২০ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৪ - প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও আত্মত্যাগের হিজরত



মদিনার মুসলিমরা নতুন রাষ্ট্র গঠনের জন্য বাইয়াত নেওয়ার প্রেক্ষিতে মক্কার মুসলিমদের জন্য নতুন পরীক্ষা নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশে আল্লাহর রাসূল সা. মক্কার মুসলিমদেরকে ইয়াসরিব তথা মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ দুনিয়ার জাগতিক দিক থেকে অনেক কঠিন। কারণ নিজের পরিবার ও স্বজনদের ছেড়ে যেতে হবে। সম্পূর্ণ খালি হাতে নিঃস্ব অবস্থায় যেতে হবে। এর কারণ যেতে হবে গোপনে সুতরাং সঙ্গে ব্যাগ বোঝাই করা যাবেনা। মক্কার বিষয় সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি হারানোর সমূহ সম্ভাবনা। মদিনায় অনিশ্চিত জীবন। সর্বোপরি মক্কার কুরাইশরা যদি বুঝতে পারে মদিনায় পালিয়ে যাচ্ছে তবে তাকে নির্যাতন করবে। এতসব সমস্যার বাইরে সম্ভাবনা শুধু একটাই আর সেটা হলো মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে। মুসলিমরা নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র পাবে।

রাসূল সা.-এর নির্দেশ পেয়ে মুসলিমরা একের পর এক মক্কা থেকে উধাও হতে শুরু করলেন। এটা টের পেয়ে যায় মুশরিকরা। তারা পাহারার ব্যবস্থা করে। বেশিরভাগই চলে যেতে সক্ষম হয়। তবে কেউ কেউ আটকা পড়ে। আটকে পড়াদের একটি বড় অংশ নিজেদের স্বজনদের দ্বারাই আটক হয়ে যায়। হজরত আবু বকর রা. ছাড়া আর বাকি সবাইকে যাওয়ার জন্য বলা হয়। মুহাম্মদ সা. আল্লাহর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আর আবু বকর রা.-কে তাঁর সফর সঙ্গী করার ইচ্ছে পোষণ করেন। মক্কার মুসলিমরা নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করে মদিনার পাড়ি দিলেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত মানতে সমস্যা হয়নি কারণ তারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর তারবিয়াতি প্রোগ্রামের ছাত্র ছিলেন। যারা আগে ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন তারাও সেখান থেকে মদিনায় যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন।

আল্লাহ তায়ালা এই হিজরতকে অনেক গুরুত্বের সাথে নিলেন। তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ সম্মানের ঘোষণা দিলেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্তরের হলেন মুহাজির সাহাবারা। মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল সা. হিজরতকে ৩য় মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করলেন। এই যুগেও যারা দ্বীন কায়েমের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করবে তাদের নেতৃত্বের অধিক হকদার বলে বিবেচিত হবে। তবে তার আগে অবশ্যই কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান থাকা লাগবে।

দারুন নদওয়া মিটিং
মক্কার মুশরিকরা যখন দেখলো, মুসলিমরা পরিবার পরিজন ও ধন সম্পদ ফেলে রেখে আওস ও খাযরাজদের এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। তখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়লো। ক্রোধে তারা অস্থির হয়ে উঠলো। ইতোপূর্বে তারা এ ধরনের বিপদজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হয়নি, এ পরিস্থিতি ছিল তাদের মূর্তি পূজা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর মারাত্মক আঘাত এবং চ্যালেঞ্জ স্বরূপ।

মুশরিকরা বুঝতে পেরেছিলো মক্কার মুসলিম ও মদিনাবাদীরা একটি শক্ত জোট করে মক্কা থেকেও শক্তিশালী শহর গড়ে তুলবে। ব্যবসায়িক কেন্দ্র তৈরি করবে। কারণ মদিনার শক্তির সাথে যুক্ত হয়েছে মুহাম্মদ সা.-এর মতো নেতৃত্ব। সাথে আছে আব্দুর রহমান, উসমান, আবু বকর, উমার, হামজা ইত্যাদি খ্যাতিমান বীর ও ব্যবসায়ী। মুহাম্মদ সা.-এর কারণে আওস ও খাজরাজের মধ্যেকার দূরত্ব দূর হয়ে যাবে এটাও তারা অনুমান করতে সক্ষম হয়েছে। সবমিলিয়ে ইয়াসরিব মক্কার চাইতেও শক্তিমান হয়ে ওঠবে এটা তারা বুঝে নিয়েছে। আর তাছাড়া মক্কার লোকদের ব্যবসায়ের জন্য সিরিয়া ও ইরাকে যেতে হলে ইয়াসরিবের পাশ দিয়ে তাদের সাহায্য নিয়ে যেতে হয়। এটাও মক্কার দুর্বলতা ছিল।

মদিনায় ইসলামী দাওয়াতের ভিত্তি দৃঢ় হওয়া এবং মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে মদীনাবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিণাম কত মারাত্মক হতে পারে মুশরিকরা এসব আশঙ্কা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত ছিল। তারা বুঝতে পারছিল যে, সামনে কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে এ কারণে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কার্যকর প্রতিষেধক সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করলো। এ সব সমস্যার মূল নায়ক হিসেবে তারা চিহ্নিত করলো মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ সা.-কে।

অবশেষে কুরাইশ সর্দাররা তাদের পরামর্শ কক্ষ দারুন নদওয়াতে মিলিত হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন গোত্র থেকে ১৪ জন নেতা একত্রিত হয়েছিল। তারা হলো, বনু মাখযূম গোত্রের (১) আবু জাহল বিন হিশাম। বনু নওফাল বিন ‘আব্দে মানাফ গোত্রের (২) জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম (৩) তু‘আইমাহ বিন ‘আদী (৪) হারেছ বিন ‘আমের। বনু ‘আব্দে শামস বিন ‘আব্দে মানাফ গোত্রের (৫) উৎবাহ ও (৬) শায়বাহ বিন রাবী‘আহ (৭) আবু সুফিয়ান বিন হারব। বনু ‘আব্দিদ্দার গোত্রের (৮) নাযার বিন হারেছ। বনু আসাদ বিন আব্দুল ওযযা গোত্রের (৯) আবুল বাখতারী বিন হিশাম (১০) যাম‘আহ ইবনুল আসওয়াদ (১১) হাকীম বিন হেযাম। বনু সাহম গোত্রের (১২) নুবাইহ ও (১৩) মুনাবিবহ ইবনুল হাজ্জাজ। বনু জুমাহ গোত্রের (১৪) উমাইয়া বিন খালাফ

তারা যখন মিটিং-এ উপস্থিত হয়েছিল তখন ইবলিশ শয়তান একজন বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে সভাস্থলে উপস্থিত হলো। তার পরিধানে ছিল জোব্বা, প্রবেশদ্বারে তাকে দেখে লোকেরা বললো, আপনি কে? আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। তখন শয়তান বলল, আমি নজদের অধিবাসী একজন শায়খ। আপনাদের কর্মসূচী শুনে হাজির হয়েছি, কথা শুনতে চাই, কিছু কার্যকর পরামর্শ দিতে পারব আশা করি। মুশিরক নেতারা শয়তানকে যত্ন করে সসম্মানে নিজেদের মধ্যে বসালো।

দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর নানা প্রকার প্রস্তাব পেশ করা হল, প্রথমে ইবনে আসওয়াদ প্রস্তাব করল যে, তাকে আমরা আমাদের মধ্যে থেকে বের করে দেবো, তাকে মক্কায় থাকতে দেব না। আমরা তার ব্যাপারে কোন খবরও রাখব না যে, সে কোথায় যায়? কি করে? এতেই আমরা নিরাপদে থাকতে পারবো এবং আমাদের মধ্যে আগেরে মতো সহমর্মিতা ফিরে আসবে।

শেখ নজদী রূপী শয়তান বলল, এটা কোন কাজের কথা নয়। তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, তার কথা কত উত্তম, কত মিষ্টি। তিনি সহজেই মানুষের মন জয় করেন। যদি তোমরা তার ব্যাপারে নির্বিকার থাকো তবে তিনি যে কোন আরব গোত্রে গিয়ে হাজির হবেন এবং তাদেরকে নিজের অনুসারী করার পর তোমাদের ওপর হামলা করবেন। এরপর তোমাদের শহরেই তোমাদেরকে নাস্তানাবুদ করে তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করবেন। কাজেই তোমরা অন্য কোনো প্রস্তাব চিন্তা করো।

আবুল বাখতারী বললো, তাকে লোহার শেকলে বেঁধে আটকে রাখা হোক। বাইরের থেকে দরজা বন্ধ করে একটা বন্ধ ঘরে রাখা হোক। এতে করে সেই ঘরে তার মৃত্যু হবে।

শেখ নজদী রূপী শয়তান বলল, এ প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয়, তোমরা যদি তাকে আটক করে ঘরের ভেতরে রাখো, তবে যেভাবে হোক, তার খবর তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে যাবে। এরপর তারা মিলিতভাবে তোমাদের ওপর হামলা করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। এরপর তার সহায়তার সংখ্যা বৃদ্ধি করে তোমাদের ওপর হামলা করবে। সেই হামলায় তোমাদের পরাজয় অনিবার্য। কাজেই অন্য কোন প্রস্তাব নিয়ে চিন্তা করো।

এরপর আবু জাহল প্রস্তাব উত্থাপন করলো, সে বললো, তার সম্পর্কে আমার একটিই প্রস্তাব রয়েছে। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যুবককে বাছাই করে তাদের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার দেয়া হবে। এরপর সশস্ত্র শক্তিশালী যুবকরা একযোগে তাকে হত্যা করবে। এতে করে আমরা এই লোকটির হাত থেকে রেহাই পাবো। এমনিভাবে হত্যা করা হলে তাকে হত্যার দায়িত্ব সকল গোত্রের ওপর পড়বে। বনু আবদে মান্নাফ সকল গোত্রের সাথে তো যুদ্ধ করতে পারবে না, ফলে তারা হত্যার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে রাজি হবে। আমরা তখন তাদের হত্যার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবো।

শেখ নজদী রূপী শয়তান এ প্রস্তাব সমর্থন করলো। মক্কার পার্লামেন্ট এ প্রস্তাবের ওপর ঐকমত্যে উপনীত হলো। সবাই ওয়াদা করলো অবিলম্বে এ প্রস্তাব কার্যকর করা হবে।

আল্লাহর রাসূলের হিজরত
মক্কার মুশরিকদের এই ষড়যন্ত্রের খবর আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে জানিয়ে দিলেন জিব্রাঈল আ.-এর মাধ্যমে। জিব্রাঈল আ. আরো বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন, হিজরত করার সময় জানিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন আপনি আজ রাত আপনার নিজের বিছানায় শয়ন করবেন না।

এ খবর পাওয়ার পর নবী সা. ঠিক দুপুরের সময় হযরত আবু বকর রা.-এর বাড়িতে গেলেন। এই প্রসঙ্গে আয়িশা রা. বলেন, নবী সা. এসে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর আবু বকর রা. কে বললেন, আপনার কাছে যারা রয়েছে তাদের সরিয়ে দিন। আবু বকর রা. বললেন, শুধু আপনার স্ত্রী রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন আমাকে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। এরপর তারা দুজনে হিজরতের কর্মসূচী তৈরি করলেন এবং নবী সা. নিজের ঘরে ফিরে রাত্রির অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এদিকে দারুন নদওয়ার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল সা.-কে হত্যার জন্য সমবেত হলো। তারা গভীর রাতে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছাই সফল করে থাকেন। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও সফল হতে পারেনি। মুহাম্মদ সা. তাঁর বিছানায় আলী রা.-কে রেখে বের হলেন ঘর থেকে। আর আলী রা.-কে আমানতসমূহ বুঝিয়ে গেলেন যাতে সেগুলো প্রাপকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।

এরপর মুহাম্মদ সা. বাইরে এলেন একমুঠো ধুলো নিয়ে কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এতেই আল্লাহ তায়ালা তাদের সাময়িকভাবে অন্ধ করে দিলেন। তারা চোখ মুছতে লাগলো। ফলে আল্লাহর রাসূলকে তারা দেখতে পেল না। এমন সময় মুহাম্মদ সা. সূরা ইয়াছিনের ১-৯ নং আয়াত পাঠ করছিলেন।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা সূরা আনফালের ৩০ নং আয়াতে বলেন, কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা নির্বাসিত করার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন আর আল্লাহরই কৌশলীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

সন্ত্রাসীরা যখন বুঝতে পারলো আল্লাহর রাসূল সা. চলে গিয়েছেন তখন তারা মদিনার পথে রাসূল সা.কে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লো। অন্যদিকে মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা. কৌশল করে মদিনার দিকে না গিয়ে উল্টো ইয়েমেনের দিকে রওনা হলেন। তাঁদের টার্গেট ছিল মদিনার পথে যখন সন্ত্রাসীরা খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে মক্কায় ফিরে যাবে তখন তাঁরা মদিনার দিকে যাত্রা শুরু করবেন।

মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা. ইয়েমেনের দিকে ৫ মেইল অতিক্রম করে সাওর নামে এক পাহাড়ের পাদদেশে পোঁছালেন। তার সেই পাহাড়ে উঠলেন। পায়ের ছাপ গোপন করার উদ্দেশ্যে তাঁরা শুধু গোড়ালি দিয়ে হাঁটার কারনে উভয়ের পায়ই একপর্যায়ে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। সেখানে একটি গুহায় তাঁরা আশ্রয় নেন।

আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করে তা পরিষ্কার করলেন। কয়েকটি গর্ত ছিল, যেগুলো জামা ছিঁড়ে বন্ধ করলেন। দুটি গর্ত বাকি ছিল, সেগুলোতে পা চাপা দিয়ে নবী সা.-কে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। নবী সা. ভেতরে গেলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ইতোমধ্যে হযরত আবু বকর রা. কে কীসে যেন দংশন করলো। কিন্তু মুহাম্মদ সা. ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি নড়াচড়া করলেন না। বিষের কষ্টে তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। এক ফোঁটা অশ্রু নবী সা.-এর চেহারায় পড়তেই তিনি জেগে গেলেন। আবু বকর রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন কীসে যেন আমাকে দংশন করেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. খানিকটা থুথু নিয়ে দংশিত স্থলে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে বিষের ব্যাথা দূর হয়ে গেল। এখানে তারা তিনদিন ছিলেন।

কোরাইশদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা যখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারল যে, মুহাম্মদ তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। তখন তারা যেন উম্মাদ হয়ে গেল, প্রথমে তারা হযরত আলীর ওপর তাদের ক্রোধ প্রকাশ করলো। তাকে টেনে হিঁচড়ে কাবাঘরে নিয়ে গেল এবং কথা আদায়ের চেষ্টা করলো। কিন্তু এতে কোন লাভ হল না।

এরপর তারা হযরত আবু বকরের বাড়িতে গেলো। দরজা খুললেন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, তোমার আব্বা কোথায়? তিনি বললেন, আমি তো জানি না। এ জবাব শুনে দুর্বৃত্ত আবু জেহেল আসমাকে এত জোরে চড় দিল যে, তার কানের দুল খুলে পড়ে গেল।

এরপর কোরাইশ নেতারা এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিল যে, মুহাম্মদ এবং আবু বকরকে গ্রেফতার করার জন্য সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। মক্কা থেকে বাইরের দিকে যাওয়ার সকল পথে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করলো। সেই সাথে ঘোষণা করা হলো যে, যদি কেউ মুহাম্মদ এবং আবু বকরকে বা দুজনের একজনকে জীবিত বা মৃত হাজির করতে পারে, তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। এ ঘোষণা সর্বসাধারণ্যে প্রচারিত হবার পর চারিদিকে বহু লোক বেরিয়ে পড়লো। পায়ের চিহ্ন বিশারদরাও উভয়কে তালাশ করতে লাগলো। পাহাড়ের প্রান্তরে ও উঁচু নিচু এলাকায় সর্বত্র চষে বেড়াতে লাগলো, কিন্তু এত কিছু করেও কোন লাভ হলো না।

কেউ কেউ সাওর পর্বতেও খুঁজতে আসলো। এই প্রসঙ্গে আবু বকর (রা.) বলেন, আমি রাসূল সা.-এর সাথে গুহায় ছিলাম। মাথা তুলতেই দেখি, লোকদের পা দেখা যাচ্ছে, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! ওরা কেউ যদি একটুখানি নিচু হয়ে এদিকে তাকায় তবেই আমাদের দেখতে পারবে। নবী সা. বললেন, আবু বকর চুপ করো। আমরা এখানে দুজন নই বরং আমাদের সাথে তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা।

তিনদিন এখানে থাকার পর আবু বকর রা.-এর ব্যবস্থাপনায় উট আসলো এবং তাঁরা সমুদ্র উপকূলের পাশ দিয়ে (যেখান দিয়ে সাধারণত কেউ যাতায়াত করে না) মদিনা তথা ইয়াসরিবের দিকে রওনা হলেন। প্রথমে কুবায় পৌঁছলেন। সেখানে চারদিন থাকলেন। এ সময়ে তিনি সেখানে একটি মসজিদ স্থাপন করেন যা মসজিদে কুবা নামে পরিচিত। এটি মুসলিমদের প্রথম মসজিদ। এখানে তিনি নামাজ চালু করে এরপর মদিনার দিকে আবার যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রা শুরু করার আগে তিনি তার মামার গোত্র বনু নাজ্জাহকে খবর পাঠালেন। তারা বহু মানুষ তলোয়ার সজ্জিত হয়ে আল্লাহর রাসূলের বহরে যুক্ত হলেন।

আল্লাহর রাসূল সা. ইয়াসরিবে প্রবেশ করলে সেখানের অধিবাসী মুসলিমরা তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেন। ইয়াসরিববাসীরা ধনী ছিলেন না, কিন্তু সবাই চাচ্ছিলেন যে, নবী সা. যেন তার বাড়িতেই অবস্থান করেন। এই অবস্থা দেখে নবী সা. বললেন, উটনীর পথ ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর তরফ থেকে আদেশ পেয়েছে। এরপর উটনী ইচ্ছামত চলতে লাগলো এবং বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী রয়েছে সেখানে গিয়ে থামলো।

নবী সা. উটনী থেকে নামলেন না। উটনী সামনে কিছুদূরে এগিয়ে গেলো। এরপর পুনরায় ঘুরে আগের জায়গায় ফিরে এসে বসে পড়লো। এটা ছিল আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর ঘরের কাছে। তিনি সেখানে বিশ্রাম করলেন। আল্লাহর রাসূল সা. নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে চলে আসলেন। তিনি প্রথমে রাষ্ট্রের নাম নির্ধারণ করলেন মদিনাতুন্নবি অর্থাৎ নবীর শহর। সেদিন থেকে ইয়াসরিব ও আশপাশের এলাকার নাম হয়ে গেল মদিনাতুন্নবী সংক্ষেপে মদিনা।

এই সময়ে মুহাম্মদ সা. এর ওপর নাজিল হয় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের জন্য নির্দেশনা। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রা এমন সব লোক যাদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে এরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহর হাতে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন