২৯ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৮ - বনু কাইনুকার বহিষ্কার ও কাব বিন আশ্রাফের মৃত্যদণ্ড


আল্লাহর রাসূল সা. ছিলেন বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক। বদর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর পরই তিনি গোয়েন্দা তথ্য পান যে, গাতফান গোত্রের শাখা বনু সুলাইম মদিনার বিরুদ্ধে সোইন্য সংগ্রহ করছে। এই খবর পাওয়ার পর মুহাম্মদ সা. দুইশত সৈন্য নিয়ে আকস্মিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। বনু সুলাইম গোত্র এ ধরনের আকস্মিক হামলার জন্যে প্রস্তুত ছিলো না। তারা হতবুদ্ধি হয়ে পলায়ন করলো। যাওয়ার সময় পাঁচশত উট রেখে গেলো। মুসলমানরা সেইসব উট অধিকার করে নিলো। মুহাম্মদ সা. সেই উটের চার পঞ্চমাংশ ভাগ করে দিলেন। প্রত্যেকে দু’টি করে উট পেলেন।

মক্কার এক যুবক ওয়াহেব ইবনে উমায়ের বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে বন্দি ছিল। তার পিতা উমায়ের বদরের প্রতিশোধ হিসেবে আল্লাহর রাসূল সা.-কে হত্যা করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। এই ব্যাপারে তাকে সহায়তা করলো মুশরিক নেতা সাফওয়ান। সাফওয়ান উমায়েরের যাবতীয় ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিল। এরপর উমায়ের তার তরবারি ধারালো করে তাতে বিশ মেশালো। মদীনার দিকে রওয়ানা হয়ে এক সময় সে মদীনায় পৌঁছালো।

তাকে দেখে উমার রা. সতর্ক দৃষ্টিতে রাখলেন। সে মুহাম্মদ সা.-এর সামনে উপস্থিত হয়ে তার ছেলের মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা করতে চাইলো। কিন্তু মুহাম্মদ সা. বললেন, হে উমায়ের তুমি কেন এসেছ তা আমি জানি। তোমার ও সাফওয়ানের পরিকল্পনা আমি জানি। এরপর তাদের পরিকল্পনা নবী সা. তার সামনে উপস্থাপন করলেন। এতে সে আশ্চর্য হয়ে পড়ে।

এরপর উমায়ের বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রসূল। হে আল্লাহর রসূল, আপনি আমাদের কাছে আকাশের যে খবর নিয়ে আসতেন এবং আপনার ওপর যে ওহী নাযির হতো, সেসব আমরা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু এটাতো এমন ব্যাপার যে, আমি এবং সাফওয়ান ছাড়া সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলো না। কাজেই আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি যে, এই খবর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ আপনাকে জানাননি। সেই আল্লাহর জন্যে যিনি আমাকে ইসলামের হেদায়েত দিয়েছেন এবং এই জায়গা পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। একথা বলে উমায়ের কালেমা তাইয়েবার সাক্ষ্য দিলেন। নবী সা. সাহাবাদের বললেন, তোমাদের ভাইকে দ্বীন শেখাও, কোরআন পড়াও এবং তার বন্দীকে মুক্ত করে দাও। ইসলাম গ্রহণের উমায়ের মক্কায় এসে পৌঁছুলো এবং ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলো। তার আহ্বানে বহু লোক ইসলাম কবুল করলো।

ইহুদীরা যখন লক্ষ্য করলো যে, বদরের প্রান্তরে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বিরাট সাহায্যে করেছেন এবং তাদের মর্যাদা ও প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তখন তারা ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতা শুরু করলো। প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করলো এবং মুসলমানদের কষ্ট দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লাগলো। তারা প্রায়ই আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকদেরকে পরষ্পরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতো।

তিনটি ইহুদী গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল বনু কাইনুকা। বাকী দুই গোত্র শহরের বাইরে থাকলেও এরা মদীনার ভেতরে থাকতো। মদিনায় তাদের বাজারই সর্বাপেক্ষা বড় বাজার। এরা পেশায় ছিলো কর্মকার, স্বর্ণকার এবং থালাবাটি নির্মাতা। এ কারণে এদের কাছে সবসময় প্রচুর সমর সরঞ্জাম বিদ্যমান থাকতো। যুদ্ধ করার মতো বলদর্পী লোকের সংখ্যা তাদের মধ্যে ছিলো সাতশত। তারাই প্রথম মদিনাতে বিদ্রোহ করে ও মদিনা সনদের চুক্তি ভঙ্গ করে।

তারা তাদের দুর্বৃত্তপনা, ঘৃণ্য কার্যকালাপ এবং উস্কানিমূলক কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুসলমানরা বাজারে গেলে তারা তাদের প্রতি উপহাসমূলক মন্তব্য করতো এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ চালাতো সবসময়। এমনি করে মুসলমানদের মানসিকভাবে কষ্ট দিতো। তাদের ঔদ্ধত্য এমন সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো যে, তারা মুসলিম মহিলাদেরও উত্যক্ত করতো।

ক্রমে অবস্থা নাজুক হয়ে উঠলো। ইহুদীদের ঔদ্ধত্য ও হঠকারীতা সীমা ছাড়িয়ে গেলো। এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের সমবেত করে একদিন ওয়ায নসিহত করে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। এছাড়া তাদের নিপীড়নমূলক কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কেও সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু এতে তাদের হীন ও ঘৃণ্য কার্যকলাপ বেড়ে গেলো।

এই প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মুহাম্মদ সা. বদর যুদ্ধের পর একদিন বনু কাইনুকার বাজারে ইহুদীদের এক সমাবেশ আহব্বান করেন। সেই সমাবেশে তিনি বলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়! কুরাইশদের ওপর যেরকম আঘাত পড়েছে, সে রকম আঘাত তোমাদের ওপর আসার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহন করো। তারা বললো, হে মুহাম্মদ! তুমি আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করছো। কুরাইশ গোত্রের আনাড়ি ও অনভিজ্ঞ লোকদের সাথে তোমাদের মোকাবেলা হয়েছে। এতেই তোমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করেছো। তোমরা ওদের মেরেছো, সেটা পেরেছো ওরা আনাড়ি বলেই। আমাদের সাথে যদি তোমাদের যুদ্ধ হয়, তবে তোমরা বুঝতে পারবে যে, পুরুষ কাকে বলে! আমরা হচ্ছি বীর। তোমরা তো আমাদের কবলে পড়োনি। তাই আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করে বসে আছ।

তাদের এ উক্তির জবাবে আল্লাহ তায়ালা সূরা ইমরানের ১২ ও ১৩ আয়াতে বলেন, //যারা কুফুরী করে, তাদের বলো তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হবে। আর সেটা কতোই না নিকৃষ্ট আবাস্থল। দু’টি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। একদল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছিলো অন্য দল ছিলো কাফের। ওরা তাদেরকে চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখছিলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয়ই এতে অর্ন্তদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্যে শিক্ষা রয়েছে।//

মোটকথা, বনু কাইনুকা যে জবাব দিয়েছিলো তার অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা। কিন্তু মুহাম্মদ সা. ক্রোধ সংবরণ করলেন এবং ধৈর্য ধারণ করেন। মুসলমানরাও ধৈর্য ধারণ করে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকেন।

এরপর একজন আবর মুসলিম মহিলা কাইনুকার বাজারে দুধ বিক্রি করতে আসে। দুধ বিক্রির পর সেই মহিলা কি এক প্রয়োজনে এক ইহুদী স্বর্ণকারের দোকানে বসে। ইহুদী তাঁর চেহারা অনাবৃত করতে বলে কিন্তু মহিলা রাজি হননি। এতে স্বর্ণকার সেই মহিলার কাপড়ের একাংশ গোপনে দরজার সাথে বেঁধে দেয়। মহিলা কিছুই বুঝতে পারেননি। মহিলা উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কাপড় খুলে গেলো ও তিনি অনাবৃত হয়ে গেলো। এত ইহুদীরা খিল খিল করে হেসে উঠলো। মুসলিম মহিলাকে তারা অপমান ও অপদস্ত করতে থাকলো।

এভাবে অপমানিত হয়ে তিনি কান্না শুরু করলেন। তার কান্না শুনে একজন মুসলমান কারণ জানতে চাইলেন। সব শুনে ক্রোধে অস্থির হয়ে তিনি সেই ইহুদির ওপর হামলা করে তাকে মেরে ফেললেন। ইহুদীরা যখন দেখলো যে, তাদের একজন লোককে মেরে ফেলা হয়েছে এবং মেরেছে তাদের শত্রু মুসলমান। তখন তারা সম্মিলিত হামলা করে সেই মুসলমানকেও মেরে ফেললো। মেরে ফেলেই তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে নিল।

এই ঘটনার সমাধান করার জন্য আল্লাহর রাসূল সা. হামজা রা.-কে সাথে নিয়ে বনু কাইনুকা পোত্রে এলেন। ইহুদিরা রাসূল সা.-কে দেখে দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলো। রাসূল সা. সাহাবাদের ডেকে তাদের দুর্গ অবরোধ করলেন। একটানা ১৫ দিন অবরুদ্ধ থেকে তার ভীত হয়ে পড়লো। তারা ভেবেছিল অন্য ইহুদি গোত্রদ্বয় এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদের সাথে মিলে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তাদের সাহায্যে কে এগিয়ে আসে নাই দেখে তারা আত্মসমর্পন করলো।

এসময় আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মুহাম্মদ সা.-এর কাছে তাদের শাস্তি মওকুফের আবেদন জানালো। উল্লেখ্য যে, এই ঘটনার মাসখানেক আগে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সে বললো, হে মুহাম্মদ সা.! আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। উল্লেখ্য, বনু কাইনুকা ছিলো খাযরাজ গোত্রের মিত্র। আল্লাহর রাসূল সা. তখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। মুনাফেক নেতা বার বার তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো।

অবশেষে রাসূল সা. সিদ্ধান্ত দিলেন বনু কাইনুকার লোকেরা আরবে থাকতে পারবে না। সাথে করে যা নেওয়া যায় এমন সম্পদ নিয়ে বনু কাইনুকা সিরিয়ার চলে গেল। মুহাম্মদ সা. ইহুদিদের পরিত্যাক্ত ধন-সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র বাজেয়াপ্ত করলেন।

মদিনার আরেক ইহুদি গোত্র বনু নাজিরের সাথে মক্কার মুশরিক নেতা আবু সুফিয়ানের সম্পর্ক ভালো ছিল। আবু সুফিয়ান তাদের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ করেছে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে মক্কার মুশরিক নেতা আবু সুফিয়ান গোপনে ২০০ সৈন্য নিয়ে মদিনায় ঝটিকা আক্রমণ করে। তাদের টার্গেট ছিল মুহাম্মদ সা.-কে হত্যা। তবে খবর পেয়েই মুহাম্মদ সা. তড়িৎ পাল্টা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসেন। তারা শহরে ঢুকতে পারেনি। মদিনার উপকণ্ঠে আরজ নামক স্থানে কয়েকটি গাছ কাটে ও আগুন লাগিয়ে দেয়। দুইজন আনসারকে হত্যা করে। মহানবী সা.-কে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে আসতে দেখে আবু সুফিয়ান ও তার দলবল পালিয়ে যায়। এটা সাভিকের যুদ্ধ নামে পরিচিত।

এই ঘটনা মুহাম্মদ সা.-কে বিচলিত করে। মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি এর তদন্ত করেন। তদন্তে কা'ব বিন আশরাফের নাম আসে। সে আবু সুফিয়ানকে চিঠি লেখে ও মদিনায় আক্রমণ চালাতে উদ্বুদ্ধ করে। সে মক্কার লোকদের জন্য কবিতা লেখে যাতে তারা মুহাম্মদ সা. বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ও বদর যুদ্ধে নিহতদের প্রতিশোধ গ্রহণ করে।

কাব বিন আশরাফ ছিল মদিনার একজন ইহুদি নেতা ও কবি। কাবের পিতা আরবের বনু তায়ি গোত্র এবং মাতা বনু নাজির গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তাকে তার মায়ের গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হতো, যেখানে সে একজন অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিল। আল্লাহর রাসূল সা. মদিনা সনদের চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।

ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ সা. কাবকে হত্যা করার জন্য তার অনুসারীদেরকে নির্দেশনা দেন, এর কারণ; কাবের প্রেরিত একটি চিঠি বদর যুদ্ধের পর মক্কায় পৌঁছেছিলো এবং তা মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে কুয়াইশদেরকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল। সে এমন কবিতাও লিখত যেগুলোতে সে বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতো। মদিনা থেকে ফেরার অল্পদিন পরেই সে মুসলিম মহিলাদের প্রকৃতি সম্পর্কে কটাক্ষ করে কবিতা রচনা করে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র দাবি করে যে, কাবকে হত্যা করা হয়েছিল কারণ ফেরেশতা জিবরাইল আ. মুহাম্মাদ সা.-কে কাবের চুক্তি সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে কাব তার মক্কা সফরের সময় কুরাইশ এবং চল্লিশজন ইহুদির মধ্যে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সন্ধিচুক্তিতে আবু সুফিয়ানের সাথে সাক্ষর করেন।

আল্লাহর রাসূল সা. কাব বিন আশরাফকে হত্যা করার ব্যাপারে কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি তার দুধভাই আবু নায়েলাকে দিয়ে তাকে হত্যা করান। ফলে বিষয়টা তাদের নিজস্ব বিষয়ে পরিণত হলো। মুহাম্মদ সা.-এর ওপর রাজনৈতিক চাপ আসে নি। এই ঘটনায় তিনি বনু নাজিরদের সবাইকে দোষী না করে শুধু মূল দোষী কাবকে শাস্তির আওতায় এনেছেন। বনু নাজিরকে তিনি আরো সুযোগ দিতে চেয়েছেন। বনু কাইনুকার পরপরই আরেকটি ইহুদি গোত্রের সাথে সরাসরি বিরোধে জড়াতে চাননি মুহাম্মদ সা.।

২৭ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৭ - দ্বীন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে মুহাম্মদ সা.-এর প্রথম যুদ্ধ



মুহাম্মদ সা. ছিলেন অনন্য রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই হুমকির মুখে পড়েছে। নানানভাবে মক্কার মুশরিকরা এই রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য রাষ্ট্রের ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। এক পর্যায়ে মুসলিমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা এই সময় মুসলিমদের সশস্ত্র প্রতিরোধের অনুমতি দেন। এর প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সা. অফেনসিভ ভূমিকা গ্রহণ করেন।

তিনি মক্কার মুশরিকদের থেকে মদিনাকে হিফাজত করার জন্য মক্কাকে সমস্যার মধ্যে ফেলে দেন। তিনি তাদের ব্যবসায়িক পথ অবরুদ্ধ করেন। সারা আরবে গোয়েন্দা জাল বিস্তার করেন। এমন সময়ে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ার উদ্দেশ্যে গোপনে রওয়ানা হলে তিনি প্রায় দেড় শতাধিক সৈন্য নিয়ে ধাওয়া দেন। তবে কৌশলী আবু সুফিয়ান ও তার কাফেলা সে যাত্রা বেঁচে যায়। সে রাস্তা পরিবর্তন করে মদিনার আশ পাশের এলাকা দ্রুত পাড়ি দেয়। মুহাম্মদ সা. সে কাফেলার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।

এরপর মুহাম্মদ সা. খবর পেলেন তারা সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে রওনা হচ্ছে। তাদের আটকানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মুহাম্মদ সা.। এরকম একটি বড় কাফেলা আটকাতে পারলে মক্কার মুশরিকরা নমনীয় হবে এবং তাদের ব্যবসায়ের পথ বিপদমুক্ত রাখতে তারা সচেষ্ট হবে। মুহাম্মদ সা. ভেবেছিলেন এর ফলে তারা মদিনা রাষ্ট্রের সাথে সহবস্থানে বিশ্বাসী হবে।

মহাম্মদ সা. তাঁর সাহাবীদেরকে এই কাফেলায় আক্রমণের জন্য আহ্বান জানান। তবে তিনি ভাবেননি তিনি একটি বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। তাই তিনি কাউকে নির্দিষ্ট করে দেননি। যার যার ইচ্ছেনুযায়ী মুহাম্মদ সা.-এর সাথে অভিযানে শরিক হয়েছিল। মুহাম্মদ সা. এতে সকলের অংশগ্রহণ জরুরি বলে উল্লেখ করেননি। ফলে অনেক মুসলিম মদিনায় থেকে যায়। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী ধারণা করা হয় আবু সুফিয়ান বদর প্রান্তর দিয়ে যাবে। তাই মুহাম্মদ সা. বদরের দিকে অগ্রসর হন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে এই সময় মদিনার অস্থায়ী আমীর নিযুক্ত করা হয়।

মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে মুসলিম বাহিনীতে ছিলেন আবু বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনে আবি তালিব, হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আম্মার ইবনে ইয়াসির ও আবু যার আল-গিফারী। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে উসমান ইবনে আফফান যুদ্ধে যেতে পারেননি। বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। এর মধ্যে মুহাজির ছিলেন ৮২ জন এবং আনসারদের মধ্যে আওস গোত্রের ছিলেন ৬১জন ও খাজরাজ গোত্রের ছিলেন ১৭০ জন। মুসলিমদের সাথে ৭০টি উট ও দুইটি ঘোড়া ছিল। ফলে তাদের সামনে পায়ে হেঁটে যাওয়া বা প্রতি দুই বা তিনজনের জন্য একটি উট ব্যবহার ছাড়া উপায় ছিল না। একটি উটে পালাক্রমে দুই বা তিনজন আরোহণ করতেন। এই ব্যবস্থায় মুহাম্মাদ সা., আলী রা. ও মারসাদ রা. এই তিনজনের জন্য একটি উট বরাদ্দ হয়েছিল।

মুহাম্মাদ সা. সার্বিক নেতৃত্বের জন্য মুসআব ইবনে উমাইরকে একটি সাদা পতাকা প্রদান করেন। মুহাজিরদের ও আনসারদের জন্য একটি করে কালো পতাকা যথাক্রমে আলি ইবনে আবি তালিব এবং সাদ ইবনে মুয়াজকে প্রদান করা হয়। বাহিনীর ডান ও বাম অংশের প্রধান হিসেবে যথাক্রমে যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. ও মিকদাদ ইবনে আমর রা.-কে নিযুক্ত করা হয়। মুসলিম বাহিনীতে থাকা দুইটি ঘোড়ায় তারা আরোহণ করেছিলেন। পেছনের অংশের প্রধান হিসেবে কাইস ইবনে আবিকে নিয়োগ দেয়া হয়। মুহাম্মাদ সা. সমগ্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

এদিকে আবু সুফিয়ানও বেশ সতর্কতার সাথে পথ অতিক্রম করছিল। সেও তার পদ্ধতিতে মুসলিমদের ব্যাপারে খবর নিচ্ছিলো। ফলে সে মুসলিমদের আক্রমণের খবর পায়। তাই সাহায্য চেয়ে জমজম ইবনে আমর গিফারিকে বার্তা বাহক হিসেবে মক্কা পাঠায়। সে দ্রুত মক্কা পৌঁছায় এবং তৎকালীন আরব রীতি অনুযায়ী উটের নাক চাপড়ায়, আসন উল্টিয়ে দেয়, নিজের জামা ছিড়ে ফেলে এবং উটে বসে ঘোষণা করে যে মক্কার কাফেলা মুসলিমদের হাতে পড়তে যাচ্ছে।

এই খবর শোনার পর মক্কায় আলোড়ন শুরু হয়। দ্রুত ১,৩০০ সৈনিকের এক বাহিনী গড়ে তোলা হয় এবং আবু জাহল বাহিনীর প্রধান হন। এই বাহিনীতে অসংখ্য উট, ১০০ ঘোড়া ও ৬০০ লৌহবর্ম‌ ছিল। নয়জন সম্ভ্রান্ত কুরাইশ রসদ সরবরাহের দায়িত্ব নেন। বাহিনীর জন্য দৈনিক কখনো ৯টি এবং কখনো ১০টি উট জবাই করা হত।

আবু জাহল, উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম, হাকিম ইবনে হিজাম, নওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির, তুয়াইমা ইবনে আদি, নাদার ইবনে হারিস, জামআ ইবনে আসওয়াদ ও উমাইয়া ইবনে খালাফসহ মক্কার অনেক অভিজাত ব্যক্তি মক্কার বাহিনীতে যোগ দেন। এর কয়েকটি কারণ ছিল। কেউ কাফেলায় নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অন্যরা ইবনে আল-হাদরামির মৃত্যুর বদলা নিতে চেয়েছিলেন। এছাড়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহজে জয়ী হওয়া যাবে এই বিশ্বাসেও কেউ কেউ যোগ দেয়। আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে তার কাছে ৪,০০০ দিরহাম ঋণগ্রস্থ আসি ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে ঋণের বিনিময়ে পাঠায়। উমাইয়া ইবনে খালাফ প্রথমে যুদ্ধে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এসময় উকবা ইবনে আবু মুয়াইত তাকে নারী হিসেবে সম্বোধন করে। এর ফলে উমাইয়া ইবনে খালাফ লজ্জিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। তবে কুরাইশদের মধ্যে বনু আদি গোত্রের (উমার রা.-এর গোত্র) কেউ এই যুদ্ধে অংশ নেয় নি।

অন্যদিকে আবু সুফিয়ান ক্রমাগত খবরাখবর সংগ্রহ করছিলো। বদরের নিকটে পৌঁছার পর মাজদি ইবনে আমর নামক এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হয়। তাকে তিনি মদিনার বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে মাজদি স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি। তবে জানান যে দুইজন উষ্ট্রারোহীকে তিনি টিলার পাশে উট বসিয়ে মশকে পানি পূর্ণ করতে দেখেছেন। তাই আবু সুফিয়ান সতর্কতা হিসেবে সেখানে যান এবং উটের গোবর ভেঙে দেখেন। বিচক্ষণ আবু সুফিয়ান গোবর থেকে প্রাপ্ত খেজুরের বিচি দেখে বুঝতে পারেন এগুলি মদিনার খেজুর। ফলে মুসলিমদের আগমনের ব্যাপারে তিনি সন্দেহমুক্ত হন। এরপর তিনি কাফেলাকে নিয়ে সমুদ্র উপকূলের দিকে ইয়ানবুতে চলে যান। মক্কার বাহিনী জুহফা নামক স্থানে পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের প্রেরিত বার্তাবাহক এসে জানায় যে কাফেলা নিরাপদ আছে তাই আর অগ্রসর না হয়ে ফিরে যাওয়া উচিত।

এই খবর পাওয়ার পর মক্কার বাহিনীর অধিকাংশ ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়। কিন্তু বাহিনীর প্রধান আবু জাহল যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে অসম্মতি দেখান। এরপর বনু জুহরা গোত্রের মিত্র ও গোত্রটির সেনাপ্রধান আখনাস ইবনে শারিক ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অধিকাংশ তার পক্ষে সায় না দেয়ায় তিনি বনু জুহরা গোত্রের ৩০০ সদস্য নিয়ে মক্কা ফিরে আসেন। এর ফলে মক্কার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১,০০০। পরবর্তীতে বনু জুহরা গোত্রের সদস্যরা আখনাসের এই সিদ্ধান্তের কারণে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। একইভাবে বনু হাশিমও মক্কায় ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আবু জাহলের জেদের কারণে তারা যুদ্ধে অংশ নেয়। মক্কার বাহিনী অগ্রসর হয়ে বদর উপত্যকার একটি টিলার পেছনে আশ্রয় নেয়।

যুদ্ধের ময়দানে এখন আছে মুহাম্মদ সা. নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ও আবু জাহলের নেতৃত্বে মুশরিক বাহিনী। যে আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা এতো কাণ্ড সেই বাণিজ্যিক কাফেলা যুদ্ধ থেকে ফসকে গিয়েছে। তারা নিরাপদে মক্কার কাছাকাছি পোঁছে গেছে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, //আর স্মরণ করো, আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে দুই দলের এক দল তোমাদের আয়ত্তে আসবে। অথচ তোমরা চাইছিলে যে, নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তে আসুক। আর আল্লাহ চাইছিলেন সত্যকে তার বাণী দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং অবিশ্বাসীদেরকে নির্মূল করতে। ” -সূরা আল-আনফাল, আয়াত : ৭

মুসলিমরা মক্কার বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবর পায়। মুসলিম বাহিনীটি মূলত কাফেলা আক্রমণের জন্য গঠিত হয়েছিল, ব্যাপক যুদ্ধের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। মুসলিমরা এসময় কুরাইশদের মুখোমুখি না হয়ে ফিরে যেতে পারত কিন্তু এর ফলে কুরাইশদের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেত এবং তারা অগ্রসর হয়ে মদিনা আক্রমণ করারও সম্ভাবনা ছিল। অন্যদিকে বাহিনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মদিনার আনসাররা আকাবার বাইয়াত অনুযায়ী মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য ছিল না এবং অভিযানের ব্যয়ভার তাদের উপর বেশি ছিল। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য মুহাম্মাদ সা. জরুরি শুরার বৈঠকে বসলেন। সভায় মুহাজির, আনসার সকলেই কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে মত দেয়। তারা বহুদিনের নির্যাতনের প্রতিবিধানের জন্য উন্মুখ হয়েছিলেন। এরপর মুসলিমরা অগ্রসর হয়ে বদরের নিকটে পৌঁছায়।

মুহাম্মদ সা. মুশরিকদের ব্যাপারে খোঁজ নেন। জানতে পারেন তারা উপত্যকার শেষ প্রান্তের টিলার অবস্থান করছে এবং প্রতিদিন নয় বা দশটি উট তাদের জন্য জবাই করা হয়। একথা শোনার পর মুহাম্মাদ সা. অনুমান করেন তাদের সংখ্যা ৯০০ থেকে ১০০০ এর মতো হতে পারে। প্রতিপক্ষের আগেই বদর প্রান্তরে পৌঁছানোর জন্য মুহাম্মাদ সা. দ্রুত বদরের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল যাতে কুরাইশরা সেখানের একমাত্র কুয়ার দখল নিতে না পারে। রাতে মুসলিমরা বদরের নিকট থামে।

এসময় হুবাব ইবনে মুনজির রা. বলেন, এটি যদি আল্লাহর নির্দেশ হয় তবে তা যেন বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু যদি মুহাম্মাদ সা. কৌশল হিসেবে এখানে থেমে থাকেন তবে তার মত হলো যাতে এখানে অবস্থান না করে মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটের কূয়ার কাছে অবস্থান নিয়ে বাকি সব কূপ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং নিজেদের কূয়ার উপর চৌবাচ্চা তৈরী করে তাতে পানি জমা করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা পানি পেলেও কুরাইশরা পানি থেকে বঞ্চিত হবে। একথা শোনার পর মুহাম্মাদ সা. পরামর্শ মেনে নিয়ে নির্দেশ দেন যাতে রাত অর্ধেক পার হওয়ার পূর্বেই কুরাইশদের সবচেয়ে নিকটের কূয়ার কাছে গিয়ে শিবির স্থাপন করা হয়। এরপর সেখানে পৌছে চৌবাচ্চা তৈরী করে অবশিষ্ট সব কূপ বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুসলিমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কূয়া দখল করার পর সাদ ইবনে মুয়াজের পরামর্শক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তরপূর্বের টিলার উপর মুহাম্মাদ সা. এর জন্য একটি তাবু নির্মিত হয়। এখান থেকে যুদ্ধের পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেত।

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কুরাইশদের আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখজুমি এগিয়ে এসে মুসলিমদের পানির জলাধার দখল করে নেবে না হয় এজন্য জীবন দেবে বলে ঘোষণা দেয়। এরপর হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব অগ্রসর হয়ে তার সাথে লড়াই করেন। লড়াইয়ে আসওয়াদের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থা আসওয়াদ চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে যায় এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য চৌবাচ্চার সীমানার ভেতর ঢুকে পড়ে। এরপর হামজা তাকে হত্যা করেন। এটি ছিল বদরের প্রথম মৃত্যু।

এই সময় মুহাম্মদ সা. আল্লাহর দরবারে বার বার দোয়া করছিলেন : হে আল্লাহ্ ! তুমি আমার সঙ্গে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো, হে রাব্বুল আলামিন আজ যদি এই মুষ্টিমেয় লোকের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত তোমার ইবাদত করবার কেউ থাকবে না।

এরপর তৎকালীন রীতি অনুযায়ী দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই শুরু হয়। কুরাইশদের মধ্য থেকে উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হন। তাদের লড়াইয়ের আহ্বান শুনে আনসারদের মধ্য থেকে আওফ ইবনে হারিস, মুয়াব্বিজ ইবনে হারিস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে আসেন। কিন্তু কুরাইশ যোদ্ধারা তাদেরকে কটাক্ষ করে বলেন যে তারা তাদের যোগ্য না এবং যেন কুরাইশদের সমশ্রেণীর কাউকে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এরপর তাদের বদলে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, উবাইদা ইবনে হারিস ও আলি ইবনে আবি তালিবকে পাঠানো হয়। হামজার সাথে শাইবা, আলির সাথে ওয়ালিদ ও উবাইদার সাথে উতবা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কুরাইশ পক্ষের তিনজনই লড়াইয়ে নিহত হয়। লড়াইয়ে উবাইদা আহত হন তাই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। যুদ্ধের কয়েকদিন পর তার মৃত্যু হয়। তিনজন নেতৃস্থানীয় যোদ্ধার মৃত্যুর ফলে কুরাইশদের মনোবলে ফাটল ধরে।

দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর কুরাইশরা মুসলিমদের উপর আক্রমণ শুরু করে। যুদ্ধের পূর্বে মুহাম্মাদ সা. নির্দেশ দেন শত্রুরা বেশি সংখ্যায় কাছে এলেই যাতে তীর চালানো হয়। মুসলিমরা তাকবির স্লোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধে মক্কার কুরাইশরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুয়াজ ইবনে আমর ও মুয়াজ ইবনে আফরা কুরাইশ পক্ষের সর্বাধিনায়ক আবু জাহলকে হত্যা করেন। বিলালের হাতে তার সাবেক মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ নিহত হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব তার মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগিরাকে হত্যা করেন। বিকেলের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে এই যুদ্ধে হাজারো ফেরেশতা মুসলিমদের সহায়তার জন্য এসেছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, স্মরণ করো, তোমরা তোমাদের রবের নিকট সাহায্যের জন্য দোয়া করেছিলে। তিনি তা কবুল করেন এবং বলেন : আমি তোমাদের সাহায্য করবো সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যারা একের পর এক আসবে। (সূরা আনফাল : আয়াত ৯)।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নিহত মুসলিমদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে দাফন করা হয়। নিহত কুরাইশদের লাশ ময়দানের একটি কূয়ায় নিক্ষেপ করা হয়। এসময় চব্বিশজন প্রধান কুরাইশ নেতার লাশ কূয়ায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আরবের রীতি অনুযায়ী মুসলিমরা তিনদিন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করার পর মদিনায় ফিরে আসে।

বদর যুদ্ধে শহীদ :
বদরের যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিচয় হল,
১. হযরত উবায়দা ইবনে হারিছ (রা) - মুহাজির।
২. হযরত উমায়ের ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) - মুহাজির।
৩. হযরত যুশ-শিমালাইন (রা) - মুহাজির।
৪. হযরত আকিল ইবনে বুকাইল (রা) - মুহাজির।
৫. হযরত মাহজা ইবনে সালেহ (রা)- মুহাজির। তিনি ছিলেন হযরত ওমর (রা.) এর আযাদকৃত ক্রীতদাস।
৬. হযরত সাফওয়ান ইবনে বায়দা (রা) - মুহাজির।
৭. হযরত সাদ ইবনে খায়সামা (রা) - আনসার।
৮. হযরত মুবাশ্বর ইবনে আবদুল মুনযির (রা) - আনসার।
৯. হযরত উমায়ের ইবনে হুমাম (রা) - আনসার।
১০. হযরত ইয়াযিদ ইবনে হারিছ (রা) - আনসার।
১১. হযরত রাফি ইবনে মুয়াল্লাহ (রা) - আনসার।
১২. হযরত হারিছা ইবনে সুরাকা (রা) - আনসার।
১৩. হযরত আওফ ইবনে হারিছ (রা) - আনসার।
১৪. হযরত মুআওবিয ইবনে হারিছ (রা) - আনসার।

যুদ্ধের পর মুসলিমরা মদিনায় ফিরে আসে। এতে কয়েকজন কুরাইশ নেতাসহ ৭০ জন বন্দী হয়। বন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ করা হয়েছিল। মুসলিমরা নিজেরা খেজুর খেয়ে বন্দীদের রুটি খেতে দেয়। বদর যুদ্ধের পর নবীজির অবস্থান ছিল পরাজিত আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা না করা ও কষ্ট না দেওয়া। তাঁর আদেশে মদিনায় আনসার এবং মুহাজিররা সাধ্যানুসারে বন্দিদেরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আপন আপন গৃহে স্থান দিলেন এবং আত্মীয়-স্বজনের মতোই তাদের সঙ্গে আচরণ করেন। বন্দীদের স্বগতোক্তি ছিল—‘মদিনাবাসীদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হোক। তারা আমাদের উটে চড়তে দিয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে গেছে, নিজেরা শুষ্ক খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিয়েছে।

বন্দীদের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে মুহাম্মাদ সা. নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। সভায় আবু বকর মত দেন যে বন্দীদের সবাই মুসলিমদেরই ভাই, একই বংশের সদস্য অথবা আত্মীয়। তাই তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া উচিত যাতে মুসলিমদের তহবিলে অর্থ সঞ্চিত হয় এবং বন্দীরা ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পায়। উমর ইবনুল খাত্তাবের মত ছিল বন্দীদের প্রতি কোনো প্রকার অনুকম্পা প্রদর্শন না করে মুসলিমদের প্রত্যেকে বন্দীদের মধ্যে নিজ নিজ আত্মীয়কে হত্যা করে যাতে এটা প্রমাণ হয় যে, মুশরিকদের ব্যাপারে মুসলিমদের মনে কোনো দুর্বলতা নেই।

যাই হোক শুরার অধিকাংশদের মতামত আবু বকরের পক্ষে থাকায় আল্লাহর রাসূল সা. মুক্তিপণ আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তবে আল্লাহ তায়ালা এই সিদ্ধান্ত পছন্দ করেন নি। তিনি পছন্দ করেছেন উমার রা.-এর সিদ্ধান্ত। যেহেতু এটা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল তাই আল্লাহ এই সিদ্ধান্তের কারণে মুসলিমদের শাস্তি না দিয়ে বরকত দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা সূরা আনফালের ৬৭ ও ৬৮ নং আয়াতে বলেন,

কোন নবীর জন্য উচিত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি জমিনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছো, অথচ আল্লাহ চাচ্ছেন আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। আল্লাহ্‌র পূর্ব বিধান (মুক্তিপণ বৈধ করার বিধান) না থাকলে তোমরা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছ সে জন্য তোমাদের উপর বড় আজাব আপতিত হতো।

এই বিজয় আল্লাহর ভাষায় ছিল সত্য প্রতিষ্ঠার বিজয়। তিনি সূরা আনফালের ৮ নং আয়াতে তা বলেছেন। এই বিজয়ের সবচেয়ে ভালো ফলাফল ছিল মদিনাতে। মদিনার মুশরিকরা যারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তারা আল্লাহর রাসূলের অভাবনীয় বিজয়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছিল যে, আল্লাহর নবী সা. সত্য নবী। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইসহ বহু মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করে। মদিনার ইহুদীরাও মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ মদিনার ভেতরে থাকা শত্রুদের মনোবল নষ্ট হয়ে যায়। মদিনা রাষ্ট্র আগের চাইতে বেশি সুসংহত হয়।

২২ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৬ - যেভাবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলা করলেন নবী সা.




মক্কার মুসলিমরা সব ছেড়ে চলে আসলো মদিনায়। সেখানে মুসলিম মদিনাবাসীর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিমদের কাঙ্ক্ষিত ইসলামিক স্টেট। মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদের হিজরত ঠেকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে তাদের চেষ্টা থেমে থাকেনি। তারা মদিনার এই নতুন আধুনিক রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকলো।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর সাথে পত্র বিনিময়
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনো ইসলামগ্রহণ করেনি। মদিনায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলো খাজরাজদের নেতা। মক্কার কুরাইশরা আবদুল্লাহকে হুমকিপূর্ণ একটি চিঠি লিখলো। সেই সময় মদিনায় আবদুল্লাহর যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। এমনও হওয়ার সম্ভাবনা ছিল যে, নবী সা. যদি মদিনায় না যেতেন, তবে ইয়াসরিববাসীরা তাকে তাদের বাদশাহ হিসাবে গ্রহণ করতো।

মক্কার মুশরিকরা তাদের চিঠিতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে লিখলো যে, আপনারা আমাদের বিধর্মী লোককে আশ্রয় দিয়েছেন। তাই আমরা কসম খেয়ে বলছি যে, হয়তো আপনারা তার সাথে লড়াই করুন অথবা তাকে ইয়াসরিব থেকে বের করে দিন। যদি না করেন তবে আমরা সর্বশক্তিতে আপনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যোদ্ধা পুরুষদের হত্যা এবং আপনাদের মহিলাদের দাসী বানাবো।

এই চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মক্কার মুশরিকদের নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হলো। নবী সা.-এর বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মনে আগে থেকেই প্রবল ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিলো। কেননা তার মনে এ ধারণা বৃদ্ধমূল হয়েছিলো যে, তিনি ইয়াসরিবের রাজমুকুট তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন। এছাড়াও তার গোত্রের লোকেরা কখনোই তার সাথে পরামর্শ করা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। অথচ তারা মুহাম্মদ সা.-এর কাছে বাইয়াত নিয়ে মদিনা রাষ্ট্র পর্যন্ত করে ফেলেছে অথচ তার সাথে পরামর্শ করে নি। এগুলো তার মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

মক্কার মুশরিকদের চিঠি পাওয়ার পরপরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং মদিনার মুশরিকরা রাসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো এবং তারা সমাবেশ করছিলো। সেখানে মদিনার বিপদ নিয়ে আব্দুল্লাহ বক্তব্য দিচ্ছিল। নবী সা. এ খবর পেয়ে দ্রুত দলবল নিয়ে আবদুল্লাহর সমাবেশে গেলেন। সেখানে তিনি তাঁর বক্তব্যে বললেন, তোমরা কুরাইশদের হুমকিতে যথেষ্ঠ প্রভাবিত হয়েছো মনে হচ্ছে। শোনো! তোমরা নিজেরা নিজেদের যতো ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছো, মক্কার কুরাইশরা তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা কি নিজেদের সন্তান এবং ভাইয়ের সাথে নিজেরাই যুদ্ধ করতে চাও? নবী সা. এর বক্তব্যের পর যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত আবদুল্লাহর অনুসারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো।

সমর্থক ও সহযোগিরা ছত্রবঙ্গ হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনকার মতো যুদ্ধ থেকে বিরত হলো। কিন্তু কুরাইশদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত ছিলো। কেননা এই দুর্বৃত্ত মুসলমান ও কাফেরদের সাথে সংঘাতের কোন ক্ষেত্রেই নিজের জড়িত হওয়ার সুযোগকে হাতছাড়া করেনি। উপরন্তু মুসলমানদের বিরোধিতার শক্তি অর্জনের জন্যে ইহুদীদের সাথেও সে যোগাযোগ রক্ষা করতো যেন, প্রয়োজনের সময় ইহুদীরা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু নবী সা. কৌশলে সবসময় তাকে কন্ট্রোল করেছিলেন।

মুসলমানদের জন্যে মসজিদে হারাম বন্ধ ঘোষণা
আবু জাহল নতুন রাষ্ট্রের ব্যাপারে মক্কা ও মক্কার আশে পাশের সব আরব গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ করলো। তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো মদিনাবাসীর জন্য কা'বাকে নিষিদ্ধ করা হলো। মুসলিমদেরকে ধর্মদ্রোহী ও মুরতাদ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলো। উল্লেখ্য যে, কা'বায় তখন খ্রিস্টান, ইহুদি ও বিভিন্ন প্রকার পূজারীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। শুধু মুসলিমদের মুরতাদ আখ্যা দিয়ে হজ্ব ও কা'বা তাওয়াফ থেকে মাহরুম করা হয়েছিলো।

যেহেতু মুরতাদ হিসেবে মদিনাবাসীদের আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাই মুরতাদদের দমনে সকল গোষ্ঠীকে এক করার চেষ্টাও করে যাচ্ছিল আবু জাহল। তার এই প্রচেষ্টায় সে মদিনার মুশরিক ও মদিনার ইহুদিদেরও ইনক্লুড করা চেষ্টা করেছিল। তার চেষ্টা সফল হয়েছিল। যেহেতু এই দুই গোষ্ঠী মুহাম্মদ সা.-সাথে মদিনা সনদের চুক্তিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল তাই তারা গোপনে আবু জাহলদের সাহায্য করতো। আর চূড়ান্ত যুদ্ধ হলে তারা ভেতরে থেকেই মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষতি করার সিদ্ধান্ত নিল।

মুসলিমদের প্রতি সরাসরি হুমকি
মক্কার মুশরিকরা মুহাম্মদ সা.-কে খবর পাঠালো যে, তোমরা মনে করো না যে, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে। বরং মদীনায় পৌঁছে আমরা তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বো। এটা শুধু হুমকি ছিলো না। রাসূল সা. নানান সূত্রে মুশরিকদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনো সারারাত জেগে কাটাতেন, আবার কখনো সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত্রি যাপন করতেন।

এই প্রসঙ্গে আয়িশা রা. বলেন, মদীনা আসার পর এক সন্ধ্যায় নবী সা. বললেন, ভালো হতো যদি আমার সাহাবাদের মধ্যে কোনো বিশ্বস্ত সাহাবি আমার এখানে পাহারা দিতো। একথা বলার সাথে সাথে অস্ত্রের শব্দ শোনা গেলো। নবী সা. জিজ্ঞাসা করলেন, কে ওখানে? জবাব এলো সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। বললেন, কি জন্য এসেছো? তিনি বললেন, হে আল্লাহ রাসূল! আপনার নিরাপত্তা প্রশ্নে আমার মনে হঠাৎ একটা সংশয়ের উদ্রেক হওয়ায় আমি আপনাকে পাহারা দিতে এসেছি। একথা শুনে রাসূল সা. তার জন্যে দোয়া করে শুয়ে পড়লেন।

মা আয়িশা রা. আরো বলেন, পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্যে নির্দিষ্ট ছিলো না। বরং অব্যাহতভাবেই তা রাখা হয়েছিলো। অতঃপর পবিত্র কোরআনের এই আয়াত নাযিল হলো- ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মানুষদের থেকে হেফাজত রাখবেন।’ এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর নবী সা. জানালায় মাথা বের করে বললেন, ‘হে লোকেরা তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তায়ালা আমাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।’

নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা শুধুমাত্র রাসূল সা. পর্যন্ত সীমাব্দ্ধ ছিলো না। সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই ছিলো এটা প্রযোজ্য ছিলো। হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা. বলেন, নবী সা. এবং তাঁর সাহাবারা মদিনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। এতে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। ফলে মদিনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত্রি যাপন করতেন না এবং সকালেও তাদের কাছে সবসময় অস্ত্র থাকতো।

এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, মুসলিমরা নিরাপদ আশ্রয়ে এসেও আতংকে দিন কাটাতে লাগলো। সারাক্ষণ একটি আতংক মুসলিমদের স্বাভাবিক কাজের বাধা হয়ে দাঁড়ালো। মদিনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতা ছিলো বিশেষ হুমকি। অন্য কথায় বলা যায় যে, এটা ছিলো তাদের টিকে থাকা না থাকার জন্যে বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে মুসলমানরা স্পষ্টভাবে বুঝে ফেলেছিলেন যে, কুরায়শরা মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে সংকল্প থেকে বিরত হবে না।

সশস্ত্র প্রতিরোধ তথা যুদ্ধের অনুমতি
মক্কায় থাকাকালীন ১৩ বছরে আল্লাহর রাসূল বহু নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। সাহাবাদের কঠিন ও ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে। কয়েকজনকে শহীদ করা হয়েছে। শারিরীক আঘাত নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। এই আঘাত থেকে বাঁচতে পারেন নি স্বয়ং মুহাম্মদ সা.। সব সাহাবীই কোনো না কোনো শারিরীক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর তিন বছর মুসলিমদের শিয়াবে আবু তালিবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো।

সাহাবারা নির্যাতিত হয়ে মুহাম্মদ সা.-এর কাছে এসে বলতেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি আমাদের জন্য কিছুই করবেন না? আমরা তো বড় অসহায় হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর রাসূল সেসময় ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতেন, পূর্বেকার নবীদের নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। আল্লাহর সাহায্যের আশ্বাস দিতেন। হজরত ওমর রা. ইসলাম গ্রহণ করার পর দাওয়াতী কাজ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে শুরু করলেও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র প্রতিরোধ করা হয় নি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এর অনুমতি দেননি।

এর কারণ ছিল আল্লাহর রাসূলের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। কোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব তার কাছে ছিল না। কোনো নিরাপদ এলাকা ছিল না। এমতাবস্থায় সশস্ত্র প্রতিরোধ মানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, যে ক'জন মুমিন আছেন তাদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জানা অপরিহার্য। অস্ত্র কখন হাতে তোলা যাবে তার একটা গাইডলাইন সীরাতে রয়েছে। আল্লাহর রাসূল তাঁর মাক্কী জীবনে নির্যাতনে পর নির্যাতন সহ্য করেছেন কিন্তু কখনোই পাল্টা প্রতিরোধ করেননি।

যখন মদিনায় ইসলামী স্টেট কায়েম হলো তখন আর এই যুক্তি থাকলো না। তদুপরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষ থেকে বার বার নিরাপত্তাহীনতার হুমকি আসছিলো। ফলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের যুদ্ধ করার অনুমতি দিলেন। সূরা হজ্বের ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, //যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম।//

যুদ্ধের অনুমতি পাওয়ার পর মুসলিমরা অত্যন্ত খুশি হলো। এতোদিনের একতরফা আক্রমণের অবসান হলো। আর এই অবসানের কারণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এর দ্বারা বুঝা যায় 'ইকামাতে দ্বীন' অর্থাৎ যে কাজের জন্য মুহাম্মদ সা.-কে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় নিযুক্ত করেছেন, সেই ইকামাতে দ্বীনের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। রাষ্ট্র ছাড়া দ্বীন বা ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হয় না।

এরপর যুদ্ধ করার গ্রাউন্ড হিসেবে আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী আয়াতে বলেন, //যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’। আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।//

এখানে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি মাঝে মাঝে ছাড় দেন তবে তাঁর নাম ঘোষণার স্থানসমূহকে অটুট রাখতে তিনি ইসলামপন্থীদের সাহায্য করবেন ও বিজয় দিবেন। যারা আল্লাহর পক্ষ হয়ে কাজ করে অর্থাৎ আল্লাহর বিধিবিধান বাস্তবায়নে সাহায্য করে আল্লাহ অবশ্যই তাদের সাহায্য করবেন। এরপর আল্লাহ সাহায্য করে ইসলামপন্থীদের যদি বিজয় দান করেন তবে তাদের বেসিক কাজ কী হবে তার নির্দেশনা পরবর্তী আয়াতে ঘোষণা করেন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা হজ্বের ৪১ নং আয়াতে বলেন, //এরা এমন সব লোক যাদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে এরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজে নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহর হাতে।// মহান প্রভু এখানে ইসলামী রাষ্ট্রের ৪ দফা কাজের কথা উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের অনুমতি পেয়ে আতংকে থাকা মুসলিমরা ডিফেন্সিভ কৌশল থেকে বের হয়ে এসে অফেনসিভ কৌশল গ্রহণ করলো। মুসলিমরা দেখলো মক্কার মুশরিকরা ভৌগলিকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। এ কারণে মুহাম্মদ সা. শুরার সাথে আলোচনা করে কিছু প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিলেন ও বাস্তবায়ন করলেন।

১- মুসলমানরা নিজেদের নিয়ন্ত্রনের সীমানা অর্থাৎ মদিনার সীমানা বৃদ্ধি করলেন। বৃদ্ধি করে মক্কা থেকে সিরিয়ার মধ্যবর্তী পথকে মদিনার অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন।
২- ১ম সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করার জন্য মক্কা থেকে সিরিয়া ও মদিনার যাতায়াতকারী বাণিজ্য কাফেলার পথের পাশে যেসব গোত্র রয়েছে তাদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করলেন।
৩- মক্কা থেকে সিরিয়ার যাওয়ার মহাসড়কে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ।
৪- কুরাইশদের ও আরবের বিভিন্ন গোত্রের গতিবিধি ও তথ্য জানার জন্য গোয়েন্দা নিয়োগ।

প্রথম পরিকল্পনার আলোকে একথা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইতিপূর্বে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত যে সকল চুক্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে যে, অনুরূপ একটি অনাক্রমণ চুক্তি জুহাইনা গোত্রের সাথেও সম্পাদিত হয়। এ গোত্র মদীনা থেকে তিন মনযিল অর্থাৎ ৫১ মাইল দূরে বাস করতো। এছাড়া আরো কয়েকটি গোত্রের সাথেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন।

পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্যে মুসলমানদের পর্যায়ক্রমিক অভিযান শুরু হয়। অস্ত্র সজ্জিত কাফেলা টহল দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিলো

১. মদীনার আশপাশের রাস্তায় সাধারণভাবে এবং মক্কার আশপাশের রাস্তায় বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা
২. মদিনার মুশরিক, ইহুদী এবং আশেপাশের বেদুইনদের মনে এ বিশ্বাস স্থাপন করানো যে, বর্তমানে মুসলমানেরা যথেষ্ট শক্তিশালী । অতীতের দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা তারা কাটিয়ে উঠেছে।
৩. মক্কার মুশরিকদের ঔদ্ধত্বপূর্ণ সাহসিকতা সম্পর্কে তাদের ভীত করে দেওয়া। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া যে, তারা যেসব চিন্তা এবং ক্রোধ প্রকাশ করেছে, তার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
৪. মক্কার ব্যবসায়ের পথ বন্ধ করে দিয়ে মুশরিকদের সমঝোতায় নত হতে বাধ্য করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল সা. অনেকগুলো সারিয়্যা ও গাজওয়া পরিচালনা করেন। সীরাতের পরিভাষায় সারিয়্যা হলো সেসব সামরিক অভিযান যেগুলোতে রাসূল সা. উপস্থিত ছিলেন না। আর গাজওয়া হলো যেসব সামরিক অভিযান আল্লাহর রাসূল সা. নিজে পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার বাণিজ্যিক যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া। এসব অভিযানের ফলে মক্কার লোকদের সিরায়া ও ইরাকে যাওয়া প্রচণ্ড নিরাপত্তা হুমকিতে গেছে।

১. সারিয়্যা সিফুল বাহার
সিফুল বাহার মানে সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের পাশে রাগিব প্রান্তরে মুসলিম ও মুশরিক বাহিনী মুখোমুখি হয়। মক্কার আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি কাফেলা মূল রাস্তা বাদ দিয়ে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে যাত্রা শুরু করেছিল। খবর পেয়ে রাসূল সা. হামজা রা.কে প্রধান করে একটি বাহিনী পাঠিয়েছেন। রাগিব প্রান্তরে উভয়পক্ষ মুখোমুখি হয়। আবু সুফিয়ানের কাফেলা বাধা পেয়ে ফিরে যায়। এখানে শুধু তীর বিনিময় ছাড়া আর কিছু হয়। উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো মিকদাদ ও উতবা নামে দুজন সাহাবী মুশরিকদের কাফেলার সাথে এসেছিল। তারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে সক্ষম হয়নি। তাই ব্যবসায়ের বাহানা করে কাফেলায় যোগ দিয়েছে। মুসলিমদের পেয়ে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। যেহেতু এখানে হামজা রা. ছিলেন তাই আবু সুফিয়ান তাদের ফেরাতে সাহস করেনি।

২. সারিয়্যা খাররার
মুশরিকদের আরেকটি বাণিজ্য কাফেলার সন্ধান পেয়ে রাসূল সা. সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে এর আমীর নিযুক্ত করে একটি বাহিনী খাররারের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাঁকে বিশজন সেনা দেওয়া হয়। তাঁরা ঐ কাফেলা ধরতে সক্ষম হন নি। তার আগেই তারা খাররার অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। এই অভিযানে মুসলিম বাহিনী পতাকা প্রদর্শন করেছিলো। পতাকার রঙ ছিল সাদা। আর বহন করেছিলেন আগের অভিযানের অর্জন মিকদাদ ইবনে আমর রা.। এরপর থেকে প্রতিটি অভিযানের সাদা পতাকা বহন করা হয়।

৩. গাজওয়ায়ে আবওয়া
এই অভিযান আল্লাহর রাসূল সা.-এর নেতৃত্বে ১ম সামরিক অভিযান। উদ্দেশ্য একই, মুশরিকদের বাণিজ্য কাফেলা রুখে দেওয়া। আবওয়া সমুদ্রের কাছে একটি স্থান। ৭০ জনের বাহিনী নিয়ে নবী সা. এই অভিযান পরিচালনা করেছেন। এই সময় মদিনায় অস্থায়ী দায়িত্বশীল হিসেবে সা'দ বিন উবাদা রা.-কে নিযুক্ত করেন। মুশরিকদের বাণিজ্য কাফেলা রাসূল সা.-এর মুখোমুখি হতে সাহস করেনি। এই অভিযানের বাড়তি অর্জন হলো রাসূল সা. স্থানীয় গোত্র বনু জামরার সাথে মৈত্রি চুক্তি করেন। রাসূল সা. পনের দিন সেখানে থাকার পর মদিনায় ফিরে আসেন।

৪. গাজওয়ায়ে বুয়াত
একটি বড় বাণিজ্য কাফেলাকে ধরার জন্য এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। মুশরিকদের নেতৃত্বে ছিল উমাইয়া ইবনে খালফ। রাসূল সা. দুইশত সাহাবা নিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন। এবারো মুশরিকরা ফিরে যায়। এই অভিযানের সময় মদিনায় অস্থায়ী আমীর নিযুক্ত করা হয় সা'দ বিন মুয়াজ রা.-কে।

৫. গাজওয়ায়ে সাফওয়ান
এই অভিযানের কারণ ছিলো, কারজ ইবনে জাবির নামে এক মুশরিকের নেতৃত্বে একদল লোক মদীনার চারণভূমিতে হামলা করে কয়েকটি গবাদি পশু অপহরণ করে। রাসূল সা. সত্তরজন সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে লুটেরাদের ধাওয়া করেন। কিন্তু কারজ এবং তার সঙ্গীদের পাওয়া যায়নি। কোনো প্রকার সংঘাত ছাড়াই তারা ফিরে আসেন। এই অভিযানের সময় মদিনার আমীর হিসেবে যায়েদ বিন হারেসা রা.-কে নিযুক্ত করা হয়েছিলো।

৬. গাজওয়ায়ে যুল উশাইরা
এই অভিযানে রাসূল সা.-এর সাথে দেড় শতাধিক সাহাবা ছিলেন। মক্কা থেকে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেছে মুশরিকদের একটি কাফেলা। এই খবর পেয়ে ঐ কাফেলাকে ধাওয়া করতে এ অভিযান চালানো হয়। এই কাফেলায় কুরাইশদের প্রচুর মালামাল ছিলো। নবী সা. এই কাফেলাকে ধাওয়া করতে যুল উশাইরা নামক জায়গা পর্যন্ত পৌ্ছেন। কিন্তু কয়েকদিন আগেই কাফেলা চলে গিয়েছিলো। ঐ কাফেলার নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান। এই কাফেলাই সিরিয়া থেকে ফেরার সময় নবী সা. তাদের গ্রেফতার করার চেষ্টা চালান। কিন্তু তারা মক্কায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই ঘটনার জের হিসাবে পরবর্তীকালে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৭. সারিয়্যা নাখলা
এই অভিযানে রাসূল সা. আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রা.-কে প্রধান করে বারোজন মুহাজিরের একটি দল প্রেরণ করেন নাখলায়। তারা সেখানে একটি বাণিজ্য কাফেলাকে পেলেন। সেদিন ছিল রজব মাসের শেষ দিন। আরব রীতি অনুসারে রজব মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ কাফেলা ঠেকাতে আর অপেক্ষা করেন নি। তিনি হামলা চালান। এতে আমর ইবনে হাদরামি মারা যায়। দুইজন মুশরিককে আটক করেন। কাফেলার সম্পদ অধিকার করেন।

অতঃপর সাহাবারা উভয় বন্দী এবং জিনিসপত্র নিয়ে মদিনায় হাজির হন। এটা ছিলো ইসলামের ইতিহাসে প্রথম গণিমতের মাল, প্রথম নিহত এবং প্রথম বন্দী। রাসূল সা. সব কথা শোনার পর বললেন, আমি তো তোমাদেরকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করতে বলিনি। এই ঘটনায় অমুসলিমরা এ প্রোপাগান্ডার সুযোগ পায় যে, মুসলমানরা আল্লাহর হারাম করা মাসকে হালাল করে নিয়েছে। এ নিয়ে নানারকম অপপ্রচার চালানো হয়। রাসূল সা. দ্বিধায় পড়ে যান। তাই তিনি বন্দী ও গনিমত রিসিভ করেন নি। রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে যান। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করে এই সমস্যার সমাধান করে দেন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ২১৭ নং আয়াতে বলেন, //পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তাতে যুদ্ধ করা ভীষন অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে বাধা দেয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা থেকে বহিস্কার করা আল্লাহর কাছে তদপেক্ষা বড় অন্যায়। ফেতনা হত্যা অপেক্ষা ভীষন অন্যায়।//

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের হীনমন্য ও দ্বিধান্বিত হতে নিষেধ করেছেন এবং মুশরিকদের অভিযোগ পাত্তা না দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। অবশেষে রাসূল সা. আল্লাহর শেখানো মোক্ষম জবাব দিয়ে মুশরিকদের মুখ বন্ধ করে দেন। হারাম মাসের সম্মানে তিনি বন্দিদের ছেড়ে দেন ও নিহতের জন্য রক্তপণ দেন। তবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গ্রহণ করেন।

২১ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৫ - মুহাম্মদ সা.-এর মসজিদভিত্তিক রাষ্ট্র ও নয়া সংবিধান



মুহাম্মদ সা. যখন মদিনায় এলেন তখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মদিনার বিভিন্ন টাইপের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা ও তাদেরকে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য করানো। কারণ মুসলিম ছাড়া বাকিরা মুহাম্মদ সা.-কে নিরঙ্কুশভাবে নেতা মানেন নি। মহানবী সা. তাই সেই সময়ে আরবে চলতে থাকে গোত্রভিত্তিক রাজনীতির বাইরে একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন। এর দ্বারা কোনো গোত্র নয় বরং যোগ্য ব্যাক্তি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। রাসূল সা. গোত্র পরিচয়ে বড় হওয়া, অহংকার করা ও গোত্রের জন্য যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। একে তিনি নোংরা কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই আসাবিয়্যাত বা জাতীয়তাবাদ শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বড় অন্তরায়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর ব্যবস্থা ৪০ বছর পর্যন্ত বহাল ছিল। আলী রা.-এর শাহদাতের মধ্য দিয়ে আবারো আসাবিয়্যাত ও রাজতন্ত্রের উত্থান হয়েছে মুসলিমদের মধ্যে। এখান থেকে আমাদের বিচ্যুতি শুরু হয়েছিল।

এখন আল্লাহর রাসূল সা.-এর সামনে অনেক গোত্রের তিন টাইপের মানুষ অবস্থান করছিল
১. মক্কা, মদিনা ও আরবের বিভিন্ন স্থানের মুসলিম
২. আওস ও খাজরাজ গোত্রের মুশরিক
৩. মদিনার ইহুদী গোত্র

নবী সা. এই বিভিন্ন টাইপের মানুষগুলোকে একীভূত করতে একটি সংবিধান প্রনয়ণ করেন তাঁর বিজ্ঞ সাহাবী ও বিভিন্ন গোত্রের নেতাদের সহযোগে। যার ফলে প্রত্যেক টাইপের মানুষ অনুভব করতে সক্ষম হয়েছে এই আধুনিক রাষ্ট্র শুধুমাত্র মুসলিমদের অথবা মুহাম্মদ সা.-এর নয়, বরং মদিনায় অবস্থানকারী সবারই এই রাষ্ট্র। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সেই সংবিধান কার্যকর হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যেই ২য় টাইপের মানুষ অর্থাৎ আওস ও খাজরাজ গোত্রের মুশরিকরা হারিয়ে গেছে। তারা সবাই ইসলামের ছায়াতলে সমবেত হয়েছেন। এই সংবিধান মদিনা সনদ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত ও সমাদৃত।

সংবিধান প্রস্তুত করার আগে মহানবী সা. নতুন রাষ্ট্রের অফিস ও সেন্টার তৈরি করেছিলেন। যেহেতু তাঁর উট আবু আইয়ুব আনসারীর বাড়ির সামনে যে স্থানে থেমেছে তাই সেখানের সেন্টার স্থাপনের কাজ শুরু করলেন। সেন্টার স্থাপন হওয়া পর্যন্ত নবী সা. আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে থেকেছেন।

যেখানে নবী সা. উট থেমেছিলো সেই জমির মালিক ছিল দু'জন ইয়াতিম বালক। মুহাম্মদ সা. তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে সেই জমিন ক্রয় করে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। এই নির্মাণ কাজে সমগ্র মুসলিম কাজ করেছেন। আল্লাহর রাসূল নিজেও পাথর টেনেছেন। মসজিদ নির্মাণ কাজে শ্রমিকের কাজ করেছিলেন। মসজিদের দরজার দুটি পিলার ছিলো পাথরের। দেয়ালসমূহ কাঁচা ইট এবং কাদা দিয়ে গাথা হয়েছিলো। ছাদের উপর খেজুর শাখা ও পাতা বিছিয়ে দেওয়া হলো, তিনটি দরজা লাগানো হলো, কেবলার সামনের দেওয়াল থেকে পেছনের দেয়াল পর্যন্ত একশত হাত দৈর্ঘ্য ছিলো, প্রস্থ ছিলো এর চাইতে কম। ভিত্তি ছিলো প্রায় তিন হাত গভীর।

নবী সা. মসজিদের অদূরে কাঁচা ঘর তৈরি করলেন নিজের জন্য। এই ঘরের দেয়াল খেজুর পাতা ও শাখা দিয়ে তৈরি। এরপর তিনি আবু আইয়ুব আনসারীর বাসা থেকে নিজের বাসায় উঠলেন। নির্মিত মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের জন্য ছিলনা। বরং এটি ছিল একটি কমপ্লেক্স। এখান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হতো তাই এটি ছিল সদর দফতর। এখানে সাহাবারা ইসলাম, ধর্মীয় আচার, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও আইন সম্পর্কে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতেন তাই এটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে রাষ্ট্রের যাবতীয় বিচার-সালিশ হতো তাই এটি ছিল বিচারালয়। এখানে অসহায়, দরিদ্র ও বঞ্চিতদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হতো তাই এটি ছিল পুনর্বাসন কেন্দ্র। এখানে রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আইন পাশ হতো তাই এটি ছিল মজলিশে শুরা বা সংসদ ভবন।

একটি দুঃখজনক বিষয় না বললেই নয়, আমরা আমাদের মসজিদগুলোকে বিরানভূমি বানিয়ে ফেলেছি। আমাদের ওপর সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ চেপে বসেছে। আল্লাহর রাসূল সা. মসজিদকে বানিয়েছিলের রাজনীতি ও সমাজের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর আমরা মসজিদকে বানিয়েছি ব্যক্তিগত ইবাদতের স্থান হিসেবে। জেনে রাখবেন আল্লাহর রাসূল সা. মসজিদভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অর্থাৎ সমাজের রাজনীতি এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে। এটাই ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। কেউ যদি মসজিদকে শুধুমাত্র নামাজের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে তবে সে আল্লাহর রাসূল সা.-এর চেতনার পরিপন্থী।

আমাদের অনেক মসজিদে লেখা থাকে 'মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা হারাম'। এটা কী দলিলের ভিত্তিতে হারাম বলা হয় তা আমার জানা নেই। দুনিয়াবী কথা বলতে যদি অপ্রয়োজনীয় ও ফাহেশা কথা বুঝানো হয় তবে তা মসজিদ ও মসজিদের বাইরে সর্ব অবস্থায় হারাম। মসজিদে আলাদাভাবে হারাম বলার মাধ্যমে মসিজিদের বাইরে এটাকে জায়েজ করার অপচেষ্টা হিসেবে ধর্তব্য হবে। আর এটা দিয়ে যদি দুনিয়ার ব্যবসায়িক ঝামেলা, মামলা মোকদ্দমা, রাজনীতি ইত্যাদি বুঝানো হয়ে থাকে তবে আল্লাহর রাসূল সা. এসব কাজের সুরাহা মসজিদে বসেই করতেন। তবে মসজিদকে কেউ যাতে তার ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জায়গা না বানায় সেজন্য রাসূল সা. মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন। এটা এমন জায়গা যেখানে সব মুসলিম আসবে আমি যদি সে সুযোগে এখানে পণ্য বিক্রি করি তাহলে এটা নিন্দনীয়।

আমাদের মসজিদ থেকে যে রাজনীতি দূর হয়ে গেছে এর জন্য দায়ি সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলো। তারা রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বন্ধ করে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলাম পরিপন্থী বহু বিষয়কে জায়েজ হিসেবে সাব্যস্থ করেছে। ইসলামের এই বিকৃতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ি আলেম সমাজ। যাদের থেকে মুসলিমরা ইসলামের জ্ঞান লাভ করে। একেকজন মুহাদ্দিস, মুফতি কুরআন ও হাদিস পড়েন ও শিক্ষা দেন অথচ দিনশেষে বলেন, আমরা রাজনীতি করি না। ওয়াল্লাহি! আল্লাহর রাসূল সা. তাঁর সারাজীবন রাজনীতি করে গেছেন। তাঁর প্রধান সাহাবীরা রাজনীতি করে জীবন পাড়ি দিয়েছেন। তাহলে এই আলেমরা কীভাবে নায়েবে রাসূল হয়? আল্লাহ তায়ালা এই আলেম নামধারীদের হিদায়াত দান করুন। ইসলামের পথে প্রত্যাবর্তন করার তাওফিক দান করুন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফেল নন”। [সূরা বাক্বারা, আয়াত ৮৫]।

আমাদের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে নবী সা. আগেই ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, মুয়াজ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "সাবধান! ইসলামের চাকা ঘূর্ণায়মান, তোমরাও ইসলামের সাথে ঘুরতে থাকবে। সাবধান! অচিরেই কুরআন ও ক্ষমতা আলাদা হয়ে পড়বে, অর্থাৎ ধর্ম থেকে রাষ্ট্র অচিরেই পৃথক হয়ে যাবে। তোমরা আল্লাহর কিতাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ো না। সাবধান! অচিরেই তোমাদের ওপর এমন শাসক চেপে বসবে যারা নিজেদের জন্য এমন ফয়সালা করবে যা তোমাদের জন্য করবে না। তোমরা যদি তাদের আনুগত্য না করো তারা তোমাদের হত্যা করবে, আর যদি আনুগত্য করো তবে তোমাদের পথভ্রষ্ট করবে।

সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, আমরা তখন কি করব ইয়া রাসূলুল্লাহ?
রাসূলুল্ললাহ সা. বলেন, "তোমরা তা করবে যা করেছেন ঈসা ইবনে মরিয়ম আ.-এর অনুসারীগণ। করাত দিয়ে তাদেরকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং শূলে চড়ানো হয়েছে (এরপরও তারা আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে আসেনি)। আল্লাহর নাফরমানী করে বেঁচে থাকার চেয়ে তাঁর আনুগত্যের পথে মারা যাওয়া অনেক শ্রেয়।

যাই হোক, আল্লাহর রাসূল সা. এরপর নয়া সংবিধান রচনার দিকে মনোনিবেশ করলেন। তিনি তিন টাইপের মানুষকে একটি রাষ্ট্রীয় বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইলেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সেই সাথে ঘটে গেল ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি হলো প্রথম লিখিত সংবিধান। এর মাধ্যমে রাসূল সা. আধুনিক রাষ্ট্রের সূচনা করলেন যার ভিত্তি হলো ইসলাম।

মদিনার সংবিধানের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ

১. মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন।
মুসলিমরা মোটা দাগে দুই ধরণের ছিলেন। একপক্ষ হলেন মুহাজির, যারা মক্কা থেকে খালি হাতে এসে মদিনায় আশ্রয় নিয়েছেন। অপরপক্ষ হলেন আনসার, যারা মদিনার অধিবাসী। নবী সা. এই দুই পক্ষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন। প্রতিটি মুহাজিরের জন্য একজন আনসার ভাই নির্দিষ্ট করে দিলেন। জাহেলী যুগের রীতিনীতি অবসান ঘটিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং বর্ণ, গোত্র, আঞ্চলিকতার পার্থক্য মিটিয়ে দেওয়াই ছিলো এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের উদ্দেশ্য।

স্বাধীন ও দাস ব্যক্তি কখনো ভাই হয়ে গলায় গলায় ভাব হতে পারে এরকম অভিনব দৃশ্য আরববাসী এই প্রথম দেখতে পেল। আনসাররা তাদের সম্পত্তি ভাগ করে মুহাজির ভাইকে দিয়ে দিল। এমনি অনেকে তাদের একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে একজনকে তালাক দিয়ে ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। ঘর বানিয়ে দিল। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এক অনন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ। সেই সময় মুসলমানরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন, এই ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন ছিল তার একটি চমৎকার সমাধান।

২. মুসলিমদের থেকে ইসলামের প্রতি সহযোগিতার অঙ্গীকার
ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক ছাড়াও নবী সা. মুসলমানদের জন্য আরেকটি অঙ্গীকারনামা প্রণয়ন করেন। এর মাধ্যমে জাহেলী যুগের সকল দ্বন্দ্ব সংঘাত ও গোত্রীয় বিরোধের ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। নতুন জাতীয়তা পরিচয় 'মুসলিম' দেওয়া হয়। সকল মুসলিমের এক জাতি এক উম্মাহ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা ও রাষ্ট্রের বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে আল্লাহর নবী সা.-এর আনুগত্যের বাইয়াত নেওয়া হয়।

৩. বিধর্মীদের অধিকার নিশ্চিত
মদিনাবাসীদের মধ্যে যারা এখনো মুশরিক রয়ে গেছেন তাদের ধর্ম পালনের অধিকার। রীতি রেওয়াজ পালনের অধিকার তাদের নিরাপত্তা ও বসবাসের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়। বিনিময়ে তারা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে। রাষ্ট্রের শত্রুদের সহায়তা করবে না। রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে একযোগে শত্রুর সাথে লড়াই করবে এই অঙ্গিকার নেওয়া হয়।

৪. ইহুদিদের সাথে চুক্তি সম্পাদন
আল্লাহর রাসূল সা. ইহুদিদের ব্যাপারে সাবধানী ছিলেন। তারা যাতে নতুন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে না যায় তাই তিনি শুরুতেই তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। সেখানে তাদের নিজেদের ধর্ম পালন, ব্যবসায়ের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি দেওয়া হয়। বিনিময়ে তাদের থেকে মদিনা রক্ষার নিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রের শত্রুদের সহযোগিতা করা ও চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। এর মাধ্যমে রাসূল সা. নিশ্চিত হতে চেয়েছেন তারা যাতে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকে ও হটকারিতা না করতে পারে।

এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর মদিনা এবং তার আশে পাশের এলাকা নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। সেই রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল মদিনা। রাসূল সা. ছিলেন সেই রাষ্ট্রের প্রধান। এর মূল কর্তৃত্ব ছিল মুসলমানদের হাতে। এভাবে পৃথিবীর বুকে ইসলামী স্টেট প্রতিষ্ঠা লাভ করলো। এই চারটি পদক্ষেপের মিলিত নাম হলো মদিনা সনদ।

পাকিস্তানের ইসলামিক স্কলার তাহির আল ক্বাদরি এই মদিনা সনদকে ক্যাটাগরিভিত্তিক ভাগ করে একটি সুন্দর রূপ দান করেন। তিনি মদিনা সনদকে ৬৩ টি আর্টিকেলে ভাগ করেন। নিচে তা উপস্থাপন করা হলো।

আর্টিকেল ১ : সাংবিধানের মূলনীতি :

এই সংবিধান আল্লাহর তায়ালার নির্দেশে রাসূল সা. কর্তৃক প্রণীত।

আর্টিকেল ২ : সংবিধানের অধিভুক্ত পক্ষসমূহ :

কুরাইশ মুসলিম, মদীনার নাগরিক, তাদের অধীনস্থ গোত্রসমূহ যারা রাজনৈতিকভাবে তাদের সাথে যুক্ত হবে এবং তাদের হয়ে যুদ্ধ করবে।

আর্টিকেল ৩ : সাংবিধানিক জাতীয়তা :
উপরোল্লিখিত পক্ষসমূহ একটি সাংবিধানিক ঐক্যের ভিত্তিতে পরিচিত হবে যা অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ থেকে তাদের আলাদাভাবে পরিচিত করবে।

আর্টিকেল ৪ : রক্তমূল্য পরিশোধের পূর্ববর্তী গোত্রীয় আইন :
মুহাজির কুরাইশগণ আগেকার বিধিবিধান মোতাবেক তাদের গোত্রের জন্য দায়বদ্ধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথভাবে রক্তঋণ পরিশোধ করবে এবং প্রতিটি পক্ষই মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের বন্দীদের মুক্ত করে নিবে এবং বিশ্বাসীদের মাঝে যাবতীয় লেনদেন হবে বিদ্যমান আইন মোতাবেক এবং ইনসাফের ভিত্তিতে।

আর্টিকেল ৫ : বনি আউফ গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ৬ : বনি হারিস গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ৭ : বনি সাঈদা গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ৮ : বনি জুশাম গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ৯ : বনি নজর গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ১০ : বনি আমর গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ১১ : বনি নাবীত গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ১২ : বনি আউস গোত্রের জন্যও একই কথা

আর্টিকেল ১৩ : আইন ও সুবিচারের সমতা সকল গোত্রের জন্য প্রযোজ্য :
সকল গোত্রকে বন্দীমুক্তি দেয়ার অধিকার দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বাসীদের প্রতি আইনের সমতা এবং সুবিচার নিশ্চিত করা হলো।

আর্টিকেল ১৪ : আইনে শিথিলতা নিষিদ্ধ :
বিশ্বাসীরা নিজেদের মাঝে কোনো ঋণগ্রস্থ রাখবে না, সাধ্যমতো তাকে মুক্তিপণ পরিশোধ করতে সহায়তা করবে।

আর্টিকেল ১৫ : অন্যায় পক্ষপাত নিষিদ্ধ :
কোনো বিশ্বাসী অন্য কোন বিশ্বাসীর সাথে তার মতামত না নিয়ে কোনো অ্যালায়েন্স করবে না।

আর্টিকেল ১৬ : অবিচার, নিষ্ঠুরতা এবং আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ :
মদীনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিরোধিতাকারী বা জোরপূর্বক কোনো কিছু জবরদখল করার চেষ্টারত বা বিশ্বাসীদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ এদের বিরুদ্ধে সকল বিশ্বাসী একসাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। যদি সেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী তাদের কারো সন্তানও হয়ে থাকে।

আর্টিকেল ১৭ : একজন মুসলিম কর্তৃক আরেকজন মুসলিম হত্যা করা নিষিদ্ধ :
একজন অবিশ্বাসীর জন্য কোন মুসলিম অপর কোনো মুসলিমকে হত্যা করবে না; এমনকি কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোনো অবিশ্বাসীকে সাহায্যও করবে না।

আর্টিকেল ১৮ : সকল মুসলিমের জন্য জানের নিরাপত্তার সমঅধিকারের নিশ্চয়তা :
আল্লাহ কর্তৃক সবার নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সংবিধান সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, এর জন্যে সকল বিশ্বাসীকে সর্বোচ্চ পরিমাণে বিনয়ী হতে হবে।

আর্টিকেল ১৯ : অন্যান্য সাংবিধানিক কমিউনিটির চেয়ে মুসলিমদের আলাদা সাংবিধানিক পরিচয় :
বিশ্বাসীরা এক উম্মাহ ও মুসলিম হিসেবে পরিচিত হবে। একে অপরকে সাহায্য করবে বহির্বিশ্বের বিপরীতে।

আর্টিকেল ২০ : অমুসলিম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী (ইহুদি)-এর জন্যও জীবনের নিরাপত্তার সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ :
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল একজন ইহুদির জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হলো যে পর্যন্ত না তিনি বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষতিকর কিছু না করেন বা বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বাইরের কাউকে সাহায্য না করেন।

আর্টিকেল ২১ : সমতা এবং ইনসাফের ভিত্তিতে সকল মুসলিমের জন্য শান্তি এবং নিরাপত্তার বিধান :
বিশ্বাসী কর্তৃক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সবার জন্য সমান। যখন আল্লাহর রাস্তায় কোন জিহাদের প্রয়োজন হবে কোন বিশ্বাসী শত্রুপক্ষের সাথে আলাদাভাবে কোন চুক্তিতে যাবে না, যদি না সেটা সকল বিশ্বাসীদের জন্য সমতা এবং নায্যতা প্রতিষ্ঠা করে।

আর্টিকেল ২২ : যুদ্ধের সহযোগী পক্ষগুলোর জন্য ছাড় :
যুদ্ধের প্রতিটি পক্ষের জন্যই যুদ্ধের যাবতীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ ছাড়।

আর্টিকেল ২৩ : আল্লাহর রাস্তায় হতাহতের বিরুদ্ধে মুসলিমদের প্রতিশোধ :
আল্লাহর রাস্তায় নিহতদের প্রতিশোধ নিতে বিশ্বাসীরা একে অপরকে সাহায্য করবে।

আর্টিকেল ২৪ : ইসলাম জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধান :
তাকওয়াসম্পন্ন বিশ্বাসীদের জন্য উৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে সঠিক জীবন পদ্ধতি ইসলামকে মনোনীত করা হয়েছে।

আর্টিকেল ২৫ : শত্রুপক্ষকে জীবনের এবং সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া নিষেধ :
কোন মুশরিক কুরাইশকে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। এমনকি কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে তাদের সহায়তাও প্রদান করা হবে না।

আর্টিকেল ২৬ : মুসলিম হত্যার প্রতিশোধ :
যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলিমকে হত্যা করে এটা সত্য প্রমাণিত হলে সেই হত্যাকারীকেও হত্যা করা হবে। যদি না নিহতের আত্মীয়-স্বজন জানের বদলা হিসেবে রক্তমূল্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন।

আর্টিকেল ২৭ : সংবিধানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বা ধ্বংসকারীদের ক্ষেত্রে কোন সুরক্ষা বা ছাড় নেই :
যারা বিশ্বাসী, এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং পরকালে বিশ্বাস করে এবং এই দলিলের সব ধারার সাথে সম্মতি জানিয়েছে তারা এই সংবিধানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বা এই সংবিধান অকার্যকর করার সাথে যুক্ত এমন কাউকে কোনরূপ সুরক্ষা বা ছাড় দেবে না।

আর্টিকেল ২৮ : মুসলিমদের মধ্যে দ্বিমত বা বিতর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের :
যখন তোমাদের মাঝে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিবে, তখন সেটি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে সেটি পেশ করবে। যেহেতু সকল বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই দেবেন।

আর্টিকেল ২৯ : অমুসলিম মানে ইহুদিগণ যুদ্ধের ব্যয়ভার সমানুপাতিক হারে বহন করবে :
ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ইহুদিগণ যতক্ষণ তাদের সাথে একসাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে, সমানুপাতিক হারে যুদ্ধের ব্যয়ভার এবং দায়দায়িত্ব বহন করবে।

আর্টিকেল ৩০ : সকল মুসলিম এবং অমুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা :
বনি আউফ গোত্রের ইহুদিগণ বিশ্বাসীদের সাথে মিলে একটি কমিউনিটি হিসেবে বিবেচিত হবে। মুসলিমদের সাথে সাথে তাদেরও পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। তাদের এবং তাদের সহযোগী সবার জন্যই এই অধিকার সুনিশ্চিত করা হলো, তাদের ছাড়া যারা অন্যের ওপর বলপ্রয়োগকারী অপরাধী এবং যারা এই চুক্তি ভঙ্গকারী। এভাবে তারা শুধুমাত্র নিজেদের এবং তাদের পরিবারের প্রতি দুর্ভোগ বয়ে আনবে।

আর্টিকেল ৩১ : বনি নজর গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩২ : বনি হারিস গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৩ : বনি সাঈদা গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৪ : বনি জুশাম গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৫ : বনি আউস গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৬ : বনি থা’লাবা গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৭ : বনি থা’লাবার উপগোত্র জাফনার ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৮ : বনি শুতাইবা গোত্রের ইহুদিগণেরও বনি আউফ গোত্রের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে।

আর্টিকেল ৩৯ : থা’লাবা গোত্রের সকল সহযোগীদের অধিকারের সমতা নিশ্চিত করা হলো।

আর্টিকেল ৪০ : ইহুদি সকল শাখার জন্য অধিকারের সমতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো।

আর্টিকেল ৪১ : সশস্ত্র যুদ্ধে যাবার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং আদেশ দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহর রাসূল-এর :
আল্লাহর রাসূল সা.-এর পূর্বানুমতি ছাড়া কেউ সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করতে পারবে না। যেহেতু যুদ্ধের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অথরিটি কেবলমাত্র রাসূল সা.।

আর্টিকেল ৪২ : প্রতিশোধের ক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম নেই :
কেউ কোন যৌক্তিক প্রতিশোধ বা খুনের বদলা নিতে চাইলে সেখানে কোনরূপ বাধা প্রদান করা হবে না।

আর্টিকেল ৪৩ : বেআইনি হত্যার দায় দায়িত্ব :
কেউ যদি বেআইনিভাবে কাউকে খুন করে তবে সে এবং তার পরিবার এর জন্য দায়ী হবে, তবে সে যদি কোন নিষ্ঠুর বা অত্যাচারী কাউকে খুন করে সেক্ষেত্রে ছাড় পেতে পারে। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা এই সনদের আনুগত্যকারীদের সাথে আছেন।

আর্টিকেল ৪৪ : পৃথকভাবে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করা :
মুসলিম এবং ইহুদিগণ পৃথকভাবে নিজ নিজ যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।

আর্টিকেল ৪৫ : যুদ্ধের সময় একে অপরকে সহায়তা করা অবশ্য কর্তব্য :
এই সনদে স্বাক্ষরকারীদের সাথে যারা যুদ্ধরত তাদের বিরুদ্ধে সকলের পারস্পরিক সহায়তা করা অবশ্যকর্তব্য।

আর্টিকেল ৪৬ : পারস্পরিক আলোচনা এবং সম্মানজনক লেনদেন :
এই চুক্তিনামায় স্বাক্ষরদানকারী প্রতিটি পক্ষ নিজেদের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া বজায় রাখবে এবং সম্মানজনকভাবে লেনদেন করবে এবং নিজেদের মাঝে করা সকল প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকবে।

আর্টিকেল ৪৭ : বিশ্বাসঘাতকতা নিষিদ্ধ এবং নিপীড়িতদের সহযোগিতা প্রদান :
কেউ মিত্রপক্ষের জন্য কোন চুক্তি ভঙ্গ করবে না এবং নিপীড়িতদের সাহায্য করা হবে।

আর্টিকেল ৪৮ : ইহুদিগণ যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রের প্রতি আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বাড়াবে :
মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদিরাও যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রকে দেয়া আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বাড়াবে।

আর্টিকেল ৪৯ : রাষ্ট্রে বিদ্যমান বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ এবং রক্তপাত নিষিদ্ধ :
ইয়াসরিব উপত্যকা পবিত্র ভূমি, সেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে যুদ্ধ এবং রক্তপাত নিষিদ্ধ করা হলো।

আর্টিকেল ৫০ : সনদের অধীনে আশ্রয় নেয়া জনগণের সমভাবে জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা :
কোন ব্যক্তিকে মদীনায় আশ্রয় দেয়া হলে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ক্ষতিকর কিছু করছে বা বিশ্বাসঘাতকতা করছে ততক্ষণ পর্যন্ত জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারও সমান অধিকার।

আর্টিকেল ৫১ : নারীদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে আইন :
একজন নারীকে তার পরিবারের সম্মতি ছাড়া আশ্রয় দেয়া হবে না।

আর্টিকেল ৫২ : কোন মতবিরোধ সংঘাতের দিকে পৌঁছালে আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল-ই হবেন এর চূড়ান্ত ফায়সালাকারী :
যখনই এই সনদে স্বাক্ষরকারী দলসমূহের মধ্যে কোন মতপার্থক্য চরমে পৌঁছালে, সংঘাতের দিকে যাবার আশঙ্কা তৈরি হলে সেটার বিচারের ভার আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ওপর ন্যস্ত করা হবে। রাসূল-ই চূড়ান্ত এবং সর্বোচ্চ মানদণ্ডের সঠিক সমাধান দিবেন।

আর্টিকেল ৫৩ : শত্রুরাষ্ট্রের কাউকে বা তাদের কোন মিত্রকে কোন আশ্রয় নয় :
কুরাইশ এবং তার মিত্রদের কোনো আশ্রয় দেয়া হবে না।

আর্টিকেল ৫৪ : রাষ্ট্রের ওপর কোন আঘাত আসলে সম্মিলিত প্রতিরোধ :
বাহির থেকে মদীনা রাষ্ট্রের ওপর কোন আঘাত আসলে মুসলিম এবং ইহুদিগণ সম্মিলিতভাবে সেটা প্রতিরোধ করবে।

আর্টিকেল ৫৫ : প্রতিটি মিত্র গোত্রের জন্য শান্তিচুক্তি মেনে চলা অবশ্যকর্তব্য :
ইহুদিদের কোন শান্তিচুক্তিতে আহ্বান জানানো হলে এটা তাদের দায়িত্ব যে তারা সেটি পালন করবে এবং এর সাথে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধভাবে যুক্ত থাকবে। একইভাবে মুসলিমদের কোন শান্তিচুক্তিতে আহ্বান জানানো হলে এটা তাদের দায়িত্ব যে তারা সেটি পালন করবে এবং এর সাথে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধভাবে যুক্ত থাকবে।

আর্টিকেল ৫৬ : ধর্মপালনে বাধা দেওয়া হবে না :
চুক্তিবদ্ধ প্রতিটি পক্ষ তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারবে। এতে কেউ বাধা দেবে না।

আর্টিকেল ৫৭ : প্রতিটি মিত্রপক্ষ তাদের নিজ নিজ সম্মুখভাগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে :
চুক্তিতে স্বাক্ষররত প্রতিটি পক্ষ তাদের নিজ নিজ সম্মুখভাগের সমরনীতি নিজেরাই নির্ধারণ করবে এবং কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে সে ব্যাপারে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।

আর্টিকেল ৫৮ : স্বাক্ষরকারী প্রত্যেকটি দলের জন্যই মূল সাংবিধানিক মর্যাদা সমান :
আউস গোত্র এবং তাদের মিত্র সকল ইহুদিগণ এই সংবিধানে স্বাক্ষরকারী অন্য দলগুলোর মতো সমানভাবে সাংবিধানিক মর্যাদা পাবে এই শর্তে যে তারা নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।

আর্টিকেল ৫৯ : সংবিধান অবমাননা করার কোন অধিকার কোন পক্ষের নেই :
বিদ্যমান কোন দলেরই সংবিধান অবমাননা করার কোন অধিকার নেই। কেউ যদি কোন অপরাধ করে তাহলে সে নিজেই এর জন্য দায়ী।

আর্টিকেল ৬০ : সংবিধানের প্রতি আনুগত্যশীলদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা দয়াশীল :
যারা বিশ্বস্ততার সাথে এই সংবিধানের প্রতি আনুগত্যশীল থাকবে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সবসময়ে সদয় থাকবেন।

আর্টিকেল ৬১ : কোন বিশ্বাসঘাতক বা বলপ্রয়োগকারীর জন্য এই সংবিধানের অধীনে কোনো আশ্রয় নেই :
এই মর্মে বলা হচ্ছে যে এই সংবিধান কোন বিশ্বাসঘাতক বা অন্যায়ভাবে বলপ্রয়োগকারীকে কোন সুরক্ষা দিবে না।

আর্টিকেল ৬২ : সকল শান্তিপূর্ণ নাগরিক নিরাপদ এবং সুরক্ষিত :
যারা যুদ্ধে যাবে বা যারা মদীনায় অবস্থান করবে সবার জন্যই নিরাপত্তা, শুধুমাত্র তাদের ছাড়া যারা গোলযোগ সৃষ্টি করছে এবং সংবিধান মেনে চলছে না।

আর্টিকেল ৬৩ : সংবিধানের প্রতি আনুগত্যশীল :
মদীনার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা. হলেন রক্ষাকর্তা। এ মর্মে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল সা. মদীনার সুনাগরিক এবং যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের রক্ষাকর্তা।

২০ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৪ - প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও আত্মত্যাগের হিজরত



মদিনার মুসলিমরা নতুন রাষ্ট্র গঠনের জন্য বাইয়াত নেওয়ার প্রেক্ষিতে মক্কার মুসলিমদের জন্য নতুন পরীক্ষা নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশে আল্লাহর রাসূল সা. মক্কার মুসলিমদেরকে ইয়াসরিব তথা মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ দুনিয়ার জাগতিক দিক থেকে অনেক কঠিন। কারণ নিজের পরিবার ও স্বজনদের ছেড়ে যেতে হবে। সম্পূর্ণ খালি হাতে নিঃস্ব অবস্থায় যেতে হবে। এর কারণ যেতে হবে গোপনে সুতরাং সঙ্গে ব্যাগ বোঝাই করা যাবেনা। মক্কার বিষয় সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি হারানোর সমূহ সম্ভাবনা। মদিনায় অনিশ্চিত জীবন। সর্বোপরি মক্কার কুরাইশরা যদি বুঝতে পারে মদিনায় পালিয়ে যাচ্ছে তবে তাকে নির্যাতন করবে। এতসব সমস্যার বাইরে সম্ভাবনা শুধু একটাই আর সেটা হলো মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে। মুসলিমরা নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র পাবে।

রাসূল সা.-এর নির্দেশ পেয়ে মুসলিমরা একের পর এক মক্কা থেকে উধাও হতে শুরু করলেন। এটা টের পেয়ে যায় মুশরিকরা। তারা পাহারার ব্যবস্থা করে। বেশিরভাগই চলে যেতে সক্ষম হয়। তবে কেউ কেউ আটকা পড়ে। আটকে পড়াদের একটি বড় অংশ নিজেদের স্বজনদের দ্বারাই আটক হয়ে যায়। হজরত আবু বকর রা. ছাড়া আর বাকি সবাইকে যাওয়ার জন্য বলা হয়। মুহাম্মদ সা. আল্লাহর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আর আবু বকর রা.-কে তাঁর সফর সঙ্গী করার ইচ্ছে পোষণ করেন। মক্কার মুসলিমরা নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করে মদিনার পাড়ি দিলেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত মানতে সমস্যা হয়নি কারণ তারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর তারবিয়াতি প্রোগ্রামের ছাত্র ছিলেন। যারা আগে ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন তারাও সেখান থেকে মদিনায় যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন।

আল্লাহ তায়ালা এই হিজরতকে অনেক গুরুত্বের সাথে নিলেন। তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ সম্মানের ঘোষণা দিলেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্তরের হলেন মুহাজির সাহাবারা। মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল সা. হিজরতকে ৩য় মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করলেন। এই যুগেও যারা দ্বীন কায়েমের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করবে তাদের নেতৃত্বের অধিক হকদার বলে বিবেচিত হবে। তবে তার আগে অবশ্যই কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান থাকা লাগবে।

দারুন নদওয়া মিটিং
মক্কার মুশরিকরা যখন দেখলো, মুসলিমরা পরিবার পরিজন ও ধন সম্পদ ফেলে রেখে আওস ও খাযরাজদের এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। তখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়লো। ক্রোধে তারা অস্থির হয়ে উঠলো। ইতোপূর্বে তারা এ ধরনের বিপদজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হয়নি, এ পরিস্থিতি ছিল তাদের মূর্তি পূজা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর মারাত্মক আঘাত এবং চ্যালেঞ্জ স্বরূপ।

মুশরিকরা বুঝতে পেরেছিলো মক্কার মুসলিম ও মদিনাবাদীরা একটি শক্ত জোট করে মক্কা থেকেও শক্তিশালী শহর গড়ে তুলবে। ব্যবসায়িক কেন্দ্র তৈরি করবে। কারণ মদিনার শক্তির সাথে যুক্ত হয়েছে মুহাম্মদ সা.-এর মতো নেতৃত্ব। সাথে আছে আব্দুর রহমান, উসমান, আবু বকর, উমার, হামজা ইত্যাদি খ্যাতিমান বীর ও ব্যবসায়ী। মুহাম্মদ সা.-এর কারণে আওস ও খাজরাজের মধ্যেকার দূরত্ব দূর হয়ে যাবে এটাও তারা অনুমান করতে সক্ষম হয়েছে। সবমিলিয়ে ইয়াসরিব মক্কার চাইতেও শক্তিমান হয়ে ওঠবে এটা তারা বুঝে নিয়েছে। আর তাছাড়া মক্কার লোকদের ব্যবসায়ের জন্য সিরিয়া ও ইরাকে যেতে হলে ইয়াসরিবের পাশ দিয়ে তাদের সাহায্য নিয়ে যেতে হয়। এটাও মক্কার দুর্বলতা ছিল।

মদিনায় ইসলামী দাওয়াতের ভিত্তি দৃঢ় হওয়া এবং মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে মদীনাবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিণাম কত মারাত্মক হতে পারে মুশরিকরা এসব আশঙ্কা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত ছিল। তারা বুঝতে পারছিল যে, সামনে কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে এ কারণে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কার্যকর প্রতিষেধক সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করলো। এ সব সমস্যার মূল নায়ক হিসেবে তারা চিহ্নিত করলো মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ সা.-কে।

অবশেষে কুরাইশ সর্দাররা তাদের পরামর্শ কক্ষ দারুন নদওয়াতে মিলিত হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন গোত্র থেকে ১৪ জন নেতা একত্রিত হয়েছিল। তারা হলো, বনু মাখযূম গোত্রের (১) আবু জাহল বিন হিশাম। বনু নওফাল বিন ‘আব্দে মানাফ গোত্রের (২) জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম (৩) তু‘আইমাহ বিন ‘আদী (৪) হারেছ বিন ‘আমের। বনু ‘আব্দে শামস বিন ‘আব্দে মানাফ গোত্রের (৫) উৎবাহ ও (৬) শায়বাহ বিন রাবী‘আহ (৭) আবু সুফিয়ান বিন হারব। বনু ‘আব্দিদ্দার গোত্রের (৮) নাযার বিন হারেছ। বনু আসাদ বিন আব্দুল ওযযা গোত্রের (৯) আবুল বাখতারী বিন হিশাম (১০) যাম‘আহ ইবনুল আসওয়াদ (১১) হাকীম বিন হেযাম। বনু সাহম গোত্রের (১২) নুবাইহ ও (১৩) মুনাবিবহ ইবনুল হাজ্জাজ। বনু জুমাহ গোত্রের (১৪) উমাইয়া বিন খালাফ

তারা যখন মিটিং-এ উপস্থিত হয়েছিল তখন ইবলিশ শয়তান একজন বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে সভাস্থলে উপস্থিত হলো। তার পরিধানে ছিল জোব্বা, প্রবেশদ্বারে তাকে দেখে লোকেরা বললো, আপনি কে? আপনাকে তো চিনতে পারলাম না। তখন শয়তান বলল, আমি নজদের অধিবাসী একজন শায়খ। আপনাদের কর্মসূচী শুনে হাজির হয়েছি, কথা শুনতে চাই, কিছু কার্যকর পরামর্শ দিতে পারব আশা করি। মুশিরক নেতারা শয়তানকে যত্ন করে সসম্মানে নিজেদের মধ্যে বসালো।

দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর নানা প্রকার প্রস্তাব পেশ করা হল, প্রথমে ইবনে আসওয়াদ প্রস্তাব করল যে, তাকে আমরা আমাদের মধ্যে থেকে বের করে দেবো, তাকে মক্কায় থাকতে দেব না। আমরা তার ব্যাপারে কোন খবরও রাখব না যে, সে কোথায় যায়? কি করে? এতেই আমরা নিরাপদে থাকতে পারবো এবং আমাদের মধ্যে আগেরে মতো সহমর্মিতা ফিরে আসবে।

শেখ নজদী রূপী শয়তান বলল, এটা কোন কাজের কথা নয়। তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, তার কথা কত উত্তম, কত মিষ্টি। তিনি সহজেই মানুষের মন জয় করেন। যদি তোমরা তার ব্যাপারে নির্বিকার থাকো তবে তিনি যে কোন আরব গোত্রে গিয়ে হাজির হবেন এবং তাদেরকে নিজের অনুসারী করার পর তোমাদের ওপর হামলা করবেন। এরপর তোমাদের শহরেই তোমাদেরকে নাস্তানাবুদ করে তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করবেন। কাজেই তোমরা অন্য কোনো প্রস্তাব চিন্তা করো।

আবুল বাখতারী বললো, তাকে লোহার শেকলে বেঁধে আটকে রাখা হোক। বাইরের থেকে দরজা বন্ধ করে একটা বন্ধ ঘরে রাখা হোক। এতে করে সেই ঘরে তার মৃত্যু হবে।

শেখ নজদী রূপী শয়তান বলল, এ প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয়, তোমরা যদি তাকে আটক করে ঘরের ভেতরে রাখো, তবে যেভাবে হোক, তার খবর তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে যাবে। এরপর তারা মিলিতভাবে তোমাদের ওপর হামলা করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। এরপর তার সহায়তার সংখ্যা বৃদ্ধি করে তোমাদের ওপর হামলা করবে। সেই হামলায় তোমাদের পরাজয় অনিবার্য। কাজেই অন্য কোন প্রস্তাব নিয়ে চিন্তা করো।

এরপর আবু জাহল প্রস্তাব উত্থাপন করলো, সে বললো, তার সম্পর্কে আমার একটিই প্রস্তাব রয়েছে। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যুবককে বাছাই করে তাদের হাতে একটি করে ধারালো তলোয়ার দেয়া হবে। এরপর সশস্ত্র শক্তিশালী যুবকরা একযোগে তাকে হত্যা করবে। এতে করে আমরা এই লোকটির হাত থেকে রেহাই পাবো। এমনিভাবে হত্যা করা হলে তাকে হত্যার দায়িত্ব সকল গোত্রের ওপর পড়বে। বনু আবদে মান্নাফ সকল গোত্রের সাথে তো যুদ্ধ করতে পারবে না, ফলে তারা হত্যার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে রাজি হবে। আমরা তখন তাদের হত্যার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবো।

শেখ নজদী রূপী শয়তান এ প্রস্তাব সমর্থন করলো। মক্কার পার্লামেন্ট এ প্রস্তাবের ওপর ঐকমত্যে উপনীত হলো। সবাই ওয়াদা করলো অবিলম্বে এ প্রস্তাব কার্যকর করা হবে।

আল্লাহর রাসূলের হিজরত
মক্কার মুশরিকদের এই ষড়যন্ত্রের খবর আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে জানিয়ে দিলেন জিব্রাঈল আ.-এর মাধ্যমে। জিব্রাঈল আ. আরো বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন, হিজরত করার সময় জানিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন আপনি আজ রাত আপনার নিজের বিছানায় শয়ন করবেন না।

এ খবর পাওয়ার পর নবী সা. ঠিক দুপুরের সময় হযরত আবু বকর রা.-এর বাড়িতে গেলেন। এই প্রসঙ্গে আয়িশা রা. বলেন, নবী সা. এসে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দেওয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর আবু বকর রা. কে বললেন, আপনার কাছে যারা রয়েছে তাদের সরিয়ে দিন। আবু বকর রা. বললেন, শুধু আপনার স্ত্রী রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন আমাকে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। এরপর তারা দুজনে হিজরতের কর্মসূচী তৈরি করলেন এবং নবী সা. নিজের ঘরে ফিরে রাত্রির অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এদিকে দারুন নদওয়ার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল সা.-কে হত্যার জন্য সমবেত হলো। তারা গভীর রাতে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছাই সফল করে থাকেন। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও সফল হতে পারেনি। মুহাম্মদ সা. তাঁর বিছানায় আলী রা.-কে রেখে বের হলেন ঘর থেকে। আর আলী রা.-কে আমানতসমূহ বুঝিয়ে গেলেন যাতে সেগুলো প্রাপকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।

এরপর মুহাম্মদ সা. বাইরে এলেন একমুঠো ধুলো নিয়ে কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপ করলেন। এতেই আল্লাহ তায়ালা তাদের সাময়িকভাবে অন্ধ করে দিলেন। তারা চোখ মুছতে লাগলো। ফলে আল্লাহর রাসূলকে তারা দেখতে পেল না। এমন সময় মুহাম্মদ সা. সূরা ইয়াছিনের ১-৯ নং আয়াত পাঠ করছিলেন।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা সূরা আনফালের ৩০ নং আয়াতে বলেন, কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা নির্বাসিত করার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন আর আল্লাহরই কৌশলীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

সন্ত্রাসীরা যখন বুঝতে পারলো আল্লাহর রাসূল সা. চলে গিয়েছেন তখন তারা মদিনার পথে রাসূল সা.কে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লো। অন্যদিকে মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা. কৌশল করে মদিনার দিকে না গিয়ে উল্টো ইয়েমেনের দিকে রওনা হলেন। তাঁদের টার্গেট ছিল মদিনার পথে যখন সন্ত্রাসীরা খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে মক্কায় ফিরে যাবে তখন তাঁরা মদিনার দিকে যাত্রা শুরু করবেন।

মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা. ইয়েমেনের দিকে ৫ মেইল অতিক্রম করে সাওর নামে এক পাহাড়ের পাদদেশে পোঁছালেন। তার সেই পাহাড়ে উঠলেন। পায়ের ছাপ গোপন করার উদ্দেশ্যে তাঁরা শুধু গোড়ালি দিয়ে হাঁটার কারনে উভয়ের পায়ই একপর্যায়ে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। সেখানে একটি গুহায় তাঁরা আশ্রয় নেন।

আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করে তা পরিষ্কার করলেন। কয়েকটি গর্ত ছিল, যেগুলো জামা ছিঁড়ে বন্ধ করলেন। দুটি গর্ত বাকি ছিল, সেগুলোতে পা চাপা দিয়ে নবী সা.-কে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। নবী সা. ভেতরে গেলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ইতোমধ্যে হযরত আবু বকর রা. কে কীসে যেন দংশন করলো। কিন্তু মুহাম্মদ সা. ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি নড়াচড়া করলেন না। বিষের কষ্টে তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। এক ফোঁটা অশ্রু নবী সা.-এর চেহারায় পড়তেই তিনি জেগে গেলেন। আবু বকর রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন কীসে যেন আমাকে দংশন করেছে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. খানিকটা থুথু নিয়ে দংশিত স্থলে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে বিষের ব্যাথা দূর হয়ে গেল। এখানে তারা তিনদিন ছিলেন।

কোরাইশদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা যখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারল যে, মুহাম্মদ তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। তখন তারা যেন উম্মাদ হয়ে গেল, প্রথমে তারা হযরত আলীর ওপর তাদের ক্রোধ প্রকাশ করলো। তাকে টেনে হিঁচড়ে কাবাঘরে নিয়ে গেল এবং কথা আদায়ের চেষ্টা করলো। কিন্তু এতে কোন লাভ হল না।

এরপর তারা হযরত আবু বকরের বাড়িতে গেলো। দরজা খুললেন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, তোমার আব্বা কোথায়? তিনি বললেন, আমি তো জানি না। এ জবাব শুনে দুর্বৃত্ত আবু জেহেল আসমাকে এত জোরে চড় দিল যে, তার কানের দুল খুলে পড়ে গেল।

এরপর কোরাইশ নেতারা এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিল যে, মুহাম্মদ এবং আবু বকরকে গ্রেফতার করার জন্য সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। মক্কা থেকে বাইরের দিকে যাওয়ার সকল পথে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করলো। সেই সাথে ঘোষণা করা হলো যে, যদি কেউ মুহাম্মদ এবং আবু বকরকে বা দুজনের একজনকে জীবিত বা মৃত হাজির করতে পারে, তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। এ ঘোষণা সর্বসাধারণ্যে প্রচারিত হবার পর চারিদিকে বহু লোক বেরিয়ে পড়লো। পায়ের চিহ্ন বিশারদরাও উভয়কে তালাশ করতে লাগলো। পাহাড়ের প্রান্তরে ও উঁচু নিচু এলাকায় সর্বত্র চষে বেড়াতে লাগলো, কিন্তু এত কিছু করেও কোন লাভ হলো না।

কেউ কেউ সাওর পর্বতেও খুঁজতে আসলো। এই প্রসঙ্গে আবু বকর (রা.) বলেন, আমি রাসূল সা.-এর সাথে গুহায় ছিলাম। মাথা তুলতেই দেখি, লোকদের পা দেখা যাচ্ছে, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! ওরা কেউ যদি একটুখানি নিচু হয়ে এদিকে তাকায় তবেই আমাদের দেখতে পারবে। নবী সা. বললেন, আবু বকর চুপ করো। আমরা এখানে দুজন নই বরং আমাদের সাথে তৃতীয় হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা।

তিনদিন এখানে থাকার পর আবু বকর রা.-এর ব্যবস্থাপনায় উট আসলো এবং তাঁরা সমুদ্র উপকূলের পাশ দিয়ে (যেখান দিয়ে সাধারণত কেউ যাতায়াত করে না) মদিনা তথা ইয়াসরিবের দিকে রওনা হলেন। প্রথমে কুবায় পৌঁছলেন। সেখানে চারদিন থাকলেন। এ সময়ে তিনি সেখানে একটি মসজিদ স্থাপন করেন যা মসজিদে কুবা নামে পরিচিত। এটি মুসলিমদের প্রথম মসজিদ। এখানে তিনি নামাজ চালু করে এরপর মদিনার দিকে আবার যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রা শুরু করার আগে তিনি তার মামার গোত্র বনু নাজ্জাহকে খবর পাঠালেন। তারা বহু মানুষ তলোয়ার সজ্জিত হয়ে আল্লাহর রাসূলের বহরে যুক্ত হলেন।

আল্লাহর রাসূল সা. ইয়াসরিবে প্রবেশ করলে সেখানের অধিবাসী মুসলিমরা তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেন। ইয়াসরিববাসীরা ধনী ছিলেন না, কিন্তু সবাই চাচ্ছিলেন যে, নবী সা. যেন তার বাড়িতেই অবস্থান করেন। এই অবস্থা দেখে নবী সা. বললেন, উটনীর পথ ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর তরফ থেকে আদেশ পেয়েছে। এরপর উটনী ইচ্ছামত চলতে লাগলো এবং বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী রয়েছে সেখানে গিয়ে থামলো।

নবী সা. উটনী থেকে নামলেন না। উটনী সামনে কিছুদূরে এগিয়ে গেলো। এরপর পুনরায় ঘুরে আগের জায়গায় ফিরে এসে বসে পড়লো। এটা ছিল আবু আইয়ুব আনসারী রা.-এর ঘরের কাছে। তিনি সেখানে বিশ্রাম করলেন। আল্লাহর রাসূল সা. নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে চলে আসলেন। তিনি প্রথমে রাষ্ট্রের নাম নির্ধারণ করলেন মদিনাতুন্নবি অর্থাৎ নবীর শহর। সেদিন থেকে ইয়াসরিব ও আশপাশের এলাকার নাম হয়ে গেল মদিনাতুন্নবী সংক্ষেপে মদিনা।

এই সময়ে মুহাম্মদ সা. এর ওপর নাজিল হয় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের জন্য নির্দেশনা। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রা এমন সব লোক যাদেরকে আমি যদি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে এরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ নিষেধ করবে। আর সমস্ত বিষয়ের পরিণাম আল্লাহর হাতে।

১৮ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১৩ - দ্বীন প্রতিষ্ঠার বাইয়াত ও শয়তানের চিৎকার



মিরাজে আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে রাষ্ট্র পরিচালনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এবং সে অনুযায়ী মুসলিমদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম সালাত ফরজ করেছেন। সেই সাথে মুসলিমদের উদ্দেশে ১৪ দফা নির্দেশনা নাজিল করেছিলেন। মিরাজের পর আল্লহর রাসূলের জীবনে একের পর এক সাফল্য ধরা দিতে থাকে।

নিশ্চয়ই কষ্টের পরই আছে স্বস্তি। আল্লাহর রাসূল সা. প্রায় ৩ বছর অবরুদ্ধ ছিলেন। বের হয়েই গেলেন তায়েফে। সেখানে চরম মার খেলেন, যেটা তাঁর জীবনে সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা। এরপর মক্কার বাইরে অনেক গোত্রকে দাওয়াত দিয়েছেন, কোনো গোত্রই সাড়া দেয়নি। এরপর আল্লাহ মুহাম্মদ সা.-কে পরীক্ষার পুরস্কার স্বরূপ দিলেন মিরাজ। এরপর থেকে আল্লাহর রাসূল সা. পৃথিবীর নেতা হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করলেন। আর এই পথে হাঁটার সুযোগ হয় মদিনাবাসীদের মাধ্যমে।

বর্তমান মদীনার পূর্ব নাম ছিল ইয়াসরিব। ইয়াসরিবের দু’টি বড় গোত্র ছিল আওস ও খাজরাজ। তারা পরস্পরে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। ইয়াসরিবের এ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগে তিনটি ইহুদি গোত্র ইয়াসরিবের কিছু অংশ দখল করে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ইয়াসরিববাসী আওস ও খাজরাজ ইহুদীদের বহিরাগত বলে অপছন্দ করতো। আবার একে অপরকে দমাতে ইহুদিদের সাহায্য গ্রহণ করতো।

অন্যদিকে ইহুদিরা নিজেদেরকে আসমানী গ্রন্থের অনুসারী বলে দাবি করতো এবং তাদের তাওরাত কিতাবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তারা শেষ নবী ও বিশ্বনবীর জন্য অপেক্ষা করছিল। শেষনবীর আবির্ভাব ঘটলে তাঁর দ্বীনে শামিল হয়ে সারা বিশ্বের ওপর তারা আধিপত্য বিস্তার করবে বলে ইয়াসরিববাসীদেরকে হুমকি দিত এবং শেষ নবীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে বলেও তারা বলাবলি করত। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সূত্রে মহানবী সা.-এর মক্কায় আবির্ভাব ও ইসলাম প্রচারের বার্তা ইয়াসরিবে পৌঁছে গিয়েছিল। ইহুদিরা ভেবেছিল তাদের বংশ থেকেই কেউ নবী হবে। কারণ তাদের বংশেই বেশিরভাগ নবী এসেছিল। কিন্তু মুহাম্মদ মক্কায় কুরাইশ বংশে আসায় তারা তা মেনে নেয় নি। যদিও তারা বুঝেছিল ইনিই তাদের কাঙ্ক্ষিত শেষ নবী।

মিরাজের আগে নবুয়্যতের ১১তম বছরে ৬২০ সালে হজ্জের সময় প্রতিবারের মতোই আল্লাহর রাসূল সা.-এর দাওয়াতী কাজে বাধা সৃষ্টি করছিলো। মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল সা.-কে অবিশ্বাস করা এবং লোকদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো তা থেকে পরিত্রাণ পেতে রাসূল সা. কৌশলের আশ্রয় নেন। এসময় তিনি রাত্রিকালে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন।

রাত্রিকালীন দাওয়াতের একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সা. আবু বকর ও আলী রা.কে সঙ্গে নিয়ে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রের লোকদের তাঁবুতে গিয়ে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। জবাবে তারা আশাব্যঞ্জক কথা বলে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন সাড়া দেয়নি। এরপর মুহাম্মদ সা. মিনার পাহাড়ী এলাকা অতিক্রমের সময় কয়েকজন লোককে আলাপ করতে শোনেন। তারা ইহুদিদের থেকে শোনা শেষ নবী নিয়ে আলোচনা করছিল। এরা ছিলো মদিনার খাজরাজ গোত্রের ছয়জন যুবক।

রাসূলুল্লাহ সা. তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললো, আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক, রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ইহুদীদের প্রতিপক্ষ? তারা বলল, হ্যাঁ। আল্লাহর রাসূল সা. বললেন, তোমরা একটু বসো। আমি কিছু কথা বলি, তারা বসলো। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিলেন। সেই ছয়জন যুবক পরস্পরকে বললো, এই তো মনে হয় সেই নবী, যার কথা উল্লেখ করে ইহুদিরা আমাদের ধমক দিয়ে থাকে। ইহুদীরা যেন আমাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার না করতে পারে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর সেই ছয় ভাগ্যবান যুবক রাসূলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

এই ছয়জন ছিলেন মদিনার বিবেকসম্পন্ন মানুষ। এই ছয়জন মুসলিম মদিনায় ফিরে যাওয়ার সময় ইসলামের দাওয়াত সাথে নিয়ে গেলেন। এদের মাধ্যমে মদিনার ঘরে ঘরে রাসূলুল্লাহ সা.-এর আবির্ভাব ও দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়লো। এরপর রাসূল সা.-এর জীবনে মিরাজের ঘটনা ঘটলো।

এর পরের বছর আবার হজ্বের সময় আসলো। ইয়াসরিবের যে ছয়জন মানুষ ইসলাম গ্রহন করেছিলেন তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেদের গোত্রে ফিরে গিয়ে নবী সা.-এর রিসালাত ও ইসলামের তাবলীগ করবেন। তারা তাদের ওয়াদা পালন করেন। অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এরমধ্যে আগের ৫ জন সহ ১২ জন লোক রাসূল সা.-এর সাথে দেখা করতে আসেন।

এরা সবাই মিনায় আকাবার কাছে আল্লাহর রাসূলের সাথে দেখা করেন। মুহাম্মদ সা. তাদের স্বাগত জানান। সেখানে তারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে ছয়টি বিষয়ে বাইয়াত বা শপথ করেন।

(১) আমরা একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করব।
(২) আমরা ব্যভিচারে লিপ্ত হব না।
(৩) আমরা চুরি-ডাকাতি বা কোনোরূপ পরস্ব আত্মসাৎ করব না।
(৪) আমরা সন্তান হত্যা বা বলিদান করব না।
(৫) কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ বা দোষারোপ করব না।
(৬) প্রত্যেক সৎকাজে আল্লাহর রাসুলকে মেনে চলব এবং কোনো ন্যায় কাজে তার অবাধ্য হব না।

এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক শপথ বা বাইয়াত। এই বাইয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সা.-কে নেতা হিসেবে মানা, তার আনুগত্য করা ও ভবিষ্যত ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই বাইয়াত যখন হয় তখন আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে কোন ভূমি বা রাষ্ট্র ছিল না। তবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল। এই বাইয়াত 'বাইয়াতে আকাবা উলা' বা আকাবার ১ম শপথ নামে পরিচিত। এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয় গোপনে।

বাইয়াত শেষ হয়ে গেলো এবং হজ্জ ও শেষ হলো। বাইয়াতকারীরা মদিনায় ফিরে যাওয়ার সময় তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সা. তাদের সাথে তাঁর একজন দূত প্রেরণ করেন। মুহাম্মদ সা. আগত লোকদের সাথে মদিনায় তার প্রথম দূত মুসয়াব বিন উমাইর রা.-কে পাঠালেন। মদিনার মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষা প্রদান এবং যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানই ছিল এ এই দূত প্রেরণের উদ্দেশ্য। মুসয়াব বিন উমাইর রা. মদিনায় পৌঁছে হযরত আসআদ ইবনে যুরারা রা.-এর ঘরে অবস্থান করেন। এরপর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উভয়ে মদীনাবাসীদের ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এ সময় হযরত মুসয়াব মুকরিউন উপাধি লাভ করেন এর অর্থ শিক্ষক বা মুয়াল্লিম।

এরপরের বছর আবার হজ্বের সময় আসলো। এটি ছিল নবুয়তের ১৩ তম বছর। মদিনা থেকে ৭০ জন মুসলমান হজ্ব পালনের জন্য মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় পৌঁছার পর গোপনে তারা প্রিয় রাসূল সা.-এর সাথে গোপনে যোগাযোগ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো ১২ জিলহজ্জ তারিখে মিনার আকাবায় একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তবে বিষয়টা থাকবে গোপন নাহলে মক্কার কুরাইশরা ঝামেলা করবে। এই সম্মেলন ইসলাম ও মূর্তিপূজার সংঘাতের মধ্যে সময়ের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিল। একজন আনসার নেতার মুখে সেই সম্মেলনের কথা শুনি।

কাব ইবনে মালিক রা. বলেন, //আমরা হজ্জ এর জন্যে এসেছিলাম মক্কায়। প্রিয় নবী আইয়ামে তাশরিকের মাঝে আকাবায় আমাদের সাথে কথা বলার সময় নির্ধারণ করলেন। অবশেষে সেই রাত এলো। সেই রাতে আমরা নিয়ম অনুযায়ী আমাদের তাঁবুতে শুয়ে পড়লাম রাতের এক তৃতীয়াংশ কেটে যাওয়ার পর আল্লাহর রাসূলের সাথে পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় মিলিত হলাম। চড়ুই পাখী যেমন চুপিসারে তার বাসা থেকে বের হয়, আমরাও ঠিক সেভাবেই তাঁবু থেকে বের হয়েছিলাম। এক সময় আমরা আকাবায় সমবেত হলাম সংখ্যায় ছিলাম আমরা ৭৫ জন। ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন মহিলা। আমরা সবাই ঘাঁটিতে পৌঁছে প্রিয় রাসূল সা.-এর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একসময় তিনি এসে পৌঁছলেন। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব।

সম্মেলন শুরু হলো। দ্বীনি এবং সামরিক সহায়তাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আলোচনা হচ্ছিল। আব্বাস রা. প্রথমে কথা বললেন, তিনি চাচ্ছিলেন যে, পরিস্থিতির আলোকে দায়িত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে। তিনি আমাদের উদ্দেশে বলেন, মুহাম্মদ সা. এর যে মূল্য ও মর্যাদা রয়েছে সেটা তোমরা জানো। আমাদের কওমের মধ্যে মুহাম্মাদ প্রবর্তিত ধর্ম বিশ্বাস যারা সমর্থন করে না, মুহাম্মাদকে তাদের কাছ থেকে আমরা দূরে রেখেছি। তিনি নিজ শহরে স্বজাতীয়দের মধ্যে তিনি নিরাপদ রয়েছেন। তিনি বর্তমানে তোমাদের কাছে যেতে চান, তোমাদের সাথে মিশতে চান যদি তোমরা তার নিরাপত্তা দিতে এবং বিরোধী পক্ষের হামলা থেকে তাকে হেফাজত করতে পারো।

তোমরা যদি তাঁর নিরাপত্তা দিতে পারো তবে আমার কিছু বলার নেই। তোমরা যে দায়িত্ব নিয়েছ সে সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো। কিন্তু যদি তাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করে থাকো, তবে এখনই চলে যাও, কেননা তিনি স্বাজাতীয়দের মধ্যে নিজ শহরে নিরাপদেই আছেন, তার সম্মানও এখানে রয়েছে।

আমরা তখন আব্বাসকে বললাম যে, আপনার কথা আমরা শুনেছি এবং আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এরপর মুহাম্মদ সা.কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এবার আপনি কথা বলুন। আপনি নিজের এবং আপনার প্রতিপালকের জন্য আমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নিতে চান তাই নিন। এরপর মুহাম্মদ সা. কুরআন পাঠ করলেন। আমাদের আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহবান জানালেন। এরপর তিনি আমাদের বাইয়াত গ্রহণ করলেন ৫ টি বিষয়ের ওপরে।

১. ভালোমন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে।
২. সচ্ছলতা অস্বচ্ছলতা উভয় অবস্থায়ই ধন সম্পদ ব্যয় করবে।
৩. সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
৪. আল্লাহর পথে উঠে দাঁড়াবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কারো ভয়ভীতি প্রদর্শনে পিছিয়ে যাবে না।
৫. তোমাদের কাছে যাওয়ার পর আমাকে সাহায্য করবে এবং নিজেদের প্রাণ ও সন্তানদের হেফাজতের মতোই আমার হেফাজত করবে এতে তোমাদের জন্যে জান্নাত রয়েছে

আমরা আল্লাহর রাসূল সা.-এর সাথে কথা বলছিলাম তখন আমাদের মধ্যেকার আবুল তায়াহাল ইবনে তাইহান বললেন, হে রাসূল! ইহুদিদের সাথে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে আমরা তার রজ্জু কেটে ফেলবো। আমরা ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। এরপর আল্লাহ তায়ালা আপনাকে জয়যুক্ত করলে আপনি আমাদের ছেড়ে স্বজাতীয়দের কাছে ফিরে আসবেন না তো?

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. মৃদু হেসে বললেন। না! তা হবে না। তোমাদের রক্ত আমার রক্ত এবং তোমাদের ধ্বংস আমার ধ্বংস হিসেবে গণ্য হবে। আমি তোমাদের অন্তর্ভুক্ত আর তোমরা আমার অন্তর্ভুক্ত। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো। তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করবো।//

এখানে মদিনাবাসী ইসলাম প্রতিষ্ঠার বাইয়াতের বিনিময়ে আল্লাহর রাসূল সা. এর পক্ষ থেকে জান্নাতের ওয়াদা নিলেন। একইসাথে এই ওয়াদাও নিলেন যে, বিজয় অর্জিত হওয়ার পর মুহাম্মদ সা. মদিনাবাসীদের ছেড়ে যাবে না। তিনি মদিনাতেই থাকবেন। বাইয়াত সমাপ্ত হলে সবাই নতুনভাবে উজ্জীবিত হন এবং মুহাম্মদ সা.-এর সাথে হাত মিলান। তবে দুজন মহিলার সাথে মুহাম্মদ সা. হাত মিলান নি।

এরপর মুহাম্মদ সা. মদিনার জন্য নকীব নির্বাচন করার জন্য সিদ্ধান্ত জানালেন। এরা হবে তাদের কওমের নকীব। তাদের দায়িত্ব হবে বাইয়াতের শর্তাবলী নিজ নিজ কওমের লোকদের দ্বারা পূরণ করানো। প্রিয় নবী উপস্থিত লোকদের বললেন, বারোজনের নাম জানাতে। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই ১২ জন নকীব মনোনীত করলেন। এদের মধ্যে ৯ জন খাজরাজ ও ৩ জন আওস গোত্রের ছিলেন।

(১) আসাদ ইবনে যুরারা (২) সাদ ইবনে রাবী (৩) আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (৪) রাফে ইবনে মালিক (৫) বারা ইবনে মারুর (৬) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (৭) উবাদা ইবনে সামিত (৮) সা’দ ইবনে উবাদা (৯) মুনযির ইবনে আমর ইবনে খুনাইস (১০) উসাইদ ইবনে খুদাইর (১১) সাদ ইবনে খায়সামা (১২) আবুল হাইসাম ইবনে তাইহান

১২ জন নকীব নিযুক্ত হওয়ার পর তাদর কাছ থেকে রাসূল সা. পুনরায় আরো একটি অঙ্গীকার নিলেন কারণ এরা ছিলেন অধিক দায়িত্বশীল। তিনি বললেন আপনারা স্বজাতীয়দের সকল বিষয়েরই জন্যেই দায়িত্বশীল ও জিম্মাদার, হাওয়ারিয়া (১২ জন)। হযরত ঈসা আ. এর পক্ষ থেকে যেমন দায়িত্বশীল ও জিম্মাদার ছিলেন, আপনারাও ঠিক তেমনি আমি মুসলমানদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ও জিম্মাদার। তারা সবাই সমস্বরে বললেন, জ্বী হ্যাঁ।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তথা দ্বীন কায়েমের জন্য এই বাইয়াতের ঘটনা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি আকাবার ২য় শপথ নামে পরিচিত। ইকামাতে দ্বীনের জন্য বাইয়াতের ঘটনা ঘটবে আর শয়তান চুপ থাকবে তা তো হতে পারে না। ইকামাতে দ্বীনের অগ্রগতি ও মদিনার মুসলিমদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শপথ দেখে ইবলিশ শয়তানের মাথা খারাপ হয়ে গেল। সে চিৎকার করতে শুরু করলো। একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সে উচ্চস্বরে বললো, মিনাবাসীরা মোহাম্মাদকে দেখো, বে-দ্বীন লোকেরা এখন তার সঙ্গে রয়েছে। তোমাদের সাথে লড়াই করার জন্য তারা একত্রিত হয়েছে।

তার চিৎকার শুনে মুহাম্মদ সা. আর সেখানে থাকলেন না। সবাইকে বললেন, আপনারা যারা যার তাঁবুতে ফিরে যান। সবাই যার যার স্থানে ফিরে গেল ও ঘুমিয়ে পড়ার ভান করলো। শয়তানের চিৎকার মুশরিকরা শুনতে পেয়েছে। এ খবর পেয়ে তারাও দিশেহারা হয়ে পড়লো। কেননা এ ধরনের বাইয়াতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে তারা অবহিত ছিল। পরদিন সকালে কোরাইশদের একদল বিশিষ্ট লোক মদীনাবাসী আগন্তুকদের তাঁবুর সামনে গিয়ে গত রাতের সম্মেলনের এবং বাইয়াতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলো। তারা বললো, ওহে খাজরাজের লোকেরা আমরা শুনলাম তোমরা আমাদের এই লোককে আমাদের কাছ থেকে বের করে নিয়ে যেতে চাও। তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে তার হাতে বাইয়াত করেছ। অথচ তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা আমরা পছন্দ করি না।

মক্কার কোরাইশরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করার পর মদিনা থেকে আসা অমুসলিম হাজীরা অস্বীকার করলো। আসলে তারা তো বিষয়টা জানেই না। তারা বলল, তোমাদের কথা ঠিক নয়। তারা কসম করে বলল, এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে না। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এই ব্যাপারে কিছুই জানতো না। সে ছিল খাজরাজদের নেতা। সে বললো, আমার কওমের লোকেরা আমাকে বাদ দিয়ে এত বড় কাজ করবে, এটাতো চিন্তাই করা যায় না। আমি তো এখন মক্কায়। যদি আমি ইয়াসরিবে থাকতাম, তবুও তারা আমার সাথে পরামর্শ না করে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করতো না।

সম্মেলন এবং বাইয়াত রাতের আঁধারে ও গোপনে হওয়ায় মদিনার বাকী লোকেরা কিছুই জানতো। তাদের প্রতিবাদের মুখে মক্কার কুরাইশ নেতারা বুঝলো যে, আশঙ্কা করার মত কিছুই আসলে ঘটেনি। অবশেষে তারা হতাশ হয়ে ফিরে গেল। মক্কায় কুরাইশ নেতারা এ বিশ্বাসের সাথে ফিরে এলো যে, তারা যা শুনেছে, সেটা সত্য নয়। তবে যেহেতু সন্দেহ ছিল, এ জন্যে তারা তথ্য সংগ্রহের জন্য অধীর হয়ে উঠলো, শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারল যে, ঘটনা সত্য, বাইয়াতের ঘটনা আসলেই ঘটেছে। নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে। কিন্তু এ খবর নিশ্চিতভাবে যখন তারা পেল তখন মদিনার হজ্জ যাত্রীরা রওয়ানা হয়ে গেছেন।

কিছুসংখ্যক অমুসলিম মদিনায় যাত্রীদের পিছু ধাওয়া করল, কিন্তু সুযোগ ততক্ষণে হাতছাড়া হয়ে গেছে। দ্রুতগামী ঘোড় সওয়াররা সাদ ইবনে উবাদা এবং মুনজির ইবনে আমরকে দেখতে পেলো। মুনজির দ্রুত এগিয়ে গেলেন, কিন্তু সাদ ধরা পড়লেন। তাঁকে মক্কায় বেঁধে নিয়ে আসা হলো। তাকে ভীষণ প্রহার কার হলো। মক্কায় নেয়ার পর মুতয়াম ইবনে আদী এবং হারিস ইবনে হবর উমাইয়া তাকে ছাড়িয়ে দিলেন। কেননা এই দুজনের বাণিজ্য কাফেলা মদিনায় সাদ ইবনে উবাদার তত্ত্বাবধানে যাতায়াত করতো।

এদিকে মদিনায় হজ্জ যাত্রীরা তাদের সফরসঙ্গী সাদ ইবনে উবাদার গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তারা মক্কায় ফিরে গিয়ে কুরাইশদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু মক্কার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই তারা লক্ষ্য করলেন যে, সাদ ইবনে উবাদা ফিরে আসছেন। এরপর কাফেলার সবাই নিরাপদে রওয়ানা হয়ে নিরাপদে মদিনা পৌঁছলেন। দ্বীন কায়েমের জন্য মদিনার মুসলিমরা যে শপথ নিয়েছিলেন তা দ্বীন কায়েমের গতি তরান্বিত করেছে। যেসব জনপদে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত নেই সেসব জনপদের মুসলিমদের দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাইয়াত নেওয়া অত্যাবশ্যকীয়। আর যেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ও বৈধ শাসক ক্ষমতায় থাকে সেখানে শাসকের আনুগত্যের বাইয়াত নেওয়া অত্যাবশ্যকীয়।

জেনে রাখবেন বাইয়াতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি বাইয়াতের বন্ধন ছাড়াই মৃত্যুবরণ করলো, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করলো।