১২ মার্চ, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৩১ : সৈয়দ আহমদ এবং তাঁর আলিগড় আন্দোলন



আলিগড় আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়কে যুক্তিবাদী আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্যার সৈয়দ আহমেদ খান উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে যে আন্দোলনের সূচনা করেন তা আলিগড় আন্দোলন নামে খ্যাত। ইতোপূর্বে ওয়াহাবি ও ফরায়েজি আন্দোলন হলেও তা সাধারণ মুসলিম সমাজকে স্পর্শ করেনি। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর অনগ্রসর মুসলিম সমাজে কিছু কিছু সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হয় । হিন্দুদের তুলনায় অনগ্রসর পাশ্চাত্য শিক্ষায় উদাসীন মুসলিম সমাজের দুরবস্থার কথা সৈয়দ আহমেদ খান অবগত ছিলেন। তিনি ইংরেজি ভাষার মাধমে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে প্রগতির যথার্থ সোপান বলে মনে করতেন, তাই তিনি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রসারে উদ্যোগী হন ।

সৈয়দ আহমদ খান ব্রিটিশ সরকারের অধীনে উচ্চপদের চাকুরীতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মনে করতেন, মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের উপরে ভারতে এক সুশৃংখল ব্রিটিশ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায়ও ইউরোপিয়ানরা মুসলমানদের চেয়ে বহুগুণে উন্নত। তাই এদেশ থেকে সহসা তাদেরকে উৎখাত করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। বিদ্রোহ না করে রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবেলা করাকেই তিনি উত্তম মনে করতেন। ইংরেজদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া মুসলমানদের আত্মহত্যারই শামিল হবে বলে তিনি মনে করতেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সকল দোষ শুধুমাত্র মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাদের উপর পাইকারী হারে যে অমানুষিক নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছিল, তাতে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ পুস্তিকা ‘আসবাব-ই-বাগাওয়াতে হিন্দু’ ও ‘ভারতীয় মুসলমান’ নামক পুস্তিকার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের কঠোর মনোভাব দূর করার চেষ্টা করেন। জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানদের পশ্চাদপদতাকেই তিনি তাদের পরাজয়ের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বাণী ছিল –‘আগে মূলকে রোগমুক্ত কর। তাহলেই বৃক্ষ বর্ধনশীল হবে’। ১৮৬৫ সালে তিনি আলীপুরের গাজীপুরে একটি অনুবাদ সমিতি প্রতিষ্ঠিত করেন। এ সমিতির মাধ্যমে বহু বিদেশী গ্রন্থ অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়।

তিনি মুসলমানদের মন থেকে পাশ্চাত্যের ভয় ভীতি দূর করার জন্য ও মুসলমানদের মধ্যে উদারনৈতিক ভাবধারা প্রচারের জন্য ‘তাহজিব-উল-আখলার্ক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন । সেই সঙ্গে কমিটি ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং নামে একটি সংস্থারও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে আলিগড়ে তিনি মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ [Muhammedan Anglo-Oriental College] -এর প্রতিষ্ঠা করেন । এই কলেজটিই পরে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় [Aligarh Muslim University] নামে পরিচিত হয়। ইংরেজ শিক্ষাবিদগণের তত্ত্বাবধানে এই কলেজে কলা ও বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও প্রগতিমূলক মনোভাবের উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে এই কলেজের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তৎকালে সরকারী ইংরেজী বিদ্যালয়গুলিতে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় মুসলমানরা সেখানে তাদের সন্তানকে পাঠাতে সংকোচ বোধ করতো। আধুনিক শিক্ষালাভের পথ থেকে সে প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয় আলীগড় কলেজের মাধ্যমে।

এ কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলিম সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারের যে আন্দোলন গড়ে তোলেন তা আলীগড় আন্দোলন’ নামে খ্যাতি লাভ করে। এ মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলনে কবি হালী, মুহসিনুল মুলক, নাজির আহমদ, চেরাগ আলী প্রমুখ মনীষীবৃন্দ যোগদান করে আন্দোলনের অগ্রগতি সাধিত করেন।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে। মুসলিমরা তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন ও সচেষ্ট হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের কথা ভাবতে শেখায়। 

মুসলিম স্বার্থের রক্ষাকবচ হিসাবে স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলমানদের জন্যে পৃথক সরকারী মনোনয়নপ্রথার দাবী জানান। তিনি বলেন এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ যুক্ত নির্বাচন প্রথা প্রবর্তিত হলে মুসলমানদের স্বার্থে পদদলিত হবে। ১৮৮৩ সালের ১২ই জানুয়ারী গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের নিকটে মুসলমানদেরন জন্যে পৃথক নমিনেশন প্রথার সমর্থনে তিনি বলেনঃ “সাধারণ যুক্ত নির্বাচন প্রথার দ্বারা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের মত ও স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা হয়। যে দেশে শুধুমাত্র একজাতি ও এক ধর্মের লোক বাস করে সেখানে এ প্রথা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ভারতে বিভিন্ন জাতির বাস, কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠ, কেউ সংখ্যালঘু এবং তাদের মধ্যে জাতিভেদ ও ধর্মভেদ বিদ্যমান। এমতাবস্থায় যুক্ত নির্বাচন প্রবর্তন করলে কুফল দেখা দিতে বাধ্য। এ প্রথা প্রবর্তন করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ পদদলিত হবে। তাতে জাতি বিদ্বেষ ও ধর্ম বিদ্বেষ প্রবল আকার ধারণ করবে। এর জন্যে সরকারকেই দায়ী হতে হবে”।

তার এ যুক্তিপূর্ণ প্রস্তাব মুসলিম সমাজের জন্যে এক চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত করে এবং তার এ প্রস্তাব কার্যকর হয় ছাব্বিশ বছর পর। ১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ভারতের বিশিষ্ট ৩৬ জন মুসলমানের একটি প্রতিনিধিদল ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টের কাছে পৃথক নির্বাচন প্রথার দাবীতে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কারে এ দাবী স্বীকৃতি লাভ করে। এতে করে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ ক্ষিপ্ত হ’য়ে উঠে। কারণ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিঘোষিত নীতি ছিল একজাতীয়তাবাদ। এই নিয়ে বহু বৎসর ধরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বাকবিতন্ডা ও তিক্ততা চলে। 

অবশেষে ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌ শহরে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে উভয় প্রতিষ্ঠানের যথারীতি ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিগণ তাঁদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এটাই ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ চুক্তি নামে অভিহিত। চুক্তিটি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচনে মুসলমানদের স্বতন্ত্র নির্বাচনাধিকার স্বীকৃতি লাভ করে। এভাবে হিন্দু কংগ্রেস ভারতে একজাতীয়তার পরিবর্তে দ্বিজাতিত্ব স্বীকার করে নেয়, যা ছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি।

সৈয়দ আহমদের প্রতিটি নীতি ও কথায় একমত হওয়া কঠিন। তবে তিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির দ্বারা ভারতীয় মুসলমানদেরকে কংগ্রেসে যোগাদান করতে নিষেধ করেছেন এবং  এই বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, কংগ্রেস শুধুমাত্র ভারতের হিন্দু স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করবে এবং মুসলমানদের স্বার্থ হবে উপেক্ষিত। এ সত্যটি প্রথমে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরা মতো ঝানু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপলব্ধি করতে না পারলেও সৈয়দের সাবধানবাণীর সত্যতা তাঁদের কাছে পরবর্তীকালে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়িছিল। যার ফলে মুসলমানদের মধ্যে স্বতন্ত্র জাতীয়তার প্রেরণা জাগ্রত হয় এবং মুসলিম নেতারা এ পথেই অগ্রসর হয়। তাই বলতে হয়, ভারতীয় মুসলমাদের স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলীগড় আন্দোলন এবং স্যার সৈয়দ আহমদের হাত ধরেই।

বঙ্গকথা পর্ব-৩০ : আব্দুল লতিফ ও মুসলিমদের রাজনৈতিক উত্থান


বাঙালি মুসলিমরা ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে তাদের মেনে নেয়নি। একের পর এক বিদ্রোহ করেছে। সর্বশেষ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এদেশের মুসলিমদের অনেকেই উপলব্ধি করেন সশস্ত্র আন্দোলন/ বিদ্রোহ করে ইংরেজ দুঃশাসন ঠেকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই মুসলিমদের বাঁচতে হলে এখন রাজনৈতিক আন্দোলন করা জরুরী। এমন ধারণা থেকে সিপাহী বিদ্রোহের ছয় বছর পর ১৮৬৩ সালের ২ এপ্রিল নওয়াব আব্দুল লতিফ কোলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’। সশস্ত্র সংগ্রামোত্তর মুসলিম জাতীয় জীবনে এ ধরনের সংস্থা, সমিতি গঠন এই প্রথম। সমিতির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কোলকাতার নওয়াব আব্দুল লতিফের ১৬নং তালতলা লেনস্থ বাড়িতে ২রা এপ্রিল তারিখে।

নওয়াব আব্দুল লতিফ উনিশ শতকের বাংলার মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত ও সমাজসেবক। জন্ম ১৮২৮ সালে ফরিদপুর জেলার রাজাপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ফকির মাহমুদ ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের আইনজীবী। আবদুল লতিফ কলকাতা মাদ্রাসা থেকে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন।

আবদুল লতিফ ১৮৪৬ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৮৪৮ সালে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি ও ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৮৪৯ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৭৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন।

আবদুল লতিফ সাতক্ষীরায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত অবস্থায় সেখানকার কৃষকদের ওপর ইংরেজ নীলকরদের নির্যাতন ও শোষণ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি সেখানকার ঐক্যবদ্ধ হতে এবং তাদের অভিযোগের কথা সরকারকে অবহিত করতে উৎসাহ দেন। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেন। অবশেষে তাঁর উদ্যোগেই নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ করার লক্ষ্যে ১৮৬০ সালে ইংরেজ সরকার নীল কমিশন গঠন করে।

১৮৬২ সালে লর্ড ক্যানিং-এর শাসনামলে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা গঠিত হলে আবদুল লতিফ এ সভার সদস্য মনোনীত হন। ১৮৬৩ সালে আবদুল লতিফ সিভিল ও মিলিটারি সার্ভিস সমূহের পরীক্ষক বোর্ডের সদস্য এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নিযুক্ত হন। ১৮৬৫ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন গঠিত হলে তিনি এর ‘জাস্টিস অব দি পিস’ নিযুক্ত হন এবং ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৮৬৫ সালে ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে আনীত একটি প্রস্তাবে মুসলিম সমাজে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিলে আবদুল লতিফ একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে ইংরেজ সরকারকে এ বিল সংশোধনের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন।

বাংলার মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে আবদুল লতিফের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে মুসলিমরা। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন এবং সরকারের সঙ্গে অসহযোগ নীতির কারণে মুসলমান জাতি সবক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তিনি মুসলিমদের শিক্ষা ও বৈষয়িক উন্নতিকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

প্রথমত, ব্রিটিশদের নতুন শাসন পদ্ধতির সুফল ভোগ করার জন্য মুসলিমদেরকে প্রস্তুত করা। 

দ্বিতীয়ত, উপনিবেশিক সরকারের প্রতি তাদের মধ্যে আনুগত্যের ভাব সৃষ্টি করা এবং এভাবে মুসলিমদের প্রতি ইংরেজদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর করা। 

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষিত মুসলিমগণ সরকারের উদ্দেশ্য, শক্তি ও কৌশল বুঝতে পারলে তাদের মধ্যে উপনিবেশিক সরকারের প্রতি আনুগত্যের মনোভাব সৃষ্টি হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি, শাসক শ্রেণির সঙ্গে যে কোনো ধরনের সংঘর্ষ পরিহার করার পক্ষপাতি ছিলেন।

১৮৫৩ সালে ‘কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার’ সমস্যাদি তদন্তের জন্য সরকার এফ. হেলিডের সভাপতিত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। আবদুল লতিফ এ তদন্ত কমিটি ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট মাদ্রাসার উন্নতির জন্য দাবি জানান। তার সক্রিয় প্রচেষ্টায় ১৮৫৪ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি ও ফারসি বিভাগ খোলা হয় এবং উর্দু ও বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আবদুল লতিফ বরাবরই সরকারের নিকট মুসলিমদের জন্য ইংরেজি উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ফলে ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত করে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদেরকে এ কলেজে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়।

ব্রিটিশ সরকার সন্দেহ করে যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত ছিল। এ কারণে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এফ. হেলিডে মাদ্রাসাটিকে একেবারে বন্ধ করে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ সরকার আরও একবার কলকাতা মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু আবদুল লতিফের তৎপরতায় দুবারই মাদ্রাসাটি রক্ষা পায়। ১৮৭১ সালে মাদ্রাসার কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হলে আবদুল লতিফ এর অবৈতনিক সচিব নির্বাচিত হন।

আবদুল লতিফ হুগলি কলেজ ও স্কুলে মুসলিম ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মোহসিন ফান্ডের টাকায় এ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি কার্যত হিন্দু ছাত্রদের প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছিল। এ সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মুসলিমদের জন্য একটি মাদ্রাসা চালু থাকলেও এর ব্যবস্থাপনায় অনেক অনিয়ম চলছিল। ছোটলাট জে.পি. গ্রান্ট-এর নির্দেশে আবদুল লতিফ মাদ্রাসা সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণ করে ১৮৬১ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। মূলত এটি ছিল হুগলি মাদ্রাসা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন। এর ওপর ভিত্তি করেই হুগলি মাদ্রাসায় ঈঙ্গ-ফারসি বিভাগ খোলা হয় এবং ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। ইতোমধ্যে আবদুল লতিফ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি জানান যে, দাতার ইচ্ছানুযায়ী মোহসিন ফান্ডের টাকা কেবল মুসলিমদের জন্য ব্যয় করা হোক। তিনি এ ব্যাপারে দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। অবশেষে ১৮৭৩ সালে হুগলি কলেজ একটি সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং মোহসিন ফান্ডের টাকা শুধু মুসলিমদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করার ব্যবস্থা করা হয়।

আবদুল লতিফের প্রচেষ্টায় ১৮৭৪ সালে মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। তিনি দরিদ্র ও মেধাবী মুসলিম ছাত্রদের পড়াশুনার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান এবং বিত্তশালী মুসলিমদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একটি তহবিল সৃষ্টি করেন। বাংলার মুসলিমদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে মুসলিমদের প্রভাব বিস্তার এবং পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ (Mohammedan Literary Society of Calcutta) গঠন ছিল আবদুল লতিফের জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। তিনি মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও সমকালীন চিন্তা ধারার অনুকূলে জনমত এবং শিক্ষিত মুসলিম, হিন্দু ও ইংরেজদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতির মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ সমিতি গঠন করেন। এটি ছিল ভারতে মুসলিমদের সর্বপ্রথম সমিতি। এই সমিতির কর্মতৎপরতার মাধ্যমেই ভারতে মুসলিমগণ প্রথম স্বনামে একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে। তাছাড়াও এর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সভা, বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে মুসলিমদেরকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা হতে থাকে।

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ রহিমুদ্দীন এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অযোধ্যার প্রিন্স মির্জা জাহান কাদের বাহাদুর ও মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ নাসিরুদ্দীন হায়দার। কমিটির মোট ১২ জন সদস্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অযোধ্যার প্রিন্স মির্জা আসমান জাহ বাহাদুর ও প্রিন্স মুহম্মদ জাহ আলী বাহাদুর এবং মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ হরমুজ শাহ ও প্রিন্স মুহম্মদ বখতিয়ার শাহ। বাংলার ছোটলাটকে সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক করা হয়েছিল। সমগ্র ভারতবর্ষের পাঁচ শতেরও বেশি মুসলমান সোসাইটির সাধারণ সদস্যভুক্ত ছিল। সোসাইটির মাসিক সভার কার্যক্রম উর্দু, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হতো।

আবদুল লতিফ এর ভাষায় ‘মুসলমানদের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং সামাজিক আচরণ ও আদান-প্রদানে শিক্ষিত হিন্দু ও ইংরেজদের সমকক্ষ করে তোলাই ছিল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিজ্ঞান, কলা ও চলমান সমস্যা সংক্রান্ত এবং মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উপায় উদ্ভাবনের জন্য আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সোসাইটি মুসলমানদের ক্ষয়িষ্ণু আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার দ্বারা সমাজ উন্নয়নের নতুন ধারার প্রবর্তনা এবং এভাবে শাসক ও শাসিতের মধ্যে এক নির্ভরশীল সেতু স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুসলমানদের এই ধরনের সর্বপ্রথম সংগঠন হিসেবে মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি কালক্রমে মুসলমানদের প্রভূত কল্যাণ সাধন করে।

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির প্রথম সভা কলকাতার ১৬নং তালতলায় অনুষ্ঠিত হয়। মৌলভী মুহম্মদ ওয়াজির এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যা সম্পর্কে মতবিনিময়ই ছিল এ ধরনের নিয়মিত সভার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বছরে একবার কলকাতা টাউন হলে সোসাইটির সদস্যদের পান্ডিত্যপূর্ণ সান্ধ্য আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হতো। কলকাতা শহরের দেশী-বিদেশী প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক ও জ্ঞানী-গুণীরা এই অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রদর্শন করতেন। ১৮৬৫ সালে কলকাতা টাউন হলে সোসাইটির এক জনাকীর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার ছোটলাট এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ও ইহুদীদের মধ্য থেকে প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি এই সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেন। মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি এভাবে প্রখ্যাত পন্ডিত ও জ্ঞানী-গুণীদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়। মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির বিভিন্ন সভায় ইন্দোরের মহারাজা, ভূপালের বেগম এবং জয়পুর, পাতিয়ালা ও কুচবিহারের রাজারা সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি বিরাট এক দুঃসময়ে মুসলিম জাতি-স্বার্থকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। ভারতীয় স্বার্থের সাইনবোর্ডে হিন্দুরা যখন সব অধিকার একাই কুক্ষিগত করছিল, তখন মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রথমবারের মতো মুসলিম স্বার্থের প্রয়োজন আলাদাভাবে তুলে ধরে। মোহসীন ফান্ডের টাকা লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছিল। যাদের জন্যে এই টাকা এবং যাদের জন্যে এটা বেশি প্রয়োজন, সেই মুসলমানরা মোহসীন ফান্ডের টাকা পাচ্ছিল না। নওয়াব আব্দুল লতিফ তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা দ্বারা বাংলার গভর্নর স্যার ক্যাম্পবলকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে, মোহসীন ফান্ডের টাকা দাতার ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলস্বরূপ বাংলার বৃটিশ প্রশাসন ১৮৭৩ সালের ২৯ জুলাই গৃহীত এক প্রস্তাব অনুসারে মোহসীন ফান্ডের টাকা শুধু মুসলমানদের জন্যে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন থেকে হুগলী কলেজ সরকারি হয়ে গেল এবং মোহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমানদের শিক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। এই টাকায় হুগলী ও কোলকাতা মাদরাসার উন্নতি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদরাসা স্থাপন এবং মুসলিম ছাত্রদের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলো। সরকার ৯টি জিলা স্কুলে আরবী ও ফার্সির শিক্ষক রাখার নির্দেশ দিলেন। এত বড় কাজ সম্ভব হয়েছিল বৃটিশ প্রশাসনের সাথে নওয়াব আব্দুল লতিফের সুসম্পর্কের ফলেই। উল্লেখ্য, মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির দ্বিতীয় আলোচনা সভাতেই নওয়াব আব্দুল লতিফ গভর্নর জেনারেল স্যার লরেন্সকে প্রধান অতিথি করে আনতে সমর্থ হন। এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৬ সালের ৬ মার্চ।

মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির মাধ্যমে নওয়াব আব্দুল লতিফের চেষ্টায় জাতি হিসেবে মুসলমানরা ঊনিশ শতকের সত্তরের দশকেই আরও কিছু সুবিধা অর্জনে সমর্থ হলো। ১৮৭১ সালের ৭ আগস্ট ভারতের বৃটিশ সরকার প্রাদেশিক সরকারগুলোকে নির্দেশ দিল যে, 

(ক) সকল সরকারি বিদ্যালয় ও কলেজে মুসলমানদের ধর্মীয় ও মাতৃভাষা শিখবার উৎসাহ দিতে হবে, 

(খ) মুসলিম অধ্যুষিত জিলাসমূহে স্থাপিত ইংরেজি বিদ্যালয়গুলোতে অধিকতর যোগ্য মুসলমান ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, 

(গ) নিজেদের মাতৃভাষা শিক্ষায় বিদ্যালয় ও ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য মুসলমানদের অধিকতর অর্থ সাহায্য দিতে হবে, 

(ঘ) নিজেদের মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার জন্যে মুসলমানদের অধিকতর উৎসাহ দিতে হবে।’

আজকের বিচারে এই পাওয়াগুলো হয়তো খুব বড় নয় কিংবা এর অন্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। যখন বৃষ্টিশ শাসন বিদ্রোহী জাতি মুসলমানদের পিষে ফেলতে ব্যস্ত এবং হিন্দুরা যখন জাতি হিসেবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মুছে ফেলতে মরিয়া, তখনকার সেই ঘোর অমানিশার দিনগুলোতে জাতি হিসেবে মুসলমানদের এই আলাদা প্রাপ্তি মোটেই ছোট ঘটনা ছিল না। এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে অন্তত শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের আলাদা জাতীয় স্বীকৃতি ও স্বার্থ চিহ্নিত হয়েছিল। মুসলিম জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য লিটারেরি সোসাইটি ছিলো প্রথম কার্যকর ধাপ।

৫ মার্চ, ২০২০

আমেরিকা - তালেবানের চুক্তি ও কিছু কথা



আমেরিকা ও তালেবানের সাথে চুক্তি হয়েছে দীর্ঘদিন আলোচনার ইতি টেনে। তালেবান নিয়ে আমার আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যারা আমার আগের লেখাগুলো পড়েছেন তারা তা জানেন। সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমার আরো আগেই এই চুক্তি বিষয়ে লিখা উচিত ছিল, কিন্তু পারিবারিক ব্যস্ততা আমাকে সে সুযোগ দেয়নি।  

যাই হোক, আমেরিকান ও তালেবানরা যে চুক্তি স্বাক্ষর করলো, সেটার মাধ্যমে গেরিলা গ্রুপ ও কাবুল সরকারসহ অন্যান্য আফগান গ্রুপের মধ্যে আলোচনার দরজা খুলে গেলো বলে অনেকে মনে করছেন। যদিও আমি এখানে আশার কিছু দেখছি না।  

চুক্তিতে যা পাওয়া গেছে...  
১. ধারাবাহিক মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু হবে। এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২ হাজার সেনা রয়েছে। তাদের সাথে রয়েছে ন্যাটো মিত্র বাহিনীর আরও কয়েক হাজার সেনা। আগামী পাঁচ মাসে ৫০০০ সেনা প্রত্যাহার হবে।  
২. এই ১৫ মাস আমেরিকান সেনারা আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারকে নিরাপত্তা দিবে। 

৩. তালেবানরা আল কায়েদা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে আফগান ভূমি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কোন হামলা পরিচালনা করতে দেবে না। 

৪. যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানরা কাতারে একটি যৌথ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করবে, এবং এই কমিটি চুক্তির বিভিন্ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।  

৫. আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তানের সরকার, বিভিন্ন আফগান পক্ষ, এবং  তালেবানদের সাথে ক্ষমতা  কিভাবে শেয়ার করবে সেই ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত চুক্তিতে আসবে সকল পক্ষ মিলে। এই ব্যাপারে আগামী ১০ দিনের মধ্যেই সকল পক্ষ আলোচনা শুরু করবে।

৬. আফগান সরকারের কাছে থাকা ৫ হাজার তালেবান বন্দি আছে তাদের মুক্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করবে, সেই সাথে তালেবানেরা মুক্তি দিবে তাদের হাতে আটক ১ হাজার আফগান বন্দিকে।  

তালেবানের সাবেক প্রধান মোল্লা ওমরের সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবদুল গনি। ২০১০-এর ফেব্রুয়ারিতে আটক হয়েছিলেন পাকিস্তানের করাচিতে। আট বছর পর ছেড়ে দেওয়া হয় সিআইএর অনুরোধে। এখন তার সাথেই চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির কথাগুলো সবই পরস্পর সম্পর্কিত ও শর্তসাপেক্ষ। 

পর্যালোচনা 
চুক্তির ভাষা থেকে যা বুঝা যায় তা হলো বর্তমান সমঝোতা কেবল একটা সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির প্রাথমিক শর্ত মাত্র। এটা কোনো শান্তিচুক্তি নয়। বরং চুক্তির একটি ধাপ মাত্র। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকেরা তাৎক্ষণিকভাবে চলে যাবে না। তালেবানও এখনই তাদের হারানো ‘ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান’ আবার গড়তে পারছে না। দুটিই অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয় হবে। এমনকি চুক্তিতে বারবার বলা হয়েছে, তালেবানের ‘ইসলামিক আমিরাতকে’ যুক্তরাষ্ট্র কোনো বৈধ সরকার বলে স্বীকারও করছে না।

তালেবান আর আমেরিকার এই ধরনের শান্তি চুক্তি অথবা চুক্তির নামে নাটক নতুন কিছু নয়, সময় সময়ে তারা তাদের দ্বিপাক্ষিক প্রয়োজনে তারা এমন চুক্তির মহড়া দিয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ২০০৭-এ তালেবানের দিকে আলোচনার হাত বাড়িয়েছিলেন সর্বপ্রথম। আফগান থেকে মার্কিন সৈন্যদের যাওয়ার প্রধান ব্যাপার হলো আফগানে শান্তি আসা। আর সেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করতে হবে আফগানদের। এই শান্তির পক্ষে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তালেবান আর মার্কিনীরা। শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো মার্কিনীদের জন্য সবচেয়ে খারাপ খবর। তাই অশান্তি জিইয়ে রাখতে তাদের নিরঙ্কুশ সহযোগিতা করে যাচ্ছে তালেবানরা। কিন্তু মার্কিনীরা এমন ভাব নেয় যেন তাদের কোনো দোষ নেই। তারা শান্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কিন্তু আফগানেরা শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হচ্ছে। 

এই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর কাজ করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ বুরহান উদ্দিন রব্বানী। ওবামা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ফেইক সদিচ্ছা প্রমাণ করতে দুই হাজার সেনা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু তালেবানকে দিয়ে আবার প্রেসিডেন্ট রব্বানীকে খুন করিয়ে আরো বাড়তি সেনা প্রেরণ করে। 

এ চুক্তিতে সবচেয়ে খুশি দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং সাধারণ আফগানরা। উভয়ের খুশির কারণ অবশ্যই এক নয়। ট্রাম্পের সামনে নির্বাচন। সেখানে সে জাতিকে দেখাবে আমি যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। যে কারণে যুদ্ধ হয়েছে আমি সেই কারণ জয় করেছি। যুদ্ধ শুরু হয়েছে আল কায়েদাকে হোস্ট করার জন্য আজ আর সেই কারণ নেই। আজ তালেবান স্বীকার করে নিয়ে আল কায়েদা সন্ত্রাসী এবং তারা আল কায়েদাকে হোস্ট করবে না। কিছু সেনা প্রত্যাহার হবে। আর সেই প্রত্যাহার ট্রাম্পের নির্বাচনের একটি ভালো প্রচারণা হবে। আফগানিস্তানের শান্তির চেয়েও ট্রাম্পের জন্য জরুরি ছিল এই চুক্তিটি। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যুদ্ধ চায় না। তারা যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্লান্ত।  

এই চুক্তিতে বড় লাভ যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর। চুক্তির পরই ন্যাটো সৈন্যদের আফগানিস্তান ছাড়তে হচ্ছে না। তালেবানকে এখন তারা বর্তমান আফগান সরকারের দিকে ঠেলে দিলো। ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো সহিংসতার দায় ওয়াশিংটন ওই দুই পক্ষের ওপর বর্তাতে পারবে। এবং তাই হবে। 

এই চুক্তিতে শান্তি আসার খুব একটা সম্ভাবনা নেই কারণ তালেবানরা আফগানের একমাত্র পক্ষ তো নয়ই বরং ছোট পক্ষ। এরা পশতুনদের একটা গ্রুপ। পশতুনদের আরো একটি গ্রুপ হলো হিজবে ইসলাম। এর বাইরে আছে তাজিক, হাজারা ও উজবেক জনগোষ্ঠী। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে তালেবানের সাপোর্ট নেই। পশতুনদের মধ্যে যারা দেওবন্দের অনুসারী তারাই কেবল তালেবানের সমর্থক।  

আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটিতে শান্তি আনতে চাইলে আফগানিস্তানের পাঁচ প্রতিবেশীকেও শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি আফগান নেতারা একমত হতে পারে। কিন্তু তালেবানের মত গোঁড়া দিয়ে সেই আশা করা একটু কঠিন। তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বর্তমান সরকারকে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে এবং একইসাথে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে হবে। 

কিন্তু আমরা কী দেখলাম! 
ট্রাম্প জানিয়েছে, তার সাথে তালেবান নেতার খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। কথাবার্তার ডিউরেশন ছিলো ৩৫ মিনিট। ফোনকলের পরপরই আমরা জানতে পারলাম তালেবান আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ১৫টিতে ৩০টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে কুন্দুজ প্রদেশে ১০ আফগান সেনা, ৪ আফগান পুলিশ ও ৬ আফগান বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। এবং এর প্রতিবাদে আমেরিকা হেলমান্দে বিমান হামলা চালিয়েছে। 

অতএব পুরো ব্যপারটাই আমার কাছে মনে হচ্ছে একটা নাটক। যা আরো কয়েকবার মঞ্চস্থ করেছে আমেরিকা ও তালেবান। তবে চুক্তি অনুযায়ী যদি আমেরিকা আফগান ছাড়ে তবে এটা আফগানিস্তানের জন্য বড় রহমত হতে পারে এবং সেটাই কামনা করি। তবে এই বিষয়টা যদি তালেবান ১৯ বছর আগে বুঝতো তাহলে হয়তো এতো কঠিন যুদ্ধ এড়ানো যেত। 

টুইন টাওয়ারে বেসামরিক মানুষ হত্যা করা ইসলামসম্মত নয়। আল কায়েদা এই হত্যার দায় স্বীকার করে ইসলামের ক্ষতি করেছে। তালেবান তাদের সাপোর্ট করে ও হোস্ট করে আফগান মুসলিম ও বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের অনেক ক্ষতির সম্মুখিন করেছে। পুরো মুসলিম জাতিকে আমেরিকার সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি করে দিয়েছে।

৩ মার্চ, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-২৯ : সাতান্ন সালের বিদ্রোহ ও তার আফটারম্যাথ


১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে কেমন যুদ্ধ ছিল তা একটু আলোচনা করা যেতে পারে। আগের বিদ্রোহগুলোর সাথে এই বিদ্রোহের একটি বেসিক পার্থক্য আছে। ১৮৫৭ সালের আগে যে বিদ্রোহগুলো হয়েছিলো সেগুলো সবগুলোই হয়েছে তাদের দ্বারা যারা ইংরেজদের বিরোধী ছিল। আর এই বিদ্রোহ হয়েছে ইংরেজদের দালাল দ্বারা। যারা ইংরেজদের সৈনিক ছিল, ইংরেজদের অধীনে চাকরি করতো এবং ইংরেজদের নিরাপত্তায় ছিল। পলাশীর ট্রাজেডির বরাবর ১০০ বছর পর এমন একটি বিদ্রোহ জনগণের মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে। প্রচুর সাধারণ মানুষও সিপাহিদের সাথে বিদ্রোহে এটেইন করেছে। বিদ্রোহের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। শুরুতে এদেশের অনেকে ইংরেজদেরকে অন্যান্য বিদেশি শাসকদের মতোই মনে করেছিলো। কিন্তু তারা ছিল অত্যাচারী ও জুলুমবাজ। তাই তাদের সৈনিকরাই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল।  ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। 

প্রথমত
ইংরেজদের অর্থনৈতিক আগ্রাসন। উপমহাদেশ দখলের শুরু থেকেই তারা দেশীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করে তার উপর ঔপনিবেশিক অর্থনীতি চাপিয়ে দেয়। তারা এদেশের প্রচলিত ব্যবসা বাণিজ্য নষ্ট করে, কুটির শিল্পগুলি ধ্বংস এবং দেশের যাবতীয় মূলধন ও সম্পদ হস্তগত করে এদেশের অর্থনীতির উপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্যের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এবং কুটির শিল্পগুলি ধ্বংস হওয়ার ফলে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। দেশে বেকার ও দারিদ্র বৃদ্ধি পায় । প্রজাসাধারণ কৃষির উপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কোম্পানির ভ্রান্ত নীতির ফলে একদিকে যেমন জমিদার ও মহাজন শ্রেণির উদ্ভব হয়, তেমনি অন্যদিকে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কোম্পানির কর্মচারী এবং জমিদার ও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে ইংরেজদের দালালশ্রেণির আগ্রহের বাড়াবাড়িতে ব্রিটিশ শাসকবর্গ সামাজিক কুপ্রথা এবং কুসংস্কারের অবসান কল্পে একের পর এক বিধি প্রণয়ন করতে থাকেন। সতীদাহ প্রথার অবলুপ্তি, বিধবাবিবাহ প্রচার, স্ত্রী-শিক্ষার প্রবর্তন, বাল্যবিবাহ নিবারণ প্রভৃতি ব্যবস্থা রক্ষণশীল হিন্দুদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থারও আমূল পরিবর্তন হয়। এতে রক্ষনশীল ভারতীয়দের মনে ইংরেজদের উদ্দেশ্যে সন্দেহ জাগে। তাদের ধারণা হয়, সমগ্র ভারতবর্ষকে ধর্মান্তরিত করার জন্য ইংরেজগণ পরিকল্পিতভাবে তোড়জোড় শুরু করছিল। তদুপরি সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের প্রতি বৃটিশের অবজ্ঞা এবং উপেক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বঞ্চনা তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়। ভারতীয়দের সেই বিরূপ মনোভাব সিপাহী বিদ্রোহে পরোক্ষ ইন্ধন জোগায়। সামাজিক এই সংস্কারের ফলে হিন্দু সমাজ যারা শুরু থেকেই মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তা করেছিল তারা বেঁকে বসে।   

তৃতীয়ত
ইংরেজরা একের পর এক দেশীয় রাজ্যগুলো গ্রাস করতে থাকে এবং রাজবংশের উচ্ছেদ করতে থাকে, তাতে দেশীয় রাজন্যবর্গ এবং তাদের কর্মচারিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। দুচার জন বাদে ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড ডালহৌসি পর্যন্ত সকলেই সমস্ত প্রকার রীতিনীতি ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় রাজ্যগুলি অধিকার করেন। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির প্রয়োগের ফলে বহু রাজবংশের উচ্ছেদ হয়। মোগল বাদশাহের অপসারণ মুসলিমদের মনে দারুন আঘাত হানে। পেশোয়ায় নানা সাহেবের বৃত্তি বন্ধ করে ইংরেজগণ মারাঠাদের উত্তেজিত করে তোলেন। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজন্য বর্গের সঙ্গে এইসব অসন্তুষ্ট মানুষ হাত মেলালে বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে।

চতুর্থত
ভারতের খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ সামগ্রিকভাবে রক্ষনশীল ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়। তাদের মিশনারি কার্যকলাপ মানুষের ধর্ম বিশ্বাসে প্রচন্ড আঘাত হানে। মুসলিমগণ যারা দীর্ঘকাল রাজ্যশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তারা অপসারিত হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ও ব্রিটিশের প্রতি চাপা অসন্তোষ পোষণ করতে থাকেন । তাদের ক্ষমতাচ্যুতি এবং দুরাবস্থার জন্য তারা ইংরেজদের দায়ী করেন। আর মুসলিমরা তো গোড়া থেকেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং একের পর এক বিদ্রোহ করেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে। তারাও দেখেছিলো যে ইংরেজদের দমননীতির ফলে বন্ধ হয়ে যায় মাদরাসাগুলো। ফলে মুসলিমদের মধ্যে শির্ক ও বিদআতের প্রচলন শুরু হয়। এজন্য এদেশে ওয়াহাবী আন্দোলন জমে উঠেছিলো। তারই প্রেক্ষিতে জিহাদী মানসিকতা তৈরি হয় মুসলিমদের মধ্যে। 

পঞ্চমত 
সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সিন্ধু ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাগণ তা থেকে বঞ্চিত হতেন। তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের যত্রতত্র বদলি ও নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহিগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অস্বীকৃত হন। অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে যখন তাঁরা অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত তখনই লর্ড ক্যানিং -এর প্রবর্তিত সামরিক নিয়োগ বিধি আগুনে ঘি ঢালার ব্যবস্থা করে। এই নিয়মানুসারে ভারতীয় সিপাহিদের যেকোনো কাজ করতেও বাধ্য করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৪-৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ইংল্যান্ডের জয়লাভ সত্ত্বেও ব্রিটিশ সামরিক বিভাগের দুর্বলতা ভারতীয় সেনাদের উৎসাহিত করে তোলে। তাদের ধারণা হয়, ভারতে অনুরূপ ব্যাপক অভ্যুত্থান ঘটাতে পারলে সেই অভ্যুত্থান দমন করা ইংরেজ বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে তারা গোপনে প্রস্তুত হতে থাকেন। অন্য একটি বদ্ধমূল ধারণা এক্ষেত্রে কাজ করেছিল, যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন একশো বছর স্থায়ী হবে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সেই শাসনেরই শতবর্ষ পূর্তির বছর। অতএব সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্যেও ভারতীয় সিপাহিগণ তৎপর হন।                        
ষষ্ঠত
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেল। বিভিন্ন কারণে সিপাহিদের মধ্যে যখন ক্ষোভ ক্রমশ পূঞ্জীভূত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভ কে বিদ্রোহে পরিণত করে। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ (Cartridge) ব্যবহার করা হতো, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হত । গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে । ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে।

তবে মূল কথা হলো এনফিল্ড রাইফেলের প্রবর্তন সিপাহী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ হলেও একে প্রধান কারণ বলা যায় না। কারণ, চর্বি মাখানো টোটাই যদি এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ হতো, তাহলে টোটা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে সরকারি নির্দেশ জারি করার পরেই এই বিদ্রোহের অবসান ঘটতো। কিন্তু তা না হয়ে বিদ্রোহ চলতে থাকে এবং ইংরেজদের হটানোই মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহিরা চর্বি মাখানো এই টোটাই ব্যবহার করেছিল।

সিপাহী বিদ্রোহ প্রথমে শুরু হয় মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে কলকাতার উত্তরে ব্যারাকপুরে। এই বিদ্রোহের সংবাদ লক্ষ্ণৌ-এর সিপাহিদেরও সংক্রামিত করেছিল। লক্ষ্ণৌ-এর পরে বিদ্রোহ মীরাটে প্রসারিত হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে এপ্রিল মীরাট সেনা ছাউনিতে ৮০ জন সৈনিক প্রকাশ্যে ওই কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। মীরাট থেকে এই বিদ্রোহ দ্রুত গতিতে দিল্লীতে ছড়িয়ে পড়ে । দিল্লীতে সিপাহিরা স্ত্রী-পুরুষ-শিশু নির্বিচারে ইংরেজদের হত্যা করে । দিল্লি পৌঁছে বিদ্রোহীরা লাল কেল্লা দখল করে । পরে বৃদ্ধ বাহাদুর শাহকে সিংহাসনে বসিয়ে তাঁকে দিল্লির বাদশারূপে ঘোষণা করেন। এর পর বিদ্রোহ গাঙ্গেয় প্রদেশগুলিতে ও মধ্যভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ফিরোজপুর, মজফ্‌ফর নগর ও আলিগড়ে সিপাহিরা বিদ্রোহী করে। এরপর পাঞ্জাবের বিদ্রোহ বিস্তার লাভ করে। অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে। অযোধ্যার সম্পত্তিচ্যুত তালুকদাররা বিদ্রোহে যোগ দেন। রোহিলাখন্ডের সর্দাররা এই বিদ্রোহে যোগ দেন। এদের মধ্যে বেরিলির খান বাহাদুর, নাজিরাবাদের মহম্মদ খাঁ, গোরখপুরের মহম্মদ হাসান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে বাংলার চট্টগ্রামের সিপাহিরা বিদ্রোহী হন। কিন্তু সেখানে জনসাধারণের সমর্থন না পাওয়ায় সিপাহিরা পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

নর্মদা নদীর দক্ষিণাঞ্চলে শান্তি একরকম অক্ষুন্নই ছিল, যদিও সিপাহিদের মধ্যে উত্তেজনার অভাব ছিল না।রাজস্থানেও বিদ্রোহ সংক্রামিত হয়। কিন্তু রাজপুত শাসকরা ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থাকায় সেখানে বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারেনি। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংগ্রামে নামা ছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের গণবিদ্রোহের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। গ্রামাঞ্চলে কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমিরাজস্ব আইন দ্বারা সুরক্ষিত সুদখোর মহাজন ও নতুন জমিদারদের  বাড়িঘর ও কাছারি লুঠ করা হয় । যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় ডাকাতরাও এই সব লুঠতরাজে অংশ নিয়েছিল। ব্যবসায়ী ও মহাজনদের ওপর কর বসিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের খাদ্যশস্য ও যুদ্ধের রসদপত্র কেনা হয়।

তারপরও ব্যর্থ এই বিদ্রোহ
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত নানান ক্ষোভ ও অসন্তোষকে কেন্দ্র করেই ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের সূচনা হয় । বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর সমর্থন, জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও সহানুভূতি থাকা সত্বেও মহাবিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার মূলে একাধিক কারণ ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো এই বিদ্রোহের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা ছিলো না। সিপাহিরা যার যার ইচ্ছেমতো বিদ্রোহ করেছে। কোনো দিক-নির্দেশনা ও গাইডলাইন ছিলো না। বিদ্রোহের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় প্রথম থেকেই এর সাফল্য লাভের সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। সিপাহি বা জনগণের নেতৃবর্গ কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরতে পারেন নি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ায় বিদ্রোহ দমন করতে ইংরেজ প্রশাসনের বিশেষ কোনো অসুবিধার সন্মুখীন হতে হয়নি। সিপাহিরা বাহাদুর শাহকে নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে কিন্তু সিপাহী ও বাহাদুর শাহের মধ্যে যোগাযোগ ছিলো না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো সিপাহিরা বেশিরভাগ ছিলেন হিন্দু অপরদিকে মুসলিম বাহাদুর শাহকে করা হয়েছে নেতা। 

সমগ্র ভারতে বিদ্রোহ প্রসারিত হলেও মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতের বিহার, দিল্লী, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। ভারতের সমস্ত অঞ্চলে বিদ্রোহ না হওয়ায় কোম্পানি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিয়ে এসে তাদের অন্যত্র বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত করে। ভারতের বিভিন্ন জাতি ও দেশীয় রাজারা বিদ্রোহের বিরোধিতা করে ব্রিটিশদের সমর্থন করেন। এরমধ্যে রয়েছে হায়দ্রাবাদের নিজাম, কাশ্মীরের মহারাজা, সিন্ধিয়া, পাতালিয়া ও গুর্খা বীর স্যার জঙ্গবাহাদুর প্রভৃতি দেশীয় রাজা ও অসংখ্য ছোটো-বড়ো জমিদার বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিল।

১৮৫৭ সালের ফলাফল
ইংরেজরা ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমাতে সক্ষম হলেও তাদের টনক নড়ে। তারা বুঝতে সক্ষম হয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে লুটতরাজ চালাচ্ছে তাতে ভারত শাসন কঠিন হয়ে যাবে। তাই বিদ্রোহ দমনের পর ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া ১ নভেম্বর থেকে নিজের হাতে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং কোম্পানী শাসন বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এর মধ্যমে ভারতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে। এছাড়া তিনি আরো ঘোষণা নিয়ে এক ঘোষণাপত্র প্রেরণ করেন। যার মাধ্যমে তিনি ভারতীয়দের নানানভাবে আশ্বস্ত করেন।

এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় — 
১. ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। 
২. জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের চাকরিতে নিযুক্ত করা হবে। 
৩. স্বত্ববিলোপ নীতি ও অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি পরিত্যক্ত হবে। 
৪. স্বাক্ষরিত সন্ধি ও চুক্তিগুলিকে মান্য করা হবে। 
৫. বন্দি সিপাহী ও ভারতীয়দের মুক্তি দেওয়া হবে।

প্রশাসনিক পরিবর্তন 
বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে ভিক্টোরিয়া ভারত শাসন আইন পাশ করেন। ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভার ও পার্লামেন্ট মহাসভার অধীনে ভারতের শাসনকে আনা হয়। ব্রিটিশ মন্ত্রীসভায় একজন ভারত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। তার খেতাব হয় "ভারত সচিব"। তিনি ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার পক্ষে ভারতবাসীর প্রধান হন। ভারত সচিবকে পরামর্শ দানের জন্য ১৮৫৮ সালে আইনে একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়। আগের মতো বড়লাট তার ক্ষমতায় থাকেন। তবে তার উপাধি হয় গভর্ণর জেনারেল ও ভাইসরয়। প্রথম ভাইসরয় হয় লর্ড ক্যানিং।

আগের ডিরেক্টর সভা ও বোর্ড অব কন্ট্রোল-এর যাবতীয় ক্ষমতা দেওয়া হয় ভারত সচিব নামে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার এক ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে। ভারত সচিবকে সাহায্যের জন্য ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠন হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল। ১৮৬১ সালের কাউন্সিল আইন পাশ করে ভাইসরয়ের আইন পরিষদে ৬-১২ জন সদস্যের মধ্যে বেসরকারি ইংরেজ ও ভারতীয়নের সংখ্যা অর্ধেক হয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে লর্ভ মেয়ো, ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে লর্ড লিটন ও ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ক্যানিং বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করে প্রাদেশিক শাসন পরিষদ ও আইনসভাগুলিকে কিছু কিছু ক্ষমতা দান করেন।

প্রদেশগুলিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা দান করায় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থায় উন্নতি হয়। স্থানীয় পৌরসভা ও জেলা বোর্ডগুলি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জলের বন্দোবস্ত প্রভৃতি উন্নতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার উন্নতিতে লর্ড রিপনের নাম স্মরণীয়। ১৮৭৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতসম্রাজ্ঞী বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে ভারতীয় রাজন্যবর্গ হন তার অধীনস্থ সামন্ত বা প্রজা।

সামরিক বিভাগের পরিবর্তন 
ভারতের সামরিক বিভাগকে নতুন করে গঠন করা হয়। দেশীয় সৈন্যসামন্তের সংখ্যা হ্রাস করে ইংরেজ সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। প্রেসিডেন্সি সেনাবাহিনীকে পৃথক করা হয়। গোলন্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়। সীমান্তরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার দায়িত্ব ইউরোপীয় সামরিক কর্মচারীদের উপর অর্পণ করা হয়। বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ বন্দি অবস্থায় রেঙ্গুনে প্রেরিত হন এবং তার পুত্র ও পৌত্রগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে মুঘল বংশের অবসান ঘটে। একইসাথে অনেক মুসলিম স্বাধীনতাকামী নেতাদের নির্বাসন ও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে ইংরেজ সরকার। 

ভারতে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ 
বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সাধারণ ভারতবাসী তার রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠলো এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে ক্রমশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে সিপাহী বিদ্রোহ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা করে। ভারতবাসীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ে। ডাক-তার-রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আদানপ্রদান বৃদ্ধি পেল। জেগে উঠল সংঘ চেতনা। শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের নেতৃত্বে ইংরেজ বিরোধী রাজনীতি সম্প্রসারিত হওয়া শুরু করেছিলো। একইসাথে ইংরেজদের পক্ষের সুবিধাভোগী শিক্ষিত শ্রেণিও তৈরি হয়েছিলো।  

বঙ্গকথা পর্ব-২৮ : সাতান্ন সালের খালক-ই-খুদা, মুলক-ই-বাদশাহ, হুকুম-ই-সিপাহী



মুঘল সম্রাট বাবরের বিশতম বংশধর ও শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ ১৮৩৭ সালে ক্ষমতায় আরোহন করেন। এই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত ইংরেজদের অনুদানপ্রাপ্ত। তিনি প্রকৃত শাসক ছিলেন না। তিনি কোম্পানি থেকে বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ভাতা গ্রহণ করতেন। ইংরেজদের সাথে ভাতা ও উত্তরাধিকার নিয়ে তার মনোমালিন্য ছিল। এর মধ্যেই শুরু হয় সর্বাত্মক স্বাধীনতা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল নেতা হিসেবে ধারণা করা হয় সম্রাট বাহাদুর শাহকে। যদিও তিনি আসলে কতটুকু নেতৃত্ব দিয়েছেন তা প্রশ্নবিদ্ধ। 

বাহাদুর শাহ সম্রাট হিসেবে আরোহণের ২০ বছর পর সূত্রপাত হয় ঐতিহাসিক স্বাধীনতা বিদ্রোহের। এটি পলাশীর যুদ্ধের ১০০ বছর পরের ঘটনা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছে। দেশবাসীর সাথে সাথে ইংরেজদের অধীনে থাকা এদেশীয় সৈন্যদের ওপরও চলছে জুলুম, বঞ্চনা ও নির্যাতন। একের পর এক দেশীয় রাজ্য ইংরেজ অধিকারে নিয়ে যাওয়া, লাখেরাজ ও দেবোত্তর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, কারাগারে হিন্দু-মুসলমান সিপাহিদের জন্য একই খাবারের ব্যবস্থা, ঘিয়ের মধ্যে চর্বি ও আটার মধ্যে হাড়গুঁড়োর সংমিশ্রণ, গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ বিতরণ ইত্যাদি ভারতবর্ষের জনমনে এবং সৈনিকদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। 

ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যে ধূমায়িত বিক্ষোভ ও অস্থিরতার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দমদম সেনাছাউনিতে। সিপাহীরা ইংরেজ অফিসারকে জানায়, এনফিল্ড রাইফেলের জন্য যে কার্তুজ তৈরি হয়, তাতে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো থাকে এবং এতে তাদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সিপাহীদের বুঝিয়ে শান্ত করে। কিন্তু খবরটি একে একে বিভিন্ন সেনাছাউনিতে পৌঁছে যায় এবং তা সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহের রূপ ধারণ করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর সেনাছাউনিতে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯ নম্বর পদাতিক বাহিনীর সিপাহীরা কার্তুজ নিতে অস্বীকার করে, রাতে অস্ত্রাগারের দরজা ভেঙে পুরনো মাসকেট বন্দুক ও কার্তুজ সংগ্রহ করে। তারা এনফিল্ড রাইফেলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিপাহীদের নিরস্ত্র ও বরখাস্ত করা হয়। এই সংবাদও দ্রুত পৌঁছে যায় বিভিন্ন সেনানিবাসে। ২৯ মার্চ রোববার ব্যারাকপুরের দেশীয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করে। মঙ্গল পান্ডে নামের সিপাহি গুলি চালিয়ে ইংরেজ সার্জেন্টকে হত্যা করে। 

প্রহসনমূলক বিচারে মঙ্গল পান্ডে তাকে সহায়তার অভিযোগে জমাদার ঈশ্বরী পান্ডেকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় তাদের ফাঁসি দেয়া হয়। এর পরিণতিতে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের উত্তর থেকে মধ্যপ্রদেশ এবং জলপাইগুড়ি থেকে পূর্ববাংলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের চট্টগ্রাম পর্যন্ত। ৯ মে উত্তর প্রদেশের মিরাটের সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন দিল্লির পথে অগ্রসর হন। ১১ মে সিপাহীরা দিল্লি অধিকার করে বহু ইংরেজকে হত্যা ও বিতাড়ন করেন। দেশপ্রেমিক সিপাহিরা এ দিন লালকেল্লায় প্রবেশ করে নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। সিপাহীরা সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেন। এদিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে ৮২ বছরের বৃদ্ধ সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়।

বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহীদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ­ এ সংবাদ  কানপুর, লক্ষ্মৌ, বিহার, ঝাঁশি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে ‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহী।’ অর্থাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশার রাজ্য, সিপাহির হুকুম। একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতবর্ষের মাটি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ ছিল। তারাও এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে। 

কিন্তু ভারতীয়দের এই সংগ্রাম সফল হতে পারেনি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। বিচারকরা রায় দেন, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দণ্ডাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। অবশেষে বাহাদুর শাহকে ইয়াঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

বাহাদুর শাহকে বাংলাদেশে প্রাক্তন ভিক্টোরিয়া পার্ককে বাহাদুর শাহ পার্ক নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান নৌবন্দর সদরঘাটে এই পার্ককে ঘিরে রয়েছে সাতটি রাস্তা। সিপাহী বিদ্রোহের সাথে সংশ্লিষ্ট সৈনিক ও দেশপ্রেমিক জনতার একটি অংশকে এই পার্কের গাছগুলিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান আমলে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয় এবং এই পার্কের নাম পরিবর্তন করে বাহাদুর শাহ পার্ক নামকরণ করা হয়। এই কাজটি করে ডিআইটি তথা ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট। ডিআইটির বর্তমান নাম রাজউক তথা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। 

১১ ফেব, ২০২০

ইরানি বিপ্লব কেন হয়েছিলো? কতটুকু সফল?



আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৯ সালে এই দিনে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফলতার মুখ দেখে। সেই থেকে ৪১ বছর ধরে পাশ্চাত্য সভ্যতার হুমকি হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইরানিরা। এই বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব বলতে রাজি হন না আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীরা। তারা এটাকে ইরানি বিপ্লব বা শিয়া বিপ্লব বলেই অভিহিত করেন। 

বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এক নাম ইরানি সভ্যতা বা পারসিক সভ্যতা। একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশটি। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শাহী ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের একজন ধারক ছিল ইরানের সর্বশেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। প্রায় আড়াই হাজার বছরের এই রাজবংশের বিলুপ্তি ঘটে গেলো ১৯৭৯ সালে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানি বিপ্লব ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমাজের বিদ্রোহ। ইসলামকে জিন্দা করা, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে প্রতিরোধ করা, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক মুক্তি ছিলো যার মূল চাওয়া। 

বিংশ শতকের প্রথম দিকে, প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বই ইউরোপিয়ান শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উসমানীয় খিলাফতের পতন ঘটে যা ছিল ক্লাসিক ইসলামি সভ্যতার সর্বশেষ প্রতিনিধি। সুতরাং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্ব তাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ শুরু করে। 

ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী, পশ্চিমা, শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি, যারা বিশ্ব বিপ্লবের প্রথম এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব অর্জনের তাগিদ থেকেই। এই নেতারা সমাজ ও রাজনীতিতে খ্রিস্টানদের দৃঢ়তা কমাতে ইউরোপের প্রগতিশীলতাকে অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, মুসলিম সমাজে যদি সংস্কার আনা সম্ভব হয় এবং সমাজের ওপর থেকে ধর্মের প্রভাব এমনকি ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয় তাহলে মুসলিম সমাজ অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হবে। 

সংস্কারবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো তুরস্কের নতুন ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গঠন। ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের পতন ঘটেছিল যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একটি ধাক্কা সৃষ্টি করেছিল। এই ধাক্কার ফলে আলেম-উলামাদের নেতৃত্বে বিকল্প তৃণমূল ইসলামী তাজদিদ আন্দোলনের উত্থান ঘটায়, যারা মনে করতো ইসলামের অস্তিত্ব বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে। এই আন্দোলনগুলির সূচনা অরাজনৈতিক ছিল এবং মুসলমান জনগণের কাছে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল বলেই জনসমর্থন অর্জন করেছিল। সময়ের স্রোতে তারা সমাজে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছিল এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা সক্রিয় হয়ে উঠলো। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বে ক্ষমতার মেরুকরণে একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, মুসলিম বিশ্বগুলো ইউরোপিয়ান উপনিবেশের হাত থেকে মুক্ত হতে শুরু করে, শুধুমাত্র ইরান ও তুরস্ক স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাবিত হয়। ইরান ও তুরস্ক এমন দুটি দেশ ছিল যেখানে সোভিয়েত সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা তীব্রতর হয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক পশ্চিম ব্লকের সদস্য হওয়ার জন্য  উভয় দেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছিল। তুরস্ক ও ইরান তাদের এই সহায়তা গ্রহণ করে এবং যথাক্রমে ১৯৫০ সালে এবং ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। 

১৯৫১ সালে ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম সরকার নির্বাচিত হয় মোহাম্মাদ মোসাদ্দেকের ন্যাশনাল ফ্রন্ট। মোসাদ্দেক ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতা। তিনি একইসঙ্গে পশ্চিমা, ইসলামি উলামা ও ধর্মনিরপেক্ষ সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জন করতে পেরেছিলেন। সম্রাট রেজা শাহ পাহলভির রাজত্বকালীন তাদের তেল ক্ষেত্রের শোষণের কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠা ক্রোধ থেকেও তিনি বেনিফিট পেয়েছেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আক্রমণের হাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য ব্রিটেন ও রাশিয়া পার্সিয়ান তেল ব্যবহার করেছিল যা ব্রিটিশ অর্থনীতির উন্নতিতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিল। তবে, ইরানিরা কেবল লাভের ২০ শতাংশই পেয়েছিল। ঠিক এমন সময়ে এই ইস্যুকে সামনে এনে ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করার মাধ্যমে মোসাদ্দেক একটি দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। যদিও এটা তার জন্য হিতের বিপরীতই হলো, ব্রিটিশ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে যা ইরানি অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করতে শুরু করে। 

১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ও মার্কিন সিআইএর সংগঠিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়েছে। রেজা শাহ পাহলভীর নিকট ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া হলো এবং অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিটি ৫০-৫০ মুনাফায় হলো বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম।

এই হস্তক্ষেপটিই শুধুমাত্র ইরানিদেরই আঘাত করেনি বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এটি এই মেসেজ মুসলিম বিশ্বকে দিয়েছিলো যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে পশ্চিমা স্বার্থের সাথে মানানসই না হলে এটি বাতিল করা হবে। এই চিত্রটি আজ পর্যন্ত চালু রয়েছে। মিশরেও কিছুদিন আগে ইখওয়ানকে একইভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। 

১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭৭, এই সময়ে ইরানের বিকাশের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে কী চরমভাবে শাহ মার্কিনদের ওপর নির্ভর করেছিল। মার্কিনদের প্রচেষ্টানুযায়ী এই সময়কালে ইরানি সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, ইরানি সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে নির্মাণ করেন শাহ, যাকে তিনি শ্বেত বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন। 

যদিও তার অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইরানে সমৃদ্ধি ও শিল্পায়ন এনেছিল এবং শিক্ষাগত উদ্যোগের ফলে সাক্ষরতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিন্তু এসবই ছিল বেশ ব্যয়বহুল। সম্পদ সমানভাবে বিভক্ত হয়নি, কৃষকদের মধ্যে নগরায়নের প্রভাব লক্ষণীয় ছিল। ভিন্নমত পোষণকারীদের  রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক দমনপীড়ন করা হয়েছিল। আলেম-উলামারা ইরানি জাতির ওপর পশ্চিমা জীবনধারা চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করতেন। তারা মনে করতেন যে, ইসলামকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরানো হচ্ছে। 

শাহের রাজনৈতিক সহিংসতামূলক দমন ইরানি সাধারণ জনগণকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে বাধ্য করে। ১৯৬০ এর দশকে মার্কসবাদী ফাদাইয়ান-ই-খালক ও ইসলামী বামপন্থী মুজাহিদীন-ই-খালক নামক দুইটি জঙ্গি গোষ্ঠী বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং আলী শরিয়তীর নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী থেকে আরো কার্যকর ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধিতা আসতে শুরু করে।

আলী শরীয়াতি, একজন ফরাসি থেকে শিক্ষার্জন করা বুদ্ধিজীবী যিনি আলজেরীয় এবং কিউবান বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সক্রিয় সংগ্রামের আহ্বান জানান এবং সমাজের পশ্চিমা মডেলের পরিবর্তে ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি শিয়া পণ্ডিতদের সমালোচনা করেছিলেন তাদের শতাব্দী-পুরাতন রাজনৈতিক শান্তির মতবাদে আটকে থাকার জন্যে যা বিপ্লবী প্রগতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা হিসাবে দেখা যায়।

আয়াতুল্লাহ খোমিনির মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতাটি ভেঙে যায়, যিনি ১৯৬৩ সালের বিক্ষোভে স্পষ্ট ভূমিকা পালন করার জন্য অগ্রসর হন এবং ফলস্বরূপ নির্বাসিত হন। শাহকে খোলাখুলিভাবে সমালোচনা করা তাঁর রেকর্ডকৃত উপদেশ ইরানে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের নতুন ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে খোমেনি যুক্তি দেন। কুরআনের ওপর ভিত্তি করে ইসলামিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, উদাহরণস্বরূপ নবী মুহাম্মাদ সা.-এর মদিনা রাষ্ট্রকে তিনি সামনে নিয়ে আসেন। 

তার বিখ্যাত বই 'উইলিয়াত-ই ফকিহ : হুকুমাত-ই ইসলামি'তে খোমেনী জোর দিয়ে বলেছেন যে সত্য ইমামের (শিয়া মাজহাবে মুহাম্মদ সা.-এর বংশধর থেকে একমাত্র বৈধ নেতা) অনুপস্থিতিতে আলেমরা ইসলামী ধর্মগ্রন্থগুলির জ্ঞান অর্জনের দ্বারা তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য দায়িত্বরত। এই ধারণাটি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কারণ সুফীবাদের কারণে ইরানি আলেমরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন। তিনি এর মাধ্যমে আলেমদের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার শুধু বৈধতাই দেননি বরং তা অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন।

খোমেনির জ্বালাময়ী বক্তব্য ও লেখনী দ্বারা ইরানিরা ব্যাপকভাবে উদ্দিপ্ত হন। শাহের বিরুদ্ধে তার অনুসারীদের বিক্ষোভগুলি ইরানের সব প্রধান প্রধান শহরে ছড়িয়ে পরেছিল। ১৯৭৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি যখন নির্বাসিত খোমেনি বিজয়ী হয়ে ইরানে ফিরে আসে তখনই বিপ্লব পূর্ণতা পায়। এর দশদিন পর যখন আন্দোলন তীব্রতা চরমে পৌঁছায় তখন রেজা শাহ পাহলভি পদত্যাগ করেন এবং পালিয়ে যান। 

ইরানি বিপ্লব এমন একটি ঘটনা যা কেবল ইরানকেই সম্পূর্ণরূপে রূপান্তরিত করেনি, বরং বিশ্বের জন্যও এর প্রভাব ছিলো ব্যাপক। এটি স্নায়ু যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির রূপান্তর ঘটিয়েছিল। আমেরিকা কমিউনিস্ট হুমকির বিরুদ্ধে কেবলমাত্র একটি কৌশলগত সহযোগীকেই হারায়নি বরং তারা নতুন এক শত্রুও অর্জন করেছে।

বিপ্লবের শুরুর প্রহরেই আমেরিকা এর বিনাশে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে। ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের উত্থান ঘটে, যা নতুন ইরানি শাসনকে আরো সুসংহত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছিল, ইরাককে বিশ্বে শক্তিশালী ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করেছিল। 

এছাড়াও ইরানি বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটায়। এটি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় স্নায়ূযুদ্ধকে উস্কে দেয়। এই বিপ্লব সৌদি আরবের রাজতন্ত্র এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের দাবির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ধর্মীয় ও মতাদর্শিক যুদ্ধ আজও বিদ্যমান। রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থানের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ইরানি বিপ্লবের প্রভাব দেখা যায়। ইরানের সফলতা দেখায় যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটি স্বপ্ন নয়। পশ্চিমা ও তাদের সহযোগী সম্রাট / স্বৈরশাসকদের ওপর জয় লাভ করা যে সম্ভব তাও ইরান প্রমাণ করেছে।

১৯৮০ ও ৯০র দশকে, পৃথিবীর সব ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলি (শিয়া ও সুন্নি) সব মুসলিম দেশেই উৎসাহিত হয়েছিলো ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায়। তাদের আহ্বানের মূল কথা ছিলো, ধর্মনিরপেক্ষতার পশ্চিমা মডেল অগ্রগতি এবং জনগণের স্বাধীনতা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে যেখানে ইসলামি মডেল একমাত্র বিকল্প ছিল। এটা যে বাস্তবায়ন হতে পারে তার প্রমাণ ছিলো ইরানি বিপ্লব।

ইরানি বিপ্লব এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান রয়েছে। ৮ বছর ধরে ইরান-ইরাক যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ এটি চার দশক ধরে টিকে রয়েছে। বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শক্তি দিনে দিনে দৃঢ় হচ্ছে। তবে এর বিপরীত দিকও আছে। এই বিপ্লব ইরানিদের একটি স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে সম্মান এনে দিয়েছে তবে ঠিক যে কারণে এই বিপ্লব জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে তা এখনো অর্জিত হয়নি। খোমেনি ও তার সমর্থকরা ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যকার পার্থক্য দূর করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। বর্তমানে ইরানের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তেলের রাজস্ব পতন রোধ করা থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ বেকারত্বের হার এবং  মুদ্রাস্ফীতির মানুষের মনে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের আশা অতি ক্ষীণ। বেশিরভাগ ইরানি নাগরিকরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসমাপ্ত নিষেধাজ্ঞাকেই বিপ্লবের ব্যর্থতা হিসেবে দোষারোপ করে। যদিও ইরান ইউরোপীয় শক্তি, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করছে, তবুও তারা বিশ্বাস করে যে, পশ্চিমারা তাদের সফল হতে দিতে চায়না।

ইরানের বিপ্লবের যে লক্ষ্য ছিল তা বাস্তবে এখন কোন অবস্থানে রয়েছে তা নিরুপণ করা বেশ কঠিন। একবিংশ শতকে এসেও ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বিশ্ব ভূ-রাজনীতির জঘন্য রোষানলের ফলে দেশটিতে এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে ইউরোপের পরে মার্কিন আগ্রাসনের সঙ্গে শত্রুতা করে কোন দেশই এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি, ইরান সেখানে এখনও এমন এক মুসলিম রাষ্ট্র যারা বিগত ৪০ বছর ধরে মার্কিন আগ্রাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে টিকে আছে। 

৯ ফেব, ২০২০

শহীদ এ কে এম ইউসুফ : এক ক্ষণজন্মা হাদীস বিশারদ



শহীদ মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ছিলেন একাধারে স্বনামধন্য মুহাদ্দিস, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও মুহাক্কিক। তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন। তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন এদেশের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চাষী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের খেদমত করে গেছেন। তার এই সমাজসেবামূলক কর্মের মাধ্যমে অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছেন। তিনি বলেন, জুলুমবাজ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য কথিত বিচারের নামে প্রহসন করে তাকে কারারুদ্ধ করে তিলে তিলি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

জন্ম :
১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাগেরহাটের শরণখোলায় মা-বাবার ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ৮৭ বছর বয়সে আরেক ফেব্রুয়ারি মাসে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে বেলা এগারোটা তিরিশ মিনিটে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার :
মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা শরণখোলার বাসিন্দা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা তার গ্রামের স্কুল এবং পরে রায়েন্দার একটি স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন। তিনি শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক স্তরের পড়ালেখা শেষ করেন। 

শহীদ এ কে এম ইউসুফ ফাজিল এবং কামিল পড়াশোনা করেন ঢাকা আলিয়া থেকে। ১৯৫০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল (সম্মান) পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপরেই তিনি ১৯৫২ সালে স্নাতক (কামিল) পরীক্ষা শেষ করেন, মমতাজ আল-মুহাদ্দেসিন হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের পন্ডিতদের কাছে এটি সর্বোচ্চ সুনাম ।

তিনি ১৯৫২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৮ সালে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন। তিনি মথবাড়িয়ার (বরিশাল) একটি সিনিয়র মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নয় বরং উপমহাদেশের অন্যতম হাদীস বিশারদ। হাদীসের মশহুর কিতাব “হাদীসের আলোকে মানব জীবন” তাঁর অনন্য কীর্তি। বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ অথচ জীবনঘনিষ্ঠ হাদীসসমূহ এবং সেই সাথে সংক্ষিপ্ত প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা সন্নিবেশিত করে তিনি যে অনন্য সাধারণ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন- এই একটি মাত্র কারণেই তিনি আমাদেরকে ঋণী করে গিয়েছেন অনাগত কালের জন্য।

পারিবারিক জীবন :
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ১৯৪৯ সালে রাবেয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আছে ৩ ছেলে ৫ মেয়ে। সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। 

ইসলামী আন্দোলনে যোগদান :
শহীদ আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তাঁর জামায়াতে যোগদানের মূল কারণ ছিলো আরেক মুমতাজুল মুহাদ্দেসীন মাওলানা আব্দুর রহীম। তাছাড়া তিনি মাওলানা মওদূদীর লেখার ভক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি জামায়াতের খুলনা বিভাগের আমীর ছিলেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইয়ুব খানের দ্বারা পাকিস্তানে সামরিক আইন ঘোষণার পরে সমস্ত দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরে শহীদ ইউসুফ জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তানের নায়েব-ই-আমীর (সহসভাপতি) পদে নিযুক্ত হন।

একাত্তরের পরে, একেএম ইউসুফ জামায়াতের সিনিয়র নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করেছিলেন। আমীর মাওলানা আবদুর রহিমের অধীনে তিনি এক মেয়াদে সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। তিনি আবারও একই দায়িত্বে জামায়াত আমীর গোলাম আযমের সাথে টানা তিনবার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে তিনি বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েব-আমির হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বে অব্যাহত ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন :
১৯৬২ সালের নির্বাচনে মাওলানা এ কে এম ইউসুফ নির্বাচনী এলাকা খুলনা ও বরিশালের প্রার্থী হওয়ার জন্য জামায়াত থেকে মনোনীত হয়েছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা থেকে ছুটি নিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন।

তিনি ১৯৬০-এর দশকে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে তিনি মালেক মন্ত্রীসভার একজন মন্ত্রী ছিলেন।

অন্যান্য সামাজিক কাজ
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শহীদ এ কে এম ইউসুফ শরীয়াহ কাউন্সিল, দারুল আরাবিয়া, কেন্দ্রীয় ওলামা-মাশায়েখ কমিটি প্রভৃতি সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সামাজিক কাজ হলো চাষী কল্যাণ সমিতি। তিনি ছিলেন এদেশের লক্ষ লক্ষ চাষিদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ চাষি কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। এদেশের গ্রামীণ জনপদের চাষিদের সংগঠিত করা, তাদের মাঝে আদর্শিক চেতনা জাগ্রত করা, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেয়া এইসব লক্ষ্য নিয়ে তিনি চাষী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমল থেকে বাগেরহাট ও খুলনায় অসংখ্য ইয়াতিমখানা, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ স্থাপন করেন।

অসিয়ত
২০১৩ সালের ৪ মে তিনি তাঁর সন্তান, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে অসিয়ত করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
“আমার বয়স এখন ৮৭ বছরে উপনীত হয়েছে। আমার সমবয়সী সাথী ও বন্ধুদের অধিকাংশই এখন দুনিয়া ত্যাগ করে পরপারের যাত্রী। যেহেতু আমার বয়স অধিক; উপরন্তু আমি নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত যে কোন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরপারের আহ্বান আসতে পারে। 

আমি পরম করুণাময় আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দা ও দাস। মহান রাব্বুল আলামীন আমার নিজের ও সন্তান-সন্ততি ও নাতী-নাতনীদের ওপরে করুণার যে ধারা প্রবাহিত রেখেছেন, আমার কামনার চেয়ে তা অনেক অধিক, যার শুকরিয়া আদায় করা আমার সাধ্যের অতীত। 

আমি আমার সন্তান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, দেশ ও দেশের বাইরে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য যারা কাজ করেছেন, আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা নিয়ে আমি তাদের কাতারে শামিল ছিলাম। পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপরে অনুগ্রহ ছিল, ফলে আমি দেশ-বিদেশের কতিপয় নেক বান্দাহ ও দাতা সংস্থার সাহায্যে আমার মাতৃভূমির সব এলাকায় বেশ কিছু সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করেছি। 

আমি আমার সন্তান ও শুভাকাংখীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারের ব্যাপারে যেমন সতর্ক থাকবে। তেমনি সতর্ক থাকবে প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের অধিকারের ব্যাপারেও। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের কথাটাও যেনো তোমাদের চিন্তায় থাকে।

সাধ্যের মধ্যে থেকে তোমরাও সবসময় সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করবে। কেননা সদকায়ে জারিয়াহর সওয়াব মৃত্যুর পরেও আমলনামায় জমা হতে থাকে। তোমরা আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত ফরজ ইবাদতসমূহ যেমন নামাজ, রোজা, জকাত ও হজ্জ আদায়ের ব্যাপারে আদৌ গাফলতি করবেনা। গুনাহের কাজের ধারে কাছেও যাবে না। আর নিয়তই নৈতিক চরিত্রের উঁচুমানে পৌছার জন্য সচেষ্ট থাকবে।

ওপরে যে অসিয়ত আমি আমার সন্তান-সন্ততিদের উদ্দেশ্যে করলাম, ঐ একই অছিয়ত আমার আন্দোলনের সাথী প্রবীণ ও তরুণদের জন্যও রইল।”

সাহিত্য :
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একজন সুপরিচিত আলেম এবং কোরআন অধ্যয়ন ও হাদিস সম্পর্কিত শিরোনাম সহ বেশ কয়েকটি বহুল পঠিত বই লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন কি এবং কেন?, হাদীসের আলোকে মানব জীবন, দর্পন, দেশ হতে দেশান্তরে, কুরআন হাদীসের আলোকে জিহাদ, জামায়াতে ইসলামী বিরোধীতার অন্তরালে।



শাহদাত :
ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্দ করে দিতে মরিয়া পাশের দেশের মুশরিকরা ও তাদের পদলেহনকারী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। এরই অংশ হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। কাল্পনিক সব অভিযোগ আনে দেশের সবচেয়ে উত্তম মানুষগুলোর প্রতি। এর মধ্যে পাঁচজন নেতাকে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করে। শহীদ এ কে এম ইউসুফ ছিলে অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অনেক রোগের রোগী। তাঁকে বিনা চিকিৎসায় কারাগারে আটকে রাখা হয়। তিনি স্ট্রোক করার পরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে খুন করে সন্ত্রাসীরা। মুমতাজ আল মুহাদ্দিসীন নিজের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইসলামের উপর টিকে ছিলেন। কোনো আপোষ করেননি সরকারের সাথে। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শাহদাতের মর্যাদা দান করুন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আদ্যোপান্ত



সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পর খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকারপ্রধান, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি মামলার রায় ও সাজা হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে এরশাদের মতো জেলও খাটতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। তবে ব্যবধান হলো খালেদা জিয়ার মামলাটি বানোয়াট। এখানে যা ঘটনা এর সাথে দুর্নীতির সম্পর্ক নেই। মূল ঘটনা জানলে আপনি অবাকই হবেন।  

মামলা : 
প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২.৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন।

আসামি যারা :
দুর্নীতি দমন কমিশনের  তখনকার উপ সহকারী পরিচালক  হারুন-অর রশিদ (বর্তমানে উপ-পরিচালক) এ মামলার এজাহারে খালেদা জিয়াসহ মোট সাতজনকে আসামি করেন। বাকি ছয়জন হলেন- খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক (ইকোনো কামাল), সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা (পরে মুখ্য সচিব হন) কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ আহমেদ ওরফে সায়ীদ আহমেদ।

দুদক কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের  ৫ অগাস্ট আদালতে যে অভিযোগপত্র দেন, সেখান থেকে গিয়াস উদ্দিন ও সায়ীদ আহমেদের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাদের অব্যাহতির কারণ হিসেবে বলা হয়, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ অনেক আগে থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া যায়নি। আর সায়ীদ আহমেদ নামে কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।  সাবেক সাংসদ কামাল জালিয়াতি করে ট্রাস্টের কাজে ওই দুই জনের নাম ব্যবহার করেছেন।

অভিযোগে যা রয়েছে :
এজাহারে বলা হয়, খালেদা জিয়া তার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালে এতিম তহবিল নামে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় একটি হিসাব খোলেন। একটি বিদেশি সংস্থা ১৯৯১ সালের ৯ জুন ওই হিসাবে ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা দেয়। ওই টাকা দীর্ঘ দুই বছর কোনো এতিমখানায় না দিয়ে জমা রাখা হয়। এরপর জিয়া পরিবারের তিন সদস্য তারেক রহমান, তার ভাই আরাফাত রহমান এবং তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুরকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে ওই টাকা তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি। এছাড়া ট্রাস্টের ঠিকানা হিসেবে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। পরে ওই টাকা দুইভাগে ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া ও বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫’শ টাকা ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে বরাদ্দ দেওয়া হয় বগুড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। ওই অর্থ থেকে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়ার দাঁড়াইল মৌজায় ২.৭৯ একর জমি কেনা হয়।

কিন্তু অবশিষ্ট টাকা এতিমখানায় ব্যয় না করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ২০০৬ সনের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তা সুদে আসলে বেড়ে ৩ কেটি, ৩৭ লাখ ৭ শ ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা হয়। এজাহারে বলা হয়, ২০০৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা তার ছেলে তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে তিন কিস্তিতে ছয়টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করেন। এরপর ওই টাকা কাজী সালিমুল হক কামাল ও অন্যদের মাধ্যমে সরিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়। মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ‘নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। 

কার দায় কতটুকু?
খালেদা জিয়া: অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে পাওয়া টাকা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে, কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর পরিচালিত তহবিলের টাকা ওই ট্রাস্টে দেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে ওই টাকা আত্মসাত করা যায়, যার জন্য খালেদা জিয়াই দায়ী।

তারেক রহমান: প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহায়তায় তার ছেলে তারেক তাদের বাসস্থানের ঠিকনা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্বহীন’ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নর্থ সার্কেল শাখায় হিসাব খুলে সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জমা করেন। পরে ট্রাস্ট ডিডের শর্ত ভেঙে ওই টাকা তিনি ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সালিমুল হক কামালকে দেন। পরে সেখান থেকে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন  প্রক্রিয়ায় আত্মসাত করা হয়।

মমিনুর রহমান: তারেকের ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানও একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করে অপরাধ করেছেন।

কাজী সালিমুল হক কামাল: সাবেক সাংসদ সালিমুল হক কামালের সঙ্গে ওই ট্রাস্টের কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তিনি তারেক রহমানের কাছ থেকে পাঁচটি চেক নিয়ে এফডিআর করেন এবং পরে তা ভাঙান। সে সময় প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকদের দিয়ে সৈয়দ আহমেদ ও গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এফডিআর ভাঙিয়ে সেই টাকা শরফুদ্দিন আহমেদের অ্যাকাউন্টে জমার ব্যবস্থা করেন।

কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল গঠন ও পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমোদন নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে সেখানে এতিম তহবিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মূল নথি সংরক্ষণ না করে তা তিনি গায়েব করে দেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।

শরফুদ্দিন আহমেদ: ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এই আত্মসাতে সহযোগিতা করে ব্যংকে তার নিজের নামের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

মূল ঘটনা : 
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা খরচই হয়নি। সব টাকা ব্যাংকে আছে। অতএব এখানে আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আশুলিয়ার জমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য কথাবার্তা হয়। সে বছরই একটি চুক্তির আওতায় তিনি সোয়া ২ কোটি টাকা অগ্রিম নেন। ২০০৭ সালের ৩১ মের মধ্যে জমি বিক্রির দলিল সম্পাদনের তারিখ থাকলেও তা সেনা সরকারের হস্তক্ষেপে হয়নি। শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতকে এ তথ্য দিয়ে আরও বলেন, ‘২০১২ সালের জানুয়ারিতে একটি টাকার মোকদ্দমা মামলায় আমি নোটিশপ্রাপ্ত হই যে ট্রাস্টকে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে। আদালত ওই সোয়া ২ কোটি টাকা ২০১৩ সালে টাকা ফেরত দিতে ডিক্রি জারি করেন। এরপর আমি প্রাইম ব্যাংক নিউ ইস্কাটন ও গুলশান শাখা থেকে ১৩টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ট্রাস্টকে হস্তান্তর করি।’ এই হচ্ছে মূল ঘটনা। এখানে দুর্নীতির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। 

আরেকটি অভিযোগ ছিলো প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের টাকা কেন জিয়া অরফানেজ নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ হবে। এই প্রসঙ্গে ২০১৫ সালে কুয়েত দূতাবাস পত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে তারা। ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে ঢাকার কুয়েত দূতাবাসের দেওয়া এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘উক্ত অনুদান '১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার' (৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল এবং তা কোনো ব্যক্তি কিংবা সরকার বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি।’ অতএব এই টাকার বৈধ মালিক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট। এটা বাংলাদেশ সরকারের টাকা নয়। কুয়েতের আমীর এই টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে পাঠাননি।  

এখানে একটা কথা বলা যেতে পারে শুধু এতোদিন পর্যন্ত এই টাকা ব্যবহার করা হয়নি কেন? কিন্তু এতিমের টাকা মেরে দিয়েছে বলে যে কথা চালু করেছে তা নিতান্তই মিথ্যা ও বানোয়াট। টাকা এখনো ব্যাংকেই আছে। শুধু শরফুদ্দিন আহমেদ থেকে ট্রাস্টের নামে জমি ক্রয় করার কথা ছিলো। পরবর্তীতে ক্রয় করতে পারেনি তত্ববধায়ক সরকারের সময়ে। এবং তারাই এই মামলা করে বিএনপি'র শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসানোর জন্য।  

মঈন ফখরুদ্দিনের আমলে ভারতের নির্দেশে বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে খালেদা ও তারেককে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা এই মামলা সাজায়। আর এই মামলাকে পুঁজি করে স্বৈরাচারী হাসিনা খালেদা জিয়াকে ফাঁসিয়ে দেয়।