১১ মার্চ, ২০২৪

মওদূদীবাদের স্বরূপ উদ্ঘাটন || পর্ব -০২


আগের পর্বে বলেছিলাম ইংরেজ আমলে অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর কুসংস্কার মুসলিম সমাজে ছেয়ে গেছে। এই অবস্থার সুযোগ নেয় কিছু ধুরন্ধর মুসলিম নামের ধর্ম-ব্যবসায়ী। তারা স্থানে মাজার ও আখড়া স্থাপন করে। ইসলামকে তারা পীরের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা, পানি পড়া আর গানের তালে নেচে গেয়ে জিকির করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেললো।

ইংরেজরা ও স্থানীয় হিন্দুরা মুসলিমদের এই বিবর্তনকে স্বাগত জানায়। ধর্ম ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসাকে লাল করার করার জন্য নতুন নতুন বিদআত চালু করতে লাগলো। ইংরেজ ও মুশরিকরা বুঝতে পারে এই ইসলাম তাদের জন্য কল্যাণকর। এই ইসলাম দিয়ে তারা মূল ইসলামকে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করছিল।

আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, শহীদ মাওলানা মীর নিসার আলী তিতুমীর ও হাজী শরিয়ত উল্লাহর আন্দোলনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো মুসলিমদেরই একটা অংশ। তারাই মুশরিকদের আনুকূল্য পেতে ইংরেজদের কোর্টে মাওলানা তিতুমীর ও হাজী শরীয়ত উল্লাহর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা করেছিলো। একই ঘটনা বাংলাদেশের কথিত মওদুদীবাদের ধারক নিজামী মুজাহিদদের বেলায়ও ঘটেছে। তাদের বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার মামলা করে ফাঁসীতে দড়ি পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে মাজার পূজারী নামমাত্র মুসলিমেরা। মূলকাজ করেছে মুশরিক ও তাদের দোসররা, অপর্যাপ্ত মুসলিমরা তাদের হেল্প করেছে।

যাই হোক, আমরা মওদূদীবাদে ফিরে আসি। মওদূদী এই অবস্থা দেখে কলম ধরলেন। এটা ১৯৩২ সালের কথা। তাঁর বয়স তখন মাত্র ২৯ বছর। তিনি দেখলেন তাঁর বয়সী শিক্ষিত যুবকেরা ইসলামের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। নাচা-গানার সহিত জিকিরে আবৃত ইসলাম দিয়ে দেশ শাসন করা যায় না, এটা তারা নিশ্চিতভাবে বুঝেছিল। নাচা-গানার বাইরে আলিয়া ও কওমি ধারার মাদরাসা শিক্ষা প্রচলিত ছিল। যার মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে ইসলাম শেখা গেলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের স্বরূপ উদাঘাটিত হয় না।

মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সেক্যুলার শিক্ষা-ব্যবস্থারই আরেকটি রূপ। এই শিক্ষার ফলে মুসলিমরা বুঝতে পারে, দুনিয়া চালানো তাদের কাজ নয়, রাজনীতিতে অংশ নেওয়া তাদের কাজ নয়। দুনিয়া মানবরচিত আইনেই চলবে। এটা পরিবর্তন তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই শিক্ষিত মুসলিম যুবকেরা এমনকি মাদরাসা শিক্ষিতরাও পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছিলো। এর চাইতেও আগ্রাসীভাবে মুসলিম শিক্ষিত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে কম্যুনিজইম। মুসলিম যুবকেরা নাস্তিক ও কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছিল।

মুসলিমদের এই দুরাবস্থার মধ্যেই মওদূদী তাঁর চেষ্টা শুরু করেন মাত্র ২৯ বছর বয়সে। মওদূদী যখন লেখালেখি শুরু করেন তখন সবাই বলতো অমুক পীরে এই বলেছেন, অমুক মুরুব্বি এই বলেছেন, অমুক আলেম এই বলেছেন আপনি নতুন কথা বললে হবে?

তখন মওদূদী বলেন, আমাদের সরাসরি কুরআন পড়তে হবে। সরাসরি হাদিস পড়তে হবে। আল্লাহর নির্দেশনা মানতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাড়া কাউকেই বিনা প্রশ্নে আনুগত্য করা যাবে না। অমুকের কথা যদি আল্লাহর রাসূলের সাথে ও আল্লাহর বিধানের সাথে না মিলে তাহলে তার কথা মানা যাবে না। এটাই ছিল মওদূদীবাদের মূল প্রিন্সিপ্যাল।

মওদূদী দেখেছেন, মুসলিমদের সামনে ইসলামের স্বরূপ উন্মোচিত নেই। একেক টাইপের মুসলিমদের কাছে ইসলাম একেকরকম। ইসলাম বলতে কী বুঝায় ও ইসলামের সঠিক তত্ত্ব সবার সামনে উপস্থাপন করার জন্য তিনি একটি বই লিখেন 'রিসালায়ে দ্বীনিয়াত' নামে। বইটিতে তিনি ইসলামের স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। এই বইটি উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পৃথিবীর সকল প্রধান ভাষাসহ প্রায় ২৩ টি ভাষায় বইটি অনুবাদ হয়।

বইটি সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে আফগানিস্তানে। ১৯৬০ সালের পর থেকে আফগানিস্তানের মানুষ পার্শ্ববর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে কম্যুনিস্ট হতে শুরু করে। এই বইটি তাদেরকে কম্যুনিজম থেকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। আর এই বই নিয়ে আফগানিস্তান চষে বেড়িয়েছেন তৎকালীন কাবুল ভার্সিটির শিক্ষক ও পরবর্তিতে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট শহীদ বুরহান উদ্দিন রব্বানী।

বাংলায় 'রিসালায়ে দ্বীনিয়াত' বইটি অনুবাদ হয় 'ইসলাম পরিচিতি' নামে। অনুবাদ করেন সৈয়দ আব্দুল মান্নান। আন্তর্জাতিক দায়ি বিলাল ফিলিপ্স বলেছেন তাঁর ইসলামের দিকে আসার জন্য দুইটি বই ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে একটি হলো রিসালায়ে দ্বীনিয়াত।

বইটিকে মাওলানা মওদূদী রহ. ৭ টি চ্যাপ্টারে ভাগ করেছেন।

১ম অধ্যায়ের নাম 'ইসলাম'
এই অধ্যায়ে মাওলানা কেন ইসলাম নাম দেওয়া হয়েছে, ইসলামের অর্থ, এর তাৎপর্য আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি কুফর কী? কুফরের তাৎপর্য কী? এই আলোচনা করেছেন। অধ্যায়ের শেষে কুফর তথা ইসলামকে অস্বীকার করার কুফল ও ইসলামের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২য় অধ্যায়ের নাম 'ঈমান ও আনুগত্য'
এই অধ্যায়ে তিনি প্রথমে আনুগত্যের জন্য জ্ঞান ও প্রত্যয়ের প্রয়োজন এটা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেছেন, মানুষ ততোক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য করতে পারে না, যতোক্ষণ না সে কতগুলো বিশেষ জ্ঞান লাভ করে এবং সে জ্ঞান প্রত্যয়ের সীমানায় পৌঁছে। সবার আগে মানুষের প্রয়োজন আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ণ প্রত্যয় লাভ। কেননা আল্লাহ আছেন, এ প্রত্যয় যদি তার না থাকলো, তা হলে কি করে সে তার প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে?

এরপর তিনি ঈমানের পরিচয় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এর ভিত্তিতে মানুষকে চারভাগে ভাগ করেছেন। এরপর তিনি জ্ঞানর্জনের মাধ্যম তথা ওহি নিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়ের শেষে তিনি ঈমান বিল গায়েবের আলোচনাও করেছেন।

৩য় অধ্যায়ের নাম নবুয়্যত
এখানে মাওলানা মওদূদী নবুয়্যত নিয়ে আলোচনা করেছেন। নবুয়্যতের মূলতত্ত্ব ও এর পরিচয় কথা বলেছেন। নবীর আনুগত্য ও তাদের ঈমানের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি নবীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা করেছেন। তাদের সাথে মানুষের বিভিন্ন আচরণেরও বর্ণনা দিয়েছেন। নবী হিসেবে মুহাম্মদ সা.-এর প্রমাণ ও নবুয়তের ভূমি হিসেবে আরবকে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। সবশেষে মুহাম্মদ সা. যে শেষ নবী সে বিষয়ে আলোচনা করেন।

৪র্থ অধ্যায়ের নাম 'ঈমানের বিবরণ'
এখানে মাওলানা মূলত কালেমা তাইয়েবার তাৎপর্য উল্লেখ করেন। এই প্রসঙ্গে বলেন, এ কালেমা-ই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদ-যা দিয়ে এক কাফের এক মুশরিক ও এক নাস্তিক থেকে মুসলিমের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। এ কালেমার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি দ্বারা এক মানুষ ও অপর মানুষের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রচিত হয়। এ কালেমার অনুসারীরা পরিণত হয় এক জাতিতে এবং অমান্যকারীরা হয় তাদের থেকে স্বতন্ত্র জাতি। এর অনুসারীরা দুনিয়া থেকে শুরু করে আখেরাতে পর্যন্ত উন্নতি, সাফল্য ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং অমান্যকারীদের পরিণাম হচ্ছে ব্যর্থতা অপমান ও পতন। কালেমা তাইয়েবা সম্পর্কে একটি চমৎকার আলোচনা আছে এই অধ্যায়ে। সাথে ঈমানের অন্যান্য বিষয় যেমন রাসূল, কিতাব, ফেরেশতা, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদি নিয়েও আচোলনা করেছেন মাওলানা মওদূদী।

৫ম অধ্যায়ের নাম 'ইবাদত'
এখানে মাওলানা ইবাদতের হাকিকত ও গুরুত্ব উল্লেখ করেন। সেই সাথে সালাত, সাওম, যাকাত, হজ্ব ও জিহাদ নিয়ে আলোচনা করেন। জিহাদ ও জিহাদের পরিব্যপ্তি নিয়ে এখানে একটি সুন্দর আলোচনা রয়েছে।

৬ষ্ঠ অধ্যায়ের নাম 'দ্বীন ও শরিয়ত'
এখানে মাওলানা দারুণভাবে দ্বীন ও শরিয়তকে বুঝিয়েছেন। দ্বীন ও শরিয়তের পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। শরীয়ত জানাত মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফিকাহ ও এর ডেবলেপমেন্ট নিয়ে কথা বলেছনে। সবশেষে তাসাউফ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফিকহ ও তাসাউফের মধ্যে সম্পর্ক সূচিত করেছেন।

৭ম ও শেষ অধ্যায়ের নাম 'শরীয়াতের বিধি-বিধান'
এই অধ্যায়ে মাওলানা দারুণভাবে শরিয়তে সবার অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। মাওলানা বলেন, শরীয়াত হচ্ছে একটি চিরন্তন বিধান। এর কানুন সমূহ কোন বিশেষ কওম ও কোন বিশেষ যুগের প্রচলিত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের উপর গড়ে ওঠেনি, বরং যে প্রকৃতির ভিত্তিতে মানুষ সৃষ্ট হয়েছে, সেই প্রকৃতির নীতির বুনিয়াদেই গড়ে ওঠেছে এ শরীয়াত। এ স্বভাব-প্রকৃতি যখন সকল যুগে সকল অবস্থায় কায়েম রয়েছে, তখন এরই নীতির বুনিয়াদে গড়া আইনসমূহ ও সর্ব যুগে সর্ব অবস্থায় সমভাবে কায়েম থাকবে।

এই বইটি পড়লে ইসলামের ব্যাপারে সম্যক জ্ঞান অল্পতেই গোছানোভাবে জানা সম্ভব। ইসলাম কী? কেন? কীভাবে? ও কী চায়? সব জানা সহজ হয়ে যাবে। যারা এখনো পড়েননি বইটি পড়ে দেখুন। আপনার দিগন্ত উন্মোচন হয়ে যাবে। ইসলামের ব্যাপারে জোরালো আস্থা তৈরি হবে। একইসাথে মওদূদীবাদের মূল চিত্র আপনার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

চলবে...


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন