২৬ এপ্রিল, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৩৬ : নিজের নাক কেটে মুসলিমদের যাত্রা ভঙ্গ করলো মুশরিকরা



১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর থেকে এদেশে অর্থাৎ বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হতে শুরু করে। ঢাকাকে রাজধানী করার জন্য যা যা করা দরকার তার প্রস্তুতি শুরু হয়। যদিও ঢাকা পূর্বেই শহর ছিল তবে প্রায় ১৫০ বছর এর কোনো উন্নয়ন হয়নি। ফলে এর অবস্থা ছিল শোচনীয়। এখানে আরেকটি তথ্য বলে রাখা দরকার গোড়া থেকেই ইংরেজদের রাজধানী ছিল বাংলায় তথা কলকাতায়। কলকাতা থেকেই সারা ভারতবর্ষ শাসন করতো তারা। ফলে স্বভাবতই কলকাতা বড় শহরে পরিণত হলো এবং কলকাতা কেন্দ্রীক ইংরেজদের পোষ্য সিভিল সোসাইটি ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরি হলো। ঢাকাকে রাজধানী করার জন্য অনেকক্ষেত্রেই সেই সিভিল সোসাইটির সাহায্য ইংরেজ সরকার পায়নি। এর মধ্যে কলকাতায় শুরু হয়েছে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। সব সমস্যা উত্তরণ করে ঢাকাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলো ইংরেজরা।

তাই বাংলায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার কর্তৃক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী ক্ষুদিরামকে ফাঁসী দেওয়া হলো। আরেক বড় সন্ত্রাসী প্রফুল্ল চাকী নিজেই আত্মহত্যা করলো। ফলে এ আন্দোলন ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। ১৯১০ সালের শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে ফিরে আসছিল। আন্দোলনের যোদ্ধারা একরকম রণক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ বৎসরেই জনৈক বাঙালি হিন্দু ব্যবস্থাপক সভায় বিষয়টি নতুন করে উত্থাপন করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে তিনি তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে সম্মত হন। স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ছিলেন আন্দোলনের উদ্যোক্তা। তিনিও সবশেষে তাঁর ‘বাঙালী’ পত্রিকার মাধ্যমে বলেন, “আমরা অবশ্য স্বীকার করি যে এ বিভাগ টিকে থাকার জন্যে হয়েছে এবং আমরা একে বানচাল করতে চাইনা”। সুরেন্দ্রনাথ বাবুর এই কথার পর আর বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু তারপরও হয়েছিল। এর কারণ ছিলো কলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবী। যেটা সন্ত্রাসবাদীরা পারেনি সেটাই পেরেছে বুদ্ধিজীবীরা।

রাজা পঞ্চম জর্জ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণের প্রাক্কালে তিনি সর্বাপেক্ষা বড় উপনিবেশকে নিজের মতো সাজাতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন। সেক্ষেত্রে তিনি এই অঞ্চলের মানুষের প্রিয়ভাজন হওয়ার চেষ্টা করলেন। তারই সূত্রে বুদ্ধিজীবীরা তাকে নানান পরামর্শ দিয়েছিলো। রাজাও তার কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি তার অভিষেক নিজের মুখে ঘোষণা করার জন্য ১৯১১ সালে ভারতে আগমন করেন। ওনার আসার সময় ভারতবর্ষ স্থিতিশীল ছিল না। বস্তুত ইংরেজদের অপশাসনের কারণে এখানে কখনোই স্থিতিশীল অবস্থা ছিল না। 

বাংলার সন্ত্রাসবাদীরা স্থিমিত হলেও তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সুযোগের অপেক্ষা করছিলো। ভারতে তখন দুর্ভিক্ষ বিরাজমান। ইতালী-তুর্কী যুদ্ধের কারণে মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ। এসব কারণে পঞ্চম জর্জের মন্ত্রীরা ভারত সফর উচিত হবে না বলে পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজা সকল পরামর্শ উপেক্ষা করে ভ্রমণের প্রস্তুতি করতে থাকেন। নভেম্বর মাসে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ডিসেম্বরের শুরুতে তিনি বোম্বাই বর্তমানে মুম্বাই পৌঁছান। ভারতবাসীর তিনি কিছু পুরস্কার ঘোষণা করতে চাইলেন। জাঁকজমকপূর্ণ সমাবেশে ভাবগম্ভীর পরিবেশে রাজা পঞ্চম জর্জ রাজ্যাভিষেক ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে তিনি ভারতবর্ষের আস্থা অর্জন করার জন্য কিছু ঘোষণা দেন।
  
১- সকল রাজনৈতিক বন্দীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন 
২- শিক্ষার উন্নয়নে মোটা রকমের অংক বরাদ্দ করেন; 
৩- ভারতীয় সৈনিকদের জন্যে ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ সম্মান লাভের অযোগ্যতা দূর করা হলো, 
৪- অল্প বেতনভূক্ত সরকারী কর্মচারীদেরকে অতিরিক্ত অর্ধ মাসের বেতন দেয়া হলো; 
৫- ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লী স্থানান্তরিত করা হলো। 
৬- সর্বশেষে বলা হলো ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদ করা হলো। 

বাংলার হিন্দুগণ আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়লো। বঙ্গভঙ্গ বাতিলের ঘোষণা দ্বারা তাৎক্ষণিক সুবিধা এই হলো যে, ভারত সাম্রাজ্যের হিন্দু সাম্প্রদায়িক অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির মধ্য দিয়ে রাজদম্পতির নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা পাওয়া গেল। কিছুদিন পর যখন রাজা কলকাতায় এলেন, তখন হিন্দুরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে রাজা ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি তাদের অসীম আনুগত্য প্রদর্শন করে বিরাট বিরাট শোভাযাত্রা করে। হিন্দু সংবাদপত্র এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয় যে, হিন্দু মন্দিরে রাজা ও রাণীর মুর্তি স্থাপনের প্রস্তাব করে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। 

বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের যতটুকু ক্ষতি তার চাইতে বড় ক্ষতি হয়ে গেল এখন। কিন্তু তারপরও তারা খুশি কারণ মুসলিমদের কোন উপকার হয়নি। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো হিংসুক জাতি বাংলার এই মুশরিকরা। কলকাতা ছিল পুরো ভারতবর্ষের রাজধানী। সেখান থেকে হয়ে শুধু বাংলার রাজধানী। লাভ হলো শুধু বাংলা আয়তন একটু বেড়েছে। আবার আগের মতো বড় হয়নি। তাদের এত বড় ক্ষতি হওয়ার পরও তারা রাজার সাথে এরকম সিদ্ধান্তে সম্মত হয় শুধুমাত্র মুসলমানদের উন্নতি ঠেকানোর জন্য। কার্যত এটা মুসলিমদের জন্য অকল্যাণ মনে হলেও এর প্রভাব হয়েছে সুদূরপ্রাসারী। এটা মুসলিমদের স্বাধীনতার জন্য আলাদা করে ভাবতে শিখিয়েছে। পাশ্চাত্য পড়াশোনা করা মুসলিম নেতারা হিন্দুদের সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। হিন্দুদের সাথে একরাষ্ট্রে থাকা সম্ভবপর নয় এই চরমসত্য তাদের উপলব্দি হয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলন আলাদাভাবে করতে হবে এটা তারা বুঝে নিয়েছেন। যদিও পাশ্চাত্য ভাবধারার মুসলিমরা বুঝেছেন কিন্তু দেওবন্দ আন্দোলনের মুসলিমরা এক অজানা প্রলোভনে সারাসময় মুশরিকদের সাথেই জোট করে ছিলেন। দেওবন্দ আন্দোলনের মুসলিমরা মুসলিম লীগে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে তারা মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন।   

যাই হোক রাজা পঞ্চম জর্জের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব ও পশ্চিমবাংলাকে সংযুক্ত করে যুক্তবঙ্গীয় প্রদেশ সৃষ্টি করা হলো। এ প্রদেশ থেকে আসামকে সরিয়ে নেওয়া হলো। বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো বিহার ও উড়িষ্যাকে। এই দুই এলাকা নিয়ে গঠন করা হলো একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ। ফলে দেখা গেল বাংলা প্রদেশ আদতে ছোট হয়ে গেল। আর ব্রিটিশ-ভারতের দেড়শ’ বছরের পুরনো রাজধানী স্থানান্তর করা হলো কলকাতা থেকে দিল্লীতে। কলকাতার বর্ণহিন্দুরা নিজেদের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করলেন এবং ‘জনগণ-মন-অধিনায়ক হে ভারত-ভাগ্য বিধাতা’ বলে পুরনো সুরে ব্রিটিশ-প্রভুর জয়গান গাইলেন। ইংরেজ শাসকরাও অল্পকালের মধ্যেই প্রমাণ পেলেন যে, কলকাতার বাইরে ভারতের আর কোথাও তাদের জন্য ‘অভয়াশ্রম’ ছিল না। ১৯১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিল্লীতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন উপলক্ষে চকবাজার থেকে মিছিল বের হলো বড়লাটের নেতৃত্বে। এই মিছিলে বড়লাট হার্ডিঞ্জের র‍্যালির ওপর বোমা নিক্ষিপ্ত হলো। প্রাচীন রাজধানী দিল্লী এভাবেই ইংরেজদেরকে পুষ্পরেণুর বদলে বারুদ ছিটিয়ে স্বাগত জানালো।

বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা ভারতের মুসলমানগণ স্তম্ভিত হলেন। দারুণভাবে আহত হলেন ঢাকার নবাব সলীমুল্লাহ। বাংলার বাইরের মুসলিম নেতাদের সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন নবাব ওয়াকার উল মুলক। তিনি উত্তর প্রদেশের মীরুটের নবাব ছিলেন। দিল্লীর দরবার থেকে ফিরে এসে বঙ্গভঙ্গ রদের মাত্র এক সপ্তাহ পর ১৯১১ সালের ২০ ডিসেম্বর তিনি আলীগড় ইন্সটিটিউট গেজেটে ‘ভারতীয় মুসলমানদের কর্মপন্হা’ নামে এক আবেগময় প্রবন্ধ লিখলেন। তাতে তিনি বলেন,

“বঙ্গভঙ্গ রদ করে সরকার মুসলমানদের প্রতি অন্যায় উদাসীনতা দেখিয়েছেন। তাই আমাদেরকে অবশ্যই বিকল্প কর্মপন্হার কথা ভাবতে হবে। মধ্যদিনের আলোকিত সূর্যের মতোই এটা এখন পরিস্কর হয়ে গেছে যে, মুসলমানদেরকে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকার পরামর্শ দেওয়া অর্থহীন। কারোর ওপর ভরসা করার সময় এখন উত্তীর্ণ। নিজেদের শক্তির ওপরই আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে। আমাদের গৌরবান্বিত পূর্ব-পুরুষগণ আমাদের জাতির জন্য সে নজির রেখে গেছেন”। দিল্লীর দরবারে উপস্থিত উপমহাদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে নবাব সলীমুল্লাহ ওয়াকার উল মূলক-এর প্রবন্ধ প্রকাশের একই তারিখে অর্থাৎ ১৯১১ সালের ২০ ডিসেম্বর লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে বাংলার মুসলমানদের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি সম্বলিত একটি পত্র পেশ করেন। সেই আট দফা দাবি হলো,

১. বঙ্গ প্রেসিডেন্সির গভর্নর কলকাতা ও ঢাকা এই উভয় রাজধানীতে সমভাবে অবস্থান করবেন;
২. বঙ্গ প্রেসিডেন্সির মুসলমানদেরকে স্বতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যানুপাতিক হারে ব্যবস্থাপক পরিষদ ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহে সুযোগ দিতে হবে;
৩. পূর্ববঙ্গের জন্য স্বতন্ত্রভাবে বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে অথবা পূর্ববঙ্গের রাজম্ব এখানকার জেলাসমূহের শাসন-ব্যবস্থা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করতে হবে;
৪. সরকারি চাকরিতে আরো অধিকহারে মুসলমানদের নিয়োগ করতে হবে। এবং পালাক্রমে একজন হিন্দুর পর একজন মুসলমান সদস্য বঙ্গ প্রেসিডেন্সির এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে নিয়োগ করতে হবে;
৫. এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে এমন একজন অফিসার থাকতে হবে, যিনি পূর্ববাংলার প্রশাসনিক কার্যাবলী পরিচালনার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন;
৬. ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে এমন দু’জন কমিশনার নিয়োগ করতে হবে, যাদের অনুরূপ অভিজ্ঞতা রয়েছে। পূর্ববাংলা ও আসামের মুলমানদের শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় তত্ত্বাবধানের জন্য একজন যুগ্ম পরিচালক বা সহ-পরিচালক নিয়োগ করতে হবে;
৭. মুসলমানদের উচ্চশিক্ষা খাতে বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে;
৮. মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটির সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৯১২ সালে মার্চ মাসে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে নবাব খাজা সলিমুল্লাহ বলেন, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর প্রসঙ্গটি পুনরায় উত্থাপনের কোন ন্যায়সংগত কারণ কোন দায়িত্বশীল বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। এ বিভাগ ১৯০৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়ে ১৯১১ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। মুসলমানদের আশা আকাঙ্ক্ষার সম্ভাবনা দেখে আমাদের শত্রুগণ ব্যথিত হয়ে পড়লেন। প্রকৃতপক্ষে বিভাগের ফলে আমরা তেমন বিশেষ কিছুই লাভ করিনি। যতটুকুই লাভ করেছিলাম আমাদের প্রতিবেশী অন্যসম্প্রদায় স্বর্গমর্ত্য আলোড়ন সৃষ্টি করে তাও আমাদের নিকট থেকে কেড়ে নিল। হত্যা ও দস্যুবৃত্তি করে তারা প্রতিশোধ গ্রহণ করলো, তারা বিলাতী দ্রব্যাদি বর্জন করলো। সরকার এতে কিছুই মনে করলেন না। এসব হত্যাকান্ডে মুসলমানগণ অংশগ্রহণ না করে সরকারের প্রতি অনুগতই রইলো। বিভাগের ফলে মুসলমান কৃষককুল লাভবান হলো। হ্নিদু জমিদারগণ তাদেরকে আন্দোলনে টেনে নামাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু তারা কর্ণপাত করলো না। এত করে হিন্দু মুসলিম সংঘর্ষ শুরু হলো। সরকার দমননীতি অবলম্বন করলেন। তাতে ফল হলো না। একদিকে ছিল সম্পদশালী বিক্ষুব্ধ সম্প্রদায় এবং অপরদিকে দরিদ্র মুসলমান এবং এরা ছিল সরকারের সাথে। এভাবে কয়েক বৎসর অতিবাহিত হলো। আকস্মিকভাবে সরকার বিভাগ রদ করে দিলেন। এ বিষয়ে আমাদের সাথে কোন আলাপ আলোচনাও করা হলো না। (Ahmed, Ruh-i-Raushan Mustaqbil, pp 58-59; A. Hamid:Muslim Separatism in India, p.92)

এ সম্পর্কে বাংলার মুসলিম নেতা এ কে ফজলুল হক বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় ১৯১৩-১৪ সালের বাজেট অধিবেশনে যে বক্তৃতা করেন তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, //ভারত সরকারের ২৫শে আগষ্টের প্রতিবেদনে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় যে, বঙ্গভঙ্গ রদের দরুন যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তার দ্বারা মুসলিম স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না, তারপর আঠার মাস অতিবাহিত হয়ে গেল এবং এখন দেখার সময় এসেছে তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি কতখানি পালন করেন। দিল্লী দরবারের ঘোষণার অল্পদিন পর বড়লাট যখন ঢাকায় পদার্পন করেন, তখন প্রত্যেকেই আশা করেছিল যে, মুসলমানদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তিনি কোন একটা ঘোষনা করবেন। অবশ্য আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শুনতে পেয়েছি। কিন্তু আমি অবশ্যই বলব যে আমরা যা আশা করেছিলাম, সেদিক দিয়ে এ অতি তুচ্ছ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বকে ছোট করতে চাই না। কারণ, পূর্ব বাংলার শিক্ষার উন্নয়নে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছিল, তা এর দ্বারা বিদূরিত হবে। একটি মুসলিম কেন্দ্রে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অশেষ সুযোগ সুবিধার কথাও অস্বীকার করিনা। 

কিন্তু এই যে বলা হচ্ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু মুসলমানদের উপকারার্থে করা হচ্ছে অথবা এটা হচ্ছে মুসলমানদের খুশী করার একটা বিশিষ্ট পদক্ষেপ, আমি এসবের প্রতিবাদ করছি। বড়লাট সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দু মুসলমান উভয়েরই জন্যে এবং তাই হওয়া উচিত’। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পরিকল্পিত একটি মুসলিম কলেজ এবং ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক স্টাডিজ – এটাকে মুসলমানদের প্রতি অনুগ্রহ করার অভিপ্রায় বলেও ধরা যেতে পারে না। কারণ অর্ধশতাব্দীর অধিককাল ধরে ষোল আনা শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জামাদিসহ সরকার কোলকাতায় একটি একচেটিয়া হিন্দু-কলেজ চালিয়ে আসছেন এবং ঢাকায় একটি মুসলিম কলেজ হলে তা হবে মুসলমানদের দীর্ঘদিনের অবহেলিত দাবীর দীর্ঘসূত্রী স্বীকৃতি। 

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ সম্পর্কে কথা এই যে, যে অঞ্চলে মুসলমানগণ দীর্ঘকাল যাবত আরবী ও ফার্সী শিক্ষার বাসনা পোষণ করে আসছে, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের শুধু স্বাভাবিক ফলমাত্র এই ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ। এটা সকলের জানান না থাকতে পারে যে, পূর্ব বাংলার জেলাগুলি থেকে অধিক সংখ্যক ছাত্র বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলিতে পড়াশুনা করে এবং এই শ্রেণীর অধিবাসীদের প্রয়োজন পূরণ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের কোন ব্যবস্থা ব্যতীত একটি বিশ্ববিদ্যালয় কিছুতেই ন্যায়সংগত হতোনা। আমি আশা করি সরকারি কর্মকর্থাগণ এ কথা উপলব্ধি করবেন যে, যদিও মুসলমানগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই রায় দিয়েছে, কিন্তু এটাকে এমনকি একটি মুসলিম কলেজ এবং ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক স্টাডিজকেও তাদের প্রতি কোন অনুগ্রহ বলে তারা মনে করে না।// 

ফজলুল হকের উপরের বক্তব্যে এ কথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বঙ্গভঙ্গ, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তথা মুসলমানদের কোন সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে হিন্দু ভারত ও ইংরেজদের মানসিকতা ও আচরণ কী ছিল। শুধু তাই নয় অসন্তুষ্ট মুসলিমদের শান্ত করার জন্য ইংরেজরা যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে তা ঘোষণার সাথে সাথেই শুরু হয় এর বিরুদ্ধে আন্দোলন। যদিও এই আন্দোলন ধোপে টিকে নাই তবুও মুশরিকদের নীচু মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানেও ইংরেজরা তাদের আজ্ঞাবহ হিন্দুদের খুশি করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এই যেহেতু শিক্ষা রিলেটেড বিষয় তাই এর জন্য সবচেয়ে বেশি লড়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো চারটি নতুন সাবজেক্ট যোগ করা,  কলকাতা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পাঠানো হবে, সিন্ডিকেটে আশুতোশ থাকবে এমন কিছু শর্তে তারা আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে আনে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন