২৬ ফেব, ২০২১

একজন নিবেদিত প্রাণ নেতা ইউসুফ আলী রহ.



আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ইউসুফ আলী রহ.-এর আজ ১৮ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৩ সালের এইদিনে তিনি সাংগঠনিক সফরে থাকাকালে কুমিল্লার চান্দিনায় ইন্তেকাল করেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী কেন্দ্রিয় দায়িত্বশীলদের মধ্যে ছিলেন একজন। 

১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জয়েন্ট সেক্রেটারী এবং ১৯৮৪ সাল থেকে অন্যতম সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, প্রকাশনা বিভাগ, সফর সূচি প্রণয়ন, কেন্দ্রিয় অফিস বিভাগ সহ বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রিয় দায়িত্ব ছিল তার উপর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে নীরবে তাঁর দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। 

মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। সাংগঠনিক কাজে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে গুরুতরভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে চান্দিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি তাঁর মাতা, স্ত্রী, দুই ভাই, পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে ও অসংখ্য আত্নীয়-স্বজন ও হিতাকাঙক্ষী রেখে যান। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী ছিলেন একজন নীরব, নিরলস, নিরহংকার ও নির্লোভ এবং নিবেদিত প্রাণ নেতা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। 

জন্ম ও শিক্ষা:
জনাব ইউসুফ আলী গাজীপুর জিলার কালীগঞ্জ থানাধীন বড়গাঁও-এ ১ মার্চ ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঢাকার ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজ (বর্তমানে কবি নজরুল কলেজ) থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চতুর্দশ স্থান অধিকার করেন এবং ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশুনা করেছেন। অতপর ১৯৬২ সালে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন:
১৯৬৩ সালে অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাংবাদিক হিসেবে ‘সাপ্তাহিক ইয়ং পাকিস্তানে’ কাজ শুরু করেন। অতপর সাংবাদিকতা ছেড়ে ১৯৬৪ সালে মৌলভীবাজার ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর একই বছরে তিনি নরসিংদী ডিগ্রি কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত উক্ত কলেজে অধ্যাপনা করেন।

ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন:
অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রায় চার যুগ ধরে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শাহ আবদুল হান্নানের নিকট থেকে (বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব) সর্বপ্রথম ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পান। অতঃপর এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ খুররম জাহ্ মুরাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে যান এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘে যোগদান করেন। ১৯৬১-৬২ সেশনে ঢাকা মহানগরীর ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক ইসলামী ছাত্র সংঘের মজলিসে শুরার সদস্য নির্বাচিত হন।

ছাত্রজীবন শেষে তিনি ১৯৬৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং একই বছরে জামায়াতের রুকন হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিভাগের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর যুগ্ম সেক্রেটারী এবং ১৯৮৮ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীল প্রকাশনী এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পরিচালনা বোর্ডের ব্যবস্থাপনার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ইকোনমিক্স রিসার্চ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক প্রকাশনীর সাথেও তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

সমাজসেবা:
সমাজ কর্মী হিসেবে কালীগঞ্জ থানায় তিনি ছিলেন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসা ও ইয়াতিমখানার সাথে জড়িত ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি ঢাকার তা’মিরুল মিল্লাত ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী, গাজীপুর ইসলামী ট্রাস্ট এবং কালীগঞ্জ আল-ইসলাহ ট্রাস্টের সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও তিনি তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মাঝে অন্যতম।

লেখালেখি:
অধ্যাপক ইউসুফ আলী আল্লাহর দ্বীন কায়েমের আন্দোলনের সাথে সাথে লেখার কাজও করেছেন এবং বেশ কিছু বই লিখেছেন। 
তার মধ্যে- 
(১) অর্থনৈতিক সাম্য ও ইসলাম 
(২) মু’মিন জীবনের বৈশিষ্ট্য 
(৩) বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত 
(৪) ইসলামী আন্দোলনমুখী পরিবার গঠন 
(৫) ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তির আত্নগঠন 
(৬) ইসলামী বিপ্লব সাধনে সংগঠন 
(৭) কুরআনের আলোকে মানব জীবন ও 
(৮) মু’মিনের পারিবারিক জীবন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭৯ ও ১৯৮২ সালে দু’বার হজ্জ পালন করেন। রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত করাচীতে আন্তর্জাতিক ইসলামিক অধিবেশনে তিনি যোগদান করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাহেবের স্ত্রী ও ২ ছেলে জামায়াতের রুকন। তার দুই ছোট ভাই কৃষিবিদ ইদরীস আলী এবং কবি আসাদ বিন হাফিজও জামায়াতের রুকন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করছি তিনি যেন এই নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদের প্রচেষ্টাগুলো কবুল করে নেন, তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করেন। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন