৩১ আগস্ট, ২০২১

বাংলাদেশে গুম সংস্কৃতির এক যুগ


আজ থেকে এক যুগ আগে বাংলাদেশে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। এর পরই এদেশেরে নাগরিকদের গুম করে ফেলার এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি চালু হয়েছে গত এক যুগে। গুমের এই বিভীষিকা বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে। গত বারো বছরে ৬৪৭ জন মানুষ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছেন। গুম হয়েছেন। এদের কেউ কেউ ফিরে আসলেও বেশিরভাগেরই কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার, আসক এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বিশ্লেষন করে পেয়েছি ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, ২০১১ সালে ৩১ জন, ২০১২ সালে ২৬ জন, ২০১৩ সালে ৫৪ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, ২০১৫ সালে ৬৬ জন, ২০১৬ সালে ৯৭ জন, ২০১৭ সালে ৮৬ জন, ২০১৮ সালে ৯৭ জন, ২০১৯ সালে ৩৪ জন, ২০২০ সালে ৩১ জন ও ২০২১ সালে জুন পর্যন্ত ১৬ জন মানুষ গুম হয়েছেন।

এদের বেশিরভাগের পরিবার দাবি করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে গেছে। এরপরে আর হদিস পাওয়া যায় নি। ৬৪৭ জনের মধ্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া বাকীদের সবাইকে সরকারি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। শতাংশের হিসেবে সেটা প্রায় ৯৩%।

গুমের পর নির্যাতন ভোগ করে অল্প কয়েকজন যারা ফিরে এসেছেন তারা চুপ হয়ে গেছেন। কারা গুম করেছিল, কেন গুম করা হয়েছিল, গুম করে কোথায় তাদের রাখা হয়েছিল সে ব্যাপারে ভয়ে কোনো কথা বলতে রাজি না। এর সর্বশেষ উদাহরণ ধর্মীয় আলোচক আবু ত্বহা আদনান। গুগলের 'ফাইন্ড মাই ডিভাইস' এপ ব্যবহার করে তার আইটি টিম জানতে পারে আবু ত্বহার ব্যবহৃত সেলফোন ডিজিএফআই কার্যালয়ে রয়েছে। এটা ব্যাপক প্রচারের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আজ পর্যন্ত আবু ত্বহা গুমের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাবে দেশে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের সংখ্যা আরো বেশি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ, এর সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত। এর মধ্যে কেউ কেউ টাকার জন্যও গুম ও খুনের শিকার হচ্ছে।

যারা গুম হয়েছে তাদের বেশিরভাগই রাজনীতির সাথে জড়িত। এর বাইরেও বাংলাদেশে টাকার জন্য অপহৃত হওয়া বা গুম হওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রায় প্রতিদিনই অনেক মানুষ হারিয়ে যায়। কিছুদিন গুম করে রাখার পর তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই কাজটা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যেমন করছে তেমনি করছে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ।

গুম ও ক্রসফায়ার নিয়ে করা অনুসন্ধানে জানা যায় বাংলাদেশের এমন কোন থানা অবশিষ্ট নেই, যে থানার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কাউকে গ্রেফতার করে তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে উপস্থাপন করার কথা। অথচ গত দশ বছরে যেসব রাজনৈতিক ব্যাক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগকেই তিন-চারদিন গুম করে রেখে তারপর আদালতে হাজির করা হয়েছে। এই সংখ্যা লক্ষাধিক। আর যেসব ব্যক্তি গুম হয়েছেন বা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন তাদের কথাতো বাদই।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৮ সালের ১২ জুলাই আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় অভিযোগ করেছেন, ২০০৯ সালের পর বিভিন্ন সময় বিএনপির নিখোঁজ হওয়া ৫০০ নেতা-কর্মীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া ১০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য অনুষ্ঠানে বিএনপি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের হারিয়ে যাওয়া ২৯ নেতা কর্মীর তালিকা প্রকাশ করেছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার বেশ কিছু দিন পর তাকে ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার করা হয়। কে বা কারা তাকে সেখানে রেখে আসে। তিনি প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে ভারতে তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি মামলা মোকাবেলা করছেন। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন বাংলাদেশের র‍্যাব তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেতে। জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার একজন সাক্ষীর ব্যাপারেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

সুখরঞ্জন বালি নামে এক সাক্ষীকে ডিবি পুলিশ একেবারে প্রকাশ্যে আদালতের সামনে থেকে একটি সাদা গাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এর বহুদিন পর তাকে পাওয়া যায় ভারতের দমদম কারাগারে। ভারতীয় আদালত তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ১১০ দিনের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উপরের নির্দেশে তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাকে ছাড়া হয়নি।

এমন ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। একটি জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে এদেশে রাজনৈতিক গুমের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) জড়িত। তাদের মর্জি মতো এদেশের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিকদের গুম, ক্রসফায়ার ও গ্রেপ্তার করা হয়।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম করা হয়। এটা বেশ আলোচিত গুম। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হওয়ার আগে বিএনপির মহানগর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম গুম হন। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা থেকে গুম হন সিলেটের ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমেদ ও জুনেদ আহমেদ। সাদা পোশাকে একদল লোক তাদের তুলে নিয়ে যায়। আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের গুমও বেশ আলোচিত ঘটনা।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফরকালে বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার আমিনুল ইসলাম ও ইলিয়াস আলীর গুমের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। গুমের পর নিহত আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের। তাদের ভাগ্যে যে কী ঘটেছে কেউ তা জানে না।

২০১২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে ‘হানিফ পরিবহন’ বাস থেকে নামিয়ে গুম করে র‍্যাব। দুই ছাত্র ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ নেই। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রশিবিরের আদাবর থানার সভাপতি হাফেয জাকির হোসেনকে পুলিশ তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কোন খবর পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালে গুম হওয়া ৯৭টি ঘটনার মধ্যে জামায়াত নেতা গোলাম আযম ও মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে যথাক্রমে আমান আজমী, মীর আহমেদ বিন কাসেম ও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কথা বেশ আলোচিত। এই তিনজনকে নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বহু প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে হুম্মাম ‘নিখোঁজ হওয়ার’ সাত মাস পর বাড়ি ফেরেন, যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনিও মুখ বন্ধ করে আছেন।

বিএনপি কর্মী সাজেদুল ইসলাম সুমন, যিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে গুম হন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ৫ কর্মী। তারা হলেন- সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল, ৭৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি আনিসুর রহমান খান, একই ওয়ার্ডের সহসাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ও ৮০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দল সম্পাদক মিঠু। ১১ দিন পর মুন্সীগঞ্জে নিয়ে আনিসুর রহমান, বিপ্লব ও মিঠুকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি সম্রাট ও খালেদের।

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীর শিশুপার্ক এলাকা থেকে মাহফুজুর রহমান সোহেল সরকার, বংশাল থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি হাবিবুল বাশাল জহির, ৭১নং ওয়ার্ডের সভাপতি পারভেজ হোসাইন ও ছাত্রদল কর্মী হোসাইন চঞ্চলকে সাদা পোশাকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। তারা এখনও নিখোঁজ। একই বছর ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে ছয়জন নিখোঁজ হন। তারা হলেন- ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, সুমনের খালাতো ভাই জাহিদুল করিম তানভীর, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, মো. আল আমিন ও আসাদুজ্জামান রানা, আবদুল কাদের ভুঁইয়া মাসুম। এদের মধ্যে তিনজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই তালিকা অনেক বড়। শেষ হবার নয়।

২০১৭ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ৩ জুলাই রাজধানীর শ্যামলীর আদাবরের নিজ বাড়ি থেকে ভোর পাঁচটার দিকে প্রখ্যাত কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করা হয়। এর ১৮ ঘণ্টা পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে যশোরের অভয়নগরে একটি বাস থেকে উদ্ধার করে।

এদেশের মানুষ বাঁচতে চায়। এই অসভ্য বর্বর সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চায়! এর একমাত্র উপায় হলো স্বৈরাচার হটানো এবং জনগণের মনোনীত শাসন প্রতিষ্ঠা।

পর্ব : ৩৭ - হুনাইনের ধাক্কা ও আমাদের শিক্ষা

 

হুনাইনের ধাক্কা ও আমাদের শিক্ষা 

মক্কা বিজয়ের ১৮ তম দিন। রাসূল সা. তখন বিজয়ীর বেশে। মক্কা পুনর্গঠিত করছেন, নিজের মতো করে সাজাচ্ছেন। এমন সময় খবর এলো বনু হাওয়াজেন ও বনু সাকীফ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে ব্যাপক প্রস্তুতি সহকারে। এই নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ সৃষ্টি হলে আল্লাহর রাসূল সা. স্মিত হেসে বললেন, ইনশাআল্লাহ্‌ তাদের প্রস্তুত সামান আমাদের গনিমত হবে। 

মহানবী সা. কালবিলম্ব না করেই পরদিন অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের ১৯ তম দিনে রওনা হয়ে গেলেন হুনাইনের দিকে। যেখানে বনু হাওয়াজেনের অবস্থান। তারিখ ছিল নবম হিজরির ১০ শাওয়াল। হুনাইন হচ্ছে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি উপত্যকা। মহানবী সা. দ্রুত অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যাতে তারা সংগঠিত হওয়ার আগেই মোকাবিলা করা যায়। এই সিদ্ধান্ত কাজে দিয়েছে। তায়েফ থেকে তখনো বনু সাকীফ হুনাইনে পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি।   

আল্লাহর রাসূল সা. মদিনা থেকে ১০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে এসেছেন। মক্কা বিজয়ের পর মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান রা. ও তার ছেলে মুয়াবিয়া রা.-সহ নতুন দুই হাজার মুসলিম সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়। কয়েকটি কারনে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস চরমে পৌঁছে যায়। প্রথমত বনু সাকীফের সাহায্য আসে নি। দ্বিতীয়ত রাসূল সা. বলেছেন, তাদের মাল-সামান আমাদের গনিমত হবে। তৃতীয়ত ঐ সময় মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিলো বিপুল আর তাদের যুদ্ধ-সরঞ্জামও ছিলো প্রচুর।  এটা দেখেই তাদের মনে পূর্ণ প্রত্যয় জন্মালো যে, দুশমনরা তাদের মুকাবিলা করতে কিছুতেই সমর্থ হবে না। বরং অচিরেই তারা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাবে। এমন কি, কোনো কোনো মুসলমানের মুখ থেকে এ উক্তি পর্যন্ত বেরিয়ে পড়লো, ‘আজ আর আমাদের ওপর কে জয়লাভ করতে পারে'! 

কিন্তু এরূপ ধারণা মুসলমানদের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কিছুমাত্রও সামঞ্জস্যশীল ছিল না। কারণ মুসলিমদের বিজয় তাদের দুনিয়াবি শক্তি সামর্থের ওপর নির্ভর করে না। মুসলিমদের বিজয় আসে আল্লাহর ইচ্ছেয় ও আল্লাহর সাহায্যে। এজন্য মুসলিমদের আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমানদার হতে হয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হয়। বিজয়ের শর্ত এটাই। এই ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ করেছেন। মুসলিমদের কখনো আপন শক্তি-সামর্থ্যের ওপর ভরসা করা উচিত নয়। তাদের মূল শক্তি হওয়া উচিত শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার দয়া ও করুণা। আর দুনিয়াবি ইপায় উপকরণ সাহায্যকারী মাত্র।  

মুসলমানরা হুনাইনের প্রান্তরে আসা মাত্র বনু হাওয়াজেন মৃদু প্রতিরোধ করলো ও পিছু হটতে লাগলো। এটা ছিল একটি ফাঁদ। নির্দিষ্ট স্থানে মুসলিম বাহিনীকে এনে তারা কিছু মালামাল ফেলে পালিয়ে গেল। মুসলিমরা যুদ্ধ শেষ ভেবে মালামাল কুড়াতে লাগলো। এমন সময় শত্রুরা আশ-পাশের পাহাড় থেকে উপুর্যপুরি তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করলো।

এ পরিস্থিতির জন্যে মুসলমানরা মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। এর ফলে তাদের সৈন্যদলে বিশৃংখলা দেখা দিলো এবং কিছুক্ষণের জন্যে তারা ময়দান ত্যাগ করলো। অনেক বেদুইন গোত্র ময়দান থেকে পালিয়ে গেলো। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল সবেমাত্র ঈমান এনেছে এবং পূর্ণ প্রশিক্ষণ পায়নি এমন নও-মুসলিম। আবু সুফিয়ান রা. ভয় পেয়ে বললেন, ওরা সমুদ্রের পাড়ে না গিয়ে থামবে না। আরেক নতুন সাহাবী বললেন, দেখো আজ যাদু বাতিল হয়ে গেছে।  

এই বিশৃংখল পরিস্থিতিতে আমাদের নেতা মুহাম্মদ সা. অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রশান্ত চিত্তে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং দুশমনদের মুকাবিলা করা ও ময়দান থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন না করার জন্যে মুসলমানদের প্রতি ক্রমাগত আহবান জানাতে লাগলেন। 

সাহবারা ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করলে রসূল সা. আহ্বান জানিয়ে বলেন, হে লোক সকল! তোমরা আমার দিকে এসো, আমি মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। সেই সময় রসূল সা.এর কাছে কয়েকজন মুহাজির এবং তাঁর বংশের সাহাবারা ছাড়া অন্য কেউ ছিলো না। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় এই সংখ্যা মাত্র ৮০ জনের কাছাকাছি। ১২০০০ সেনার মধ্যে মাত্র ৮০ জনকে পাওয়া গেল যারা তীর বৃষ্টির মধ্যে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তীর ঠেকাচ্ছিলেন। এরাই মুহাজির। এরাই সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। 

রাসূল সা. শত্রুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং উচ্চস্বরে বলছিলেন, আনান্নবিউল লা কাজিব!  অর্থাৎ আমি নবী, আমি মিথ্যাবাদী নই। এরপর রসূল সা. তাঁর চাচা হযরত আব্বাস রা.-কে বললেন, লোকদের যেন তিনি উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করেন। হযরত আব্বাস রা.-এর ছিলো দরাজ গলা। তিনি বলেন, আমি উচ্চ কন্ঠে ডাকলাম, কোথায় তোমরা বৃক্ষওয়ালা? কোথায় বাইয়াতে রেদওয়ানওয়ালা? 

পলায়নপর সাহাবারা হঠাত থমকে দাঁড়ালেন। হুনাইয়ের উপত্যাকায় রব উঠে গেল। সাহাবারা চিৎকার করে বলতে লাগলেন আমরা আছি! আমরা আসছি! সাহাবারা ছুটে আসতে শুরু করলেন। আব্বাস রা. বলেন, সাহাবার আমার কন্ঠ শুনে এমনভাবে ছুটে আসতে শুরু করলেন যেমন গাভীর আওয়াজ শুনে বাছুর ছুটে আসে। রাসূল সা. আবার সাহাবাদের সংগঠিত করে যুদ্ধ শুরু করলেন। সাহাবারা রণাঙ্গণ থেকে যেভাবে দ্রুত চলে গিয়েছিলেন, তেমনি দ্রুত ফিরে আসতে লাগলেন। 

দেখতে দেখতে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হলো। দু'পক্ষই মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। রাসূল সা. সাহাবাদের নিষ্ঠা দেখে সন্তুষ্ট হলেন। এরপর রাসূল সা. রণাঙ্গনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার চুলো গরম হয়েছে। এরপর একমুঠো ধুলো তুলো ‘শাহাতুল উজুহ’ বলে শত্রুদের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করলেন। এর অর্থ হচ্ছে চেহারা বিগড়ে যাক। নিক্ষিপ্ত ধুলোর ফলে প্রত্যেক শত্রুর চোখ ধুলি ‍ধুসরিত হলো। তারা পৃষ্ট প্রদর্শন করে প্রাণ নিয়ে পালাতে শুরু করলো। আল্লাহর সাহায্যে হুনায়েনের প্রান্তরে বিজয় আসলো। মুশরিকদের প্রায় ৭০ ব্যক্তি নিহত এবং সহস্রাধিক লোক বন্দী হলো।

এই প্রসঙ্গ আল্লাহ তায়ালা আমাদের শিক্ষার জন্য কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মহান রব সূরা তাওবায় ২৫ ও ২৬ আয়াতে উল্লেখ করেন, 

//হুনাইনের দিনকে স্মরণ করো, যখন তোমরা নিজেদের সংখ্যাধিক্যতে তুষ্ট ছিলে; কিন্তু তাতে তোমাদের কোনো কাজ হয়নি; বরং জমিন প্রশস্ত থাকা সত্ত্বেও তা তোমাদের জন্যে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো এবং তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালিয়েছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মুসলমানদের ওপর নিজের তরফ থেকে সান্ত্বনা ও প্রশান্তির ভাবধারা নাযিল করলেন এবং তোমরা দেখতে পাওনি এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে কাফিরদের শাস্তি দিলেন। কাফিরদের জন্যে এমনি শাস্তিই নির্ধারিত।//

নবী করীম (স) এবং তার সাহাবীদের এই ধৈর্য ও দৃঢ়তাকেই আল্লাহ তা’আলা তাঁর তরফ থেকে অবতীর্ণ সান্ত্বনা ও প্রশান্তির লক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর ফলে আল্লাহর অনুগ্রহে অদেখা সেনাবাহিনীর যুদ্ধে অল্পক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেলো এবং মুসলমানরা পুরোপুরি জয়লাভ করলো। আল্লাহু আকবার। 

এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। আমরা আজকে আমাদের কাঙ্খিত বিজয় না আসার জন্যে নানান বিষয় আমাদের বিবেচনায় আনি। এই বিবেচনা ও পর্যালোচনায় আমরা লোকে কী বলবে? অমুককে কীভাবে বোঝাবো? কীভাবে আমরা সংখ্যাধিক্যে পৌঁছাবো? এসব বেশি পর্যালোচনায় আনি। যে বিষয়টা পর্যালোচনায় আনি না তা হলো কীভাবে আমরা আরো ভালো ঈমানদার হবো? 

আমরা কীভাবে আরো বেশি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করবো এই চিন্তা আমাদের মধ্যে কমে গেছে। আমরা সাহাবা ও আল্লাহর ওলিদের ফানাফিল্লাহকে গালগল্প বানিয়ে ফেলেছি। আমরা বৈষয়িক উপায় উপকরণকে বিজয়ের মূল উপজীব্য করে নিয়েছি। 

আমরা আমাদের বিজয়ের জন্য অনুসরণ করছি কীভাবে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করেছে? আমরা বারাক ওবামার থিম নেওয়ারও চেষ্টা করি অথচ আমাদের উচিত নবীর দেখানো পথ। সাহাবাদের দেখানো পথ। ক্ষমা করবেন। উপায় উপরকণকে আমরা অস্বীকার করি না বরং মনে করি পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রযুক্তি আমাদের থাকা উচিত। এটা সহায়ক শক্তি। তবে এটা মূল উপজীব্য হতে পারবে না। আল্লাহ আমাদের বিজয়ের জন্য শর্ত দিয়েছেন "আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমান"। মহান রব বলেন, তোমরা হতাশ হয়োনা, চিন্তিত হয়োনা, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও” (সূরা আলে ইমরান-১৩৯)

দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের একথা দৃঢ়ভাবে অনুধাবন করতে হবে, যে পথে আওয়ামী লীগ, জো বাইডেন, বিজেপি, কংগ্রেসের বিজয় আসবে সে পথে ইসলামের বিজয় আসবে না। ইসলামের বিজয় আসবে আল্লাহর ইচ্ছেয় ও সাহায্যে। যেভাবে হুনাইনের প্রান্তরসহ সব যুদ্ধে বিজয় এসেছিলো। এটাই সূরা তাওবার ২৫-২৬ আয়াতের শিক্ষা। 


২৯ আগস্ট, ২০২১

পর্ব : ৩৬ - মুসলিমরা কা'বার কর্তৃত্ব অধিকার করলো

৮ম হিজরি। রামাদান মাসের দশ তারিখ দশ হাজার সাহাবি নিয়ে মুহাম্মদ সা. রওনা হলেন মক্কার উদ্দেশ্যে। এ সময় আবু রাহাম গিফারিকে মদিনায় রাসূল সা.-এর প্রতিনিধি নিয়োগ করা হলো। যেহেতু রোজার মাস। সাহাবারা সবাই রোজা রেখেছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর মুহাম্মদ সা. রোজা ভঙ্গ করলেন একইসাথে সবাইকে রোজা ভঙ্গ করতে বললেন। সাহাবারা সবাই রোজা ভঙ্গ করে খাবার দাবারের আয়োজন শুরু করলো।

মুহাম্মদ সা. কুরাইশদের ভড়কে দিতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন যুদ্ধ না করে তারা যাতে ভয়ে আত্মসমর্পন করে। এজন্য তিনি দশহাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী সাথে নিয়েছেন। মুহাম্মদ সা. সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন প্রত্যেকে যাতে আলাদা চুলায় রান্না করে খায়। এতে হাজার হাজার চুলা তৈরি হয়। ঐসময়ে গোয়েন্দারা চুলা দেখে সৈন্যবাহিনীর আনুমানিক হিসেব করতো। মুহাম্মদ সা. চেয়েছেন যাতে সৈন্য সংখ্যা যা আছে তার চাইতেও বেশি বুঝা যায়। এতে করে কুরাইশরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকবে।

এভাবে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে। মাররুজ জাহরানে পৌঁছার পর রাসূলের চাচা আব্বাস রা. একটি সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রাসূল সা.-এর মক্কায় প্রবেশের আগেই কুরাইশরা তাঁর কাছে এসে নিরাপত্তার আবেদন জানান।

এদিকে আবু সুফিয়ান কয়েকজনকে সাথে নিয়ে খবর নেওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হলেন। আবু সুফিয়ান ও আব্বাস রা.-এর মধ্যে দেখা হয়ে যায়। আব্বাস রা. আবু সুফিয়ানকে আত্মসমর্পনে রাজি করালেন ও জীবনের নিরাপত্তার ওয়াদা দিলেন। এরপর তাকে নিয়ে আব্বাস রা. মহানবী সা.-এর তাঁবুর দিকে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে পাহারায় থাকা উমার রা. আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে উল্লসিত হলেন ও তাকে নিয়ে দ্রুত নবী সা.-এর কাছে গেলেন। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার জন্য বার বার রাসূল সা.-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। আব্বাস রা. জানালেন তিনি আবু সুফিয়ানের নিরাপত্তার ওয়াদা করেছেন।

নবী সা. আবু সুফিয়ানের সাথে কথা বলে তাকে ইসলাম কবুলের জন্য আহ্বান জানালেন। সে প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে ইসলাম কবুল করে। আল্লাহর রাসূল সা. তখন তাকে সম্মানিত করলেন। মক্কার মূল নেতা আবু সুফিয়ানের নিরাপত্তার ঘোষণা দিলেন এবং বললেন, আবু সুফিয়ান নিরাপদ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখেবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ।

১৭ রমাদান মুসলিম বাহিনী মাররুজ জাহরান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। এই যাত্রায় মক্কার বাইরের ও ভেতরের কোনো গোত্র যাতে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয় সেজন্য সেনাবাহিনীর সামনে আবু সুফিয়ানকে রাখা হয়। আবু সুফিয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে আছে এটা দেখে যারা প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলো তারাও মনোবল হারিয়ে ফেললো।

মক্কার উপকণ্ঠে এসে আব্বাস রা. বললেন, আবু সুফিয়ান এবার তুমি কওমের কাছে যাও এবং তাদের বুঝাও। আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় গিয়ে পৌঁছলো এবং উচ্চকন্ঠে বললো, হে কুরাইশগণ! মুহাম্মদ তোমাদের কাছে এতো সৈন্য নিয়ে এসেছে যে, মোকাবেলা করা অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানে ঘরে প্রবেশ করবে, সি নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা উঠে এসে আবু সুফিয়ানের গোঁফ নেড়ে বললো, তোমরা এই বুড়োকে মেরে ফেলো। খারাপ খবর নিয়ে আসা এই বুড়োর অকল্যাণ হোক।

আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের সর্বনাশ হোক! দেখো তোমাদের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে এই মেয়েলোক তোমাদের যেন ধোঁকায় না ফেলে। মুহাম্মদ এতো বিরাট বাহিনী নিয়ে এসছে যার মোকাবেলা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ। লোকেরা বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আমরা কয়জন তোমার ঘরে যেতে পারবো?

আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর এবং মসজিদে হারাম অর্থাৎ কাবাঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। মক্কার কিছু মুশরিক মুসলিমদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো।

মুহাম্মদ সা. সৈন্য সমাবেশ করলেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-কে নিজের ডানদিকে রাখলেন। তাকে মুহাম্মদ সা. নির্দেশ দিলেন যেন মক্কার ঢালু এলাকায় প্রবেশ করেন। খালেদকে বললেন, যদি কুরাইশদের কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে হ্ত্যা করবে। এরপর তুমি সাফায় গিয়ে আমার সাথে দেখা করবে। যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা.-কে বামদিকে রাখলেন। তাঁর হাতে ছিলো ইসলামের পতাকা। মুহাম্মদ সা. তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ কোদায় প্রবেশ করেন এবং হাজুনে তাঁর দেয়া পতাকা স্থাপন করে মুসলিম বাহিনীর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। পদব্রজে যারা এসেছিলেন তাদের পরিচালনা দায়িত্ব পালন করছিলেন আবু ওবায়দা রা.। মুহাম্মাদ সা. আদেশ দিলেন, তিনি যেন প্রান্তরের প্রান্তসীমার পথ ধরে অগ্রসর হন এবং মক্কায় প্রবেশ করেন। নির্দেশ পাওয়ার পর সেনাপতিরা নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন।

খালিদ রা. এবং তাঁর সঙ্গীদের পথে যেসব পৌত্তলিক আসছিলো, তাদের সাথে মোকাবেলা করে তাদের হত্যা করা হলো। সেখানে ১২ জন মুশরিক মৃত্যুবরণ করলো। দুইজন মুসলিম বাহিনী থেকে একটু আলাদা হয়ে যাওয়ায় ঐ দুইজন শাহদাত বরণ করলেন। খালিদ রা. খান্দামায় শত্রুদের মোকাবেলার পর মক্কার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাফায় ‍গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে মিলিত হলেন। আর কোনো স্থানে কেউ বাধা দেয় নি। সবাই বিনা বাধায় মক্কায় প্রবেশ করলো।

এরপর মুহাম্মদ সা. আনসার ও মুহজিরদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন। প্রথমে তিনি হাজরে আসওয়াদ চম্বুন করলেন। এরপর কাবাঘর তওয়াফ করলেন। সে সময় মুহাম্মদ সা.-এর হাতে একটি লাঠি ছিলো। কাবাঘরের আশেপাশে এবং ছাদের ওপর সেই সময় বহু মূর্তি ছিলো। তিনি তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে সেসব মূর্তিকে গুঁতো দিচ্ছিলেন আর উচ্চারণ করছিলেন, "জায়াল হাক্কু ওয়া জাহাকাল বাতিলু ইন্নাল বাতিলা কানা জাহুকা" (সত্য এসছে, অসত্য চলে গেছে, নিশ্চয় অসত্য চলে যাওয়ার মতো)।

মুহাম্মদ সা. তাঁর উটনীর উপর বসে তওয়াফ করলেন। তওয়াফ শেষ করার পর উসমান ইবনে তালহা রা.-কে ডেকে তাঁর কাছ থেকে কাবা ঘরের চাবি নিলেন। কাবাঘর খোলা হলো। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন অনেকগুলি ছবি। এসব ছবির মধ্যে ইবরাহীম আ. এবং ইসমাইল আ.-এর ছবিও ছিলো। তাঁদের হাতে ছিলো ভাগ্য গণনার তীর। এ দৃশ্য দেখে মুহাম্মদ সা. বললেন, আল্লাহ তায়ালা এই সব মুশরিককে ধ্বংস করুন। আল্লাহর শপথ, এই দুই জন পয়গম্বর কখনোই গণনায়-এর তীর ব্যবহার করেননি। মুহাম্মদ সা. কাবাঘরের ভেতর কাঠের তৈরি একটি কবুতরও দেখলেন। নিজ হাতে তিনি সেটি ভেঙ্গে ফেললেন। তাঁর নির্দেশে ছবিগুলো নষ্ট করে ফেলা হলো।

এরপর মুহাম্মদ সা. ভেতর থেকে কাবাঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। উসামা রা. এবং বিলাল রা. ভেতরেই ছিলেন। তিনি সেখানে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে তিনি কাবাঘরের ভেতরের অংশ ঘুরলেন। সকল অংশে তকবীর এবং তাওহীদের বাণী উচ্চারণ করলেন। এরপর পুনরায় কাবা ঘরের দরজা খুলে দিলেন। মুশরিকরা সামনে অর্থাৎ মসজিদে হারামে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলো। মুহাম্মদ সা. কোরায়শদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণে তিনি বললেন,

‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা সত্য করে দেখিয়েছেন। তাঁর বান্দাদের মাধ্যমে তিনি একাই সকল বিরুদ্ধ শক্তিকে পরাজিত করেছেন। শোনো, কাবাঘরের তত্ত্বাবধান এবং হাজীদের পানি পান করানো ছাড়া অন্য সকল সম্মান বা সাফল্য আমার এই দুই পায়ের নীচে। মনে রেখো, যে কোন রকমের হত্যাকান্ডের দায়িত্ব বা ক্ষতিপূরণ একশত উট। এর মধ্যে চল্লিশটি উট হবে গর্ভবতী।

হে কুরায়শরা, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মধ্যে থেকে জাহেলিয়াত এবং পিতা ও পিতামহের অহংকার নিঃশেষ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ আদমের সন্তান আর আদম মাটি থেকে তৈরি। এরপর তিনি কুরআন থেকে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে, তোমরা এক অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকি। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।

এরপর তিনি বললেন, হে কোরায়শরা, তোমাদের ধারণা, আমি তোমদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো? সবাই বললো, ভালো ব্যবহার করবেন, এটাই আমদের ধারণা। আপনি দয়ালু। দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। এরপর তিনি বলেন, তাহলে আমি তোমাদেরকে সেই কথাই বলছি, যে কথা হযরত ইউসুফ আ. তাঁর ভাইদের বলেছিলেন, ‘লা তাছরিবা আলাইকুমুল ইয়াওমা।’ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।

কাবাঘরের চাবি আগে যে পরিবারের কাছে ছিল তাদের হাতেই ন্যাস্ত করা হয়েছে। রাসূল সা. উসমান ইবনে তালহাকে চাবি দিয়ে বললেন, এই চাবি সব সময়ের জন্যে নাও। তোমাদের কাছ থেকে এ চাবি যে কেড়ে নেবে সে জালিম। হে উসমান! আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তার ঘরের তত্ত্বাধায়ক নিযুক্ত করেছেন। এরপর বিলাল রা.-কে কা'বার ছাদে উঠে আজান দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেদিন মুহাম্মদ সা. উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে গিয়ে গোসল করলেন। এরপর সেখানে আট রাকাত শুকরানার নামায আদায় করলেন।

মুহাম্মদ সা. মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এরপরেও নয় ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন। এরা ছিল ইসলামের চরম দুশমন। তারা মক্কার মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতন করেছিল। তাই তাদের ক্ষমা করা হয় নি। এরা হলো ১. আবদুল ওজ্জা ইবনে খাতাল ২. আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবু সারাহ ৩. ইকরামা ইবনে আবু জাহেল ৪. হারিস ইবনে নুফায়েল ইবনে ওয়াহাব ৫. মাকিস ইবনে সাবাবা ৬. হাব্বাব ইবনে আসওয়াদ ৭ সারাহ ৮. এবং ৯. ইবনে খাতালের দুই দাসী।

আবদুল্লাহ ইবনে সা’দকে উসমান ইবনে আফফান রা. রাসূল সা. কাছে নিয়ে তার প্রাণভিক্ষার সুপারিশ করলেন। মুহাম্মদ সা. প্রাণভিক্ষা দিয়ে তার ইসলাম গ্রহণ মেনে নিলেন। কিন্তু এর আগে তিনি কিছুক্ষণ নীরব ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলিনে যে, ইতিমধ্যে কোন একজন সাহবী আবদুল্লাহকে হ্ত্যা করুক। কেননা এই লোকটি আগেও একবার ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলো। কিন্তু পরে মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে এসেছিলো। দ্বিতীয়বার ইসলাম গ্রহণের পর অবশ্য তিনি ইসলামের ওপর অটল অবিচল ছিলেন।

ইকরামা ইবনে আবু জাহেল ইয়েমেনের পথে পালিয়ে গিয়েছিলো। তার স্ত্রী রসূল মুহাম্মদ সা.-এর কাছে স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইলো। রসূল সা. তা মঞ্জুর করলেন। এরপর সেই মহিলা ইকরামাকে ফিরিয়ে আনলো। এরপর ইকরামা ইসলাম গ্রহণ করে। ইবনে খাতাল কাবাঘরের পর্দা ধরে ঝুলছিলো। তাকে সেখানেই হত্যা করা হলো। হারিস ও মাকিসকে হত্যা করা হলো। হাব্বাব মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। ফিরে আসলে তাকে ক্ষমা করা হয়। সারাহ'র প্রাণভিক্ষা মঞ্জুর করা হয়। ইবনে খাতালের দুইজন দাসীর মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয়। অন্যজন ইসলাম গ্রহণ করেন ও তাকে ক্ষমা করা হয়। মোট ৯ জনের মধ্যে ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় বাকীরা ক্ষমা পায়।

মক্কা বিজয়ের পরদিন ১৮ রমজান মুহাম্মদ সা. ভাষণ দেওয়ার জন্যে দাঁড়লেন। তিনি মক্কার গুরুত্ব ও এর পবিত্রতা সম্পর্কে কথা বলেন। মক্কায় সব রক্তপাত নিষিদ্ধ করেন। এর পবিত্রতা রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে বলেন। তাঁর এই ভাষণের পর মদিনার আনসার সাহাবীরা সংশয়ের মধ্যে পড়ে যান। তারা কেউ কেউ ভেবেছেন মুহাম্মদ সা. আর মদিনায় ফিরে যাবেন না। তারা দুঃখিত ও মনে কষ্ট পেলেন। পরে তারা মুহাম্মদ সা.-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর করেন, আমার জীবন মরণ তোমাদের সাথে। এরপর তারা সংশয়মুক্ত হলো এবং খুশি হলো।

এরপর রাসূল সা. কা'বা, মক্কা ও তার আশেপাশের মুর্তি ভাঙার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে পাঠানো হলো নাখলায় উজ্জার মুর্তিকে ধ্বংস করার জন্য। কুরাইশ এবং সমগ্র বনু কেনানা গোত্র এ মূর্তির পূজা করতে। এটি ছিলো তাদের সবচেয়ে বড় মূর্তি। বনু শায়বান গোত্র এ মূর্তির তত্ত্বাবধান করতো। খালিদ রা. ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। এভাবে অন্যান্য মূর্তিগুলোও ভেঙ্গে ফেলা হয়।

মক্কা বিজয়ই ছিল আরবে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য দারুণ বিজয়। আর এই বিজয়ের দ্বার উন্মোচন হয়েছে হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা তাই হুদায়বিয়ার সন্ধির কূটনৈতিক বিজয়কেই বড় বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা কা'বার ওপর অধিকার লাভ করেছে। যাকে কেন্দ্র করে মুসলিমরা নামাজ পড়ে সেই কেন্দ্র কা'বাকে শিরকের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো মক্কা বিজয়ের সূচনা বা ভূমিকা। এ সন্ধির ফলে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা গেছে। মানুষ একে অন্যের সাথে খোলাখুলি আলাপ করার সুযোগ পাচ্ছিলো। ইসলাম সম্পর্কে তারা মতবিনিময় ও তর্ক বিতর্ক করছিলো। মক্কায় যেসব লোক গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তারাও দ্বীন সম্পর্কে মত বিনিময়ের সুযোগ পেলো। ফলে বহু লোক ইসলামে দীক্ষিত হলো। ইতিপূর্বে বিভিন্ন যু্দ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা তিন হাজারের বেশী ছিলো না। অথচ মক্কা বিজয়ের সময় তাদের সংখ্যা ছিলো ১০ হাজার। এছাড়াও সন্ধির সময়ে সারা পৃথিবীতে মুহাম্মদ সা. নবুয়্যত ও ইসলামের দাওয়াত জানিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

২৭ আগস্ট, ২০২১

জামায়াত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস (৩য় ও শেষ পর্ব)




১৯৩২ সাল থেকে মাওলানা মওদূদী তাঁর পত্রিকা 'তর্জুমানুল কুরআন' ও তার লিখিত বিভিন্ন বই দ্বারা মুসলিমদের ইসলাহ করার চেষ্টা করেছেন। এতোদিন পর্যন্ত মাওলানা আলাদা দল করার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবেননি। কিন্তু যখন পাকিস্তান আন্দোলন চরম জনপ্রিয়তা লাভ করে তখন তাঁর মধ্যে একটি জামায়াত বা দল গঠনের চিন্তা মাথায় আসে।

মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ভারতীয় মুসলমান অবশেষে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত লীগের এক ঐতিহাসিক অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্থাব গ্রহণ করে। মুসলমানদেরকে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দান এবং তাদের জন্যে ভারত উপমহাদেশেই একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি দান করতে হবে, যেখানে তারা তাদের দ্বীন, তাহযীব-তামাদ্দুন ও ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি পূর্ণ রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে। এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের মূল কথা।

ইসলামের নামে এই পাকিস্তান আন্দোলন চলতে থাকলেও তা যে ইসলাম কায়েমের জন্যে মোটেই অনুকূল ও উপযোগী ছিল না, তা মাওলানা মওদূদী স্পষ্ট বুঝেছিলেন। কারণ মুসলিম লীগ তার ঘোষিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা না করে ভিন্ন পথে ভিন্ন দিকেই যাত্রা শুরু করেছিল। এর কারণ হলো মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ নিজেরা ভালো প্র্যাকটিসিং মুসলিম ছিলেন না এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের পথ ও পন্থা সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। মাওলানা বলেন, //আমি তখন স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলাম যে, মুসলিম জাতি এখন আল্লাহর ইচ্ছেয় হিন্দু জাতির মধ্যে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে। তার মধ্যে স্বতন্ত্র জাতীয়তার অনুভূতি এত মজবুত হয়ে গেছে যে, কোনো গান্ধী বা নেহেরুর সাধ্য নেই যে তাকে হিন্দুদের বা হিন্দুস্তানী জাতীয়তার মধ্যে বিলীন করে দিতে পারে। এখন আমার কাছে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিল, তা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র কাকে বলে, তা কয়েম করার জন্য কি ধরনের চরিত্র প্রয়োজন, কি ধরনের আন্দোলন দ্বারা তা কায়েম করা হতে পারে এবং ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে মৌলিক ও কার্যত কী কী পার্থক্য বিদ্যমান সে সম্পর্কে মুসলিম জনগণকে সার্বিকভাবে শিক্ষিত করে তোলা। আমার এ প্রচেষ্টা সম্পর্কে যার যা খুশী তাই বলুক, আমি এসবের কোনোই পরোয়া করি না। আমি পূর্ণ সততার সাথে বিশ্বাস করি যে, তখন এটাই আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল। শুধুমাত্র জাতীয় রাষ্ট্র গঠন করাই মুসলমানদের একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় বরং একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন এবং ইসলাম উপযোগী প্রয়োজনীয় চরিত্র গড়ে তোলা উচিত। এ কথা আমি মুসলমানদেরকে বুঝাবার চেষ্টা না করতাম তাহলে আমার কর্তব্যে অবহেলা করা হতো।// পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ছ’মাস পরে ১১ই সেপ্টেম্বর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ষ্ট্রাচী হলে ‘আনজুমানে ইসলামী তারীখ ও তামাদ্দুনের’ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাওলানা মওদূদী এক দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হুতি হ্যায়? (‘ইসলামী রাষ্ট্র কিরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়?’) তাঁর এ বক্তৃতা উর্দু, ইংরেজী, বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়। এই বক্তব্যে মাওলানা ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও এর প্রতিষ্ঠার পন্থা নিয়ে পরিপূর্ণ রূপরেখা দেন। মাওলানা বলেন- “ইসলামী রাষ্ট্রের গোটা ইমারতের কাঠামো আল্লাহ তায়ালার প্রভুত্বের বুনিয়াদের উপর স্থাপিত। বস্তুত ইহা ইসলামী হুকুমাতের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য। নিখিল বিশ্বজগত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার রাজ্য, তিনিই ইহার প্রভু, শাসক ও বিধানকর্তা। ইহাই ইসলামী রাষ্ট্রনীতির মৌলিক ধারণা। কোন ব্যক্তি, পরিবার, শ্রেণী কিংবা জাতি তথা সমগ্র মানুষেরও কোনরূপ প্রভুত্বের অধিকার নাই। রাষ্ট্রীয় বিধান রচনার এবং হুকুম-নির্দেশ দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার- অন্য কাহারও নয়। মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহ তায়ালার খলীফা বা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করিবে। পৃথিবীর রাষ্ট্র পরিচালনার ইহাই একমাত্র বিশুদ্ধ ও সুষ্ঠু পন্থা।” ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিশেষ গুণাবলী সম্পর্কে মাওলানা বলেন- “ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে এক বিশেষ মনোবৃত্তি, বিশেষ প্রকৃতি এবং বিশেষ ধরনের কার্যক্রম নির্ধারণ আবশ্যক। অন্য কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সহিত উহার কোন তুলনাই হইতে পারে না। উহার সৈন্যবাহিনী, উহার পুলিশ, আদালত, উহার অর্থনীতি, আইন-কানুন ও রাজনীতি, উহার সন্ধি ও যুদ্ধনীতি এবং তৎসংক্রান্ত কার্যালাপ প্রভৃতি সবকিছুই ধর্মহীন রাষ্ট্র হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধর্মহীন বৈষয়িক রাষ্ট্রের আদালতের জজ ও প্রধান বিচারপতি ইসলামী হুকুমাতের কেরানী বা চাপরাশী হওয়ারও যোগ্য নয়। ওখানকার পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল ইসলামী হুকুমাতে একজন সাধারণ কনস্টেবলের পদেও নিয়োগ পাইতে পারে না। ওখানকার ফিল্ড মার্শাল এখানে সাধারণ সৈন্যবাহিনীতেও প্রবেশ করিতে পারে না। ওখানকার পররাষ্ট্র সচিব ইসলামী রাষ্ট্রে কোন পদ লাভ করা তো দূরের কথা, মিথ্যা প্রচারণা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধের দরুন নির্বাসন দন্ড লাভের যোগ্য।” পাকিস্তান তথা ইসলামী হুকুমাতের জন্যে যে ধরনের আন্দোলন ও কর্মপদ্ধতি চলছিল, তার কঠোর সমালোচনা করে মাওলানা বলেন- //এক শ্রেণীর মুসলমান মনে করেন যে, মুসলিম জাতিকে কোনরূপে সংগঠিত করিতে পারিলেই সকল দুঃখের অবসান হইবে। মুসলিম নামধারী একটি জাতিকে নির্দিষ্ট কোন প্লাটফরমে সমবেত এবং একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত ও পরিচালিত করিতে পারিলেই আপনা আপনিই আসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহা অবাস্তব কল্পনা বিলাস ছাড়া আর কিছুই নহে। উপরন্তু ইহা অন্ধ জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতীয়তাবাদী কর্মপন্থা মাত্র, তাহাতে সন্দেহ নাই। যে জাতিই দুনিয়াতে নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করিতে চাহিবে, তাহাকে এই পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে, সে যে ধর্মের বা যে দেশের অন্তর্ভুক্তই হউক না কেন। জাতির প্রেমে আত্মহারা নেতার সর্বাপেক্ষা বড় পরিচয় এই যে, তিনি সময় ও সুযোগ বুঝিয়া কথা বলিতে পারেন, বিভিন্ন প্রকার চাল চালিতে পারেন এবং নির্দেশ দান ও দল পরিচালনার দক্ষতা তাঁহার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় থাকে। এহেন নেতার নেতৃত্বে জাতির যথেষ্ট উন্নতি লাভ হইতে পারে, তাহা অনস্বীকার্য। অনুরূপভাবে মুসলমানও যদি কেবলমাত্র একটি বংশানুক্রমিক কিংবা ঐতিহাসিক ঐতিহ্যসম্পন্ন জাতির সমষ্টির নাম হইত। কিন্তু এই ধরনের নেতৃত্ব ও কর্মপ্রণালীর দ্বারা আদৌ কোন ইসলামী বিপ্লব সৃষ্টি হইতে পারে না এবং উহার দ্বারা ইসলামী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না, তাহা আর নতুন করিয়া বলিবার আবশ্যক হয় না।”// অবিভক্ত ভারতে পাকিস্তান আন্দোলন পূর্ণ উদ্দমে চলছিলো বটে, কিন্তু পথভ্রষ্ট ও চরিত্রহীন সমাজের সংস্কার সাধনের কোনই চেষ্টা করা হয়নি এবং সে সম্পর্কে কোন কর্মসূচীও গ্রহণ করা হয়নি। সমাজের মধ্যে ইসলামী চেতনাবোধ ও নৈতিক অবস্থা অতীব নৈরাজ্যজনক ছিল। জাহেলী যুগের আবর্জনা ও চরিত্রদোষসহ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছিল। পকিস্তান একটি নামমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছিল গুনগত ও চরিত্রগত বিবেচনায় তা ভারত থেকে আলাদা কিছু ছিল না। মাওলানা এসবের তীব্র প্রতিবাদ করে বলেন- //যে জাতির নৈতিক অবস্থা এত হীন ও অধঃপতিত, তাহার সেই নানা মতের ও নানা প্রকৃতির জনতার ভিড় জমাইয়া একটি বাহিনী গঠন করিয়া দিলে কিংবা রাজনৈতিক শিক্ষাদীক্ষার সাহায্যে তাহাদিগকে শৃগালের ন্যায় চতুর করিয়া তুলিলে অথবা যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তাহাদের মধ্যে ব্যাঘ্রের হিংস্রতা জাগাইয়া তুলিলে অরণ্য জগতের প্রভুত্বলাভ করা হয়ত বা সহজ হইতে পারে, কিন্তু তাহার সাহায্যে মহান আল্লাহ্ তায়ালার দ্বীন ইসলামের কোন প্রচার হওয়া বা ইসলামী হুকুমাত কায়েম হওয়া মোটেও সম্ভব নয়। কারণ এমতাবস্থায় দুনিয়ার কেহই তাহাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিবে না, কাহারও মনে ইসলামের আবেগময়ী ভাবধারা ও অনুপ্রেরণা জাগ্রত হইবে না এবং এই সব কারণেই ইসলামের সীমার মধ্যে দুনিয়ার মানুষের দলে দলে অনুপ্রবেশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকন করার ভাগ্য কখনই হইবে না।// উপরোক্ত আলোচনায় মুসলিম লীগের সাথে মাওলানার পার্থক্য কোন জায়গায় তা সহজেই স্পষ্ট হয়। মাওলানা তখন চিন্তা করলেন মুসলিমদের একটি জামায়াত তিনি প্রতিষ্ঠা করবেন তা তিনটি সমস্যার সমাধান করবে। প্রথমত দেশ বিভক্ত না হলে মুসলমানদেরকে রক্ষা করার জন্য কি করা যেতে পারে? দ্বিতীয়ত দেশ বিভক্ত হলে যেসব মুসলমান ভারতে থেকে যাবে তাদের জন্য কি ব্যবস্থা করা দরকার? তৃতীয়ত দেশ বিভক্ত হলে যে দেশ মুসলানদের অংশে পড়বে তাকে মুসলমানদের পরিচালিত অনৈসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া থেকে কি করে রক্ষা করা যায় এবং তাকে খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসবে গড়ে তোলার জন্য কী পন্থা অবলম্বন করা উচিত? দ্বীনে হক প্রতিষ্ঠার জন্যে মাওলানা মাওদূদী তাঁর মাসিক পত্রিকা ‘তর্জুমানুল কোরআনের’ মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করেন। যে কোন আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে এবং তাকে বাস্তব রূপ দিতে প্রয়োজন হয় একটি জামায়াত বা দলের। ঐক্যবদ্ধ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম ব্যতীত কোন আন্দোলন পরিচালনা মোটেও সম্ভব নয়। এ উদ্দেশ্যে মাওলানা ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট ‘জামায়াতে ইসলামী’ নামে মুসলিমদের একটি জামায়াত গঠন করেন। এটা কোনো মাজহাবের বা কোনো ফিরকার আন্দোলন নয়। এটা সমগ্র মুসলিমদের আন্দোলন যারা হক প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত। এ দলটির দ্বারা এই পাক-ভারত উপমহাদেশে এমন কিছু ইসলামের সাচ্চা সৈনিক তৈরি হবে, যারা এ দেশে ইসলামের বাণী সমুন্নত রাখার সংগ্রাম করে যাবে। ইসলামী সংস্কৃতি লালন ও পুনর্জীবিত করবে। পাকিস্তান আন্দোলন ব্যর্থ হলে জাতীয় পরাজয়ের ভয়াবহ পরিণাম থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা করবে। এবং পাকিস্তান হয়ে গেলে তাকে সঠিক পথে চালাতে সাহায্য করবে। হিজরী ১৩৬০ সালের সফর মাসের তর্জুমানুল কুরআনে মাওলানা মওদূদী মুসলমান জনসাধারণের নিকট এক আবেদন জানান যে, যারা উক্ত মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে তদনুযায়ী কাজ করতে চান, তাঁরা যেন তর্জুমান অফিসের সাথে যোগাযোগ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই সংবাদ আসতে লাগল যে, বেশ কিছু সংখ্যক লোক একটা ইসলামী দল গঠন করে কাজ করতে আগ্রহী। অতএব হিজরী ১৩৬০ সালের ১লা শাবান, ইং ১৯৪১ সালের ২৫শে আগস্ট লাহোরে সমবেত হওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানানো হলো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ৭৫ জন অধিবেশনে যোগদান করেন। প্রথম দিনে বিভিন্ন লোক মাওলানাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। মাওলানা সে সবের সন্তোষজনক জবাব দেন। দ্বিতীয় দিন সকাল আটটায় অধিবেশন শুরু হয়। সর্বপ্রথম মাওলানা তাঁর বক্তৃতায় তৎকালীন ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি ‌’দ্বীন’কে একটা আন্দোলন হিসাবে পেশ করে বলেন, “আমাদের জীবনে যেন দ্বীনদারী নিছক একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসাবে নিষ্ক্রিয় ও স্থবির হয়ে না থাকে। বরঞ্চ আমরা যেন আমাদের সামগ্রিক জীবনে দ্বীনকে কায়েম করতে এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর মূলোৎপাটন করার জন্য সংগ্রাম করতে পারি। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘দারুল ইসলামের’ প্রতিষ্ঠাই ছিল এর প্রথম পদক্ষেপ। সে সময়ে মাত্র চারজন ছিল আমার সহকর্মী। এ ক্ষুদ্র সূচনা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু এতেও আমরা নিরাশ হইনি। বরঞ্চ ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত এবং এই আন্দোলনের জন্যে দৃষ্টিভঙ্গি ও মন মস্তিষ্ক তৈরি করার কাজ খোদার ফজলে অব্যাহত রইলো। আল্লাহর অনুগ্রহে দু’একজন করে সহকর্মী বাড়তে লাগলো। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ধরণের লোকের ছোট ছোট শাখা প্রতিষ্ঠান কায়েম হতে লাগলো। তার সাথে সাথে ইসলামী সাহিত্য প্রকাশ ও মৌলিক দাওয়াত-তাবলীগের কাজো চলতে থাকলো। অবশেষে আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া যাচাই-পর্যালোচনা কার পর বুঝতে পারা গেল যে, এখন জামায়াতে ইসলামী গঠন করে সংগঠিতভাবে ইসলামী আন্দোলন চালানোর উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তার ফলেই এই অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে।” এ পটভূমিকা বিশ্লেষণের পর মাওলানা বলেন, “মুসলমানদের মধ্যে সাধারণত যে সকল আন্দোলন অতীতে চলেছে এবং বর্তমানে চলছে, সে সব থেকে ইসলামী আন্দোলনের মৌলিক পার্থক্য কি, তা-ই সর্বপ্রথম আমাদের ভাল করে জেনে রাখা দরকার।” “প্রথমত, হয়তো ইসলামের কোন অংশ বিশেষকে অথবা পার্থিব কোন উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করেএ সব আন্দোলন পরিচালিত হয়। কিন্তু আমাদের এ আন্দোলন চলবে পরিপূর্ণ ইসলামকে নিয়ে।” “দ্বিতীয়ত, এদের দলীয় সংগঠন দুনিয়ার অন্যান্য দলগুলোর পদ্ধতিতে করা হয়েছে। কিন্তু আমরা ঠিক সেই দলীয় সংগঠন ব্যবস্থা অবলম্বন করছি, যা প্রথমে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত দলের মধ্যে ছিল।” ‍”তৃতীয়ত, এসব দলে যখন কোন লোক ভর্তি করা হয়, তখন এ ধারণার বশবর্তী হয়ে করা হয় যে, যেহেতুসে মুসলমান জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে, অতএব সে নিশ্চিয়ই প্রকৃত মুসলমানই হবে। এর ফল এই হয়েছে যে, দলের সভ্য ও কর্মী থেকে আরম্ভ করে নেতা পর্যন্ত এমন অনেক লোক এ দলে অনুপ্রবেশ করেছে যে, চরিত্রের দিক দিয়ে তারা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয় এবং কোন মহান দায়িত্ব পালনের যোগ্যও নয়। কিন্তু আমরা আমাদের দলে কাউকে এ ধারণায় গ্রহণ করি না যে, ‘সে মুসলমানই হবে’। বরঞ্চ যখন সে কালেমায়ে তাইয়েবার অর্থ, মর্ম ও তার দাবি জেনে বুঝে তার উপর ঈমান আনার অঙ্গীকার করে, তখনই তাকে দলে গ্রহণ করি। যোগদান করার পর দলের সদস্য হয়ে থাকবার জন্যে অবশ্য পালনীয় শর্ত হচ্ছে এই যে, ঈমান যে সব বিষয়ে সর্বনিম্ন দাবি করে তা তাকে পূরণ করতে হবে। এভাবে ইনশাআল্লাহ মুসলমান জাতির মধ্য থেকে শুধুমাত্র সৎ ব্যক্তিই বাছাই হয়ে এ দলে যোগদান করবে।” এমনি করে একটা ইসলামী দল গঠনের কারণ, তার সংগঠন পদ্ধতি এবং অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে তার তুলনামূলক পার্থক্য বিশ্লেষণ করার পর মাওলানা মওদূদী জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের খসড়া পাঠ করেন। অবশ্য এর ছাপানো কপি একদিন পূর্বে সকলকে বিতরণ করা হয়েছিল। পূর্ণ আলোচনার পর যৎসামান্য সংশোধনীসহ গঠনতন্ত্র সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অতঃপর মাওলানা মওদূদী দাঁড়িয়ে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করেন এবং সমবেত সকলকে সম্বোধন করে ঘোষণা করেন, “আপনারা সকলে সাক্ষী থাকুন যে, আমি নতুন করে ঈমান আনছি এবং জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করছি।” এরপর একে একে সকলেই কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে জামায়াতে শরীক হওয়ার ঘোষণা করেন। সর্বপ্রথম পঁচাত্তর জন লোক জামায়াতে ইসলামীতে শামিল হন এবং তাদেরকে নিয়েই জামায়াতে ইসলামীর পত্তন হয়। মাওলানা মওদূদী সর্বসম্মতিক্রমে জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন। আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর মাওলান মওদূদী তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন, “আমি আপনাদের মধ্যে না সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, আর না সর্বাপেক্ষা মুত্তাকী। অন্য কোন দিক দিয়েও আপনাদের উপর আমার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কিন্তু যখন আমার উপর আস্থা স্থাপন করে আপনারা এ বিরাট কাজের দায়িত্ব আমার উপরে ব্যস্ত করেছেন, তখন আমি আল্লাহর কাছে এ দোয়াই করি এবং আপনারাও করুন, যেন এ দায়িত্ব পালনের শক্তি তিনি আমাকে দান করেন এবং আমার প্রতি আপনাদের আস্থাও অক্ষুন্ন রাখেন। আমি আমার সাধ্যমতো পরিপূর্ণ খোদাভীতি ও দায়িত্বানুভূতি সহকারে এ কাজ করার আগ্রাণ চেষ্টা করবো। আমি স্বেচ্ছায় আমার দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার অবহেলা করব না। আমি ইলম ও জ্ঞান অনুযায়ী আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পদাংক অনুরণ করে চলতে কোন ত্রুটি করব না। তারপরেও আমার কোন ত্রুটি বিচ্যুতি হলে এবং যদি আপনারা কেউ অনুভব করেন যে, আমি সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছি, তাহলে এমন ধারণা যেন পোষণ না করেন যে, এসব আমার ইচ্ছাকৃত। বরঞ্চ আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করে আমাকে সংশোধন করার চেষ্টা করবেন। যতক্ষণ আমি সঠিক পথে থাকবো আপনারা আমার সহযোগিতা করবেন, আমার কথা মেনে চলবেন, সৎ পরামর্শ দেবেন, সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করবেন এবং জামায়াতের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয় এমন কাজ থেকে দূরে থাকবেন। এ আন্দোলনের মহত্ত্ব এবং আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে আমার পূর্ণ অনুভূতি আছে। আমি জানি যে, এ এমন এক আন্দোলন যার নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন আল্লাহর মহান নবী-রাসূলগণ এবং নবুয়তের যুগ শেষ হওয়ার পর এমন সব অসাধারণ মানুষ এ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন যারা ছিলেন মানব সমাজের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ব্যক্তি। আমার নিজের সম্পর্কে এক মুহূর্তের জন্যেও আমার এ ভুল ধারণা নেই যে, এ মহান আন্দোলনের নেতৃত্বে যোগ্য আমি। বরং এটাকে আমি দুর্ভাগ্যজনক মনে করি যে, এ বিরাট কাজের জন্যে আমার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি আপনাদের চোখে পড়লো না। এ দ্বীনি আন্দোলন আমার জীবনের লক্ষ্য। আমার জীবন-মরণ এরই জন্যে। আর কেউ এ পথে চলুক বা না চলুক, আমাকে চলতেই হবে। এ পথে আমার সঙ্গে কেউ না চললে, একাকীই চলব। সারা দুনিয়া ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিরোধিতা করলে আমাকে তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং তার থেকে পশ্চাৎপদ হবো না।” আমীর নির্বাচনের পর ঐ ৭৫ জন মর্দে মুজাহিদ তাদের জামায়াত পরিচালনার জন্য নিজেদের মধ্য থেকে পরামর্শ সভা বা মজলিশে শুরা নির্বাচন করেন। এই মজলিশে শুরাই জামায়াতের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব রাখে।

২৬ আগস্ট, ২০২১

জামায়াত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস (২য় পর্ব)


পাঞ্জাবের চৌধুরি নিয়াজ আলী খান তার বিপুল সম্পত্তি দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি তার বন্ধুদের সাথে অনেক আলোচনা করেছেন। তারা সবাই তাকে আল্লামা ইকবালের কাছে যেতে বলেছেন। তিনি আল্লামা ইকবালের সাথে দেখা করে তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনার কথা জানান।

এদিকে আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীর তর্জুমানুল কুরআন নিয়মিত পড়েন। তিনি তর্জুমানুল কুরআন ও মাওলানা মওদূদীর ভক্ত হয়ে ওঠেন। আল্লামা ইকবালের কাছে নিয়াজ আলী খান আসলে তিনি মাওলানা মওদূদীকে দেখিয়ে দেন। মাওলানা মওদূদী কারো চাকুরি বা অনুগ্রহে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। কারণ এতে স্বাধীন সত্ত্বা থাকে না। ফরমায়েশি কাজ করতে হয়।

তাই নিয়াজ আলী খানের অনুরোধে আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীকে পত্র লিখে পাঞ্জাবে আসতে বলেন। ১৯৩৮ সালে চিঠিটি নিয়াজ আলী খান নিজেই দিল্লী গিয়ে মাওলানার হাতে দেন। আল্লামা ইকবালের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি মাওলানাকে চিঠি দেয়ায় মাওলানা হতবাক হয়ে যান। আল্লামা তাকে হায়দারাবাদ পরিত্যাগ করে পাঞ্জাবে চলে আসার আহ্বান জানান। মাওলানা মওদূদী কিছুদিন পরে আল্লামা ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বিষয়টির নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

নিয়াজ আলী খানের সম্পত্তি ছিল পাঞ্জাবের গ্রামে। সেই সম্পত্তি দিয়ে মাওলানা দারুল ইসলাম ট্রাস্ট গঠন করেন। যদিও শহর ছেড়ে গ্রামে আসা কষ্টকর তারপরও নিরাপদে গবেষণা করার জন্য দারুল ইসলাম ছিল একটি দারুণ স্থান। এই দারুল ইসলাম থেকে বের হয়েছে মাওলানা মওদূদীর দুটি শক্তিশালী বই। একটি 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' অন্যটি ‘মুসলমান আওর মওজুদা সিয়াসী কাশমকাশ'। এগুলো বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বাংলায় এগুলো 'ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ' অন্যটি 'রাজনৈতিক সংঘাতের কবলে মুসলমান' নামে অনুবাদ হয়েছে। দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাওলানার জীবিকা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। তিনি নিবিষ্ট মনে কাজ করতে পেরেছেন।

এই বই দুটি তৎকালীন মুসলিমদেরকে রাজনৈতিকভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল। কংগ্রেসের সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে মুসলিমদের বিশেষত আলেমদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছিল। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আলেমরা যখন হিন্দু মুসলিম এক জাতি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছিল তখন এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেন।

১৯৩৮ সালে হুসাইন মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হলো।

১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য এ জাতিগত ঐক্যের চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি, বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আর এক ধাপ এগিয়ে বলেন,“ আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে। এতএব হিন্দু মুসলিম এক জাতি, আমরা সবাই ভারতীয়”

ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসার আলেমদেরকে তো দেওবন্দীরা পাত্তাই দিত না।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত গবেষণানির্ভর বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

মাওলানা মওদূদী রহ. বলেন, অমুসলিম জাতি সমূহের সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্কের দু’টি দিক রয়েছে। প্রথমটি এই যে মানুষ হওয়ার দিক দিয়ে মসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। আর দ্বিতীয়টি এই যে, ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য হেতু আমাদেরকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে দেয়া হয়েছে। প্রথম সম্পর্কের দিক দিয়ে মুসলিমরা তাদের সাথে সহানুভূতি, দয়া ঔদার্য ও সৌজন্যের ব্যবহার করবে।

কারণ মানবতার দিক দিয়ে এরূপ ব্যবহারই তারা পেতে পারে। এমনকি তারা যদি ইসলামের দুশমন না হয়, তাহলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব, সন্ধি এবং মিলিত উদ্দেশ্যের (Common Cause) সহযেগিতাও করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার বস্তুগত ও বৈষয়িক সম্পর্ক তাদেরকে ও আমাদেরকে মিলিত করে ‘একজাতি’ বানিয়ে দিতে পারেনা।

তিনি আরো বলেন, যেসব গন্ডীবদ্ধ, জড় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও কুসংস্কারপূর্ণ ভিত্তির উপর দুনিয়ার বিভিন্ন জাতীয়তার প্রাসাদ গড়ে উঠেছে আল্লাহ ও তাঁর রসুল তা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেন। বর্ণ, গোত্র, জন্মভূমি, অর্থনীতি ও রাজনীতিক অবৈজ্ঞানিক বিরোধ ও বৈষম্যের ভিত্তিতে মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও চরম অজ্ঞতার দরুণ মানবতাকে বিভিন্ন ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত করেছিল, ইসলাম তার সবগুলোকে আঘাতে চূর্ণ করে দেয় এবং মানবতার দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষকে সমশ্রেণীর সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমানাধিকার প্রধান করেছে।

ইসলামী জাতীয়তায় মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য বিধান পেশ করা হয় যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয়মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানব জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

যারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে,তারা এক জাতি হিসাবে গণ্য হবে আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে, তারা সম্পুর্ণ ভ্ন্নি জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমস্ত ব্যক্তিসমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। মুসলিম ও মুশরিক কখনো এক জাতি হতে পারে না।

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য।

যেহেতু মুসলিম ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপরেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে। কুরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে। যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি।

মাওলানা মওদূদীর এই বই মুসলিম সমাজে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। দেওবন্দী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতি মুসলিমদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বইয়ের প্রভাবে জমিয়তে উলামায় হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে একটি দল। তারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নতুন দল করেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবিও এই নতুন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

মাওলানার এই বইগুলো পাকিস্তান আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন সভা সেমিনারে মাওলানার বক্তব্যও পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে যায়। মাওলানা মওদূদী সফলভাবে মুসলিম লীগের নিছক রাজনৈতিক দাবিকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে সক্ষম হন। কিন্তু তারপরও মাওলানা কখনোই মুসলিম লীগে যোগ দেননি। মুসলিমদের জন্য আলাদা আবাসভূমি জরুরি মনে করলেও যাদের নেতৃত্বে এই কাজটি হচ্ছে তারা ইসলামকে ধারণ করতেন না বলেই মাওলানা মনে করতেন।

মুসলিম লীগ নেতা মাওলানা জাফর আহমদ আনসারী বলেন, .

এ বিষয়বস্তুর উপরে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী সাহেব মাসয়ালায়ে কওমিয়াত শীর্ষক এক ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। অকাট্য যুক্তি-প্রমাণাদি ও শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গির দরুণ প্রবন্ধটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুততার সাথে মুসলমানদের মধ্যে এ এক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে পড়ে। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফলে একজাতীয়তার ধারণা বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় এবং স্বতন্ত্র জাতিতত্ত্বের অনুভূতি মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যুত বেগে সঞ্চারিত হয়।

জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে এ একটা নিছক আদর্শিক বিতর্ক-আলোচনা ছিল না, বরং এ কংগ্রেস ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের স্বপ্ন প্রাসাদ ভেঙ্গে দিয়েছিল। মুসলমানদের অন্তর থেকে স্বতন্ত্র জাতিতত্ত্বের অনুভূতি কোন প্রকারে বিদূরিত করে তাদের জাতীয় অস্তিত্বের মূলকে অন্তঃসারশূন্য করে দেয়াই ছিল হিন্দুদের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক কৌশল। স্বয়ং মুসলিম লীগ এ বিতর্ক আলোচনায় ধর্মীয় দিকটা বেশি করে ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করছিল, যাতে জনসাধারণ কংগ্রেসের খেলা ধরে ফেলতে পারে এবং তাদের দ্বীন ও ঈমানের দবি পূরণের জন্য প্রবৃত্ত হতে পারে।”

লাহোর থেকে প্রকাশিত ইকদাম পত্রিকার সাংবাদিক মিয়া মুহাম্মদ শফি বলেন,

“মাওলানা মওদূদী তো প্রকৃতপক্ষে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দুশমন ছিলেন। আমি পূর্ণ দায়িত্বের সাথে একথা বলছি যে, আমি আল্লামা ইকবালকে একথা বলতে শুনতাম, “মওদূদী এসব কংগ্রেসী মুসলমানদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে।” আল্লামা ইকবাল আযাদ (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ) ও মাদানির (মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী) সুস্পষ্ট ভাষায় সমালোচনা করতেন।

২৫ আগস্ট, ২০২১

জামায়াত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ১ম পর্ব




২৬ আগস্ট জামায়াতের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কীভাবে মুসলিমদের এই জামায়াত প্রতিষ্ঠা হয়েছে সে আলোচনার করতে গেলে এর প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়েই শুরু করতে হয়। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদূদীর জন্ম ১৯০৩ সালে। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত মেধার সাক্ষর রেখেছেন তিনি। ১৯১৮ সালে তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর তখন তিনি বিজনৌর থেকে প্রকাশিত পত্রিকা 'মদিনা'য় কাজ শুরু করেন। অল্প বয়সেই সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধহস্ত হয়েছিলেন। 

কিছুদিন মদিনায় কাজ করার পর তিনি জীবিকা অন্বেষণে দিল্লিতে চলে যান। সেখানে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু মনমতো দল পাচ্ছিলেন না যারা একইসাথে ব্রিটিশদের খেদাবে ও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি “আনজুমানে এয়ানাতে নযরবন্দানে ইসলাম” নামে একটি ছোট দলের সন্ধান পান যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছিলেন। তিনি এই দলের কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। 

এরপর তিনি 'তাজ' পত্রিকায় সম্পাদকের কাজ পান। এটি মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর থেকে প্রকাশিত হতো। তিনি জব্বলপুরে চলে আসেন। এসময় খিলাফত আন্দোলন শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। জব্বলপুরের অভিজ্ঞতা ও খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ সম্পর্কে  মাওলানা মওদূদী বলেন,  

“সে সময় এখানে মুসলমানদের পক্ষ থেকে জনসভায় কিছু বলার কোনো লোক ছিল না। বাধ্য হয়ে আমাকেই এ কাজ করতে হয়। এতে আমার দু’টি বড়ো উপকার হয়েছিল। প্রথমটি এই যে, আমার মধ্যে বিরাট আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল যা পূর্বে ছিল না। পূর্বে কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ করতে সাহস করতাম না। কিন্তু জব্বলপুরে যখন অপরের সাহায্য ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ একাকী এবং সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে সাংবাদিকতা ও জনসেবার কাজ শুরু করলাম, তখন অনুভব করলাম যে, আমার মধ্যে এমন কিছু শক্তি লুকায়িত আছে, যা প্রয়োজনের সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তারপর থেকে কোনো দায়িত্ব গ্রহণের কখনো দ্বিধাবোধ করিনি।

দ্বিতীয় উপকার এই যে, আমি আমার জীবনে একেবারে আত্মনির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। ইতোপূর্বে আমি কোন না কোন আত্মীয় বন্ধুর সাথে একত্রে বাস করতাম এবং অপরের উপর নির্ভর করার দুর্বলতা কিয়ৎ পরিমান হলেও আমার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু জব্বলপুরে আত্মনির্ভরশীল হয়ে কাজ করতে পেরেছি।”

মাওলানা মওদূদী অল্প বয়সেই জনগণের মধ্যে উদ্দীপনা ও অদম্য প্রেরণা সৃস্টি করার ভাষাজ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। তাঁর পূর্বাপর কথার মধ্যে ছিল পরিপূর্ণ ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য। সে সময়ে ব্রিটিশ কর্তৃক তুরস্কের প্রতি যে চরম অবিচার করা হয়েছিল, তিনি সেজন্যে ব্রিটিশের তীব্র সমালোচনা করে দীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন। যার ফলে ‘তাজের’ প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। এর মাধ্যমে মাওলানা মওদূদীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। 

খেলাফত আন্দোলনের সময়ে হিন্দুস্থানে হিজরত আন্দোলনও শুরু হয়। মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯২০ সালে রাঁচী জেল থেকে মুক্তিলাভের পর হিজরত আন্দোলন শুরু করেন।  তার অনুসারী কওমী আলেমগণ ফতোয়া দিতে শুরু করেন, 'ভারত দারুল হারব এবং এখান থেকে হিজরত করে কোন দারুল ইসলামে যেতে হবে'। অথচ তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে এতদিন মুসলিম লীগের বিরোধীতা করে আসছিলেন। জেলখানায় গিয়ে তার জাতীয়তাবাদ ছুটে যায়। 

মওলানা আজাদের আহ্বানে বহু মুসলমান হিজরতের জন্যে বদ্ধপরিকর হয়। দিল্লীতে হিজরত কমিটি প্রতিষ্ঠিত হলো এবং যথারীতি অফিস খোলা হলো। এই আন্দোলন যেহেতু মওলানা আজাদ আহ্বান করেছেন তাই আফগানিস্তানে যাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মুসলিম প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলো, তারা তাদের সকল সহায় সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেশত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিলো। ১৯২০ সালের কেবলমাত্র আগস্ট মাসেই আঠারো হাজার মুসলিম হিজরত করে চলে যায়। এই মানুষগুলোর কোনো ব্যবস্থা হয় না আফগানে। তারা অবর্ণনীয় জিল্লতির শিকার হয়। 

এদিকে প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান আফগানে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের ভিটেমাটি বিক্রয় করেছিলো। এ আন্দোলনের পেছনে ছিলো মূলত মওলানা আবুল কালাম আজাদের হুজুগ বা  ঝোঁকপ্রবণতা। কোন একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছাড়াই এবং হিজরতের ফলাফল বিচার বিশ্লেষণ না করেই এ আন্দোলনে ঝাঁপ দেওয়া হয়েছিল।

হিজরত কমিটির সেক্রেটারি তাজাম্মল হোসেন ছিলেন মাওলানা মওদূদীর আত্মীয়। তিনি মাওলানাকে হিজরতের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। মাওলানা হিজরত কমিটির সাথে আলোচনা করে দেখেন তাদের কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। দলে দলে লোক আফগানিস্তানে চলে গেলেও আফগান সরকারের সাথে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলা হয়নি। মুফতী কেফায়েতুল্লাহ ও মওলানা আহমদ সাঈদ এ ব্যাপারে ছিলেন দায়িত্বশীল। মওদূদী সাহেব এ দুজনের সাথে দেখা করে একটি পরিকল্পনাহীন আন্দোলনের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো দেখিয়ে দেন। 

তারা ত্রুটি স্বীকার করে মাওলানা মওদুদী সাহেবকে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্যে অনুরোধ করেন। মওদূদী সাহেব বলেন সর্বপ্রথম আফগান সরকারের নিকটে শুনতে হবে যে তাঁরা হিন্দুস্তান থেকে হিজরতকারীদের পুনর্বাসনের জন্যে রাজী আছেন কিনা এবং পুনর্বাসের পন্থাই বা কি হবে। আফগান রাষ্ট্রদূতের সংগে আলাপ করা হলো। তিনি বলেন, তাঁর সরকার বর্তমানে খুবই বিব্রত বোধ করছেন। যারা ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে চলে গেছে তাদেরকে ফেরৎ পাঠাতে অবশ্য সরকার দ্বিধাবোধ করছেন। কিন্তু তথাপি তাদের বোঝা বহন করা সরকারের সাধ্যের অতীত’।

এরপর হিজরত কমিটি হতাশ হয়ে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। আফগানিস্তানের আমীরও মুসলিমদের আফগানিস্তানে যাওয়া রুখতে বলেন। সবমিলিয়ে এই আন্দোলন চরমভাবে ব্যর্থ হয়। উদ্বাস্তু হয় পনের থেকে বিশ লক্ষ মুসলিম। তাদের দুর্দশা চরমে পৌঁছায়। তবে আন্দোলন আহ্বানকারী মাওলানা আজাদের খুব একটা ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না। এরপর ১৯২৩ সালে তিনি কংগ্রসের সভাপতি হয়ে ভুলে যান মুসলিমদের অধিকার ও দুঃখ দুর্দশার কথা। তিনি থাকেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নিয়ে।

যাই হোক তাজ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে মাওলানা মওদূদী দিল্লীতে যান। সেখানে মাওলানা মুফতী কেফায়েতুল্লাহ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আহমদ সাঈদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁরা জমিয়তের পক্ষ থেকে ‘মুসলিম’ নাম দিয়ে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং মাওলানা মওদূদীর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন মাওলানা। এখানে থাকাকালে মাওলানা জ্ঞানর্জনে মনোনিবেশ করেন। তিনি দিল্লীর দারুল উলুম ফতেহপুর অনেকগুলো বিষয়ে সনদ অর্জন করেন। ১৯২৩ সালে মুসলিম পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে ১৯২৪ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ 'আল জমিয়ত' নতুন পত্রিকা শুরু করে। মাওলানা এই পত্রিকার সম্পাদনা করতে থাকেন।  

১৯২৬ সালের শেষ ভাগে শুদ্ধি আন্দোলনের প্রবর্তক ও নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ এক মুসলমান আততায়ীর হাতে নিহত হয়। এর ফলে ভারতের হিন্দুসমাজ অতিমাত্রায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক অভিযান শুরু হয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে। তারা প্রচার করেন যে, ইসলাম তার অনুসারীদের হত্যায় উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি মোহনদাস গান্ধী পর্যন্ত এই দাঙ্গা উস্কে দেয়। এক বিবৃতির মাধ্যমে সে জানায়, "অতীতে তরবারীর সাহায্যেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে এবং বর্তমানকালেও তাই হচ্ছে"। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের প্রচারণা ভারতের আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে এবং বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্রপাত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর এ সমস্ত ভিত্তিহীন এবং উস্কানীমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে গিয়ে অতীব দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আহা! আজ যদি ভারতে এমন কোনো মর্দে মুজাহিদ আল্লাহর বান্দা থাকতো, যে তাদের এসব হীন প্রচারণার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারতো, তাহলে কতই না ভাল হতো!”

তরুণ মাওলানা মওদূদী দিল্লী জামে মসজিদের উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সময়ে তিনি ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯২৭ সালের প্রথম থেকেই তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে “আল জিহাদু ফিল ইসলাম” শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। এটাই মাওলানা মওদূদীর প্রথম বই। এই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ও বহু ভাষায় অনূদিত হয়। 

আল্লামা ইকবাল এই বই সম্পর্কে বলেন, “জিহাদ, যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কে ইসলামী আইন-কানুন সম্বলিত এ বইটি অভিনব ও চমৎকার হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও সুধী ব্যক্তিকে গ্রন্থখানি পাঠ করতে অনুরোধ করি।”

১৯২৮ সাল থেকে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাথে মাওলানা মওদূদীর মতবিরোধ তৈরি হয়। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ছিল দেওবন্দি আলেমদের সংগঠন। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে এই সংগঠন মুসলিম লীগের বিরোধীতা করতে থাকে ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন জাতীয় কংগ্রেসের সকল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিতে থাকে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ওপর মাওলানা আজাদের প্রভাব ছিল বলে এই ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে। আলেমদের পত্রিকা 'আল জমিয়ত' হিন্দুদের সংগঠন কংগ্রেসের মুখপাত্রে পরিণত হতে থাকে। এই প্রেক্ষিতে ১৯২৮ সালে তিনি আল জমিয়তের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। 

এখান থেকেই শুরু হয় মাওলানার সাথে দেওবন্দী আলেমদের বিরোধ। হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেসপন্থী আলেমরা মাওলানার নামে শত কুৎসা ও অপবাদ রটাতে থাকে। যার ধারাবাহিকতা আজো বিদ্যমান। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত মাওলানা আর কোনো পত্রিকার সাথে যুক্ত হননি। এর মধ্যে তিনি পড়াশোনায় রত ছিলেন। জ্ঞানর্জনের এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একটি আন্দোলন দাঁড় করাতে হবে। এর অংশ হিসেবে তিনি ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ও প্রকাশ করেন মাসিক “তর্জুমানুল কোরআন” নামে একটি পত্রিকা। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের ব্যাপারে মুসলিমদের সচেতন করে তুলেন। 

এই পত্রিকার মাধ্যমে মাওলানা ইসলামের মর্মকথা পৌঁছে দেন বহু মানুষের কাছে। এর মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন আল্লামা ইকবাল। তার হাত ধরে এই মাওলানার এই আন্দোলন একটি শক্তিশালী নুসরাহ পায়।        

২৪ আগস্ট, ২০২১

পর্ব : ৩৫ - আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও রাষ্ট্রের গোপন তথ্য

 


অষ্টম হিজরিতে মুতার যুদ্ধের পর মুসলিমদের বীরত্বের কথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লো। মুহাম্মদ সা.-সহ মুসলিমরা তাবলিগ ও তারবিয়াতে সময় ব্যয় করতে থাকলো। এসময় মক্কায় একটি ঘটনা ঘটে। যার ফলে কুরাইশরা হুদায়বিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করে। হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুসারে আরবের যে কোনো গোত্র মুসলিম অথবা মুশরিকদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে। যারা মুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তাদের ওপর কুরাইশরা আক্রমন করতে পারবে না। আবার যারা কুরাইশদের সাথে বন্ধুত্ব করবে মুসলিমরা তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারবে না। 

হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুসারে মক্কার বনু খুজায়া গোত্র মুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করে আর বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে বন্ধুত্ব করে। বনু বকর ও বনু খুজায়ার মধ্যে বহু আগ থেকেই ঝামেলা চলে আসছিল। সন্ধির পর তারা উভয়েই যুদ্ধাবস্থা থেকে মুক্ত ছিল। তাই তারা মুক্তভাবে বিনা প্রস্তুতিতে চলাফেরা করতে থাকলো।

এমন সময়ে এক রাতে বনু বকরের একজন নওফেল ইবনে মুয়াবিয়া বনু খুজায়া গোত্রের একজনকে হাতের কাছে পেয়ে হত্যা করে। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। উভয় গোত্র অন্যান্য গোত্রের সাথে দল পাকিয়ে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হলো। কুরাইশরা এই সময় বনু বকরকে অস্ত্র দিল এবং তাদের সহযোগিতায় কুরাইশদের অনেকেই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে বনু খুজায়ার সাথে যুদ্ধ করলো। দিশেহারা হয়ে খুজায়া গোত্র মসজিদুল হারামের নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে আশ্রয় নিল। সেখানেও তারা বনু বকরের আক্রমণের শিকার হলো। 

বনু খুজায়ার লোকেরা মক্কায় তাদের এক মিত্র বুদাইল ইবনে ওয়ারাকার কাছে আশ্রয় নেয়। তারপরও বনু খুজায়ার ওপর আক্রমণ বন্ধ হয়নি। অবশেষে কুরাইশদের সহায়তায় বনু খুজায়ার কয়েকজনকে হত্যা করে বনু বকর। এই খবর রাসূল সা.-এর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে বনু খুজায়া। রাসূল সা. তাদের সাহায্য করার আশ্বাস দেন।

এরপর বুদাইল বিন ওয়ারাকা (যিনি খুজায়াদের আশ্রয় দিয়েছেন) বনু খুজায়ার কতিপয় লোককে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে সাক্ষাত করলো। তাঁকে তাদের বিপদ মুসিবতের কথা এবং কুরাইশরা বনু বকরকে তাদের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নির্যাতন চালাচ্ছে তার কথা অবহিত করলো। অতঃপর মক্কায় ফিরে গেল। মুহাম্মদ সা. মুসলমানদেরকে জানালেন, “তোমরা ধরে নিতে পার যে, আবু সুফিয়ান তোমাদের কাছে এসেছে এবং সন্ধি চুক্তি অলংঘনীয় করা ও তার মেয়াদ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দিয়েছে।” নবীজি এই আগাম কথা বললেন এই কারণে যে, তিনি ৭ম হিজরিতে কাজা উমরাহ করার সময় কুরাইশদের নেতৃত্বহীন অবস্থায় দেখেছেন। তাদের পক্ষে এসময় মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার মনোবল নেই। 

এদিকে মক্কার মুশরিকরা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে মিটিং করে। তখন সবাই আবু সুফিয়ানকে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে দেখা করে সন্ধি বহাল রাখা ও এর সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিল। কারণ তারা মুসলিমদের ভয় পেয়েছে। মুতার যুদ্ধের যারা হেরাক্লিয়াসের সাথে যুদ্ধ করে তারা মক্কার কুরাইশদের উড়িয়ে দেবে এই ভয়ে তারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়নি।   

তারপর আবু সুফিয়ান রওনা হয়ে মদিনায় মুহাম্মদ সা.-এর নিকট দেখা করতে আসলো। এসে নিজের কন্যা ও মুহাম্মদ সা.-এর স্ত্রী উম্মে হাবিবার কাছে গেল। আবু সুফিয়ান মুহাম্মদ সা.-এর বিছানায় বসার উপক্রম হতেই উম্মে হাবিবা বিছানা গুটিয়ে ফেললেন। তা দেখে আবু সুফিয়ান বললো, “হে আমার কন্যা! তুমি কি আমাকে ঐ বিছানায় বসার যোগ্য মনে করোনি?” উম্মে হাবীবা বললেন, “ওটা মুহাম্মদ সা.-এর বিছানা। আর আপনি একজন মুশরিক, অপবিত্র। আমি চাই না যে, আপনি মুহাম্মদ সা.-এর বিছানায় বসেন।” আবু সুফিয়ান বললো, “হে আমার কন্যা! আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর তুমি খারাপ হয়ে গিয়েছো।”

আবু সুফিয়ান এরপর মুহাম্মদ সা.-এর নিকট হাজির হলো এবং কথা বললো। কিন্তু নবীজি শুধু শুনলেন। তার কোনো কথার জবাব দিলেন না। অতঃপর সে আবু বকর রা.-এর নিকট গিয়ে এ মর্মে অনুরোধ করলো যাতে তিনি নবীজির কাছে তার সম্পর্কে সুপারিশ করেন। আবু বকর রা. এ অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন।

অতঃপর সে উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর নিকট গিয়ে অনুরূপ অনুরোধ করলো। উমার বললেন “কি বলছো? আমি তোমার সম্পর্কে মুহাম্মদ সা.-এর নিকট সুপারিশ করবো? আমি যদি ছোট কাঠ ছাড়া আর কিছু না পাই তবে তা দিয়েই তোমার সাথে লড়াই করবো।”

এরপর সে আলী ইবনে আবু তালিব রা. নিকট গেল। সে বললো, “হে আলী! তুমি আমার প্রতি সর্বাধিক দয়ালু। আমি তোমার কাছে এসেছি একটা বিশেষ প্রয়োজনে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে চাই না। কাজেই তুমি আমার জন্য মুহাম্মদ সা.-এর নিকট সুপারিশ করো।” তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সা. একটা ব্যাপারে সংকল্প গ্রহণ করেছেন, আমরা সে সম্পর্কে তাঁর সাথে কথা বলতে পারি না।”

আবু সুফিয়ান বললো, “হে আলী! আমি দেখছি পরিস্থিতি আমার প্রতিকূল। এখন আমাকে একটা সদুপদেশ দাও।” আলী রা. বললেন, “তোমার উপকারে আসবে এমন কোনো উপদেশ আমার জানা নেই। তবে তুমি তো বনু কিনানা গোত্রের নেতা। তুমি যাও, লোকজনকে রক্ষা কর। অতঃপর তোমার জন্মস্থানে অবস্থান করতে থাকো।” সে বললো, “এতে আমার শেষ রক্ষা হবে তো?” আলী রা. বললেন, “তা আমার মনে হয় না। তবে এ ছাড়া তোমার জন্য আর কোন উপায়ও দেখছি না।” 

অতঃপর আবু সুফিয়ান মসজিদে নববীর সামনে গিয়ে ঘোষণা করলো “হে জনতা! আমি সকল মক্কাবাসীর রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছি।” এই বলেই সে উটে চড়ে প্রস্থান করলো। কুরাইশদের কাছে গেলে তারা জিজ্ঞোস করলো, “কি করে এসেছো?” সে মক্কাবাসীদের সব কথা জানালো।

মুহাম্মদ সা. মদিনায় সকল মুসলমান এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন কিন্তু কোথায় যাবেন তা বলেন নি। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদেরকে সুষ্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি মক্কা অভিমুখে যাত্রা করতে যাচ্ছেন। তিনি সবাইকে সফরের জন্য তৈরি হতে বললেন। এই সফরের খবর যাতে গোপন থাকে বিশেষত মক্কার লোকেরা যাতে না জানে এই ব্যাপারেও সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন। তিনি মহান মালিকের কাছে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! কুরাইশদের থেকে আমাদের প্রস্তুতির যাবতীয় খবর গোপন রাখুন যাতে আমরা তাদের ওপর আকস্মিকভাবে গিয়ে চড়াও হতে পারি।” মুসলমানগণ অল্পক্ষনের মাধ্যেই তৈরি হলেন অভিযানের জন্য।

একজন মুহাজির সাহাবী নাম হাতিব ইবনে আবি বালতায়া রা.। তিনি রাসূল সা.-এর মক্কা আক্রমণের বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। এরপর থেকেই তার মনে অস্থিরতা শুরু হয়। কারণ মক্কায় তার পরিবার পরিজন রয়েছে।তাঁর সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ মক্কাতেই ছিল। তবে তিনি নিজে কুরাইশদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। শুধু তিনি হযরত উসমান রা.-এর মিত্র ছিলেন, এ জন্যেই মক্কায় তিনি নিরাপত্তা লাভ করেছিলেন। অতঃপর তিনি হিজরত করে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে মদিনায় অবস্থান করছিলেন। 

এই যখন পরিস্থিতি তখন মক্কা থেকে একজন মহিলা আসলো। সে আগে মহানবী সা.-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের দাসী ছিল। কিন্তু পরে দাসত্ব শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে গানবাদ্য করে বেড়াত। নবীর সা. কাছে এসে সে তার দারিদ্রের কথা বলল এবং কিছু অর্থ সাহায্য চাইলো। নবী সা. বনী মুত্তালিবের লোকদের কাছে থেকে কিছু অর্থ চেয়ে দিয়ে তার অভাব পূরণ করলেন। সে মক্কায় ফিরে যাচ্ছিলো। এ ব্যাপারটির সুযোগ নিয়েছিলেন হাতিব ইবনে আবি বালতায়া রা.। তিনি ঐ মহিলার সাথে দেখা করলেন এবং কুরাইশ নেতাদের নামে লেখা একটি চিঠি তাকে দিলেন। আর সে যাতে এই গোপনীয় বিষয়টি প্রকাশ না করে এবং গোপনে তাদের কাছে পৌঁছে দেয় সে জন্য তিনি তাকে দশটি দিনারও দিলেন। মহিলাটি সবেমাত্র মদিনা থেকে রওনা হয়েছিল। ইতোমধ্যে আল্লাহ তা'আলা এই বিষয়টি নবী সা.-কে অবহিত করলেন। 

রাসূল সা. তৎক্ষণাৎ হযরত আলী, হযরত যুবায়ের এবং হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদকে তার সন্ধানে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও। মহিলাটিকে ধরো। তার কাছে মুশরিকদের নামে হাতেবের একটি চিঠি আছে। যেভাবেই হোক তার নিকট থেকে সেই চিঠিটি নিয়ে এসো। সে যদি পত্রখানা দিয়ে দেয় তাহলে তাকে ছেড়ে দেবে। আর যদি না দেয় তাহলে তাকে হত্যা করবে। 

আলী রা.-এর দল মদীনা থেকে ১২ মাইল দূরে মহিলাটির দেখা পেলেন। তাঁরা তার কাছে পত্রখানা চাইলেন। কিন্তু সে অস্বীকার করে বললো, আমার কাছে কোনো পত্র নেই। তাঁরা তার থলে তাল্লাশী করলেন। কিন্তু কোন পত্র পাওয়া গেল না। অবশেষে তারা বললেন, পত্রখানা আমাদের দিয়ে দাও তা না হলে আমরা তোমাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশী নেব। সে যখন বুঝতে পরলো রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই তখন সে তার চুলের খোঁপার ভেতর থেকে চিঠি বের করে দিলো। আর আলী রা.-এর দল তা নিয়ে নবী সা.-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। চিঠিটি খুলে পড়া হলো। দেখা গেলো তাতে কুরাইশদের জানানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সা. তোমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

মহানবী সা. হযরত হাতেবকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি একি করেছো? তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি আমার ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি যা করেছি তা এ জন্য করি নাই যে, আমি কাফের বা মুরতাদ হয়ে গিয়েছি এবং ইসলামকে পরিত্যাগ করে এখন কুফরকে ভালবাসতে শুরু করেছি। প্রকৃত ব্যাপার হলো, আমার আপনজনেরা সব মক্কায় অবস্থান করছে। আমি কুরাইশ গোত্রের লোক নই। বরং কুরাইশদের কারো কারো পৃষ্ঠপোষকতা ও ছত্রছায়ায় আমি সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলাম। অন্য যেসব মুহাজিরের পরিবার-পরিজন মক্কায় অবস্থান করছে তাদের গোত্র তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু আমার পরিবার -পরিজনকে রক্ষা করার মত কেউই সেখানে নেই। তাই আমি এই পত্র লিখেছিলাম। আমি মনে করেছিলাম, এটা হবে কুরাইশদের প্রতি আমার একটা অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহের কথা মনে করে তারা আমার সন্তানদের ওপর নির্যাতন চালাবে না। 

হাতেবের এই বক্তব্যে শুনে রসূলুল্লাহ সা. উপস্থিত সবাইকে বললেন, হাতেব তোমাদের কাছে সত্য কথাই বলেছে। অর্থাৎ এটিই তার এই কাজের মূল কারণ। ইসলামকে পরিত্যাগ বা কুফরকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থেকে কাজটি হয়নি। 

হযরত উমর উঠে বললেন, হে আল্লাহর রসূল সা.! আমাকে অনুমতি দিন। আমি এই মুনাফিকের শিরচ্ছেদ করি। সে আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। 
নবী করিম সা. বললেন, এ ব্যক্তি তো বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তোমরা তো জানো না, হয়তো আল্লাহ তা'আলা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের বিষয় বিবেচনা করে বলে দিয়েছেন, তোমরা যাই করো না কেন আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দিয়েছেন। একথা শুনে হযরত উমর রা. বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই সর্বাধিক জানেন। তাদের কথাই চূড়ান্ত। 

যতদূর জানা যায় হযরত হাতেব রা.-এর এই ওজর শোনার পর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। তবে মহান রাব্বুল আলামীন এই বিষয়টিকে আমাদের জন্য শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে রেখে দিয়েছেন। তিনি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সূরা মুমতাহিনা নাজিল করেছেন। সেখানে আল্লাহ আমাদের এইসব অপরাধ করা থেকে সতর্ক করে দিয়েছে। হযরত হাতেব রা. শুধু তার পরিবার পরিজনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রসূলুল্লাহ সা. এর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গোপন সামরিক তথ্য শত্রুদের জানিয়ে দেয়ার চেষ্ট করেছিলেন। এটি যথাসময়ের ব্যর্থ করে দেওয়া না গেলে মক্কা বিজয়ের সময় ব্যাপক রক্তপাত হতো। মুসলমানদেরও বহু মূল্যবান প্রাণ নষ্ট হতে পারতো এবং কুরাইশদেরও এমন বহু লোক মারা যেতো, যাদের দ্বারা পরবর্তী সময়ে ইসলামের ব্যাপক খেদমত পাওয়া গিয়েছিল। 

শান্তিপূর্ণ উপায়ে মক্কা বিজিত হওয়ায় যেসব সুফল অর্জিত হয়েছে তা সবই পণ্ড হয়ে যেতে পারতো। এসব বিরাট ও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হতো শুধু এ কারণে যে, মুসলমানদেরই এক ব্যক্তি যুদ্ধের বিপদ থেকে নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছিল। সূরা মুমতাহিনাতে হাতেব রা.-এর এ কাজের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। মারাত্মক এই ভুল সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ তা’আলা সমস্ত ঈমানদারদের এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো ঈমানদারের কোন অবস্থায় কোন উদ্দেশ্যেই ইসলামের শত্রু কাফেরদের সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখা উচিত। এবং এমন কোন কাজও না করা উচিত যা কুফর ও ইসলামের সংঘাতে কাফেরদের জন্য সুফল বয়ে আনে। 

মহান রাব্বুল আলামীন বলেন সূরা মুমতাহিনার ১ ও ২ নং আয়াতে বলেন, 
// হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করো না, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা তারা অস্বীকার করেছে এবং রাসূলকে ও তোমাদেরকে বের করে দিয়েছে এজন্য যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। তোমরা যদি আমার পথে সংগ্রামে ও আমার সন্তুষ্টির সন্ধানে বের হও (তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না)। তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ করো, অথচ তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো তা আমি জানি। তোমাদের মধ্যে যে এমন করবে সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হবে। তাদের আচরণ হলো, তারা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে তাহলে তোমাদের সাথে শত্রুতা করবে। হাত ও জিহবা দ্বারা তোমাদের কষ্ট দেবে। তারা চায় যে, কোনক্রমে তোমরা কাফের হয়ে যাও।// 

যাদের জন্য এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তারা কিয়ামতের দিন কোনো কাজে আসবে না এই মর্মে আল্লাহ ৩ নং আয়াতে বলেন, 
//কিয়ামতের দিন তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন কোনো কাজে আসবে না, সন্তান-সন্তুতি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন আল্লাহ তোমাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেবেন। আর তিনিই তোমাদের আমল বা কর্মফল দেখবেন।// 

নিশ্চয়ই আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা সহজ নয়। এটা খুবই কঠিন। মহান রাব্বুল আলামীন মুমিনদের তাই সান্তনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ৭ ও ৮ নং আয়াতে বলেন,
//অসম্ভব নয় যে, আজ তোমরা যাদের শত্রু বানিয়ে নিয়েছো আল্লাহ তা’আলা তাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন এক সময় বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমতাবান। আর তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়। যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে লড়াই করেনি এবং বাড়ীঘর থেকে তোমাদের তাড়িয়ে দেয়নি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায় বিচারকারীদের পছন্দ করেন।//

সবশেষে কোনো অবস্থায়ই জালিমদের বন্ধু বানানো যাবে না এই মর্মে মহান আল্লাহ তায়ালা আবারো ৯ নং আয়াতে সতর্ক করে দিয়েছেন শুধু তাই নয় তিনি বলেছেন যারা জালিমদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারাও জালিম। তিনি বলেন, 
//আল্লাহ তোমাদেরকে শুধু তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করছেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে লড়াই করেছে, বাড়ীঘর থেকে তোমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে পরস্পরকে সাহায্য করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারাই জালিম।// 

মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আত্মীয়দের দ্বীনের ওপরে স্থান দেওয়া থেকে রক্ষা করুন। জালিমদের বন্ধু বানানো থেকে রক্ষা করুন। আরো বেশি আমানতদার হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের খিয়ানত থেকে দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করুন। আমিন। 


২২ আগস্ট, ২০২১

পর্ব : ৩৪ - সুপার পাওয়ার রোমান সেনাবাহিনীর সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ



তখন ৮ম হিজরি। মুসলিমদের জয় জয়কার। আয়িশা রা. বলেন, খায়বারের ইহুদিদের পরাজিত করার পর আমাদের মনে এরূপ আশা জন্মেছে যে, আমরা এখন থেকে পেটপুরে খেতে পারবো, আমাদের অভাব থাকবে না। আরবের রাজনীতি বেশিরভাগই এখন মুহাম্মদ সা.-এর নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে জর্ডানের বালকা থেকে একটি দুঃসংবাদ আসলো। মুসলিমদের দূতকে হত্যা করা হয়েছে।

মুহাম্মদ সা. হারিস ইবনে উমায়ের রা.-কে পাঠিয়েছেন জর্ডানের বালকাসহ আরো কয়েকটি রাজ্যে। এই অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। বালকার গভর্নর ছিল শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানি। হারিস রা. যখন তার কাছে ইসলাম গ্রহণ অথবা মুহাম্মদ সা.-এর অনুগত হওয়ার আহবান জানিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর চিঠি দেয় তখন সে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়। হারিস রা.-কে বন্দি করে ও পরে হত্যা করে। দূতদের হত্যা করা গুরুতর অপরাধ। এটা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল, এমনকি এর চেয়েও গুরুতর মনে করা হতো সেই সময়ে।

মুহাম্মদ সা. খবর পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হন। রোমান সাম্রাজ্যের মূল নেতা হেরাক্লিয়াসও নবী সা.-এর দূতকে সম্মান করেছে অথচ তার অধীনস্ত বালকার গভর্নর দূতকে হত্যা করলো। মুহাম্মদ সা. চিন্তা করলেন এর যদি যথাযথ প্রতিরোধ না করা হয় তবে আর কোথাও দূত পাঠানো যাবে না। তখন দূর দূরান্তের শাসকেরা মদিনা রাষ্ট্রকে গুরুত্বহীন মনে করবে। নবীর প্রতিনিধিদের সাথে খারাপ আচরণ করবে এমনকি হত্যাও করতে পারে।

মুহাম্মদ সা. কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। জর্ডানের বালকায় তিনি সৈন্য পাঠানো ও যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মদিনা থেকে বালকা প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরে। মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলোও ইসলামের অধীনে নয়। মুহাম্মদ সা. আল্লাহর ওপর ভরসা করে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তিনি জানতেন এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। তারপরও তিনি ইসলামকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নিলেন। যেহেতু কুরাইশদের সাথে সন্ধি রয়েছে তাই তাদের সাহায্য ছাড়া অন্য কোনো আরব মুশরিক গোষ্ঠী মুসলিমদের ওপর হামলা করবে না এই ভরসাও ছিল।

মুহাম্মদ সা. প্রায় তিনহাজার সৈন্যের এক বাহিনীর সমাবেশ করলেন। এর আগে এত বড় বাহিনী আগে কোনো অভিযানে বের হয়নি। শুধু খন্দকের সময় মদিনা প্রতিরক্ষার জন্য তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী মোতায়েন ছিল। এবার দূরত্ব অনেক বেশি, সেই সাথে সৈন্য সংখ্যাও বেশি। ব্যতিক্রমীভাবে মুহাম্মদ সা. এই যুদ্ধের জন্য তিনজন সেনানায়কের নাম ঘোষণা করেন।

জায়েদ বিন হারেসা রা.

জাফর বিন আবু তালিব রা. ও

আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.

তিনজন ঘোষণা শুনেই মুসলিমরা বুঝতে পারলো এটা বড় কঠিন যুদ্ধ হবে। যেখানে তিনজন সেনাপতি শাহদাতবরণ করবে। মুহাম্মদ সা. তারপর বলেন, জায়েদ নিহত হলে জাফর। জাফর নিহত হলে আব্দুল্লাহ। আর আব্দুল্লাহ নিহত হলে তোমরা তোমাদের থেকে একজনকে সেনাপতি করে নিও।

মুহাম্মদ সা. এরপর সাদা পতাকা জায়েদ বিন হারেসার হাতে তুলে দিয়ে বলেন, হারিস ইবনে উমায়েরের শাহদাতের স্থান বালকায় তোমরা স্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তো ভালো। যদি ইসলাম গ্রহণ না করে তবে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাইবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে, আল্লাহর সাথে কুফুরকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, খিয়ানত করবে না, কোন নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং গীর্জায় অবস্থানকারী দুনিয়া পরিত্যাগকারীকে হত্যা করবে না। খেজুর এবং অন্য কোনো গাছ কাটবে না, কোন অট্টালিকা ধ্বংস করবে না।

এরপর মুসলিম সেনাবাহিনী রওনা হয়ে গেল। মহানবী সা. তাদের সাথে কিছুদূর পর্যন্ত গিয়ে বিদায় দিয়ে আসেন। উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মুসলিম সৈন্যরা মাআন নামক এলাকায় পৌঁছলেন। এ স্থান ছিলো হেজাজের সাথে লাগোয়া জর্ডানি এলাকা। মুসলিম বাহিনী এখানে এসে অবস্থান নেন। মুসলিম গোয়েন্দারা এসে খবর দিলেন যে, রোমের কায়সার বালকা অঞ্চলের মাআব এলাকায় এক লাখ রোমান সৈন্যের সমাবেশ করে রেখেছে। এছাড়া তাদের পতাকাতলে লাখাম, জাজাম, বলকিন, বাহরা এবং বালা গোত্রের আরো এক লাখ সৈন্য সমবেত হয়েছিলো। পরের এক লাখ ছিলো আরব গোত্রমূহের সমন্বিত সেনাবাহিনী।

মুসলমানরা ধারণাই করতে পারেননি যে, তারা এতো বড় সেনাদলের সম্মুখীন হবেন। বালকা অঞ্চলের সাথে যুদ্ধ করতে এসে পুরো রোমান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে পড়লেন। মদিনা থেকে বহু দূরে মুসলিম সেনাবাহিনী সত্যিই বড় সংকটে পড়ে গেলেন। তারা কি তিন হাজার সৈন্য নিয়ে দুই লাখ সৈন্যের সাথে মোকাবেলা করবেন? বিস্মিত ও চিন্তিত মুসলমানরা দুই রাত পর্যন্ত পরামর্শ করলেন। কিন্তু সিদ্ধান্তে আসা যায় নি। কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, মুহাম্মদ সা.-কে চিঠি লিখে উদ্ভুত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হোক। এরপর তিনি হয়তো বাড়তি সৈন্য পাঠাবেন অথবা অন্য কোন নির্দেশ দেবেন। সেই নির্দেশ তখন পালন করা যাবে।

শেষে আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রা. দৃঢ়তার সাথে সমস্ত প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। তিনি বললেন, ‘হে লোকেরা! আপনার যা এড়াতে চাইছেন এটাতো সেই শাহাদাত। যার জন্য আপনারা বেরিয়েছেন। স্মরণ রাখবেন যে, শত্রুদের সাথে আমাদের মোকাবেলার মাপকাঠি সৈন্যদল, শক্তি এবং সংখ্যাধিক্যের নিরিখে বিচার হয় না। আমরা সেই দ্বীনের জন্যই লড়াই করি, যে দ্বীন দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে গৌরাবান্বিত করেছেন। কাজেই সামনের দিকে চলুন। আমরা দুইটি কল্যাণের মধ্যে একটি অবশ্যই লাভ করবো। হয়তো আমরা জয়লাভ করবো অথবা শাহাদাতবরণ করে জীবন ধন্য হবে।

৩য় সেনাপতির এমন আবেগপূর্ণ ও দৃঢ় বক্তব্যের পর মুসলিমরা জীবনবাজী রেখে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। মাআন নামক এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী শত্রুদের প্রতি অগ্রসর হলেন। বালকার মাশারেফ নামক জায়গায় তাঁরা হিরাক্লিয়াসের সৈন্যদের মুখোমুখি হলেন। শত্রুরা আরো এগিয়ে এলে মুসলমানরা মুতা নামক প্রান্তরে গিয়ে সমবেত হন। এরপর যুদ্ধের জন্য সৈন্যদের বিন্যস্ত করা হয়।

মুতা জর্ডানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এই জায়গা থেকে বাইতুল মাকদাসের দূরত্ব মাত্র ৭০-৮০ কিলোমিটার। মুতার যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হয়েছিলো। এই যুদ্ধই খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশসমূহ জয়ের পথ খুলে দেয়। অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল অর্থাৎ ৬২৯ খৃষ্টাব্দ বা সেপ্টেম্বর মাসে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটা বেশ রক্তক্ষয়ী ভয়াবহ যুদ্ধ।

মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সাথে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। বিসম্ময়কর ছিলো এ যুদ্ধ। ছোট বাহিনী এক বিশাল ও ঐ সময়ের সুপার পাওয়ার রোমানদের বাহিনীকে ঠেকিয়ে দিয়েছে। পতাকা হাতে যুদ্ধ করা জায়েদ ইবনে হারেসা রা. প্রথম শহীদ হন।

জায়েদ রা.-এর শাহাদাতের পর পতাকা তুলে নেন হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব। তিনিও তুলনাহীন বীরত্বের পরিচয় দিয়ে লড়াই করতে থাকেন। তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তিনি নিজের সাদাকালো ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে শত্রুদের ওপর আঘাত করতে থাকেন। শত্রুদের আঘাতে তাঁর ডানহাত কেটে গেলে তিনি বাঁ হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। এরপর বাঁ হাত কেটে গেলে তিনি দাঁত দিয়ে কামড়ে পতাকা ধরে রাখেন। যাতে ইসলামের পতাকা মাটিতে পড়ে অপমানিত না হয়। শাহাদাত বরণ করা পর্যন্ত তিনি এভাবে পতাকা ধরে রাখেন।

শহীদ জাফর রা.-এর এই অনুভূতি আল্লাহ তায়ালা খুব পছন্দ করেছেন। মুহাম্মাদ সা. বলেন, আল্লাহ তায়ালা জাফর রা.-কে বেহেশতে দুটি সবুজ পাখা দান করেছেন। সেই পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়াতে পারেন। এ কারণে তাঁর উপাধি ‘জাফর আত তাইয়ার’ এবং জাফর যুল জানাহাইন। তাইয়ার অর্থ উড্ডয়নকারী আর যুল জানাহাইন অর্থ দুই পাখাওয়ালা।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, মুতার যুদ্ধের দিনে জাফর শহীদ হওয়ার পর আমি তার দেহে আঘাতের চিহ্নগুলো গুণে দেখেছি। তাঁর দেহে তীর ও তলোয়ারের নব্বইটিরও বেশি আঘাত ছিলো। এ সব আঘাতের একটিও পেছনের দিকে ছিলো না।

সাধারণত কবিরা দুর্বল চিত্তের মানুষ হন। ব্যতিক্রম আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.। তিনি জানতেন জাফর রা.-এর শাহদাতের পর তার পালা আসবে। তাই তিনি জাফর রা.-এর দিকে খেয়াল রাখছিলেন। জাফর রা.-এর হাতে থাকা পতাকা পড়ে যেতে দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে উড়ে গিয়ে সেটা ছোঁ মেরে হাতে তুলে নিলেন। এরপর কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলেন। যার মূল কথা হলো, ওরে মন! তুমি খুশি থাকো বা বেজার থাকো, যুদ্ধ তোমাকে করতেই হবে। ওরা যুদ্ধের আগুন জ্বেলেছে। অস্ত্র প্রস্তুত করেছে। জান্নাত থেকে কেনরে মন তুমি দূরে থাকতে চাও?

এরপর বীরবিক্রমে লড়াই করে তিনিও আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিলেন। এভাবে একে একে যারা নিশ্চিত মৃত্যুর খবর ও প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন তারা তিনজনই শহীদ হলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. শাহদাতের পর বনু আজলান গোত্রের সাবিত ইবনে আরকাম রা. পতাকা তুলে নেন। তিনি বলেন, হে মুসলমানরা, তোমরা উপযুক্ত একজনকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও। সাহাবারা সাবিত রা.-কেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন, আমি একাজের উপযুক্ত নই।

এরপর সাহাবারা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি হুদায়বিয়া সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি পতাকা গ্রহণের পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। খালিদ রা. বলেন, মুতার যুদ্ধের দিনে আমার হাতে ৯টি তলোয়ার ভেঙ্গেছে। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিলো।

এদিকে মদিনায় মুহাম্মদ সা. রণক্ষেত্রের খবর ওহির মাধ্যমে পান। তিনি উপস্থিতদের বলেন, জায়েদ পতাকা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি শহীদ হন। এরপর জাফর পতাকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি শহীন হন। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা গ্রহণ করেছিলেন, তিনিও শহীন হন। এতটুকু বলে মুহাম্মদ সা. অশ্রুসজল হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি বলেন, তাদের পর যে পতাকা গ্রহণ করেছে সে আল্লাহর তলোয়ার সমূহের মধ্যে একটি তলোয়ার। তাঁর যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জয়যুক্ত করেন।

তাই খালিদ বিন ওয়ালিদের উপাধি সাইফুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর তরবারি। বীরত্ব, বাহাদুরি ও চরম আত্মত্যাগের মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সামানে টিকে থাকা ছিলো এক বিস্ময়কর ঘটনা। সাধারণত সেনাপতি মরে গেলে যুদ্ধের ময়দানে এক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মানুষ রণেভঙ্গ দেয়। পালিয়ে যায়। এখানে সেটি হয় নি, কারণ মুসলিম সৈন্যরা আগেই জানতো তারা পর পর তিন সেনাপতিকে হারাবে। তাই তারা বিচলিত না হয়ে যুদ্ধ করেছে। এই ব্যাপারটাও রোমানদের অবাক করেছে। এই যুদ্ধে মুসলিমরা এতো বেশি রোমান সৈন্যকে হত্যা করেছে যে, তারাও ভড়কে গেছে। খলেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. সেদিন বীরত্বের পরিচয় দেন, ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না।

খালিদ রা. যুদ্ধের সাথে কৌশলও প্রয়োগ করেছেন ফলে যুদ্ধ সমাপ্তির দিকে গেছে। তিনি দূত পাঠিয়ে দেন মদিনায় যাতে সাহায্য আসে। আর এদিকে তিনি যুদ্ধের ময়দানে সেনা অদল বদলের কৌশল করেন। তিনি কিছুক্ষণ পর পর ডানের সৈন্য বাঁয়ে আর বাঁয়ের সৈন্য ডানে বদল করে দেন। এতে রোমানরা ভেবেছে মুসলিমদের সাহায্যকারী বাহিনী এসে পৌঁছেছে। খালিদ রা. ভালো প্রতিরোধ করতে থাকার পরও একটু একটু করে পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছিলেন। খালিদ রা.-এর ইচ্ছে ছিল তিনি পেছাতে থাকলে সাহায্যকারী বাহিনীর দেখা আগে পাবেন।

সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডর ছিল ময়দানের সেনাপতি। তার নেতৃত্বেই যুদ্ধ হচ্ছিল। যুদ্ধের ৩য় দিন তিনি হঠাৎ করে যুদ্ধ বন্ধ করে দেন। আড়াই দিন ধরে এই বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সে মাত্র ১২ জন মুসলিমকে হত্যা করতে পেরেছে। তার বাহিনীর মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। আর এদিকে অদল-বদলের কারণে সে ভাবছে প্রতিদিনই নতুন সৈন্য আসছে। তাই মুসলিম বাহিনীর পেছানো দেখে সে সন্দেহ করেছে তাদেরকে ট্র্যাপে ফেলতে যাচ্ছে মুসলিম বাহিনী। তারা মরুপ্রান্তরে রোমানদের নিয়ে পাল্টা হামলা করে পর্যদুস্ত করবে। এরূপ চিন্তা করে রোমানরা যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে না এসে নিজেদের সীমানায় চলে গেল। অর্থাৎ বালকায় ফিরে গেল।

অথচ রোমানরা এমন পিছিয়ে যাওয়ার লোক নয়। তারা সে বছরগুলোতে বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য দখল করে ফেলেছিলো। খসরুর সৈন্যদের রোমানরা কখনো পালাতে পর্যন্ত দেয়নি।

তবে মুসলিমরা যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মুতা অভিযান পরিচালনা করেছে, সেটা সম্ভব না হলেও এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের সুনাম সুখ্যাতি বহুদূর বিস্তার লাভ করে। সমগ্র আবর জগত বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কেননা, রোমানদের মোকাবেলা করা তো দূরের কথা, এমন কথা চিন্তাও করতে পারতো না আরবরা। আবরব মনে করতো যে, রোমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া মানে আত্মহত্যার শামিল। কাজেই, উল্লোখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তিনহাজার সৈন্য নিয়ে দুই লাখ সৈন্যের মোকাবেলা করা বিশাল ব্যাপার।

আরবের জনগণ বুঝতে সক্ষম হয়েছিলো যে, ইতোপূর্বে পরিচিতি সকল শক্তির চেয়ে মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সাথে রয়েছে। তাদের নেতা মুহাম্মদ সা. নিঃসন্দহে আল্লাহর মনোনীত ব্যাক্তি। ফলে দেখা গেল এই যুদ্ধের পর মুসলমানদের চিরশত্রু জেদী ও অহংকারী হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু সংখ্যক গোত্র ইসলামের কবুল করে। এসব গোত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গোত্র হচ্ছে, বনু সালিম, আশজা, গাতফান, জিবান ও ফাজারাহ।