৩ ডিসেম্বর, ২০২১

খিলাফত পর্ব-০৪ : যাকাত অস্বীকারকারী ও বিদ্রোহীদের দমন



মুহাম্মদ সা.-এর মৃত্যুর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মক্কা মদিনার বাইরের আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। বানূ আসাদ, গাতফান, তাঈ, ফারাহ, আবস, যুবইয়ান ও কিনানাহ প্রভৃতি মাদীনার পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলো নামায পড়তে ও শারী'আতের অন্যান্য বিধি-বিধান মেনে চলতো। কিন্তু যাকাত দিতে অস্বীকার করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কেবল কার্পণ্যবশত যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। আবার অনেকেই নিজেরা যাকাত প্রদানের পক্ষে ছিল; তবে তা মাদীনায় পাঠাতে সম্মত ছিল না। তারা এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য মাদীনায় তাদের প্রতিনিধি দলও প্রেরণ করে। প্রতিনিধি দল প্রথমে বিষয়টি সম্পর্কে উমার রা., যুবাইর রা. ও আব্বাস রা. প্রমুখ মাদীনার নেতৃস্থানীয় মুসলিমদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে এবং তাদের নিকট আবেদন করে, যেন তারাও এ ব্যাপারে আবু বকর রা.-এর নিকট সুপারিশ করেন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ও বিদ্রোহীগোষ্ঠীদের এখনই বিরোধী করে না তুলতে আগ্রহী ছিলেন সিনিয়র সাহাবীরা। তারা যাকাত অস্বীকারকারীদের যুক্তিতেও কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারা আবু বকর রা.-কে বললেন, এ সকল আরবের মধ্যে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রয়োগ করা উচিত হবে না। উমার রা. যিনি নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাহসী ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। তিনি আবু বকর রা.-কে বলেন,

“আপনি কিসের ভিত্তিতে লোকদের সাথে লড়াই করবেন? মুহাম্মদ সা. তো বলেছেন যে, আমাকে ততক্ষণ লোকদের সাথে লড়াই করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে। আর যখন তারা এ কথা বলবে, তখন তারা নিজেদের সম্পদ ও জীবনকে আমাদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ করে নিল। তবে হ্যাঁ, যদি তাদের কারো ওপর কোনো হক থাকে তা হলে ভিন্ন কথা। অধিকন্তু তার হিসাব আল্লাহর কাছেই হবে। [১]

আবু বকর রা. ব্ললেন, ফরজ হিসেবে সালাত ও যাকাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ কারণেই পবিত্র কুরআনের বেশির ভাগ স্থানে সালাত ও যাকাতের কথা একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “আর যদি ঐ সকল লোক তাওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দান করে, তবেই তাদের পথ মুক্ত করে দাও।”[২] কাজেই সালাত কায়েমের জন্য যদি যুদ্ধ করা যায়, তা হলে যাকাত অনাদায়কারীদের বিরুদ্ধে কেন লড়াই করা যাবে না?

তাই তিনি খুবই জোরালো ভাষায় ঘোষণা করলেন,
-“আল্লাহর কসম, যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে (অর্থাৎ সালাত আদায় করবে; কিন্তু যাকাত দেবে না), আমি তাদের সাথে অবশ্যই লড়াই করবো। কেননা যাকাত হলো সম্পদের হক । আল্লাহর কসম, যদি তারা একটি মেষশাবক প্রদান করতেও অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগে আদায় করতো, তা হলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। [৩]

উমার রা. বললেন, হে খলিফাতুর রাসূল! এটা কঠোরতার সময় নয়, আপনি লোকদের মন রক্ষা করুন এবং তাদের সাথে নম্র আচরণ করুন।”

জবাবে আবু বকর রা. বলেন, তুমি জাহেলী যুগে খুবই শক্ত প্রকৃতির লোক ছিলে, ইসলামে এসে কি দুর্বল হয়ে গেলে? শুনো, এখন ওহীর আগমন বন্ধ হয়ে গেছে, দ্বীন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। তাই এটা কি সম্ভব যে, আমি জীবিত থাকতেই দীন অপূর্ণ হয়ে যাবে?

আবু বকর রা.-এর যুক্তিপূর্ণ দৃঢ়তা দেখে উমার রা. চুপ হয়ে গেলেন। তিনি খলিফার সাথে একমত হলেন। [৪]

অবশেষে খালীফার নিকট থেকে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাদের গোত্রের নিকট ফিরে যায়। যাওয়ার সময় তারা দেখে যায় সাহাবাদের একটি বিরাট দল উসামা রা.-এর নেতৃত্বে সিরিয়ায় যাচ্ছেন এবং মাদীনায় স্বল্পসংখ্যক সাহাবী রয়েছেন। তারা এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। এ সকল লোক নিজ নিজ গোত্রকে উৎসাহ প্রদান করে বলে যে, এখনই মাদীনার ওপর আক্রমণ করার সুবর্ণ সুযোগ। এদিকে আবু বকর রা. মুহূর্তটিকে সংকটপূর্ণ বিবেচনা করে মাদীনার নিরাপত্তা ও প্রহরার দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে মাদীনার বিভিন্ন রাস্তায় আলী রা., আবদুর রাহমান ইবনু আওফ রা., সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা., আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. ও তালহা ইবনু আবদিল্লাহ (রা.) প্রমুখ নেতৃস্থানীয় সাহাবীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনী নিযুক্ত করেন এবং মাদীনায় অবস্থানকারী সকল যুদ্ধসক্ষম মুসলিমদেরকে মাসজিদে নববীর সামনে সর্বক্ষণ উপস্থিত ও প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেন, যাতে হঠাৎ কোনো সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। [৫]

যাকাত অস্বীকারকারীদের প্রতিনিধি দল ফিরে যাওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যে মিথ্যা নবী দাবীদার তুলাইহা আল-আসাদীর নেতৃত্বে বা আসাদ, গাতফান, আবস, যুবইয়ান, বাকর ও তাঙ্গ গোত্র দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে মাদীনার ওপর আক্রমণ করতে এগিয়ে এলো। তাদের একভাগ যু-হুসা নামক জায়গায় অবস্থান নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূল বাহিনীর সাহায্য করা। অপর অংশটি মাদীনা আক্রমণ ও ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত হয়। আবু বকর রা.-এর গোয়েন্দারা এই খবর খলিফা আবু বকর রা.-কে জানালেন।

শত্রুবাহিনী মদিনা আক্রমণ করার আগেই আবু বকর রা. সেনাবাহিনী নিয়ে মসজিদে নববী থেকে রওনা হন। মুসলিমগণ যখন শত্রুদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালালেন, তখন তারা হতভম্ব হয়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অবশেষে তারা প্রাণভয়ে এদিক সেদিক দৌড়ে পালাতে করতে লাগলো। তারা মুসলিমদের পক্ষ থেকে আক্রমণের কোনো আশংকা করেনি। তাই তাদের বেহাল দশা হয়। মুসলিমরা তাদের পিছু ধাওয়া করে। বিদ্রোহীরা যু-হুসা নামক স্থানে পৌছলে সেখানে যারা আগে থেকেই অবস্থান করছিল, তারাও তাদের সাথে পালাতে থাকে।

মুসলিমরা উটের ওপর সওয়ারী হয়ে ধাওয়া করছিল। বিদ্রোহীরা পালানোর সময় এক অভিনব কাজ করে। তাদের সাথে থাকা চামড়ার থলের মধ্যে ফু দিয়ে বাতাস ভর্তি করে মুসলিমদের উটগুলোর দিকে নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে মুসলিমদের উট ভয় পেয়ে গেল। তারা উল্টো দিকে দৌড় দিতে থাকলো। উটগুলো দৌড়ে মদিনায় চলে আসলো। অন্যদিকে বিদ্রোহীরাও পালিয়ে গেল।[৬]

এই পরিস্থিতি দেখে বিদ্রোহীদের মিত্র আবস, যুবইয়ান, বান্ মুররাহ ও বান্ কিনানাহ প্রভৃতি গোত্র মনে করলো যে, মুসলিমরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছে। অতএব তাদের পিছু ধাওয়া করা উচিত। তারা মাদীনা আক্রমণ করার জন্য যুল-কাসসা বাসীদেরকে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তারা হিবালা ইবনু তুলাইহার নেতৃত্বে মাদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এ দিকে আবু বকর রা. মাদীনা পৌঁছে একটি মুহুর্তও অপচয় না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। সৈন্যদের যথারীতি শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। সৈন্যদলের ডান দিকে নু'মান ইবনু মুকাররিন রা.-কে, বাম দিকে 'আবদুল্লাহ ইবনু মুকাররিন রা.-কে এবং পেছনের ভাগে সুয়াইদ ইবনু মুকাররিন রা.-কে মোতায়েন করা হয়। রাতের শেষ প্রহরেই তারা রওয়ানা হন এবং অতি ভোরেই শক্রদের কাছে পৌঁছে যান।

এ সময় বিদ্রোহীরা ঘুমাচ্ছিল। হঠাত মুসলিমদের আগমনে তারা দিশেহারা হয়ে পড়লো। যে যে অবস্থায় ছিল সে সেই অবস্থায়ই চোখ রগড়াতে রগড়াতে অস্ত্রধারণ করলো। কিন্তু অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা মুসলিমদের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই যে যেদিকে পারলো পালিয়ে গেল। আবু বকর রা. তাদেরকে যুল-কাসসা পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গেলেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, শত্রুসৈন্যদের সাহস ভেঙ্গে গেছে। তারা আর পুনরায় এদিকে মাথা তুলে তাকাবার সাহস পাবে না, তখন তিনি ধাওয়া বন্ধ করলেন।

খলিফা আবু বকর রা. মদিনায় ফিরে এলেন। তার ফিরে আসার পরপরই বিভিন্ন গোত্র থেকে যাকাত নিয়ে প্রতিনিধিরা আসতে থাকে। যদিও আবু বকর রা.-এর বাহিনীর সামনে বিদ্রোহীরা টিকতে পারেনি। তবে তাদের মনোবল পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। যাকাত অস্বীকারকারী ও ভন্ড নবী দাবীদাররা জোটবদ্ধ হয়ে মদিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে।

তথ্যসূত্র : 
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া / ইবনে কাসীর / ইসলামিক ফাউন্ডেশন / ৬ষ্ঠ খন্ড / পৃ. ৪৬৫
২. আল কুরআন / সূরা তাওবা / আয়াত ৫ 
৩. সহীহ বুখারী / আধুনিক প্রকাশনী / হাদীস নং ১৩১২
৪. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৪৫৯-৪৬০
৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া / ইবনে কাসীর / ইসলামিক ফাউন্ডেশন / ৬ষ্ঠ খন্ড / পৃ. ৪৬৪
৬. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৪৬৩

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন