২৬ অক্টোবর, ২০২১

সুদান সংকটের আদ্যোপান্ত


গতকাল সুদানের রাজধানী খার্তুমে ছিল কেবল ধোঁয়া, আগুন, বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। প্রধানমন্ত্রীসহ পাঁচজন মন্ত্রী আটক। ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ। জনগণ রাস্তায়, বিক্ষোভ করছে! এক বিভীষিকাময় অবস্থা!

সুদানের এই সংকট একদিনের নয়। বহু আগ থেকে ব্রিটিশরা এই সংকটের গোড়াপত্তনকারী। আর এখন আমেরিকা এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করে যাচ্ছে।

সুদান আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মিশরের দক্ষিণে এর অবস্থান। ১৮২০ সালে উসমানীয় শাসনের অধীনে আসে পুরো সুদান। উসমানীয়দের মিশরিয় গভর্নর ছিলেন মুহাম্মদ আলী পাশা। তার নেতৃত্বে সুদান উসমানীয় সাম্রাজ্যে যুক্ত হওয়ার পর উসমানীয় সুলতান মাহমুদ সানি আলী পাশার ছেলে তরুণ সেনানায়ক ইসমাঈল পাশাকে সুদানের গভর্নর করেন।

ইসমাঈল পাশার ছেলে তৌফিক ব্রিটিশদের সাথে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে পড়ে। সুদানের পাশাপাশি মিশরেও ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৮৭০ সালে মিশরে ব্রিটিশদের পরোক্ষ শাসন শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৯ সালে সুদানের শাসক ইসমাঈল পাশাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে তারই ছেলে তৌফিক। তৌফিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সেনাবাহিনী ও জনগণের একাংশ। তৌফিক ব্রিটিশদের সাহায্য কামনা করে। এভাবে ব্রিটিশ সৈন্যরা উসমানীয় শাসনে বিনাবাধায় ঢুকে পড়ে।

এ সুযোগে ব্রিটিশরা সুদান তো দখলে নিয়েই আসে তদুপরি ১৮৮২ সালে মিশরও দখল করে নেয়। এরপর সুদানে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। এতে নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ। ১৮৮৫ সালে সুদানে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল গর্ডনের পতন হয়। সুদান থেকে প্রত্যাহার করা হয় মিশরীয় ও ব্রিটিশ সৈন্য।

জিহাদি চেতনায় জনগণকে সংগঠিত করে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিপ্লব সাধন করেন। ক্ষমতায় আরোহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি মারা যান। এরপর ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। আশেপাশে উসমানীয় অঞ্চল না থাকায় তারা কারো সাহায্য পায়নি। তবে সুদানে তারা যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেন। সুদানের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রতিবেশি ছিল খ্রিস্টান রাষ্ট্র ইথিওপিয়া। ইথিওপিয়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে খ্রিস্টানরা সুদানে এসে দক্ষিণ সুদানের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে এসেছিল ব্রিটিশদের সহায়তায়।

আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে ইথিওপিয়া থেকে আক্রমণের হুমকি শুরু হয়েছিল। ফলে আব্দুল্লাহ ১৮৮৭ সালে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে ইথিওপিয়ায় অভিযান চালায় এবং সীমান্তবর্তী বহু অঞ্চল দখলে নিয়ে আসেন। এর দুই বছর পর ১৮৮৯ সালে তিনি মিসরেও অভিযান চালায়। তবে মিসর অভিযানে তিনি ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হন। ১৮৯৩ সালে বেলজিয়াম ও ইতালিয়ানদের সহায়তায় ইথিওপিয়া তার দেশ থেকে থেকে সুদানিদের হটাতে সক্ষম হয়।

১৯৯০ সাল থেকে ব্রিটিশরা নানানভাবে সুদানে বার বার আক্রমণ চালিয়ে আসছিলো। অবশেষে বহু চেষ্টার পর ব্রিটিশরা ১৮৯৯ সালে আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে থাকা সুদানিদের পরাজিত করে। এরপর সুদান ব্রিটিশদের কলোনি হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯২৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা সুদানকে দু’টি ভাগে ভাগ করে শাসন করত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্য থেকে গভর্নর করতো এবং দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে গভর্নর করতো। ধীরে ধীরে ইথিওপিয়া থেকে খ্রিস্টানরা এসে দক্ষিণ সুদানের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করতে শুরু করলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সংখ্যালঘুতে পরিণত হলো। সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সংখ্যাগুরুতে পরিণত হতে থাকে।

ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই মিশরীয়রা দাবি করতে থাকে, মিশর ও সুদান এক রাষ্ট্র হবে। কিন্তু সুদানের নেতারা কোনোভাবেই মিশরের অধীনে যেতে রাজি ছিল না। এদিকে এই সমস্যা সমাধান হতে দেরি হওয়ায় মিশরের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতে থাকে। ফলে মিশরের রাজনীতিবিদরা সুদানের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি হয় এবং স্বাধীনতাকে তরাণ্বিত করে। ১৯৫৪ সালে মিশরীয়রা ব্রিটিশদের সাথে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুসারে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান স্বাধীনতা লাভ করে। ইসমাইল আল আজহারি সুদানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক সুদানের প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দেন।

তবে স্বাধীনতার এক বছর আগে ১৯৫৫ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের আশঙ্কা, স্বাধীন সুদানে নেতৃত্ব দেবে উত্তরের মুসলমান জনগোষ্ঠী। কারণ উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের সাথে মিশরসহ আরব বিশ্বের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুদানের দক্ষিণাঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করে ব্রিটিশরা। কিন্তু মুসলিমরা এটা মেনে নেয়নি। এই সমস্যা নিয়ে প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সুদানে।

এরপর নানান পক্ষ তৈরি হয় সুদানে এবং মারাত্মক গোলযোগ শুরু হয়। ১৯৫৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলে। ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন ওমর আল বশির একদল সামরিক কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। তিনি দেশটিতে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন এবং ইসলামি আইন চালু করেন। তার এই ঘোষণায় বেশিরভাগ মুসলিম যোদ্ধা তার আনুগত্য স্বীকার করে। তিনি সুদানে সুদ নিষিদ্ধ করেন। যে তিনটি রাষ্ট্রে সুদ নিষিদ্ধ এর মধ্যে সুদান একটি। বাকি দুইটি হলো ইরান ও পাকিস্তান।

পাঁচ বছরের মধ্যেই ওমর আল বশির পুরো সুদানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সুদানের প্রেসিডেন্ট হন ওমর আল বশির। একমাত্র প্রার্থী ছিলেন তিনি নিজেই। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। ওমর আল বশির ইসলামী আইন প্রচলন করলেও তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণ কিংবা শুরার তোয়াক্কা করতেন না। বলা যায় তিনি স্বৈরাচার ছিলেন। দেশের জনগণের সাপোর্ট না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি পশ্চিমাদের কাছে জিম্মি হয়ে যান।

আমেরিকার ইন্ধনে ও অস্ত্র সহায়তায় ২০০৩ সালে দারফুরের মুসলিমরা ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ওমর আল বশির আমেরিকার কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়নি। এছাড়াও সংকটের মূলে রয়েছে জাতিগত বিভেদ। ফুর, জাঘাওয়া ও মাসালিত এই তিন উপজাতি মিলে দারফুর লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করেন। সুদান সরকার দারফুরে থাকা আরেক যাযাবর উপজাতি জানজাউইদের সহায়তায় বিদ্রোহ খুব কঠোরভাবে দমন করেন। এই বিষয় নিয়ে ওমর আল বশির আন্তর্জাতিকভাবে বিপদে পড়ে যায়। দারফুর সমস্যা নিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চাদ সুদানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

দারফুরের বিপদকে পুঁজি আমেরিকা পুরাতন সমস্যা দক্ষিণ সুদানকে স্বাধীন করার প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারিতে ওমর আল বশির দক্ষিণ সুদানের নেতাদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। "কমপ্রিহেনসিভ পিস এগ্রিমেন্ট" চুক্তি অনুসারে চুক্তির পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চল স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে এবং স্বাধীনতার জন্য ছয় বছর পর গণভোট হবে। কিন্তু চুক্তির পর দক্ষিণের এক নেতা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ দেশটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ বাহিনী মোতায়েনের বিরোধিতা করেন প্রেসিডেন্ট বশির। কিন্তু তার কিছু করার ছিল না।

২০০৯ সালে দারফুরে গণহত্যার অভিযোগ এনে ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তার সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে। ২০১১ সালে জানুয়ারিতে স্বাধীনতা ইস্যুতে দক্ষিণ সুদানে গণভোট হয় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। ৯৮% ভোট পড়ে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে। ২০১১ সালের ৯ জুলাই দক্ষিণ সুদান একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হয়।

২০১১ সালের পর থেকে সুদানের আর্থিক অবস্থা দিন দিন খুব খারাপ হতে থাকে। দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ায় ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিতে থাকে রাজনীতিবিদ ও জনগণ।

২০১৮ সালে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরকম বিক্ষোভ গত তিরিশবছরে দেখেনি সুদান।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি এক বছর মেয়াদি জরুরি অবস্থা জারি করেন ওমর আল বশির। তার মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং দেশের সব স্টেট সরকারের গভর্নরদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সুদানে তিন দশক ধরে দায়িত্ব পালন করা ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালের এপ্রিলে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়৷ এর তিন মাস পর দেশ পরিচালনায় সামরিক ও রাজনৈতিক দলের নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছিল৷ ২০২৩ সাল শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন আয়োজনের কথা ছিল তাদের৷ অন্তবর্তী সরকারে থাকা সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের মধ্যেকার দন্দ্ব গত দুই বছর ধরেই চলে আসছে।

এর প্রেক্ষিতে গতকাল অভ্যুত্থান হয়েছে সুদানে। এখনো ঘটনা পরিষ্কার নয় কারা খার্তুমের দখল নিয়েছে। ধারণা করা যায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। তবে অনেকেই ধারণা করছেন ওমর আল বশিরের অনুগত পদচ্যুত সেনারাই এই অভ্যুত্থানে জড়িত।

২২ অক্টোবর, ২০২১

খাদিজা রা. ও মুহাম্মদ সা.-এর বিয়ে


খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি লোকজনকে নির্দিষ্ট বেতনে ও লভ্যাংশের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে নিয়োগ করতেন। ব্যবসায়ী গোত্র হিসেবে কুরাইশদের নাম-ডাক ছিল। মুহাম্মদ সা.-এর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক মহত্ত্বের কথা জানতে পেরে তিনি তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁর পণ্যসামগ্যী নিয়ে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বললেন যে, এজন্য তিনি অন্যদেরকে যা গিয়ে থাকেন তার চেয়ে উত্তম সম্মানী তাঁকে দেবেন। মাইসারাহ নামক এক গোলামকেও তাঁর সাহায্যের জন্য সঙ্গে দিতে চাইলেন। মুহাম্মদ সা. এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং খাদীজার পণ্য সামগ্রী ও দাস মাইসারাহকে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন।

সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি জনৈক খ্রিস্টান ধর্মযাজকের গীর্জার নিকটবর্তী এক গাছের নীচে বিশ্রাম করলেন। মুহাম্মদ সা.-এর নিকট নবুয়ত আসার আগে খ্রিস্টানরাই ছিল মুসলিম। ধর্মযাজক মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছটির নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি কে?” মাইসারাহ বললেন, “তিনি হারামের অধিবাসী একজন কুরাইশ বংশীয় ব্যক্তি।” ধর্মযাজক কললেন, “তিনি শেষ নবী ছাড়া আর কেউ নন!”

মুহাম্মদ সা. তাঁর আনীত পণ্য বিক্রি করে দিলেন এবং নতুন কিছু জিনিস ক্রয় করলেন। অতঃপর তিনি মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। পথে যেখানেই দুপুর হয় এবং প্রচণ্ড রৌদ্র ওঠে, মাইসারাহ দেখতে পায় যে, একটি ছায়া তাদেরকে রৌদ্র থেকে রক্ষা করেছে। মক্কায় পৌঁছে মুহাম্মদ সা. খাদিজাকে তাঁর পণ্যদ্রব্য ও অর্থ বুঝিয়ে দিলেন। প্রায় দ্বিগুণ লাভ হলো খাদিজার। খাদিজা এত লাভ দেখে অবাক হলেন। মাইসারাহ খাদিজাকে যাজকের বক্তব্য ও মুহাম্মদ সা.-কে ছায়াদানের বিষয় অবহিত করলেন।

খাদীজা ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বুদ্ধিমতি ও সম্ভ্রান্ত মহিলা। মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এসব শুনে মনে মনে তাঁকে পছন্দ করে ফেললেন। এর আগে বড় বড় সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। মনের গোপন ইচ্ছার কথা খাদিজা রা. তাঁর বান্ধবী নাফিসার কাছে ব্যক্ত করলেন। নাফিসা গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে কথা বললেন। মুহাম্মদ সা. তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করলেন।

তাঁর চাচারা এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলেন। চাচা হামজা রা. খাদিজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদের সাথে আলোচনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। এরপর ২০ টি উট মোহরানা ধার্য হয়ে বিয়ে হলো। এ বিয়েতে বনি হাশেম এবং মুজার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষ করে ফিরে আসার দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

মুহাম্মদ সা.-এর সাথে খাদিজা রা.-এর বিয়ের সময় বয়স কত ছিল তা নিয়ে দু'টি মত রয়েছে। একটি মতামত হচ্ছে মশহুর মানে প্রসিদ্ধ, আর সেটা হলো ৪০ বছর। অন্যটি অপ্রসিদ্ধ তবে অধিকতর সঠিক, আর সেটা হলো ২৭/২৮। ইসলামের ১ম গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে বিয়ের সময় তাঁর বয়স ২৭/২৮ ছিল।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য সেটা হলো যারা সীরাত রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে দুটি দল রয়েছে। একদল মুহাম্মদ সা.-এর ব্যাপারে আবেগাক্রান্ত হয়ে সীরাত রচনা করেছেন। অন্য দল যুক্তি ও দলিলের নিরিখে ইতিহাস রচনা করেছেন। ১ম দল খাদিজা রা.-এর বিয়ে নিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর মহানুভবতা ফুটিয়ে তুলতে চান। তারা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেন মুহাম্মদ সা. বয়স্ক খাদিজা রা.-কে বিয়ে করে তাঁর প্রতি করুণা করেছেন।

কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়, বরং উল্টো। দুইবারের বিধবা খাদিজা রা.-কে বিয়ে করার জন্য মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী মানুষ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু খাদিজা রা. সবাইকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। বরং মক্কার মানুষ অবাক হয়েছে মুহাম্মদ সা.-এর মতো দরিদ্র যুবককে তিনি বিয়ে করেছেন বলে। ২য় দল নানানভাবে গবেষণা করে তাঁর বয়স ২৭/২৮ বলেছেন। আলেমগণ এই মতামতকে অধিকতর সহীহ বলে জানিয়েছেন।

নবুয়তের তিন বছর পর খাদিজা রা.-এর সবশেষ সন্তান আব্দুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। যদি খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ হয় তবে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় তাঁর বয়স হয় ৫৮ বছর। আর যদি ২৭/২৮ বছর হয় বিয়ের বয়স তাহলে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় খাদিজা রা.-এর বয়স হয় ৪৫/৪৬। ৫৮ বছর বয়সে সন্তান জন্মদান, এটা খুবই রেয়ায় বা অলৌকিক ঘটনা। যদি তাই হতো তবে এটা নিয়ে আলাদা আলোচনা তৈরি হতো।

যাই হোক, খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ ছিল এটি ভুল বলা যাবে না, কারণ সঠিক কথা আমরা কোনো হাদিসে পাই না। তবে ২৭/২৮ হওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বাকী আল্লাহ ভালো জানেন।

খাদিজার গর্ভে মুহাম্মদ সা.-এর একজন সন্তান ছাড়া বাকি সবার জন্ম হয়। কাসিম, তাহির তাইয়েব, যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আব্দুল্লাহ। কাসিমের নামানুসারে মুহাম্মদ সা. আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম ও তাহির জাহেলিাতের যুগেই মারা যান। আব্দুল্লাহ নবুয়তের ৩য় বছরে জন্ম নেন ও ৫ম বছরে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সাথে হিজরত করেন। খাদিজা রা. নবুয়তের দশম বছরে ইন্তেকাল করেন।

২০ অক্টোবর, ২০২১

রাসূল সা.-এর মৃত্যুর পর যা ঘটেছিল মদিনায়




আজ ১২ রবিউল আউয়াল। ১১ হিজরির এই দিনে আমাদের নেতা মুহাম্মদ সা. দুনিয়া থেকে ইন্তেকাল করেন। অনেকের মতে আজকের এই দিনে রাসূল সা. জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মতামত হচ্ছে মুহাম্মদ সা. ৯ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছেন। মুহাম্মদ সা. বহুবার বলেছেন তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। সেই হিসেবেও ৯ রবিউল আউয়াল সঠিক হয়। আমুল ফিল বা হস্তির বছরে ১২ রবিউল আউয়াল ছিল বৃহস্পতিবার।

মুহাম্মদ সা. আয়িশা রা.-এর কোলে মাথা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে সাহাবারা হতাশ হয়ে কান্না করতে থাকে। তখন উমার ইবনুল খাত্তাব রা. দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “কতকগুলো মুনাফিক বলে বেড়াচ্ছে যে, রাসুল সা. মারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। তিনি কেবল মূসা আ.-এর মত সাময়িকভাবে আল্লাহর কাছে গিয়েছেন। মূসা আ. চল্লিশ দিনের জন্য আল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন। তখন প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি মারা গেছেন। অথচ তার পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, মূসার আ. মত রাসূলুল্লাহ সা. আবার ফিরে আসবেন। তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, যারা বলছে যে, তিনি মারা গেছেন তাদের হাত পা কেটে দেওয়া হবে।

আবু বকর রা. মুহাম্মদ সা.-এর ইন্তিকালের খবর পেয়ে ছুটে এলেন। উমার রা. তখন ঐ কথা বলে চলেছেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি আয়িশার রা.-এর ঘরে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে চলে গেলেন। তখন তাঁকে একটি কাপড় দিয়ে ঘরের এক কোণে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এগিয়ে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। অতঃপর বললেন, “আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছিলেন তা আপনি আস্বাদন করেছেন। এরপর আপনার কাছে আর কখনো মৃত্যু আসবে না।” অতঃপর মুখ ঢেকে দিলেন।

আবু বকর রা. এই ঘটনার জন্য আগেই প্রস্তুত ছিলেন। বিদায় হজ্বে যখন দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তখন থেকেই তিনি জানতেন যে কোনো সময়ই মুহাম্মদ সা. চলে যাবেন। তিনি বাহিরে বেরিয়ে দেখেন উমার রা. সেই একই কথা বলে চলেছেন। তিনি বললেন, “উমার। তুমি ক্ষান্ত হও। চুপ করো।” উমার রা. কিছুতেই থামতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ অবস্থা দেখে আবু বকর রা. জনতাকে লক্ষ্য করে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর কথা শুনে জনতা উমারকে রা.-কে রেখে তাঁর দিকে এগিয়ে এল।

তিনি আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, “হে জনমন্ডলী, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের পূজা করতো সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করতো সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।” তারপর তিনি সূরা ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত উল্লেখ করেন,
//মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ আর কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন।//

আবু বকর রা.-এর এই বক্তব্যের পর সাহাবারা বুঝতে পারলেন রাসূল সা. আর নেই। উমার রা. একদম শান্ত হয়ে বসে পড়লেন, যেন তিনি সব হারিয়ে ফেললেন। তবে অবশ্য অল্পসময় পর সবাই শোক চেপে রেখে স্বাভাবিক হলেন।

আনসারদের একজন নেতা হলেন সা'দ বিন উবাদা রা.। তিনি খাজরাজদের অন্তর্গত বনু সাঈদা গোত্রের প্রধান। তিনি আকাবার ২য় শপথের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যেসব মানুষের কারণে মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মুহাম্মদ সা. আনসারদের নেতা হিসেবে তাকে বিবেচনা করতেন। কোনো ব্যাপারে আনসারদের মনোভাব জানতে মুহাম্মদ সা. সবসময় সা'দ বিন উবাদা রা.-কে জিজ্ঞাসা করতেন। তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকায় শুধু খাজরাজরা নয়, আওস গোত্রের লোকেরাও তাঁকে নেতা মানতেন।

মুহাম্মদ সা.-এর মৃত্যুর পর বনু সাঈদা গোত্রে খাজরাজদের একদল লোক সমবেত হলো। তারা সা'দ বিন উবাদার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। আলী রা.-এর ঘরে ছিল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.। তারা এখন এসব ঝামেলায় জড়াতে চাননি। একদল লোক তাদের আনুগত্য করলো। তারা সম্ভবত আলী রা.-কে পরিবারের সদস্য হিসেবে নেতা মানতে চেয়েছিল। আওস গোত্রের শাখা আব্দুল আশহাল গোত্রের নেতা উসাইদ বিন হুদাইর রা.-এর নেতৃত্বে কিছু সাহাবী আলাদা হয়ে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। অল্প সময়ের মধ্যে সাহাবারা তিনভাগ হয়ে গেল। সা'দ বিন উবাদা রা.-এর নেতৃত্বে বেশি মানুষ জমায়েত হলো। তিনজন নেতা দেখা দিলেও মদিনার বেশিরভাগ সাহাবী এই তিনদলের কারো সাথেই যুক্ত হননি। মুহাজিররা সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য আবু বকর রা.-এর কাছে হাজির হলো।

এই প্রসঙ্গে উমার রা. বলেন, //রাসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকালের পর আমরা খবর পেলাম আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা বনু সাঈদা গোত্রের চত্বরে তাঁদের গণ্যমান্য মুরব্বীদের নিয়ে সমবেত হলেন। আলী রা., তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. ও তাঁদের সহচরগণ আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাইলেন। আর আবু বকর রা.-এর কাছে জমায়েত হলেন মুহাজিরগণ। আমি আবু বকরকে বললাম, “আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আনসার ভাইদের কাছে চলুন।”

তাদের কাছে যাওয়ার পথে তাদের দু’জন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হলো। তারা আনসারদের মনোভাব জানালেন। অতঃপর আমরা বনু সাঈদা গোত্রে গেলাম। আমরা সেখানে বসলে তাঁদের এক বক্তা আল্লাহর একত্ব ও রাসূলের রিকালাতের সাক্ষ্য দিয়ে এবং আল্লাহ যথোচিত প্রশংসা করে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। বললেন, “আমরা আল্লাহর আনসার এবং ইসলামের বীর সেনানী। আর হে মুহাজিরগণ! আপনার আমাদেরই একটি দল। আপনাদের একটি শান্তশিষ্ট মরুচারী দল আমাদের সাথে এসে ইতোমধ্যেই যোগদান করেছে।”

উমার বলেন, আমরা দেখতে পেলাম, তারা আমাদেরকে আমাদের মূল আদর্শ থেকেই বিচ্যুত করতে চাইছে এবং তার ওপর জোরপূর্বক নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছে। আমি এর জবাবে চমৎকার একটা বক্তৃতা তৈরি করলাম এবং তা আমার নিজের কাছে অত্যন্ত যুৎসই মনে হয়েছিল। আমি আবু বকরকে শোনাতে চাইলাম। আবু বকরের মধ্যে এক ধরনের তেজস্বিতা ছিল যার জন্য তাঁকে আমি খুবই ভয় পেতাম এবং যথাসম্ভব তাঁর মনরক্ষা করে চলার চেষ্টা করতাম।

আবু বকর বললেন, “উমার। তুমি কিছু বলো না।” তিনি তাঁদের কথার এত সুন্দরভাবে জবাব দিলেন যে, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি যে বক্তব্য তৈরি করে এটি ছিল তার চাইতেও অনেক সুন্দর। তিনি বললেন, “তোমরা নিজেদের মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী ও অবদান সম্পর্কে যা বলেছো তা যথার্থ বলেছো। আবার এ কথাও অনস্বীকার্য যে, এই কুরাইশ গোত্রের অবদান না থাকলে আরবরা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতো না। তারা আরবদের মধ্যে মধ্যম ধরনের বংশীয় মর্যাদার অধিকারী এবং তাদের আবাসিক এলাকাও সমগ্র আরব জাতির মধ্যস্থলে অবস্থিত। আমি তোমাদের সবার জন্য এই দুইজনের যেকোনো একজনকে পছন্দ করি। তোমরা এদের মধ্যে যাকে পছন্দ করো তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হও ও বাইয়াত করো।” এই বলে তিনি আমার ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর হাত ধরলেন। তাঁর এই শেষের কথাটি ছাড়া আর কোনো কথা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছিল, আবু বকর থাকতে অন্য মুসলমান নেতা হতে পারে না।

আবু বকরের এই ভাষণের পর আনসারদের একজন বললেন, “আমরা আরবদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তায় যেমন নির্ভরযোগ্য, মান মর্যাদায়ও তেমনি শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমাদের পক্ষ থেকে একজন এবং তোমাদের (কুরাইশদের) তরফ থেকে আরো একজন আমীর হোক।” এরপর প্রচুর বাকবিতন্ডা হলো এবং বেশ চড়া গলায় কথা কথাবার্তা হতে লাগলো। আমার আশংকা হলো যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের দুই গোষ্ঠী মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে একটা বিভেদ বা কলহের সৃষ্টি হয়ে না যায়। আমি (সকল বিতর্কের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে) তৎক্ষণাৎ বললাম, “হে আবু বকর! আপনার হাতখানা বাড়িয়ে দিন।” তিনি বাড়িয়ে দিলেন। আমি তার হাত ধরে বাইয়াত করলাম। এরপর মুহাজিররা বাইয়াত করলেন। তারপর আনসাররাও বাইয়াত করলেন। এরপর আমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে বকাঝকা করতে আরম্ভ করলাম। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের একজন বললেন, “তোমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলে।” আমি বললাম, “আল্লাহই সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলেন।”//

নেতা নির্বাচন নিয়ে ঘটে যাওয়া এসব কাণ্ডের কারনে সোমবার গত হয়ে যায়। মঙ্গলবারের রাত চলে আসে। আরবি ক্যালেন্ডার অনুসারে দিন শুরু হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে। মঙ্গলবার সকালে আবু বকর রা. নামাজ শেষে মিম্বরে বসলেন। রাসূল সা. অসুস্থ থাকতেই মসজিদে নববিতে আবু বকর রা. ইমামতি করতেন। আমীর হিসেবে বাইয়াত নেওয়ার পরও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। আবু বকর রা. কিছু বলার আগে উমার রা. তার অনুমতি কিছু বলার জন্য দাঁড়ালেন।

আল্লাহর প্রশংসা করে তিনি বলেন, “হে জনতা! গতকাল আমি তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম [অর্থাৎ মুহাম্মদ সা. মারা যাননি, তিনি মুসা আ. মত সাময়িকভাবে অন্তর্ধান হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি] তা আমি কুরআন থেকে পাইনি এবং রাসূলুল্লাহু সা.ও আমাকে তা বলেননি। আমার ধারণা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের সমষ্টিগত জীবনের সকল দিক পুরোপুরিভাবে গুছিয়ে দিয়ে সবার শেষে ইনতিকাল করবেন। কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়।

আল্লাহর যে কিতাব দ্বারা তাঁর রাসূল সা.কে নিজের মনোনীত লক্ষ্যে পরিচালিত করেছেন সে কিতাব আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বহাল রেখেছেন। এই কিতাবকে যদি তোমরা আঁকড়ে ধর তাহলে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যেদিকে পরিচালিত করেছেন সেদিকে তোমাদের চালিত করবেন। আজ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠতম তাঁর কাছেই তোমাদের নেতৃত্ব সমর্পণ করেছেন। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্যতম সঙ্গী, সওর পর্বত গুহায় তাঁর একনিষ্ঠ সহচর। অতএব তোমরা তাঁর কাছে বাইয়াত করে তাঁকে খলিফা বা আমীর হিসাবে গ্রহণ করো।” উমার রা.-এর এই কথার পর সাহাবার একযোগে সবাই বাইয়াত করলো। যারা গতকাল করেছিল তারা আজ আবার বাইয়াত করলো।

অতঃপর আবু বকর রা. বক্তব্য রাখলেন। প্রথমে আল্লাহর যথোচিত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, “হে জনতা! আমাকে তোমাদের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। আসলে আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি যদি ভাল কাজ করি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি অন্যায় করি তাহলে আমাকে শুধরে দেবে। সত্যবাদিতাই বিশ্বস্ততা। আর মিথ্যাবাদিতা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের কাছে যে দুর্বল বিবেচিত হয়ে থাকে সে আমার শক্তিশালী যতক্ষণ আমি আল্লাহর ইচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না দিতে পারবো। আর তোমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী বিবেচিত হয়ে থাকে তার কাছ থেকে যতক্ষণ প্রাপ্য হক আদায় না করবো ততক্ষণ সে আমার কাছে দুর্বল।

মনে রেখ কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ তাকে লাঞ্চনা গঞ্জনা ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেন। আর অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামি যে সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করে সে সমাজকে আল্লাহ বিপদ মুসিবত ও দুর্যোগ দিয়ে ভরে দেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করবো ততক্ষণ তোমরা আমার কথামতো চলবে। কিন্তু যখন আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবো তখন তোমাদের আনুগত্য আমার প্রাপ্য হবে না। তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান থেকো আল্লাহ তোমাদের ওপর রহমত নাযিল করুন।”

আবু বকর রা. বাইয়াত সুসম্পন্ন হওয়ার পর মঙ্গলবার দিন জনগণ রাসূলুল্লাহ সা.-এর দাফনের আয়োজন করলো। আলী রা., আব্বাস রা., ফযল ইবনে আব্বাস রা., কুসাম ইবনে আব্বাস রা., উসামা ইবনে যায়িদ রা. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুক্ত গোলাম শাকরান রা. তাঁকে গোসল দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত হলেন। আওস রা. আলী রা.-কে বললেন, “হে আলী! আল্লাহর দোহাই। রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাফন-দাফন আমাদের অংশ নিতে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।”

আলী রা. বললেন, “এসো।” তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোসলে অংশগ্রহণ করলেন। গোসলের আয়োজন করতে গিয়ে গোসলের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকেরা মতবিরোধের শিকার হলেন। প্রশ্ন ছিল এই যে, অন্যান্য মৃতের মত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাপড় খুলে ফেলে গোসল দেওয়া হবে, না কাপড় গায়ে রেখেই গোসল দেওয়া হবে। এই মতভেদ চলাকালে সহসা আল্লাহ তাদের ওপর ঘুম চাপিয়ে দিলেন। ঘুমের কারণে সকলেরই মুখ রাসূলুল্লাহ সা.-এর বুকের ওপর এসে পড়লো। সেই অবস্থায় ঘরের একপাশ থেকে এক অচেনা ব্যক্তি তাদেরকে বললো, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাপড় গায়ে রেখেই গোসল দাও।” এই কথা শুনে সবাই হতচকিত হয়ে জেগে ওঠলেন এবং সকলেই এই কথা শুনেছেন বলে জানালেন। অতঃপর জামা গায়ে রেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গোসল দেওয়া হলো এবং কাপড়ের ওপর দিয়েই গা কচলানো হলো।

রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোসল সম্পন্ন হলে তিনটি কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হলো। মঙ্গলবার রাসূলুল্লাহ সা.-কে কাফন ও গোসল দিয়ে তাঁর বাড়ীতে তাঁর খাটে শুইয়ে রাখা হলো। এরপর দাফন নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে আবার মতান্তর ঘটলো। কেউ বললেন, মসজিদে নববীতে দাফন করবো।” কেউ বললেন, “অন্যান্য সাহাবীদের কবরের পার্শ্বে দাফন করবো।” আবু বকর রা. মীমাংসা করে দিলেন এই বলে যে, রাসূলুল্লাহ সা.-কে আমি বলতে শুনেছি যে, প্রত্যেক নবীকে তার ইনতিকালের জায়গাতে দাফন করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সা. যে বিছানার শুয়ে ইনতিকাল করেছিলেন তা তুলে ফেলে তার নীচেই কবর খনন করা হলো।

এরপর শুরু হলো জানাজার নামাজ। রাসূল সা.-এর জানাজার নামাজ অন্য মুসলিমদের মতো জামায়াতবদ্ধভাবে হয়নি। রাসূল সা.-কে তাঁর ছোট্ট ঘর থেকে বের করা হয়নি। তিনি সেখানেই ছিলেন। এরপর একে একে সাহাবারা সেই ঘরে প্রবেশ করলেন ও জানাজার নামাজ পড়লেন। এভাবে প্রথমে সকল পুরুষরা পড়লেন, তারপর মহিলারা অবশেষে শিশু-কিশোররা জানাজার নামাজ পড়লেন। এভাবে কেন হয়েছে তা অনেক চেষ্টা করেও সঠিকভাবে জানতে পারিনি।

এভাবে জানাজার নামাজ পড়তে গিয়ে অনেক সময় লেগেছে। মঙ্গলবারের সূর্য অস্ত গিয়েছে। বুধবারের রাত চলে এসেছে। এরপরও জানাজা চলছিল। মধ্যরাতে জানাজা শেষ হলে মুহাম্মদ সা.-কে কবরস্থ করা হলো। মহানবীকে কবরে শোয়ানোর জন্য রাসূল সা. তিনজন চাচাতো ভাই আলী রা., ফজল রা., কুসাম রা. ও আজাদকৃত দাস শাকরান রা.। আল্লাহর রাসূল সা.-এর ইন্তিকালের পর প্রায় ৪০-৪৫ ঘন্টা পর তাঁর দাফন সম্পন্ন হলো।

দাফন সম্পন্ন হলে আলী রা. আব্বাস রা.-সহ নিকটাত্মীয়রা জানতে পারলো আবু বকর রা. খলিফা হিসেবে বাইয়াত নিয়েছেন। অভিষেক ভাষণও দিয়ে ফেলেছেন। এতে তাঁরা ভীষণভাবে আহত হন। তাঁদের কাছে পুরো প্রেক্ষাপটও জানা ছিল না। তাঁরা মুহাম্মদ সা.-এর লাশের পাশেই ছিলেন এবং লাশ সামলানোকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে নিয়েছেন। মুহাম্মদ সা. এর রাজনৈতিক উত্তরসূরী নির্ধারিত হয়ে গেল অথচ তার পরিবার কোনো পরামর্শও দিতে পারলো না এটা তাঁদের ব্যথিত করলো।

আলী রা.সহ অন্যদের এই মনঃকষ্ট দূর হতে প্রায় ছয়মাসের মতো সময় লেগেছে। আবু বকর রা. সেসময় নানান সমস্যায় পড়েছিলেন। চারদিকে মানুষ মুরতাদ হয়ে যাচ্ছিল, মিথ্যা নবী দাবীদার বের হয়েছিল, মুসলিমরা জাকাত দিতে অস্বীকার করছিল। এসব পরিস্থিতিতে আলী রা. অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আবু বকর রা.-কে সাহায্য করেছেন এবং মুসলিম রাষ্ট্রের ঐক্য ফিরিয়ে আনতে শক্ত ভূমিকা রেখেছিলেন।

আলী রা.-এর উগ্র অনুসারী শিয়াদের কেউ কেউ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবু বকর রা.-এর খিলাফতকে অস্বীকার করেন। এটা সঠিক নয়। তারা বলতে চান আলী রা. বাধ্য হয়ে আবু বকর রা.-এর আনুগত্য করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে আলী রা. কখনো এই জন্যে বাইয়াত নিতে দেরি করেননি যে, তিনি আবু বকর রা.-কে অযোগ্য মনে করেন বা তাকে অপছন্দ করেন। বরং তারা ঘটনার পরম্পরায় ব্যথিত হয়ে বাইয়াত নিতে দেরি করেছেন।

বস্তুত আলী রা. আবু বকর রা.-কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন। আবু বকর রা.-এর সাথে মিলিয়ে তিনি তার নাতির নাম রেখেছেন আবু বকর। আলী রা. আবু বকর রা.-কে অপছন্দ করতেন বা তার নেতৃত্ব আন্তরিকভাবে মেনে নেননি এই দাবি ভুয়া ও অগ্রহণযোগ্য।

১৩ অক্টোবর, ২০২১

পাকিস্তানের পারমানবিক অস্ত্রের ইতিকথা




১৯৪০ সালের কথা। তখন জাপান ছিল পরাশক্তিদের মধ্যে একটি। পৃথিবীর বেশিরভাগ সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা বেশ মরিয়া। ১৯৪১ সালে তারা আরেক পরাশক্তি আমেরিকার বিশাল নৌ-ঘাঁটি পার্ল হারবারে আক্রমণ চালিয়ে তাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। আমেরিকার ৮ টি বিশাল রণতরীর চারটি পুরোপুরি ডুবে যায়, বাকী চারটি ক্ষটিগ্রস্থ হয় মারাত্মকভাবে। সাড়ে তিনশ যুদ্ধ বিমান ধ্বংস হয় ও ২৩৩৫ জন আমেরিকান নেভি মৃত্যুবরণ করে।

এই আক্রমণ চালিয়ে সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে জাপান। জাপানকে সমীহ করতে থাকে সব পরাশক্তিগুলো। ১৯৪২ সালে আমরা তখন ইংল্যান্ডের অধীনে। জাপান মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরে থাকা ইংল্যাণ্ডের নৌঘাঁটি দখল করে ফেলে। বাকী থাকে ইংল্যান্ডের কলকাতা নৌ-ঘাঁটি। জাপান ইংল্যান্ডকে হুমকির ওপরে রাখছিল। ইংল্যান্ডের এই দিশেহারা অবস্থার সুযোগ নিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে 'ভারত ছাড়' আন্দোলন শুরু করে।

আমার ধারণামতে এই আন্দোলনই পাকিস্তান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এই প্রথম উপমহাদেশের হিন্দুরা ইংল্যান্ডকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। যাই হোক জাপানের কলকাতা আক্রমণ ইংল্যান্ড ঠেকিয়েছে চীনের মাধ্যমে। পূর্ব চীন সাগরে আক্রমণ চালিয়ে চীন কোরিয়া উপদ্বীপে পৌঁছে গেলে জাপান সেদিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। হিন্দুস্থান জাপানের দৃষ্টি থেকে সরে যাওয়ার পর ইংল্যান্ড গান্ধী ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। ইংরেজদের ও হিন্দুদের মারাত্মক অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসকে পুঁজি করেই জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিমরা পাকিস্তান আদায় করে নেয়।

১৯৪৫ সালে বিশ্বে জাপান ও জার্মানীর জয়জয়কার। ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে এই দুই পরাশক্তি ভালো অবস্থানে রয়েছে। এমন সময়ে আমেরিকা তাদের পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাশাকিতে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে এই ঘটনা ঘটায় আমেরিকা। এটা শুধু জাপানকে নয়, সারাবিশ্বকে থমকে দিয়েছে। জাপান সারাবিশ্ব থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে সেপ্টেম্বরে আত্মসমর্পন করে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান তার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পারমাণবিক শক্তি অর্জনের দিকে দৃষ্টিপাত করে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৫১ সালে আমেরিকার সাথে পারপমাণবিক চুক্তি করে পাকিস্তান। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য যে, সৃষ্টির পর পাকিস্তান আমেরিকাপন্থী ও ভারত সোভিয়েতপন্থী অবস্থান নেয়। তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার 'এটম ফর পিস প্রোগ্রাম' ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তান হচ্ছে এই প্রোগ্রামের প্রথম পার্টনার। পরমাণু শক্তি কেবল মানবজাতির কল্যাণে ব্যয় হবে এমন চুক্তিতে পাকিস্তান পারমাণবিক গবেষণা শুরু করে।

এর ধারাবাহিকতায় যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখন পরমাণবিক গবেষণা নিয়ে পাকিস্তান সরকার 'পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশন' নামে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করে। কমিশন স্পষ্ট উল্লেখ করে তারা কোনো অস্ত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখবে না। তারা খাদ্য সংরক্ষণ, বীজ সংরক্ষণ, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও ক্যান্সার চিকিৎসায় পারমাণবিক এনার্জি নিয়ে গবেষণা করবে।

অল্প সময়ের মধ্যে পাকিস্তান পরমাণু এনার্জি নিয়ে কৃষি, শিল্প ও চিকিৎসায় সফলতা পেতে শুরু করে। মুলতানে নিউক্লিয়ার এনার্জি ব্যবহার করে পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট স্থাপিত হয়। করাচিতে জিন্নাহ মেডিকেলে নিউক্লিয়ার ক্যান্সার ইউনিট চালু করা হয়। তিনটি ভার্সিটির সাথে সমন্বয় করে পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনের ল্যাব স্থাপন করা হয়। পাঞ্জাব, লাহোর ও ঢাকা। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয় করে পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনের ল্যাব স্থাপন করা হয়। এই ল্যাব এখন বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয়। আইয়ুব খানের আমলে এই ল্যাবের জন্য কম্পিউটার আনা হয় এবং তা এখানে স্থাপন করা হয়। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বপ্রথম কম্পিউটার যা ঢাকায় ইন্সটল করা হয়।

১৯৫৯ সালে আইয়ুব খানের আমলে দু'টি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিকল্পনা হয়। ১ম টি করাচিতে ২য় টি পাবনার রূপপুরে। পাবনার রূপপুরে এখন যে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট হচ্ছে তা মূলত ১৯৬১ সালের একনেকে পাশ হওয়া। জমি অধিগ্রহণ ও প্রাথমিক অনেক কাজ, লোক নিয়োগ ইত্যাদি বিষয় হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এই প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আইয়ুব খান পারমাণবিক বোমার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন। তিনি কয়েক ধাপে পাকিস্তানের সেরা ৬০০ ছাত্র শুধু এই বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার জন্য সারাবিশ্ব ছড়িয়ে দিয়েছেন। তবে যেহেতু পাকিস্তানের পুরো পারমাণবিক কার্যক্রমে আমেরিকা জড়িত তাই তিনি তাদের চোখ এড়িয়ে সুবিধা করতে পারেন নি। তবে তিনি এই গবেষণার জন্য ঢাকার ল্যাব ব্যবহার করেছেন।

অন্যদিকে পাকিস্তান এগিয়ে যাচ্ছে দেখে ভারতও জোরালোভাবে পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছিলো। তারা এই ব্যাপারে রাশিয়া থেকে সাহায্য পেয়েছিলো এবং পরমাণু অস্ত্রের ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

পাকিস্তানে পরমাণু অস্ত্রের কাজ গোপনে চলতে থাকে। ১৯৬৯ সালে প্রথম ভারত তাদের নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে। এতে পাকিস্তান নিশ্চিত হয়ে যায়, অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ভারত পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে। আইয়ুবের সময় পরমাণু অস্ত্র প্রজেক্টের হেড ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী আব্দুস সালাম। তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলও পেয়েছেন। তবে তিনি সফলতা পাননি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান হেরে যাওয়ায় পাকিস্তানের ভয় তৈরি হয়।

যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এই বিষয়ে নজর দেন। তখন পরমাণু অস্ত্র প্রজেক্টের প্রধান ছিলেন মুনির আহমেদ খান। ড. আব্দুল কাদির খান তখন নেদারল্যান্ডে একটি ফিজিক্স ল্যাবে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি আব্দুস সালামের সাথে জড়িত থাকায় এই গোপন প্রজেক্ট সম্পর্কে জানতেন। ড. আব্দুল কাদির খান এই বিষয়ে নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর সাথে শেয়ার করেন। ভুট্টো তাকে পাকিস্তান এটমিক এনার্জি কমিশনের ডেপুটি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন।

মুনির আহমেদ খানের প্ল্যান হচ্ছে প্লুটোনিয়াম(plutonium) এনরিচমেন্টের মাধ্যমে বোমা বানানো। আর এখানেই বিপত্তি তৈরি হয় কাদির খানের সাথে। কাদির খানের বক্তব্য হলো প্লুটোনিয়াম নয় ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টের মাধ্যমেই সম্ভব বোমা বানানো। এটা নিয়ে সমস্যা তৈরি হলো এবং তা সরকার পর্যন্ত গড়ালো। সরকার ছিল মরিয়া। এদিকে ১৯৭৪ সালে ভারত তাদের প্রথম নিউক্লিয়ার অস্ত্র 'স্মাইলিং বুদ্ধ' পরীক্ষা চালায়। যদিও তারা এটাকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের ঘোষণা দেয়। মরিয়া হয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো উভয়কেই তাদের পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করার সুযোগ করে দেয় এবং টাকা ঢালে। অবশেষে আব্দুল কাদির খান সফলতা লাভ করেন।

অনুমান করা হয় আব্দুল কাদির খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান ১৯৮০ সাল থেকেই পরামাণু অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা লাভ করে। পাকিস্তান অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখি হতে পারে বিধায় তারা সেটা পৃথিবীকে জানতে দেয়নি।

১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। প্রবল জনসমর্থনের ভিত্তিতে তিনি ঘোষণা করেন যে, বিশ্বদরবারে প্রাপ্য সম্মানটুকু পেতে হলে ভারতকে এবার পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র থেকে পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হতে হবে। পৃথিবীতে তখন বিশ্বের পাঁচ মোড়লই পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র। ফ্রান্স, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও ইংল্যান্ড।

১৯৯৮ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয়ে কাশ্মীরে ব্যাপক নির্যাতন। এই নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। পাকিস্তানকে ভয় দেখাতে ভারত মে মাসের ১১ তারিখ কোনো রাখ-ঢাক ছাড়াই পারমাণবিক অস্ত্রের ঘোষণা দিয়ে তিনটি বোমা বিস্ফোরণ করে। দু'দিন পর ১৩ তারিখ আরো দুটি বোমা বিস্ফোরণ করে।

এই বিস্ফোরণের পর পাকিস্তান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু আমেরিকার মৃদু প্রতিবাদ ছাড়া বিশ্ব মোড়লরা খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং সবাই পাকিস্তানকে চাপ দিতে থাকে যাতে পাকিস্তান এই পথে না হাঁটে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নওয়াজ শরীফ। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন পাল্টা পরীক্ষা করার। নইলে সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে। ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করবে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিষদে দীর্ঘ আলোচনার পর নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালের ২৮ মে ও ৩০ মে দু'দিন দু'টি বোমার বিস্ফোরণ করে পাকিস্তান তার শক্তির কথা জানান দেয়।

বিস্ফোরণের পর নওয়াজ শরীফ পৃথিবীবাসীকে জানান, "নিরাপত্তা হুমকির ব্যাপারে নির্বিকার থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এত বড় হুমকিকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থ থেকেই এই পারমাণবিক বিকল্প বেছে নেয়া হয়েছে।"

পাকিস্তান সাময়িক অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে। তবে ভারতের আস্ফালন বন্ধ হয়ে যায়। চীন ও পাকিস্তান একইসাথে যৌথমহড়া দিয়ে ভারতকে নিষ্ক্রীয় করে দেয়।