৩০ জুলাই, ২০২২

হিজরি সন গণনার ইতিহাস



আমাদের নেতা উমার রা.-এর শাসনামল। ইসলামী হুকুমাত তখন অনেক বড়। এর মধ্যে একটি সংকটে পড়লো রাষ্ট্র। আরবে তৎকালীন সমাজ মাসের হিসেব ও তারিখের হিসেব করতো কিন্তু নির্দিষ্টভাবে সনের হিসাব করতো না। রাষ্ট্র বিশাল হওয়ায় অনেক ডকুমেন্টস মেইনটেইন করতে হচ্ছে। যেমন, রাষ্ট্রীয় আদেশ, সার্কুলার, ঘোষণাপত্র, চুক্তিপত্র, কূটনৈতিক চিঠি ইত্যাদি। এগুলোতে মাসের নাম থাকলেও সন লিখা থাকতো না। 

১৬ হিজরির শাবান মাসের ঘটনা। তখন অবশ্য ১৬ হিজরি বলে কিছু ছিল না। একটি অফিসিয়াল সার্কুলার হাজির হলো উমার বিন খাত্তাব রা.-এর সামনে। সেখানে মাসের নাম লেখা ছিল কিন্তু সনের নাম ছিল না। উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলো এটি কোন সনের সার্কুলার! উমার রা. বললেন এটি এখনই সমস্যা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে তো এটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়াবে। এর সমাধান কী? এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায় নি সেসময়। 

তৎকালীন আরবে সুনির্দিষ্ট কোন সন প্রথা প্রচলিত ছিল না। বিশেষ ঘটনার নামে বছরগুলোর নামকরণ করা হতো। যেমন- বিদায়ের বছর, অনুমতির বছর, ভূমিকম্পের বছর, হস্তীর বছর ইত্যাদি। মহানবী সা. যখন পৃথিবীতে এসেছেন আরববাসী তখন ‘হস্তীর বছর’ থেকে কাল গণনা করছিল। এরপর ফিজার যুদ্ধ দিয়েও সাল গণনা হতো। যেমন তারা বলতো হস্তীর বছরের তিন বছর পরে আমার মেয়ের জন্ম। ফিজার যুদ্ধের আগের বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে ইত্যাদি। 

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমার ফারুক রা. যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নতুন নতুন রাষ্ট্র ও ভূখন্ড ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাষ্ট্রের জরুরি দলিল, কাগজপত্র ইত্যাদিতে কোন সন উল্লেখ না থাকায় অসুবিধার সৃষ্টি হতো। আবার বসরার (ইরাক) গভর্নর মুসা আল আশয়ারি রা. রাষ্ট্রনায়ক উমার ফারুক রা.-কে লিখে পাঠালেন, আপনি পাঠানো চিঠিতে সন না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি এক্ষেত্রে গ্রিসকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।  

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমীরুল মুমেনিন একটি বিশেষজ্ঞ মিটিং আহ্বান করলেন এই সমস্যা সমাধানে। এখানে বিজ্ঞ সাহাবা ও পন্ডিত ব্যক্তিদের আহ্বান জানান হয়েছে।  সোলার ক্যালেন্ডার নাকি লুনার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হবে? কোন ঘটনাকে সাক্ষী রেখে বছর গণনা শুরু হবে? কোন মাসকে প্রথম মাস হিসেবে ধরা হবে? ইত্যাদি সব জটিল সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে সেই মিটিং-এ।        

হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জমাদিউল আউয়ালে আসলো সেই ঐতিহাসিক দিন। যেহেতু আরবের মানুষ ও সাহাবীরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করতো এবং আমাদের ইবাদতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ চাঁদের সাথে সম্পর্কিত তাই সৌর ক্যালেন্ডার বাদ পড়ে যায় শুরুতেই। মহানবী সা.-এর জন্ম, নব্যুয়ত, হিজরত ও মৃত্য—এ চারটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যেকোন একটি হতে হিজরি সন গণনা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো।

কিন্তু সমস্যা হলো জন্ম ও নবুয়তের তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আর মৃত্যু শোকের সিম্বল। এছাড়া জন্ম, মৃত্যুকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা রাসূল সা. বলেননি। অতএব হিজরতের মাধ্যমেই সন গণনা শুরু করার পক্ষে সাহাবার একমত হলেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন বিজ্ঞ সাহাবী সাইয়্যেদেনা আলী রা.। কারণ ঐদিন থেকে আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. শাসনক্ষমতা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং মুসলিমরা রাষ্ট্রীয় শক্তি অর্জন করে। সেজন্যই দিনটি মুসলিমদের কাছে চিরস্মরণীয়। আর পবিত্র মাস মহররমকে ১ম মাস হিসেবে নির্ধারণ করতে একমত হন সাহাবারা।     

সিদ্ধান্ত হলো যে বছর মুহাম্মদ সা. হিজরত করে মদিনায় এসেছেন সে বছরের মহররমের ১ তারিখ থেকে হিজরি বর্ষ গণনা করা হবে। হিসেব করে দেখা গেল ১ হিজরির ১ মহররম অর্থাৎ প্রথম দিনটি ছিল জুমাবার, জুলিয়ান দিনপঞ্জি অনুসারে ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। আর এই সিদ্ধান্তটি নেয়া হয় ঘটনার ১৬ বছর পর ৯ জুন ৬৩৭ সালে। সেদিনই বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখলো সেদিন ছিল ১০ জমাদিউল আউয়াল, ১৬ হিজরি। উমার ফারুক রা. শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করার তিন বছরের মাথায় এমন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কার্যকরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। 

আজ ১ মহররম ১৪৪৪। আজ থেকে ১৪৪৪ বছর আগে মুহাম্মদ সা. তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আলী রা.-এর শাহদাতের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রকে হারিয়ে ফেলেছি। এরপর বহু মর্দে মুজাহিদ এই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করতে চেয়েছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুসাইন ইবনে আলী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা., উমার ইবনে আব্দুল আজিজ রা.। 

আমাদের আন্দোলন সেই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার আন্দোলন! আসুন আমরা শপথ নিই আমরা আমাদের সম্পদ ও জীবন বাজী রেখে ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার চেষ্টা করে যাবো ইনশাআল্লাহ। 

সবাইকে হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা। নতুন বছরে মহান রাব্বুল আলামীন আরো বেশি তার অনুগত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

২৬ জুলাই, ২০২২

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

খুররম জাহ মুরাদ। ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানের ২য় নাজিম-ই-আলা বা কেন্দ্রীয় সভাপতি। খুররম জাহ মুরাদ এশিয়ার একজন বিখ্যাত প্রকৌশলী। একই সাথে তিনি ছিলেন দা’য়ী, সংগঠক, ছাত্রনেতা, হাদীস বিশারদ, ইসলামিক চিন্তাবিদ। তাঁর জন্ম হয়েছে ভারতের ভূপালে। ৪৭-এর দেশভাগের সময় তার পরিবার ভূপাল থেকে লাহোরে চলে আসে। 

পড়লেখা শেষে তিনি সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬৫ সালে মাতুয়াইল, মুসলিম নগর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানাসহ ৫৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যামুক্ত এলাকা গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডিএনডি বাঁধ। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন খুররম জাহ মুরাদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৭৫ সালে করা কা'বা ঘরের এক্সটেনশন। তিনি জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমীর ছিলেন।  

সব পরিচয়ের পাশাপাশি খুররম জাহ মুরাদ একজন ভালো লেখকও ছিলেন। তাঁর একটি আর্টিকেল ১৯৫৮ সালে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিলো মাওলানা মওদূদী সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকা 'তরজুমানুল কুরআনে'। নাম ছিল, তেহরিকে ইসলামী মেঁ কারকুনো কি বেহমি তা'লুকাত। প্রবন্ধটি খুবই জনপ্রিয় হয় তাই পরে এটি বই আকারে পাবলিশ হয়। এই দারুণ বইটি পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনুবাদ হয়। বাংলায় এর নাম হয়, 'ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক'। অনুবাদ করেন মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান। 

বইয়ের নাম শুনে বুঝা যাচ্ছে এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় কী। বইটিতে ভ্রাতৃত্বকে জোর দেওয়া হয়েছে। একটি সফল ইসলামী আন্দোলনের জন্য এর বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নং আয়াতে বলেন, “আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের ঘোরতর দুশমন, তখন তিনিই তোমাদের হৃদয়কে জুড়ে দিলেন এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহ ও মেহরবানীর ফলে ভাই-ভাই হয়ে গেলে। (নিঃসন্দেহে) তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের তীরে দাঁড়িয়ে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে নাজাত দিলেন"। ইসলামের একটি বেসিক শিক্ষাই হলো মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। বংশ, গোত্র, বর্ণ, জাতি, সম্পদ ইত্যাদির ব্যবধান দূর করে পরস্পর ভাই হয়ে যাওয়া। 

খুররম জাহ মুরাদ ৪ টি অধ্যায়ে এই বইটি লিখেছেন। ১ম অধ্যায়ে তিনি পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তি, তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে একজন মুসলিমের ভালো চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৩য় অধ্যায়ে যেসব বদ্গুণ সম্পর্কের অবনতি ঘটায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। শেষ অধ্যায়ে সম্পর্ক ভালো করার পন্থা ও ভালো গুণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

১. পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিঃ তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
লেখক এখানে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ঈমানকে উল্লেখ করেছেন, কারণ সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “মু’মিনেরাতো পরস্পরের ভাই”। এরপর ভ্রাতৃত্বকে তিনি ঈমানের অনিবার্য দাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর এই অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেছেন বিশ্বব্যাপী আমরা যে ইসলামী বিপ্লবের কাজ করছি তার জন্য ভ্রাতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই, এটি অপরিহার্য। এরপর খুররম জাহ মুরাদ ভ্রাতৃত্বের দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই ভ্রাতৃত্ব আমাদের কাছে কী চায়! ভ্রাতৃত্বের ফলে আমরা আখিরাতে কী সুবিধা পাবো তা নিয়েও তিনি এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। 

২. চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য 
লেখক বলেছেন, ইসলাম পারস্পারিক সম্পর্কের যে মান নির্ধারণ করেছে তাকে কায়েম ও বজায় রাখার জন্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) পারস্পারিক অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি বিধি-বিধানও তৈরী করে দিয়েছেন। সেই বিধি-বিধানকে অনুসরণ করে এ সম্পর্ককে অনায়াসে দ্বীন-ইসলামের অভীষ্ট মানে উন্নীত করা যেতে পারে। এ বিধি-বিধানের ভিত্তি কতিপয় মৌলিক বিষয়ের ওপর স্থাপিত। লেখকের মতে এই মৌলিক বিষয়গুলো হলো আটটি, কল্যাণ কামনা, আত্মত্যাগ, ইনসাফ, ইহসান, রহমত, ক্ষমা, নির্ভরতা ও মর্যাদা। লেখক এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন ২য় অধ্যায়ে। 

৩. সম্পর্ককে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার উপায়
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেকার সম্পর্ককে বিকৃত করতে ও নষ্ট করার জন্য কিছু বদ্গুণ দায়ি। লেখক এখানে ১৫ টি বদগুণ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো আমাদের সম্পর্ককে নষ্ট করে। ৩য় অধ্যায়ে লেখক এসব বদ্গুণের ব্যাপারে ও কুফল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেকটি বদগুণের ব্যাপারে ইসলামের বিধান বর্ণনা করেছেন। 

৪. সম্পর্ক দৃঢ়তর করার পন্থা
পূর্বের অধ্যায়ে বর্ণিত সম্পর্কের বিকৃতি ও অনিষ্টসাধনকারী এ জিনিসগুলো থেকে বারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যেগুলো গ্রহণ ও অনুসরণ করার ফলে সম্পর্ক দৃঢ়তর ও স্থিতিশীল হয়, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং যার ফলে দুটো হৃদয়ের মধ্যে এক হাতের দু’টি অংগুলির মতোই ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়, আল্লাহ্ ও রাসূল (সঃ) সেগুলোও আমাদেরকে সুনির্দিষ্টরূপে বলে দিয়েছেন। এর ভেতর কতকগুলো জিনিসকে অত্যাবশ্যকীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথবা বলা যায়, সেগুলোকে অধিকার (হক) হিসেবে পেশ করা হয়েছে। আবার কতকগুলো জিনিসের জন্যে করা হয়েছে নসিহত। এগুলো হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের পর্যায়ভূক্ত। লেখক এরকম ১৮ টি গুণের কথা কথা উল্লেখ করে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।  

খুররম জাহ মুরাদের লেখার সাথে যারা পরিচিত তারা বিষয়টা জানেন। তিনি তাঁর লেখায় প্রচুর কুরান-হাদীসের রেফারেন্স ইউজ করেছ। প্রতিটি বিষয়ে তিনি ইসলামের নির্দেশনার আলোকে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন। যারা এই বইটি এখনো পড়েননি, পড়ে নিন। সর্বস্তরের মানুষের সাথে আপনার মুয়ামেলাত সুন্দর করার একটি দারুণ গাইডলাইন পাবেন।  

চরিত্র গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মানুষ রাতারাতি অর্জন করতে পারে না। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে: চরিত্র গঠনের গোটা পরিকল্পনাটিকে বুঝে নিয়ে এক একটি জিনিসকে মনের মধ্যে খুব ভালো মতো বদ্ধমূল করে নেয়া, তারপর তাকে গ্রহণ ও অনুসরণ করার চেষ্টা করা এবং এভাবে প্রথমটির পর দ্বিতীয়টির পর তৃতীয়টিকে গ্রহণ করা। ধীরে ধীরে ভালো গুণগুলো প্র্যাকটিস করা ও বদগুণগুলো আমাদের আচরণ থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। তবেই এই বই পড়া সার্থক হবে। ইনশাআল্লাহ।  

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক
লেখক : খুররম জাহ মুরাদ
অনুবাদক : মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান  
প্রকাশনী : আইসিএস
পৃষ্ঠা : ৯৬
মুদ্রিত মূল্য : ৪০
জনরা : আত্মউন্নয়ন ও মোটিভেশন

২৪ জুলাই, ২০২২

ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ


আজকে যে বইটি রিভিউ করবো এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এই বইয়ের মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী আর দেওবন্দীদের পথ দুইদিকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। দেওবন্দীদের মিথ্যাচার ও তাকফিরের টার্গেট হয়েছেন মওদূদী ও তাঁর সমর্থকরা।

উপমহাদেশের সেরা ইসলামিক স্কলার যিনি ইসলামের স্বরূপ উপস্থাপন করে রাষ্ট্র ও জীবন পরিচালনার প্রায় সব দিক নিয়ে বই লিখেছেন সেই মাওলানা মওদূদীর উত্থান হয়েছে দেওবন্দীদের হাত ধরে। খুব কম বয়সে মাওলানা ইসলাম নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। তাঁর এই প্রতিভা দেখে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র 'মুসলিম' পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেয় কর্তৃপক্ষ।


১৯২৩ সালে মাওলানার বয়স যখন মাত্র বিশ বছর, তখন তিনি 'মুসলিম' পত্রিকার সম্পাদক। ইংরেজ সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করলে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ 'আল জমিয়ত' নামে আরেকটি পত্রিকা স্টার্ট করে। মাওলানা এই পত্রিকারও সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই পত্রিকার মাধ্যমে সারা উপমাহাদেশের মুসলিমরা মাওলানার লেখার সাথে পরিচিত হতে থাকে। ১৯২৭ সালে জমিয়ত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মাওলানা 'আল জিহাদ ফিল ইসলাম' নামের বইটি লিখতে থাকেন। এতে তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। ১৯৩০ সালে বইটি লেখা শেষ হয় ও বই আকারে পাবলিশ হয়।

এর মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্তান আন্দোলন হুট করে হিন্দুস্থানে নাজিল হয়নি। ধারাবাহিকভাবে এর একটি প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। লর্ড কার্জন কর্তৃক শুধুমাত্র প্রশাসনিক কারণে ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভেঙে আরেকটি প্রদেশ তৈরি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুশরিকদের বঙ্গভঙ্গরদ আন্দোলন এবং ১৯১১ সালে তা রহিতকরণ থেকে শুরু। এরপর উপমহাদেশের যত্রতত্র এবং যখন তখন মুসলমাদের গায়ে পড়ে হিন্দুদের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টি এবং মুসলমানদের জানমালের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে মুশরিকরা। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বার বার সমঝোতা করার চেষ্টা করা হলেও কংগ্রেস তথা হিন্দুত্ববাদীদের হটকারিতায় সেটা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর সাতটি প্রদেশে আড়াই বছর কংগ্রেসের হিংস্র শাসন মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের কথা তীব্রভাবে ভাবতে শিখায়।

হিন্দুস্থানে মুশরিকরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী হওয়ার কারণে মুসলিম জাতিকে হয় তাদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখতে অথবা নির্মূল করতে চায়। এ লক্ষ্য হাসিলে জন্যেই কংগ্রেসের দাবী ছিল এই যে এ উপমহাদেশের অধিবাসীদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ সরকারকে তার হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। হিন্দু সভ্যতা সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ এবং হিন্দুরামরাজ্য স্থাপনই ছিল কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য। কংগ্রেস ও তার কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন আচরণে এ বিশ্বাস মুসলমানদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয় এবং এ কারণেই মুসলমানগণ পাকিস্তান আন্দোলন করতে বাধ্য হন।

যাই হোক পাকিস্তান আন্দোলনের শুরুর দিকে মাওলানার সাথে জমিয়ত পত্রিকার মালিক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতাদের সাথে দ্বিমত হয়। জমিয়ত নেতারা পাকিস্তান আন্দোলন ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে থাকেন। মাওলানা তাদের এই মুশরিকপ্রধান কংগ্রেসপন্থী কার্যক্রম পছন্দ করেননি। মাওলানা ১৯২৮ সালে জমিয়ত পত্রিকা থেকে সরে দাঁড়ান।

১৯৩৮ সালে দেওবন্দের প্রধান নেতা হুসাইন আহমদ মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত গবেষণানির্ভর বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য।

আমাদের আজকের বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' বা 'ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ'। বইটি অনুবাদ করেছেন বাংলার বিখ্যাত পণ্ডিত মুমতাজুল মুহাদ্দিসিন মাওলানা আব্দুর রহীম রহ.। এই বইয়ের মাধ্যমে দেওবন্দের সাথে মাওলানার যে বিরোধ শুরু হয়েছে তা আজো চলমান। মাওলানাকে তাকফির করা শুরু হয়েছে এখান থেকেই। তখনো জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হলে জামায়াতে ইসলামও তাকফিরের মুখোমুখি হয়।

বইটিতে মোটাদাগে ৬ টি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
১. ইসলাম ও জাতীয়তা
২. জাতীয়তার মৌলিক উপাদান
৩. ইসলামের মিলনবাণী
৪. একজাতিত্ব ও ইসলাম
৫. জাতীয়তাবাদ কি মুক্তি দিতে পারে?
৬. ইসলামী জাতীয়তার তাৎপর্য

প্রথমত মাওলানা জাতির সংজ্ঞা, জাতীয়তা গঠনের উপকরণ ইত্যাদি আলোচনা করেন। এই জাতীয়তা মানবিকতা ধ্বংস করে বিপর্যের উৎস হিসেবে কাজ করে মাওলানা তা আলোচনা করেছেন একসাথে এটাও দেখিয়েছেন এটা জাহেলি বিদ্বেষ তৈরি করে। আর ইসলাম এর কোনোটাই সাপোর্ট করে না। বরং জাতীয়তাবাদের জাহেলিয়াতকে নির্মূল করা ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

দ্বিতীয়ত মাওলানা জাতীয়তাবাদের মোলিক উপকরণ নিয়ে আলোচনা করেন। গোত্রবাদ, স্বদেশিকতা, ভাষাগত জাতীয়তা, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক জাতীয়তা, রাজনৈতিক জাতীয়তা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেন। একইসাথে মাওলানা বিদায় হজ্বের ভাষণ ও রাসূল সা. অন্যান্য বক্তব্য থেকে জাতীয়তা বিষয়ে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেন। এই গোত্রবাদের সাথে ইসলামের যে দ্বন্দ্ব তা তুলে ধরেন। আভিজাত্যের অহমিকা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ইসলামের বক্তব্য উপস্থানপন করেন।

মাওলানা বলেন, জাহেলী যুগের এ বর্বরতাকে নির্মূল করার পর ইসলাম বিজ্ঞানের ভিত্তিতে জাতীয়তার এক নতুন ধারণা উপস্থাপিত করেছে। ইসলামী জাতীয়তার মানুষে মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে; কিন্তু তা জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোনো কারণে নয়; তা করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্যবিধান পেশ করা হয়েছে-তার নাম হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয় মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা-সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানবজাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যে, যারা এ আমন্ত্রণ কবুল করবে তারা একজাতি হিসাবে গণ্য হবে। আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতির অন্তর্ভূক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমগ্র ব্যক্তি সমষ্টি মিলে একটি উম্মাত وَكَذَالِكَ جَعَلناكم اُمَّةً وَّسَطًا অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। তার অনুসারীরা নিজেদের পারস্পারিক মতদ্বৈততা ও বৈষম্য সত্ত্বেও একই দল একই জাতির মধ্যে গণ্য। وَاللهُ لاَ يَهْدىِ القَومَ الكافِرِيْنَ

তৃতীয়ত মাওলানা ইসলামে ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সুদূর প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সীমান্ত পর্যন্ত মুসলমানদের যে অখণ্ড সংহতি বিদ্যমান, এটাও আলাহরই অপার অনুগ্রহের সুস্পষ্ট নিদর্শন সন্দেহ নেই। বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও সংহতি স্থাপন একমাত্র চূড়ান্ত কথা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্ভব। এছাড়া আর যত মত ও পথ রয়েছে, তা সবই ভুল-সবই বিচ্ছেদ ও বিভেদ সৃষ্টিকারী, এটা নিঃসন্দেহ। বস্তুত এ পাঁচটি বিষয়ের প্রতি সংশয়ের লেশহীন বিশ্বাস স্থাপনের নামই হচ্ছে মিলনবাণী।

চতুর্থত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর বইয়ের প্রসঙ্গ এনে সেই বইয়ের ভুল ও অবাস্তব কথাগুলো ধরিয়ে দেন। মাওলানা ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বই থেকে হুসাইন মাদানীর কথা, যুক্তি ও পয়েন্ট উল্লেখপূর্বক তাঁর লেখাকে খন্ডন করেছেন। তার এই যুক্তি খন্ডন শুধু উপমহাদেশের আলেম সমাজ নয়, দেওবন্দীদের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছে। দেওবন্দী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতি মুসলিমদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বইয়ের প্রভাবে জমিয়তে উলামায় হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে একটি দল। তারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নতুন দল করেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবিও এই নতুন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

পঞ্চমত মাওলানা আলোচনা করেন, 'জাতীয়তাবাদ কী আসলে মুক্তি দিতে পারে?' এই প্রসঙ্গে। এই আলোচনার প্রেক্ষাপট মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি। রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন যাপনের পর কলকাতায় একটা সভায় ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণে তিনি মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ইউরোপীয় স্টাইল অনুসরণের জন্য আহ্বান জানান। মাওলান তার এই ধারণার বিরোধীতা করে বক্তব্য রাখেন। সেই আলোচনায় মাওলানা ইসলাম ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে পার্থক্য, ইউরোপের প্রকৃত অবস্থা, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের স্বরূপ ও পরিণতি এবং উবাইদুল্লাহ সিন্ধি প্রস্তাবিত বিদেশী পোষাক গ্রহনের বিরোধীতা করেন।

ষষ্ঠত এবং সবশেষে মাওলানা ইসলামী জাতীয়তার তাৎপর্য উল্লেখ করেন। তিনি এখানে ইসলামী জাতীয়তার ভিত্তি 'ঈমান' তা উল্লেখ করেন। ঈমানের কারনে আমাদের চিন্তা ভাবনা ও আচরণের পার্থক্য সূচিত হয় ও আমরা আলাদা জাতিতে পরিণত হই।

মাওলান বলেন, কুরআন মজীদ ভূ-পৃষ্ঠের এ বিপুল জনতার মধ্যে কেবল দুটি পার্টিরই অস্তিত্ব স্বীকার করেছে : একটি হচ্ছে আল্লাহর দল (حـــزب الله) আর অপরটি হচ্ছে শয়তানের দল (حـــزب الشيطان) শয়তানের দলের পরস্পরের মধ্যে নীতি ও আদর্শের দিক দিয়ে যতোই পার্থক্য ও বিরোধ হোক না কেন, কুরআনের দৃষ্টিতে তা সবই এক। কারণ, তাদের চিন্তা, পদ্ধতি ও কর্মনীতি কোনো দিক দিয়েই ইসলামী নয়। আর খুঁটিনাটি ও ক্ষুদ্র ব্যাপারে মতবিরোধ সত্ত্বেও তারা সকলেই এক শয়তানের পদাংক অনুসরণ করতে সম্পূর্ণরূপে একমত।

বইটি দারুণ একটি বই, যা আপনার চিন্তাজগতকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করবে। বইটি পড়ুন, মুসলিমদের ঐতিহাসিক পটভূমি জানুন। যে বিষয়কে নিয়ে মওদূদী ও দেওবন্দের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়েছে সে সম্পর্কেও জানা যাবে এই বই থেকে।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : মুহাম্মদ আবদুর রহীম
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ১৩৩
মুদ্রিত মূল্য : ৬৫
জনরা : থিয়োলজি

২১ জুলাই, ২০২২

ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?


১৯৪০ সালের কথা। আমাদের উপমহাদেশ তখন স্বাধীনতার জন্য উত্তাল। স্বাধীনতা দাবীদাররা আবার দুইভাগে বিভক্ত। মুসলিমরা আলাদাভাবে স্বাধীনতা চায়। তারা পাকিস্তান নামে আলাদা রাষ্ট্র করতে চায়। এই দাবীর পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি নাম 'মুসলিম লীগ'।

অন্যদিকে হিন্দুরা এক ভারত চায়। ভারত ভাঙ্গুক এটা তারা চায় না। এই দাবীর পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি হলো 'কংগ্রেস'। মুসলিমরা গত ৫০ বছরে কংগ্রেসের ভয়ংকর বর্ণবাদী আচরণে নিশ্চিত হয়েছে ভারত ইংরেজদের থেকে স্বাধীন হয়ে কংগ্রেসের হাতে পড়লে পরস্থিতি আরো ভয়ংকর হবে। মুসলিমরা পাইকারিভাবে নিধন হবে।

শুনতে ভিন্নরকম শোনালেও হিন্দুপ্রধান সংগঠন কংগ্রেসের মতামতের সাথে একাত্মতা পোষণ করলো দেওবন্দী আলেমদের মূল সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। আর তাদের নেতা হুসাইন আহমদ মাদানী ১৯৩৮ সালে ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসার আলেমদেরকে তো দেওবন্দীরা পাত্তাই দিত না।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' নামে গবেষণানির্ভর বই লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত মুসলিম লীগ একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি পায়।

কিন্তু মাওলানা মুসলিম লীগে যোগদান করেননি। তিনি মুসলিম লীগের সাথে এই বিষয়ে একমত যে, মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের দরকার আছে। এটা খুবই জরুরি। কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা সেই রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, যে কর্মসূচি ঘোষণা করছে তা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নয়। সবচেয়ে বড় কথা একটি ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য যে যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের দরকার, মুসলিম লীগ সেই লোক তৈরি করছে না এবং লোক তৈরির কর্মসূচিও তাদের নেই। এই নিয়ে মুসলিম লীগের সমালোচনা করেছেন তিনি। মাওলানার এই অবস্থানকে কেউ কেউ পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান বলে মিথ্যাচার করেন।

যাই হোক আমরা মূল প্রসঙ্গে আসি। ১৯৪০ সালে মাওলানা রাষ্ট্রের বিষয়ে তাঁর অবস্থান ক্লিয়ার করেন। এটা সেসময়ের কথা, জামায়াতে ইসলাম তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মাওলানা একজন ইসলামিক স্কলার হিসেবে সারা হিন্দুস্থানজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন। ১২ই সেপ্টেম্বর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচি হলে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা মওদূদীকে অতিথি করা হয়। সে প্রোগ্রামে অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মওদূদী ইসলামী রাষ্ট্র গঠন কীভাবে হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন।

তাঁর এই বক্তব্য আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বই আকারে বের করে। বইটির নাম হলো 'ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যায়'। এই বইটি উপমহাদেশে ব্যাপক তোলপাড় করে। বিচক্ষণ মুসলিমরা এই বইটিকে সাদরে গ্রহণ করে। এই বইটি বাংলায় অনুবাদ হয় প্রথমে 'ইসলামী বিপ্লবের পথ' এই নামে। পরে সংশোধন করে 'ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?' এই নামে প্রকাশিত হয়। বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন আব্দুস শহীদ নাসিম।

মাওলানা মওদূদীর এই বক্তব্যকে ৬টি ভাগে ভাগ করা যায়। বলা যায় তিনি ৬ টি বিষয়ে কথা বলেছেন।
১. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন।
২. আদর্শিক রাষ্ট্র।
৩. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র ।
৪. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি।
৫. অবাস্তব ধারণা-কল্পনা।
৬. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতি।

১. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন:
রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। একটা সমাজের মানুষের চিন্তা চেতনা, সংস্কৃতি, আচরণ এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিবর্তন হয়। অতএব হুট করে একটি জাহেলি সমাজকে ইসলামী সমাজে পরিণত করা যায় না। এর জন্য প্রথমে প্রয়োজন ঐ রাষ্ট্রের মানুষের পরিবর্তন। মাওলানা এখানে বুঝাতে চেয়েছেন শুধু একটি ভৌগলিক সীমারেখা নির্ধারণ করলেই ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায় না। বরং এর জন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে।

২. আদর্শিক রাষ্ট্র:
ইসলামী রাষ্ট্র মানে মুসলিমদের রাষ্ট্র নয়। মুসলিমরা রাষ্ট্র কায়েম করলে সেটি ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায় না। ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে সেটি যে রাষ্ট্রে ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়। এখানে জাতীয়তাবাদের লেশমাত্র থাকবে না। আদর্শিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গোটা মানবজাতিকে তার আদর্শ গ্রহন করে অজাতীয়তাবাদী বিশ্বজনীন রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানায়।

মাওলানা তাঁর কাঙ্খিত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন,
১. রাষ্ট্রের আদর্শ হবে ইসলাম
২. সংকীর্ন জাতীয়তাবাদ হতে সম্পূর্ন মুক্ত
৩. অন্যান্য রাষ্ট্রনীতি হতে সম্পূর্ণ পৃথক।
৪. জনগনের অধিকার সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
৫. যোগ্যতার বলে যে কেউ শাসক হতে পারে।
৬. উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
৭. সার্বভৌমত্ব হবে আল্লাহর, প্রতিনিধিত্ব হবে জনগনের।

৩. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র:
মাওলানা বলেন, আমরা যে রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই সেখানে সার্বভৌমত্ব হবে একমাত্র আল্লাহর। তাঁর বিধান, আইনই শেষ কথা। এই রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে, এখানে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করবে। এই খিলাফাত প্রতিষ্ঠার কাজে এমন সব লোকই অংশীদার হবে, যারা এই আইন ও বিধানের প্রতি ঈমান আনবে এবং তা অনুসরণ ও কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই রাষ্ট্রের সকল কাজের জন্য সামষ্টিকভাবে আমাদের সকলকে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেককে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ রাষ্ট্রের পরিচালকদের অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের মালিক নয়, আমানতদার হবে। শাসকগণ জনগনের কল্যান চিন্তায় বিনিদ্র রজনী কাটাবে। শাসক নির্বাচিত হবে জনগণের মতামত নিয়ে। বংশানুক্রমিক বা জবরদস্তি করে ক্ষমতা দখল করা যাবে না।

৪. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি:
মাওলানা বলেন, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য প্রথমে এমন একটি আন্দোলন প্রয়োজন যে আন্দোলনের মধ্যে ইসলামের প্রাণশক্তির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। এখানে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এমনসব বিশেষজ্ঞ তৈরি করবে যারা নিজেদের মন মানসিকতা, ধ্যানধারনা ও চিন্তা দর্শনের দিক থেকে হবে পূর্ণ মুসলিম। যাদের ইসলামের মূলনীতির ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নকশা তৈরি করার থাকবে পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা।

৫. অবাস্তব ধারণা কল্পনা:
কিছু লোকের ধারণা মুসলমানরা সংগঠিত হলেই তাদের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মূলত জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে এই ধারণার উদ্ভব। সত্যিকারভাবে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। তারা ভাবে “মুসলমান” একটি বংশগত বা ঐতিহাসিক জাতির ধারণা। মুসলিমদের ঐক্যের মাধ্যমে সেই জাতিটিরই কেবল উন্নতি সাধন করা এবং একটি জাতীয় রাষ্ট্র অর্জিত হতে পারে। কিংবা কমপক্ষে দেশ শাসনে ভাল একটা অংশীদারিত্ব লাভ হতে পারে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লব বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে এটাকে প্রথম পদক্ষেপও বলা যেতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ইসলামকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করা। ইসলামী বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা। মাওলানা এখানে মূলত মুসলিম লীগের সমালোচনা করেছেন। মুসলিম লীগ ভেবেছে মুসলিমদের রাষ্ট্র হলেই সেটা ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যাবে। কিন্তু মাওলানা বলেন, এর দ্বারা মুসলিমদের উপকার হতে পারে, একটি ভালো শাসন পাওয়া যেতে পারে তবে কোনোভাবেই এটি ইসলামী রাষ্ট্র হবে না। এই রাষ্ট্র দিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব পালন হবে না।

৬. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতি:
সবশেষে মাওলানা আমাদের কর্মনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এক আল্লাহর একচ্ছত্র ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে মানবজীবনের পরিপূর্ণ ইমারত রচনা করার প্রচেষ্টা ও আন্দোলনকে বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে বলা হয় ইসলাম। আর এর জন্য মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা:) এর অনুসৃত পথেই ইসলামী আন্দোলনের কর্মনীতি পরিচালনা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে আল্লাহর বিধান কায়েম হবে তথা তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। আর মুহাম্মদ সা.-এর সীরাত থেকেই এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি আমরা গ্রহণ করবো।

এটি একটি দারুণ বই! ইসলামী রাষ্ট্র যারা প্রতিষ্ঠা করতে চান তাদের জন্য এটা টেক্সট বুক। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এটা পড়া দরকার। যারা এখনো পড়েননি তারা অবশ্যই পড়বেন। আপনার চিন্তা পরিশুদ্ধ হবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যারা চেষ্টা করছেন তাদের অন্তরে যদি চরমপন্থী ধারণা থাকে তবে তা দূর হবে ইনশাআল্লাহ।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : আব্দুস শহীদ নাসিম
প্রকাশনী : শতাব্দী প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ৪৮
মুদ্রিত মূল্য : ২৪
জনরা : থিয়োলজি


১৯ জুলাই, ২০২২

একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ

১৯৭১ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত অনেক খুব পড়ে যায়। রাজনীতি করার অধিকার হারিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। আওয়ামীলীগের পতনের পরে আস্তে আস্তে জামায়াত রাজনীতিতে ফিরে আসতে শুরু করে।

১৯৮৪ সালে জামায়াত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলার প্রস্তাব দেয় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে। কারন সে সময়ের ধূর্ত শাসক লে জে হু মু এরশাদের অধীনে নির্বাচন কারো পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। জামায়াতের এই ফর্মুলা সেসময় সরকারি দলতো গ্রহন করেইনি। বিরোধী দলের মধ্যেও কেউ গ্রহন করেনি। একই ফর্মূলা সকল বিরোধী দল গ্রহন করেছে ১৯৮৯ সালে। সকল বিরোধী দল তখন এই ফর্মূলা বাস্তবায়নের জন্য যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। তারই প্রেক্ষিতে গণঅভ্যুত্থান হয় এরশাদের পতন হয়। 


১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলাতে নির্বাচন হয়। বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পায় তবে অল্পের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিস করে। জামায়াত ১৮টি সিট পায়। এটা ছিল খুবই চমকপ্রদ ঘটনা। জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দেয়, বিএনপি সরকার গঠন করে। এর কিছুদিন পরই সংসদে দাবী উঠে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। আওয়ামীলীগ এই দাবী উত্থাপন করে। বিএনপি এই দাবী প্রত্যাখ্যান করে। এই নিয়ে জামায়াত বিএনপিকে রাজী করানোর চেষ্টা করে। সেই সময় সংসদে মাওলানা নিজামী খালেদাকে বলেন আমরা মোটেই আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা দেশগঠনে আপনাকে সহায়তা করতে রাজি। কিন্তু আপনি জোর করে আমাদের আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বাধ্য করবেন না। কিন্তু সেই সময়ের খালেদা জিয়া সেটা মেনে নিতে অসম্মত হয়। জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আন্দোলন করে। আওয়ামীলীগও একই দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু যতটা না আওয়ামীলীগের তার চাইতে বেশী জামায়াতের। 

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয় বিএনপি। ১৯৯৬ তে দু'বার নির্বাচন হয়। ১ম বার সকল বিরোধী দল বয়কট করে। পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হয়। জামায়াত এই নির্বাচনে মাত্র ৩ টি আসন পায়। আগের ১৫ টি আসন হাতছাড়া হয়। এতে জামায়াতের মধ্যে ব্যাপক কথাবার্তা হয়। অনেকে মনে করতে থাকে জামায়াত পতনের মুখে চলে এসেছে। 

এই পরিস্থিতিতে আব্বাস আলী খান একটি বই লিখেন। তিনি সেখানে একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ কী হতে পারে এবং তা থেকে বাঁচার কী উপায় হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটির নাম 'একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়। আব্বাস আলী খান তখন ছিলেন জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর। 

বইটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। দলের সাফল্যের জন্য যেমন কারণ থাকে, পতনের জন্যও তেমনি কারণ থাকে। কর্মীকে জানতে হয় কি কি কারণে পতন হয় এবং কীভাবে তা থেকে বাঁচা যায়। জামায়াত একটি আদর্শিক দল বিধায় এই বইটি তাদের জন্য গাইড বুক হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক আব্বাস আলী খান প্রথমে একটি আদর্শবাদী দলের স্বরূপ কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এখানে যেটা বুঝাতে চেয়েছেন তা হলো একটি আদর্শবাদী দলের পতন তখনই হয় যখন সেই দল তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক জয় পরাজয় মূখ্য বিষয় নয় বরং আদর্শের সাথে সংগতি রাখাই বেসিক ব্যাপার। এরপর লেখক জামায়াত প্রতিষ্ঠার পটভূমি আলোচনা করেন। দারুল ইসলাম ট্রাস্ট গঠন ও ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্যে দল গঠনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা বলেন। 

একটি দলের উন্নতি, অগ্রগতি ও সাফল্যের পেছনে যেমন কিছু কারণ থাকে, তেমনি বিকৃতি ও পতনের পিছনেও কিছু কারণ থাকে। যেহেতু কোন দলই চায় না যে, দলের বিকৃতি ও পতন ঘটুক, সেহেতু কারণগুলো ভাল করে জেনে নিয়ে তা সৃষ্টির আগেই প্রতিরোধ করতে পারলে বিকৃতি ও পতন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আব্বাস আলী খানের মতে জামায়াতের বিকৃতি ও পতন হবে ১৩টি কারণে

১. জামায়াতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহন না করা।
২. কুরআন হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন না করা ।
৩. সময় ও আর্থিক কুরবানীর প্রতি অবহেলা ।
৪. দলীয় মূলনীতি মেনে না চলা ।
৫. দলের ভেতরে ও বাইরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করা।
৬. ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব।
৭. পারষ্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়া
৮. জামায়াত ইসলামী দল হিসেবে তার প্রকৃত পরিচয় হারিয়ে ফেলে এবং নিষ্ক্রিয় ও প্রাণহীন হয়ে পড়া।
৯. জনশক্তির মধ্যে নৈরাশ্য ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া।
১০. নেতৃত্বের অভিলাষ বা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া। 
১১. অর্থ-সম্পদের প্রতি লালসা তৈরি।
১২. জীবন মান উন্নত করার প্রবণতা।
১৩. সহজ সরল জীবন যাপন না করা।

লেখকের মতে জামায়াত তার পতন থেকে বাঁচতে পারে ১২ টি উপায়ে  

১. নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন।
২. অতিরিক্ত জিকির আজকার।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করা।
৪. আত্মসমালোচনা।
৫. ক্রোধ দমন করা।
৬. মৌলিক বিষয়ে একমত পোষণ করা।
৭. বিরোধী পরিবেশ পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।
৮. নেতৃত্বে দুর্বলতা পরিহার।
৯. নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা আন্দোলনের পতন ডেকে আনে।
১০. সমস্যার ত্বরিত ও সঠিক সমাধান।
১১. ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য প্রস্তুত থাকা।
১২. বাইতুলমালে আমানতদারীতা ও সততা।

লেখক শেষে এসে বলেছেন নিয়মিত হকের দাওয়াত দেওয়া অপরিহার্য। এটা পতন থেকে বাঁচার কার্যকর পন্থা। আর দাওয়াত দাতার মধ্যে যেসব গুণ থাকা দরকার তা অর্জন করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি আরো বলেন, পতনের অন্যতম কারণ হলো, নিয়মিত দ্বীনি সাহিত্য পড়াশুনা বন্ধ হওয়া। তাফহীম, সীরাতে সরওয়ারে আলম, রাসায়েল মাসায়েল, মাওলানার অন্যান্য বই না পড়ার পরিণাম। এর ফলে চিন্তার ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয় এবং ঐক্যের অভাব ঘটে। নৈরাশ্য, অবসাদ, ক্লান্তি, আন্দোলন বিমুখতা ও নিষ্ক্রিয়তা আসে।

#বুক_রিভিউ 
বই : একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়
লেখক : আব্বাস আলী খান 
প্রকাশনী : প্রকাশনা বিভাগ, জামায়াতে ইসলামী। 
পৃষ্ঠা : ৪০
মুদ্রিত মূল্য : ১৮
জনরা : থিয়োলজি


১৭ জুলাই, ২০২২

সত্যের সাক্ষ্য


১৯৪৬ সালের কথা। জামায়াতের বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। এসময় জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদূদী রহ. ভারতজুড়ে চষে বেড়াচ্ছেন, বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন ও ইসলামী আন্দোলন তথা ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। তেমনি একটি সাধারণ সভার আয়োজন হয়েছিল পাঞ্জাবের শিয়ালকোট জেলার মুরাদপুরে। শিয়ালকোট এখন পাকিস্তানের একটি মোটামুটি প্রসিদ্ধ শহর। ১৯৪৬ সালে তখনো পাকিস্তান গঠিত হয়নি। পাকিস্তানের জন্য জোর আন্দোলন চলছিল।

মুরাদপুরের সেই সভায় সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সামনে একটি বক্তব্য রাখেন মাওলানা মওদূদী। সেখানে মাওলানা মওদূদীর রহ.-এর বক্তব্যের বিষয় ছিল একজন মুসলিমের ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য কী? বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রহ.-এর সেই ভাষণ 'শাহদাতে হক' নামে উর্দুতে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

বাংলায় এই বইটি 'সত্যের সাক্ষ্য' নামে প্রকাশিত হয়েছে। উর্দু থেকে এটি অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। যেহেতু বইটি একটি বক্তব্যের লিখিত রূপ তাই এখানে অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা হয়নি। তবে যে কয়টি প্রধান বিষয় এখানে আলোকপাত করা হয়েছে তা হলো, আমাদের দাওয়াত, মুসলিমদের দায়িত্ব, সত্যের সাক্ষ্য, সাক্ষ্যদানের পদ্ধতি, সত্য গোপনের শাস্তি, মুসলিমদের সমস্যা, আমাদের উদ্দেশ্য ও জামায়াত সম্পর্কে কিছু অভিযোগের জবাব।

আমাদের দাওয়াত
মাওলানা মওদূদী এখানে আমাদের দাওয়াত বলতে জামায়াতের দাওয়াত বুঝিয়েছেন। জামায়াতের দাওয়াত দুই শ্রেণির প্রতি। যারা মুসলিম নয় এবং যারা মুসলিম। যারা মুসলিম নয় তাদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেওয়া হয়। আল্লাহকে একক রব হিসেবে মেনে নেওয়া ও মুহাম্মদ সা.-কে তাঁর প্রেরিত রাসূল হিসেবে মানার দাওয়াত দেওয়া হয়। আর যারা মুসলিম তাদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহবান জানানো। আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য আহ্বান জানানো হয়।

মুসলিমদের দায়িত্ব
এই প্রসঙ্গে মাওলানা বলেন, শুধু সত্যের ওপর ঈমান আনলেই হবে না। বরং সে সত্যের ওপর আপনারা ঈমান এনেছেন তার সাক্ষীরূপে সারা দুনিয়ার সামনে দাঁড়াতে হবে। কুরআনে আপনাদেরকে 'মুসলমান' নামে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সাথে এই দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে, আপনারা দুনিয়ার মানুষের সামনে হকের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াবেন। এরপর মাওলানা সূরা আল বাকারার ১৪৩ নং আয়াত পাঠ করেন। আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদেরকে এক মধ্যমপন্থী জাতি বানিয়েছি। যাতে তোমরা লোকদের জন্য সাক্ষী হও আর রাসূল যেন তোমাদের জন্য সাক্ষী হন।

মাওলানা এই বক্তব্য যখন দিচ্ছিলেন তখন ভারতীয় উপমহাদেশের আরেকজন মাওলানা বলেছেন। হিন্দু-মুসলিম আমরা এক জাতি। এক মাটির সন্তান। তাই আমরা একসাথে থাকবো। হোসাইন আহমেদ মাদানীর সেই বক্তব্যকেও এখানে খন্ডন করা হয়েছে। কারণ মুসলিমরা স্বতন্ত্র জাতি। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আলাদা। এরপর মাওলানা কুরআনের আরো কিছু কুরআনের আয়াত তিলওয়াত করেন যেখানে মুসলিমদের সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং সত্যের সাক্ষ্য না দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে বলেছেন। সেগুলো হলো, সূরা নিসা ১৩৫, বাকারা ৬১ ও ১৪০।

সত্যের সাক্ষ্য
মাওলানা বলেন, সত্যের সাক্ষ্য হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য এসেছে, উদ্ভাসিত হয়েছে, তার সত্যতা দুনিয়ার সামনে এমনভাবে প্রকাশ করা যাতে দ্বীনের যথার্থতা প্রমানিত হয়, এটাই সত্যের সাক্ষ্য।

এই সাক্ষ্যের গুরুত্ব প্রসঙ্গে মাওলানা ৫ টি কথা বলেছেন, সাক্ষ্যদানের ভিতিত্তেই হাশরের ময়দানে ফয়সালা হবে। সাক্ষ্যদান সকল নবীর সুন্নাত। সত্যের সাক্ষী না হলে জালেমদের অন্তভূক্ত হবে। সাক্ষ্য না দিলে দুনিয়ার লাঞ্জনা, অপমান, অধ:পতন চেপে বসবে। সাক্ষ্য দান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া দায়িত্ব।

সাক্ষ্য দানের পদ্ধতি
মাওলানা বলেন, দুইভাবে সাক্ষ্য দিতে হবে। মৌখিকভাবে ও বাস্তবে। দুইটাই জরুরি।

নবী সা.-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে যে সত্য এসে পৌছেছে তা বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে মানুষের কাছে সহজবোধ্য করাকে মৌখিক সাক্ষ্য বলে। দাওয়াতের সকল পদ্ধতি প্রয়োগ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল উপাদান ব্যবহার করে ইসলামকে একমাত্র সঠিক পরিপূর্ণ বিধান হিসাবে প্রমান এবং প্রতিষ্ঠিত বাতিল মতাদর্শের দোষ ক্রটি তুলে ধরা হচ্ছে মৌখিক সাক্ষ্য। এই যে আমরা ফেসবুকিং বা ব্লগিং করছি এটাও মৌখিক সাক্ষ্য। আর আমরা যা মুখে বলছি, যা লিখছি তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের সামনে তার সত্যতা প্রমাণের নাম বাস্তব সাক্ষ্য।

মাওলানা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, আল্লাহর দ্বীনকে পরিপূর্ণভাবে মানতে পারলেই দ্বীনের পূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করা হবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকলে দ্বীনকে পরিপূর্ণভাবে মানা সম্ভব হয় না। সুতরাং শুধুমাত্র দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সাক্ষ্যদানের পূর্ণতা সম্ভব। নইলে তা পূর্ণতা পাবে না।

১৯৪৬ সালের পরিস্থিতি উল্লেখ করে মাওলানা বইলেন, আজ আমাদের সমাজে খুব কম সংখ্যক লোকই মৌখিক সাক্ষ্য দিচ্ছেন। দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত লোকই ইসলামকে বাদ দিয়ে মানব রচিত মতবাদকে সত্য বলে গ্রহণ করছেন। আজ পত্র পত্রিকা, ব্যবসা-বানিজ্য, আইন-আদালত সর্বোত্রই বাতিল মতবাদকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের সমাজে খুব সামান্য সংখ্যক লোক ছাড়া কেউই নিজ জীবনে বাস্তব সাক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতের চেয়েও আমাদের সামাজিক রীতিনীতির অবস্থা আরো খারাপ। এমনকি আজ আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ইসলাম বিরোধী মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে সংগ্রাম করছি। এই অভিযোগটা মূলত মাওলানা মুসলিম লীগকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। মুসলিম লীগের অনেক নেতাই প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ করার কথা বলেছিলেন।

সাক্ষ্য গোপন বা সত্য গোপনের শাস্তি
মাওলানা বলেন, আজ আমরা সত্য গোপন করে যে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছি এজন্য অবশ্যই ইহকাল ও পরকালে শাস্তি পেতে হবে। ইহকালে আমাদের সত্য গোপনের জন্য অপর জাতির হাতে লাঞ্চিত হতে হবে। যেমনটি ঘটেছে পূর্ববর্তী জাতিদের ক্ষেত্রে। দুনিয়ার চেয়েও কঠিন শাস্তি আমাদের পেতে হবে পরকালে। যদিও দুনিয়ার অশান্তি ও অনৈসলামিক কাজের জন্য আমরা দায়ী নই তবুও এগুলো দূর করার কাজ না করার জন্য আমাদেরকে শাস্তি পেতে হবে।

মুসলিমদের সমস্যা
১৯৪৬ সালে মুসলিমদের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তারা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। মাওলানা বলেন, এটা আমাদের মূল সমস্যা নয়, আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে আমরা বাস্তব জীবনে ইসলামকে মানতে পারিনা। আর এজন্য প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে আমরা সক্ষম হচ্ছি না। তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে দ্বীনের হককে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ইসলামের বিধান মোতাবেক যাবতীয় কাজ সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মাওলানা আরো সুন্দর কথা বলেছেন, শাহদাতে হক বা সত্যের সাক্ষ্যের মাধ্যমে সংখ্যালঘু পরিণত হবে সংখ্যাগুরুতে।

আমাদের উদ্দেশ্য
এখানে মাওলানা আমাদের উদ্দেশ্য বলতে জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করেছেন। উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাওলানা বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনকে নিজের জীবনে, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। কথা ও কাজের মাধ্যমে তার যথার্থ সাক্ষ্য দুনিয়ার সামনে পেশ করা। মুসলমান হিসেবে দ্বীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও সত্যের সাক্ষ্য দানই আমাদের জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য। এরপর মাওলানা সংগঠনের কর্মপদ্ধতি, সংগঠন প্রতিষ্ঠা, কাজের ধারা নিয়ে আলোচনা করেন। এই আলোচনা শেষে তিনি উপস্থিত জনগণকে জামায়াতে শামিল হওয়ার জন্য আহ্বান জানান।

অভিযোগের জবাব
আলোচনার শেষ দিকে মাওলানা জামায়াতের ব্যাপারে উত্থাপিত কিছু অভিযোগের জবাব দেন। এর মধ্যে ছিল জামায়াত নতুন ফিরকা তৈরি করে মুসলিমদের মধ্যে দলাদলি করছে। আমীর শব্দটা কেন ব্যবহার করা হচ্ছে? এর দাবীদার একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক। পৃথক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা কী? জামায়াত কী অধিকারে যাকাত গ্রহণ করে? বাইতুল মাল কেন বানিয়েছে? ইত্যাদি। এসব কিছু প্রশ্নের দারুণ জবাব দিয়েছেন মাওলানা মওদূদী রহ.।

জবাব দান শেষে মাওলানা বলেন, প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ প্রশ্নই এমনি নিরর্থক যে, এগুলোর জবাব দান করে শ্রোতাবৃন্দের সময় নষ্ট করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তবু আমি নমুনা স্বরূপ কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দান করলাম এ জন্যে যে, যারা নিজেরাও দায়িত্ব পালন করতে চান না, বরং অন্যকেও তা করতে দিতে প্রস্তুত নন, তারা কি ধরণের বাহানা, কুটিল প্রশ্ন এবং সন্দেহজনক বিষয় খুঁজে খুঁজে বের করেন এবং নিজেরা যেমন আল্লাহর পথ থেকে বিরত থাকেন, তেমনি করে অন্যকেও কীভাবে বিরত রাখার চেষ্টা করেন।

বস্তুত অহেতুক ঝগড়া-বিবাদ এবং বিতর্ক-মুনাযারায় লিপ্ত হওয়া আমাদের কাজের পন্থা নয়। যদি কেউ সহজ-সরলভাবে আমাদের কথা বুঝতে চান, তো তাকে বুঝানোর জন্যে আমরা সদা প্রস্তুত। আর যদি কেউ যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা আমাদের ভূল-ভ্রান্তি ধরিয়েদিতে চান তা-ও আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু কেউ বিতর্ক সৃষ্টি করলে এবং আমাদের তাতে জড়িত করতে চাইলে আমরা তার সম্মুখীন হতে মোটেই সম্মত নই। বিরুদ্ধবাদীগণ যতক্ষণ ইচ্ছা এ খেলা চালু রাখতে পারেন।

জামায়াতকে বুঝতে ও মুসলিম হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট একটি বই। যারা এখনো বইটি পড়েননি, পড়ে নিন। আপনার মন ভরে যাবে। মুসমানিত্বের দায়িত্ব পালনে আপনি সচেষ্ট হবেন ইনশাআল্লাহ।

#বুক_রিভিউ
বই : সত্যের সাক্ষ্য
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
প্রকাশনী : প্রকাশনা বিভাগ, জামায়াতে ইসলামী।
পৃষ্ঠা : ৪০
মুদ্রিত মূল্য : ১৬
জনরা : আত্মউন্নয়ন ও মোটিভেশন

১৬ জুলাই, ২০২২

ইসলাম পরিচিতি

 


বিংশ শতাব্দির শুরুটা ছিল মুসলিমদের জন্য খুবই হতাশাজনক। ইউরোপিয়ানরা পৃথিবীতে তাদের আগ্রাসন জোরদার করেছে, সাথে সাথে তারা জ্ঞান বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি করে পৃথিবী শাসনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। মুসলিম যুবকদের মধ্যে পশ্চিমা প্রীতি ও ইংরেজ প্রীতি বেড়ে যাচ্ছিল। মুসলিম শাসকদের একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারীর সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা মুসলিম যুবকদের মুসলিম শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলছিল।

এর মধ্যে ১ম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানীয় খিলাফত পরাজিত হওয়ার সূত্র ধরে মুসলিমদের আশা ভরসার শেষ ঠিকানাও নিঃশেষ হয়ে যায়। ১৯২৩ সালে খিলাফত ভেঙ্গে দেওয়া হয়। সারা পৃথিবীতে মুসলিমরা এলাকাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে বিভক্ত হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহ বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

এদিকে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে কম্যুনিস্টদের বিপ্লব মুসলিম আদর্শবাদীদের কম্যুনিস্টদের দিকে ধাবিত করে। সব মিলিয়ে মুসলিম সমাজের অবস্থা ছিল হযবরল। মুসলিমরা নিশ্চিত হয়ে গেছে তত্ত্ব হিসেবে ইসলাম আর ফাংশনাল না। ইসলাম দিয়ে সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব না।

মুসলিম যুবকদের কেউ পশ্চিমা পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। কেউ কম্যুনিস্টদের বাম বিপ্লবে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাজে অবস্থায় ইসলামের স্বরূপ তুলে ধরে মুসলিমদের ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও সংগঠক সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী রহ.।

১৯৩২ সালে তিনি নিজেও যুবক। তাঁর তখন ২৯ বছর। তিনি ইসলাম বলতে কী বুঝায় ও ইসলামের সঠিক তত্ত্ব সবার সামনে উপস্থাপন করার জন্য একটি বই লিখেন 'রিসালায়ে দ্বীনিয়াত' নামে। বইটিতে তিনি ইসলামের স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। এই বইটি উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পৃথিবীর সকল প্রধান ভাষাসহ প্রায় ২৩ টি ভাষায় বইটি অনুবাদ হয়।

বইটি সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে আফগানিস্তানে। ১৯৬০ সালের পর থেকে আফগানিস্তানের মানুষ পার্শ্ববর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে কম্যুনিস্ট হতে শুরু করে। এই বইটি তাদেরকে কম্যুনিজম থেকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। আর এই বই নিয়ে আফগানিস্তান চষে বেড়িয়েছেন তৎকালীন কাবুল ভার্সিটির শিক্ষক ও পরবর্তিতে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট শহীদ বুরহান উদ্দিন রব্বানী।

বাংলায় 'রিসালায়ে দ্বীনিয়াত' বইটি অনুবাদ হয় 'ইসলাম পরিচিতি' নামে। অনুবাদ করেন সৈয়দ আব্দুল মান্নান। আন্তর্জাতিক দায়ি বিলাল ফিলিপ্স বলেছেন তাঁর ইসলামের দিকে আসার জন্য দুইটি বই ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে একটি হলো রিসালায়ে দ্বীনিয়াত।

বইটিকে মাওলানা মওদূদী রহ. ৭ টি চ্যাপ্টারে ভাগ করেছেন।

১ম অধ্যায়ের নাম 'ইসলাম'
এই অধ্যায়ে মাওলানা কেন ইসলাম নাম দেওয়া হয়েছে, ইসলামের অর্থ, এর তাৎপর্য আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি কুফর কী? কুফরের তাৎপর্য কী? এই আলোচনা করেছেন। অধ্যায়ের শেষে কুফর তথা ইসলামকে অস্বীকার করার কুফল ও ইসলামের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২য় অধ্যায়ের নাম 'ঈমান ও আনুগত্য'
এই অধ্যায়ে তিনি প্রথমে আনুগত্যের জন্য জ্ঞান ও প্রত্যয়ের প্রয়োজন এটা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেছেন, মানুষ ততোক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য করতে পারে না, যতোক্ষণ না সে কতগুলো বিশেষ জ্ঞান লাভ করে এবং সে জ্ঞান প্রত্যয়ের সীমানায় পৌঁছে। সবার আগে মানুষের প্রয়োজন আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ণ প্রত্যয় লাভ। কেননা আল্লাহ আছেন, এ প্রত্যয় যদি তার না থাকলো, তা হলে কি করে সে তার প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে?

এরপর তিনি ঈমানের পরিচয় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এর ভিত্তিতে মানুষকে চারভাগে ভাগ করেছেন। এরপর তিনি জ্ঞানর্জনের মাধ্যম তথা ওহি নিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়ের শেষে তিনি ঈমান বিল গায়েবের আলোচনাও করেছেন।

৩য় অধ্যায়ের নাম নবুয়্যত
এখানে মাওলানা মওদূদী নবুয়্যত নিয়ে আলোচনা করেছেন। নবুয়্যতের মূলতত্ত্ব ও এর পরিচয় কথা বলেছেন। নবীর আনুগত্য ও তাদের ঈমানের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি নবীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা করেছেন। তাদের সাথে মানুষের বিভিন্ন আচরণেরও বর্ণনা দিয়েছেন। নবী হিসেবে মুহাম্মদ সা.-এর প্রমাণ ও নবুয়তের ভূমি হিসেবে আরবকে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। সবশেষে মুহাম্মদ সা. যে শেষ নবী সে বিষয়ে আলোচনা করেন।

৪র্থ অধ্যায়ের নাম 'ঈমানের বিবরণ'
এখানে মাওলানা মূলত কালেমা তাইয়েবার তাৎপর্য উল্লেখ করেন। এই প্রসঙ্গে বলেন, এ কালেমা-ই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদ-যা দিয়ে এক কাফের এক মুশরিক ও এক নাস্তিক থেকে মুসলিমের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। এ কালেমার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি দ্বারা এক মানুষ ও অপর মানুষের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রচিত হয়। এ কালেমার অনুসারীরা পরিণত হয় এক জাতিতে এবং অমান্যকারীরা হয় তাদের থেকে স্বতন্ত্র জাতি। এর অনুসারীরা দুনিয়া থেকে শুরু করে আখেরাতে পর্যন্ত উন্নতি, সাফল্য ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং অমান্যকারীদের পরিণাম হচ্ছে ব্যর্থতা অপমান ও পতন। কালেমা তাইয়েবা সম্পর্কে একটি চমৎকার আলোচনা আছে এই অধ্যায়ে। সাথে ঈমানের অন্যান্য বিষয় যেমন রাসূল, কিতাব, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদি নিয়েও আচোলনা করেছেন মাওলানা মওদূদী।

৫ম অধ্যায়ের নাম 'ইবাদত'
এখানে মাওলানা ইবাদতের হাকিকত ও গুরুত্ব উল্লেখ করেন। সেই সাথে সালাত, সাওম, যাকাত, হজ্ব ও জিহাদ নিয়ে আলোচনা করেন। জিহাদ ও জিহাদের পরিব্যপ্তি নিয়ে এখানে একটি সুন্দর আলোচনা রয়েছে।

৬ষ্ঠ অধ্যায়ের নাম 'দ্বীন ও শরিয়ত'
এখানে মাওলানা দারুণভাবে দ্বীন ও শরিয়তকে বুঝিয়েছেন। দ্বীন ও শরিয়তের পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। শরীয়ত জানাত মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফিকাহ ও এর ডেবলেপমেন্ট নিয়ে কথা বলেছনে। সবশেষে তাসাউফ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফিকহ ও তাসাউফের মধ্যে সম্পর্ক সূচিত করেছেন।

৭ম ও শেষ অধ্যায়ের নাম 'শরীয়াতের বিধি-বিধান'
এই অধ্যায়ে মাওলানা দারুণভাবে শরিয়তে সবার অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। মাওলানা বলেন, শরীয়াত হচ্ছে একটি চিরন্তন বিধান। এর কানুন সমূহ কোন বিশেষ কওম ও কোন বিশেষ যুগের প্রচলিত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের উপর গড়ে ওঠেনি, বরং যে প্রকৃতির ভিত্তিতে মানুষ সৃষ্ট হয়েছে, সেই প্রকৃতির নীতির বুনিয়াদেই গড়ে ওঠেছে এ শরীয়াত। এ স্বভাব-প্রকৃতি যখন সকল যুগে সকল অবস্থায় কায়েম রয়েছে, তখন এরই নীতির বুনিয়াদে গড়া আইনসমূহ ও সর্ব যুগে সর্ব অবস্থায় সমভাবে কায়েম থাকবে।

এই বইটি পড়লে ইসলামের ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান অল্পতেই গোছানোভাবে জানা সম্ভব। ইসলাম কী? কেন? কীভাবে? ও কী চায়? সব জানা সহজ হয়ে যাবে। যারা এখনো পড়েননি বইটি পড়ে দেখুন। আপনার দিগন্ত উন্মোচন হয়ে যাবে। ইসলামের ব্যাপারে জোরালো আস্থা তৈরি হবে।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলাম পরিচিতি
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : সৈয়দ আব্দুল মান্নান
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ১১১
মুদ্রিত মূল্য : ৬৫
জনরা : থিয়োলজি

১৫ জুলাই, ২০২২

চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান

 



যখন জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয় তখন নঈম সিদ্দিকী ছিলেন ২৫ বছরের যুবক। ১৯৪১ সালে জামায়াতের প্রতিষ্ঠা থেকেই তিনি এর সাথে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, আলেম, এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন। নঈম সিদ্দিকীর জন্ম ১৯১৬ সালের ৫ জুন পাঞ্জাবে। তিনি উলুম-ই-ইসলামিয়া ফাজিল সম্পন্ন করেন। এরপর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবী ও ফার্সি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। 

তিনি তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু করেছিলেন নসরুল্লাহ খান আজিজের সম্পাদনায় করাচী থেকে বের হওয়া দ্বিমাসিক পত্রিকা 'কাউসার'-এ যোগ দিয়ে। পরবর্তীতে, তিনি মাসিক চেরাগ-এ-রহে যোগদান করেন এবং নয় বছর এটির সম্পাদক ছিলেন। তিনি পত্রিকা, সাময়িকী ব্যবহার করে উপমহাদেশে ইসলামী জ্ঞান প্রচার এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তাঁর লেখা মুসলিমদের মধ্যে ব্যপক সাড়া ফেলেছিলো। তাঁর কবিতাগুলো মুসলিমদের মুখে মুখে ছড়িয়ে যেত। তিনি ছদ্মনামে রম্যরচনাও করতেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে আমরা ওনার দারুণ সাহিত্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি। ৭১ এর পর থেকে এদেশে মুসলিমদের মধ্যে উর্দু-ফার্সি চর্চা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা ওনার সাহিত্য থেকে বঞ্চিত হই।   

মাওলানা মওদূদী ইন্তেকাল করার পর দীর্ঘদিন তিনি মাসিক পত্রিকা তারজুমানুল কুরআনের সম্পাদকও ছিলেন। মাওলানা নঈম সিদ্দিকীর সেরা কীর্তি মুহসিনে ইনসানিয়াত বা মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা.। এতে মুহাম্মদ সা. এর জীবনের বিভিন্ন দিক দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও তিনি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ওপরে আরো অনেক বই লিখেছেন। 

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের পাশাপাশি ইসলামের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর প্রায় ৭০০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। উপমহাদেশের বাইরে আরবেও তাঁর লেখার ভক্ত তৈরি হয়েছিল প্রচুর। তিনি সারাবিশ্বে আরেকটি প্রবন্ধের জন্য পরিচিত। সেটি বাংলায় 'চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান' নামে অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ করেছেন আব্দুল মান্নান তালিব।  

বিশ শতকের ষাটের দশকের শুরুর দিকে উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার নঈম সিদ্দিকী একটি প্রবন্ধ লিখেন 'তা'মীরে সিরাত কে লাওয়াজিম' নামে। এটি এখন চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান নামে বই আকারে পাওয়া যায় বাংলায়। 

এখানে লেখক জোর দিয়েছেন কীভাবে আমরা আমাদের চরিত্র ঠিক রাখবো। আর চরিত্র ঠিক রাখা মানে হলো ইসলামী আন্দোলনে টিকে থাকা বা ইসলামকে গালিব করার জন্য কাজ করা। চরিত্র নষ্ট বলতে লেখক বুঝিয়েছেন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইসলামী আন্দোলন থেকে বিচ্যুত হওয়া। উনি যেসময় লেখাটি লিখেছিলেন তখন ওনার দৃষ্টিতে দুটি কারণ ধরা পড়ে চরিত্র নষ্ট হওয়া তথা হকের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার। 

উনি বলতে চেয়েছেন যখন কোনো মানুষ ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়ার চেষ্টা করে তখন শয়তান ঐ মানুষের প্রতি তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। তাকে দুইভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। 

প্রথমত তাকে দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লোভ দেখায়। যেটাকে নঈম সিদ্দিকী বলেছেন পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও স্বার্থপূজারী সভ্যতার হামলা। 
দ্বিতীয়ত তাকে সাম্যবাদী সমাজের নামে ইসলামবিমুখ করার চেষ্টা করে। যেটাকে লেখক বলেছেন সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলা। 

বইটি লেখার প্রায় ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমান সমাজে শয়তানের এই দুটি আক্রমণের মধ্যে ১ম টি প্রবলভাবে অব্যাহত আছে এবং এটি আজীবন থাকবে বলে মনে করি। কারণ এর মাধ্যমে বেশিরভাগ ঘায়েল হয়েছে ও হচ্ছে। মানুষ বরাবরই সম্পদ, খ্যাতি, ক্ষমতার কাঙ্গাল। এটি মানুষের কমন ফিতরাত। নফসের চাহিদাও তাই। ফলে বেশিরভাগ মানুষ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শয়তানের ধোঁকায় পড়ে। 
 
সমাজতন্ত্র সেসময় ট্রেন্ডি আদর্শ ছিল। মুসলিম যুবকরা কম্যুনিস্টদের কবলে পড়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তারা কিন্তু আদর্শের জন্য ডেডিকেটেড ছিল। যেহেতু তারা আদর্শের জন্য উন্মূখ ছিল তাই ওদের চেয়ে ভালো আদর্শ উপস্থাপন করতে পারলেই সমস্যা কেটে যাবে। জামায়াতে ইসলাম উপমহাদেশে সেই ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামকে সঠিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরেছে। ফলে বহু কমিউনিস্ট নেতা তওবা করে সঠিক মুসলমান হয়েছে। 

কমিউনিস্টদের আদর্শ বিশ্বব্যাপী মার খাওয়ায় সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলা ষাটের দশকের চেয়ে অনেক অনেক কমে গিয়েছে। কিন্তু এই স্থান দখল করে নিয়েছে সেক্যুলারিজম। তারা ইসলাম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে দিয়েছে। ফলে একশ্রেণির মুসলিম তৈরি হচ্ছে যারা পার্সোনালি ইসলামকে ভালোবাসে। নামাজ রোজা করে কিন্তু রাষ্ট্র থেকে অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিহার করতে সচেষ্ট তো থাকেই না। উল্টো রাষ্ট্রকে ইসলামী কানুন থেকে আলাদা রাখতে চায়। 

শয়তানের আক্রমনের টুলস পরিবর্তন হলেও চরিত্র সংরক্ষণের টুলস অপরিবর্তিত। নঈম সিদ্দিকী লিখেছেন এর জন্য তিনটি কাজ করতে হবে।  
১. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো।  
২. সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকা। 
৩. আন্দোলনের সহকর্মীদের সাথে গুড রিলেশন।

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য নঈম সিদ্দিকী চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রথমত মৌলিক (ফরজ-ওয়াজিব) ইবাদতসমূহ সুন্দরভাবে যথানিয়মে আদায় করা। দ্বিতীয়ত ইসলামের বিষয়ে জ্ঞানর্জনের জন্য কুরআন হাদিস সরাসরি অধ্যয়ন করা। এর জন্য যা প্রস্তুতি নেওয়া দরকার তা নেওয়া। টেক্সট বই না পড়ে অন্য কিছু পড়লে যথাযথ জ্ঞান হাসিল হয় না। বরং এর মাধ্যমে মিসগাইডেড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নঈম সিদ্দিকী তাই টেক্সট বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তৃতীয়ত নঈম সিদ্দিকী নফল বা অতিরিক্ত ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দিতে বলেছেন। নফল নামাজ ও ইবাদত মানুষকে আল্লাহর প্রিয় করে তোলে। সবশেষে সার্বক্ষনিক দোয়া ও জিকিরের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। সব কাজে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া ও ইসলামের নীতির মধ্যে থাকাই হলো এর মূল কথা। 

সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার ব্যাপারে নঈম সিদ্দিকী দারুণ কথা বলেছেন। এখানে যেমন দায়িত্বশীলের ভূমিকা আছে তেমনি কর্মীরও ভূমিকা আছে। তাই তিনি প্রথমেই আদেশ ও আনুগত্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে বলেছেন। নেতা চেষ্টা করবেন এমন আদেশ করতে যা পালনযোগ্য আবার কর্মীও আদেশ পালনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। উভয়ের প্রচেষ্টাই সংগঠনকে টিকিয়ে রাখবে। অন্ধ আনুগত্য করা যাবেনা। নেতা ইসলামবিরোধী কোনো কথা বললে তা সমর্থন করা যাবে না। তার প্রতিবাদ করা ঈমানের দাবী। নেতার কথাই শেষ কথা নয়, নেতার কথা যাচাই হবে শরিয়তের মানদণ্ড অনুযায়ী। নেতা পরিবর্তনে আনুগত্যের কম-বেশি করা যাবে না। যাকে ভালো লাগে তার পূর্ণ আনুগত্য করবো, যাকে কম ভালো লাগে তার আনুগত্য কম করবো এমন যেন না হয়। দায়িত্বশীলদের করণীয় হলো, সকলের সাথে উত্তম আচরণ করা। এমনভাবে আচরণ করা যাতে প্রত্যেক কর্মী মনে করে দায়িত্বশীল আমাকেই বেশি পছন্দ করে। সহযোগীদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমার সাথে দেখে শোধরানোর চেষ্টা করা। সর্বোপরি নেতা ও কর্মী উভয়েই এই সংগঠনকে আল্লাহর আমানত মনে করে এর সংরক্ষণ করবে। কোনো অনৈসলামিক, অসুন্দর ও অসভ্য নিয়ম, প্রথা ও চেতনা যাতে সংগঠনে ঢুকে না পড়ে তার জন্য সচেষ্ট থাকা।     

আন্দোলনের সহকর্মীদের সাথে গুড রিলেশনের বেসিক হলো সূরা হুজরাতের শিক্ষা। কারো ব্যাপারে কোনো খবর শোনার সাথে সাথে সিদ্ধান্ত না নেওয়া বরং যাচাই করা। আন্দোলনে এলাকাপ্রীতি তৈরি করে একদল আরেকদলকে বিদ্রূপ না করা। এলাকার নিমিত্তে কারো জন্য সুবিধা বৃদ্ধি করে দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়া এমন যেন না হয়। এগুলো স্পষ্ট জাহেলিয়াত। রাসূল সা. জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বড় কঠিন কথা বলে গেছেন। তারা মুসলিম হিসেবেই মৃত্যুবরণ করতে পারবে না। সহযোগীদের সাথে গুড রিলেশনের বড় অন্তরায় হলো গীবত। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা গীবত করবে না বা অন্যের দোষ নিয়ে চর্চা করবে না।      

আমরা যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বাড়াই, সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকি এবং আন্দলনের কর্মীদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখি তবে আমরা শয়তানের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। দুনিয়ার দিকে যেমন ঝুঁকে পড়বো না তেমনি কম্যুনিজম ও সেক্যুলারিজমের প্রতিও অনুরক্ত হবো। আর এভাবেই আমাদের চরিত্র ঠিক থাকবে। চরিত্র ঠিক থাকা মানেই হলো আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, ইকামাতে দ্বীনের কাজ করা। 

#বুক_রিভিউ

বই : চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান 
লেখক : নঈম সিদ্দিকী
অনুবাদক : আব্দুল মান্নান তালিব 
প্রকাশনী : আইসিএস
পৃষ্ঠা : ৩৩
মুদ্রিত মূল্য : ২০
জনরা : আত্মউন্নয়ন ও মোটিভেশন