৪ ফেব, ২০২৩

ওয়ালি-মুকাদ্দাস গুমের আদ্যপান্ত

২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১.০০টায় ঢাকা জেলার সাভার থানার নবীনগর এলাকা থেকে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৪ (র‌্যাব) ও ডিবি পুলিশ (গোয়েন্দা শাখা) সদস্য পরিচয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকাহ্ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আল মুকাদ্দাস (২২) এবং দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মার্স্টাস পরীক্ষার্থী মোঃ ওয়ালিউল্লাহকে (২৩) ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁদের গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আজ ১১ বছর তাদের কোনো খবর নেই। 


জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ সরকারকে গুমের শিকার হওয়া ৭৬ জনের তালিকা দেয়। ওই তালিকায় ওয়ালী উল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের নাম আছে। এই দুইজন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। 


এর প্রেক্ষিতে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১২, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করেন। আবেদনটি ১৩ই ও ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ শুনানি শেষে আদালত তা আমলে নেন। রিট পিটিশন নম্বর ১৫৩৫/২০১২।


গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ আদালত তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজিপি, র‌্যাবের ডিজি, ডিসি ডিবিসহ মোট নয়জনকে কেন আল মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে তিন সপ্তাহের ভিতরে আদালতে হাজির করা হবে না, এই মর্মে জবাব দিতে বলে।


হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ আদালত তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজিপি, র‌্যাবের ডিজি, ডিসি ডিবিসহ মোট নয়জনকে এ রুলের জবাব দিতে বলে। তিন সপ্তাহ পর উল্লেখিত নয়জনই আদালতে জানান, নিখোঁজদের ব্যাপারে তাঁরা কোন সন্ধান পাননি। আদালত তাঁদের জবাবে সন্তুষ্ট নয় বলে অধিকতর তদন্ত করতে আরো ৭দিন সময় বাড়িয়ে দেন। ৭দিন পর তাঁরা নয়জন আবার আদালতে হাজির হয়ে এই বিষয়ে তাঁদের অপারগতা প্রকাশ করেন। আদালত আবারও ৭দিনের সময় দিয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের মোবাইল ফোনের কললিস্ট আদালতে হাজির করতে বলেন। ৭দিন পর তারা নয়জন হাতে লিখে কয়েকটি মোবাইল ফোন নম্বর আদালতে উত্থাপন করলে বিজ্ঞ আদালত অরিজিনাল কললিস্ট নিয়ে ১৪/৪/২০১২ তারিখে হাজির হতে বলেন। ১৪/৪/২০১২ তাঁরা নয়জন অরিজিনাল কললিস্ট আদালতে জমা দিতে ব্যর্থ হন। এরপর আদালত আবার ১৮/৪/২০১২ তারিখে অরিজিনাল কললিস্টসহ তাঁদের নয় জনকে হাজির হতে বলেন। কিন্তু ১৮/৪/২০১২ তারিখে হরতাল থাকায় সেদিন আর শুনানী হয়নি। এরপর আদালত আর কোনো আদেশ দেয়নি। 


পিরোজপুর জেলার খানা কুনিয়ারী গ্রামের আব্দুল হালিম ও আয়েশা সিদ্দিকার ছেলে আল মুকাদ্দাস এবং ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া থানার পশ্চিম শৈল জালিয়া গ্রামের মোঃ ফজলুর রহমান ও আফিফা রহমানের ছেলে মোঃ ওয়ালিউল্লাহ। আল মুকাদ্দাস এবং মোঃ ওয়ালিউল্লাহ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা একে অপরের বন্ধু ছিলেন। এছাড়া দুইজনই 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল' এর ২১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন।


গুম হওয়া আল মুকাদ্দাসের চাচা মুহাম্মদ আব্দুল হাই (৪১) জানান, তিনি ঢাকার মালিবাগের ৮/২ শান্তিবাগ এলাকায় থাকেন। ২রা ফেব্রুয়ারি ২০১২ তাঁর সঙ্গে আল মুকাদ্দাসের মোবাইল ফোনে কথা হয়। আল মুকাদ্দাস ইসলামী বিশ্ববিদ্যাল ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় আসে। আল মুকাদ্দাস তাঁকে জানায়, একটি দেশাত্ববোধক গানের অ্যালবাম বের করার জন্য ঢাকায় দুইদিন থাকতে হবে। আল মুকাদ্দাস বাংলামোটরে জাফর নামে এক বন্ধুর বাসায় থেকে একটি স্টুডিওতে গান রেকর্ড করতে থাকে। এছাড়া ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০১২ আল মুকাদ্দাসের আরেক বন্ধু মোঃ ওয়ালিউল্লাহ প্রিন্টিং প্রেসের কাজের জন্য ঢাকায় আসে এবং একই সঙ্গে তারা অবস্থান করে।


৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০১২ আল মুকাদ্দাস তাঁর সঙ্গে ঢাকার পল্টন এলাকায় দেখা করে জানায় যে, গানের রেকডিং হয়েছে, পরে এডিট করে বাজারে ছাড়া হবে। আল মুকাদ্দাস এবং মোঃ ওয়ালিউল্লাহ রাতে ক্যাম্পাসে ফিরে যাবে বলে তাঁকে জানায়।


৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ বিকাল আনুমানিক ৩.০০টায় আল মুকাদ্দাসের ছোট বোন তাঁকে মোবাইল ফোনে জানায়, আল মুকাদ্দাসের মোবাইল বন্ধ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বা বাড়ীতে কোথাও তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি তখন পল্টন থানায় যান এবং আল মুকাদ্দাস নিখোঁজ হয়েছে বলে একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেন। তিনি আল মুকাদ্দাসের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। বাংলামোটর থেকে আল মুকাদ্দাসের বন্ধু জাফর তাঁকে মোবাইল ফোনে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য রাতে আল মুকাদ্দাস ও মোঃ ওয়ালিউল্লাহকে সে কল্যাণপুরগামী বাসে তুলে দিয়েছে। আল মুকাদ্দাসের আরেক বন্ধু সাইয়েদ আহমেদ তাঁকে জানায়, আল মুকাদ্দাস এবং মোঃ ওয়ালিউল্লাহর সঙ্গে রাত ১০.৩২টায় মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। তখন আল মুকাদ্দাস সাইয়েদকে বলেছিল যে, তারা কল্যানপুর বাস কাউন্টার থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ পরিবহনে রাত ১১.৩০টায় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। আব্দুল হাই আরো বলেন, সাইয়েদ এর কাছ থেকে এ খবর পেয়ে তিনি ঢাকা মহানগরীর দারুস সালাম থানায় যান এবং সেখানে গিয়ে মোঃ ওয়ালিউল্লাহর ভাই মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহকে দেখতে পান। থানায় বসে আলোচনা করে খালিদ সাইফুল্লাহ দুইজনের নিখোঁজের বিষয়ে একটি জিডি করেন।


৭ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ তিনি খালিদ সাইফুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হানিফ এন্টারপ্রাইজ পরিবহনের কল্যাণপুর কাউন্টারে যান এবং সুপারভাইজার মোঃ সুমন মিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। সুপারভাইজার সুমন মিয়া তাঁকে জানান, ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাত আনুমানিক ১১.৩০টায় হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়ি নম্বর ৩৭৫০ কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। গাড়িটি সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌছালে রাত আনুমানিক ১২.৩০ টা থেকে ১.০০টার মধ্যে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে ৭/৮ জন লোক সেই গাড়ির কাছে আসে। কয়েকজন লোকের পরনে ছিল ডিবি পুলিশের জ্যাকেট। বাকীরা র‌্যাবের পোশাক পরা ছিল। ডিবি সদস্যরা গাড়ির ভেতরে ওঠে এবং সি-১ ও সি-২ সিটের যাত্রী মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসকে জোর করে নামিয়ে নিয়ে যায়। সুমন মিয়া ডিবি পুলিশ সদস্যদের কাছে জানতে চান, তাঁর যাত্রীদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এক ডিবি সদস্য তাঁকে বলেন, দুইজনের নামে অভিযোগ আছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হবে। এই কথা বলে দুইজনকে সেই সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায়।


মুহাম্মদ আব্দুল হাই সুপারভাইজার সুমনের কাছে এ খবর শুনে আশুলিয়া থানায় যান এবং একটি জিডি করেন। যার নম্বর ৫২৫; তারিখ ৮/২/২০১২। পরে তিনি খালিদ সাইফুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর পাইকপাড়ায় র‌্যাব-৪ এর কার্যালয়ে যান। সেখানে কর্মরত একজন র‌্যাব কর্মকর্তা তাঁদের নবীনগর র‌্যাব ক্যাম্পে যেতে বলেন। তিনি নবীনগর র‌্যাব ক্যাম্পে গেলে মিজান নামে এক র‌্যাব কর্মকর্তা তাঁকে জানান, ঐ ক্যাম্পের সদস্যরা সেদিন কাউকে গ্রেপ্তার করেননি।


অবশেষে ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।


ওয়ালিউল্লাহার ভাই মোহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ (৩২) জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে থাকেন। ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০১২ মোঃ ওয়ালিউল্লাহ মোবাইল ফোনে তাঁকে বলেন, সে কুষ্টিয়া থেকে প্রয়োজনীয় কাজে ঢাকায় এসেছে এবং এক বন্ধু আল মুকাদ্দাসের সঙ্গে দেখা হয়েছে। মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস এক সঙ্গে বাংলামোটরে তাঁদের আরেক বন্ধু জাফরের বাসায় থাকবে এবং কাজ শেষে কুষ্টিয়া ফিরে যাবে। ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ বিকাল আনুমানিক ৩.০০টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ ওয়ালিউল্লাহর এক সহপাঠী তাঁকে জানান, মোঃ ওয়ালিউল্লাহর মোবাইল নম্বর বন্ধ এবং ঢাকা থেকে সে ক্যাম্পাসে তখনও ফেরেনি। তিনি তখন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর করেন এবং জাফরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন।


জাফর তাঁকেও জানায় যে, মোঃ ওয়ালিউল্লাহ এবং আল মুকাদ্দাসকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কল্যাণপুরের বাস কাউন্টারে যাওয়ার জন্য বাসে তুলে দেয়। মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ তখন দারুস সালাম থানায় যান। তিনি সেখানে আল মুকাদ্দাসের চাচা আব্দুল হাই এর দেখা পান। তিনি একটি জিডি করেন।


পরে তিনি আব্দুল হাইকে সঙ্গে নিয়ে আশুলিয়া থানায় যান এবং একটি জিডি করেন।


গুম হওয়া আল মুকাদ্দাসের বন্ধু সাইয়েদ আহমেদ (২৩) জানান, তিনি ঢাকায় সরকারি তিতুমীর কলেজে পড়াশুনা করেন। আল মুকাদ্দাস তাঁর এলাকার ছেলে এবং পরিচিত। আল মুকাদ্দাস একটি গানের এ্যালবাম বের করার জন্য এবং মোঃ ওয়ালিউল্লাহ প্রিন্টিংয়ের কাজ করতে ঢাকায় এসেছিলেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে আল মুকাদ্দাস এর গান রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি একটি স্টুডিওতে একই সঙ্গে ছিলেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তাঁরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ার জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে যান। রাত ১০.৩২ মিনিটে আল মুকাদ্দাসের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। আল মুকাদ্দাস তাঁকে জানান যে, তাঁরা কল্যাণপুর থেকে রাত ১১.৩০টার গাড়িতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রওনা দিবেন। এরপর তাঁর সঙ্গে আর কোন কথা হয়নি।


হানিফ এন্টারপ্রাইজ পরিবহনের সুপারভাইজার সুমন মিয়া (৩২) জানান, গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাত আনুমানিক ১১.৩০টায় ৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে তিনি ডিউটি করছিলেন। তাঁদের গাড়ি কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে রাত আনুমানিক ১২.৩০ থেকে ১.০০টার মধ্যে ঢাকা জেলার সাভার থানার নবীনগর এলাকায় পৌঁছায়। রাস্তায় জ্যাম থাকায় গাড়ি থেমেছিল। এমন সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে গাড়ির বামপাশে থামে এবং মাইক্রোবাস থেকে ৭/৮জন লোক নামে। কয়েকজনের পরনে ছিল ডিবি পুলিশের জ্যাকেট এবং বাকি লোকদের পরনে ছিল র‌্যাবের পোশাক। তারা র‌্যাব-৪ ও ডিবি পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দেয়। তল্লাশির নামে তারা কয়েকজন গাড়ির ভেতরে ওঠে এবং একজন লোক সি-১ ও সি-২ সিটের যাত্রী মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসকে তাদের সঙ্গে নেমে যেতে বলে। তিনি তখন র‌্যাব ও ডিবি সদস্যদের বলেন, এঁরা তাঁর যাত্রী। এঁদের কোথায় নেয়া হবে? এমন সময় ডিবির এক সদস্য তাঁকে জানায়, মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের নামে অভিযোগ আছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হবে। তারা যাত্রী ২ জনকে নিয়ে সেই সাদা মাইক্রোবাসে তোলে এবং তাঁকে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বলে। তিনি তখন গাড়ি নিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে চলে যান।


আশুলিয়া থানার সাব ইন্সপেক্টর খায়রুল আলম জানান, ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের আত্মীয়স্বজনরা থানায় আসেন এবং দুইজনকে র‌্যাব ও ডিবি পুলিশ সদস্যরা ধরে নিয়ে গেছে বলে একটি জিডি করেন। তিনি জানান, জিডির ভিত্তিতে প্রথমে তদন্ত করেন এসআই তৌহিদুল ইসলাম। এসআই তৌহিদুল ইসলাম হঠাৎ বদলি হওয়ায় জিডির তদন্ত কাজ চালান এসআই খায়রুল ইসলাম। এসআই খায়রুল ইসলামও পরে বদলি হওয়ার কারণে জিডি তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই জাকারিয়া।


পরে এসআই জাকারিয়া নিজেই বাদী হয়ে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর-৬১; তারিখঃ ২৩/০২/২০১২। ধারা-৩৬৪/১৭১/৩৪ দ-বিধি। এছাড়া বাদী নিজেই মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তদন্ত চালিয়ে যান।


দারুস সালাম থানার এসআই সারোয়ার আলম জানান, ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ নিখোঁজ মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের পরিবারের সদস্যরা রাত ১০.৪৫টায় থানায় আসেন এবং ঐ দুইজনের শারীরিক গঠন, গায়ের রঙের বর্ণনা সম্বলিত নিখোঁজ সংবাদ দিয়ে একটি জিডি করেন। যার নম্বর ৩১৭; তারিখঃ ৬/০২/২০১২। তিনি নিজেই জিডিটি তদন্ত করছেন।


ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ ওহিদুজ্জামান জানান, ডিবি পুলিশ সদস্যরা ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে নবীনগর এলাকা থেকে মোঃ ওয়ালিউল্লাহ এবং আল মুকাদ্দাস নামে কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।


র‌্যাব-৪ এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ্ ইবনে জায়েদ জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র মোঃ ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে হেবিয়াস কর্পাস দরখাস্ত দাখিল করার পরে আদালত র‌্যাব এবং পুলিশসহ নয়জনকে জবাব দিতে রুল জারি করেছেন। র‍্যাব সদর দপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আদালতকে দিয়েছে।  


আজ ৪ ফেব্রুয়ারি। ১১ বছর হয়ে গেলেও এই গুমের আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের স্বজনরা এখনো অপেক্ষা করছে। কবে ফিরবে তারা? আদৌ কী তারা ফিরবে?  

২ ফেব, ২০২৩

শিক্ষা সন্ত্রাস ও জামায়াতে ইসলামী

শিক্ষা সন্ত্রাসের মূল প্রস্তাবক লর্ড মেকলে

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের অবসান হয় ও ইংরেজদের বর্বর শাসন শুরু হয়। ক্ষমতা দখল করেই ইংরেজরা দীর্ঘ ৫৫০ বছরে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। বাংলার দুইটি বিষয়ের ব্যাপারে তারা খুবই কনসার্ন ছিল। এক বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা, দুই বাংলার শিল্প। 

তারা ক্ষমতা দখল করেই এই দুটি সেগমেন্ট তারা বন্ধ করে দেয়। সকল শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টেক্সটাইল, জাহাজ শিল্প ও যুদ্ধাস্ত্র। শুধু শিল্প কারখানা বন্ধ নয়, শিল্প কারখানা যাতে আর কোনোদিন গড়ে না ওঠে এজন্য সকল উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। বস্ত্র শিল্প ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য হুমকি। এদেশের ভালো কাপড়ের বিপরীতে ব্রিটিশদের নিন্মমানের কাপড় চালানোর জন্য তারা বস্ত্রশিল্পকে একেবারে নির্মূল করে দিয়েছে। 

যারা তাঁতের ইঞ্জিনিয়ার/ কারিগর ছিল তাদের প্রতি হুমকি ছিল তারা যাতে মেশিন তৈরি না করে। আর যারা লুকিয়ে মেশিন তৈরি ও এর আপগ্রেডেশনের সাথে যুক্ত ছিল তাদের হাত কেটে দেওয়া হয়েছিল। মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে বাংলার সকল শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশদের পণ্য এদেশে চালু হতে শুরু করে। বাংলার ইতিহাস থেকে শিল্প কারখানা ও শিল্প গবেষণা হারিয়ে গেছে। আর অন্যদিকে ইউরোপে শিল্প গবেষণা এগিয়ে যায়। আমাদের এখানে লুটপাট ও মনোপলি বিজনেস করে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সাধিত হয়।    

এদেশের মানুষ যাতে পিছিয়ে থাকে ও সভ্যতার বিকাশ না ঘটে সেজন্যে ব্রিটিশরা এখানের সকল উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। কোনো জাতির মধ্যে শিক্ষা না থাকলে প্রথমত তারা সভ্যতার বিকাশে অংশ নিতে না পারায় হারিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত নিজেদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা ভুলে অন্য জাতির গোলামীর পথ ধরে। বাংলায় এই ব্যাপারটাই হয়েছে। 

যতদূর জানা যায় এই বাংলায় সভ্যতার বিকাশ হয়েছে দ্রাবিঢ় জাতিগোষ্ঠীর মাধ্যমে। তারা ছিল নূহ আ.-এর সরাসরি বংশধর ও একেশ্বরবাদী। সেসময় গোত্রভিত্তিক মানুষ বসবাস করতো। প্রতিটা গোত্রে কয়েকজন পণ্ডিত মানুষ থাকতেন। তাদের বাড়িই ছিল জ্ঞানর্জনের কেন্দ্র। প্রাথমিক লেখাপড়া সবাই করতো। এর মধ্যে যারা সক্ষম ছিল তারাই জ্ঞানের ধারাকে এগিয়ে নিতেন। জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা সীমিত ছিল বিধায় একজন জ্ঞানী ব্যাক্তি সকল বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন। যেমন কৃষি, শিল্প, ধাতুবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান সব বিষয়েই তারা পারদর্শী ছিলেন। 

এরপর ইরান থেকে বহুঈশ্বরবাদী আর্যরা এসেছে এখানে ও উপমহাদেশের উত্তর দিক থেকে ধীরে ধীরে দখলে নেয়। বাংলার দ্রাবিঢ়রা দীর্ঘদিন তাদের ঠেকিয়ে রাখলেও এক পর্যায়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা পরাজিত হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচারের শিকার হয় এখানকার জ্ঞানী সমাজ ও পন্ডিত ব্যাক্তিরা। ব্রাহ্মণ্যবাদী সভ্যতায় জ্ঞানর্জন শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। আর কিছু প্রাথমিক জ্ঞান ক্ষত্রিয়, বৈশ্যরা পেত। শুদ্র ও এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের জন্য জ্ঞানর্জন নিষিদ্ধ ছিল। 

একেশ্বরবাদী বুদ্ধের আগমনের পর এদেশের বেশিরভাগ মানুষ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী হন। বৌদ্ধ ধর্মের হাত ধরে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ধারা শুরু হয় বিহার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। গুপ্ত আমলে আর্যরা বৌদ্ধ ধর্মের ওপর ব্যাপক অত্যাচার করে। বিহারগুলো ধ্বংস করে। আবারো ক্ষতিগ্রস্থ হয় এই অঞ্চলের শিক্ষা। 

বৌদ্ধরা আবারো ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ওপর বিজয়ী হয়। পাল আমলে আবারো বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা চালু হয়।  পাল আমলে মুসলিমরা সারা বিশ্বে মাদরাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। সে সময়ে সভ্যতায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল বাগদাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলায়ও মুসলিমরা আসতে শুরু করেছে ও এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের প্রায় সবাই মুসলিম হয়ে গেছে। বহুঈশ্বরবাদীদের মধ্যে যারা নিন্ম বর্ণের ছিল তারা ও বৌদ্ধরা দ্রুতগতিতে ইসলামে দাখিল হতে থাকে। মুসলিমরা পাড়াভিত্তিক মক্তব ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। এই নিয়ে হিন্দু/ আর্য জমিদারদের সাথে প্রায়ই বিবাদে লিপ্ত হতে হতো। বিহার বা বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাও হতো। ফলে দেখা যায় উচ্চশিক্ষার জন্য সকল ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম) লোকেরা বৌদ্ধবিহারে যেতেন। 

এরপর আসে সেন আমল অর্থাৎ আর্য হিন্দুদের আমল। এবার তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার প্রতিষ্ঠান পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। তবে সেগুলো ছিল উচ্চ বর্ণের মানুষদের জন্য। বিহারগুলোর সাথে অসহযোগিতা ও ক্ষেত্র বিশেষে বন্ধ করে দিত। বেশিরভাগ সমস্যা হতো মুসলিমদের মাদরাসার সাথে। বাংলার বৌদ্ধরা ও মুসলিমরা বর্বর সেনদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে দিল্লির সুলতান, সিন্ধের মুসলিম শাসকদের কাছে প্রায়ই আবেদন করতেন। 

কিন্তু বাংলায় রাস্তাঘাটের অপ্রতুলতা ও স্থল যোগাযোগের সুবিধা বেশি না থাকায় মুসলিমরা শাসকরা বাংলা কন্ট্রোলে আনতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে ১২০৫ সালে আমাদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আসেন আফগানিস্তানের ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি। তাঁর হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর ধরে চলে মুসলিম শাসন। বাংলার শাসন ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সভ্যতার উৎকর্ষ, বস্ত্র ও জাহাজ শিল্পের উন্মেষ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবই হয় ৫৫০ বছরে। অনেক পর্যটক এই বাংলাকে পৃথিবীর জান্নাতের সাথে তুলনা করেছেন। এখানের প্রাচুর্য ও এখানের মাটিতে সারাবছর কৃষি কাজ করা যায় বিধায় এখানের মানুষ অভাবে পড়তেন না। যারা এখানে ব্যবসা ও ধর্মপ্রচারে এসেছেন তাদের সিংহভাগ এত সুন্দর পরিবেশ দেখে এখানে স্থায়ীভাবে থেকে গেছেন। আমার পূর্বপুরুষরাও এভাবে এই অঞ্চলের বাসিন্দা হয়ে যান। 

বাংলায় সুলতানী আমলে শিল্পের বিপ্লবের মূলে ছিল এখানের বড় বড় মাদরাসাগুলো। বাংলার মুসলিম শাসনের শুরু থেকেই পাড়া ও মহল্লাভিত্তিক মাদরাসা, মসজিদভিত্তিক মক্তব চালু হয়ে যায়। মুসলিম সন্তানদের পাশাপাশি সকল ধর্মের মানুষ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিতেন। তখন সেক্যুলার শিক্ষা ছিল না। মাদরাসাগুলোতেই ইতিহাস, রাজনীতি, ধাতুবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কবিতা, ভাষাবিজ্ঞান, আইনশাস্ত্র, রসায়ন, ভৌতবিজ্ঞান সবই পড়ানো হতো। পাশাপাশি ফিকহ, হাদীস, তাফসীরও পড়ানো হতো। 

বাংলায় ১ম বিশ্ববিদ্যালয় মানের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন শেখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। তিনি ছিলেন হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ইসলামি আইনবিদ। রসায়ন, ভৌতবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। স্বাধীন সুলতানি আমলে বাংলায় আসেন তিনি। সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের শাসনকালে (১২৬৬-৮৭) তিনি দিল্লিতে পৌঁছেন এবং সেখান থেকে বাংলায় আসেন। এরপর সোনারগাঁতে তিনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরকম আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো তৎকালীন গৌড় ও বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মাদরাসা। 

সাড়ে পাঁচশত বছরে বাংলায় হাজার হাজার মাধ্যমিক মাদরাসা ও শ'খানেক জামেয়া/ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পরাজয়ের ক্ষত আমাদের এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ইংরেজরা সমস্ত মাধ্যমিক মাদরাসা ও জামেয়া বন্ধের ঘোষণা দেয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত নিষ্কর লাখেরাজ সম্পত্তি সরকারের অধিকারে নিয়ে নেয়। এতে মাদরাসাগুলোর আয় বন্ধ হয়ে যায়। মাদরাসায় জমি সরকার দখল করে প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেয়। এরপরও কিছু প্রসিদ্ধ শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে নিজ বাড়িতে শিক্ষা চালু রাখার চেষ্টা করেন। সেসব শিক্ষকদের নির্মমভাবে খুন করে ইংরেজরা। 

১০ বছরের মধ্যে তারা বাংলাসহ উপমহাদেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে এক মূর্খ সমাজে পরিণত করার চেষ্টা চালায়। তাদের টার্গেট ছিল উপমহাদেশের মানুষ কেবল কৃষিকাজ করবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না। 

১৮০০ সাল থেকে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষানীতির নামে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। নতুনভাবে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পাঠ্য কার্যক্রমের পরিকল্পনা করে। এতে তাদের টার্গেট ছিল ভারতীয়রা যাতে ইংরেজদের প্রতি অনুগত থাকে সেরকম শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। এজন্য তারা মুসলিম শাসনামলকে অন্ধকারচ্ছন্ন মধ্যযুগ বলে অভিহিত করে। তাদের পুরাতন সভ্যতাগুলো মহান ও মানবিক সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করে। ইংরেজরা এদেশ থেকে মুসলিম শাসকদের হটিয়ে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছে এমন কথা দ্বারা পাঠ্যক্রম সাজায়। যাতে ভারতীয়রা ইংরেজদের মহান ভাবে। ইংরেজদের অনুসরণ করে তাদের অনুগত থাকাকে গর্বের বিষয় হিসাবে ভেবে নেয়। 

১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি মেকলে তাঁর বিখ্যাত পাশ্চাত্য শিক্ষানীতির প্রস্তাব বড়লাটের কাছে পেশ করেন। এই প্রস্তাবের প্রধান দিকগুলি হল –

(১) তিনি প্রাচ্যের সভ্যতাকে ‘দুর্নীতি, অপবিত্র ও নির্বুদ্ধিতা’ বলে অভিহিত করে সরাসরি পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
(২) তাঁর মতে প্রাচ্যের শিক্ষায় কোনও 'বৈজ্ঞানিক চেতনা' নেই এবং তা পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা অপেক্ষা সম্পূর্ণভাবে নিকৃষ্ট (Oriental learning was completely inferior to European learning”)।
(৩) তাঁর মতে, “ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি তাক আরব ও ভারতের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ। বলা বাহুল্য, মেকলের এই মত ছিল সম্পূর্ণভাবে অহমিকা-প্রসূত ও অজ্ঞানতাপূর্ণ।
(৪) তিনি বলেন যে, উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃত হলে তা ‘ক্রমনিম্ন পরিস্রুত নীতি’ (Downward Filtration Theory) অনুযায়ী ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
(৫) মেকলের লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক বিজয়। তিনি বলেন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে এমন এক ভারতীয় গোষ্ঠী তৈরি হবে যারা “রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ।”

মেকলের এই প্রস্তাবনা অনুসারেই পাশ্চাত্য শিক্ষাক্রম চালু করে করে ইংরেজরা। একই সাথে ইংরেজরা পাঠ্যক্রমে 'বৈজ্ঞানিক চেতনা'র নামে সেক্যুলার শিক্ষা চালু করে। যাতে মানুষ জীবন যাত্রায় ধর্মের কোনো সংযুক্ততা না পায়। ধর্মকে শুধুমাত্র আচার ও রীতিনীতি সর্বস্ব সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। মুসলিম ও হিন্দুরা যাতে ভেবে নেয় ধর্মই তাদের পিছিয়ে যাওয়া ও পরাজিত হওয়ার মূল কারণ। যত দ্রুত ধর্মকে ছেড়ে দেবে ততই উন্নতি হবে এমন শিক্ষা দেওয়া হয় ভারতীয়দের। ইংরেজদের এই পাশ্চাত্য শিক্ষানীতি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে উপমহাদেশে। নির্যাতন, দুর্নীতি ও শোষণ করে দুর্ভিক্ষে ঠেলে দিলেও ইংরেজদের সভ্য ও মহান ভাবতে থাকে এই অঞ্চলের মানুষরা।

নানা ঘটনা ও উপ-ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে আমরা ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করি। কিন্তু আমাদের নীতি নির্ধারকেরা পূর্বের মিথ্যা ও ফাঁকা বুলি সর্বস্ব শিক্ষানীতিকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হয় নি। পাকিস্তান আমলে পূর্বের পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে কিছু ধর্মীয় শিক্ষা যুক্ত হয়েছে ও ইতিহাসে মুসলিম শাসনকে পুনরায় আলোকজ্জল হিসেবে দেখানো ছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নি। তাতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব কাটানো যায় নি। ইংরেজি সভ্যতা, তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও তাদের আইন দিয়ে বিচার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হয়। এটিও হয়েছে পাশ্চত্য শিক্ষানীতির জন্য।

১৯৭১ সালে আমরা পুনরায় স্বাধীন হই। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ৭ টি শিক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে। প্রথমটি ছিল শেখ মুজিবের সময়কালে কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন। এই কমিশন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক গলদ ঢুকিয়ে দেয়। পাশ্চাত্য শিক্ষার পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদ প্রবেশ করানো হয়। এরপরে যতগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে তার কোনোটাই পাশ্চাত্য ও সেক্যুলার শিক্ষানীতি থেকে বের হতে পারেনি। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে এই হিন্দুত্ববাদ কিছুটা দূর হলেও ২০০৯ সালে কবির চৌধুরীর শিক্ষানীতি পুনরায় হিন্দুত্ববাদ ঢুকিয়ে মুসলিম পরিচয়কে মুছে দিতে চাইছে।  

এদেশের মুসলিমরা ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেও এখন পর্যন্ত ১৭৫৭ সালের পরাজয়ের গ্লানি টেনে বেড়াচ্ছে। দেশের সীমারেখা পরিবর্তন হয়েছে, উপনিবেশিক ও অত্যাচারী এদেশ ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশী ও মুসলিম হিসেবে স্বতন্ত্র শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হইনি। ইংরেজদের পাশ্চাত্য শিক্ষানীতির সাথে হিন্দুত্ববাদ যুক্ত করে এক আত্মঘাতী জগাখিচুড়ী শিক্ষা কার্যক্রম চলছে বাংলাদেশে। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান আমল থেকেই সেক্যুলার শিক্ষা বাদ দিয়ে বাংলার স্বর্ণযুগ মুসলিম শাসনামলের মতো জাগতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ে সমন্বিত শিক্ষার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা চালান। শিক্ষা কীরূপ হবে এই নিয়ে ঢাবিতে একটি বিতর্কসভার আয়োজন করা হয়। জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেক ইসলামের আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জন্য বলিষ্ঠভাবে বক্তব্য রাখেন। তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যে সেক্যুলার শিক্ষার পক্ষে থাকা লোকদের বক্তব্যগুলো অসার ও অবৈজ্ঞানিক প্রমাণিত হয়। এই বক্তব্য দেয়ার অপরাধে ঢাবির প্রাণরসায়ন বিভাগের ছাত্র আব্দুল মালেককে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ঢাবি ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন।

আমরা এখনো সেই অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থায় থাকায় আমাদের জাতি গঠনে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের সন্তানেরা ইউরোপে যাওয়াটাকেই সফলতা জ্ঞান করে। একটা গোলামী মানসিকতা তৈরি হয়েছে। পড়ালেখার উদ্দেশ্য হয়েছে চাকুরি করা ও যেকোনো ভাবে টাকা উপার্জন। গবেষণা উঠেই গেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে পশ্চাতপদ মনে করে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছি। আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে এক উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছি। শিক্ষিতদের অধিকাংশই দুর্নীতির সাথে যুক্ত হয়েছে। সেক্যুলার শিক্ষা আমাদের ভালো মানুষ হতে শেখায় না। যা আমাদের জাতীয় মেরুদণ্ডকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে টু দ্য পয়েন্ট প্রস্তাবনা সব শিক্ষা কমিশনকেই দিয়েছে। এই নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও একটি প্যারালাল একটি শিক্ষা বোর্ড চালু করেছে জামায়াত। শুধু তাই নয়, জামায়াতের শিক্ষা বোর্ড প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রমের আলোকে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করেছে। এসব সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তককে ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য জেলাভিত্তিক স্কুল ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্কুল ও মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানের সমন্বয় করছে। আলোকিত মানুষ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় উদ্যোগটি এখনো পাইলট প্রকল্প হিসেবেই চালু আছে। এর মধ্যে আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো গত এক দশকে এই সকল স্কুলের প্রায় সবই সরকার দখল করে নেয়।

২৯ জানু, ২০২৩

খিলাফত পর্ব-৪৩ : আয়িশা রা. ও আলী রা.-এর মধ্যেকার ভয়াবহ যুদ্ধ


আলী রা. খিলাফতের দায়িত্ব নেয়ার পর সাহাবাদের মধ্য থেকে প্রথমে তালহা রা. ও যুবাইর রা. খলিফা হত্যার কিসাস দাবী করেন। আলী রা. তাদের বুঝালেন এবং বললেন, যেহেতু বিদ্রোহীরা মদিনার সর্বত্র বিরাজ করছে এবং তাদের সাপোর্টে একটা বড় সংখ্যক জনগণ রয়েছে তাই এটা সাবধানে করতে হবে। আগে রাষ্ট্রের সংহতি নিশ্চিত হোক, রাষ্ট্র কন্ট্রোলে আসুক তারপরে হত্যাকারীদের শনাক্ত ও শাস্তি দেওয়া যাবে। তালহা রা. ও যুবাইর রা. বুঝলেন ও ফিরে গেলেন।

তৎকালে মদিনার সাহাবীরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে যান। একদল ছিল আলী রা.-এর পক্ষে। এরা মূল দল। তারা আলী রা.-এর সিদ্ধান্ত ও শাসনে খুশি ছিলেন। এদের মধ্যে প্রায় সবাই উসমান রা.-এর হত্যার বিচার চান। তবে পরিস্থিতি পূর্ণরূপে আলী রা.-এর নিয়ন্ত্রণে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। উসমান রা.-এর সময়ের মিসরীয় ও বসরার বিদ্রোহীরাও আলী রা.-এর পক্ষে ছিলেন।

দ্বিতীয় দল কতিপয় সাহাবী রা.-এর নেতৃত্বে ছিল। এদের মধ্যে আয়িশা রা., যুবাইর রা., তালহা রা., মুয়াবিয়া রা. ছিলেন উল্লেখযোগ্য। উসমান রা.-এর হত্যার কিসাস তারা এখনই কার্যকরের ব্যাপারে আগ্রহী। আলী রা. এই সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন বিধায় তারা আলী রা.-এর বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন। উমাইয়া পরিবারের প্ররোচনায় এই দলের কেউ কেউ আলী রা.-কে উসমান রা.-এর হত্যাকারী এবং হত্যাকারীদের শেল্টারদাতা হিসেবে মনে করতে লাগলেন। এখানে লক্ষ্যণীয় আবু বকর রা.-এর দুই সন্তান মুহাম্মদ ও আব্দুর রহমান রা. ছিলেন আলী রা.-এর পক্ষে অন্যদিকে অন্য সন্তান আয়েশা রা. ছিলেন বিপক্ষে।

তৃতীয় দল কোনো কিছু বুঝে উঠতে সক্ষম ছিলেন না। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না বিধায় তারা নিরপেক্ষ থাকলেন। এদের সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা., আবু হুরাইরা রা. এবং আবু মুসা আশআরি রা. ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তারা কোনো পক্ষে অবস্থান না করে নিজের ঘরে অবস্থান করাটাকে শ্রেয় মনে করেছেন।

আলী রা. প্রথমে রাষ্ট্রীয় শৃংখলা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনায় এবং বিদ্রোহীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কিছুটা বিলম্ব করেন। এতে কেউ কেউ আলী রা.-এর প্রতি রুষ্ট হন। অন্যদিকে হজ্জের মওসুম হওয়ায় রাসূল সা.-এর স্ত্রীগণ সহ বহু সাহাবী হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় ছিলেন। এভাবে চার মাস অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর তালহা ও যুবায়ের রা. আলী রা.-এর ওপর বিরক্ত হয়ে মক্কায় গমন করেন। উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা. উসমান রা.-এর খুনীদের শাস্তির দাবীতে মক্কার হাতিমে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন।

তাঁকে কেন্দ্র উসমান রা.-এর হত্যার বদলা চাওয়া লোকেরা জমায়েত হতে শুরু করলো। আয়িশা রা. আলী রা. বিরোধী শিবিরের অঘোষিত নেতা হয়ে গেলেন। তাদের দাবী উসমান হত্যার বদলা না নিয়ে এক মুহূর্তও শাসন ক্ষমতায় থাকা থাকা যাবে না। আগে খলিফা হত্যার বিচার করতে হবে। মদিনা থেকে মিশরীয় বিদ্রোহীদের শাস্তি দিয়ে বিতাড়িত করতে হবে ইত্যাদি। এদিকে বসরায় একদল লোক উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে দল গঠন করলো। তাদের সাথে যুক্ত হতে চাইলেন মক্কায় খুনের বদলা নিতে চাওয়া লোকেরা। উসমান হত্যার ক্বিসাস গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বসরায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং আয়েশা রা.-এর নেতৃত্বে মক্কা থেকে তালহা রা., যুবায়ের রা. প্রমুখ সাহাবী বসরার পথে রওয়ানা হন।

পথিমধ্যে আয়িশা রা. বসরার নিকটবর্তী ‘হাওআব’ নামক স্থানে পৌঁছলে কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তখন তাঁর রাসূল সা.-এর হাদীসের কথা মনে পড়ে যায়। একদা রাসূল সা. তাঁকে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যকার একজনের অবস্থা কেমন হবে, যখন হাওআবের কুকুর তার বিরুদ্ধে ঘেউ ঘেউ করবে? (হাকেম হা/৪৬১৩; আহমাদ হা/২৪২৯৯; ছহীহাহ হা/৪৭৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

‘তোমাদের মধ্যে উটে আরোহণকারিনীর অবস্থা কি হবে, যখন সে বের হবে? অতঃপর তার বিরুদ্ধে হাওআবের কুকুরগুলি ঘেউ ঘেউ করবে? তার ডানে ও বামে বহু মানুষ নিহত হবে। এরপর কোন মতে সে প্রাণে রক্ষা পাবে’ (মুসনাদে বাযযার হা/৪৭৭৭; মাজমাঊয যাওয়ায়েদ হা/১২০২৬, সনদ সহীহ)। তখন আয়িশা রা. বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মনস্থ করলেন। এমন সময় যুবায়ের রা. বললেন, না বরং আপনি সামনে অগ্রসর হন। লোকেরা আপনাকে দেখে হয়ত সন্ধিতে চলে আসবে। আল্লাহ আপনার মাধ্যমে হয়তো বিবদমান দু’টি দলের মধ্যে মীমাংসা করে দিবেন। তখন তিনি সামনে অগ্রসর হন’ (হাকেম হা/৪৬১৩; আহমাদ হা/২৪২৯৯; ছহীহাহ হা/৪৭৪)।

এই ঘটনাগুলো ৩৬ হিজরির কথা। ৩৫ হিজরিতে আলী রা. খলিফা হন। এরপর সিরিয়ার গভর্নর আলী রা. নির্দেশ না মানলে তিনি সিরিয়ায় সফর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বসরায় সংগঠিত বিদ্রোহ ঠেকাতে তিনি সিরিয়ার দিকে না গিয়ে বসরার দিকে রওনা হন।

আলী রা. কা'কা' রা.-কে বসরায় তালহা ও যুবায়র রা.-এর কাছে দূতরূপে পাঠালেন সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে এবং বিভেদ-বিভক্তি ও দলাদলিকে ভয়ংকর সাব্যস্ত করে। কা'কা' রা. বসরায় পৌঁছেছে প্রথমে আয়েশা রা.-এর কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, আম্মাজান! আপনি কেন এদেশে এলেন? তিনি বললেন, 'প্রিয় বৎস! মানুষদের মধ্যে আপোস-মীমাংসার উদ্দেশ্যে। কা'কা' রা. তালহা ও যুবায়র রা.-কে ডেকে আনার আবেদন করলেন। তাঁরা উপস্থিত হলে কা'কা' রা. তাঁদের বললেন, “আমি উম্মুল মু'মিনীনকে এখানে আগমনের হেতু জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, মানুষদের মধ্যে আপোসরফা করার উদ্দেশ্যে। তারা দু'জন বললেন, আমরাও একই উদ্দেশ্যে এসেছি।

কা'কা' রা. বললেন, তবে আপনারা আমাকে অবহিত করুন, এ আপোসের পন্থা কী হবে? কিসের ভিত্তিতে হবে? আল্লাহর কসম! তা আমাদের বোধগম্য হলে আমরাও আপোসে সাড়া দিব। তারা দু'জন বললেন, উসমান হত্যাকারীদের বিষয়টি। কেননা, এটি বর্জন করা হলে তা হবে কুরআন বর্জন করা। কা'কা' বললেন, তাঁর হত্যাকারীদের মধ্যে বসরার লোকদের আপনারা হত্যা করেছেন। কিন্তু তাদের হত্যা করার পূর্বে আপনারা আজকের স্থিরতার চেয়ে অধিক স্থির পরিস্থিতির নিকটবর্তী ছিলেন। আপনারা ছয় শত জনকে হত্যা করলে ছয় হাজার তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আপনাদের বর্জন করেছে এবং আপনাদের মধ্য হতে বের হয়ে গিয়েছে।

আপনারা হুরকুস ইবন যুহায়রকে (বসরার বিদ্রোহী নেতা) পাকড়াও করার জন্য সন্ধান করলে ছ'হাজার লোক তাকে রক্ষা করার জন্য দাঁড়িয়েছে। এখন যদি আপনারা তাদের ছেড়ে দেন তবে অন্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন আপনারা সে অপরাধে দায়ী হলেন। আর যদি আপনারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং তারাও পাল্টা আঘাত হানে তবে তো আপনারা যে উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছেন এবং যা প্রতিরোধে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে আমি দেখতে পাচ্ছি তার চেয়ে যে বিষয়ের ভয়ে আপনারা ভীত-সন্ত্রস্ত তা অনেক সঙ্গীন রূপ ধারণ করবে। অর্থাৎ আপনাদের দৃষ্টিতে আপনাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় তথা উসমান হত্যাকারীদের হত্যা করা একটি কল্যাণকর্ম । কিন্তু তাতে এমন অকল্যাণ ও বিশৃংখলা জন্ম নিবে যা উক্ত কল্যাণের চেয়ে অধিক ভয়ংকর।

আর আপনারা যদি হুরকুস ইবন যুহায়র হতে উসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে এ কারণে অক্ষম হয়ে থাকেন যে, তার হত্যাকারীদের হাত হতে তাকে সুরক্ষার জন্য ছয় হাজার লোক প্রস্তুত রয়েছে তবে তো চলমান পরিস্থিতিতে বর্জন করার ক্ষেত্রে আলী রা.-এর অপারগতা অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি তো উসমান হন্তাদের উপর কর্তৃত্ব বিস্তারে নিশ্চিন্ত হওয়া পর্যন্ত তাদের হত্যা করার পরিকল্পনা মুলতবি করেছেন মাত্র। কারণ, জনতার মনোভাব ও বক্তব্য বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হয়ে রয়েছে। কা'কা রা. তাদের একথাও অবহিত করলেন যে, সংঘটিত এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রাবী'আ ও মুযার গোত্রের এক বিশাল বাহিনী সমবেত হয়ে রয়েছে।”

এ পর্যায়ে উন্মুল মু'মিনীন আয়েশা রা. বললেন, তোমার মতামত কি? কা'কা রা. বললেন, আমি বলতে চাই, যা কিছু ঘটেছে তার প্রথম ওষুধ হলো পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা। পরিস্থিতি শান্ত হলেই ওরা ধরা পড়বে। কাজেই আপনারা আমাদের বায়'আত মেনে নিলে তা হবে কল্যাণের প্রতীক, রহমানের সুসংবাদের বার্তা ও হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের সময় চলে আসবে। আর যদি আপনারা হটকারীতাই করতে থাকেন এবং নতুন নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে থাকেন তবে তা হবে অকল্যাণের প্রতীক ও ইসলামের বিদায় ঘণ্টা। কাজেই শাস্তি-শৃংখলাকে অগ্রাধিকার দিন, তা প্রাপ্তির সুযোগ গ্রহণ করুন এবং যেমন পূর্বেও ছিলেন, কল্যাণের চাবিকাঠি হোন। আমাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিবেন না, তাতে আপনারাও তার সম্মুখীন হবেন এবং মহান আল্লাহ্ আমাদের ও আপনাদের ধরাশয়ী করবেন।

তাঁরা বললেন, তুমি সুন্দর বলেছ ও সঠিক বলেছ। এখন ফিরে যাও। আলীও তোমার অনুরূপ মতামত নিয়ে আগমন করলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তখন কা'কা' রা. 'আলী রা.-এর কাছে ফিরে গিয়ে তাঁকে সব বিষয় অবহিত করলে বিষয়টি তাঁর মনঃপূত হলো এবং সমবেত জনতা আপোস-সন্ধির দিকে অগ্রণী হলো। যারা (অন্তরে) তা অপছন্দ করল তারা অপছন্দ করল এবং যারা পছন্দ করল তারা পছন্দ করল। আয়েশা রা. ও আলী রা.-এর কাছে এ মর্মে দূত পাঠালেন যে, তিনি আপোস-সন্ধির জন্যই এসেছেন। এতে উভয় পক্ষ আনন্দিত হলো। আলী রা. লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি জাহিলী যুগ ও তার অকল্যাণের কথা ও অপকর্মসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও দলবদ্ধতার সৌভাগ্যের কথা উল্লেখ করলেন।

তিনি আরও বললেন, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর ওফাতের পরে এ উম্মতকে খলীফা আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর নেতৃত্বে একত্রিত করে দিয়েছিলেন। তাঁর পরে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর নেতৃত্বে, তারপর উসমান রা.-এর নেতৃত্বে। তারপর এ দুর্ঘটনার সূত্রপাত হলো যা সমগ্র উম্মতকে ঘিরে ফেলেছে। একদল লোক দুনিয়ালোভী হয়ে মহান আল্লাহ্ বাদের দুনিয়ার নিয়ামত দান করেছেন তাদের প্রতি মহান আল্লাহ্ যে মাহাত্ম্য ও মর্যাদা দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন তার প্রতি হিংসায় আক্রান্ত হলো। তারা ইসলামকে ও এ বিষয়গুলোকে পিছনে সরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা করল; মহান আল্লাহ্ অবশ্যই তাঁর কর্ম সম্পন্ন করবেন। পরে তিনি বললেন, শোন! আমি আগামী দিন সফর শুরু করব, তোমরাও বেরিয়ে পড়বে। যারা উসমান হত্যায় কোন কিছু দিয়ে কোন প্রকার অংশগ্রহণ করেছে তারা আমার সঙ্গে যাবে না।

আলী রা.-এর এই ঘোষণায় উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা আড়াই হাজার বিদ্রোহী শঙ্কিত হয়ে পড়ে। আলী রা. বসরা থেকে চলে যেতে উদ্যত হলে তালহা রা. ও যুবাইর রা. বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা করে। এরপর আলী রা. তালহা ও যুবায়র রা.-এর কাছে পত্র পাঠালেন যে, তোমরা কা'কা' ইবন 'আমরকে যে কথার উপরে ফেরত পাঠিয়েছিলে তাতে অবিচল থাকলে হাত গুটিয়ে রাখো, যাতে আমরা অবস্থান নিয়ে বিষয়টির প্রতি নজর দিতে পারি। তাঁরা দুইজন পত্রের জবাবে অবহিত করলেন যে, মানুষের মধ্যে আপোসরফার যে কথার উপরে কা'কা' ই আমরকে ফেরত পাঠিয়েছিলাম আমরা তাতে অবিচল রয়েছি। এতে সকল মানুষ শান্ত ও নিশ্চিন্ত হলো এবং উভয় বাহিনীর লোকেরা তাদের সংগী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিলিত হলো।

সন্ধ্যায় আলী রা. আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন 'আব্বাস রা.-কে অপর পক্ষের কাছে পাঠালেন এবং তারা মুহাম্মদ ইব্‌ন তুলায়বা সাজ্জাদকে আলী রা.-এর কাছে পাঠাল। ফলে জনতা একটি সুখময় রাত অতিবাহিত করলো। তবে উসমান হত্যাকারীরা একটি ভয়ানক রাত অতিবাহিত করল। তারা রাতভর সলা-পরামর্শ করে কাটাল এবং শেষ রাতের আঁধারের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হলো।

সিদ্ধান্তমতে ফজরের সময় শুরু হওয়ার আগেই তাদের প্রায় দুই হাজার লোক উঠে পড়ল এবং প্রত্যেক উপদল তাদের আপনজনদের কাছে পৌঁছে তরবারি দ্বারা আক্রমণ চালাল। এতে প্রত্যেক উপদল আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের বড় দলের কাছে ছুটে গেল। ঘুম ভাঙ্গা লোকেরা নিজ নিজ অস্ত্র হাতে তুলে নিল। তারা বলতে লাগল, কুফাবাসীরা (আলী রা.-এর বাহিনী) রাতের আঁধারে আমাদের উপর আক্রমণ করেছে এবং আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা ধারণা করল যে, আলী রা.-এর সঙ্গে আগতদের কোন একটি দল এ কাজ করেছে। আলী রা.-এর কাছে সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, লোকদের কি হয়েছে? লোকেরা বলল, বসরাবাসীরা আমাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এতে প্রত্যেক পক্ষ তার অস্ত্রের কাছে ছুটে গেল এবং বর্ম পরিধান করে অশ্বারোহী হলো। তাদের কেউই বাস্তবে কি ঘটেছে তা অনুধাবন করতে পারল না।

অশ্বারোহীরা দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হলো। বীর বাহাদুররা চক্কর দিয়ে দিয়ে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করল। যুদ্ধ তার নখর বসিয়ে দিল। এক সময় উভয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাড়াল।কঠিন যুদ্ধের প্রাক্কালে আলী রা. তালহা রা. ও যুবায়র রা.-এর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের খোঁজাখুঁজি করলেন। পরে তাঁরা (যুদ্ধক্ষেত্রেই) সমবেত হলেন, এমনকি তাদের ঘোড়াগুলির ঘাড় পরস্পর মিলিত হলো।

আলী রা. যুবায়র রা.-কে বললেন, তোমাকে কে বের করে আনলো (বিদ্রোহী করল)? 'যুবায়র রা. বললেন, তুমিই। এছাড়া এ বিষয়ের জন্য আমি তোমাকে আমার চেয়ে অধিক যোগ্য অধিকারী মনে করি না। আলী রা. তাকে বললেন, সে দিনটির কথা কি তোমার মনে পড়ে যে দিন আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর সঙ্গে বনু গুমের এলাকায় পথ চলছিলাম। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন, আমিও তাঁর দিকে তাকিয়ে হেসেছিলাম। তখন তুমি বলেছিলে, ইব্ন আবু তালিবের গর্বিত আচরণ আর গেল না। তখন রাসূলুল্লাহ্ বলেছিলেন- “সে অহংকারী নয়, তুমি অবশ্যই তার সঙ্গে যুদ্ধ করবে এবং তখন তুমি তার প্রতি জুলুমকারী হবে।”

যুবায়র রা. বললেন, আল্লাহর কসম, হ্যাঁ (আমার মনে পড়েছে)। আগে তা আমার স্মরণে থাকলে আমি আমার এ সফরে বের হতাম না। এখন, আল্লাহর কসম! তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। তখন যুবাযর রা. সারি ভেদ করে চলে যেতে লাগলেন। একই কথা আলী রা. তালহা রা.-কেও বললেন। তালহা রা.-ও যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে চাইলেন। তিনি যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ার সময় যুদ্ধক্ষেত্রেই একটি অজ্ঞাত তীর তাঁকে আঘাত করল- কথিত মতে মারওয়ান ইবনুল হাকাম সেটি মেরেছিল। মহান আল্লাহ্ সমধিক অবহিত। এই তীরের বিষক্রিয়ায় তিনি শাহদাতবরণ করেন। যুবাইর রা.-ও ফিরে যাওয়ার সময় যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে শাহদাতবরণ করেন।

আয়েশা রা. তাঁর হাওদায় বসে এগিয়ে চললেন এবং বসরার কাজী কা'ব ই সিওয়ারের হাতে একখানি কুরআন শরীফ তুলে তাকে বললেন, লোকদের এর দিকে আহ্বান করো। এটি ছিল সে সময় যখন যুবাইর রা. ফিরে গেলেন এবং তালহা রা. শহীদ হলেন এবং যুদ্ধের তীব্রতা প্রচণ্ড রূপ ধারণ করল। এক পর্যায়ে আয়িশা রা.-এর বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়লো। আয়িশা রা. অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। আলী রা. তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন।

এ সময় 'আলী রা.-এর ঘোষক ঘোষণা প্রচার করলো- কোন পলাতকের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে না। কোন আহতকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হবে না, বাড়িঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যাবে না। 'আলী রা. একদল লোককে আয়িশা রা.-এর বাহনটি নিহতদের মধ্য হতে সরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবন আবূ বকর রা. ও আম্মার রা.-কে একটি তাঁবু লাগিয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। ভাই মুহাম্মদ ‘আয়েশা রা.-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কোন আঘাত লাগেনি তো? তিনি বললেন, না। আর তাতে তোমার কি এসে যায়? 'আম্মার রা. তাঁকে সালাম করে বললেন, 'মা, কেমন আছেন আপনি? আয়েশা রা. বললেন, 'আমি তোমার মা নই।'

আম্মার রা. বললেন, অবশ্যই, যদিও আপনার অপছন্দ হয়। এ সময় আমীরুল মু'মিনীন আলী রা. তাঁর কাছে এলেন এবং সালাম করে বললেন, মা, কেমন অবস্থায় আছেন? 'আয়েশা রা. বললেন, ভালো। আলী রা. বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! এ সময় অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও গোত্রপতি-দলনেতাগণ এসে উম্মুল মুমিনীন রা.-কে সালাম করতে লাগলেন।

রাত ঘনিয়ে এলে উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা রা. বসরা শহরে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল তার ভাই ও বিপক্ষ দলের মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর রা.। তিনি বসরার বৃহত্তম বাড়ি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন খালাফ খুযা'ঈর বাড়িতে অবতরণ করলেন। খুঁজে খুঁজে উভয় পক্ষের আহতদের বসরার শহরে নিয়ে যাওয়া হলো। আলী রা. ঘুরে ঘুরে উভয়পক্ষের নিহতদের দেখতে লাগলেন। এর মধ্যে তালহা রা.-এর লাশ দেখতে পেয়ে খুবই কষ্ট পেলেন। তাঁর জন্য প্রশংসাসূচক কবিতা বলতে লাগলেন।

মুসলিমদের জন্য ভয়ংকর খারাপ দিন হলো বসরার এই যুদ্ধ। ইতিহাসে এই যুদ্ধের নাম উটের যুদ্ধ নামে পরিচিত। আয়িশা রা. উটের পিঠে চড়ে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে। এই যুদ্ধে অগণিত মুসলিম শাহদাতবরণ করেন। বহু মুসলিমের হাত-পা কর্তিত হয়। অনেকেই মুসলিম ভাইকে খুন না করে হাত-পা কেটে পরাজিত করতে চেয়েছেন। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরে আয়িশা রা. অনুতপ্ত হয়েছেন। যুদ্ধ না করে আলী রা.-এর সাথে সরাসরি আলোচনা করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা সঠিক হতো বলে রায় দিয়েছেন।

আলী রা.-এর পক্ষে ছিলেন প্রায় ২০ হাজার সৈন্য। তাঁর পক্ষের কমান্ডাররা হলেন, হাসান রা., হুসাইন রা., আম্মার রা., মুহাম্মদ বিন আবু বকর রা., আব্দুর রহমান বিন আবু বকর রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., আবু কাতাদা রা., আবু আইয়ুব আনসারী রা. ইত্যাদি

অন্যদিকে আয়িশা রা.-এর পক্ষে ছিলেন প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য। তাঁর পক্ষের কমান্ডাররা হলেন, মারওয়ান, ওয়ালিদ ইবনে উকবা, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা., মুহাম্মদ ইবনে তালহা রা., উমাইয়া ইবনে খালাফ ইত্যাদি। তালহা রা. ও যুবাইর রা. কমান্ডার ছিলেন কিন্তু তারা যুদ্ধ করেননি।

উভয় পক্ষে মৃত্যুবরণ করেন আড়াই হাজার সৈন্য। আহত হন পাঁচ হাজারেরও বেশি সৈন্য।



২৪ জানু, ২০২৩

ঝিনাইদহ গণহত্যা : বাংলাদেশ পুলিশের ভয়ংকর রূপ ( পর্ব – ০৩)


২০১৬ সালে ঝিনাইদহে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সমির মণ্ডল হত্যা করে দায় স্বীকার করে আইএস জঙ্গীরা। বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন আইএসের উপস্থিতি ধামাচাপা দিতে চায়। তারা তাই খুনের দায় বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। একদিকে জঙ্গীরা গুপ্তহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তাদের অপকর্মের দায় জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। 

আর তাদের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা একে একে খুন করেছে ১৪ জন নীরিহ মানুষকে। ঝিনাইদহ গণহত্যার ৯ম শিকার হলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুল ইসলাম মামুন। তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ঝিনাইদহ শহরের একটি থানার অর্থ সম্পাদক ছিলেন সাইফুল ইসলাম। সাইফুল ইসলামের বাড়ি ঝিনাইদহের জেলার শৈলকূপা উপজেলার ফুলহরি ইউনিয়নে। 

সাইফুল ইসলামের বাবা লুৎফর রহমান অভিযোগ করে বলেন, গত ১ জুলাই ২০১৬ তারিখ শুক্রবার গভীর রাতে ঝিনাইদহ শহরের পবহাটীর টুলু মিয়ার বাড়ির ছাত্রাবাস থেকে পুলিশ তার ছেলেকে আটক করে নিয়ে যায়। সাইফুলের আটকের খবর থানা থেকেই তাকে জানানো হয়। এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল ফোন থেকে তাকে জানানো হয়। 

খবর পেয়ে সাইফুল ইসলামের বাবা শনিবার দুপুরে তার প্রতিবেশী কাজিপাড়া গ্রামের তপন কুমার ঘোষসহ ঝিনাইদহ সদর থানায় খবর নিতে আসেন। এ সময় দূর থেকে দেখেন সাইফুল ইসলাম থানা হাজতে আছে। দূর থেকে তাদের ইশারাও হয়। বিকাল ৩টার দিকে খাবার দিতে গেলে থানা থেকে জানানো হয় সাইফুল নামে থানায় কেউ নেই। এবার পুলিশ সাইফুলের গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। সাইফুলের বাবাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।  

অবস্থা বেগতিক দেখে সাইফুলের পরিবারের সদস্যরা নিজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছে যান। এই বিষয়ে সাইফুলের মামাতো ভাই ব্যবসায়ী নাসির উদ্দীন জানান, সাইফুলকে পুলিশ গ্রেফতার ও গুম করে ফেলার পর আমরা ফুলহরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামিরুল ইসলাম বিপুল ও শৈলকুপার এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাইকে জানাই। তারা বলেছিলেন শিবির করলে আমরা কিছুই করতে পারব না। 

১৮ দিন গুম রেখে ভীষণ অত্যাচার করে সাইফুল ইসলামকে। সাইফুল ইসলাম পুরোহিত হত্যার মিথ্যা স্বীকারোক্তি না দিলে ১৯ জুলাই ২০১৬ তারিখ গভীর রাতে পুলিশ গুলি করে খুন করে সাইফুল ইসলামকে। ঝিনাইদহ সদর থানার তৎকালীন ওসি হরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশের একটি টহলদল ঝিনাইদহ-মাগুরা সড়কে আড়ুয়াকান্দি নামক স্থানে পৌঁছালে শিবিরের নেতা-কর্মীরা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ৪/৫টি হাতবোমা ছুড়ে মারে। পুলিশের আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে কমপক্ষে ২০ মিনিট গুলিবিনিময় হয়। বন্দুকযুদ্ধ শেষে শিবির নেতা-কর্মীরা পালিয়ে গেলে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ সাইফুলের লাশ উদ্ধার করা হয়। 

অথচ বাস্তবতা হলো ১ জুলাই থেকে সাইফুল ইসলাম পুলিশের কাছে বন্দি। সাইফুল ইসলামের সাথে আরো দুইজন শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সাইফুলসহ গুম থাকা সবার জন্য সাংবাদিক সম্মেলন করে পরিবারগুলো। পুলিশ গ্রেফতার করাকে স্বীকার করেনি, জিডিও গ্রহণ করেনি। সাইফুলের সাথে থাকা দুইজন পুরোহিত হত্যার স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হলে সাইফুলকে খুন করার দুইদিন আগে অর্থাৎ ১৭ জুলাই ২০১৬ তারিখে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। 

পুলিশের কথা সত্য হলে সাইফুলের শরীরে শুধু গুলির দাগ থাকতো। কিন্তু সাইফুলের পুরো শরীর জুড়ে গভীর আঘাতের চিহ্ন। তার দুইহাত ও দুই পা ভীষণ ফোলা ও আঘাতের ফলে কালো হয়ে গিয়েছিল। একই রকম আঘাতের চিহ্ন দেখা গিয়েছে স্বীকারোক্তি দেওয়া দু'জনের শরীরেও।   

২৬ জুলাই ২০১৬ তারিখে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে রমজান আলী নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পুলিশের দাবি অনুসারে ৩০ জুলাই ২০১৬ তারিখে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাটাখালী নামক স্থানে পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে রমজান আলী (৪৬) নামে একজন ডাকাত সদস্য নিহত হয়েছে। তিনি মহেশপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কুড়োন মণ্ডলের ছেলে। তিনি ঝিনাইদহ গণহত্যার ১০ম শিকার। একজন নীরিহ মানুষকে হত্যা ডাকাত বানিয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজও ঝিনাইদহ পুলিশ করেছে।

মহেশপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, পুলিশের একটি টহল গাড়ি মহেশপুর কোটচাঁদপুর সড়কের কাটাখালী নামক স্থানে পৌঁছালে ওঁৎ পেতে থাকা ডাকাত দলের সদস্যরা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছুড়ে মারে। এ সময় পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। দশ মিনিট গুলি বিনিময়ের পর ডাকাত দলের সদস্যরা পালিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অজ্ঞাত এক ডাকাত সদস্যের লাশ উদ্ধার করে। কৃষ্ণপুর গ্রামের ইউপি সদস্য ওমর আলী ও একই গ্রামের বাসিন্দা কোমল কুমার মৃতদেহটি রমজান আলীর বলে শনাক্ত করে। অথচ রমজান আলী গ্রামের বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী এবং তাঁকে ৪ দিন আগেই এরেস্ট করা হয়েছে। রমজান আলী কোনো রাজনৈতিক দলের যুক্ত ছিলেন না। 

২০১৬ সালের ২ আগস্ট যশোরের ষষ্ঠীতলা গ্রামের শরিফুল ইসলামের ট্রেনে কাটা পড়া লাশ পাওয়া যায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ফুলবাড়ী রেলগেটে। শরিফুল ইসলামের পরিবার দাবি করে ২৭ জুলাই তাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেফতার করে একদল লোক। শরিফুল কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতেন। তিনি ঝিনাইদহ গণহত্যার ১১শ শিকার 

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট গ্রেফতার হন রঘুনাথপুর হোসেন আলী আলিম মাদরাসার শিক্ষক ও মহিষগাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইদ্রিস আলী ওরফে পান্না হুজুর। পান্না হুজুর রঘুনাথপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি ছিলেন। তাকে রামচন্দ্রপুর বাজার থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় একদল লোক। এরপর অনেক স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে পাওয়া যায় নি। 

৯ আগস্ট মাওলানা ইদ্রিস আলীর স্ত্রী মমতাজ বেগম ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানান, তার স্বামীকে গত ৪ আগস্ট শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর বাজার থেকে ফেরার সময় রাত ৮টার দিকে সাদা পোশাকধারী লোকজন মোটরসাইকেলসহ তুলে নিয়ে যায়। এরপর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে অভিযোগ নেয়া হয়নি।

৮ দিন গুম করে রাখার পর ১২ আগস্ট ২০১৬ তারিখে পুলিশ হরিণাকুন্ডু-ঝিনাইদহ সড়ক থেকে লাশ উদ্ধার করার নাটক সাজিয়েছে। পান্না হুজুরের লাশ পাওয়া যায় অত্যন্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। তার হাত-পায়ের নখ ওঠানো। গায়ে প্রচুর ক্ষতস্থান। ধারণা করা হয় পুলিশের ভীষণ নির্যাতনে তিনি মৃত্যুবরণ করলে পুলিশ তার লাশের গাড়ি চালিয়ে তাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্য  হয় বলে নাটক সাজায়। মাওলানা ইদ্রিস আলী ওরফে পান্না হুজুর ঝিনাইদহ গণহত্যার ১২শ শিকার।

ঝিনাইদহ গণহত্যার ১৩শ শিকার হলেন ঝিনাইদহ পৌরসভা জামায়াতের আমীর জহুরুল ইসলাম। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ শহরের দিশারি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। সদর থানা পুলিশের এসআই আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। তারপর ওই স্থানে থাকা সি.সি ক্যামেরা ও তার রেকর্ড খুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর তাকে চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে তুলে অজানা স্থানে নিয়ে যায় এস আই আমিনুল। তার খোঁজে থানায় যোগাযোগ করে আত্মীয়রা। থানা পুলিশ দিনে দুপুরে শত মানুষের সামনে ঘটা এই গ্রেফতারের ঘটনা অস্বীকার করে।  

নিহত জহুরুল ইসলাম কালিগঞ্জ আসাদুজ্জামান হোসনেয়ারা কেয়া বাগান কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। এ ছাড়া ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা থেকে কামিল পাস করেছেন। তিনি একাধিকবার ঝিনাইদহ জেলা ও পৌর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন আগে তিনি বিয়ে করেন। জহুরুল ইসলামের খোঁজে পরিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে, জামায়াত বিবৃতি দেয় ও বিক্ষোভ মিছিল করে। কিন্তু কোথাও জহুরুল ইসলামের খোঁজ মিলে না। 

এদিকে এই ঘটনার ৬ দিন পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ শহরে বাড়ির পাশ থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় ডা. তারিক হাসান সজিবকে। ডা. সজিব ঝিনাইদহ গণহত্যার ১৪শ শিকার। তারিক হাসান সজিবের গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। তিনি আরাপপুর সেবা ক্লিনিকের পাশে বসবাস করেন। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার। তিনি বেশ কিছুদিন ঝিনাইদহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে যান। তিনি দুই বছর আগে একই এলাকার লুৎফর রহমানের মেয়েকে বিয়ে করেন। গ্রেফতারের সময় তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। 

ডা. তারিক হাসান সজিব ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরী উত্তরের অফিস সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরী পশ্চিমে স্কুল কার্যক্রম সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিহত ডা. সজিব ঝিনাইদহ ব্যাপারিপাড়ার মৃত খন্দকার আব্দুল লতিফের ছেলে। 

সজিবের মা মাহফুজা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে এমবিবিএস ডাক্তার। ১৩ সেপ্টেম্বর ঈদের পরের দিন বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের বাড়ির পাশে হাটের রাস্তা থেকে সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় একদল লোক। এরপর থেকে সে নিখোঁজ। এ ব্যাপারে ১৪ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।’

দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি জহুরুল ইসলাম ও ডা. তারিক হাসান সজিবকে। এরপর ২৬ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে তারা নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ প্রচার করে। জনপ্রিয় জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলামকে ৪৮ দিন গুম করে রেখে নির্মম নির্যাতনের পর ঠাণ্ডা মাথায় গুলী করে হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়েছে পুলিশ। একইসাথে মেধাবী ছাত্রনেতা ডা. তারিক হাসান সজিবকে ৪২ দিন গুম রেখে নির্যাতন করে খুন করে পুলিশ। 

এই দুই খুনের ব্যাপারে ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শহরের নাজির উদ্দিন সড়কে পুলিশের একটি দল ডিউটিতে ছিল। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় যুবক যাচ্ছিল। পুলিশ থামার সংকেত দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলী ও ককটেল ছোঁড়ে। আত্মরক্ষায় পুলিশও পাল্টা গুলী ছেঁড়ে। একপর্যায়ে দু’জন গুলীবিদ্ধ হয়। এ সময় অন্যরা পালিয়ে যায়। তাদের উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা হলেন-ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড আবাসিক ভবনের সমশের আলী মোল্যার ছেলে ও পৌর জামায়াতের আমীর জহুরুল ইসলাম ও আরাপপুর গ্রামের মৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মিয়ার ছেলে ও ঢাকা মহানগর পশ্চিমের ছাত্রশিবিরের সাবেক দায়িত্বশীল তারিক হাসান সজিব। 

অথচ মূল ঘটনা হলো এই দুইজন দেড় মাস ধরে পুলিশের কাছে আটক। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ডা. সজিবের জমজ দুটি মেয়ে সন্তান জন্ম নিয়েছে। যাদের মুখ তিনি মারা যাওয়ার আগে আর দেখতে পারলেন না। এই দুজনের ঝিনাইদহ পৌর এলাকায় শোক ও আতংক নেমে আসে। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে এলাকাবাসী আওয়ামী সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে অভিশাপ দিতে থাকে।  

এই ছয়জন নিরীহ মানুষকে বিনা বিচারে ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তাদের পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত সন্দেহাতীতভাবে পুলিশকে দায়ী করেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে ৬টি খুনের জন্যই এএসপি আজবাহার আলী শেখ ও ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান দায়ী। 

এর বাইরে সাইফুল ইসলামকে হত্যার জন্য হরেন্দ্রনাথ সরকার (ওসি, সদর, ঝিনাইদহ), ফয়সাল হোসেন (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ) ও সুমন হোসেন (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ) দায়ী। রমজান আলীকে হত্যার জন্য আমিনুল ইসলাম (ওসি, মহেশপুর, ঝিনাইদহ), সেলিম রেজা (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ) ও আহসান হাবিব (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ)। শরিফুল ইসলামের খুনের জন্য দায়ী আনোয়ার হোসেন (ওসি, কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ) এবং নীরব হোসেন (এসআই, কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ)। 

মাওলানা ইদ্রিস আলী হত্যার জন্য মাহাতাব উদ্দীন (ওসি, হরিণাকুন্ডু, ঝিনাইদহ) দায়ী। জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলাম ও ডা. তারিক হাসান সজিবের খুনের জন্য হরেন্দ্রনাথ সরকার (ওসি, সদর, ঝিনাইদহ), আমিনুল ইসলাম (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ), বুলবুল আহমেদ (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ), আলমগীর হোসেন (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ), আজিম উদ্দিন (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ) ও নাসিম হোসেন (কনস্টেবল, মহেশপুর, ঝিনাইদহ)।   

ঝিনাইদহ গণহত্যা : বাংলাদেশ পুলিশের ভয়ংকর রূপ ( পর্ব – ০২)

সোহান তার ছোট বোনকে সাথে নিয়ে অপেক্ষা করছিল মায়ের। মা আসবেন ঢাকা থেকে। মাকে এগিয়ে নিতে জামতলায় অপেক্ষা করছিল সোহান ও মাসুমা। এইসময় একটি ইজিবাইকে চারজন লোক এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে সোহানকে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয় মাসুমা এবং উপস্থিত জনতা। সোহানকে সাদা পোষাকে তুলে নিয়ে যায় ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ থানার দুই এসআই নীরব হোসেন ও নাসির উদ্দিন। তাদের সাথে আরো দুইজন কনস্টেবল ছিল যাদের নাম জানা যায়নি।

 

ঝিনাইদহের নূর আলি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল মহিউদ্দিন সোহান। এটা ১০ এপ্রিল ২০১৬ সালের কথা। এরপর আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না সোহানকে। কিশোর সোহানের অপরাধ সে ছাত্রশিবিরের কর্মী। সমির উদ্দিন মণ্ডল হত্যার ঘটনায় জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করতে চায় ঝিনাইদহ পুলিশ। এজন্য সোহানকে অপহরণ করে ঝিনাইদহ সহকারী পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ। সবাই খুঁজতে থাকে সোহানকে। না, কোথাও পাওয়া যায় না তাকে। পুলিশ তার অপহরণের কথা অস্বীকার করে। মামলা, জিডিও কিছুই গ্রহণ করে নি।

 

১৭ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করে সোহানের পরিবার। কিছু পত্রিকায় রিপোর্ট হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সোহানের বাবা মো. মহসিন আলী।  এ সময় সোহানের মা পারভিন খাতুন ও ছোট দুই ভাই বোন উপস্থিত ছিলেন।

 

লিখিত বক্তব্যে মহসিন আলী জানান, গত ১০ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে বিকাল ৫টার দিকে আমার বড় ছেলে কালীগঞ্জ নুর আলী কলেজের ছাত্র সোহান ঈশ্বরবা জামতলা নামক স্থানে তার মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলো। এ সময় নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চারজন লোক ইজিবাইকে করে জোরপুর্বক তাকে তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে সোহান নিখোঁজ রয়েছে। ছেলের সন্ধানে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে আমি ক্লান্ত। সবাই আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। সোহানের মা অসুস্থ। ছেলের শোকে আরও অসুস্থ হয়ে পেড়েছে।

 

উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সোহানের বাবা এবং মা তাদের আশংকার কথা উল্লেখ করে বলেন, হয়তো পুলিশের লোকজন তার ছেলেকে নিয়ে গেছে। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা অক্ষত অবস্থায় সোহানকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবী জানান। তারপরও সোহানের খোঁজ পাওয়া যায়নি কোথাও। পুলিশ সাহায্য করা তো দূরের কথা বরং অস্বীকার করে যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের পর জিডি নিয়েছে তবে হুমকি ধামকি দিয়েছে। সোহানের পরিবারকে জঙ্গী পরিবার বলেছে।

 

তার পরের দিন অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল সোহানের মা স্থানীয় এমপি আনোয়ারুল আজিমের কাছে যান ছেলেকে বাঁচাতে। আনোয়ারুল আজিম তাকে তাড়িয়ে দেন। প্রায় ৩০০ গ্রামবাসী মিলে এমপির কাছে গিয়ে অনুরোধ করে পুলিশের কাছ থেকে সোহানকে ছাড়িয়ে আনতে। তারা এও বলে, আগামী দিন থেকে সোহান ও সোহানদের পরিবার আওয়ামী লীগ করবে। এমপি আনোয়ারুল আজিম দম্ভের সাথে তাদের বলে, তোদের আওয়ামীলীগ করা লাগবে না। আওয়ামী লীগ করার জন্য লোকের অভাব হবে না।

 

এর দুইদিন পর ২০ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে কালীগঞ্জ থেকে প্রায় ৫০ কি.মি. দূরে চুয়াডাঙ্গায় সোহানের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভুলাটিয়ার মাঠে ডান হাত ভাঙ্গা, চোখ উপড়ানো মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় মহিউদ্দীন সোহানের। কান্নায় ভেঙে পড়ে সোহানের বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজন! তারা তাদের সন্তানকে হারিয়ে ফেললো। সোহানের মা সেদিন আর্তনাদ করে বলেছিলেন "মারবেই যখন আমার বাবুটারে। চোখ তুইল্যা নিলো ক্যান বাবুর?"

 

এভাবে নৃশংস নির্যাতন করেও মহিউদ্দিন সোহানের কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নিতে পারেনি পুলিশ। নানানভাবে নির্যাতন করে জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে 'ধর্মান্তরিত' হওয়া সমির উদ্দিন মন্ডলের খুনের দায় চাপাতে চেয়েছে ঝিনাইদহ পুলিশ। সোহান ছিল তাদের ৫ম শিকার।

 

ঝিনাইদহ পুলিশের ৬ষ্ঠ শিকার হলেন ছাত্রশিবির নেতা শহিদ আল মাহমুদ। শহিদ আল মাহমুদ সদর উপজেলার বদনপুর গ্রামের রজব আলীর ছেলে। ২০১৬ সালের ১৩ জুন ঝিনাইদহ শহরের বদনপুর থেকে সাদা পোষাকের একদল লোক ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাকে গাড়িতে তুলে নেয়। পুলিশ সাদা পোষাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে উপস্থিত জনতা তাদের মধ্য থেকে এসআই আমিনুর রহমান ও এসআই উজ্জলকে চিনতে পারে।

 

১৮ জুন ২০১৬ তারিখে আল মাহমুদের পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়েছিলো। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, গত ১৩ জুন রাত ১২টার দিকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার ছেলে শহীদ আল মাহমুদকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বদনপুর গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে আল মাহমুদ নিখোঁজ। ১০/১২ জন লোক একটি কালো মাইক্রোবাস ও ৩টি মোটর সাইকেল এসে তার ছোট ছেলে শহীদ আল মাহমুদকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এমতাবস্থায় তিনি এবং তার পরিবার ছেলের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শহীদ আল মাহমুদের বড় বোন মদিনা খাতুন এবং মামা ফিরোজ আহমেদ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে শিবির কর্মী শহীদ আল মাহমুদকে আটক করা হয়নি বলে জানানো হয়।

 

অন্যদিকে ১৬ জুন ২০১৬ তারিখে রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ৯ নাম্বার রোডের ১১ নাম্বার বাসার ৬ তলা থেকে ছাত্রশিবিরে সহকারী সাহিত্য সম্পাদক ও ঝিনাইদহ শহর শাখার সাবেক সভাপতি ইবনুল ইসলাম পারভেজ, ঝিনাইদহের ছাত্রকল্যাণ ও আইন সম্পাদক এনামুল হক এবং ঝিনাইদহ পলিটেকনিকের সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমানকে সাদা পোষাকের পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

 

ঝিনাইদহ গণহত্যার ৭ম ও ৮ম শিকার হলেন আনিসুর রহমান ও ইবনুল ইসলাম পারভেজ। ঢাকা থেকে ডিবি পরিচয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ঝিনাইদহে নিয়ে আসে আজবাহার আলী গং। পুলিশের কাছে আটক থাকা ৪ জনের মধ্যে একজন প্রচণ্ড নির্যাতনে পুরোহিত খুনের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২১ জুন ২০১৬ তারিখে শিবির নেতা এনামুল হককে ঝিনাইদহ আদালতে হাজির করা হয়। এসময় তার এক পা ভাঙ্গা ছিল এবং সারা শরীরে ভয়ংকর নির্যাতনের গভীর ক্ষতস্থান ছিল। এনামুল হলো ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে একজন।

 

বাকি তিনজন অর্থাৎ ১৩ জুন ঝিনাইদহ থেকে আটক হওয়া আল মাহমুদ এবং ১৬ জুন ঢাকা থেকে আটক হওয়া আনিসুর রহমান ও ইবনুল ইসলাম পারভেজের সন্ধানের দাবীতে পরিবার ও ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে একাধিকবার বিবৃতি এবং সংবাদ সম্মেলন করা হয়। একই দাবীতে ২১ জুন ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এত কিছুর পরও পুলিশ তাদের বর্বরতার অবস্থান থেকে ফিরে আসতে পারেনি।

 

১ জুলাই ২০১৬ তারিখে আল মাহমুদ ও আনিসুর রহমানকে হত্যা করে ঝিনাইদহ পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুসারে ১ জুলাই গভীর রাতে তাদের ওপর আক্রমণ করে শিবির নেতা আল মাহমুদ ও আনিসুর রহমান। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে তেতুলবাড়ীয়া এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত নাশকতা সৃষ্টির জন্য অবস্থান করছে। খবর পেয়ে ঝিনাইদহ সদর থানার টহল পুলিশ তেতুলবাড়ীয়া রাস্তা দিয়ে টহল দিচ্ছিল। পুলিশ টহলের সময় তেতুলবাড়ীয় গ্রামের উত্তর মাঠের দিকে দুর্বৃত্তরা পুলিশের গাড়ী লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ ও পাল্টা গুলি চালায়। উভয় পক্ষের প্রায় ২০ মিনিট গুলি বিনিময় হয়। এর এক পর্যায়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুইটি গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

 

নিহত আনিসুর রহমানের বাড়ি ঝিনাইদহ না হলেও তিনি ঝিনাইদহ পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেছিলেন। ঝিনাইদহে তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং পলিটেকনিক শাখার সভাপতি ছিলেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার জুগিয়ার ভাটাপাড়ায়। তিনি সাবদার হোসেন ও জাহানারা খাতুনের ৫ সন্তানের মধ্যে ছোট সন্তান। 

 

ছাত্রশিবির এই দুইজনের হত্যার প্রতিবাদ বিবৃতিতে বলে, গ্রেপ্তারের ১৭ দিন পর শিবির নেতা শহিদ আল মাহমুদ ও ১৪ দিন পর আনিসুর রহমানকে ঝিনাইদহে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। মূলত পুলিশ তাদের দীর্ঘদিন আটক রেখে পুরোহিত হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায়ের জন্য নির্মম নির্যাতন চালায়। শত নির্যাতনের পরেও মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করলে তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে পুলিশ। আমরা মনে করি, সরকার সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যা করে এর দায়ভার ছাত্রশিবিরের উপর চাপিয়ে দমন নিপীড়নের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে। এইসব হত্যার সাথে সরকার সরাসরি জড়িত

 

এই দুইজনকে হত্যার পরদিনই অর্থাৎ ২ জুলাই ২০১৬ তারিখে ইবনুল ইসলাম পারভেজকে খুন করে ঝিনাইদহ পুলিশ। ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার আড়ুয়াকান্দিতে একটি কবরস্থানের পাশে ২ জুলাই ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধের নামে ইবনুল ইসলাম পারভেজকে হত্যা করে ঝিনাইদহ পুলিশ। নিহত পারভেজ ঝিনাইদহ শহরের বনানীপাড়ার জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। তিনি ঝিনাইদহ শহর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন।

 

এই ঘটনা সম্পর্কে ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাতে ঝিনাইদহ-মাগুরা মহাসড়কে পুলিশের একটি টহল দল গাড়িতে করে টহল দিচ্ছিল। রাত আড়াইটার দিকে মহাসড়কের আড়ুয়াকান্দি কবরস্থান এলাকায় পুলিশের গাড়িটি পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করে। পরে জানা যায়, নিহত ব্যক্তি শিবিরের নেতা পারভেজ

 

পারভেজের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ছাত্রশিবির তাদের বিবৃতিতে বলে, গ্রেপ্তারের পর প্রায় ১৬ দিন গুম রেখে পুরোহিত হত্যার মিথ্যা স্বীকারোক্তির আদায় করতে তাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালায় পুলিশ। কিন্তু শত নির্যাতনের পরেও মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করলে তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে পুলিশ

 

পুরোহিত হত্যার স্বীকারোক্তি দেওয়া শিবির নেতা আমিনুল হককে ভয়ংকরভাবে অসুস্থ অবস্থায় আদালতে উপস্থাপনের মাধ্যমে এই কথা নিশ্চিত হয়ে যায়, আল মাহমুদ, আনিসুর রহমান ও পারভেজকে হত্যার জন্য নিঃসন্দেহে পুলিশ দায়ী। আমিনুলকে তাদের সাথেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের ১৫-১৬ দিন আটক রেখে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পেরে খুন করা হয়েছে।

 

স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ ভয়ংকর নির্যাতন করে। এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সন্দেহভাজনরা প্রায়ই দায় স্বীকার করে। এরকম একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো নারায়ণগঞ্জের দিশামণির ঘটনা। ৪ জুলাই ২০২০ সালে দিশা মণি এক কিশোরি নিখোঁজ হয়। তার পরিবার নিখোঁজ ডায়েরি করলে পুলিশ ঐ এলাকার তিন সন্দেহভাজন যুবককে প্রচণ্ড নির্যাতন করে হত্যার স্বীকারোক্তি আদায় করে নেয়। ঐ তিন যুবক ধর্ষণের পর হত্যার বিবরণ দিয়ে জবানবন্দি দেয়। মূলত দিশা তার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। পালিয়ে যাওয়ার ৪৯ দিন পর সে ফিরে এসেছে। এই নিয়ে দেশে তোলপাড় হয়েছে ব্যাপক। যদি সত্যিই খুন হতো দিশা অথবা আর ফিরে না আসতো তবে মিথ্যা অভিযোগে ঐ তিন যুবকের জীবন স্তব্ধ হয়ে যেত।

 

পুলিশ স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য শিবির নেতা এনামুল হককে নির্যাতন করে পা ভেঙ্গে দেয়, তার হাত পায়ের সব নখ উপড়ানো ছিল। তার পুরো শরীর থেতলে দিয়ে তার থেকে স্বীকারোক্তি নিয়েছিল। একইভাবে দেখা যায়, খুন হওয়া সোহান, আল মাহমুদ, আনিস ও পারভেজের শরীর ভীষণভাবে নির্যাতিত। কিশোর সোহানের এক চোখ উপড়ানো ছিল। ভয়ঙ্কর নির্যাতনেও এরা স্বীকারোক্তি দেয়নি বলে তাদের তাদের হত্যা ঝিনাইদহ পুলিশ।

 

সোহান, মাহমুদ, আনিস ও পারভেজ এই চারজন নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনায় তাদের পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন ছাত্রশিবির সন্দেহাতীতভাবে পুলিশকে দায়ী করেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে ৪টি খুনের জন্যই এএসপি আজবাহার আলী শেখ ও ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান দায়ী। এর বাইরে কিশোর মহিউদ্দিন সোহান হত্যার জন্য আনোয়ার হোসেন (ওসি, কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ), নীরব হোসেন (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ) ও নাসির উদ্দিন (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ) দায়ী। বাকী তিনজন হত্যার জন্য  হাসান হাফিজুর রহমান (ওসি, সদর, ঝিনাইদহ), আমিনুর রহমান (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ), উজ্জল (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ), প্রবির কুমার (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ), রাব্বি হোসেন (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ), তারিকুল ইসলাম (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ), আরিফুল ইসলাম (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ) এবং সামন্ত কুমার (কনস্টেবল, সদর, ঝিনাইদহ)।  

ঝিনাইদহ গণহত্যা : বাংলাদেশ পুলিশের ভয়ংকর রূপ ( পর্ব – ০১)

ঘটনার সূত্রপাত একজন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান নাগরিক হত্যা নিয়ে। ঝিনাইদহে হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক সমির উদ্দিন মণ্ডল ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে কাজ করছিলেন। কে বা কারা ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি তার চেম্বারে রোগী সেজে তাকে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে ঝিনাইদহ সদরের কালুহাটি গ্রামের বেলেখাল বাজারে। 

ওইদিন রাতেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) 'ধর্মান্তরিত হওয়ায়' সমিরকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে খবর দেয় জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট 'সাইট ইনটিলেজেন্স গ্রুপ'। সমির উদ্দিন ২০০১ সালে স্থানীয় 'ওয়ানওয়ে চার্চ বাংলাদেশ' এর মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন বলে দাবি করেন চার্চের ঝিনাইদহ এলাকার কো-অর্ডিনেটর হারুন অর রশিদ। হারুন আরো বলেন, "সমির খ্রিস্টধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। জঙ্গিরা এ কারণেই তাকে হত্যা করেছে।" 

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে জোর গলায় আইএসের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। তারা তাদের এই কথাকে সত্য প্রমাণ করতে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র শুরু করে। মুসলিম থেকে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া সমিরের খুনের দায় তারা জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। খুনীদের ধরার ব্যাপারে তাদের প্রচেষ্টা দেখা যায় না বরং তারা কীভাবে এর দায় জামায়াত-শিবিরের ওপরে চাপিয়ে দেবে সেই প্রচেষ্টা বেশ লক্ষ্যণীয়। 

বাংলাদেশ পুলিশ তাদের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার জন্য একে একে খুন করে ১৪ জন মানুষকে। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কয়েকজনকে সমির হত্যার স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে। যে কয়েকজন স্বীকারোক্তি দিয়েছে তারা বেঁচে আছেন। যারা শত নির্যাতনেও স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি তাদের খুন করে ফেলা হয়েছে। এই গণহত্যার মাস্টার মাইন্ড হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। মাঠ পর্যায়ে এই গণহত্যা কার্যক্রম পরিচালনা করে ঝিনাইদহের তৎকালীন এএসপি আজবাহার আলী শেখ, সদর থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান, হরিণাকুণ্ড থানার ওসি মাহাতাব উদ্দীন, মহেশপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম, কালিগঞ্জ থানার ওসি আনোয়ার হোসেন ও ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান।   

গণহত্যার প্রথম শিকার জামায়াত কর্মী ও মাদ্রাসা শিক্ষক আবু হুরাইরা মালিথা। তাঁর বয়স ছিল ৫৫ বছর। ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শৈলমারী বাজার সংলগ্ন কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে আবু হুরাইরা মালিথাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আবু হুরাইরা সদর উপজেলার অশ্বস্থলী গ্রামের মৃত আশির উদ্দীন মালিথার ছেলে। মাদ্রাসা সুপার শরিফুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন (২৩ জানুয়ারি ‘১৬) সকাল ১০টার দিকে আবু হুরাইরা মাদ্রাসার ক্লাস নিচ্ছিলেন। এ সময় মটরসাইকেল যোগে কয়েকজন সাদা পোশাকের মানুষ এসে জানান, তারা বৃহত্তর যশোর থেকে এসেছেন এবং ডিবি পুলিশের লোক। ডিবি পুলিশের কথা শুনে শিক্ষক আবু হুরাইরা তাদের সঙ্গে চলে যান। 

ডিবি পরিচয়ে শিক্ষক আবু হুরাইরাকে নিয়ে যাওয়ার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও তার পরিবারের লোকজন এক মাসেরও বেশি সময় কোথাও তাকে খুজে পাচ্ছিলেন না। ঝিনাইদহ পুলিশ ও ডিবির পক্ষ থেকেও বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান জানিয়েছে, আবু হুরাইরা নামে তারা কাউকে আটক করেননি। আবু হুরাইরার পরিবার সদর থানায় জিডি করতে গেলে তা গ্রহণ না করে পরিবারকেই খোঁজ করতে বলেছে সদর থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান। 

২৩ জানুয়ারী আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে মাদরাসা থেকে তুলে নেয়ার ১ মাস ৬ দিন পর আবু হুরাইরা মালিথার  ক্ষত-বিক্ষত লাশ ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী সোমবার যশোর চৌগাছা সড়কের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাওয়া যায়। যশোর কতোয়ালি থানা পুলিশ অজ্ঞাত হিসেবে লাশটি উদ্ধার করে। সন্ধ্যায় যশোর হাসপাতাল মর্গে লাশটি আবু হুরাইরার বলে তার ভাই আব্দুল খালেক মাস্টার শনাক্ত করেন।  

ঝিনাইদহ পুলিশের ২য় শিকার হলেন ঝিনাইদহ আলীয়া মাদ্রাসার ফাজিলের ছাত্র ও শিবির নেতা হাফেজ জসিম উদ্দীন। তাঁর বয়স ২৫ বছর। জসিমের বাবা কালুহাটি গ্রামের খলিল মন্ডল জানান, গত ১১ জানুয়ারী জসিম উদ্দীন সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি গোয়ালন্দ ঘাট পার হয়ে জসিম তার বাবাকে জানান, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন তাদের বাসটি চেক করবে বলে থামিয়েছে। এরপর থেকেই জসিমের মোবাইল বন্ধ রয়েছে। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ জানান, আবু হুরাইরা ও জসিম নামে কাউকে পুলিশ আটক করেনি। তাদের কোন তথ্যও পুলিশের কাছে নেই। অথচ দুই পরিবারের লোকেরা জিডি করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি। 

নিখোঁজ হওয়ার ২২ দিন পর ২০১৬ সালের ৪ মার্চ ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর হিঙ্গার গ্রামের একটি মাঠ থেকে থেকে জসিম উদ্দিনের হাত-পা বাঁধা গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সকালে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে অজ্ঞাত এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। তাকে চোখ ও পেছনে হাত বেধে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ সকাল ১০টার দিকে লাশ উদ্ধার করে হরিণাকুণ্ডু থানায় নেয়। ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আনোয়ার হোসেন জানান, নিহত জসিম উদ্দিন ঝিনাইদহের গান্না ইউনিয়নের শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। পুলিশ শিবির নেতা জসিমকে আটকের পর অস্বীকার করছে। গতকাল শুক্রবার সকালে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের মাঠ থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। 

নিহতর ভাই সাইফুর রহমান জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে বাসযোগে বাড়ি ফেরার পথে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে জসিমকে নামিয়ে নেয়। সেই থেকে জসিম নিখোঁজ ছিলো। শুক্রবার সকালে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া মোস্তবাপুর গ্রামের মাঠে মুখ ও পিঠমোড়া করে হাত-বাধা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায় জসিমের। সাইফুর রহমান অভিযোগ করেন, তার ভাইকে প্রশাসনের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

ঝিনাইদহে আজবাহার আলী গং-দের ৩য় ও ৪র্থ শিকার হলেন আবু যর গিফারী ও শামীম হোসেন। ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ দুপুরে জুমআর নামাজের পর ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় চাপালী গ্রামের ইসলাম আলীর ছেলে আবু জর গিফারীকে। তাঁর বয়স ২২ বছর। তিনি যশোর এম এম কলেজের অনার্সের ছাত্র। এর পরদিন ২৪ মার্চ বিকেলে বাকুলিয়া গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে শামীম হোসেনকে পুলিশ পরিচয়ে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর বয়স ২০ বছর। তিনি ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজের ছাত্র। 

আবু জর গিফারী ছাত্রশিবিরের কালীগঞ্জ পৌর শাখার সভাপতি ও শামীম হোসেন ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। আবু জর গিফারীর পিতা ইসলাম আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ২৭ দিনেও তিনি তাঁর ছেলে আবু জর গিফারীকে ফেরত পাননি। ১৮ মার্চ জুমার নামাজ পড়ে ফেরার সময় বাড়ির সামনে অপেক্ষমাণ দুটি মোটরসাইকেলে চারজন লোক ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে গিফারীকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তাদের কাছে পিস্তল ও হ্যান্ডকাপ ছিল। তিনি আরো বলেন, ‘ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর কালীগঞ্জ থানায় একটি জিডি করার জন্য আবেদন করি। পুলিশ আবেদনটি রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জিডি হিসেবে আর লিপিবদ্ধ করেনি।’ 

আরেক অপহৃত ছাত্র শামীম হোসেনের বাবা বাকুলিয়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর ছেলে ২৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে সন্ধ্যায় কালীগঞ্জ শহরের মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সেখানে অপেক্ষায় থাকা কয়েক ব্যক্তি ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাঁকে অস্ত্র দেখিয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ মিলছে না। 

২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল আবু যর গিফারী ও শামীম হোসেনের লাশ একসাথে পাওয়া যায়। সেদিন সকালে ঝিনাইদহের বারোবাজার সীমান্তে যশোর সদরের লাউখালি শ্মশান এলাকা থেকে তাদের ক্ষতবিক্ষত ও গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা যথাক্রমে ১৮ ও ২৪ মার্চ পুলিশ কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। 

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, লাউখালী গ্রামের মাঠে একটি শ্মশান রয়েছে। ১২ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে মাঠে কাজ করতে আসা লোকজন ওই শ্মশানে দুটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁরা যশোর থানার পুলিশকে জানালে যশোর কোতোয়ালি থানার পুলিশ এসে লাশ দুটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে গিফারীর চাচাতো ভাই পান্নু মিয়া গিফারীকে শনাক্ত করেন। শামীম হোসেনের ভাই তাজনিম হোসেন তাঁর মরদেহ শনাক্ত করেন।

যশোর হাসপাতাল মর্গের সামনে আবু জর গিফারীর ফুপা আক্কাস আলী গণমাধ্যমকে বলেন, গিফারীকে গত ১৮ মার্চ বাড়ি থেকে পুলিশ পরিচয়ে সাদাপোশাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থানায় খোঁজ করা হলেও তাঁর খোঁজ মেলেনি। গিফারী ছাত্রশিবিরের কালীগঞ্জ পৌর শাখার সভাপতি ছিলেন। শামীমের মামা ইমরান হোসেন বলেন, ২৪ মার্চ বিকেলে শামীম কালীগঞ্জের মাহতাব উদ্দীন ডিগ্রি কলেজের সামনের একটি দোকানে পত্রিকা পড়ছিলেন। এ সময় দুটো মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা চারজন এসে শামীমকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আশপাশের লোক ধাওয়া দিলে পিস্তল বের করে তাঁরা নিজেদের পুলিশের লোক বলে পরিচয় দেন। এরপর থানায় খোঁজ করলে শামীমের খোঁজ মেলেনি। 

কালীগঞ্জ থানা পুলিশ আটকের বিষয় অস্বীকার করে। একইসাথে জিডিও নেয়নি। এই চারজন নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনায় তাদের পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত সন্দেহাতীতভাবে পুলিশকে দায়ী করেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে ৪টি খুনের জন্যই এএসপি আজবাহার আলী শেখ ও ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান দায়ী। এর বাইরে আবু হুরাইরা খুনের জন্য হাসান হাফিজুর রহমান (ওসি, সদর, ঝিনাইদহ) দায়ী। হাফেজ জসিম উদ্দিন জসিম উদ্দিন খুনের জন্য মাহাতাব উদ্দীন (ওসি, হরিণাকুন্ডু, ঝিনাইদহ) ও হাসান হাফিজুর রহমান (ওসি, সদর, ঝিনাইদহ) দায়ী। আবু জর গিফারী ও শামীম হোসেন খুনের জন্য আনোয়ার হোসেন (ওসি, কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ), নীরব হোসেন (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ) ও নাসির উদ্দিন (এসআই, সদর, ঝিনাইদহ) দায়ী।

২২ জানু, ২০২৩

হিন্দুত্ববাদের কবলে পাঠ্যপুস্তক পর্ব ০২ (৭ম শ্রেণি)

ষষ্ঠ শ্রেণির মতো ৭ম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকেও রয়েছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমস্যা। এই সমস্যাগুলো অনিচ্ছাকৃত নয় বরং টার্গেটভিত্তিক। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক সেগুলো আলোচনা করবো। ৬ষ্ঠ শ্রেণির মতো ৭ম শ্রেণীতেও সবচেয়ে বেশি সমস্যা সামাজিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইতে। সামাজিক অনুশীলন বই ১ম ১০৯ পৃষ্ঠা পড়লে মনে হবে আপনি সামাজিক বিজ্ঞান বই নয়, হিন্দু ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের কোনো ধর্মীয় বই পড়ছেন।


সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের প্রচ্ছদ মৌর্য সাম্রাজ্যের আমলের বৌদ্ধ সমাজের পাটলিপুত্র মন্দিরের (ভারতের বিহারে অবস্থিত) ছবি। এটা আমাদের বর্তমান সমাজ কিংবা অতীত ইতিহাস কোনোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করে না। ধর্মীয়ভাবেও প্রতিনিধিত্ব করে না।

৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে চারটি প্রধান অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ের মূল বিষয় হলো আর্যদের হরপ্পা সভ্যতা। এই সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে এই সভ্যতার ধর্ম বেদের উপর নির্ভরশীল। তারা খুবই সভ্য আর শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছিল। তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুব ভালো ছিল। আধুনিক নগর সভ্যতার সব উপাদান সেখানে ছিল। নাগরিকদের সকলের সম্মানজনক অবস্থান ছিল। সবার নাগরিক স্বাধীনতা ছিল। ছিল বিস্তৃত রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ, ডাস্টবিন, সূক্ষ্ম পরিমাপ পদ্ধতি, শিল্পকলা ইত্যাদি সব বিষয়ে তারা পারদর্শী ছিল। মূলত তারা ছিল উৎকৃষ্ট এক জনগোষ্ঠী। তাদের ধর্ম বেদের উপর নির্ভরশীল। বেদের প্রকারভেদ নিয়েও বেশ ভালো আলোচনা কয়েকবার এসেছে। এই জনগোষ্ঠী মূলত প্রাকৃতিক কারণে ধীরে ধীরে পতিত হয়েছে।

বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হলো একেশ্বরবাদী দ্রাবিড় সভ্যতা। নূহ আ.-এর সন্তানদের দ্বারা এই সভ্যতার সৃষ্টি। আর্যরা দ্রাবিড়দের ওপর নির্যাতন করে, হত্যা করে, ও জুলুম করে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। দ্রাবিড়দের ব্যাপারে কোনো আলোচনা নেই। এছাড়া আর্যরা ছিল জাতভেদ ও বর্ণপ্রথার বর্বর সভ্যতা। যারা মানুষকে মানুষ মনে করতো না। সেই হিন্দুয়ানী ও ব্রাহ্ম্যণ্যাবাদী বর্বর সভ্যতাকে মহান সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিষয় হলো বৌদ্ধ ধর্ম ও শাসনব্যবস্থা। বৌদ্ধ ধর্ম খুবই ভালো, পরম অহিংসার ধর্ম। গৌতম বুদ্ধের জীবনীর অনেক নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আগের অধ্যায়ের মতোই এই অধ্যায়েও এই সমাজের অনেক বিস্তারিত বর্ননা এসেছে। তাদের সমূহ মূর্তি, ভাস্কর্য, উপসনালয়ের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। ধর্মগ্রন্থ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আপনার মনে হবে ২য় অধ্যায়ে আপনি বৌদ্ধদের ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ছেন।

তৃতীয় অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে তৎকালীন হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার নগরায়ন আর ধর্মীয় স্থাপনার চিত্র আর বর্ণনা। ভারত উপমহাদেশে ও বাংলায় শশাংক রাজত্ব। এখানে মুদ্রা, মন্দির, স্থাপনা, ধর্মিয় গ্রন্থ, দেব-দেবীর ছবি, বৌদ্ধ বিহার আর মন্দিরের ছবিতে সয়লাব। প্রতিমা, মূর্তি, দেব-দেবীর আলোচনাই মুখ্য এই অধ্যায়ে। ১২৪ পৃষ্ঠার বইয়ের ১০৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়লে একে সামাজিক বিজ্ঞানের চাইতে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের বই বললেই ভালো হবে।

এরপর ৪র্থ অধ্যায়। এই অধ্যায় মুসলিম শাসনের ইতিহাসের অধ্যায়। সুলতানী আমলের কথা বলার জন্য এই অধ্যায়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ১৫। আর তাতে সামান্য প্রশংসা দেখা গেলেও মূলত এই ১৫ পৃষ্ঠায় মুসলিম শাসনের প্রতি বিদ্বেষ উপস্থাপন করা হয়েছে। এদেরকে বিদেশী শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ আর্যরা, গুপ্তরা, সেনরা ও পালরা কারো ক্ষেত্রেই বিদেশী উল্লেখ করা হয়নি। মুসলিমরা এসে তাদের ওপর শরীয়াহ চাপিয়ে দিয়েছে। অমানবিক দাসপ্রথা চালু করেছে। নারীদের ঘরে আটকে রেখেছে এই জাতীয় বহু অপবাদে জর্জরিত করেছে। আসুন আমরা এবার পয়েন্টভিত্তিক আলোচনায় আসি।

১. সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব নেই।

পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে আমাদের মুসলিম সন্তানেরা তাদের আত্মপরিচয় জানবে এবং নিজস্ব সংস্কৃতিতে গড়ে উঠবে। দুঃখজনকভাবে ৬ষ্ঠ শ্রেণির মতো ৭ম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকেও আমাদের মুসলিম পরিচয় অনুপস্থিত। মুসলিম পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে এমন কোনো প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা ও ইলাস্ট্রেশন নেই। উল্টো মুসলিম পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে করা হয়েছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ। অথচ আমাদের বাচ্চাদের পাঠ্যবই দেখে মনে হবে এরা মুসলিম না, সবাই মূর্তিপূজারি।

২. হিন্দুত্ববাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

এদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্যরা এসেছে ইরান মতান্তরে জার্মানী থেকে। তারা এসে এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে। তাদের এই অত্যাচারের ভিত্তি ছিল বর্ণপ্রথা। তারা নিজেদের বড় মনে করতো। স্থানীয়দের অচ্যুত, নীচু মনে করতো। স্থানীয়দের সাথে তাদের আচরণ ছিল মানবতার জন্য চরম অপমানের। জাত পাত ও বর্ণভেদ করে তারা মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিত না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র এর চার ভাগে তারা মানুষকে ভাগ করেছে। শুদ্রদের তারা ঘৃণা করতো।

৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইতে ১-৩১ পৃষ্ঠায় আর্যদের হরপ্পা সভ্যতাকে পজেটিভলি উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের উন্নত, সভ্য ও মানবতাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এভাবে আমাদের বাচ্চাদের কাছে মানবতাবিরোধী ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পজেটিভলি উপস্থাপন করা হয়েছে।

৩. হিন্দুয়ানী ভাষা ও কালচারকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।

বাংলায় মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে ভাষাগত সামান্য কিছু প্রার্থক্য রয়েছে। যদিও সেগুলো শব্দ হিসেব ইসলামী শরিয়তে ম্যাটার করে না। কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক থেকে ম্যাটার করে। যদি কোনো শব্দ, পোষাক ও আচরণ কোনো মু*শরিক গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে তবে সেটা ব্যবহার আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। যেমন বাংলার মুসলিমরা 'গোসল'কে 'গোসল' বলে, অন্যদিকে হিন্দুরা এটাকে 'স্নান' বলে। আমাদের ভাষাগত সংস্কৃতিতে এটা গোসল, স্নান নয়। গোসলখানাকে এই দেশের মানুষ স্নানাগার বলে না, গোসলখানা বলে। ৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১৮ পৃষ্ঠায় 'গোসলখানা'কে 'স্নানাগার' বলা হয়েছে। এটা সুস্পষ্ট হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।

৭ম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৯৫ পৃষ্ঠায় আনিসুজ্জামানের একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে 'কত কাল ধরে' নামে। এই প্রবন্ধের বেসিক বিষয় হলো বাংলার মানুষ হিসেবে আমরা কেমন ছিলাম? আমাদের আচরণ কেমন ছিল? আমাদের পোষাক কেমন ছিল ইত্যাদি।


সেখানে তিনি যা উল্লেখ করেছেন তা সবই হিন্দু*য়ানী সংস্কৃতি। যেমন আমাদের পূর্বের লোকেরা সবাই ধুতি পরতো, মেয়েরা বহরে ছোট শাড়ি পড়তো। কপালে টিপ দিত ইত্যাদি। খাদ্য সংস্কৃতিতে ছাগলের গোশতের কথা আছে। গরুর গোশতের কথা নেই। যেন সবাই এদেশে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ছিল। অথচ এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে একেশ্বরাবাদী দ্রাবিড়দের মাধ্যমে। আমাদের বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে আমরা আগে সবাই হিন্দু*য়ানী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত ছিলাম।

৪. দেব-দেবী ও মন্দিরের পরিচয়গুলো হাইলাইট করা হয়েছে।

৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞানের পুরো বইতেই খুব দৃষ্টিকটুভাবে লক্ষ্য করা গেছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দেব-দেবীর নাম। সামাজিক বিজ্ঞান বই পড়ে একজন ছাত্রের স্বাভাবিকভাবে মাথায় যে বিষয়টা ইন্সটল হবে তা হলো, আমাদের দেশের ইতিহাস মানেই হলো মূর্তিপূজার ইতিহাস। দেব দেবীকে শুধু পরিচয় করিয়ে দেওয়া নয়, তাদের প্রতি যাতে ভক্তি আসে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে সামাজিক বিজ্ঞান বইতে।

সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের প্রচ্ছদসহ ১ - ১০৯ পৃষ্ঠায় আমাদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পুরো আলোচনায় হিন্দু ও বৌদ্ধদের উন্নত সভ্যতা, উন্নত সংস্কৃতি, তাদের দেব-দেবী ও নগরায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

৫. পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বিদ্বেষ যুক্ত করা হয়েছে।

৬ষ্ঠ শ্রেণির মতো ৭ম শ্রেণিতেও পরিকল্পিতভাবে মুসলিম সমাজ ও ইসলামের প্রতি বিষোদগার করা হয়েছে। ৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের ১২১ পৃষ্ঠায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবরোধবাসিনীর কাহিনী থেকে কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ইচ্ছেকৃতভাবে মুসলিম সমাজের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে। একইসাথে ইসলামের অত্যাবশ্যকীয় বিধান 'পর্দার' ব্যাপারেও ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে।


সেখানে পরস্পরবিরোধী ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একবার তিনি বলেছেন সেখানে লেডিস ক্লাবের অনুষ্ঠান করছেন। যদি মেয়েরা অবরোধের মধ্যেই থাকতো তাহলে লেডিস ক্লাবের সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠলো। তিনি বলেছেন সবাই বোরকা পড়ে থাকতো। আবার তিনি গল্প করছেন, একবার এক বিয়ের অনুষ্ঠানে রোকেয়া বোরকা পরে যাওয়ায় উপস্থিত সবাই নাকি তাকে ভূত ভেবে ভয় পেয়েছে।

যদি মুসলিম সমাজে বোরকা পরার রীতি থেকেই থাকে (অবশ্যই ছিল) তবে তা দেখে মানুশ ভূত ভেবে ভয় পাবে কেন? আর যদি ভূত ভেবে ভয় পায় তবে ধরে নিতে হবে মুসলিম সমাজে বোরকা পরার রীতি ছিল না। নতুন কিছু দেখে ভয় পেয়েছে। আর বাকী যে অবাস্তব গল্পগুলো বলেছেন তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি মিথ্যাচার করেছেন। এসব গল্প উল্লেখপূর্বক ইসলামকে কটাক্ষ করা হয়েছে। মুসলিম সমাজের সন্তানরা কেন ইসলামকে করা বিদ্রূপকে পাঠ্য হিসেবে গ্রহণ করবে?

৬. ইংরেজ লুটেরাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে।

অবাক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম সামাজিক বিজ্ঞান বইতে ইংরেজ লুটেরা ও ডাকাতদের প্রশংসা করা হয়েছে। তাদের হাজারো অপকর্মের কথা আড়াল করে অনেকটা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাব লক্ষ্য করা গেছে। ৭ম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের ১৩০ নং পৃষ্ঠায় ইংরেজ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।


অথচ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল ইংরেজদের শোষণের হাতিয়ার। যেসব জমিদার প্রজাদের শোষণ করে মোটা অংকের রাজস্ব আদায় করে দিতে পারবে তাদেরকেই জমিদারী স্থায়ীভাবে দেওয়া হবে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার ফলে প্রজাদরদী জমিদাররা জমিদারি হারিয়েছে। পক্ষান্তরে নব্য শোষক শ্রেণী তৈরি হয়ে এদেশে দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে।

৭. আওয়ামী লীগের দলীয় বইয়ের রূপ দেওয়া হয়েছে।

৬ষ্ঠ শ্রেণির মতো ৭ম শ্রেণির প্রতিটি বইয়ের ২য় পৃষ্ঠায় আওয়ামীলীগের উন্নয়নের ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে যেন এটা পাঠ্যবই নয়, আওয়ামীলীগের দলীয় বুলেটিন। নির্লজ্জ দলীয়করণের মাধ্যমে পাঠ্যবইকেও গ্রাস করেছে আওয়ামীলীগ। এমন হীনকর্ম আইয়ুব খানের মতো স্বৈরাচারও করেনি।

৮. ভ্রান্ত মুসলিম গোষ্ঠিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে

মুসলিমদের মধ্যে যারা ভ্রান্ত ও ইসলামী শরিয়ত বিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরকম একটা গোষ্ঠি হলো মাইজভান্ডারি গোষ্ঠী। যাদের গান লিখে দিত রমেশ শীল নামের এক মুশ*রিক।


সেই মাইজভান্ডারিকে বলা হয়েছে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। ৭ম শ্রেণির শিল্প ও সংস্কৃতি বইয়ের ২৩ পৃষ্ঠায় রমেশ শীলের জীবনী বর্ণনা দিতে গিয়ে এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভ্রান্ত ও কুফরি কাজে লিপ্ত মাইজভান্ডারিদের বলা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি।

৯. ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ

মুসলিম বিদ্বেষের ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশে মুসলিম ও বৌদ্ধদের ত্রাণকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে বহিরাগত লুটেরা ও ক্ষমতালিপ্সু হিসেবে দেখানো হয়েছে। সামাজিক অনুশীলন বইয়ের ৩ নং পৃষ্ঠায় আক্রমণকারী ও দখলদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ মূল কথা হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্য সেন বংশের রাজাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলার মুসলিমরা তাদের রক্ষার জন্য আহ্বান জানায়।


সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বখতিয়ার খলজি আমাদের বর্বর আর্যদের হাত থেকে উদ্ধার করে। বখতিয়ার খলজি বাংলার মুসলিমদের উদ্ধার করে নিজে শাসক বনে যাননি। তিনি দিল্লির সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেকের কাছে বাংলাকে সমর্পন করেন। ক্ষমতালিপ্সু হলে তিনি এই কাজ করতেন না। তার বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তিনি বৌদ্ধদের বিহার ও পাঠাগার ধ্বংস করেছেন। এটা সর্বৈব মিথ্যে কথা। বখতিয়ার খলজিকে ওয়েলকাম করেছে বৌদ্ধরা। বখতিয়ারের অভিযানের মাধ্যমে বৌদ্ধদের ওপর চলা বহুদিনের অত্যাচার চিরতরে বন্ধ হয়েছে।

১০. সুলতানী আমল তথা মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে

৭ম শ্রেণিতে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো উপমহাদেশের স্বর্ণযুগ মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে। সুলতানি আমল শুরুই হয়েছে এভাবে, “তোমাদের যদি জিজ্ঞেস করি, ‘বিদেশি' বলতে তোমরা কাদের বোঝাবে? তোমরা চোখ বন্ধ করে বলবে, বিদেশি হলো তারাই যারা আমাদের দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশের বাইরে থেকে এই দেশে এসেছে। তোমাদের উত্তর একদম সঠিক। কিন্তু সুলতানি আমলে যদি কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো ‘বিদেশি' কে? তাহলে সে কী বলত জানো? সে বলত, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি যে আমাদের গ্রামে বা অঞ্চলে থাকে না, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ নয়, সেই বিদেশি।” (সামাজিক বিজ্ঞান, পৃষ্ঠা ১১১)
অর্থাৎ, এতক্ষন পর্যন্ত যা পড়লাম সবকিছুই আমাদের দেশীয়, আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এখন যা আসছে সব ভিনদেশি, অন্য সংস্কৃতির জিনিস। অর্থাৎ বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে আমাদের উপর “সুলতানি তথা ইসলামী সংস্কৃতি” চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।


সুলতানরা একনায়ক ছিল এটা বুঝাতে গিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “সুলতানগণ ছিলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এখন মনে হতে পারে, ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ আবার কী? বন্ধুরা, সার্বভৌম ক্ষমতা হলো সর্বময় ক্ষমতা। যে ব্যক্তি এই ক্ষমতার অধিকারী তারা তাদের ক্ষমতার জন্য কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না। তার ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়। তিনি যেমন চান, তেমনই হয়।” এমনভাবে উপস্থাপন হয়েছে যেন সুলতানি আমলের আগে সবাই ছিল উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু সুলতানগন চা ইচ্ছা তা-ই করতো। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা। অথচ বাস্তবতা হলো মুসলিম শাসকরাই সবচেয়ে বেশি জনগনের জন্য জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করেছিলেন। এই কারণেই বাংলার মানুষ দলে দলে মুসলিম হয়েছিল।


বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে, উপমহাদেশের ইতিহাসে সবসময়ে হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসন থাকলেও বর্ণবাদের শুরু হয় সুলতানি আমল থেকে। সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১১৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “ইতিহাসবিদদের গবেষণা অনুযায়ী, এ সময়ে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীর মানুষ বসবাস করলেও মুসলমানগণ অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। আর এর কারণ কিন্তু একটু আগেই বলা হয়েছে। সেই কারণটা মনে আছে তো? আচ্ছা, কারণটা আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। সুলতানি আমলের শাসকগণ সবাই ছিলেন মুসলিম এবং সে জন্যই মুসলিমরা অন্যদের থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। মুসলমান সমাজে মূলত দুইটি শ্রেণী ছিল। একভাগে ছিল বাইরে থেকে আসা অভিজাত সম্প্রদায় … অন্যভাগে ছিল স্থানীয় ধর্মান্তরিত সাধারণ শ্রেণী। অভিজাত শ্রেণী নিজেদের আশরাফ ও অন্যদের আতরাফ মনে করতেন। আশরাফ ও আতরাফদের মধ্যে মেলামেশা, বিয়েশাদী, দাওয়াতের আদানপ্রদান একেবারেই ছিল না। বর্তমানেও এ ধরনের বিভাজন আমরা দেখতে পাই। সমাজের ‘দলিতদেরকে' অন্ত্যজ ও অপাংক্তেয় মনে করা হয়।”

সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের লেখক মুসলিম সমাজে বর্ণবাদ খুঁজে পেয়েছে। অথচ আর্যদের হরপ্পা সমাজে বর্ণপ্রথা নিয়ে তারা কোনো আলোচনা তারা করে নি। অথচ মুসলিম সমাজে সবাই একসাথে বসবাস করতো, একসাথে খাবার খেত, একসাথে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পাদন করতো।


নগ্নভাবে মিথ্যা বলে মুসলিম শাসনের দোষ বের করতে গিয়ে সামাজিক বিজ্ঞানের লেখক দাবি করেছেন, “অমানবিক দাসপ্রথা” সুলতানি আমলেই চালু হয়েছিল। এই অমানবিক দাসপ্রথাও নাকি ইংরেজ লুটেরারা বন্ধ করেছিল।

সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১১৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে "ইতিহাসের এই মন্দটুকুও তোমাদের জানতে হবে। সুলতানি আমলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। তোমরা হয়তো জানতে চাইতে পারো দাসপ্রথা কী? দাসপ্রথা হলো অমানবিক একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে মানুষের কেনা-বেচা হতো। এই ব্যবস্থায় ধনীরা ব্যক্তিকে কিনে নিত এবং ক্রীত ব্যক্তি তার সম্পত্তি হিসেবে যেকোনো কাজ করতে বাধ্য থাকত। সুলতানি আমলেও এই দাসপ্রথার মাধ্যমে মানুষের কেনা-বেচা হতো। দাসগণ অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করত। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। সুলতানি আমল ও মোগল আমল শেষে ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যমভাগে আইন করে এই অমানবিক প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়।”

অথচ বাস্তবতা হলো সুলতানী আমলের পূর্বেও দাসপ্রথা ছিল এবং দাসদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হতো। আর মুসলিম সমাজে দাসপ্রথা চালু থাকলেও অমানবিক আচরণ করা হতো না। দাসরা যোগ্যতা অনুসারে সমাজে সম্মানিত হতেন। সেনাবাহিনী কমান্ডার হতেন, এমনকি শাসকও হতেন। দিল্লীর সুলতানদের মধ্যে প্রথম কুতুব উদ্দিন আইবেকের শাসনের অধীনে আসে বাংলা। আর কুতুব উদ্দিন আইবেক নিজেই একজন দাস ছিলেন। সুতরাং পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়।


সুলতানী আমলে নারীদের অবস্থা খারাপ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১২০ পৃষ্ঠায়। অথচ আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আমলে নারীদের দূরাবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বাস্তবতা হলো, বাংলার নারীরা প্রথম মানুষ হিসেবে ট্রিট হতে থাকে সুলতানী আমল থেকে। তাদের সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। আর হিন্দুদের আমলে অধিকার তো দূরের কথা গায়ে কাপড় দেয়ার অধিকার ছিল না। তারা তাদের শরীর ঢাকতে পারতো না। শরীর ঢাকতে হলে তাদেরকে ট্যাক্স দিতে হতো।

প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনব্যবস্থার অর্থনৈতিক আমলের বিস্তারিত বর্ননা থাকলেও সুলতানি আমলের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারেনি ৭ম শ্রেণীর সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের লেখকরা। কী আজিব! ১২০ পৃষ্ঠায় তারা এটা জানিয়েছে।

বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা সুলতানী আমলে অর্থনীতি নিয়ে ভালো মন্তব্য করেছেন তার বিরুদ্ধেও যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।


সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১২১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, "যদিও ইবনে বতুতা সুলতানি আমলে বাংলার ভূয়সী প্রসংশা করেছেন। তাঁর মতে বাংলায় যত সস্তায় জিনিসপত্র কিনতে পাওয়া যেত, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। কিন্তু সস্তায় জিনিসপত্র কেনার মতো সামর্থ্য কতজনের ছিল তা অবশ্য কোনো পর্যটকের লেখায় পাওয়া যায় না। … সে-সময়ে সোনা, রূপা এবং তামার পয়সার প্রচলন ছিল। … তবে সাধারণ মানুষ কড়ির মাধ্যমে বিনিময় করত। সমাজে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট ছিল। সমাজের একদিকে যেমন বিত্তবানদের বিলাসী জীবন, ঠিক তেমনি উল্টো দিকে সংগামী মানুষ দুমুঠো খাবারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করত।”

এভাবে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ৪র্থ অধ্যায়ে সুলতানি আমলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ দেখিয়ে মুসলিম বিদ্বেষ শেখানো হয়েছে। পক্ষান্তরে হিন্দুদের হরপ্পা সভ্যতা, বৌদ্ধদের সভ্যতা ও তাদের ধর্মীয় ইতিহাসের প্রতি মুগ্ধতা সৃষ্টির চেষ্টা করানো হচ্ছে।

১১. মুসলিমদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা হয়েছে
ইংরেজদের বিরুদ্ধে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল মুসলিমরা। অথচ সামজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের ৫ নং পৃষ্ঠায় সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়েছে। ফরায়েজী আন্দোলন, তীতুমীরের বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, মুসলিম কৃষকদের বিদ্রোহকে অস্বীকার করে সন্ত্রাসবাদী স্বদেশী আন্দোলনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


১২. মুসলিম লীগের স্বাধীনতার ভূমিকাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে


হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেসের মুসলিম বিদ্বেষের ফলে ১৯০৫ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে খাজা সলিমুল্লাহর আহবানে মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছে। সেই থেকে মুসলিম লীগ মুসলিমদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিল। একইসাথে মুসলিমদের অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মুসলিম লীগের মাধ্যমে এদেশের মুসলিমরা একইসাথে ইংরেজ ও মুশ*রিকদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলো। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ৭ম শ্রেণীর সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের ৭২ পৃষ্ঠায় মুসলিম লীগের সেই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ব্রাহ্মণ্যবাদী নেহেরুকে বীরোচিত উদার নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বইয়ের টেক্সট দেখে মনে হয় এই বইটা বাংলাদেশের ছাত্রদের জন্য নয়, ভারতের ছাত্রদের জন্য লেখা হয়েছে।

১৩. না*স্তিকতার হাতেখড়ি


ষষ্ঠশ্রেণিতে না*স্তিকতার হাতেখড়ি হিসেবে বিবর্তনবাদ শেখানো হয়েছে। আর এখানে বলা হয়েছে প্রকৃতির সন্তান। বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের ১১৫ পৃষ্ঠায় একটি অধ্যায়ের নাম 'রুদ্র প্রকৃতি'। এখানে মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে। অধ্যায়ের শুরুতে বলা হয়েছে প্রকৃতিরই সন্তান আমরা। এটা নাস্তি*কতা শিক্ষার প্রথম ধাপ। আদম সন্তানরা নিজেদের প্রকৃতির সন্তান দাবি করবে। যাতে তারা পরবর্তীতে স্বীকার করে আদম থেকে নয়, এককোষী এমাইনো এসিড থেকে প্রাণের উৎপত্তি। এরপর ধীরে ধীরে সব প্রাণী বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে।

১৪. ইসলামে নিষিদ্ধ ভাস্কর্যপ্রীতি শেখানো হচ্ছে
ভাস্কর্য, মূর্তি এগুলো বানানো ইসলামে নিষিদ্ধ। যেহেতু ইসলামে নিষিদ্ধ তাই এগুলোকে জনপ্রিয় করতে হবে এমন মিশন নিয়ে নেমেছে পাঠ্যপুস্তক রচনাকারী ইসলাম বিদ্বেষীরা। বাংলা বইয়ের ২০ নং পৃষ্ঠায় একটি প্রবন্ধ লেখা হয়েছে যার নাম 'কত দিকে কত কারিগর', লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এখানে ভাস্কর্য নির্মাতাদের গুরুত্ব দিয়ে তাদের তথাকথিত শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়েছে।


এছাড়াও বিজ্ঞান বইতে শিলা/পাথর বিষয়ে পড়ানোর সময় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ভাস্কর্যের ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে। ৭ম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের ১৩১ পৃষ্ঠা ও ১৩২ পৃষ্ঠায় শিলার আলোচনায় যথাক্রমে আব্রাহাম লিংকন ও মাইকেল এঞ্জেলোর 'ডেভিডে'র ভাস্কর্যের ছবি দেওয়া হয়েছে। পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক তবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত।



প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, শুধু পাঠ্যপুস্তকে নয়, সারা বাংলাদেশে শেখ মুজিবের ভাস্কর্য দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তো মূর্তির হাট বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনে হয় আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে মক্কাও এতো মূর্তি ছিল না যতটা আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। এটা নিঃসন্দেহে গর্হিত ও শরিয়তবিরুদ্ধ কাজ।

আত্মঘাতী এই শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নইলে আমাদের সন্তানেরা মুশ*রিকদের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। প্রতিটি মানব জনগোষ্ঠীর পদস্থলনের ব্যাপারে লক্ষ্য করা যায় যে, তাওহীদবাদী মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে তাওহীদের চর্চা একনিষ্ঠ না করার ফলে ধীরে ধীরে মুশ*রিকে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি আমাদের পরিণতি সেরকম করতে না চাই, জাহান্নাম থেকে আমাদের ও আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে চাই তবে এই শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।