২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আমাদের ইমাম অধ্যাপক গোলাম আযম



কিছু মানুষের জন্মই হয় হিরো হওয়ার জন্য। পাঞ্জেরী হওয়ার জন্য। তাদের দিকে তাকিয়ে মানুষ আগুনে ঝাঁপ দিতেও কার্পন্য করেনা। এদের পুরো জীবনটাই সাক্ষী হয়ে থাকে মানবজাতির জন্য। এরা শহীদ, সাক্ষ্যদাতা। জীবনের প্রতিটি কাজে ইসলামের সাক্ষ্য দেয়াই ওনাদের কাজ।

এমন একজন কিংবদন্তি মানুষ অধ্যাপক গোলাম আযম। ৭১ সালের বাম-রামদের যৌথপ্রজেক্ট বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হলে অনেকে মনে করেছে এদেশে ইসলামী আন্দোলন আর কোনদিন দাঁড়াতে পারবে না। মনে বল নিয়ে বিদেশে থেকেও আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন। একের পর এক ষড়যন্ত্রের মুখে ছিলে অবিচল, নিঃসংকোচ, নিরুদ্বিগ্ন। মহান রবের প্রতি অবিচল আস্থায় যেকোন পরিস্থিতে শান্ত থাকার অনুপ্রেরণা তিনি। তিনি এমন এক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন যেখানে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ পাওয়া যায়না। যে দেশে রাজনীতি একটি লাভজনক ব্যবসা সে দেশে তিনি মানুষকে পকেট থেকে টাকা বের করে সমাজের উপকার করার রাজনীতি শিখিয়েছেন। তিল তিল করে কঠিন সময়গুলো পার করে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন।

অধ্যাপক গোলাম আযম একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি বিশ্বনন্দিত ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষা আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক জিএস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার। বাংলাদেশের মাটি, আলো, বাতাস এবং মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে আছে তার জীবন, তার সংগ্রাম। স্বেচ্ছায় দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন তার মতো ব্যক্তির পক্ষেই দেয়া সম্ভব হয়েছে। ৫ম বারের মতো জেলে যাওয়ার আগে গণমাধ্যমের সামনে তিনি যে বলিষ্ঠ সাক্ষাতকার দিয়ে গেছেন তা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার বাতিঘর হিসেবেই দেখছেন সকলে। তার চিন্তা চেতনা আর সাহসিকতা আর বলিষ্ঠতা এদেশের ছাত্র যুব সমাজ তথা ইসলাম প্রিয় মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে। তার অমর কৃতির জন্য তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন।

জন্ম :
অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯২২ সালের ৭ই নভেম্বর মঙ্গলবার (বাংলা ১৩২৯ সালের ৫ই অগ্রহায়ণ) ঢাকা শহরের লক্ষ্মীবাজারস্থ বিখ্যাত দ্বীনী পরিবার শাহ সাহেব বাড়ী (মিঞা সাহেবের ময়দান নামে পরিচিত) মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ মাওলানা আব্দুস সোবহান। তাদের আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে। ইউনিয়নের নামও বীরগাঁও। অধ্যাপক গোলাম আযমের পিতা ১৯৪৮ সালে ঢাকা মহানগরীতে রমনা থানার পূর্ব দিকে মগবাজার এলাকায় জমি কেনার পর ঢাকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

অধ্যাপক আযমের পূর্ব পূরুষগণ কমপক্ষে সাত পুরুষ যাবত ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁওয়ের বাসিন্দা। মাতুল বংশের দিক থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ সাহেব পরিবারের সাথে সম্পর্কিত। তার মাতামহ ছিলেন মরহুম শাহ্ সৈয়দ আব্দুল মোনয়েম। প্রপিতামহ শাইখ মাহাবুদ্দিন। শাইখ শাহাবুদ্দিন একজন বড় আলেম এবং বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। অধ্যাপক আযমের দাদা মাওলানা আব্দুস সোবহান একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন। তার সম্পর্কে প্রচলিত ছিলো যে, মেঘনার পূর্ব পারে অতবড় আলেম তখন কমই ছিল। ঢাকার মোহসিনিয়া মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী নেয়ার পর গোলাম আযমের পিতা গোলাম কবির ১৯২১ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। এন্ট্রান্স পাসের পর মাওলানা গোলাম কবির হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অধ্যাপক আযমের দাদা মাওলানা আব্দুস সোবহানও ঢাকার মোহসিনিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন এবং পরে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পরিণত হয় এবং গোলাম আযম সেই কলেজেই শিক্ষা লাভ করেন।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার :
গোলাম আযম ১৯৩৭ সালে জুনিয়ার মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতিত্বেও সাথে উত্তীর্ণ হন। এসএসসি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় গোলাম আযম ত্রয়োদশ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকেই আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ঢাকা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের কাজে জড়িয়ে পড়ায় গোলাম আযম পরীক্ষা দিতে পারেননি এবং ১৯৪৯ সালে দাঙ্গাজনিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি। ফলে তিনি ১৯৫০ সালে এম. এ পরীক্ষা দেন। ঐ বছর কেউ প্রথম বিভাগ পায়নি। চারজন ছাত্র উচ্চতর দ্বিতীয় বিভাগ লাভ করেন এবং অধ্যাপক গোলাম আযম তাদের মধ্যে একজন।

১৯৫০ সালের ৩রা ডিসেম্বর তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মজীবনের সূচনা হলো। তিনি ১৯৫০ সালর ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৫ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে রংপুর কারমাইকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। নিজ বিভাগের ছাত্ররা ছাড়াও তার লেকচারের সময় অন্যান্য ক্লাসের ছাত্ররা তার ক্লাসে যোগদান করতো।

ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন :
ছাত্রজীবন শেষে অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৫০ সালেই তাবলীগ জামায়াতের তৎপরতার সাথে জড়িত হন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি তাবলীগ জামায়াতের রংপুরের আমীর ছিলেন। তাবলীগ জামায়াত যেহেতু ধর্মীয় প্রচার ও মিশনারী দায়িত্ব পালন করছিলো তাই তিনি শুধুমাত্র তাবলীগ জামায়াতের কাজ করেই তৃপ্তি পাননি। সুনির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচী তাবলীগ জামায়াতের ছিল না। তমদ্দুন মজলিসের কার্যক্রমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে বক্তব্য থাকায় জনাব গোলাম আযম তমদ্দুন মজলিসের কাজেও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে পড়েন ১৯৫২ সালেই। ১৯৫৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি তমদ্দুন মজলিসের রংপুর জেলার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৪ সালের এপ্রিলে জামায়াতে ইসলামীতে সহযোগী (মুত্তাফিক) হিসেবে যোগদান করার পর ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়ে রংপুর কারাগারে অবস্থানকালেই জামায়াতের রুকন হন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এর এক বছর পর তাকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯-১৯৭১ সেশনে তিনি জামায়াতে ইসলামী পূর্ব-পাকিস্তানের আমীর নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে মজলিসে শূরার কাছে বিশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে আমীরে জামায়াত-এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করেন।

রাজনৈতিক আন্দোলন :
স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জামায়াত সর্বদাই সোচ্চার ছিলো। জামায়াতের অন্যতম নেতা হিসেবে এবং বিশেষভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে উত্তপ্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম বিরোধী দলীয় আন্দোলনে একজন প্রথম সারির নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। আইয়ূব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলনে অধ্যাপক গোলাম আযম অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের ২০শে জুলাই ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, আওয়ামী লীগ, নেজামে ইসলাম ও নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য চার দিনব্যাপী বৈঠকে নয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সম্মিলিত বিরোধী দল Combined Oppositeon Partics (COP) গঠন করা হয়। সম্মিলিত বিরোধী দলের তৎপরতা পরিচালনায় অধ্যাপক গোলাম আযম বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৭ সালের ৩০ এপ্রিল শাসরুদ্ধকর স্বৈরশাসনের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য আতাউর রহমান খানের বাসভবনে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সর্বজনাব নূরুল আমীন, হামিদুল হক চৌধুরী ও আতাউর রহমান খান, কাউন্সিল মুসলিম লীগের মিয়া মমতাজ দৌলতানা, তোফাজ্জল আলী ও সৈয়দ খাজা খায়েরুদ্দিন, জামায়াতে ইসলামীর মিয়া তোফায়েল মুহাম্মদ, মাওলানা আব্দুর রহীম ও অধ্যাপক গোলাম আযম, আওয়ামী লীগের নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, আব্দুস সালাম খান ও গোলাম মোহাম্মদ খান লুন্দখোর এবং নেজামে ইসলাম পার্টির চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, মৌলভী ফরিদ আহমদ ও এম, আর, খানকে নিয়ে ‘পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ গঠিত হয়। পিডিএম আট দফা কর্মসুচি ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের জনাব আব্দুস সালাম খানকে সভাপতি এবং অধ্যাপক গোলাম আযমকে জেনারেল সেক্রেটারি করে পূর্বাঞ্চলীয় পিডিএম কমিটি গঠিত হয়। পিডিএম-এর পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযম দিনরাত পরিশ্রম করেন এবং গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯৬৯ সালের সরকার বিরোধী আন্দোলন জানুয়ারি মাসে সতুন পর্যায়ে প্রবেশ করায় দেশব্যাপী এক প্রচন্ড গণজাগরণের সূচনা হয়। সমগ্র দেশব্যাপী সুষ্ঠুভাবে গণআন্দেলন পরিচালনার তাগিদে ৭ ও ৮ই জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী বৈঠকে (১) ন্যাপ, (২) আওয়ামী লীগ (৬ দফা), (৩) নেজামে ইসলাম পার্টি, (৪) জমিয়তে ই উলামায়ে ইসলাম, (৫) কাউন্সিল মুসলিম লীগ, (৬) জামায়াতে ইসলামী, (৭) এনডিএফ, (৮) আওয়ামী লীগ (৮ দফা পন্থী) এই আটটি দলের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠন করা হয়। নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানকে ডাক-এর আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়।

গণআন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গোল টেবিল বৈঠকে যোগদান করার জন্য ডাক-এর ৮টি অঙ্গদলের দু’জন করে প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানান। যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তারা হলেন- কাউন্সিল মুসলিম লীগের মমতাজ দৌলতানা এবং খাজা খায়েরুদ্দিন, জামায়াতে ইসলামীর সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী ও অধ্যাপক গোলাম আযম, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (৬ দফা) শেখ মুজিবুর রহমান ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মুফতি সাহমুদ ও পীর মোহসেন উদ্দিন, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (৮ দফা) নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ও আব্দুস সালাম খান, নেজামে ইসলামের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ও মৌলভী ফরিদ আহমদ, ন্যাপের আব্দুল ওয়ালী খান ও অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। এ ছাড়াও পাকিস্তানের পিপল্স পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ন্যাপ (ভাসানীর) মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এয়ার মার্শাল আসগর খান, লেঃ জেনারেল মুহম্মদ আযম খান ও প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

২৬শে ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে সকাল সাড়ে দশটায় প্রেসিডেন্ট গেস্ট হাউজে ডাক-এর ষোলজন প্রতিনিধি, প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের নেতৃত্বে ১৫ জন, নির্দলীয় এয়ার মার্শাল আসগর খান, বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ রাজনৈতিক সংকট উত্তরণকল্পে গোল টেবিল বৈঠকে মিলিত হন। ৪০ মিনিট ব্যাপী বৈঠকের পর ঈদুল আযহা উপলক্ষে বৈঠক ১০ মার্চ সকাল ১০ টা পর্যন্ত মূলতবি রাখা হয়। ১০ই মার্চ হতে ১৩ই মার্চ পর্যন্ত রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট গেস্ট হাউজে গোল টেবিল বৈঠকে বসে এবং ১৩ই মার্চ গোল টেবিল বৈঠকের সমাপ্তি অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান নিম্নোক্ত দাবী দুটি গ্রহণ করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচন এবং ফেডারেল পার্লামেন্টারী সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন। অধ্যাপক গোলাম আযম এ বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলা’ উপস্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালে তার পূর্বেকার প্রস্তাব মতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলা’ সংযোজন করেন। ১৯৯৯ সালে ইসলাম ও জনগণের ইচ্ছার বিরোধী ভারতের তাঁবেদার আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্ছেদের লক্ষ্যে গঠিত চারদলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন তিনি।

লেখক ও চিন্তাবিদ গোলাম আযম :
আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও অধ্যাপক গোলাম আযম লেখা এবং চিন্তার জগতে তার অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ১৯৫৮ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদনা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব নেন। তিনি সম্পাদকীয়সহ বিভিন্ন কলামে নিয়মিত লিখতেন। তাফসীর, নবী জীবন, ইসলাম, সংগঠন, আন্দোলন, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে এ পর্যন্ত ১০৭ টি বই লিখেছেন তিনি। অধ্যাপক গোলাম আযম লিখিত কিছু বই ইংরেজী ছাড়াও উর্দু, তামিল ও অহমিয়া ভাষায় অনুদিত হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যাপক গোলাম আযমের জীবনী নিয়ে ইংরেজী ভাষায় একটিসহ ৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্যের প্রচেষ্টা :
১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর ইসলামী ঐক্য ইসলামী আন্দোলন’ পুস্তিকায় সকল ইসলামী শক্তিকে এক প্লাটফর্মে সমবেত হওয়ার রূপরেখা প্রদান করেন অধ্যাপক গোলাম আযম। ’৮১ সালের ডিসেম্বরে ঐ রূপরেখা অনুযায়ী ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামক ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যমঞ্চ গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালে ইসলামী ঐক্যের অগ্রগতি সম্পর্কে ‘ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টা’ শিরোনামে পুস্তিকা রচিত হয়। ১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকাস্থ আল ফালাহ মিলনায়তনে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে ইসলামী ঐক্য গঠনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী ও পটিয়া মাদ্রাসার মুহতামিমদ্বয়ের নিকট প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে মুহতামিমদ্বয় কর্তৃক চারদফা প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৯৬ সালে চারদফা প্রস্তাব গ্রহণ করে পত্রের উত্তর প্রদান। ১৯৯৭ সালে খুলনায় অনুষ্ঠিত ওলামা সম্মেলনে ইসলামী ঐক্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে গওহারডাঙ্গা মাদ্রাসার মুহতামিম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরীয়াত ও মহাসচিবের নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ২০ বছর ধরে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ধারাবাহিক বিবরণ দিয়ে ‘ইসলামী ঐক্যমঞ্চ চাই’ নামক পুস্তিকা রচনা।

বিদেশে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ :
অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে World Association of Muslim Youth (ওয়ামী) কর্তৃক আহূত International Islamic youth Conference এর উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি Islamic Youth Conference at Tripoli, Annual Conference of Federation of Students Islamic Socities (Fosis), England, 11th Convention of Muslim Students Association of America held at Michigan University Annual Conference of U.K. Islamic Mission এ অংশ গ্রহণ করেন।

১৯৭৭ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত International Federation of Students Organization-এর সভায় অতিথি বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের মে মাসে তুরস্কে আয়োজিত রিফা পার্টির সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের আগস্টে লন্ডনে ইসলামী সংস্থাগুলোর সম্মিলিত গণসম্বর্ধনায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেIslamic Society of North America-এর উদ্যোগে বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অতিথি বক্তা,Muslim Ummah in America-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে International Islamic Federation of Students Organization-এর উদ্যোগে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষ অতিথি এবং ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইসলামী সংস্থাগুলোর সম্মেলনে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ড. নাজমুদ্দীন আরবাকানের আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৯৯ সালের জানুয়ারী মাসে Islamic Mission Japan-এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। জুলাই মাসে বাল্টিমোরে Islamic Circle of North America (ICNA) বার্ষিক কনভেনশনে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি ছিলেন। একই বছর আগষ্ট মাসে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত U.K. Islamic Mission হ সম্মেলনে অতিথি বক্তা এবং ইংল্যান্ডের শেফিল্ডে অনুষ্ঠিত U.K. Islamic Mission সম্মেলনে অতিথি বক্তা হিসেবে যোগদান করেন।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত Islamic Society of North America (ISNA) -এর বার্ষিক মহাসম্মেলনে অতিথি বক্তা এবং Muslim Ummah in America-এর উদ্যোগে আয়োজিত শিকাগো শাখার সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন। অক্টোবরে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে অনুষ্ঠিত Islamic Forum Europe-এর সম্মেলনে প্রধান বক্তা, দাওয়াতুল ইসলাম ইউ.কে এন্ড আয়ার-এর উদ্যোগে আয়েজিত ২দিন ব্যাপী সম্মেলনে প্রধান বক্তা এবং নভেম্বরে দুবাই সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক কুরআন পুরস্কার পরিষদের সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগদান করেন।

পাঁচবারের কারাবরণ:
নির্ভীক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই ৫ম বারের মতো কারাগারে গেলেন বর্ষীয়ান জননেতা, ভাষা সৈনিক জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। এর আগে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৯৫২ ও ১৯৫৫ সালে দুইবার, ১৯৬৪ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুবের আমলে একবার, ১৯৯২ সালে নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে একবার আর সর্বশেষ গত ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশে কারাবরণ করেন এই নেতা। প্রিজন সেলে থাকা অবস্থায়ই তিনি ইন্তিকাল করেন।

২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই তার কারাবরণের কথা তুলে ধরেন। সে সময় তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম আমি রংপুরে গ্রেফতার হই। ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততার জন্যই আবারো ১৯৫৫ সালে আমি গ্রেফতার হই। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করে। তখন আমি লাহোরে ছিলাম কেন্দ্রীয় শূরার সভার জন্য। সেখানে আমি আবারো গ্রেফতার হই। এর ২ মাস পর আমাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ সময় ৫ মাস আমি জেলে ছিলাম। একটা কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই, তাহলো জেলে যাওয়ার পর প্রত্যেক বারই আমি উচ্চ আদালতে রিট করে মুক্ত হই।

সর্বশেষ ১৯৯২ সালে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে আমার নাগরিকত্ব বাতিল করে। ১৯৯২ সালে বিএনপি আমাকে বিদেশী নাগরিক হিসেবে গ্রেফতার করে। এ সময় আমি ১৬ মাস জেলে ছিলাম। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে বিদেশী নাগরিক হিসেবে যে মামলা করে সরকার, এতে তারা হেরে যায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আমি মুক্ত হই। কিন্তু তখনও নাগরিকত্ব পুনর্বহালের মামলা বাকী ছিল। এ ব্যাপারে দুই বিচারক দুই রকম রায় দেন। এরপর তা তৃতীয় বিচারপতির কাছে গেলে তিনি আমার পক্ষে রায় দেন। সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করে। এক বছর পর ১৯৯৪ সালের ২২ জুন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫ জন বিচারপতির সমন্বয়ে পুর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাগরিকত্ব বহালের আদেশ দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অর্ডারকে বেআইনী ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর আমি নাগরিকত্ব ফিরে পেলাম।

সেই সাক্ষাৎকারেই আবারো জেলে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মু'মিনের জন্য নিয়ম হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। এটাই আল্লাহর নির্দেশ। আর ভয়, আল্লাহ ছাড়াতো কাউকে ভয় পাওয়া জায়েজই নেই। মু'মিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতে পারে না। আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। মৃত্যুকে ভয় পাবো কেন? মু'মিনতো মৃত্যু কামনা করে। কেননা মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে ওনাকে হত্যা করার পাঁয়তারার সময় গ্রেপ্তারের প্রাক্কালে সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল আপনার ভয় করছে না? তিনি জবাব দিলেন, তিনি জবাব দিলেন,ভয়? ভয় কিসের? ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে শাহাদাতের কামনা করেছি সারা জীবন...আর অন্যায়ভাবে যদি মৃত্যু দেয়া হয় শহীদ হওয়ার গৌরব পাওয়া যায়... আল্লাহকে ছাড়া কাউকে "ভয় করাতো জায়েজই নাই, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করার অনুমতি নাই।"

২০১৪ সালে যখন খবর পেলাম আমাদের ইমাম আর নেই তখন নিজেকে ধরে রাখাটা খুব কষ্টকর হচ্ছিল। যদিও জানি সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তারপরও যেন মানতে পারছিলাম না। বার বার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো না, কখনো না, গোলাম আযম মরতে পারেনা। এক অর্থে গোলাম আযমদের মৃত্যু নেই। তাঁরা শহীদ। শহীদের মৃত্যু হয়না। আমরা তা সহজে বুঝতে পারিনা। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন শহীদেরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিক প্রাপ্ত হন। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ইমামকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও।

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মুসলিম পূনর্জাগরনের অগ্রদূত জামাল উদ্দিন আফগানী


স্বচ্ছ পানির ঝরনাধারা আর বিশাল পর্বতমালার দেশ আফগানিস্তান। নানান দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রে আজ দেশটি সারা পৃথিবীর অন্যতম যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশ। রুশদের বর্বর আক্রমণ, উপুর্যপুরি মার্কিন হামলা ও ষড়যন্ত্র, প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদ আফগানিস্তানের ভাগ্যকে নির্মম পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। 

এই দেশটির ইতিহাস অতি প্রাচীন। এখানে ইসলাম আসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সঃ এর ইন্তেকালের এর অল্প কিছু পরই। ১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানী আধুনিক আফগানিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করলেও আফগান জাতির আবাসভূমি হিসেবে ‘আফগানিস্তান’ শব্দটার প্রচলন ছিল অনেক আগ থেকেই।

উনিশ শতকে মুসলিম জাহান যখন এক অস্থিরতার আবর্তে দিশেহারা, খিলাফতের স্বর্ণযুগের স্মৃতি রোমান্থন করে টিকে থাকা ওসামানিয়া খিলাফত বয়সের ভারে ন্যুজ তেজী বৃদ্ধের মত দাঁড়িয়ে ছিল, নানান প্রকার ইসলাম বিরোধী শক্তির রক্তচক্ষু ক্রমেই তার লাল রঙ বৃদ্ধি করছিল, তাদের সেই চক্ষুর রোষানলে পুড়ছিল একের পর এক ইসলামী সাম্রাজ্য, হিন্দুস্থানে জেঁকে বসেছে বৃটিশ উপনিবেশ, গোটা ইউরোপ ইসলামকে মুছে দিতে একের পর এক নিত্যনতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামছিলো তখন আফগানিস্তানে ফুটলো এক নতুন আলোর প্রদীপ। এই আলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ধ্রুবতারার মত জ্বলতে থাকে। 

এই আলো ছিলেন আফগানিস্তানের সিংহপুরুষ সৈয়দ মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন হুসায়নী আল-আফগানী। তিনি মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করতে বৈশ্বিক ইসলামিজম বা প্যান ইসলামিজমের আহ্বান জানান। তিনি জামালুদ্দিন আফগানী নামেই সমাধিক পরিচিত। 

পাশ্চাত্যদের সামরিক ও আর্থিক শক্তি এবং সার্বিক প্রভাব ব্রিটিশ শাসিত হিন্দুস্থান এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উপর সর্বগ্রাসী আকারে আপতিত। মুসলিমরা শুধু শোষিতই হচ্ছিল না বরং তাদের উপর পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, আদর্শ ও চিন্তাধারার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, ইসলামী আদর্শ ধরে রাখা বা বজায় রাখা দুষ্কর। জড়বাদী ও নাস্তিক্যবাদী মতবাদ এবং এর প্রভাব ইসলাম ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ডারউইনের মতবাদ ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ধ্বংস ও চরিত্র হননের কারণ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। এই দুঃসময়ে জামাল উদ্দিন আফগানী তার বক্তব্য ও লেখনীর দ্বারা মুসলিমদের পূনর্জাগরণের প্রচেষ্টা গ্রহন করেন। তার কর্মক্ষেত্র ছিল আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স। 

মুসলিম বিশ্বের আভ্যন্তরীণ দূর্বলতা দূর করার জন্য তিনি যেমন সচেষ্ট ছিলেন তেমনি পাশ্চাত্য শক্তির প্রভাব বলয় থেকে মুসলিম বিশ্বকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি চিন্তা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জাগরণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম দেশসমূহের পরাধীনতা থেকে মুক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্য যা প্যান ইসলাম নামে বহুল পরিচিত। 

বৈদেশিক নিয়ন্ত্রন হতে মুক্তির জন্য ইরান, তুর্কি ও মিসরের যুবশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করেন। এই কাজ মোটেই সহজ ছিল না তার জন্য। প্রথমেই এই কাজের বিরোধীতা আসে আধিপত্যবাদের দোসর ও আপোষকামী এবং ইসলামী চেতনা বিবর্জিত মুসলিম শাসকদের পক্ষ হতে। এজন্য তাকে সংস্কার পরিপন্থী শাসকের বিরুদ্ধেও কথা বলতে হয়। তিনি একক খিলাফতের অধীনে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। তার এই আন্দোলনে তিনি যুগপৎ পাশ্চাত্য ইসলাম বিরোধী শক্তি এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কায়েমী স্বার্থপুষ্ট মহলের কোপানলে পতিত হন। এজন্য তিনি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন কেন্দ্র থেকে তার আন্দোলন চালানো এবং আদর্শ প্রচার করার সুযোগ পাননি। 

তারপরও তার ক্ষুরধার বক্তব্য যুবকদের আকৃষ্ট করে। তাঁর যুক্তি আদর্শ ও আধুনিক চিন্তাধারা সহজেই জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতো। মানব সমাজে ধর্মের গুরুত্ব এবং জড়বাদের অসারতা তিনি সহজেই মানুষের উপস্থাপন করতে পারতেন। তারা ভাষা জ্ঞানের যে পরিচিতি মিলে তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তিনি একই সাথে ইংরেজী, ফরাসী, আরবী, উর্দু, ফারসী ভাষায় সমান দক্ষ ছিলেন। সব ভাষায় তিনি বক্তব্য রাখতেন। 

তার আকীদা বিশ্বাস নিয়ে কোন বিতর্ক চলে না। এই বিষয়ে তিনি ছিলেন বিতর্কের উর্ধ্বে। যে ব্যাক্তি কায়রো, কাবুল, ইস্তাম্বুল, দিল্লী সর্বত্র ইসলামের দায়ি হতে পারেন, পৌঁছতে পারেন শিয়া মতে বিশ্বাসীদের উচ্চ দরবারে আবার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র বানাতে পারেন সুন্নীদের খলীফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ সহ অন্যান্য সুন্নী নেতাদের দরবারে তাকে শিয়া বা সুন্নী গন্ডির মধ্যে আটকানো যায় না। তিনি শিয়া-সুন্নী বিরোধ মেটাতে ছিলেন আন্তরিক। একক খিলাফতের যে ধারণা নিয়ে তিনি আদর্শ প্রচার করতেন তা সুন্নী ধারাকে সমর্থন করে। আবার তিনি ইমামতকে অস্বীকার করেছেন এমন প্রমান মিলে না। তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি কালেমার সূত্রকেই ঐক্যের ভিত ভেবেছেন। তাওহীদ এবং রাসূল সঃ এর আদর্শই ছিল তার সকল প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ধারা বিভক্তি, মাজহাব অত্যন্ত গৌণ। 

জামাল উদ্দিন কথিত সাধুপুরুষ ছিলেন না, ছিলেন না রাজনৈতিক নেতাও, তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান সংগঠক। যিনি কাজ করেছে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতাকামী মানুষ তৈরীতে, ইসলামে মূল শিক্ষা মুসলিমদের মধ্যে প্রসার ঘটাতে, অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দিতে, সর্বোপরি মুসলিমদের মধ্যে পূনর্জাগরণ ঘটাতে। 

তিনি মূলত পাঁচটি বিষয়কে লালন করতেন [১]

১- ইসলামের রসম রেওয়াজের উর্ধ্বে যে প্রাণশক্তি সেটাই তার কাছে অধিকতর মূল্যবান। অন্যকথায় বলতে গেলে প্রতিটি রসম রেওয়াজের উদ্দেশ্যকেই তিনি বেশী গুরুত্ব দিতেন। 

২- মুসলিম সমাজে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল চরম অন্যায় এবং আলেমগন এই রাজতন্ত্রকে সাপোর্ট করা ছিল মহাভুল এবং এর কারণের মুসলিমদের অধঃপতন ঘটছে। 

৩- ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরুপ তুলে ধরতে হবে জাতির সামনে। নইলে ইউরোপীয় ও জড়বাদী আগ্রাসন ঠেকানো যাবে না। আর পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না। 

৪- মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা অভিন্ন এবং সমাধানও অভিন্ন বলেই তিনি মনে করতেন। 

৫- মুসলিমদের মধ্যে চালু হওয়া কুসংস্কার, বিকৃতি তাকে আহত করতো। তিনি মনে করতেন এর সংস্কার না হলে বর্তমান মুসলিমদের মহানবী সঃ এর উম্মত বলা যাবে না। 

তিনি তাঁর বিশ্বাস নিয়ে কাজ করতেন। এক জায়গায় ব্যর্থ হলে অন্য যায়গায় গিয়ে আবার দাওয়াত দেয়া শুরু করতেন। এভাবে তিনি সারা পৃথিবীতে তার অনুসারি সৃষ্টি করেছেন। যার ভাবাদর্শে এখনো পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন। 

মুসলিম দেশসমূহ এবং মুসলমানদের অধঃপতনের জন্য তিনি তিনটি সমস্যা চিহ্নিত করেন।[২] 

প্রথমত, অনৈক্যঃ বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু অনৈক্যের কারণে তারা দ্বিধাভিবক্ত ও শক্তিহীন। তারা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে সেজন্য সাম্রাজ্যবাদের দোসররা মুসলিমদের মধ্যে পারষ্পরিক সন্দেহ, সংশয়, দ্বন্দ্বের প্রাচীর তৈরী করেছে। 

দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদঃ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বৈদেশিক শাসন ও প্রভাবকে তিনি মুসলিম সমাজের দুরাবস্থার জন্য দায়ী করেন। এদের বিরুদ্ধে সচেতন করা এবং ঐক্য গড়ার কাজ তিনি সারা জীবনব্যপী করেছেন। 

তৃতীয়ত, অশিক্ষা-কুশিক্ষাঃ মুসলিম সমাজে সঠিক শিক্ষার অভাব এবং কুসংস্কারের বিস্তারের কারণে তারা স্বধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যদের বর্বর ও পরিবার ধ্বংসকারী সংস্কৃতি তাদের কাছে হয়ে উঠে চকচকে। 

আফগানী তার একতা গ্রন্থে বলেছেন, ‘একথা বলছি না, সমগ্র মুসলিম দেশের উপর কোন একক ব্যক্তির আধিপত্য মেনে নেয়া হোক। এমন প্রস্তাব দুঃসাধ্য মনে করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি অবশ্যই চাইযে, এদের সবার উপর কুরআনী আহকামের আধিপত্য থাকুক এবং সবাই ইসলামকে নিজের ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে পরিণত করুক।’ [৩] 

তিনি আরো বলেছেন, ঐক্য ও নেতৃত্ব ইসলামী সুউচ্চ প্রাসাদের দুটি প্রধান স্তম্ভ। এগুলোকে অটুট রাখার জন্য চেষ্টা করা ইসলামের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ব্যক্তির উপর ফরয। [৪]

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, বেশীরভাগ দ্বীনি হুকুম জারী করা একটা সুসংগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। [৫]

তিনি তার যুগের মুসলিম উম্মাহর মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন ঐক্য না থাকায় এই সমস্যাগুলো হচ্ছে। দ্বিতীয় সমস্যা হলো সঠিক নেতৃত্বের। এছাড়াও জ্ঞানের অভাব, ভ্রাতৃত্ব এবং বীরত্বের কথাও বলেছেন। আফগানীর এই কথাগুলো আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। 

তথ্যসূত্রঃ 
১- জামাল উদ্দিন আফগানী, তথ্য সন্ত্রাসে আক্রান্ত এক কালজয়ী মহাপুরুষ/ মাসুদ মজুমদার
২- সৈয়দ জামাল উদ্দিন আফগানীঃ ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব/ মুহাম্মদ মতিউর রহমান। 
৩- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৪৩ 
৪- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৪৬ 
৫- সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন রচনাবলী/ মুহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস কাসেমী/ পৃঃ-৫৩ 

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মুমিনের সাংগঠনিক গুণাবলী, পর্ব ০২


সংগঠন সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (অর্থাৎ ইসলামকে) আঁকড়ে ধর”-আল ইমরান ১০৩
তাই মুমিনদের সাংগঠনিক জীবন এক অপরিহার্য জীবন। এই জীবনে যে গুনগুলো থাকা প্রয়োজন তা নিয়েই আলোচনা এখানে।
১ম পর্ব পড়ুন   

৫। মজলিশে শূরা (পরামর্শ সভা) থেকে ওয়াক আউট করা যাবে না 
এই বিষয়ে আমরা নির্দেশনা পাই সূরা নূরের ৬২ নং আয়াতে। সেখানে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা বলেন, 
“মুমিন তো আসলে তারাই যারা অন্তর থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মানে এবং যখন কোন সামষ্টিক কাজে রসূলের সাথে থাকে তখন তার অনুমতি ছাড়া চলে যায় না”। 
কোন নায়েবে রাসূলের পরিচালিত জামায়াতের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। এছাড়াও মজলিশে শূরা প্রত্যেকের কাছে আমানত। এর সিদ্ধান্ত অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন তিনটি মজলিশ ছাড়া সব মজলিশ আমানত। তিনটি হল অবৈধভাবে রক্তপাত ঘটানো, ব্যাভিচার সংগঠন, এবং অবৈধভাবে কালো অর্থসম্পদ লুন্ঠনের জন্য মজলিশ। 

৬। আন্তরিকভাবে নেতার আনুগত্য করতে হবে 
মহান রাব্বুল আলামীন সূরা আন নিসার ৫৯ নং আয়াতে বলেছেন,
হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং সেসব লোকেরও যারা তোমাদের মধ্যে সামগ্রিক দায়িত্বসম্পন্ন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাপারে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃতই খোদা ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। এটাই সঠিক কর্মনীতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও এটাই উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মুসলমানদের উপর নেতার আদেশ শোনা ও মানা অপরিহার্য কর্তব্য। চাই সে আদেশ তার পছন্দনীয় হোক, আর অপছন্দনীয় হোক। তবে হ্যাঁ, যদি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোন কাজের নির্দেশ হয় তবে সেই নির্দেশ শোনা ও মানার কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবু অলিদ ওবাদা ইবনে ছামেত (রা.) বলেন, আমরা নিম্নোক্ত কাজগুলোর জন্যে রাসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলাম: ১. নেতার আদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে- তা দুঃসময়ে হোক,আর সুসময়ে হোক। খুশীর মুহূর্তে হোক, আর অখুশীর মুহূর্তে হোক। ২. নিজের তুলনায় অপরের সুযোগ-সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ৩. ছাহেবে আমরের সাথে বিতর্কে জড়াবে না, তবে হ্যাঁ, যদি নেতার আদেশ প্রকাশ্য কুফরীর শামিল হয় এবং সে ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যথেষ্ঠ দলিল প্রমাণ থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। ৪. যেখানে যে অবস্থাতেই থাকি না কেন হক কথা বলতে হবে। আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের ভয় করা চলবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল সঃ বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। যেই ব্যক্তি আমাকে অমান্য করলো সে আল্লাহকে অমান্য করলো। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করলো সে আমারই আনুগত্য করলো। যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করলো সে আমাকে অমান্য করলো। (বুখারী)

আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, সন্তুষ্টিতে, অসন্তুষ্টিতে, তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও তোমার কর্তব্য হচ্ছে নেতার নির্দেশ শোনা ও মানা। (মুসলিম)

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন, যে আনুগত্যের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায় এবং জামায়াত থেকে বিছিন্ন হয়ে যায় অতঃপর মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হয় জাহেলীয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) রাসূলে (সঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আনুগত্যের বন্ধন থেকে হাত খুলে নেয়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে তার বলার কিছুই থাকবে না। আর যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহেলীয়াতের মৃত্যু।(মুসলিম) 

এখানে আল কুরআন এবং হাদিসের আলোকে আনুগত্যের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা আমরা বুঝতে পারি। ক্ষুদ্র একটা পরিবার থেকে শুরু করে বিভিন্নমুখী প্রতিষ্ঠানের গঠনমূখী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ঠ লোকদের আনুগত্যের উপরই নির্ভরশীল। বিশেষ যে কোন আন্দোলনের, সংগঠনের জন্যে আনুগত্যই চালিকাশক্তি বা প্রাণশক্তির ভূমিকা পালন করে। আনুগত্যই সাংগঠনিক শৃংখলার মূল উপাদান। 

৭। অনুগামী এবং সহকর্মীদের প্রতি দরদপূর্ণ এবং কোমল হতে হবে 
দায়িত্বশীলকে অবশ্যই পারস্পরিক নম্র ও কোমল আচরণ করতে হবে। সংগঠন বা সংঘবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীলের অন্যতম কাজ হল, কর্মীদেরকে একে অন্যের সাথে জুড়ে দেয়া, নিজেদেরকে পারস্পারিক দৃঢ়, মজবুত বন্ধনে আবদ্ধ করা, সংঘবদ্ধ ও সু-সংহত করা। ইসলামী আন্দোলনের সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম দায়িত্বশীল রাসূল সঃ কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, (হে নবী) আল্লাহর মেহেরবাণীতে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি তাদের প্রতি রূঢ় হতেন তাহলে তারা আপনার নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। (সূরা আল ইমরান: ১৫৯) 

দায়িত্বশীলদের সামগ্রিক আচরণ হবে সাহাবায়েকেরাম রা. এর মত। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তাঁর সাথিবর্গ কাফেরের মোকাবেলায় অত্যন্ত কঠোর কিন্তু তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহমর্মী। (সূরা ফাতাহ: ২৯) 

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল, তিনি সকল কাজে কোমলতা পছন্দ করেন। (বুখারী ও মুসলিম)

আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল এক সাহাবাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট দায়িত্বশীল ঐ ব্যক্তিরা যারা অনুগামীদের প্রতি কঠোর। সাবধান তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। (বুখারী ও মুসলিম) 

৮। সহকর্মীদের সাথে একে অপরের আয়নাস্বরূপ হওয়া
আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন, মুমিন তার ভাইয়ের আয়নাস্বরুপ। এক মুমিন আরেক মুমিনের ভাই। সে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পদের হিফাযাত করে। (আল আদাবুল মুফরাদ)

আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, মুমিন তার ভাইয়ের আয়নাস্বরুপ। সে তার মাঝে কোন ত্রুটি দেখতে পেলে তা সংশোধন করে দেয়। (আল আদাবুল মুফরাদ)

একজন মুমিনের ভুলত্রুটি যদি অন্যজনের দৃষ্টিগোচর হয়, সংশোধনের নিয়তে তিনি সেটি ঐ মুমিন ভাইকে ধরিয়ে দিবেন। অন্য কারো কাছে সেই ভুল ত্রুটির কথা বলে বেড়াবেন না। আর ভুল ধরিয়ে দেয়ার এই কাজটি করতে হবে আন্তরিকভাবে, মোলায়েম ভাষায়। একটির ব্যাপারে বলতে গিয়ে অতীতের অন্য কোন ভুলকে টেনে আনা ঠিক হবেনা। একেবারেই খুঁটিনাটি বিষয়কে ইহতেসাবের বিষয় না বানানো উচিত। এমন বিষয় আনা দরকার যা দ্বারা ব্যাক্তি নিজে অথবা সংগঠনের ভাব-মর্যাদা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

ব্যক্তিগতভাবে বারকয়েক ইহতেসাব দেয়ার পরও সংশোধিত না হলে বিষয়টি ফোরামে উপস্থাপন করা যাবে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত কোনভাবেই ইহতেসাব অনুষ্ঠান যাতে বিতর্ক অনুষ্ঠানে পরিণত না হয়। 

৯। একান্ত আভ্যন্তরীণ বিষয় অন্যদের জানানো যাবে না 
সূরা আলে ইমরানের ১১৮ নং আয়াতে এই বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা বলেন, 
হে ঈমানদারগণ, নিজেদেরকে ছাড়া অন্য লোকদেরকে তোমাদের একান্ত আভ্যন্তরীণ বিষয়ের শরিক বানাবে না। তারা তোমাদের ক্ষতি করার কন সুযোগই হাতছাড়া করবে না। 

অতএব এই বিষয়টা মুমিনদের বিবেচনায় রাখতে হবে। কোন ভাবেই যাতে সংগঠনের কোন আভ্যন্তরীণ তথ্য যা শত্রু পক্ষ জানলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে এমন বিষয় কারো সাথে শেয়ার না করা। 

১০। দায়িত্বশীল এবং অনুগামীগন পরষ্পরের জন্য দোয়া করা
আওফ ইবনু মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেছেন, তোমাদের উত্তম নেতা তারা যাদেরকে তোমরা ভালোবাস এবং তারাও তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ কর, তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। পক্ষান্তরে তোমাদের অধম নেতা তারা যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দিয়ে থাক এবং তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দিয়ে থাকে। (সহীহ মুসলিম)

১১। কারো মান-সম্মানের প্রতি আঘাত হানা যাবে না। 
আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তাকে মিথ্যা বলবে না এবং তাকে হেয় করবে না। প্রত্যেক মুসলিমের মান-সম্মান, অর্থ সম্পদ ও রক্ত অন্য মুসলিমের জন্য হারাম। (জামে আত তিরমিযি)

আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেন, তোমরা পরষ্পরের ভাই ভাই এবং আল্লাহর বান্দা হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করতে পারে না। তাকে হেয় করতে পারে না এবং তাকে অপমানিত করতে পারে না। 

একজন মুমিনের সাংগঠনিক জীবনে এই গুণগুলো বেসিক গুণ। আভ্যন্তরীণ শৃংখলা বজায় রাখার জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গুণও বটে। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা তিনি যেন আমাদের এই গুণগুলো অর্জন করার তাওফীক দান করেন। আমীন। 

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

সফলতাঃ দুনিয়া ও আল্লাহর দৃষ্টিকোণ


মাক্কী জীবনের মাঝামাঝি অবস্থা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কাফেরদের মধ্যে ভীষণ সংঘাত চলছে। কিন্তু তখনো কাফেরদের নির্যাতন নিপীড়ন চরমে পৌঁছে যায়নি। তবে নির্যাতনের ব্যপকতা দিন দিন বেড়েই চলছে। অপরদিকে এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ধৈর্য্য ধারণ করে সহ্য করা ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। এমতাবস্থায় সাহাবাদের মধ্যে কিছু হতাশা বিরাজ করছিল। অন্যদিকে কাফেররা মুসলিমদের উপহাস করে বলছিল, তোমাদের তো আল্লাহ আছে! অথচ তোমরাই লাঞ্চনার মধ্যে আছ। তোমরা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। এই অবস্থায় আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা মুমিনদের জন্য নিয়ে এসেছেন আশার বানী। মুমিনদের সফলতা জানান দিয়ে নাজিল হয়েছে সূরা মুমিনূন এর প্রথম দশটি আয়াত। 

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ .الَّذِيْنَ هُمْ فِىْ صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ .وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ .وَالَّذِيْنَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُوْنَ. وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ إِلَّا عَلى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ فَمَنِ ابْتَغى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُوْلئِكَ هُمُ الْعَادُوْنَ وَالَّذِيْنَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُوْنَ وَالَّذِينَ هُمْ عَلى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُوْنَ الَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ [সূরা আল মুমিনূন : ১-১১]

“সফলতা লাভ করলো সেই সব মুমিন যারা তাদের ছালাতে খুশু অবলম্বন করে, যারা বেহুদা কাজ থেকে বিরত থাকে, যারা পবিত্রতা বিধান কাজে তৎপর থাকে, যারা লজ্জাস্থানের হিফাজাত করে নিজেদের স্ত্রী ও দক্ষিণ হস্তের মালিকানাধীন স্ত্রীলোকদের ছাড়া, এই ক্ষেত্রে তারা ভৎসনার যোগ্য নয়, তবে এর বাইরে কিছু চাইলে তারা হবে সীমালংঘনকারী, যারা আমানাত ও ওয়াদা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, যারা সালাতের পূর্ণ হিফাজাত করে। তারাই সেই উত্তরাধিকারী যারা উত্তরাধিকার হিসাবে ফিরদাউস পাবে, সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল।”

দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষকেই জীবনের প্রকৃত মিশনের প্রতি উদাসীন থেকে ‘সফলতার’ ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে বেহুঁশের মতো ছুটতে দেখা যায়। সাধারণ মুসলিমরা এই জীবনে টাকার পাহাড় গড়তে পারা, বিশাল অট্টালিকার মালিক হওয়া, বহু সংখ্যক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া, বিলাসী জীবন যাপন করতে পারা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে পারাকেই তারা মনে করে সফলতা। আর দ্বীন কায়েমের পথে সংগ্রামরত অনেকে মনে করেন শুধুমাত্র দুনিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ইত্যাদি ইসলামপন্থীদের হাতে থাকাই সফলতা। অন্যথায় আমরা ব্যর্থ। 

কিন্তু মহাজ্ঞানী রাব্বুল আলামীনের দৃষ্টিতে সফলতার স্বরূপ ভিন্ন। আল কুরআনের বহু সংখ্যক আয়াতে তিনি সফল ব্যক্তিদের পরিচয় তুলে ধরেছেন যাতে মানুষ ‘সফলতার’ ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হতে, সঠিক ধারণা লাভ করতে এবং সঠিক কর্মপন্থা অবলম্বন করতে পারে। বেশীরভাগ নবী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পান নি। তাই বলে কি তাঁরা ব্যর্থ? আসুন আমরা জানি আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা সফলতা এবং সফল ব্যক্তি সম্পর্কে কি বলেছেন। 

আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
أَلاَ إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُوْنَ الَّذِينَ آمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ لَهُمُ الْبُشْرُى فِى الْحَياةِ الدُّنْيَا وَفِى الْاخِرَةِ لاَ تَبْدِيْلَ لِكَلِمَاتِ اللهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ [সূরা ইউনুস : ৬২-৬৪] 

“জেনে রাখ, যারা আল্লাহর বন্ধু, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদের কোন ভয় ও চিন্তার কারণ নেই। দুনিয়া এবং আখিরাতে- উভয় জীবনেই তাদের জন্য সুসংবাদ। আল্লাহর কথা পরিবর্তিত হবার নয়। এটি বড়ই সফলতা।”

قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكّاهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسّاهَا [সূরা আশ্ শামস : ৯, ১০]

“অবশ্যই সেই ব্যক্তি সফল যে নিজকে পরিশুদ্ধ করে নিয়েছে। আর সেই ব্যক্তি বিফল যে নিজকে দাবিয়ে দিয়েছে।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَالأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوْهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ [সূরা আল মায়িদা : ৯০]

“ওহে যারা ঈমান এনেছো, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য নজরানা পেশ করার স্থান এবং ভাগ্য গণনার জন্য শর নিক্ষেপ নাপাক, শয়তানী কাজ। তোমরা এইগুলো পরিহার করে চল। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

فَاتِ ذَا الْقُرْبى حَقَّه وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِّلَّذِيْنَ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللهِ وَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আর রূম : ৩৮]

“আত্মীয়দেরকে তাদের হক দাও, মিসকীন ও মুসাফিরদেরকেও। যারা আল্লাহর সন্তোষ প্রত্যাশী তাদের জন্য এটি খুবই উত্তম কাজ। তারাই ঐসব লোক যারা সফল।”

قُلْ لاَ يَسْتَوِى الْخَبِيْثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيْثِ فَاتَّقُوْا اللهَ يا أُولِى الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ[সূরা আল মা-য়িদা : ১০০]

“বলে দাও, অপবিত্রতার আধিক্য তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও পবিত্র ও অপবিত্র জিনিস সমান নয়। ওহে জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চল। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا لاَ تَأْكُلُوْا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً وَاتَّقُواْ اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ[সূরা আলে ইমরান : ১৩০] 

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আল্লাহকে ভয় করে চল। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

فَأَمَّا الَّذِيْنَ امَنُوْا وَعَمِلُوْا الصَّالِحَاتِ فَيُدْخِلُهُمْ رَبُّهُمْ فِى رَحْمَتِه ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْمُبِيْنُ[সূরা আল জাসীয়া : ৩০]

“অতপর যারা ঈমান এনেছে এবং আমালে ছালেহ করেছে তাদের রব তাদেরকে তাঁর রাহমাতের মধ্যে দাখিল করে নেবেন। এটি সুস্পষ্ট সফলতা।”

الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْناهُمْ يُنْفِقُوْنَ. والَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْاخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ أُوْلـئِكَ عَلى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَأُوْلـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ[সূরা আল বাকারা : ৩-৫]

“যারা গাইবে বিশ্বাস করে, ছালাত কায়েম করে, আমি যেই রিয্ক তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে দান করে, যারা তোমার প্রতি ও তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান পোষণ করে, আর আখিরাতের প্রতিও যাদের রয়েছে ইয়াকীন, তারাই রয়েছে তাদের রবের নির্দেশিত পথে। আর তারাই সফল।”

إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِيْنَ إِذَا دُعُوْا إِلَى اللهِ وَرَسُولِه لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আন্ নূর : ৫১] 

“নিশ্চয়ই মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফায়সালা মেনে নেওয়ার জন্য ডাকা হয় তখন তারা বলে আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। এবং এরাই সফল।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِيْدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَمَنْ يُّطِعِ اللهَ وَرَسُولَه فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيْمًا 

[সূরা আল আহযাব : ৭০, ৭১]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করে চল এবং সোজা সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের আমলগুলো সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। আর যেই ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলে সে লাভ করেছে বিরাট সফলতা।”

الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْاخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ أُوْلئِكَ عَلى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা লোকমান : ৪, ৫] 

“যারা ছালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আখিরাতের প্রতি ইয়াকীন রাখে, তারাই রয়েছে তাদের রবের নির্দেশিত পথে। আর তারাই সফল।”

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِىْ شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَّأَحْسَنُ تَأْوِيلاً [সূরা আন্ নিসা : ৫৯]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আর আনুগত্য কর উলুল আমরের (আদেশ প্রদানের অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের)। তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরাও। এটাই সঠিক কর্মনীতি এবং শেষ ফলের দিক দিয়ে এটাই ভালো।”

فَالَّذِيْنَ امَنُوْا بِه وَعَزَّرُوْهُ وَنَصَرُوْهُ وَاتَّبَعُوْا النُّوْرَ الَّذِىْ أُنْزِلَ مَعَهُ أُوْلـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ[সূরা আল আ‘রাফ : ১৫৭]

“অতপর যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সহযোগিতা করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার প্রতি নাযিলকৃত নূরের (আল কুরআনের) অনুসরণ করে, তারাই সফল।”

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَه أُوْلـئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ إِنَّ اللهَ عَزِيزٌ حَكِيْمٌ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِىْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِى جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ [সূরা আত্ তাওবা : ৭১, ৭২]

“এবং মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয়, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, ছালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। আল্লাহ শিগগীরই তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী মহাবিজ্ঞ। এই মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত এবং সেখানে তারা থাকবে চিরদিন। সবুজ বাগানে তাদের জন্য উত্তম বাসস্থান থাকবে। আর সবচে’ বড় কথা, তারা আল্লাহর সন্তোষ হাছিল করবে। আর এটাই তো বড় সফলতা।”

قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكى لَهُمْ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلى جُيُوْبِهِنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ ابَائِهِنَّ أَوْ ابَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِىْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِىْ أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ أُوْلِى الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرُوْا عَلى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوْبُوْا إِلى اللهِ جَمِيْعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ

[সূরা আন্ নূর : ৩০, ৩১]

“মুমিন পুরুষদের বল তারা যেনো তাদের চোখ সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। তারা যা কিছু করে আল্লাহ তার খবর রাখেন। মুমিন মহিলাদেরকে বল তারা যেন তাদের চোখ সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করে। তারা যেন তাদের সাজ দেখিয়ে না বেড়ায় এটুকু ছাড়া যা আপনাআপনি প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তারা যেন তাদের বুকের ওপর ওড়নার আঁচল দিয়ে রাখে। তারা যেন তাদের সাজ প্রকাশ না করে, তবে তাদের সামনে ছাড়া, তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজের ছেলে, নিজের স্বামীর ছেলে, আপন ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, ঘনিষ্ঠ চেনা-জানা মহিলা, নিজেদের দাস, অধীনস্থ এমন পুরুষ যাদের অন্য রকম চাহিদা নেই এবং এমন বালক যারা মেয়েদের গোপন বিষয় জানে না। তারা যেন তাদের গোপন সাজ সম্পর্কে লোকদেরকে জানাবার উদ্দেশ্যে যমীনে জোরে পা ফেলে না চলে। হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা কর। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ أُمَّةٌ يَّدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আলে ইমরান : ১০৪] 

“তোমাদের মধ্য হতে এমন একদল লোক থাকতে হবে যারা লোকদেরকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, মা‘রূফ কাজের নির্দেশ দেবে এবং মুনকার থেকে বিরত রাখবে। আর এরাই সফল।”

فَاتَّقُوْا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوْا وَأَطِيْعُوْا وَأَنْفِقُوْا خَيْرًا لِّأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আত্ তাগাবুন : ১৬]

“আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করে চল। শুন, আনুগত্য কর এবং ইনফাক কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম। যারা মনের সংকীর্ণতা থেকে বেঁচে গেছে তারাই সফল।”

لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِيْنَ الَّذِيْنَ أُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُْونَ اللهَ وَرَسُولَه أُوْلئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ وَالَّذِيْنَ تَبَوَّؤُوْا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُوْنَ فِى صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُوْنَ عَلى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আল হাশর : ৮, ৯]

“(ঐ মাল) ঐ দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের বাড়ি-ঘর ও সহায়-সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদকৃত। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তোষ প্রত্যাশী। এরাই সত্যনিষ্ঠ। (ঐ মাল তাদের জন্যও) যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বেই ঈমান এনে বসবাস করছিলো। তারা ঐসব লোকের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে যারা হিজরাত করে তাদের কাছে এসেছে। এমনকি মুহাজিরদেরকে যা কিছু দেওয়া হয় সেই বিষয়ে তারা নিজের অন্তরে কোন চাহিদা পর্যন্ত অনুভব করে না। নিজেদের যতো অভাবই থাকুক না কেন তারা নিজেদের ওপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের সংকীর্ণতা থেকে বেঁচে গেছে তারাই সফল।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَابْتَغُوْا إِلَيْهِ الْوَسِيْلَةَ وَجَاهِدُوْا فِى سَبِيْلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ [সূরা আল মা-য়িদা : ৩৫]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করে চল, তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধানে লেগে থাক এবং তাঁর পথে জিহাদ কর। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُوْنَ فِى سَبِيْلِ اللهِ فَيَقْتُلُوْنَ وَيُقْتَلُوْنَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِىْ التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيْلِ وَالْقُرْانِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِه مِنَ اللهِ فَاسْتَبْشِرُوْا بِبَيْعِكُمُ الَّذِى بَايَعْتُمْ بِه وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ [সূরা আত্ তাওবা : ১১১] 

“আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান-মাল কিনে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, মারে ও মরে। তাদেরকে জান্নাত দেবার মজবুত ওয়াদা আত্ তাওরাত, আল ইনজীল ও আল কুরআনে করা হয়েছে। ওয়াদা পালনে আল্লাহর চেয়ে বেশি যোগ্য আর কে আছে? অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে যেই বেচা-কেনা করেছো সেই ব্যাপারে খুশি হয়ে যাও। এটা অতি বড় সফলতা।”

الَّذِيْنَ امَنُوْا وَهَاجَرُوْا وَجَاهَدُوْا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ وَأُوْلئِكَ هُمُ الْفَائِزُوْنَ[সূরা আত্ তাওবা : ২০]

“আল্লাহর কাছে তো ঐসব লোকের মর্যাদাই বড় যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে এবং আল্লাহর পথে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে। আর এরাই তো সফল।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ تُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَرَسُولِه وَتُجَاهِدُوْنَ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِىْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِىْ جَنَّاتِ عَدْنٍ ذلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ [সূরা আছ্ ছাফ : ১০-১২] 

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আমি কি তোমাদেরকে এমন ব্যবসার কথা বলবো যা তোমাদেরকে কষ্টদায়ক আযাব থেকে বাঁচাবে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং মাল ও জান দিয়ে তাঁর পথে জিহাদ কর। যদি তোমরা জান, এটাই তো তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন, তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। তোমাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতে উত্তম ঘর দেবেন। এটি অতি বড় সফলতা।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوْا وَاذْكُرُوْا اللهَ كَثِيْرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلحُوْنَ [সূরা আল আনফাল : ৪৫]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, কোন বাহিনীর সাথে তোমাদের মুকাবিলা হলে তোমরা দৃঢ়পদ থাক এবং বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ কর। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا اصْبِرُواْ وَصَابِرُوْا وَرَابِطُوْا وَاتَّقُواْ اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ 

[সূরা আলে ইমরান : ২০০]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, ছবর অবলম্বন কর, বাতিলপন্থীদের মুকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর, সদা-সর্বদা প্রস্তুত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করে চল, আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।”

لـكِنِ الرَّسُولُ وَالَّذِيْنَ امَنُوْا مَعَهُ جَاهَدُوْا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ وَأُوْلـئِكَ لَهُمُ الْخَيْرَاتُ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আত্ তাওবা : ৮৮] 

“কিন্তু রাসূল এবং ঐসব লোক যারা তাঁর সাথে ঈমান এনেছে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে। এদের জন্যই তো সব কল্যাণ। আর এরাই তো সফল।”

لاَ تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاخِرِ يُوَادُّوْنَ مَنْ حَادَّ اللهَ وَرَسُولَه وَلَوْ كَانُوْا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيْرَتَهُمْ أُوْلئِكَ كَتَبَ فِيىْ قُلُوْبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِىْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا رَضِىَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ أُوْلئِكَ حِزْبُ اللهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ [সূরা আল মুজাদালা : ২২] 

“তোমরা কখনো এমন দেখতে পাবে না যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদেরকে ভালোবাসে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করছে, ঐ লোকেরা চাই তাদের পিতা, পুত্র, ভাই কিংবা গোষ্ঠীর কেউ হোক না কেন। আল্লাহ এইসব লোকের অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি রূহ দিয়ে তাদেরকে শক্তি যুগিয়েছেন। তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে ঝর্ণা প্রবাহিত থাকবে। তারা সেখানে থাকবে চিরদিন। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এরাই আল্লাহর বাহিনী। জেনে রাখ, আল্লাহর বাহিনীর লোকেরাই সফল।”

এইসব আয়াতে একনজরে আমরা যেগুলোকে সফলতা হিসেবে দেখতে পাই তা হলো,
১। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা-ইখতিয়ার কিংবা অধিকারে শিরকমুক্ত ঈমানের অধিকারী হওয়া।

২।আখিরাতের জওয়াবদিহিতা, শাস্তি ও পুরস্কারের কথা মনে জাগ্রত রেখে জীবন যাপন করা।

৩।কোন বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফায়সালা জানার পর বিনা দ্বিধায় মেনে চলা।

৪।একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করতে থাকা।

৫।সালাত কায়েম করা ও খুশু সহকারে সালাত আদায় করা।

৬।যাকাত আদায় করা।

৭।আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়গুলোর অনুশীলন করতে থাকা।

৮।আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিত থাকা।

৯। ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ করতে থাকা।

১০।মা‘রূফের প্রতিষ্ঠা ও মুনকারের উচ্ছেদে সচেষ্ট থাকা।

১১।সর্বাবস্থায় সবর অবলম্বন করা।

১২।যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়পদ থাকা।

১৩।আত্মীয়, মিসকীন ও মুসাফিরের হক আদায় করা।

১৪।সুদ থেকে বেঁচে থাকা।

১৫।মদ থেকে বেঁচে থাকা।

১৬।জুয়া থেকে বেঁচে থাকা।

১৭।আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য নজরানা পেশ করা হয় এমন স্থান পরিহার করে চলা।

১৮।তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য গণনা থেকে বেঁচে থাকা।

১৯।নাপাক জিনিস পরিহার করা।

২০।অবৈধ যৌনাচার থেকে বেঁচে থাকা।

২১।পর নারীর সৌন্দর্য উপভোগ করা থেকে বেঁচে থাকা।

২২।আমানাতের হিফাযাত করা।

২৩।ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি পালন করা।

২৪।বেহুদা কাজ থেকে বেঁচে থাকা।

২৫।কৃপণতা থেকে মুক্ত হওয়া।

২৬।আত্মীয়-স্বজন হলেও যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে তাদেরকে ভালো না বাসা।

দুনিয়ার জীবন ক্ষনস্থায়ী এবং পরীক্ষা ক্ষেত্র। এর সফলতা কিংবা ব্যর্থতা মূলত কিছুই নয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِيْنَ وَالْقَنَاطِيْرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللهُ عِنْدَه حُسْنُ الْمَابِ[সূরা আলে ইমরান : ১৪] 

“মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনা-রূপার স্তুপ, সেরা ঘোড়া, গৃহপালিত পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আকর্ষণকে খুবই সুশোভিত করা হয়েছে। কিন্তু এইগুলো দুনিয়ার জীবনের সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর কাছে তো রয়েছে উত্তম আবাস।”

الْمَالُ وَالْبَنُوْنَ زِيْنَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِنْدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا [সূরা আল্ কাহফ : ৪৬]

“এই অর্থ-সম্পদ এবং সন্তান সন্তুতি তোমাদের দুনিয়ার জীবনের সাময়িক সাজ-সজ্জা মাত্র। আসলে তো টিকে থাকার মতো নেক আমলই তোমার রবের নিকট পরিণামের দিক দিয়ে উত্তম। এবং এই বিষয়েই ভালো কিছু আশা করা যায়।”

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللهُ عِنْدَه أَجْرٌ عَظِيْمٌ [সূরা আত্ তাগাবুন : ১৫]

“অবশ্যই তোমাদের অর্থ-সম্পদ এবং সন্তান সন্তুতি একটি পরীক্ষা। আর কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে বিরাট প্রতিদান।”

اِعْلَمُوْا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِى الْأَمْوَالِ وَالْاَوْلاَدِ [সূরা আল হাদীদ : ২০]

“জেনে নাও, দুনিয়ার জীবন একটি খেলা, তামাশা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব-অহংকার এবং অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে একে অপরকে অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ [সূরা আল আনকাবুত: ৬৪]

“আর দুনিয়ার জীবন তো হাসি-তামাশা, খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর আখিরাতের ঘর, সেটাই তো জীবন, যদি ওরা জানতো।”

“অর্থাৎ এর (দুনিয়ার জীবনের) বাস্তবতা শুধুমাত্র এতটুকুই যেমন ছোট ছেলেরা কিছুক্ষণের জন্য নেচে-গেয়ে আমোদ করে এবং যার যার ঘরে চলে যায়। এখানে যে রাজা হয়ে গেছে সে আসলে রাজা হয়ে যায় নি বরং শুধুমাত্র রাজার অভিনয় করছে। এক সময় তার এই খেলা শেষ হয়ে যায়। তখন সে তেমনি দীনহীন অবস্থায় রাজ সিংহাসন থেকে বিদায় নেয় যেইভাবে এই দুনিয়ার বুকে এসেছিলো। অনুরূপভাবে জীবনের কোন একটি আকৃতিও এখানে স্থায়ী ও চিরন্তন নয়। যে যেই অবস্থায়ই আছে সাময়িকভাবে একটি সীমিত সময়ের জন্যই আছে। মাত্র কয়েক দিনের জীবনের সাফল্যের জন্য যারা প্রাণপাত করে এবং এরই জন্য বিবেক ও ঈমান বিকিয়ে দিয়ে সামান্য কিছু আয়েশ আরামের উপকরণ ও শক্তি প্রতিপত্তির জৌলুস করায়ত্ত করে নেয়, তাদের এই সমস্ত কাজ মন ভুলানো ছাড়া আর কিছুই নয়। [তাফহীমুল কুরআন, সাইয়্যেদ আবুল ‘আলা মওদূদী ১১ খণ্ড, সূরা আল ‘আনকাবূতের তাফসীরের ১০২ নাম্বার টীকা।]

فَمَا أُوْتِيْتُمْ مِّنْ شَىْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ وَّأَبْقى لِلَّذِيْنَ امَنُوْا وَعَلى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ [সূরা আশ্ শূরা : ৩৬]

“তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা দুনিয়ার (ক্ষণস্থায়ী) জীবনের সামগ্রী। আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা যেমনি উত্তম তেমনি স্থায়ী। তা সেই সব লোকের জন্য যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের ওপর তাওয়াক্কুল করেছে।”

وَلَوْلاَ أَنْ يَّكُوْنَ النَّاسُ أُمَّةً وَّاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَنْ يَّكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُوْنَ وَلِبُيُْوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِؤُوْنَ وَزُخْرُفًا وَإِنْ كُلُّ ذلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِيْنَ [সূরা আয্ যুখরুফ : ৩৩-৩৫]

“সকল মানুষ একই পথ ধরার আশংকা না থাকলে আমি কাফিরদের ঘরের ছাদ, যেই সিঁড়ি দিয়ে তারা উপরে ওঠে সেই সিঁড়ি, তাদের ঘরের দরওয়াজাগুলো এবং যেই উচ্চাসনে তারা হেলান দিয়ে বসে রূপা ও সোনা বানিয়ে দিতাম। এইগুলো তো পার্থিব জীবনের (সামান্য) উপকরণ। তোমার রবের নিকট আখিরাত তো কেবল মুত্তাকীদের জন্য নির্ধারিত।”

“অর্থাৎ এই সোনা-রূপা যা কারো লাভ করা তোমাদের দৃষ্টিতে চরম নিয়ামাত প্রাপ্তি এবং সম্মান ও মর্যাদার চরম শিখরে আরোহণ, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে এতই নগণ্য যে যদি সকল মানুষের কুফরের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশংকা না থাকতো, তাহলে তিনি প্রত্যেক কাফিরের বাড়ি-ঘর সোনা-রূপা দিয়ে তৈরি করে দিতেন। এই নিকৃষ্ট বস্তুটি কখন থেকে মানুষের মর্যাদা ও আত্মার পবিত্রতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই সম্পদ তো এমন সব মানুষের কাছেও আছে যাদের ঘৃণ্য কাজ-কর্মের পংকিলতায় গোটা সমাজ পুঁতিগন্ধময় হয়ে যায়। আর একেই তোমরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছো।”

[তাফহীমুল কুরআন, সাইয়্যেদ আবুল ‘আলা মওদূদী, ১৪শ খণ্ড, সূরা আয্ যুখরুফের তাফসীরের ৩৩ নাম্বার টীকা।]

وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُوْنَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ 

[সূরা মুহাম্মাদ : ১২]

“আর কাফিররা দুনিয়ার ক’দিনের মজা লুটছে। জন্তু-জানোয়ারের মতো পানাহার করছে। ওদের চূড়ান্ত ঠিকানা জাহান্নাম।”

وَلاَ تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلى مَا مَتَّعْنَا بِه أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيْهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَّأَبْقَى [সূরা তা-হা : ১৩১]

“দুনিয়ার জীবনের এই জাঁকজমক যা আমি তাদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়েছি সেই দিকে তুমি চোখ তুলেও তাকাবে না। এইসব তো তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলার জন্য দিয়েছি। আর তোমার রবের রিয্কই উত্তম ও স্থায়ী।”

আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

اِنَّ لِكُلِّ اُمَّةٍ فِتْنَةً وَفِتْنَةُ اُمَّتِى الْمَالُ.

[কা‘ব ইবনু ইয়াদ (রা), জামে আত্ তিরমিযী]

“অবশ্যই প্রত্যেক উম্মাতের জন্য রয়েছে এক একটি ফিতনা। আমার উম্মাতের ফিতনা হচ্ছে অর্থ-সম্পদ।”

আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلاَ أَوْلَادُكُمْ بِالَّتِىْ تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفى إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُوْلئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوْا وَهُمْ فِى الْغُرُفَاتِ امِنُوْنَ [সূরা সাবা : ৩৭]

“তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি এমন নয় যে তা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে, তবে যারা ঈমান আনে এবং আমালে ছালেহ করে তারা এমন লোক যাদের জন্য রয়েছে তাদের কর্মের দ্বিগুণ প্রতিদান এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে অবস্থান করবে।”

وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُوْرِ [সূরা আলে ইমরান : ১৮৫]

“আর দুনিয়ার জীবন তো ছলনার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।”

يا أَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذلِكَ فَأُوْلئِكَ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ [সূরা আল মুনাফিকুন : ৯]

“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না রাখে। যারা এমনটি করবে তারা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”

“বিশেষভাবে অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির উল্লেখ করা হয়েছে এই জন্য যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ এইসব স্বার্থের কারণে ঈমানের দাবি পূরণ না করে নিফাক অথবা ঈমানের দুর্বলতা অথবা পাপাচার ও না-ফরমানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।”

[তাফহীমুল কুরআন, সাইয়্যেদ আবুল ‘আলা মওদূদী, ১৭শ খণ্ড, সূরা আল মুনাফিকুনের তাফসীরের ১৮ নাম্বার টীকা।]

আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوْضَةٍ مَا سَقى كَافِرًا مِنْهَا شِرْبَةَ مَاءٍ[সাহল ইবনু সা‘দ (রা), জামে আত্ তিরমিযী] 

“আল্লাহর নিকট দুনিয়াটার মূল্য যদি একটি মশার ডানার মূল্যের সমান হতো, তাহলে তিনি কোন কাফিরকে এর থেকে এক চুমুক পানি পান করতে দিতেন না।”

আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

يا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللهِ الْغَرُوْرُ [সূরা ফাতির : ৫]

“ওহে মানব জাতি, অবশ্যই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে। আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকাবাজ (শাইতান) যেন তোমাদেরকে ধোঁকা দিতে না পারে।”

فَلاَ تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلاَ يَغُرَّنَّكُمْ بِاللهِ الْغَرُوْرُ [সূরা লোকমান : ৩৩] 

“অতএব দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে। আর ধোঁকাবাজ (শাইতান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলতে না পারে।”

আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ اَحَبَّ دُنْيَاه اَضَرَّبِاخِرَتِه وَمَنْ اَحَبَّ اخِرَتَه اَضَرَّبِدُنْيَاه فَاثِرُوْامَا يَابْقى عَلى مَا يَفْنى

[আবু মূসা আল আশ‘আরী (রা)। আহমাদ, ইবন হিব্বান, আল বাযযার, আল হাকিম, আল বাইহাকী।]

“যেই ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবাসে সে তার আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসে সে তার দুনিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অতএব যা ধ্বংসশীল তার ওপর যা স্থায়ী তাকে অগ্রাধিকার দাও।”

আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِى سَبِيْلِه فَتَرَبَّصُواْ حَتَّى يَأْتِىَ اللهُ بِأَمْرِه وَاللهُ لاَ يَهْدِى الْقَوْمَ الْفَاسِقِيْنَ [সূরা আত্ তাওবা : ২৪]

“তাদেরকে বল, তোমাদের আব্বা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা যার মন্দার আশংকা তোমরা কর, তোমাদের পছন্দের ঘর-বাড়ি যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ থেকে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আর আল্লাহ ফাসিকদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন না।”

এই আয়াতের দাবি হচ্ছে, দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে একজন মুমিনের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ প্রিয়তর হতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদকে অগ্রাধিকার দিতে পারার ওপরই নির্ভর করে তার আখিরাতের সফলতা।

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা আমাদের জীবনকে সাফল্যমন্ডিত করুন, আমীন। 

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

আমাদের রাজপুত্র মীর কাসেম আলী


পনের-ষোল বছর আগের কথা। ছাত্রশিবিরের কর্মী হতে ভাইবা দিতে হবে। তাই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। দুই/তিন পাতার শিট। পুরো শিট মুখস্ত করতে হবে। ছোট মানুষ ছিলাম। ভাইবার কথা মনে করলেই সব ওলট-পালট হয়ে যেত। যা শিখি তা আবার ভুলে যাই। শিটতো মুখস্ত করতেই হবে, সাথে আরো সাধারণ জ্ঞানও মুখস্ত করা চাই। নইলে শিবিরের কর্মী হওয়া যাবে না।

সেই প্রস্তুতি নিতে গিয়ে রূপকথার এই মানুষের নাম প্রথম জানলাম। তিনি শিবিরের ১ম কেন্দ্রীয় সভাপতি। মীর কাসেম আলী নাম। রূপকথার রাজপুত্রকে যেমন সবাই ভালোবাসে আমিও ভালোবাসতে লাগলাম এই রাজপুত্রকে। বড় হওয়ার সাথে সাথে যখন তাকে আরো জানলাম বুঝেছি আমাদের এই রাজপুত্র শুধুমাত্র রূপকথার রাজপুত্র নন, আরো বড় কিছু।

জাহেলিয়্যাতের মোকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের চেষ্টায় নিজেকে করেছিলেন আত্মনিয়োগ। যেখানেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলেছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ব্যবসা, পর্যটন শিল্প, আবাসন খাত, কৃষি, মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই তিনি ভূমিকা রেখেছেন রাজার মত। তিনি দেখিয়েছেন অমানবিক পুঁজিবাদী সমাজের বিপরীতে ইসলামের অপার সৌন্দর্য।

কেউ বক্তব্য দেয়, কেউ থিউরি দেয়, কেউ আবার সেই থিউরি কপচায়, কেউ বলে এই করা দরকার, সেই করা দরকার, কেউ উপদেশ দেয়, কেউ আবার সেই উপদেশের ক্রিটিসিজম করে, কেউ সমালোচনা করে, কেউ সেই সমালোচনার সমালোচনা করে বিতর্কের হাট বসায়। মীর কাসেম আলী এসবের লোক নন। তিনি নীরবে কাজ করে যেতেন। যারা কাজ করেন তাদের উৎসাহ দিতেন। তিনি বলার চাইতে করতেন বেশী। জনশক্তিদের উপদেশ দিয়ে শেখানোর চাইতে কাজ করে উদাহরণ হওয়া ছিল তার পছন্দের।

আমাদের এই রাজপুত্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ তিনি নাকি অমানবিক। মানবতাবিরোধী কাজ করেছেন। আমি ভাবি আর স্মরণ করি রবীন্দ্রনাথের “দুই বিঘা জমির” শেষ দু’টি লাইন। 

আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে -
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।

রাজপুত্রের অপরাধ গুরুতর। মাস্টার্স পাশ করতে না করতেই দায়িত্ব নিলেন রাবেতা আলম আল ইসলামী (মুসলিম বিশ্বে ভ্রাতৃত্ব) নামক একটি এনজিওতে যার অন্যতম কাজ স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে যেখানে মুসলমানরা নির্যাতিত। তখন সাল ছিল ১৯৭৯। বাংলাদেশে আগত বার্মার নির্যাতিত মুসলমান শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। কক্সবাজারের মরিচ্যাপালংএ গড়ে তুললেন রাবেতা হাসপাতাল। তার বড় ভাইসহ একদল সদ্যপাশ করা তরুন ডাক্তার আর নিবেদিত প্রাণ একঝাঁক যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেন এই প্রকল্প। সেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কয়েকটি চেয়ার টেবিল দিয়ে শুরু। দেখতে দেখতে সেই হাসপাতালের বড় হলো, অনেক বড়। গড়ে উঠলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অপারেশন থিয়েটার (O.T), ফার্মেসী, ইনডোর- আউটডোর সার্ভিসসহ সার্বক্ষনিক ব্যবস্থাপনায় এক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। স্থানীয় বাংলাদেশীদের চিকিৎসাও চললো পাশাপাশি । গড়ে উঠলো নিজস্ব বিল্ডিং, চালু হলো নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তৈরি হল আবাসিক হোস্টেল।

গ্রাম-বাংলার জনগন এর চাহিদাকে সামনে রেখে প্রবর্তন করা হলো ‘পল্লী চিকিৎসক প্রকল্প’ এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুবকরা ছড়িয়ে পড়লো গোটা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এরপর শুরু হলো ইমামদের স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, যার প্রধান অংশে রয়েছে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রশিক্ষণ। এভাবেই মীর কাসেম আলীর মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। মীর কাসেম এদেশের জনগণের উন্নতির জন্য যে চিন্তাভাবনা করেছেন তার বাস্তবরূপ প্রকাশ পেয়েছে রাঙ্গামাটির পিছিয়ে পড়া পার্বত্য জনগন এর জন্য নির্মিত রাবেতা হাসপাতাল, মাইনিমুখ এর মাধ্যমে। এছাড়াও রয়েছে রাবেতা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স টেকনাফ এর উখিয়া ও হিলি, রংপুর এর মিঠাপুকুর সহ বিভিন্ন ছোটখাট স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে। দিন রাত পড়ে থাকতেন আটকে পড়া রোহিঙ্গা, বিহারী, সাঁওতাল, চাকমা, মারমাসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের সেবায়।

ঢাকায় আটকে পড়া বিহারীদের জন্য তৈরী করেছেন মুহাম্মদপুরে রাবেতা হাসপাতাল। দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনাকে একটি ছোট্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বিরাট হাসপাতাল, ডি ল্যাব, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রি, ইমেজিং সেন্টার এবং ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ স্থাপন পর্যায়ে নিয়ে আসেন। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে থাকাকালীন তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল কাকরাইল, শাহজাহানপুর, বরিশাল, খুলনা, রংপুর এবং কমিউনিটি হাসপাতাল নামে মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে তুলেন হাসপাতাল। রাজশাহীতে ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ও মেডিকেল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট মীর কাসেম আলীর একনিষ্ঠ শ্রমের ফসল। আর ফুয়াদ আল খাতিব হাসপাতাল ঢাকা ও কক্সবাজারে এক অতিপরিচিত নাম।

আপনারা হয়তো ভাবছেন ওনার কর্মের কিছু কথা বলে আমি মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ঢাকার চেষ্টা করছি। না তা নয়। আসুন জেনে নিই ওনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং তার পোস্টমর্টেম। 

প্রভুকে ভীষন ভালোবাসেন তিনি। প্রভুর সাথে পাঁচবার সাক্ষাতে তিনি আলাদা করে প্রস্তুতি নিতেন। পছন্দের পোষাকগুলো পরে প্রভুর সামনে হাজির হন বিনম্রভাবে। আমরা সবাই নামাজ আদায় করি। কিন্তু আমাদের রাজপুত্র মালিকের সামনে হাজির হতেন আলাদাভাবে যেন তিনি রবকে দেখতে পেতেন। কেউ তার সেজেগুজে নামাজে যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, দেশের প্রধান আপনাকে ডাকলে আপনি কিভাবে যাবেন? আমাকে তো ডেকেছে তার চাইতে বড়, অনেক বড়, এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, মহান প্রভু। আমি কিভাবে অগোছালোভাবে যাই...?

আজ আমাদের রাজপুত্র অপেক্ষা করছে তার প্রভুর কাছে চিরদিনের জন্য যেতে, প্রভু তাকে ডাকছে। আমাদের রাজপুত্র মহান প্রভুর মেহমান হবে।

#MirQuasemAli
#WeAreMirQuasemAli