৪ জুল, ২০২০

রাসূল সা. এর দাম্পত্য জীবনের কিছু তিক্ত ঘটনা



ঘটনাগুলো রাসূল সা. এর ব্যক্তিগত। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারটা আল্লাহ তায়ালা উন্মুক্ত করে দিলেন। যাতে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ্ সা. মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর সাধারণত তিনি তাঁর স্ত্রীদের সাক্ষাত করতেন। 

একদিন তিনি হযরত হাফসা রা.-এর রুমে প্রবেশ করেন এবং অন্যান্য দিনের চাইতে একটু বেশি সময় সেখানে অবস্থান করলেন। এতে নারীসুলভ ইর্ষা জেগে উঠে হযরত আয়েশা রা.-এর মনে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন যে, হাফসা রা.-এর এক আত্মীয়া এক মশক মধু তার কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সা. তাঁর ঘরে এতটা বিলম্ব করেছেন।

এই প্রসঙ্গে আয়েশা রা. বলেন, //আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে মধু খাওয়া হতে বিরত রাখবো। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ রা.-কে বললাম, তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ সা. আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবে,
“আজ কি আপনি মাগাফির খেয়েছেন?”
তিনি জবাবে বলবেন, “না।”
তখন তুমি বলবে, তাহলে এই গন্ধ কিসের?”
তিনি তখন বলবেন, “হাফসা রা. মধু পান করিয়েছেন।”
তুমি তখন বলবে, “সম্ভবত মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কন্টকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে। তাই আপনার মুখ থেকে মাগাফিরের গন্ধ আসছে ”
আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া রা.! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।//

এই ব্যাপার নিয়ে হযরত সাওদাহ রা. বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ সা. আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার ওপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, আয়েশা রা. আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি আয়েশা রা.-কে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সা. আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বললাম যা আয়েশা শিখিয়েছিল। তারপর তিনি হযরত সফিয়া রা.-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এই দিনের পরে হযরত হাফসা রা. পুনরায় রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার এর প্রয়োজন নেই, আমি খাবো না।” আমি তখন আফসোস করে বলতে লাগলাম, “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমার কথা শুনে আয়েশা রা. বললো, চুপ থাকো।

রাসূলুল্লাহ সা. দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন এবং একইসাথে স্ত্রীদের পছন্দ অপছন্দের দিকে নজর রাখতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেন, “আপনি মাগাফির খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফিরে কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেন, “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফির এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফিরের গন্ধ রয়েছে। তাই রাসূল সা. কসম করে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আর মধু খাবেন না।

পুরো ঘটনায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের প্রতি তো বটেই, রাসূল সা.-এর প্রতিও। এই ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে সূরা আত তাহরিমের ১ম আয়াতে তিনি বলেন, হে নবী, আল্লাহ যে জিনিস হালাল করেছেন তা তুমি হারাম করছো কেন? (তা কি এ জন্য যে,) তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাও? আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।

আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত দ্বারা সতর্ক করেছেন রাসূল সা.-কে। আল্লাহর হালালকৃত জিনিসকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়ার যে কাজ রাসূল সা. দ্বারা হয়েছে, তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। এ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম করার অধিকার কারো নেই, এমন কি স্বয়ং নবী সা.-এর নিজেরও এ ইখতিয়ার নেই। নবী সা. ঐ জিনিসটিকে যদিও আকীদাগতভাবে হারাম মনে করেছিলেন না কিংবা শরীয়াতসম্মতভাবে হারাম বলে সাব্যস্ত করেছিলেন না বরং নিজের জন্য তা ব্যবহার করা হরাম করে নিয়েছিলেন। 

কিন্তু তাঁর মর্যাদা যেহেতু সাধারণ একজন মানুষের মত ছিল না বরং তিনি আল্লাহর রসূলের মর্যাদায় অভিসিক্ত ছিলেন। তাই তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নিজের ওপর কোন জিনিস হারাম করে নেওয়াতে এই আশংকা ছিল যে, তাঁর উম্মতও ঐ জিনিসকে হারাম অথবা অন্তত মাকরূহ বলে মনে করতে শুরু করবে অথবা উম্মতের লোকেরা মনে করতে শুরু করবে যে, আল্লাহর হালালকৃত কোন জিনিস নিজের জন্য হারাম করে নেয়াতে কোনো দোষ নেই।

এর পরের আয়াতে অর্থাৎ আত তাহরিমের ২য় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে কসমের কাফফারা দিয়ে কসম ভাঙতে পরামর্শ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য কসমের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার পন্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক এবং তিনি মহাজ্ঞানী ও মহাকৌশলী। কসমের কাফফারা কী হবে তা আল্লাহ সূরা মায়েদার ৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত করেছে। দশজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো অথবা তাদের পোষাক দেওয়া অথবা একজন দাস মুক্ত করা। এগুলোর সামর্থ না থাকলে তিনদিন রোজা রাখা।

এর পরে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের প্রসঙ্গে তিনটি আয়াত নাজিল করলেন। সূরা আত তাহরিমের ৩ নং আয়াতে তিনি বলেন,
//নবী তাঁর এক স্ত্রীকে (হাফসা রা.) গোপনে একটি কথা বলেছিলেন। পরে সেই স্ত্রী যখন সেই গোপনীয় বিষয়টি অন্যের (আয়েশা রা.) কাছে প্রকাশ করে দিল এবং আল্লাহ নবীকে এই ব্যাপারটি জানিয়ে দিলেন তখন নবী (হাফসা রা.-কে) কিছুটা সাবধান করলেন এবং কিছুটা মাফ করে দিলেন। নবী যখন তাকে (গোপনীয়তা প্রকাশের) এই কথা জানালেন তখন সে জিজ্ঞেস করলো : কে আপনাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে? নবী বললেন : আমাকে তিনি (আল্লাহ) অবহিত করেছেন যিনি সবকিছু জানেন এবং সর্বাধিক অবহিত।//

এটি আরেকটি ঘটনার ইঙ্গিত। বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সা. হাফসা রা.-কে একটি গোপন কথা বলেছেন সেটি সামহাউ তিনি আয়েশা রা.-এর কাছে প্রকাশ করে দেন। যা অপছন্দনীয় ঘটনা। এই বিষয়কে আমরা অনেক সময় হালকাভাবে দেখি। কিন্তু আল্লাহ মোটেই হালকাভাবে নেননি। কুরআনে উল্লেখ করে তিনি আমাদের জন্য বিষয়টি শিক্ষা হিসেবে রেখে দিলেন। আমরা যাতে কারো গোপনীয় কথা প্রকাশ না করি।

৪র্থ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা দু’জন যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), কেননা, তোমাদের মন বেঁকে গিয়েছে। আর যদি তোমরা নবীর বিরুদ্ধে পরস্পর সংঘবদ্ধ হও, তা হলে জেনে রাখো, আল্লাহ তার অভিভাবক, তাছাড়া জিবরাঈল, নেক্‌কার ঈমানদারগণ এবং সব ফেরেশতা তার সাথী ও সাহায্যকারী।

এই দুইজন স্ত্রী কারা এই প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রা. বলেন তারা হলেন হজরত হাফসা রা. ও হজরত আয়েশা রা.। তিনি হজরত উমার ফারুক রা. থেকে জেনে নিয়েছেন। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল সা.-এর সাথে বাদানুবাদ ও জিদ করতেন। এই কারণে দুইটি ঘটনা ঘটতো। এক তারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর উপর রাগ করে থাকতেন। অন্যদিকে আল্লাহর রাসূল সা.ও তাদের উপর রাগ করে থাকতেন। মাঝে মাঝে আল্লাহর রাসূল সা. তাদের বিছানা আলাদা করে দিতেন। এই বিষয়গুলো আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেননি। এমনিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ভালো নয়। তার উপর ইনি মুহাম্মদ সা.। সারাক্ষণ দ্বীন প্রতিষ্ঠার হাজারো ব্যস্ততা, হাজারো পেরেশানী, নবুয়্যতের কঠিন দায়িত্ব পালনের পর স্ত্রীদের কাছে শান্তি না পাওয়া আল্লাহ তায়ালা ভালোভাবে নেন নি। তাই তিনি তাদের তওবা করতে বলেছেন।

৫ম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, নবী যদি তোমাদের মত সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন তাহলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পরিবর্তে তাকে এমন সব স্ত্রী দান করবেন যারা তোমাদের চেয়ে উত্তম হবে। তারা হবে সত্যিকার মুসলমান, ঈমানদার, অনুগত, তাওবাকারিনী, ইবাদাতকারী এবং রোজাদার। তারা পূর্বে বিবাহিত বা কুমারী যাই হোক না কেন।

এই আয়াত থেকে জানা যায় যে, হযরত আয়েশা রা. এবং হাফসা রা. শুধু ভুল করেছিলেন না বরং নবীর সা.-এর অন্য স্ত্রীগণও কিছু না কিছু ভুল করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতে তাঁদের দু'জনকে ছাড়াও নবীর সা.-এর অন্যসব স্ত্রীদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। নবী সা.-এর স্ত্রীদের পারস্পরিক ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নবীকে সা.-কে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

বিরক্ত হয়ে হজরত মুহাম্মদ সা. যখন সাময়িকভাবে তাঁর স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা বন্ধ করলেন তখন উমার রা. দেখলো লোকজন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে বসে নুড়ি পাথর তুলছে এবং নিক্ষেপ করেছে এবং পরস্পর বলাবলি করছে যে, রসূলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। এরপর হযরত উমার রা. রাসূলের স্ত্রীদের কাছে গিয়ে বললেন, তোমরা রসূলুল্লাহ সা.-কে অতিষ্ঠ করা থেকে বিরত থাকো। তা না হলে আল্লাহ তা'আলা নবীকে সা.-কে তোমাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দান করবেন।

এরপর উমার রা. রাসূল সা.-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, আপনি স্ত্রীদের ব্যাপারে চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আপনি যদি তাঁদের তালাক দেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে আছেন, সমস্ত ফেরেশতা, জিবরাঈল ও মিকাঈল আপনার সাথে আছেন। আর আমি, আবু বকর এবং সমস্ত ঈমানদার আপনার সাথে আছি। এরপর আমি নবী সা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন? তিনি বললেন, না। এ কথা শুনে মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলাম যে, নবী সা. তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেন নাই।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের আলোচ্য আলোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমাদের দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করুন। আমরা যাতে আল্লাহর অনুগত থাকি, হালালকে হারাম বানিয়ে না নিই এবং হারামকে হালাল বানিয়ে না নিই। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের কবুল করুন।


- তাফহীমুল কুরআন (সূরা আত তাহরিম ১-৫)
- তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা আত তাহরিম ১-৫) 

২ জুল, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৪৩ : ভারতের স্বাধীনতায় আরেকটি ব্যর্থ সুযোগ 'ক্রিপস মিশন'



১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সাঁড়াশি আক্রমনের চাপে মিত্রশক্তির অন্যতম সদস্য ব্রিটেন নাজেহাল হয়ে পড়ে। একইসাথে একই বছরের শেষদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং তা আমাদের উপমহাদেশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। জাপানের হাতে বৃটেন ও তার মিত্রশক্তির দুর্গ সিংগাপুরের পতন ঘটে। এর কিছুদিন পর জাপান মিয়ানমার ঘিরে ফেলে। চট্টগ্রাম বন্দর, কোলকাতা বন্দর জাপানির আক্রমনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। কংগ্রেস নেতাদের অনেকেই বৃটেন ও তার শত্রুকে একই চোখে দেখতেন। গান্ধী বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুষ্কর্মের শাস্তিস্বরূপ ভগবান হিটলারকে পাঠিয়েছেন। কংগ্রেস মনে করতো যুদ্ধে বৃটেন কোণঠাসা হয়ে পড়লে তার থেকে বেশী বেশী রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা যাবে। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জয় করে জাপান বার্মার ভিতর দিয়ে দ্রুত ভারতের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারেন যে, এই সংকটের সময় ভারতবাসীর সাহায্য ছাড়া ভারতে জাপানকে বাধা দেওয়া যাবে না । আর ভারতে ব্রিটিশ অধিকার রক্ষা করা যাবে না । জাপানি আক্রমণের ফলে উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতিতে এশিয়ার বিভিন্ন রণাঙ্গনে জাপানি আক্রমণের মোকাবিলা করতে হলে ভারতের সামরিক শক্তি ও সম্পদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ব্রিটিশ সরকারকে ভারত সম্পর্কে নমনীয় মনোভাব নিতে বাধ্য করে । এই সময়ে চিনের রাষ্ট্রপতি চিয়াং-কাই শেক ও মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেন্ট উভয়েই ভারত সম্পর্কে  ব্রিটিশ সরকারের নীতি পরিবর্তনের অনুরোধ জানান । এরই সঙ্গে সঙ্গে আটলান্টিক সনদে পরাধীন জাতিগুলিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল । সেই অর্থে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভারতের পক্ষে অনুকূল ছিল ।

সাতই মার্চ ১৯৪২, জাপান বার্মা দখল করে। তার মাত্র চার দিন পর ১১ই মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল হাউস অব কমন্সে গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দানের পর ওয়ার কেবিনেটে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সিদ্ধান্তগুলো একটি খসড়া ঘোষণায় সন্নিবেশিত হয়। সেই খসড়া ঘোষণা নিয়ে স্টাফোর্ড ক্রিপস ২৯ শে মার্চ ভারতে আগমণ করেন। খসড়ার ভুমিকায় বলা হয় যে, একটি নতুন ভারতীয় ডমিনিয়ন গঠন এ ঘোষনার উদ্দেশ্য।

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে মার্চ স্টাফোর্ড ক্রিপস ভারতে এসে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে একগুচ্ছ প্রস্তাব ঘোষণা করেন। তিনি মূলত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সাথে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর নিচের প্রস্তাবগুলি পেশ করেন:-
ক. যুদ্ধের অবসানে ভারতকে কানাডার মতো অধিরাজ্যের মর্যাদা (Dominion Status) দেওয়া হবে।
খ. যুদ্ধ শেষে ভারতীয় সংবিধান রচনার জন্য ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সভা গঠন করা হবে এবং সেই সভাকে ভারতের নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
গ. নতুন সংবিধান কোনো প্রদেশের পছন্দ না হলে সেই প্রদেশ ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান রচনা করতে পারবে। ভারতের যে-কোনো প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য ইচ্ছে করলে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও থাকতে পারবে।
ঘ. সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা বহাল রাখা।
ঙ. প্রদেশগুলোর প্রাদেশিক আইনসভা সংবিধান সভার সদস্যদের নির্বাচন করবে, অন্যদিকে দেশীয় রাজ্যের রাজারা তাঁদের সদস্যদের মনোনীত করবেন ।
চ. নতুন সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকার নিজের হাতে রাখবে এবং বড়লাটের কার্যনির্বাহক কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা বাতিল করার অধিকার বড়লাটের থাকবে।

ভারতীয়তের প্রতিক্রিয়া
স্টাফোর্ড ক্রিপস ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বিশেষত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রাখেন। তিনিটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই এ আলোচনা চলতে থাকে। 
এক. প্রস্তাবিত ভারতীয় ইউনিয়নের প্রদেশের যোগদান না করার স্বাধীনতা। 
দুই. শাসনতন্ত্র প্রণয়ন পরিষদের দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং 
তিন. সত্বর একটি দায়িত্বশীল সরকার গঠন।

খসড়া ঘোষণার সময় প্রদেশগুলোকে এ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে যে, ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করা থেকে তারা চাইলে বিরত থাকতে পারে। এ সম্পর্কে কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়ানক তীব্র। তার ধারণা, এতে ভারতের অখন্ডতার প্রতি চরম আঘাত হানা হবে। তাই তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কংগ্রেসের দাবী হলো যে, যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতিতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। এতে কংগ্রেসের সুবিধা এই যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসকে সমর্থন করবে। এ ব্যবস্থা কিন্তু মুসলিম লীগ মেনে নিতে পারেনা। কংগ্রেসের জোর দাবী এই কেন্দ্রে সত্বর একটি দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা হোক। এতে মুসলিম লীগ ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে বলে তারা এ দাবী মেনে নিতে পারেনা।

স্টাফোর্ড ক্রিপসের সাথে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট কিছু দিন যাবত পত্র বিনিময় হয়। কিন্তু কংগ্রেসের দাবী মেনে নেয়া হয়নি বলে ১১ই এপ্রিল কংগ্রেস ক্রিপস প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা করে। মুসলিম লীগ তো আগেই ক্রিপস প্রস্তাব মেনে নিতে পারেনি। মুসলিম লীগের কথা এই যে, যতক্ষণ না পাকিস্তান প্রস্তাবের মূলনীতি মেনে নেয়া হয়েছে এবং মুসলিম ভারতে সত্যিকার রায় প্রতিফলিত হয় এমন কোন পদ্ধতিতে মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার মেনে নেয়া না হয়েছে, সে পর্যন্ত ভবিষ্যতের কোন প্রস্তাব মুসলিম লীগ মেনে নিতে পারবে না।

ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার কারণ 
ক্রিপসের প্রস্তাবগুলো ভারতের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণ যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি, কারণ-
১. ক্রিপসের প্রস্তাবে ব্রিটিশ সরকারের সদিচ্ছার অভাব প্রকাশ পায়, তাই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগসহ ভারতের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলই ক্রিপস-এর প্রস্তাব একযোগে প্রত্যাখ্যান করে।
২.  এই প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবিকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় অর্থাৎ ক্রিপস প্রস্তাবে দেশ বিভাগের পরোক্ষ ইঙ্গিত থাকায় কংগ্রেস তা প্রত্যাখ্যান করে। 
৩. ভারতের প্রতিরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার রাজি ছিল না।
৪. ক্রিপস প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারকে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার মতো সম-মর্যাদা ও ক্ষমতা দেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।
৫. মুসলিম লীগ ক্রিপস প্রস্তাবে আপাত খুশি হলেও সরাসরি দেশ বিভাগ মেনে না নেওয়ায় তা বর্জন করে । ফলে ক্রিপস তাঁর প্রস্তাবসমূহ প্রত্যাহার করে দেশে ফিরে যান ।

ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হওয়ারপর কংগ্রেস চরম ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যের শিকার হয়। কংগ্রেস চেয়েছিল একটি জাতীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে উপমহাদেশের উপর তার শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে। এ ছিল ভারতীয় মুসলমানদের পদদলিত করে রাখার এক নির্মম দুরভিসন্ধি। যাহোক ব্রিটিশ সরকার তাঁদের স্বার্থেই কংগ্রেসের এ অন্যায় আবদার মেনে নিতে পারেননি। বৃটেন যুদ্ধে হেরে গেছে এটাকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করে গান্ধী ১৯৪০-এর মে মাসে ভাইসরয়কে লিখিত এক পত্রে বলেন, “এ নরহত্যা বন্ধ করতে হবে। তোমরা ত হেরে যাচ্ছ। এরপরও যদি জিদ ধরে থাক, তাহলে অধিকতর রক্তপাত ঘটবে। হিটলার একজন মন্দ লোক নয়। তোমরা আজ যুদ্ধ বন্ধ করলে, সেও তোমাদের অনুসরণ করবে”। 

ভাইসরয় এ জবাবে বলেন, আমরা এখন যুদ্ধরত আছি। আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছার পূর্বে আমরা নড়চড় করব না। আমাদের জন্যে আপনার উৎকণ্ঠা বুঝতে পারছি। তবে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। গান্ধী ভাইসরয়ের জবাবে তুষ্ট না হয়ে ৬ই জুলাই প্রত্যেক ইংলন্ডবাসীর প্রতি এক আবেদনে বলেন, অস্ত্র সংবরণ কর। কারণ এ তোমাদের নিজেদেরকে এবং মানবতাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তোমরা হিটলার ও মুসোলিনিকে ডেকে আনবে এবং তারা তোমাদের সব কিছুই কেড়ে নেবে। ঠিক আছে, তাদেরকে তোমাদের মনোরম অট্টালিকাদিসহ তোমাদের সুন্দর দ্বীপ দখল করতে দাও।

ক্রিপসের বেতার ভাষণ
স্টাফোর্ড ক্রিপস ২৬শে জুলাই, আমেরিকাবাসীদের জন্যে তাঁর প্রদত্ত বেতার ভাষণে, তাঁর ভারত ভ্রমণের সময় থেকে সর্বশেষ ভীতিপ্রদর্শন পর্যন্ত কংগ্রেস রাজনীতির পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, কোন দায়িত্বশীল সরকার কংগ্রেসের দাবী বিবেচনা করতে পারেননা। কংগ্রেস আধিপত্যের চরমবিরোধী মুসলমানগণ এবং কয়েক কোটি অনুন্নত সম্প্রদায়ও এ দাবী মানতে পারে না। গান্ধীর দাবী মেনে নেয়ার অর্থ চরম অরাজকতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করা। তিনি আরও বলেন, আমরা একজন কল্পনাপ্রবণকে প্রাচ্যে জাতিসংঘের বিজয় প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতি দিতে পারি না, তিনি অতীতে যতোবড়োই স্বাধীনতা সংগ্রামী থাকুন না কেন। 

জওহরলাল নেহরু উক্ত বেতার ভাষণের প্রতিবাদে স্টাফোর্ড ক্রিপসকে ‘শয়তানের উকিল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বৃটেনে ভারতের যে অনিষ্ট করেছে এবং এখন ও করছে, তার জন্য তার উচিত ছিল অনুতপ্ত হয়ে অতি বিনীতভাবে আমাদের নিকটে আবেদন পেশ করা। মুসলমানদের কংগ্রেস দাবীর বিরোধিতাকে নেহরু প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমার মুসলমান দেশবাসীকে আমি স্টাফোর্ড ক্রিপস অপেক্ষা ভালোভাবে জানি এবং তাদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা অপবাদ মাত্র। 

জওহরলাল নেহেরু ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধে ভারতীয়দের সমর্থন সংগঠিত করার জন্য জোরালোভাবে মত প্রকাশ করলেও কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এবং গান্ধী নিজেও এ ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন। ফলে কংগ্রেস-ব্রিটিশ সম্পর্ক তিক্ত হয় এবং অন্যান্য ঘটনা ভারত ছাড় আন্দোলন এর মতো সম্পূর্ণ সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। মিশনের ব্যর্থতার জন্য ক্রিপস কংগ্রেসকে দায়ী করে, অন্যদিকে কংগ্রেস এ দায়ভার চাপায় ব্রিটিশ সরকারের ওপর। এভাবে অবিভক্ত স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। 

আমার করোনা অভিজ্ঞতা



ঈদের পর অফিস কর্তৃপক্ষ অফিস খোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। যদিও এখনো ফুল স্কেলে আমাদের অফিস চালু হয়নি তবে চালু হওয়া যে দরকার তা কর্তৃপক্ষের চাইতে চাকুরেরা বেশি অনুভব করছে। 

যাই হোক ঈদের পর অফিসের আহ্বানে দীর্ঘ দু'মাসের ছুটি শেষ করে কর্মস্থলে এলাম। যেদিন এলাম তার দু'দিন পর দেখলাম মেসের এক সদস্য ক্লেইম করলো তার জ্বর। কিন্তু ভাবগতিক আর চেহারা দেখে কেউ তার কথাকে পাত্তা দিলনা। আমি টেম্পারেচার চেক করে দেখলাম তাপমাত্রা স্বাভাবিক। এভাবে চললো তিনদিন। সেই কলিগ আবারো বললেন, রাতে তার জ্বর আসে। গা ব্যাথা করে। শীত লাগে। 

এদিকে আমরা মেসের সদস্যরা জামায়াতের সাথে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা শুরু করেছি। কলিগের জ্বর আসার তৃতীয় দিন সেহেরি করতে উঠে বুঝলাম শরীরটা আমার ভালো না। মাথা ব্যাথা করছে খুব। পাত্তা না দিয়ে গোসল করে ফেললাম এরপর সেহেরি করলাম। এরপর আর ঘুমাতে পারছি না। জ্বর চলে এলো, সাথে গা ব্যাথা। নয়টার দিকে সবাই ঘুম থেকে উঠলে মশারির ভেতর থেকে এনাউন্স করলাম, আমার জ্বর শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা হেতু আমাকে আইসোলেশনে থাকতে হবে।

প্রতিবছর মোটামোটি আমার জ্বর হয়। সো খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। তবে সতর্কতা যেগুলো নেয়া দরকার তা নিতে থাকলাম। গরম পানি, মশলা চা ইত্যাদি নিতে থাকলাম। আর জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেতে থাকলাম তিন বেলা। জ্বর একবার আসে একবার ছাড়ে। তবে কখনোই ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করেনি। 

জ্বর হয়েছিল ১৭ সালে। চিকুনগুনিয়ার সময়। জ্বর আর গায়ের ব্যথা কান্না করিয়ে ছেড়েছে। মারাত্মক ছিল সেটা। তবে এবারের জ্বর একেবারেই হালকা। জ্বর হওয়ার দ্বিতীয় দিন কোভিডের জন্য প্রস্তুত জামায়াতে ইসলামীর ডাক্তারদের থেকে অনলাইন চিকিৎসাপত্র গ্রহণ করলাম। তাঁরা যখন শুনলেন আমার কাশি, সর্দি, গলাব্যাথা ইত্যাদি কোনো বিষয় নেই তাই তাঁরা আমাকে প্যারাসিটামল আর এন্টিহিস্টামিন খেতে দিয়েছেন। গরম পানি, র চা, আইসোলেশনে থাকতে বলেছেন। তবে এও বলেছেন আমরা আশা করছি এটা কোভিড নয়। 

তৃতীয় দিন থেকে বেশ ফ্রেশ লাগছিলো। জ্বর ছেড়ে গেল মনে হলো। রাতে শরীরটা আবার একটু গরম হলো। আমি কোভিডের যত ঘরোয়া চিকিৎসা আছে তা নিতে থাকলাম। চতুর্থ দিন পুরোপুরি সুস্থ বোধ করলাম। এতদিন প্যানিকড হবে বলে বাসায় খবর দেই নি যে, আমার জ্বর হয়েছে। পঞ্চম দিন সকালে জানালাম আমার জ্বর হয়েছিল চারদিন আগে। এখন ছেড়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌। 

তারপরও বাসায় প্যানিক তৈরি হয়ে গেছে। নির্দেশ আসলো এখনই যেন বাড়িতে ফিরে যাই। যাই হোক এটা সেটা বলে ম্যানেজ করে অফিসের কাজে মনযোগ দিলাম। দুপুরের পর থেকে শুরু হলো বিপত্তি। বুকটা যেন ভারী ভারী লাগছিলো। আমাকে লম্বা শ্বাস নিতে হচ্ছে। 

যত সময় যাচ্ছে ততই শ্বাসের বিপত্তি বাড়ছে। আসরের পর মনে হচ্ছে বুকটা বুঝি ফেটেই যাবে। মেস মেম্বারদের বললাম আমার পরিস্থিতি মনে হয় ভালো না, অক্সিজেন ও হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। তাদের এগুলো ম্যানেজ করার জন্য বললাম। এর মধ্যে যে ডাক্তার থেকে সেবা নিয়েছিলাম এখন আর তাঁকে পাচ্ছি না। পরে আরেকজন পরিচিত ডাক্তার যিনি কোভিড থেকে সেরে উঠেছেন তাকে নক করলাম। তিনি আমাকে কিছু পরামর্শ দিলেন। 

এদিকে গরম পানির ভাপ নিতে থাকলাম। গরম পানির ভাপ শ্বাসকষ্টে রিলিফ দিচ্ছিল। সন্ধ্যায় কিছুটা উন্নতির দিকে যেতে থাকলো। তবে শ্বাস একেবারে স্বাভাবিক হয়নি। আমাকে যিনি প্রথম ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন (জামায়তের নির্ধারিত ডাক্তার) তিনি ফোন দিয়েছেন। সব শুনে আমাকে ইনহেলার একটা দিলেন। ভাপ নিতে বললেন। আর কষ্ট লাগলে উপুড় হয়ে থাকতে বললেন। আর বেশি সমস্যা হলে হাসপাতালে যেতে বললেন। 

অনেকেই শুরু থেকে টেস্ট করাতে বললেও আমি অনেকগুলো যুক্তি দিয়ে টেস্ট করানো থেকে বিরত থাকলাম। কিন্তু পঞ্চম দিনের পরিস্থিতি হেতু খোঁজখবর করে জানা গেল টেস্ট বাধ্যতামূলক। টেস্ট ছাড়া চিকিৎসা মিলবে না। হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে হলে কোভিড/নন কোভিড নিশ্চিত হতে হবে। পঞ্চম দিন রাতে বুক ভারী হয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন কিছুক্ষণ ভাপ এভাবে রাতটি পার হলো। সকালে বাদ ফজর একটু ভালো ঘুম হলো। 

অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম ইবনে সিনায় টেস্ট করাবো। সেখানে অনলাইনে নাকি আগে এপ্লিকেশন করতে হয়। এরপর কবে স্যাম্পল কালেকশন করবে তার ডেট দেয়। কিন্তু আমার তো জরুরি লাগবে। তাই আরেকটি পদ্ধতি এপ্লাই করলাম। আউটডোরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখালাম। সব কথা বললাম। তিনি জরুরী ভিত্তিতে কিছু টেস্ট দিলেন এর মধ্যে করোনা টেস্টও ছিলো। ইবনে সিনায় চাকুরী করা ভাইদের আন্তরিক সহায়তায় সবগুলো ব্যাপার সহজ হয়ে গেল। মাত্র আধাঘন্টায় স্যাম্পল জমা দিয়ে বের হলাম হাসপাতাল থেকে। 
এটি হলো ষষ্ঠ দিনের ঘটনা। 

স্যাম্পল কালেকশন মানে হলো লম্বা একটি কটনবাড মুখ দিয়ে ঢুকিয়ে গলা থেকে সম্ভবত কিছু টিস্যু কালেশন করেছে। কটনবাড দিয়ে যখন গলায় গুতোগুতি হচ্ছিল তখন মনে হলো বমি হয়েই যাবে কিনা! আল্লাহ রক্ষা করেছেন। তেমন বিপত্তি হয় নি। আলহামদুলিল্লাহ্‌। নিজেকে করোনা রোগী ভেবে নিয়ে খুবই সতর্ক ছিলাম। জীবাণুনাশক স্প্রে নিয়েই বের হয়েছিলাম। যেখানে হাত লেগেছে, যেখানে বসেছি সব স্থানে স্প্রে করে দিয়ে এসেছি। বিশেষ করে সিএনজিতে ভালোভাবে স্প্রে করেছি। সেদিন হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। পরিবেশ নির্মল ছিলো। বড় বড় শ্বাস টেনে ফুসফুসকে রিলিফ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর শ্বাস স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। তবে কিছু সময় পর পর চাপ অনুভব করতাম। এর মধ্যে ইবনে সিনার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আমাকে আইভেরা ১২ একবার একটা ট্যাবলেট খেতে বললেন। বাসায় আসার পর আমার প্রথম ডাক্তারের পূর্ণ সাজেশন পেলাম কীভাবে চলতে হবে। তিনি আমাকে দিনে পাঁচবার দশ মিনিট করে ভাপ নিতে বলেছেন। এইদিন রাতেই জ্বিহবার টেস্ট ও নাকের ঘ্রাণক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। 

এরপর টেস্টের রেজাল্ট যাই আসুক না কেন মোটামোটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেছি। সপ্তম দিন থেকে আর খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে মাথা ব্যাথা, বুকে হঠাৎ হঠাৎ চাপ অনুভব করা চলতে থাকে। জ্বর সর্দি ও কাশি না থাকায় ইনহেলার ছাড়া আর কোন মেডিসিন নিচ্ছি না। তবে গরম পানি, র চা, পানির ভাপ, ভিটামিন সি, ফল-ফলাদি, মধু, কালোজিরা ইত্যাদি চলতে থাকে। 

আমি আবার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতেও আস্থা রাখি। একজন অভিজ্ঞ হোমিও ডাক্তারকে ফোন দিলাম। তিনি সব শুনে বললেন, আপনি রিকোভারি করে ফেলেছেন। অসুবিধা নেই, ওষুধ খেতে হবে না। 

দশম দিন সকালে বেলা মোবাইলে মেসেজ আসলো আমার করোনা পজেটিভ এসেছে। এর কিছুক্ষণ পর IEDCR এর রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে একজন ডাক্তার ফোন করলেন। সব কিছু জেনে নিলেন। সবাই যে পরামর্শগুলো দেন তিনিও সেই পরামর্শগুলো দিলেন। ইবনে সিনায় পরিচিত মানুষ থাকার সুবাদে বাসায় খবর চলে যায়। স্বজন ও বন্ধু মহলে হাহাকার পড়ে যায়। 
স্বাদ-গন্ধহীন এক বোরিং আইসোলেশন জীবন চলতে থাকে। মাঝে মাঝে বুকে চাপ ও মাথা ব্যাথা অনুভব হয়। তেরতম দিন থেকে স্বাদ গন্ধ ফিরে পেতে শুরু করি। পনেরতম দিন থেকে আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থতা লাভ করি। স্বাদ-গন্ধ ফিরে পাই, শ্বাস একদম স্বাভাবিক হয়ে যায়। 

২৪ তম দিনে IEDCR আমাকে অফিসিয়ালি সুস্থ ঘোষণা করে। এখানে একটা বিষয় না বললেই নয়, IEDCR যেভাবে খোঁজ খবর রেখেছে, আন্তরিকভাবে কথা শুনেছে, কাউন্সিলিং করেছে তাতে আমি মুগ্ধ। ১০-২৪ এই পনের দিনে দুজন ডাক্তার পাঁচবার ফোন করেছেন। আমাদের হিস্ট্রিগুলো লিখে রেখেছেন। সাহস দিয়েছেন। সতর্ক রেখেছেন। IEDCR এর প্রতি কৃতজ্ঞতা। 

এর আগে একবার মৃত্যর বিভীষিকা তৈরি হয়েছিল যখন চট্টগ্রামে ওসি প্রদীপ আমাকে গুলি করেছিলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সারা জীবনের সামারি রিভিউ করে নিয়েছিলাম। সমস্ত অপরাধ স্মরণ করে তাওবা ইস্তেগফার পাঠ করছিলাম। করোনার এই সময়েও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ছয় ঘন্টা আমার মনে হচ্ছিল এখনই আমি মারা যাবো। লেনদেনের ফিরিস্তি তৈরি করলাম, কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওসিয়ত তৈরি করলাম। যাই হোক এগুলো কাউকে সাবমিট করতে হয়নি। মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালা আমাকে সুস্থ করে তুলেছেন।    

অসীম দোয়া, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা আমার মেস মেম্বারদের জন্য। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটুও হেজিটেশন না করে আমাদের সেবা করেছেন। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো যিনি প্রথমে আক্রান্ত হয়েছে তিনি কিন্তু আমার রুমমেট নন। অথচ আমি ছাড়া মেসের আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। ওনার রুমমেটরাও না। এগুলো আসলে আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি যাকে ইচ্ছে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যাকে ইচ্ছে বিপদ না দিয়ে পরিক্ষা করেন। আমরা কতটুকু পাশ করেছি জানিনা তবে আমার মেস মেম্বাররা শতভাগ মার্ক নিয়ে আল্লাহর কাছে উর্ত্তীর্ণ হয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস। 

বহু ভাই, বন্ধু ও আত্মীয় সারাক্ষণ ফোন করে সাথে ছিলেন, দোয়া করেছেন। তাদের জন্য দোয়া ও ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা এই করোনার কঠিন বিপদ থেকে সবাইকে হিফাযত করুন। মহামারী থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমার রক্তের গ্রুপ বি পজেটিভ। কারো যদি একান্ত প্লাজমা লাগে আমি দিতে প্রস্তুত ইনশাআল্লাহ। সমস্যা একটু আছে, সেটা হলো আমি ডায়াবেটিস আক্রান্ত বেশ কিছু বছর ধরে। এ ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। ইমারজেন্সি সময়ে ডাক্তারের পরামর্শে ডায়াবেটিসকে উপেক্ষা করা যেতে পারে।

২৯ জুন, ২০২০

নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করার পরিণাম



ঘটনাটি রাসূল সা. পৃথিবীতে আসার আগেরকার। ইয়েমেনে কিছু লোক খুব ধনী ছিলো। তাদের গ্রাম ছিল যারওয়ান, যা সানাআ হতে ছয় মাইল দূরের অবস্থিত। তারা তাদের বাবার কাছ থেকে পেয়েছিল বিশাল ফলের বাগান। ফলের চাষ ও ব্যবসা করে তারা বিশাল সম্পদের মালিক হয়। তারা যদিও বিশ্বাসী ছিলো তবে তারা ভালো প্রকৃতির লোক ছিলো না। তারা তাদের সম্পদ থেকে ফকির মিসকিনদের জন্য খরচ করতে চাইতো না। তাদের সম্পদে থাকা গরীবদের হক তারা আত্মসাৎ করতো। 

কিন্তু তাদের পিতার নীতি এই ছিলো ভিন্ন। তিনি বাগানে উৎপাদিত ফল ও শস্যের মধ্য হতে বাগানের খরচ বের করে এবং নিজের ও পরিবার পরিজনের সারা বছরের খরচ বের করে নিয়ে বাকীগুলো আল্লাহর নামে সাদাকা করে দিতেন। তাদের পিতার ইন্তেকালের পর তাঁর এই সন্তানরা পরস্পর পরামর্শ করে বললো, “আমাদের পিতা বড়ই নির্বোধ ছিলেন। তা না হলে তিনি এতোগুলো ফল ও শস্য প্রতি বছর এদিক-ওদিক দিয়ে দিতে পারতেন না। 

আমরা যদি এগুলো ফকীর মিসকীনদেরকে প্রদান না করি এবং তা যথারীতি সংরক্ষণ করি তবে দ্রুতই আমরা আরো ধনী হয়ে যাবো।” তারা মিসকিনদের ফসল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন বারংবার নিষেধ করেছিলো এরকম সিদ্ধান্ত নিতে। তিনি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির করা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি অপরাপর সঙ্গীদের সম্পদ দেওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট কৃতজ্ঞ থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন যে, তাদের আঙ্গুরের বাগান ছিল। যেহেতু তারা মিসকিনদের কোন ফল দিবে না তাই তারা চেয়েছিলো খুব সকালেই ফল আহরণ করে নিতে। তারা চুপে চুপে কথা বলতে বলতে তাদের বাগানের দিকে চললো যাতে কেউ শুনতে না পায় এবং গরীব মিসকীনরা কোন টের না পায়। তারা একে অপরকে বলেছিলো, 'তোমরা সতর্ক থাকবে, যেন কোন গরীব মিসকীন টের পেয়ে আজ আমাদের বাগানে আসতে না পারে। কোনক্রমেই কোন মিসকীনকে আমাদের বাগানে প্রবেশ করতে দিবে না।’ এভাবে দৃঢ় সংকল্পের সাথে গরীব দরিদ্রদের প্রতি ক্রোধের ভাব নিয়ে তারা তাদের বাগানের পথে যাত্রা শুরু করলো। 
তারা মনে করেছিলো তাদের বাগান চিরদিনই তাদের থাকবে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাগানের ফল তাদের দখলে রয়েছে। সুতরাং তারা ফল আহরণ করে সবই বাড়ীতে নিয়ে আসবে। কিন্তু বাগানে পৌঁছে তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে। তারা তাদের বাগানে গিয়ে দেখে সবুজ-শ্যামল শস্যক্ষেত এবং পাকা পাকা ফলের গাছ সব ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে গেছে। ফলসহ সমস্ত গাছ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এখন এগুলোর কোন মূল্য নেই। গাছগুলো জ্বলে গিয়ে কালো হয়ে গেছে। পুরো বাগানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।  

এই দৃশ্য দেখে তারা প্রথমে ভেবেছিলো তারা ভুল করে অন্য কোন বাগানে এসে পড়েছে। আবার দিশেহারা হয়ে তারা বললো, ‘আমাদের বাগান তো এটাই, কিন্তু আমরা হতভাগ্য বলে আমরা বাগানের ফল লাভে বঞ্চিত হয়ে গেলাম। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সৎ ও ন্যায়পন্থী ছিল সে তাদেরকে বললো, “দেখো, আমি তো তোমাদেরকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, তোমরা কেন আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্রতা ঘোষণা এবং প্রশংসা করছো না? এ কথা শুনে তারা বললো, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র ও মহান। নিশ্চয়ই আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি। 

যখন শাস্তি পৌঁছে গেল তখন তারা আনুগত্য স্বীকার করলো, যখন আযাব এসে পড়লো তখন তারা নিজেদের অপরাধ মেনে নিলো। অতঃপর তারা একে অপরকে তিরস্কার করতে লাগলো এবং বলতে থাকলো। আমরা বড়ই মন্দ কাজ করেছি যে, মিসকীনদের হক নষ্ট করতে চেয়েছি এবং আল্লাহ্ পাকের আনুগত্য করা হতে বিরত থেকেছি। 

তারপর তারা সবাই বললো, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের হঠকারিতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণেই আমাদের উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়েছে। অতঃপর তারা বললোঃ ‘সম্ভবতঃ আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। অর্থাৎ দুনিয়াতেই তিনি আমাদেরকে এর চেয়ে ভাল বদলা দিবেন। অথবা এও হতে পারে যে, আখিরাতের ধারণায় তারা এ কথা বলেছিল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। 

এই ঘটনার বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা ক্বালামের ১৭ থেকে তেত্রিশ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, 
//আমি তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছি যেভাবে পরীক্ষায় ফেলেছিলাম বাগানের মালিকদেরকে, যখন তারা শপথ করেছিল যে, তারা খুব ভোরে গিয়ে নিজেদের বাগানের ফল আহরণ করবে। তারা এ ব্যাপারে কোনো ব্যতিক্রমের সম্ভবনা স্বীকার করেছিলো না। অতঃপর তোমার রবের পক্ষ থেকে একটি বিপর্যয় এসে সে বাগানে চড়াও হলো। তখন তারা ছিলো নিদ্রিত। বাগানের অবস্থা হয়ে গেলো পোড়া ফসলের মতো। ভোরে তারা একে অপরকে ডেকে বললো, তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও তাহলে সকাল সকাল ফসলের মাঠের দিকে বেরিয়ে পড়ো। 

সুতরাং তারা বেরিয়ে পড়লো। তারা নীচু গলায় একে অপরকে বলছিলো, আজ যেন কোনো অভাবী লোক বাগানে না আসতে পারে। তারা কিছুই না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব ভোরে এমনভাবে দ্রুত সেখানে গেল যেন তারা (ফল আহরণ করতে) সক্ষম হয়। কিন্তু বাগানের অবস্থা দেখার পর বলে উঠলো, আমরা রাস্তা ভুলে গিয়েছি। তাও না- আমার বরং বঞ্চিত হয়েছি। 
তাদের মধ্যকার সবচেয়ে ভাল লোকটি বললো, আমি কি তোমাদের বলিনি? তোমরা তাসবীহ করছো না কেন? তখন তারা বলে উঠলো, সুবহানআল্লাহ। বাস্তবিকই আমরা গোনাহগার ছিলাম।

এরপর তারা সবাই একে অপরকে তিরষ্কার করতে লাগলো। অবশেষে তারা বললো, "আমাদের এ অবস্থার জন্য আফসোস! আমরা তো বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিলাম। বিনিময়ে আমাদের রব হয়তো এর চেয়েও ভাল বাগান আমাদের দান করবেন। আমরা আমাদের রবের দিকে রুজু করছি।//  

মুসনাদে আহমাদে হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “তোমরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকো। জেনে রেখো যে, পাপের কারণে বান্দাকে ঐ রিযিক হতে বঞ্চিত রাখা হয় যা তার জন্যে তৈরি করে রাখা হয়েছিল।” অতঃপর তিনি বলেন, ঐ লোকগুলো তাদের পাপের কারণে তাদের বাগানের ফল ও শস্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়েছিল। 

১৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা "আমি তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছি যেভাবে পরীক্ষায় ফেলেছিলাম বাগানের মালিকদেরকে" এখানে তাদের বলতে মক্কাবাসীদের বুঝিয়েছেন এবং উদাহরণ হিসেবে বাগান মালিকদের কথা উল্লেখ করেছেন। আলোচ্য ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষা হয়ে রইলো। আল্লাহর নিয়ামত লাভ করেও তারা সে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। বরং তাদের মধ্যকার সর্বোত্তম ব্যক্তিটির কথাও তারা যথাসময়ে মেনে নিয়নি। অবশেষে তারা সে নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। 

যখন তাদের সবকিছুই ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে গিয়েছে তখনই কেবল তাদের চেতনা ফিরেছে। এ উদাহরণ দ্বারা মক্কীবাসীকে এভাবে সাবধান করা হয়েছে যে, রাসুল সা.-কে রসূল করে পাঠানোর কারণে তোমরাও ঐ বাগান মালিকদের মতো পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছো। তোমরা যদি তাকে না মানো তাহলে দুনিয়াতেও শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আর এ জন্য আখেরাতে যে শাস্তি ভোগ করবে তাতো এর চেয়েও বেশি কঠোর। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদের হিদায়াতের পথে রাখুন। ঈমানের যে দৌলত দান করেছেন আমরা যেন তার জন্য আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আমরা যেন আল্লাহ ও তার রাসূলের যথাযথ আনুগত্য করি। মানুষের হক প্রদানে যাতে কোন কার্পণ্য না করি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের কবুল করুন। আমীন। 

২৮ জুন, ২০২০

সাইয়্যেদ মুনাওয়ার : ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে আলোর পথে



সাইয়্যেদ মুনাওয়ার ছিলেন পাকিস্তান জামায়াতের সাবেক আমীর। যে বছর জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয় সে বছরই দিল্লীতে জন্ম নেন সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান। এরপর সাতচল্লিশে দেশভাগের সময় পাকিস্তানের করাচিতে চলে আসে তার পরিবার। মাধ্যমিক থেকেই মুনাওয়ার যুক্ত হয়েছেন সমাজতন্ত্রী আন্দোলনের সাথে। তার ধ্যান জ্ঞান ছিলো কার্ল মার্ক্স, লেনিন এবং তাদের আদর্শ। 

ছোটবেলা থেকে পড়ুয়া ও মেধাবী মুনাওয়ার যুক্ত ছিলে পাকিস্তানের বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফোরামের (এনএসএফ) সাথে। ১৯৫৯ সালে তিনি করাচি এনএসএফের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু তার পরের বছরই ঘটে যায় উল্টো ঘটনা। তরুণ মুনাওয়ারের কাছে এসে পড়ে মাওলানা মওদূদী ও নঈম সিদ্দিকীর কিছু বই। বইগুলো পড়ে ব্যকুল হয়ে পড়েন সাইয়েদ মুনাওয়ার হাসান। নিজের মুসলিম পরিচয় তার কাছে আবার নতুনভাবে ধরা পড়ে। 

১৯৬০ সালে তিনি তার বামপন্থী আদর্শ ত্যাগ করেন। ঈমান বিধ্বংসী রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে যুক্ত হন ইসলামের সুমহান আদর্শে। নতুনভাবে তৈরি করেন নিজেকে। মেধাবী মুনাওয়ার হাসান অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন আদর্শকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন। শুধু তাই নই ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য যোগ দেন ইসলামপন্থী ছাত্র সংগঠন ইসলামী জমিয়তে তালাবাতে।    

এর চার বছর পর মুনাওয়ার হাসান পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবার কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে তিনি তার দক্ষতা ও যোগ্যতার সুস্পষ্ট ছাপ অংকন করেন। ধারাবাহিকভাবে ইসলামী আন্দোলনে ভূমিকা রেখে ২০০৯ সালে তিনি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান আমীরে জামায়াত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত শুক্রবার অর্থাৎ ২৬ জুন ২০২০ সালে তিনি মহান প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়ে এই নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে যান। 

জন্ম ও শৈশব   
সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান জন্মগ্রহণ করেন ভারতের দিল্লীতে। ১৯৪১ সালের ৫ আগস্টে মুনাওয়ার হাসান জন্ম নেন। তার শিশুবেলাতেই তিনি তার পরিবারের সাথে ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যান। এটা ছিল দেশ ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের সময়ের ঘটনা। সেসময়ের পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতেই তার পরিবার সেটেল হয়। তার শৈশব ও শিক্ষাজীবন সবই কাটে করাচিতে। 

পড়াশোনা 
পড়াশোনায় আগ্রহী ও মেধার সাক্ষর রাখেন সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান। তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুইটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার প্রথম বিষয় ছিলো সমাজবিজ্ঞান। পরে ইসলামী আদর্শে পরিবর্তিত হওয়ায় ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশি জ্ঞান হাসিল করার উদ্দেশ্যে তিনি ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করেন। এছাড়াও তিনি ভার্সিটিতে একজন ভালো বক্তা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। একইসাথে তিনি ভালো বিতার্কিকও ছিলেন। 

ছাত্র রাজনীতি
স্কুল জীবন থেকেই মুনাওয়ার হাসান বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৭ সালে এনএসএফের নেতা হিসাবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে তিনি এনএসএফের করাচি'র সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে ১৯৬০ সালে তিনি আদর্শিক মোড় নিয়ে ইসলামী জমিয়তে তালাবাতে যোগ দেন।

১৯৬৭ সালে মূলধারার জাতীয় রাজনীতিতে যোগদান না করা পর্যন্ত তিনি ইসলামী জমিয়তে তালাবার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে জমিয়তে তালাবার করাচি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। এর পরের বছর তিনি জমিয়তে তালাবার করাচি শাখার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।

১৯৬৪ সালে সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান ইসলামী জমিয়তে তালাবার কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি পর পর তিন বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তানের ছাত্রদের কাছে ও ইসলামপ্রিয় জনতার কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। করাচির লোকেরা তাকে ভালোবেসে দিল্লিওয়ালা ভাই ও মুন্নু ভাই নামে ডাকতো। 

জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পন
১৯৬৭ সালে মুনাওয়ার হাসান জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানে মাধ্যমে পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে জাতীয় নির্বাচনে করাচির একটি আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান তার আসন থেকে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু এরপর সামরিক শাসন জারি করে এই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করা হয়। 

১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মুনাওয়ার হাসান জামায়াতের করাচি শাখার আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি পাকিস্তান জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তিনি কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি  হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সেসময় পাকিস্তানের আমীরে জামায়াত ছিলেন কাজী হুসাইন আহমদ। সেসময় থেকে মুনাওয়ার হাসান করাচি থেকে জামায়াতের সদর দপ্তর লাহোরে চলে আসেন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি পাকিস্তান জামায়াতের ৪র্থ আমীর হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। 

সাদাসিদে জীবনযাপন
সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান তার প্রথম জীবনে একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ইসলামিক রিচার্স একাডেমিতে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি রিচার্স একাডেমির সেক্রেটারি হন। এছাড়াও তিনি নানান সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেন। সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে তিনি স্থায়ীভাবে তার পেশাগত কাজ করতে পারেন নি। শেষদিকে জামায়াত কর্তৃক নির্ধারিত সামান্য ভাতাই ছিল তার জীবিকার উৎস। কয়েক দশক ধরে তিনি করাচিতে জামায়াত নেতা নেয়ামতুল্লাহ খানের বাড়ির দুটি রুম নিয়ে থাকতেন। 

তার স্ত্রী আয়েশা মুনাওয়ারও পুরোদস্তুর জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি মহিলা শাখার সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুনাওয়ার হাসান এতোটাই অনাড়ম্বর ছিলেন যে, তার মেয়ের বিয়েতে পাওয়া সমস্ত উপহার বায়তুল মালে জমা করে দিয়েছিলেন। পরহেজগারীতা ও আমানতদারীতায় তার মতো মানুষ দুনিয়ায় খুবই নগণ্য। তিনি তার সমগ্র জীবনে রাজনীতির চাইতে আদর্শকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। 

হাসিনার জুলুমের ব্যাপারে তৎপরতা 
২০১৩ সালে পাকিস্তানের আমীরে জামায়াত ছিলেন সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান। তিনি সেসময় আমাদের ওপর হাসিনার জুলুমের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী ক্যাম্পেইন শুরু করেন। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করে হাই কোর্টের আদেশের তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর উচিত বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। একই সাথে তিনি যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচারের সমালোচনা করে বলেন, এগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। তাঁর মতে, যে কোন মুসলিম দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার অন্যান্য মুসলিম দেশের আছে।

তিনি বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ওপর জুলুমের ব্যাপারে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন। আমাদের দুর্দশার খবর সারা পৃথিবীর মুসলিম নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান আন্তর্জাতিক মিডিগুলোতে বলেছেন, বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, এবং সে ’কারণে তারা জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে চায়। তিনি বলেন, জামায়াতকে সাহায্য করার জন্য অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। তিনি অর্থনৈতিক চাপের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে কিছু নেই। বিশেষ করে সৌদি আরব এবং তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

মুসলিম ভাইরা সব কিছুই করতে পারবে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি মুসলিম রাষ্ট্র, তাই অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো সব কিছুই করতে পারে। তবে বাংলাদেশে শুধু জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ করে হাইকোর্টের আদেশই নয়, পাকিস্তান জামায়াত প্রধান মনে করেন চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াটা প্রশ্নবিদ্ধ এবং সেটা শুরু করাই উচিত ছিল না। তিনি দাবি করেন সত্তর দশকের শুরুর দিকে, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার প্রধান, অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিলো। ‘’চুক্তিতে বলা হয়েছিলো, কোন যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে না, বা কোথাও কোন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে না। 

কিন্তু পাকিস্তান সরকার এখনো কোন উচ্চ-বাচ্য করছে না, তারা বাংলাদেশ সরকারকে এই চুক্তি সম্পর্কে মনে করিয়ে দিচ্ছে না। পাকিস্তান সরকারের এই ভূমিকা নিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসান বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের জন্যই লড়াই করেছিল, কিন্তু এখন ইসলামাবাদ সরকারের নীরব ভূমিকায় জনগণ ক্ষুব্ধ। পাকিস্তানের জনগণ এটা নিয়ে মোটেই খুশি না। যখন যুদ্ধ চলছিল, ঐ দেশ বাংলাদেশ ছিল না, পূর্ব পাকিস্তান ছিল। কাজেই যারা পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করছিল, তারা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী সঠিক কাজই করছিল। 

সাইয়্যেদ মুনাওয়ার হাসানের মতে, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সমর্থনে পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনীর সবার আগে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমির মনে করেন বাংলাদেশে জনমত যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিপক্ষে চলে গেছে। তবে তাঁর মতে, ১৯৭১ সালে সংঘটিত কোন অপরাধের বিচার করার অধিকার বাংলাদেশ সরকারের নেই।

ইন্তেকাল
তিনি দীর্ঘদিন যাবত জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সবশেষে চলমান মহামারী কোভিড-১৯-এ তিনি আক্রান্ত হন। ২৬ জুন শুক্রবার পবিত্র দিলে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন।

২৬ জুন, ২০২০

রেশমি রুমাল আন্দোলনের ইতিকথা



তুর্কিতে পায়িতাথ নামে একটি সিরিজ শুরু হয়েছিলো অনেক আগে। এর কিছু অসাধারণ ভিডিও ক্লিপ বাংলা সাবটাইটেল আকারে প্রচার হয়। তা থেকে উৎসাহিত হই। লকডাউনে কিছু পর্ব দেখি। এই সিরিয়ালের কেন্দ্রীয় চরিত্র উসমানীয় সুলতান আব্দুল হামিদ খান দ্বিতীয়। পরে ওনার সম্পর্কে পড়াশোনা করতে আবিষ্কার করি আমাদের উপমহাদেশে ওনার এক ব্যর্থ পরিকল্পনার কাহিনী। এই কাহিনী রেশমি রুমাল আন্দোলন নামে পরিচিত।

আব্দুল হামিদের মূল শত্রু ছিলো ব্রিটিশরা। ব্রিটিশরা বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চল তাদের উপনিবেশে পরিণত করছে। এমনকি তুর্কি সালতানাতের অঞ্চলগুলো দখলের চেষ্টা চালায়, বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ উস্কে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা গোটা তুর্কি সালতানাতই দখলের প্রচেষ্টা চালায় আব্দুল হামিদের সময়। আব্দুল হামিদও তাদের ষড়যন্ত্র দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করতে থাকে।

এই মোকাবেলার অংশ হিসেবে আব্দুল হামিদ ব্রিটিশ শাসিত হিন্দুস্থানে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা করে। তাঁর এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হয় দেওবন্দি আলেম শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি বিপ্লবী দল গঠন করে মাহমুদুল হাসান তার ছাত্রদের দ্বারা।

এদিকে তুরস্কে ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে তরুণ তুর্কি নামে একদল সেক্যুলার যুবকদের উত্থান হয়। ১৯০৯ সালে তারা বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনতার নামে সুলতান আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আব্দুল হামিদ তার ছোট ভাইয়ের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ফলে এদেশের স্বাধীনতা কামীদের সাথে তুরস্কের যোগাযোগে ফাটল সৃষ্টি হয়। ১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবস্থান হেতু তুরস্ক মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। তুরস্ক ভারতে বিদ্রোহ তৈরি করে ব্রিটিশদের চাপে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু স্বাধীনতার মূল দাবীদার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ আগেই ব্রিটিশদের সাথে সমঝোতা করে যদি তারা ব্রিটিশদের অনুগত থাকবে যুদ্ধের সময়। বিনিময়ে ভারতে স্বায়ত্বশাসন দেওয়া হবে। এজন্য তারা চুপ থাকে।

তুরস্ক বাধ্য হয়ে দেওবন্দি আলেম মাহমুদুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করে আবার তাদের সংগঠিত করে। ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতাকামীর সংখ্যা কম ছিল না। তুর্কিরা জার্মানিতে অধ্যায়নরত কিছু ভারতীয় ছাত্র ও স্বাধীনতাকামী কিছু বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনা সফল করার জন্য আফগানিস্তানের আমীরের সাথেও তারা যোগাযোগ করে। আফাগানিস্তান যদিও স্বাধীন ছিলো তথাপি তারা ব্রিটিশদের সাথে নানা চুক্তি ও ঘেরাও-এর মধ্যে ছিল। কার্যত অনেকটাই ব্রিটিশ অনুগত থাকতে হতো।

তুরস্ক এ সময় মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে তুর্কি ও আফগান সরকারের সাথে প্রত্যক্ষ আলাপ আলোচনার জন্য দায়িত্ব দেয়। তাদের এই কার্যক্রম ব্রিটিশ সরকার টের পেয়ে যায়। মাহমুদুল হাসান ও সঙ্গীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। মাহমুদুল হাসান তার ছাত্র ওবাইদুল্লাহ সিন্ধিকে পাঠিয়ে দেন কাবুলের পথে এবং নিজে রওনা হন মক্কার পথে। কাবুলে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল আফগান সরকারের সহযোগিতা নিশ্চিত করা ও আফগান সীমান্তে থাকা স্বাধীনতাকামীদেরকে সংগঠিত করে ভারতের আজাদী আন্দোলনের কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা।

ওবাইদুল্লাহ সিন্ধি কাবুল পৌঁছেন। কাবুল আমীরকে সহযোগিতায় রাজি করান। তিনি তুর্কি ও জার্মানি মিশনের সাথে কাজ করতে রাজি হন। ওবাইদুল্লাহ সিন্ধি সেখানে গিয়ে অনেক স্বাধীনতাকামীদের দেখতে পান এবং সেখানে একটি অস্থায়ী ভারত সরকার গঠন করেন। তুর্কি- জার্মান মিশনের সমন্বয়কারী প্রতিনিধি রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে এই সরকারের প্রেসিডেন্ট, বরকতুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী এবং উবায়দুল্লাহ সিন্ধি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

এদিকে মাহমুদুল হাসান মক্কা পৌঁছেন। মক্কা মদিনা তখন ছিল তুর্কি খেলাফতের অংশ। তিনি গিয়ে তুর্কি গভর্নর গালিব পাশার সাথে সাক্ষাত করেন। গালিব পাশার তখন ধর্মীয় প্রভাব ছিল অনেক। তিনি দুটি পত্র লিখেন। একটি পাঠানো হয় মদিনার গভর্নর বসরী পাশার কাছে আরেকটি আফগান গোত্রপতি মুসলমানদের কাছে। এতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বান ছিল।

সেসময় তুর্কি যুদ্ধমন্ত্রী আনোয়ার পাশা মদিনায় এসেছিলেন। মাহমুদুল হাসান তার সাথে সাক্ষাতে করেলেন। তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সহায়তার চুক্তি সাক্ষর করলেন। তিনি শায়খুল হিন্দকে তিনটি চিঠি লিখে দিলেন। একটি ছিল অস্থায়ী ভারত সরকার ও তুর্কি সরকারের মধ্যকার চুক্তিনামা। দ্বিতীয়টি মুসলিম নেতৃবৃন্দের কাছে শায়খুল হিন্দকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান। তৃতীয়টি ছিল আফগান সরকারের প্রতি।

আনোয়ার পাশার সাথে সাক্ষাতের সময় সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আফগান সরকার সম্মত থাকলে তুর্কি বাহিনী সীমান্তে অবস্থান নিবে। সুযোগমতো সেই বাহিনী ভারতে প্রবেশ করবে এবং অভ্যুত্থান ঘটাবে। সেই সময় শায়খুল হিন্দ আফগানিস্তান থেকে সামগ্রিক দিক নির্দেশনা দিবেন এবং তুর্কি বাহিনীর রসদের যোগান দিবেন এক্ষেত্রে সাহায্য করবেন আফগান আমীর।

ওবাইদুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে এই পত্র আফগান সরকারের নিকট পৌঁছানো হল। কিন্তু তিনি ব্রিটিশদের চাপের কথা তুলে প্রথমে সম্মতি দিতে চাইলেন না। পরে এই মর্মে চুক্তি হলো আফগান সরকার নিরপেক্ষ থাকবে সাহায্য যা করার গোপনে করবে এবং তুর্কি বাহিনী আফিগান সীমান্ত দিয়েই ভারতে প্রবেশ করবে। আর যদি কোন আফগানী এই যুদ্ধে যেতে চায় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে কোন নিষেধ থাকবেনা। ইংরেজদেরকে দেওয়ার জন্য কৈফিয়তও প্রস্তুত রাখা হল, “সীমান্তের স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে আফগান সরকার”।

উবাইদুল্লাহ সিন্ধি মাহমুদুল হাসানের বার্তা পাঠান হিন্দুস্থানে অবস্থানরত দেওবন্দীদের কাছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চিঠি ধরা পড়ে যায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে। পুরো প্ল্যান ফাঁস হয়ে যায়। কওমী নেতাদের এরেস্ট করা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। তুর্কিদের একটি প্ল্যান এভাবে ভেস্তে যায়। উবায়দুল্লাহ সিন্ধি আফগানিস্তান থেকে তুর্কিতে পালিয়ে যায়। ফলে তাকে এরেস্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে মূল নেতা মাহমুদুল হাসান মক্কায় এরেস্ট হন। মক্কায় তখন শরিফ হুসেইন নামে এক হাশেমীয় নেতা ব্রিটিশদের সহায়তায় বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে থাকে। শরীফ খুব জনপ্রিয় ছিলো আরবদের কাছে। ব্রিটিশরা শরীফের সাহায্যে মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে এরেস্ট করে।

এরপর মাহমুদুল হাসান, হোসাইন আহমেদ মাদানীসহ অপরাপর দেওবন্দী নেতাদের দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টায় নির্বাসন দেন। তিন বছর পর ১৯২০ সালের শুরুতে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তারা খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। তবে মাহমুদুল হাসান আর বেশিদিন বাঁচেন নি। ওই বছরই নভেম্বরে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের আগে আযাদি আন্দোলনে কংগ্রেসকে সহায়তা ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির সাথে দেওবন্দীদের আন্দোলন করার পরামর্শ দেন।

তার সিদ্ধান্ত অনুসারে দেওবন্দীদের সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সবসময় মুশরিকদের সংগঠন কংগ্রেসকে সাপোর্ট করে এবং মুসলিম লীগের বিরোধীতা করে। তবে এই মতের বিরোধী ছিলেন আরেক দেওবন্দী আলেম হাকিমুল উম্মত আশ্রাফ আলী থানবী রহ.। পাকিস্তান আন্দোলন যখন চরমে তখন মাওলানা থানবী'র অনুসারী সাব্বির আহমেদ ওসমানী জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে আলাদা হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে আলাদা আরেকটি সংগঠন তৈরি করেন। এই সংগঠন পাকিস্তান আন্দোলনকে সাপোর্ট করেন এবং মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করেন।

মাওলানা মাহমুদুল হাসানের এই বিদ্রোহ রেশমি রুমাল আন্দোলন নাম দিয়েছে মূলত ইংরেজরা। কারণ উবাইদুল্লা সিন্ধি বার্তাটি লিখে পাঠান একটি রুমালে করে যা রেশমি কাপড়ের ছিলো। অর্থাৎ ইংরেজ গোয়েন্দারা যে চিঠিটি পায় তা লেখা রেশমি কাপড়ের রুমালে। সেখান থেকেই এই আন্দোলনের এরূপ নাম হয়।

রেশমী রুমাল আন্দোলন হিন্দুস্তানে ইংরেজের সাথে যুদ্ধ করার সেনাদল তৈরি করে তার নাম দেয় ‘জুনুদে রব্বানিয়া'। নিম্নোক্ত নেতৃবর্গ ছিলেন এ সেনাদলের প্রথম সারিতে :
প্রধান পৃষ্ঠপোষক : তুরস্কের সুলতান মেহমেদ খান পঞ্চম, ইরানের সুলতান আহমদ শাহ কাচার, আফগানিস্তানের আমীর হাবিবুল্লাহ খান।

সহকারী পৃষ্ঠপোষক : আনোয়ার পাশা, তুরস্কের যুবরাজ, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী, আফগানিস্তানের সহকারী রাষ্ট্রপ্রধান সরদার নসরুল্লাহ খান, হায়দরাবাদের নিজাম, ভূপালের নওয়াব, রামপুরের নওয়াব, বাহাওয়ালপুরের নিজাম, ইয়াগিস্তানের মুজাহিদ দলের প্রধান।
প্রধান সেনাপতি : শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান এবং সহকারী সেনাপতি : মওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী।

বিভাগীয় সেনাপতিবৃন্দ : মওলানা আবদুর রহীম, মওলানা গোলাম মুহাম্মাদ দীনপুরী, মওলানা তাজ মাহমুদ আনরুজ, মওলবী হুসাইন আহমদ মাদানী, মওলবী হামদুল্লাহ, হাজী তরঙ্গ যই, ডা. মুখতার আহমদ আনসারী, মুল্লা সাহেব বাবড়া, জান সাহেব বাজোড়, মওলবী মুহাম্মাদ মিয়া, হাকিম আবদুর রাজ্জাক, মওলবী উবাইদুল্লাহ গাজীপুর, মওলবী আবদুল বারী ফিরিঙ্গী মহলী, মওলানা আবুল কালাম আযাদ, মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, মওলানা শওকত আলী, মওলানা জাফর আলী খান, মওলানা হাসরাত মোহানী, মওলবী আবদুল কাদের কাসুরী ও পীর আসাদুল্লাহ শাহ সিন্ধী।

রেশমী রুমাল আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবর্গের সংখ্যা দুশ' বাইশের মতো। সাধারণ লোকেরাও এর মধ্যে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে চলছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে শুরু করে সিন্ধু, পাঞ্জাব, দিল্লী, অযোধ্যা পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছিল।

২৪ জুন, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৪২ : লাহোর প্রস্তাব থেকে পাকিস্তান আন্দোলন



পাকিস্তানের চিন্তাভাবনা অথবা পরিকল্পনা কোন অভিনব রাজনৈতিক দশর্ন নয়। এটি হুট করে হিন্দুস্থানে নাজিল হয়নি। ধারাবাহিকভাবে এর একটি প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। লর্ড কার্জন কর্তৃক শুধুমাত্র প্রশাসনিক কারণে ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভেঙে আরেকটি প্রদেশ তৈরি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুশরিকদের বঙ্গভঙ্গরদ আন্দোলন এবং ১৯১১ সালে তা রহিতকরণ থেকে শুরু। এরপর উপমহাদেশের যত্রতত্র এবং যখন তখন মুসলমাদের গায়ে পড়ে হিন্দুদের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টি এবং মুসলমানদের জানমালের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে মুশরিকরা। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বার বার সমঝোতা করার চেষ্টা করা হলেও কংগ্রেস তথা হিন্দুত্ববাদীদের হটকারিতায় সেটা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর সাতটি প্রদেশে আড়াই বছর কংগ্রেসের কুশাসন মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের কথা তীব্রভাবে ভাবতে শিখায়। 

হিন্দুস্থানে মুশরিকরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী হওয়ার কারণে মুসলিম জাতিকে হয় তাদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখতে অথবা নির্মূল করতে চায়। এ লক্ষ্য হাসিলে জন্যেই কংগ্রেসের দাবী ছিল এই যে এ উপমহাদেশের অধিবাসীদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ সরকারকে তার হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। হিন্দু সভ্যতা সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ এবং হিন্দুরামরাজ্য স্থাপনই ছিল কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য। কংগ্রেস ও তার কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন আচরণে এ বিশ্বাস মুসলমানদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয় এবং এ কারণেই মুসলমানগণ পাকিস্তান আন্দোলন করতে বাধ্য হন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, পাকিস্তানের সূচনা তখন থেকে হয় যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম বিজয়ীর বেশে হিন্দুস্থানে পদার্পণ করেন। অতঃপর এ উপমহাদেশে কয়েকশত বছর ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলবৎ থাকে। বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে পুনরায় বৃটিশ ভারতে মুসলিম জাতির স্বাতন্ত্র ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠর চিন্তভাবনা ও প্রচেষ্টা শুরু হয়। উপমহাদেশে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ- পূর্ব অঞ্চলগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা আলাদা রাষ্ট্রের ব্যাপারে প্রেরণা দিয়েছিল। তাই বিশ্ব ইসলামী ঐক্যের অগ্রদূত সাইয়েদ জামালুদ্দীন আগগানী আফগানিস্তান এবং উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে একটি মুসলিম রিপাবলিক গঠনের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রথম চিন্তাভাবনা করেন।

আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে ভারতের বিভিন্ন সমস্যা আলোচনার পর বৃটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যেই অথবা বাইরে মুসলমানদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আল্লামা ইকবাল তাঁর প্রস্তাবিত মুসলিম রাষ্ট্রের কোনো নাম দেননি। এ কাজটি করেছেন চৌধুরী রহমত আলী। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারী মাসে চৌধুরী রহমত আলী এবং তাঁর ক্যাম্ব্রিজের তিনজন সহকর্মী নাউ অর নেভার (Now or Never) শীর্ষক একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। চৌধুরী রহমত আলী তাঁর প্রচারপত্র ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দের কাছে, লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠকে যোগদানকারী মুসলিম ডেলিগেটদের কাছে এবং ইংলন্ডের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিকটে প্রেরণ করেন। এই প্রচারপত্রেই তিনি পাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি পাকিস্তান বলতে হিন্দুস্থানের উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি প্রদেশ তথা পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানকে বুঝিয়েছেন। এই প্রচারপত্রের মূল বিষয় ছিলো মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র। ‘পাকিস্তান’ নামটি চৌধুরী রহমত আলীরই উদ্ভবন- যা লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে হিন্দুস্থানের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং প্রায় সাত বছর পর তা বাস্তব সত্যে পরিণত হয়।

লাহোর প্রস্তাবের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ :
প্রথমত
 নিখিল ভারত মুসলিম লীগ দৃঢ়তার সাথে পুনঃঘোষণা করছে যে, ১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দের ভারত শাসন আইন-এ যে যুক্তরাষ্ট্রের (Federal) পরিকল্পনা রয়েছে, তা এ দেশের উদ্ভূত অবস্থার প্রেক্ষিতে অসঙ্গত ও অকার্যকর বিধায় তা ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।

দ্বিতীয়ত 
সমস্ত সাংবিধানিক পরিকল্পনা নতুনভাবে বিবেচনা না করা হলে মুসলিম ভারত অসন্তুষ্ট হবে এবং মুসলমানদের অনুমোদন ও সম্মতি ব্যতিরেকে সংবিধান রচিত হলে কোন সংশোধিত পরিকল্পনাও তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।

তৃতীয়ত 
নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সুচিন্তিত অভিমত এরূপ যে, ভারতে কোন শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা কার্যকর হবে না যদি তা নিম্নবর্ণিত মূলনীতির উপর ভিত্তি করে রচিত না হয়:
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সংলগ্ন বা সন্নিহিত স্থানসমূহকে 'অঞ্চল' হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে, প্রয়োজন অনুযায়ী সীমানা পরিবর্তন করে এমনভাবে গঠন করতে হবে যেখানে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এলাকাগুলো 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' (Independent States) গঠন করতে পারে, 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের' সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাষ্ট্র বা প্রদেশসমূহ হবে স্বায়ত্বশাসিত ও সার্বভৌম।

চতুর্থত 
এ সমস্ত অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য তাদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে সংবিধানের কার্যকর ও বাধ্যতামূলক বিধান রাখতে হবে। ভারতবর্ষের মুসলমান জনগণ যেখানে সংখ্যালঘু সেখানে তাদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথেও আলোচনা সাপেক্ষে সংবিধানে কার্যকর বিধান রাখতে হবে।

২৪ মার্চ প্রবল উৎসাহের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকীসমূহ লাহোর প্রস্তাবকে ক্যামব্রিজে বসবাসরত দেশত্যাগী ভারতীয় মুসলমান রহমত আলী কর্তৃক উদ্ভাবিত নকশা অনুযায়ী ‘পাকিস্তানের জন্য দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবকে পাকিস্তান ট্যাগ দিয়ে একটি রাষ্ট্রের ধারণা দেয়। মুসলমান নেতাদের পক্ষে সাধারণ মুসলিম জনগণের নিকট লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা প্রদান এবং এর প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব বুঝাতে হয়তো দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারতো। কিন্তু হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ কর্তৃক প্রস্তাবটিকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে নামকরণ করাতে সাধারণ জনগণের মাঝে এর পূর্ণ গুরুত্ব জনে জনে প্রচার করার ব্যাপারে মুসলমান নেতৃবৃন্দের অনেক বছরের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। বিরোধীতা করতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রচার হিন্দুরাই বেশি করে। যদিও লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তান শব্দটির উল্লেখ ছিল না। 

যাই হোক, এরপর ১৯৪১ সালের ১৫ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে একটি মৌল বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি লীগের প্রধান বিষয় ছিল। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে যখন মন্ত্রী মিশন ভারতে পৌঁছে, তখন ৭ এপ্রিল দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তাদের ‘পাকিস্তান দাবি’র পুনরাবৃত্তি করতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের তিন-দিনব্যাপী এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি চৌধুরী খালিকুজ্জামান, হাসান ইস্পাহানি ও অন্যান্যদের সমবায়ে একটি উপ-কমিটি নিয়োগ করে। চৌধুরী খালিকুজ্জামান প্রস্তাবের একটি খসড়া তৈরি করেন। অন্যান্য সদস্যদের সাথে খসড়াটি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সামান্য পরিবর্তনের পর উপ-কমিটি এবং অতঃপর সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ‘স্টেটস’ (States) শব্দটিকে একবচন শব্দ ‘স্টেট’ (State)-এ পরিবর্তন করা হয়। 

পাকিস্তান দাবি ভারতের মুসলিমদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর পিছনে অনেক সুস্পষ্ট কারণ ছিল। বাংলা ও পাঞ্জাবের কৃষকদের নিকট ‘পাকিস্তান’কে হিন্দু জমিদারদের শোষণের অবসান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বেঙ্গল মুসলিম লীগের সচিব আবুল হাশেম ১৯৪৪ সালে এক ঘোষণার মাধ্যমে জমিদারি উচ্ছেদের অঙ্গীকার করেন। আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল যে, প্রস্তাবিত পাকিস্তান ভারতের অংশ বিশেষকে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ব্যবসায়ী বা পেশাজীবীদের প্রভাব বলয় থেকে পৃথক করবে বলে অঙ্গীকার করে। এতে স্বল্প সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠা লাভ এবং নতুন গড়ে উঠা মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ চাকরি গ্রহণ করতে পারবে। তুলনামূলকভাবে বড় মুসলিম পুঁজিপতিদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ১৯৪৭ সালের পূর্বে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাঞ্জাবে বড় ধরনের কোন শিল্পকারখানা ছিল না বললেই চলে। অবশ্য এতদ্অঞ্চলে উন্নত কৃষি ব্যবস্থার সাথে জড়িত ক্ষুদ্র মাপের কিছু উদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটে। প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় বড় পুঁজিবাদের প্রতিযোগিতার কবল থেকে রক্ষা করে পাকিস্তান এ সকল লোকের জন্য আর্থিক সুবিধাদি লাভের ব্যবস্থা করে দেয়।

রাজনীতির পাশাপাশি পাকিস্তান আন্দোলনকে আদর্শিকভাবেও লড়াই করতে হয়েছে। হিন্দু নেতাদের সাথে সুর মিলিয়ে কিছু মুসলমান ব্যক্তিত্বও পাকিস্তান আন্দোলনের সমালোচনায় নেমে পড়লেন। মুসলমান ব্যক্তিত্বের অন্যতম ছিলেন দেওবন্দি মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী। তিনি যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম শিরোনামে একটি বই লিখেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে  সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত  যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বিবেচিত হলো। ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য  এ জাতিগত  ঐক্যের চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি,  বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আর এক ধাপ  এগিয়ে বলেন,“ আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে। এতএব হিন্দু মুসলিম এক জাতি, আমরা সবাই ভারতীয়”

মওলানা সাহেবের এই পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর নির্ভেজাল তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে পুংখানুপুংখ বিচার গবেষণা চালিয়ে মওলানা মওদূদী রহ. রচনা করেন  “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” পুস্তক। তিনি যুক্ত জাতীয়তাবাদের পক্ষের সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

//মাওলানা মওদূদী রহ. বলেন, অমুসলিম জাতি সমূহের সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্কের দু’টি দিক রয়েছে। প্রথমটি এই যে মানুষ হওয়ার দিক দিয়ে মসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। আর দ্বিতীয়টি এই যে, ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য হেতু আমাদেরকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে দেয়া হয়েছে। প্রথম সম্পর্কের দিক দিয়ে মুসলিমরা তাদের সাথে সহানুভূতি, দয়া ঔদার্য ও সৌজন্যের ব্যবহার করবে।  কারণ মানবতার দিক দিয়ে এরূপ ব্যবহারই তারা পেতে পারে। এমনকি তারা যদি ইসলামের দুশমন না হয়, তাহলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব, সন্ধি এবং মিলিত উদ্দেশ্যের (Common Cause) সহযেগিতাও করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার বস্তুগত ও বৈষয়িক সম্পর্ক তাদেরকে ও আমাদেরকে মিলিত করে ‘একজাতি’ বানিয়ে দিতে পারেনা।

তিনি আরো বলেন, যেসব গন্ডীবদ্ধ, জড় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও কুসংস্কারপূর্ণ ভিত্তির উপর দুনিয়ার বিভিন্ন জাতীয়তার প্রাসাদ গড়ে উঠেছে আল্লাহ ও তাঁর রসুল তা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেন। বর্ণ, গোত্র, জন্মভূমি, অর্থনীতি ও রাজনীতিক অবৈজ্ঞানিক বিরোধ ও বৈষম্যের ভিত্তিতে মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও চরম অজ্ঞতার দরুণ মানবতাকে বিভিন্ন ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত করেছিল, ইসলাম তার সবগুলোকে আঘাতে চূর্ণ করে দেয় এবং মানবতার দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষকে সমশ্রেণীর সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমানাধিকার প্রধান করেছে। ইসলামী জাতীয়তায় মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য বিধান পেশ করা হয় যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয়মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানব জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যে, যারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে,তারা এক জাতি হিসাবে গণ্য হবে আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে, তারা সম্পুর্ণ ভ্ন্নি জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমস্ত ব্যক্তিসমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি।// 

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব  থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত  কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য। যেহেতু  মুসলিম  ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস  ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপরেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট  শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে। কুরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে। যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি।

২০ জুন, ২০২০

শতাব্দির পর শতাব্দি দাওয়াতি কাজ করে যাওয়া এক ধৈর্যশীল মহামানব

ছবি : ইরাকের মসুল নগরী। আইএসের সাথে যুদ্ধে এই নগরী এখন ধ্বংসস্তূপ। এখানেই বসবাস করতেন নবী নূহ আ. এবং তাঁর জাতি।  

আদম আ. গত হওয়ার পর প্রায় হাজার বছর পার হয়ে গেল। শেষ শতকে ক্রমবর্ধমান মানবকুলে শিরক ও কুসংস্কারের আবির্ভাব ঘটে এবং তা বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহ নূহ আ.-কে নবী ও রাসূল করে পাঠান। তিনি সাড়ে নয়শত বছরের দীর্ঘ বয়স লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন পথভোলা মানুষকে পথে আনার জন্য দাওয়াতে অতিবাহিত করেন। কিন্তু তাঁর কওম তাঁকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে আল্লাহর গযবে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। 

মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা বলে খ্যাত নূহ আ. ছিলেন পিতা আদম আ.-এর দশম অথবা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ। নূহ আ.-এর চারটি পুত্র ছিল। তারা হলেন সাম, হাম, ইয়াফিছ ও ইয়ামিন অথবা কেন‘আন। প্রথম তিনজন ঈমান আনেন। কিন্তু শেষোক্ত জন কাফের হয়ে প্লাবনে ডুবে মারা যায়। নূহ আ.-এর দাওয়াতে তাঁর কওমের হাতে গোণা মাত্র কয়েকজন ঈমানদার ব্যক্তি সাড়া দেন এবং তারাই প্লাবনের সময় নৌকারোহণের মাধ্যমে বেঁচে যান। ঐতিহাসিকরা বলেন, আমরা বাঙালিরাও নূহ আ.-এর বংশধর। 

নুহ আ. ছেলে হামের ছিলো ছয় ছেলে। তারা হলো, হিন্দ, সিন্দ, হাবাস, জানাস, বার্বার ও নিউবাহ। এদের মধ্যে হিন্দের মাধ্যমে ভারতবর্ষ আবাদ হয়েছিলো। হিন্দের সন্তানরা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলো বলেই এ ভুখন্ড ‘হিন্দুস্তান’ নামে পরিচিত। আল্লাহর নবী নুহ আ. ছেলে ও নাতিদের সকলেই ছিলেন ঈমানদার ও ধর্মপ্রচারক। তাঁরা ছিলেন তাওহীদবাদের পূর্ণ বিশ্বাসী। হামের বড় ছেলে হিন্দের ছিলো চার ছেলে। তারা হলেন পূরব, বঙ্গ, দাখিন ও নাহরাওয়াল। বড় ছেলে পূরবের মোট বিয়াল্লিশজন ছেলে ছিলো। তারা ভারতবর্ষ ও এর আশেপাশে বসতি স্থাপন করে এবং অল্পকালের মধ্যেই তাদের বংশবিস্তার হয়। তারা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দের উল্লেখিত দ্বিতীয় ছেলে বঙ্গ ভারত উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর বংশধরের আবাসস্থলই তাঁর নামে অর্থাৎ ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিত হয়। 

নূহ আ. ৯৫০ বছর জীবন পেয়েছিলেন। নূহ আ. ইরাকের মসুল নগরীতে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে বসবাস করতেন। তারা বাহ্যতঃ সভ্য হ’লেও শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তিনি তাদের হেদায়াতের জন্য প্রেরিত  হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, হযরত নূহ (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২৮টি সূরায় ৮১টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং নূহ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাও নাজিল হয়েছে।

আদম (আঃ)-এর সময়ে ঈমানের সাথে শিরক ও কুফরের মুকাবিলা ছিল না। তখন সবাই তওহীদের অনুসারী একই উম্মতভুক্ত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের মধ্য শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। নূহের কওম ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূস, ইয়াঊক্ব ও নাসর প্রমুখ মৃত নেককার লোকদের উসিলায় আখেরাতে মুক্তি পাবার আশায় তাদের পূজা শুরু করে। মুহাম্মাদ ইবনু ক্বায়েস বলেন, আদম ও নূহ আ.-এর মধ্যবর্তী সময়কালের এই পাঁচজন ব্যক্তি নেককার ও সৎকর্মশীল বান্দা হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর পর ভক্ত অনুসারীগণকে শয়তান এই বলে প্ররোচনা দেয় যে, এইসব নেককার মানুষের মূর্তি সামনে থাকলে তাদের দেখে আল্লাহর প্রতি ইবাদতে অধিক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। ফলে তারা তাদের মূর্তি বানায়। অতঃপর উক্ত লোকদের মৃত্যুর পরে তাদের পরবর্তীগণ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ঐ মূর্তিগুলিকেই সরাসরি উপাস্য হিসাবে পূজা শুরু করে দেয়। তারা এইসব মূর্তির উসিলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। আর এভাবেই পৃথিবীতে প্রথম মূর্তিপূজার শিরকের সূচনা হয়।

ইবনু আবী হাতেম-এর বর্ণনায় এসেছে যে, ‘ওয়াদ’ ছিল এদের মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক নেককার ব্যক্তি। তিনি মারা গেলে লোকেরা তার প্রতি ভক্তিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শয়তান এই সুযোগ গ্রহণ করে এবং লোকদেরকে তার মূর্তি বানাতে প্ররোচনা দেয়। ফলে ওয়াদ-এর মূর্তিই হ’ল পৃথিবীর সর্বপ্রথম মূর্তি, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার পূজা শুরু হয়’।

নূহ আ. স্বীয় কওমকে দিন-রাত দাওয়াত দিতে থাকেন। তিনি তাদেরকে প্রকাশ্যে ও গোপনে বিভিন্ন পন্থায় ও পদ্ধতিতে দাওয়াত দেন। কিন্তু ফলাফল হয় নিতান্ত নৈরাশ্যজনক। তাঁর দাওয়াতে অতিষ্ট হয়ে তারা তাঁকে দেখলেই পালিয়ে যেত। কখনো কানে আঙ্গুল দিত। কখনো তাদের চেহারা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলতো। তারা তাদের হঠকারিতা ও জিদে অটল থাকত এবং চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত’ (নূহ ৭১/৬-৯)। এক সময় কওমের সর্দাররা লোকদের ডেকে বলল, (খবরদার!) ‘তোমরা তোমাদের পূর্ব পুরুষদের পূজিত উপাস্য ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূস, ইয়াঊক্ব, নাসর-কে কখনোই পরিত্যাগ করবে না’। (এভাবে) ‘তারা বহু লোককে পথভ্রষ্ট করে এবং (তাদের ধনবল ও জনবল দিয়ে) নূহ-এর বিরুদ্ধে ভয়ানক সব চক্রান্ত শুরু করে’ (নূহ ৭১/২১-২৩)।

কওমের অবিশ্বাসী নেতারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য নূহ আ.-এর বিরুদ্ধে পাঁচটি আপত্তি উত্থাপন করেছিল। 
(১) আপনি তো আমাদের মতই একজন মানুষ। নবী হ’লে তো ফেরেশতা হতেন। 
(২) আপনার অনুসারী হলো আমাদের মধ্যকার হীন ও কম বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা 
(৩) কওমের উপরে আপনাদের কোন প্রাধান্য পরিদৃষ্ট হয় না। 
(৪) আপনার দাওয়াত আমাদের বাপ-দাদাদের রীতি বিরোধী 
(৫) আপনি আসলে নেতৃত্বের অভিলাষী। অতএব আপনাকে আমরা মিথ্যাবাদী মনে করি।

অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো একই প্রায় একই অভিযোগ করা হয়েছে রাসূল সা.-এর বিরুদ্ধেও। শুধু তাই নয় আজকেও আমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করি আমাদের বিরুদ্ধেও প্রথমটি ছাড়া বাকী অভিযোগগুলো জারি রয়েছে।   

আল্লাহ তা‘আলা নূহ আ.-কে সাড়ে নয়শত বছরের সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন। তিনি এক পুরুষের পর দ্বিতীয় পুরুষকে অতঃপর তৃতীয় পুরুষকে শুধু এই আশায় দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন যে, তারা ঈমান আনবে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়া সত্ত্বেও তারা ঈমান আনেনি। মূলতঃ এই সময় নূহ (আঃ)-এর কওম জনবল ও অর্থবলে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সংখ্যাধিক্যের কারণে ইরাকের ভূখন্ড ও পাহাড়েও তাদের আবাস সংকুলান হচ্ছিল না। 

আল্লাহর চিরন্তন নীতি এই যে, তিনি অবাধ্য জাতিকে সাময়িকভাবে অবকাশ দেন। নূহের কওম সংখ্যাশক্তি ও ধনাঢ্যতার শিখরে উপনীত হয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তারা নূহ আ.-এর দাওয়াতকে তাচ্ছিল্য ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। নূহ আ. তাদেরকে দিবারাত্রি দাওয়াত দেন। কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে অর্থাৎ সকল পন্থা অবলম্বন করে তিনি নিজ কওমকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, এই সুদীর্ঘ দাওয়াতী যিন্দেগীতে তিনি যেমন কখনো চেষ্টায় ক্ষান্ত হননি, তেমনি কখনো নিরাশও হননি। সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নানাবিধ নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েও তিনি ছবর করেন। 

কাফির নেতারা বলল, হে নূহ! যদি তুমি বিরত না হও, তবে পাথর মেরে তোমার মস্তক চূর্ণ করে দেওয়া হবে’ (শো‘আরা ২৬/১১৬)। তবুও বারবার আশাবাদী হয়ে তিনি সবাইকে দাওয়াত দিতে থাকেন। আর তাদের জন্য দো‘আ করে বলতে থাকেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার কওমকে ক্ষমা কর। কেননা তারা জানে না। 

একদিন নূহ আ. তার জাতির লোকদের ডেকে বললেন,
‘হে আমার জাতি! যদি তোমাদের মাঝে আমার উপস্থিতি ও আল্লাহর আয়াত সমূহের মাধ্যমে তোমাদের উপদেশ দেওয়া ভারি বলে মনে হয়, তবে আমি আল্লাহর উপরে ভরসা করছি। এখন তোমরা তোমাদের যাবতীয় শক্তি একত্রিত কর ও তোমাদের শরীকদের সমবেত কর, যাতে তোমাদের মধ্যে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ না থাকে। অতঃপর আমার ব্যাপারে একটা ফায়সালা করে ফেল এবং আমাকে মোটেও অবকাশ দিয়ো না’। ‘এরপরেও যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। তবে জেনে রেখ, আমি তোমাদের কাছে কোনরূপ বিনিময় কামনা করি না। আমার বিনিময় কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। আর আমার প্রতি নির্দেশ রয়েছে যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই’। ‘কিন্তু তারপরও তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো’ (ইউনুস ১০/৭১-৭৩)। 

এরপর আল্লাহ তায়ালা ওহী নাযিল করে বলেন, তোমার কওমের যারা ইতিমধ্যে ঈমান এনেছে, তারা ব্যতীত আর কেউ ঈমান আনবে না। অতএব তুমি ওদের কার্যকলাপে বিমর্ষ হয়ো না’ (হূদ ১১/৩৬)। এভাবে আল্লাহর ওহী মারফত তিনি যখন জেনে নিলেন যে, এরা কেউ আর ঈমান আনবে না। বরং কুফর, শিরক ও পথভ্রষ্টতার উপরেই ওরা দৃঢ় থাকবে। 

তখন তিনি প্রার্থনা করলেন,
হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সাহায্য কর। কেননা ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছে। অতএব তুমি আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথী মুমিনদেরকে তুমি (ওদের হাত থেকে) মুক্ত করো। তিনি আরো দোয়া করেন, হে প্রভু! পৃথিবীতে একজন কাফের গৃহবাসীকেও তুমি ছেড়ে দিয়ো না। যদি তুমি ওদের রেহাই দাও, তাহলে ওরা তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করবে এবং ওরা কোন সন্তান জন্ম দিবে না পাপাচারী ও কাফের ব্যতীত।

বলা বাহুল্য, নূহ (আঃ)-এর এই দো‘আ আল্লাহ সাথে সাথে কবুল করেন। এ বিষয়ে সূরা হূদে ৩৭ থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্ত এই ১২টি আয়াত নাযিল হয়েছে। চূড়ান্ত গযব আসার পূর্বে আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে বললেন,
//তুমি আমার সম্মুখে আমারই নির্দেশনা মোতাবেক একটা নৌকা তৈরী কর এবং জালেমদের ব্যাপারে আমাকে কোন কথা বলো না। অবশ্যই ওরা ডুবে মরবে’। ‘অতঃপর নূহ নৌকা তৈরী শুরু করলো। তার কওমের নেতারা যখন পাশ দিয়ে যেত, তখন তারা তাকে বিদ্রুপ করত। নূহ তাদের বলল, তোমরা যদি আমাদের উপহাস করে থাক, তবে জেনে রেখো তোমরা যেমন আমাদের উপহাস করছ, আমরাও তেমনি তোমাদের উপহাস করছি। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে লাঞ্ছনাকর আযাব কাদের উপরে আসে এবং কাদের উপরে নেমে আসে চিরস্থায়ী গযব। 

আল্লাহ বলেন, ‘অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে গেল এবং চুলা উদ্বেলিত হয়ে উঠল, (অর্থাৎ রান্নার চুলা হ’তে পানি উথলে উঠলো), তখন আমি বললাম, সর্বপ্রকার জোড়ার দুটি করে এবং যাদের উপরে পূর্বেই হুকুম নির্ধারিত হয়ে গেছে, তাদের বাদ দিয়ে তোমার পরিবারবর্গ ও সকল  ঈমানদারগণকে নৌকায় তুলে নাও। বলা বাহুল্য, অতি অল্প সংখ্যক লোকই তার সাথে ঈমান এনেছিল। নূহ তাঁদের বলল, তোমরা এতে আরোহণ কর। আল্লাহর নামেই এর গতি ও স্থিতি। নিশ্চয়ই আমার প্রভু অতীব ক্ষমাশীল ও দয়াবান। অতঃপর নৌকাখানি তাদের বহন করে নিয়ে চলল পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গমালার মাঝ দিয়ে। এ সময় নূহ তার পুত্রকে (ইয়ামিনকে) ডাক দিল- যখন সে দূরে ছিল, হে বৎস! আমাদের সাথে আরোহণ করো, কাফেরদের সাথে থেকো না। সে বলল, অচিরেই আমি কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব। যা আমাকে প্লাবনের পানি হতে রক্ষা করবে। নূহ বললো, আজকের দিনে আল্লাহর হুকুম থেকে কারো রক্ষা নেই, একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন সে ব্যতীত।  

এমন সময় পিতা-পুত্র উভয়ের মাঝে বড় একটা ঢেউ এসে আড়াল করল এবং সে ডুবে গেলো। অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হলো, হে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে ফেল (অর্থাৎ হে প্লাবনের পানি! নেমে যাও)। হে আকাশ! ক্ষান্ত হও (অর্থাৎ তোমার বিরামহীন বৃষ্টি বন্ধ কর)। অতঃপর পানি হ্রাস পেল ও গযব শেষ হলো। ওদিকে জুদি পাহাড়ে গিয়ে নৌকা ভিড়লো এবং ঘোষণা করা হলো, যালেমরা নিপাত যাও’। ‘এ সময় নূহ তার প্রভুকে ডেকে বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমার পুত্র তো আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, আর তোমার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য, আর তুমিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফায়ছালাকারী। 

আল্লাহ বললেন, হে নূহ! নিশ্চয়ই সে তোমার  পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চয়ই সে দুরাচার। তুমি আমার নিকটে এমন বিষয়ে আবেদন করো না, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই। আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি যেন জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। নূহ বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমার অজানা বিষয়ে আবেদন করা হতে আমি তোমার নিকটে পানাহ চাচ্ছি। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর ও অনুগ্রহ না কর, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। বলা হলো, হে নূহ! এখন (নৌকা থেকে) অবতরণ করো আমাদের পক্ষ হতে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি সহকারে তোমার উপর ও তোমার সঙ্গী দলগুলির উপর এবং সেই (ভবিষ্যৎ) সম্প্রদায়গুলির উপর- যাদেরকে আমরা সত্বর সম্পদরাজি দান করব। অতঃপর তাদের উপরে আমাদের পক্ষ হতে মর্মান্তিক আযাব স্পর্শ করবে।//

এখানে উল্লেখ্য যে খুব সম্ভবত নূহ আ. -এর জাতির লোকেরা নৌকা সম্পর্কে ধারণা রাখতো না। অর্থাৎ নূহ আ. জানতেন না নৌকা কী? এবং এটা কীভাবে বানাতে হয়। তাই নূহ আ.-কে বলা হয়েছে আমাদের নির্দেশনা মোতাবেক নৌকা বানাও। মুফাসসীররা নানান বর্ণনা থেকে দাবী করেন স্বয়ং জীবরাঈল আ.-এর নির্দেশনায় মুসলিমরা নূহ আ.-এর নেতৃত্বে নৌকা তৈরি করে। আর এই আজব জিনিস দেখে কাফিররা উপহাস ও ব্যঙ্গ করতো মুসলিমদের।

নূহ আ. অনুসারী কতজন ছিলো তা নিয়ে কুরআন কিছু বলে না। আল্লাহ বলেন, তারা ছিল অতি নগণ্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে ইবনে আব্বাস রা. দাবি করেন তাদের সংখ্যা ছিল চল্লিশ জন পুরুষ ও চল্লিশ জন নারী। প্লাবনের পর মসুল নগরীর যে স্থানটিতে তারা আবার বসবাস শুরু করেন তার নাম হয় সামানুন বা আশি।  

এখানে জুদি পাহাড়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ পাহাড়টি আজও ঐ নামেই পরিচিত। এর অবস্থান এখন তুরস্কে। তুরস্ক ও ইরাক সীমান্তে মসুলের পাশে এটি অবস্থিত। বস্তুত এটি একটি পবর্তমালার  অংশ  বিশেষের নাম। এর অপর এক অংশের নাম ‘আরারাত’ পর্বত। প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে যে, ইরাকের বিভিন্ন স্থানে উক্ত কিশতীর ভগ্ন টুকরা সমূহ অনেকের  কাছে সংরক্ষিত আছে। যা বরকত মনে করা হয় এবং বিভিন্ন রোগ-ব্যধিতে আরোগ্যের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো যে, নূহের পুত্র কাফিরদের দলভুক্ত হওয়ায় মহাপ্লাবনে ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু নূহের স্ত্রী সম্পর্কে এখানে কিছু বলা হয়নি। ইবনে কাসির বলেন, এতে স্পষ্ট হয় যে, তিনি আগেই মারা গিয়েছিলেন। তিনি গোপনে কুফরি পোষণ করতেন ও কাফিরদের সমর্থন করতেন। নূহের স্ত্রী ও লূত্বের স্ত্রী স্ব স্ব সঙ্গীর নবুয়াতের উপরে বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে খেয়ানত করেছিল বলে স্বয়ং আল্লাহ অন্য সূরায় বর্ণনা করেছেন। নবীদের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কুফরির কারণে তারা জাহান্নামবাসী হয়েছেন। সম্ভবত মহাপ্লাবনের সময় নূহের স্ত্রী জীবিত ছিলেন না। সেকারণ গযবের ঘটনা বর্ণনায় কেবল পুত্র ইয়ামিনের কথা এসেছে। কিন্তু তার মায়ের কথা আসেনি।

যাই হোক এভাবে নূহ আ. এর জাতি ধ্বংস হলো। পৃথিবী আবার ঈমানদার পদচারণায় মুখরিত হলো। নূহ আ. এর সন্তানেরা ঈমানের সাথে সারা পৃথিবী আবাদ করলেন।