশ্যের (Common Cause) সহযেগিতাও করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার বস্তুগত ও বৈষয়িক সম্পর্ক তাদেরকে ও আমাদেরকে মিলিত করে ‘একজাতি’ বানিয়ে দিতে পারেনা।

তিনি আরো বলেন, যেসব গন্ডীবদ্ধ, জড় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও কুসংস্কারপূর্ণ ভিত্তির উপর দুনিয়ার বিভিন্ন জাতীয়তার প্রাসাদ গড়ে উঠেছে আল্লাহ ও তাঁর রসুল তা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেন। বর্ণ, গোত্র, জন্মভূমি, অর্থনীতি ও রাজনীতিক অবৈজ্ঞানিক বিরোধ ও বৈষম্যের ভিত্তিতে মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও চরম অজ্ঞতার দরুণ মানবতাকে বিভিন্ন ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত করেছিল, ইসলাম তার সবগুলোকে আঘাতে চূর্ণ করে দেয় এবং মানবতার দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষকে সমশ্রেণীর সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমানাধিকার প্রধান করেছে। 

ইসলামী জাতীয়তায় মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য বিধান পেশ করা হয় যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয়মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানব জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। 

যারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে,তারা এক জাতি হিসাবে গণ্য হবে আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে, তারা সম্পুর্ণ ভ্ন্নি জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমস্ত ব্যক্তিসমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। মুসলিম ও মুশরিক কখনো এক জাতি হতে পারে না।

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব  থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত  কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য। 

যেহেতু  মুসলিম  ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস  ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপরেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট  শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে। কুরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে। যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি।

মাওলানা মওদূদীর এই বই মুসলিম সমাজে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। দেওবন্দী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতি মুসলিমদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বইয়ের প্রভাবে জমিয়তে উলামায় হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে একটি দল। তারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নতুন দল করেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবিও এই নতুন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।  

১৯৪৬ সালের পরবর্তী নির্বাচনে মুসলিম লীগ আশানুরূপ ভালো ফলাফল করে। যার ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি মুসলিমদের অকুণ্ঠ সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। দেওবন্দী তথা হুসাইন আহমদ মাদানীর অনুসারীদের সাথে মাওলানা মওদূদীর বিরোধ এখান থেকে শুরু। এরপর যত আলাপ তৈরি হয়েছে তা তাদের হিংসা ও মিথ্যাচার থেকে উদ্ভূত। আর এখন এসে মুফতি ফয়জুল হুসাইন আহমেদ মাদানীর দায় জামায়াতের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। 

ফয়জুল করীমের বক্তব্য