১৮ মার্চ, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৩৩ : বঙ্গভঙ্গ এবং মুসলিম ও মুশরিকদের দ্বন্দ্বের পুনরাবৃত্তি


বাংলার ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে বাংলায় চলে আসা হাজার বছরের তাওহীদবাদী ও মুশরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব পুনরায় চরমে পৌঁছে যায়। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবনার একেবারে শুরুতে মুসলিমরা এর বিরোধীতা করে ইংরেজরা তাদের শোষণ আরো জোরদার করবে মনে করে। তখন হিন্দু সমাজ চুপ ছিলো। কিন্তু যখন লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে কিছু সুযোগ সুবিধা ঘোষণা করেন আর এতে সন্তুষ্ট হয়ে মুসলিম সমাজ বঙ্গভঙ্গ মেনে নেয়। 

এতেই বাধে বিপত্তি। মুসলিমদের উপকার হবে আর হিন্দুরা তা মেনে নিবে এটা তো হতে পারে না। সর্বাত্মক আন্দোলন করে বঙ্গভঙ্গকে রুখে দেয় হিন্দুরা। এই ঘটনাকে ইস্যু করে মুসলিমরা বুঝতে পারে কংগ্রেস ভারতীয়দের জন্য নয় সেটা কেবল হিন্দুদের স্বার্থ বিবেচনা করে। এর প্রেক্ষিতে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। 

লর্ড কার্জন ভাইসরয় থাকাকালীন সময়ে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। ১৭৬৫ সাল থেকে বিহার ও উড়িষ্যা সমন্বয়ে গঠিত বাংলা ব্রিটিশ ভারতের একটি একক প্রদেশ হিসেবে বেশ বড় আকার ধারণ করেছিল। এর ফলে প্রদেশটির প্রশাসনকার্য পরিচালনা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে এবং এজন্য এটিকে বিভক্ত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বলা চলে এই বিশাল প্রদেশ শাসন করা ইংরেজদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিলো বলেই এখানে বারংবার বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। 

১৯০৩ সালে বাংলা প্রদেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৭ কোটি ৮৫ লক্ষে দাঁড়ায়। এর ফলস্বরূপ পূর্ব বাংলার অনেকগুলি জেলা কার্যত বিচ্ছিন্ন এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অবহেলিত ছিল। ফলে এতদঞ্চলের সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কলকাতা ও এর নিকটস্থ জেলাসমূহ সরকারের আওতাধীন ছিলো। অন্যান্য অঞ্চলে জমিদারদের শোষণের ভারে চাষীদের অবস্থা ছিল দুর্দশাগ্রস্ত; এবং ব্যবসায়, বাণিজ্য ও শিক্ষা ছিল অবহেলিত। প্রদেশের প্রশাসনিক যন্ত্রকে প্রয়োজন অপেক্ষা কমসংখ্যক কর্মচারী নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হতো। বিশেষত নদ-নদী ও খাঁড়িসমূহ দ্বারা অত্যধিক বিচ্ছিন্ন পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলে পুলিশী কাজ চালানো অসুবিধাজনক হলেও উনিশ শতকের শেষ দশক পর্যন্ত সেখানে আলাদা মনোযোগ প্রদান করা হয় নি। জলপথে সংঘবদ্ধ জলদস্যুতা অন্তত এক শতাব্দীকাল বিদ্যমান ছিল।

প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতাসমূহের পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ, প্রতিরক্ষা অথবা ভাষাগত সমস্যাবলির কারণে ইংরেজরা বাংলাকে ভাগ করে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করার চিন্তা করে। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবসমূহ ১৯০৩ সালে প্রথম বিবেচনা করা হয়। লর্ড কার্জন মূলত প্রসাশনিক ও প্রতিরক্ষামূলক কাজের সুবিধার জন্যই নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। ১৯০৪ সালের জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে লর্ড কার্জন পূর্ব বাংলার জেলাগুলি সফর করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা করেন এবং বিভক্তির ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে বক্তৃতা দেন। প্রথমে মুসলিমরা বিরোধীতা করলেও তার এই সফরে মুসলিমরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। 

বঙ্গভঙ্গ অনুসারে নতুন প্রদেশটি গঠিত হবে পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগসমূহ এবং মালদা জেলাকে আসামের সাথে একত্র করে। বাংলাকে যে শুধু পূর্বদিকে এ বৃহৎ ভূখণ্ডসমূহ ছেড়ে দিতে হবে তাই নয়, তাকে হিন্দি-ভাষাভাষী পাঁচটি রাজ্যও মধ্যপ্রদেশকে ছেড়ে দিতে হবে। পশ্চিম দিকে সম্বলপুর এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে উড়িয়া-ভাষাভাষী পাঁচটি রাজ্যের সামান্য ভূখণ্ড বাংলা লাভ করবে। বাংলার নিজের দখলে যে ভূখণ্ড থেকে যায় তার আয়তন ১৪১,৫৮০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা পাঁচ কোটি চল্লিশ লক্ষ, যাদের মধ্যে চার কোটি বিশ লক্ষ হিন্দু ও নব্বই লক্ষ মুসলমান।

নতুন প্রদেশটি অভিহিত হবে ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে, যার রাজধানী হবে ঢাকা এবং অতিরিক্ত সদর দপ্তর হবে চট্টগ্রামে। এর আয়তন হবে ১০৬,৫৪০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা তিন কোটি দশ লক্ষ। এর মধ্যে এক কোটি আশি লক্ষ মুসলমান ও এক কোটি বিশ লক্ষ হিন্দু। এর প্রশাসন গঠিত হবে একটি আইন পরিষদ ও দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি রাজস্ব বোর্ড নিয়ে। নতুন প্রদেশটির সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, এটা এর নিজস্ব চৌহদ্দির মধ্যে এ যাবৎ বাংলার তুচ্ছ ও অবহেলিত প্রতিনিধিত্বমূলক সমপ্রকৃতির মুসলমান জনগণের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিবে। অধিকন্তু, চা শিল্প এবং পাট উৎপাদনকারী এলাকার বৃহদংশ একক প্রশাসনের অধীনে নিয়ে আসা হবে। 

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলাকে নিজের পক্ষে টানতে লর্ড কার্জন ঢাকাকে রাজধানী করে মুসলিমদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। সেই সাথে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, পৃথক আইন পরিষদ ও রাজস্ব বোর্ডের ঘোষণাও দেন কার্জন। প্রথমদিকে পূর্ব বাংলার মুসলিমরা ভেবেছিলো তাদের উপর ইংরেজ শাসন আরো জেঁকে বসবে তাই তারা বিরোধীতা করেছিলো। কিন্তু পরে বিভিন্ন সুবিধার কথা চিন্তা করে বেশিরভাগই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে চলে যায়। নবাব সলিমুল্লাহও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। জমিদার, আইনজীবী ও কিছু ব্যবসায়ী ছাড়া মুসলমানদের অধিকাংশই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। তবে আসামের চিফ কমিশনার হেনরি কটন নিজেও এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এসব পক্ষ-বিপক্ষ মতের মধ্যেই ১৯০৫ সালের ৯ জুন ভারত সচিব ব্রডরিক এ পরিকল্পনা অনুমোদন করেন ও ১০ জুলাই সরকারি গেজেট হিসেবে তা প্রকাশিত হয়। একই বছর ১৬ অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। 

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য পূর্ব বাংলাকে গুরুত্ব দেয়ার দরকার অপরিহার্য হলে বঙ্গভঙ্গের পেছনে কাজ করেছিল কিছু রাজনৈতিক ব্যাপারও। ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত হওয়া শিক্ষিত সমাজ একসময় নিজেদের পরাধীনতার কষ্টটা অনুভব করতে থাকে। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয় আর এর কেন্দ্র ছিল কলকাতা। বাংলাকে বিভক্ত করে এই জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করার কথা যে ব্রিটিশরা একেবারেই ভাবেনি সেটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য না। এছাড়া সরকারি চাকরিতে ব্রিটিশদের তুলনায় দেশীয়দের বৈষম্য বাঙালিদের ক্ষুব্ধ করে রেখেছিল অনেক দিন ধরেই। হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তৈরি করে ভারতীয়দের ঐক্য নষ্ট করে ব্রিটিশদের শাসকরা সুবিধা নিবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই সুবিধা নেয়ার মূল কারণ হিন্দুদের হিংসা। 

বঙ্গভঙ্গের শুরুতে হিন্দু সমাজের তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কিন্তু যখন ঢাকাকে রাজধানী করা, মুসলিমদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, সেই সাথে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, পৃথক আইন পরিষদ ও রাজস্ব বোর্ডের ঘোষণা দেন তখনই মূলত হিন্দু সমাজ ও কংগ্রেসের বিরোধীতা পরিলক্ষিত হয়। এদিকে লর্ড কার্জন পূর্ব বাংলা সফরে মুসলমানদের ঐক্যের উপরেই জোর দেন বেশি। এটি ধর্মকে সরাসরি ব্যবহার করা দুই বাংলাতেই প্রভাব ফেলে। কোলকাতার হিন্দুদের আচরণে পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে হিন্দু বিদ্বেষী মনোভাব বাড়তে থাকে। এছাড়া পূর্ব বাংলায় প্রচুর হিন্দু থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিলেন নিচু বর্ণের হিন্দু। অন্যদিকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের মতো উঁচু বর্ণের হিন্দুরা থাকতেন কোলকাতায়। ফলে মুসলমানদের সাথে সাথে পূর্ব বাংলার হিন্দুরাও নিজেদের সুবিধার কথা ভেবে বঙ্গভঙ্গের পক্ষেই অবস্থান নেন।

মুসলমানগণ নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার-কে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। মুসলেম ক্রনিকল সংবাদপত্র বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেয়। কলকাতার মুসলমানরাও নতুন প্রদেশটির সৃষ্টিকে স্বাগত জানায়। মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি ১৯০৫ সালে সাতজন নেতৃস্থানীয় মুসলমান ব্যক্তিত্ব কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি প্রকাশ্য লিখিত ঘোষণা বের করে। ঘোষণাটি পশ্চিম ও পূর্ব উভয় বাংলার বিভিন্ন মুসলমান সোসাইটিগুলির নিকট বিলি করা হয় এবং এর মাধ্যমে বিভক্তি ব্যবস্থার প্রতি তাদের শর্তহীন সমর্থন দানের জন্য মুসলমানদের নিকট অনুরোধ জানানো হয়। নতুন প্রদেশটির সৃষ্টি মুসলমানদেরকে একটি সঙ্ঘবদ্ধ দলে পরিণত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার অভিপ্রায়ে একটি সংঘ গঠন করতে উৎসাহিত করে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিরাজমান সকল প্রতিষ্ঠান ও সমিতিকে এ নতুন ইউনিয়নটির সাথে নিজেদেরকে অধিভুক্ত করতে আহ্বান জানানো হয় এবং খাজা সলিমুল্লাহকে সর্বসম্মতিক্রমে এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মনোনীত করা হয়।

আবার একদল শিক্ষিত মুসলিম পন্ডিত ছিল যারা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বিক্ষোভ ও স্বদেশী আন্দোলন-এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। যদিও তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য, তবুও তাদের ভূমিকা মুসলমানদের চিন্তাধারায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এই দলটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে সমর্থন ও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। মুসলমানদের মধ্যকার এ ধারার লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন নওয়াব সলিমুল্লাহর সৎ ভাই খাজা আতিকুল্লাহ। কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে (১৯০৬) তিনি বঙ্গভঙ্গকে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন