২১ মে, ২০২৬

বিএনপি’র ঋণখেলাপী গভর্নর ও মাত্র তিন মাসেই ভঙ্গুর অর্থনীতি

 

যেকোনো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং খাত। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সামগ্রিক আর্থিক খাতের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দলীয় সংকীর্ণতার কারণে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা দেশের আর্থিক খাতে অন্যায় হস্তক্ষেপ ঘটে, তবে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদের ওপর ব্যাংক খাতের ওপর আমানতকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা নির্ভর করে। অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তখন আর্থিক খাতের সংস্কার ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি মব বা উশৃঙ্খল জনতাকে ব্যবহার করে তাকে জোরপূর্বক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এভাবে অপসারণ করার ঘটনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

ড. মনসুরের অপসারণের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি অতি সংবেদনশীল ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি শুধু ক্ষমতাসীন দলের সরাসরি অনুসারীই নন, বরং একজন চিহ্নিত ঋণখেলাপি। ব্যাংকিং নিয়মানুযায়ী যেখানে একজন সাধারণ ঋণখেলাপি কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা হারান, সেখানে একজন বড় ঋণখেলাপিকে পুরো দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক বা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া চরম অনৈতিক এবং আইনি কাঠামোর পরিপন্থী। এই নিয়োগের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

দেশের অর্থনীতি যখন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণের শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু নতুন গভর্নর ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় আইএমএফ-এর শর্তসমূহ অপূরণীয় থেকে যায়। দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ কেবল কিছু বাড়তি টাকা নয় বরং এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘সার্টিফিকেট’ বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো কাজ করে। যখন আইএমএফ অর্থ ছাড় স্থগিত করে, তখন বিশ্বব্যাংক বা এডিবির (ADB) মতো অন্যান্য সংস্থাও সতর্ক হয়ে যায়।

ক। রাজস্বখাত সংস্কারে ব্যর্থতা (Failure in Tax/Revenue Reform)
আইএমএফ-এর অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও (Tax-to-GDP Ratio) বা কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করা, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল কর জালের সম্প্রসারণ এবং এনবিআর (NBR)-এর অটোমেশন বা আধুনিকায়ন। কিন্তু নতুন গভর্নর ও সরকার এই সংস্কারে হাত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের আয় বাড়েনি এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে হয় টাকা ছাপাতে হচ্ছে, না হয় চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।

খ। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার না করা (Lack of Structural Banking Reforms)
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ (NPL) কমিয়ে আনা, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সঠিক নীতিমালা তৈরি এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার শর্ত দিয়েছিল আইএমএফ। কিন্তু সংস্কারের পরিবর্তে নতুন গভর্নর নিজেই একজন ঋণখেলাপি হওয়ায় এবং ব্যাংকের শীর্ষ পদে দলীয় লোক বসানোর ফলে আইএমএফ-এর ব্যাংকিং সংস্কার এজেন্ডা সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়।

গ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার না করা (Failure to Withdraw Subsidies)
আইএমএফ-এর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ভর্তুকিমুক্ত করে বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, যাতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমে। সরকার এখানে একটি ‘উভয়সংকট’ বা পলিসি প্যারালাইসিসে পড়েছে—ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়ে, আর ভর্তুকি বজায় রাখলে আইএমএফ-এর শর্ত ভঙ্গ হয়। সরকার কার্যকর কোনো মধ্যপন্থা বা বিকল্প বের করতে না পারায় শর্তটি অপূরণীয় থেকে গেছে।

ঘ। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করতে না পারা (Failure in Market-based Exchange Rate)
ডলারের দাম কৃত্রিমভাবে ধরে না রেখে সম্পূর্ণ বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্ত ছিল আইএমএফ-এর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই এখানে হস্তক্ষেপ করে ডলারের দর বেঁধে দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, তখনই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হুন্ডি চ্যানেলে চলে গেছে। বৈধ পথে ডলার আসা কমে যাওয়ায় এই শর্ত পূরণে ব্যর্থতা অর্থনীতিকে আরও বড় ধাক্কা দিয়েছে।

নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বৃহত্তম শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-এর ওপর আঘাত আসে। কোনো যৌক্তিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ এবং রেমিট্যান্স আহরণে নেতৃত্ব দেওয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় এমন জোরপূর্বক পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতের ভেতরে তীব্র আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

আর্থিক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে একীভূত হওয়া ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংক থেকে তুলতে পারছে না। নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে গ্রাহকরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাংকের সামনে গ্রাহকদের এই বিক্ষোভ ও হাহাকার দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ব্যাংকিং খাতে এস আলম গ্রুপের মতো লুটেরা চক্রের পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ফলে গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংক থেকে একযোগে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নিতে শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। একটি ব্যাংকের জন্য এত বিপুল পরিমাণ লিকুইডিটি বা তারল্য একবারে চলে যাওয়া ব্যাংকটিকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে লুটপাট ও বিদেশে পাচার করার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর (যেমন: এস আলম গ্রুপ) নাম বারবার সামনে এসেছে। নতুন গভর্নরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক এই চিহ্নিত লুটেরা ও ঋণখেলাপিদের হাতে পুনরায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকানা হস্তান্তরের অপচেষ্টা চালায়। এমনকি পূর্বে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক নিয়মবহির্ভূত ও অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংকিং খাতে পুনরায় পুনর্বহাল ও নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপর মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়।

ব্যাংকিং খাতের এই চরম অরাজকতা ও তারল্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার ও টাকার সংকটের কারণে দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এলসি (লেটার অফ ক্রেডিট) খুলতে না পারায় একদিকে যেমন কলকারখানার কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।

মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়া ও দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া অবস্থা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং বেদনাদায়ক রূপ। সামষ্টিক অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কস্ট-অফ-লিভিং ক্রাইসিস’ (Cost-of-Living Crisis), যা সরাসরি সাধারণ মানুষের হাড়গোড় ভেঙে দেয়। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় পণ্য বা কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি (LC) খুলতে পারছেন না। বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। গ্যাস, ডিজেল এবং এলপিজির দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ভাড়া একলাফে অনেক বেড়ে গেছে। খেত থেকে একটি সবজি ট্রাকে করে বাজারে আনা বা ফ্যাক্টরিতে পণ্য উৎপাদন করা সবখানেই খরচ বাড়ায় চূড়ান্ত ভোক্তাকে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেট ও সুশাসনের অভাব: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা এবং সরকারের নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটছে।

“আয় বাড়েনি এক পয়সাও, কিন্তু খরচের খাতা দ্বিগুণ।” মুদ্রাস্ফীতি যখন দুই অঙ্কের ঘরে (Double-digit) পৌঁছায়, তখন মানুষের জমানো টাকার মান কমে যায়। গত বছর যে টাকা দিয়ে পুরো মাসের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে ১৫ দিন চলাও দায়। দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া অবস্থার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তাদের খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, মাংস, ডিম বা দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। যখন মানুষ তার মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) মেটাতে হিমশিম খায়, তখন সমাজে অপরাধ প্রবণতা, হতাশা এবং সরকারের প্রতি ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে।

একটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে আর্থিক খাতের সুশাসন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক স্বার্থে এবং দলীয় ও ঋণখেলাপি ব্যক্তি মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর করার মাধ্যমে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শীর্ষ ব্যাংকগুলোর আমানত শূন্য হওয়া, লুটেরা গোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা দেশের জাতীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকিং খাতকে অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং যোগ্য ও স্বাধীন পেশাদারদের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব

 

পাকিস্তান আমল থেকেই বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টা চলে আসছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনাকালে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে স্পষ্টভাবে বলা হয়: "রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ আলাদা করার বিষয়টি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৭২ সালে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হয়। 

সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে আলাদা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। তদুপরি ১৯৭৪ সালে বাকশাল গঠনের প্রাক্কালে পুরো আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি তথা শেখ মুজিব নিজের কাছে নিয়ে নেয়। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। বিচার বিভাগ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রপ্রধানের একটি অস্ত্র। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হলেও এই মূল ক্ষমতা আর সুপ্রিম কোর্টকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। 

এরপর ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান। প্রেসিডেন্ট জিয়া সেনাশাসক হওয়ায় কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ছিলো। নানান পক্ষ থেকে দাবি উঠেছিল বিচার বিভাগকে পৃথক করে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার। অতঃপর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এক সামরিক ফরমানের (Proclamation Order) মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সাথে "সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে" শব্দগুলো যুক্ত করা হয়। এটা ছিল আসলে একটা আইওয়াশ।

এরপর এরশাদের শাসন আসে। হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ও খালেদা নেতৃত্বাধীন বিএনপি বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি জানায়। কিন্তু এরশাদ কর্ণপাত করে না। 

এরপর আসে খালেদা জিয়ার শাসন। ১৯৯১ সালে এই প্রথম বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শাসন পায়। সবাই ভেবেছিলো, এতোদিন খালেদা যে দাবিগুলো নিয়ে মাঠে ছিল সেগুলো এবার বাস্তবায়িত হবে। না, হলো না। খালেদার শাসনামলেও বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি খালেদা বাস্তবায়ন করে নি। কেয়ারটেকার সরকারও মানে নি খালেদা। অথচ এটা ছিল ৯১ এর নির্বাচনের আগে খালেদার ওয়াদা। ১৯৯৪ সালে জেলা জজ ও জুডিশিয়াল এসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন বিভাগ পৃথকীকরণের জন্য একটি মামলা করেন। 

১৯৯৬ সালে খালেদার বেঈমানির প্রতিবাদে মানুষ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনে। ধুর্ত হাসিনাও বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি মানতে চায়নি। ১৯৯৯ সালে হাসিনার আমলে মাসদার হোসেনের মামলার রায় দেওয়া হয়। সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে "নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ" নিশ্চিত করার যে কথা বলা আছে, এই রায়ের মাধ্যমে সেটিকে কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। হাসিনা ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকলেও আদালতের নির্দেশ মানে নি। 

অতঃপর ২০০১ সালে এলো কেয়ারটেকার সরকার। প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ অধ্যাদেশ করতে চাইলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামীলীগ সরাসরি বিরোধীতা করে। তারা বলে এটা রাজনৈতিক সরকারের এখতিয়ার। বিএনপি সফটলি বাধা দেয়। খালেদা জিয়া লতিফুর রহমানকে এই অধ্যাদেশ করার ক্ষেত্রে বিরত থাকতে বলেন। একইসাথে জাতির কাছে ওয়াদা করেন, তিনি ক্ষমতায় এলে মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করবেন। 

কিন্তু খালেদা ২য় বারের মতো জনগণের সাথে বেঈমানি করলেন। বিএনপি সরকার জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করে বিষটিকে ঝুলিয়ে রাখলেন। তিনি বিচার বিভাগ থেকে আলাদা করার ব্যপারে বার বার আদালত থেকে সময় চেয়েছেন। জামায়াত সেসময় তাদের সহযোগী সংগঠন ল'ইয়ার্স কাউন্সিল দিয়ে সরকারকে চাপ দিলেও প্রকাশ্যে মাসদার হোসেন মামলার রায় ঝুলিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে কোনো বক্তব্য বিবৃতি দেয়নি। 

২০০১-২০০৬ মেয়াদে মাসদার হোসেন মামলার রায় ঝুলিয়ে রাখার যে রাজনৈতিক দায় চারদলীয় জোট সরকারের ওপর বর্তায়, জামায়াতে ইসলামী সেই সরকারের অংশ হিসেবে সেই দায়ের অংশীদার। তবে খালেদা জিয়া কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ করেছেন যা অসদাচার।

২০০৭ সালে এলো সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) সংশোধন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করেন।  

২০০৭ সালের ১ নভেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পরিচালিত হচ্ছেন। তবে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ (যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত) এখনো বহাল থাকায় বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।

২০০৯ সালে হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৮ সালের সেই সামরিক ফরমানের রূপটিকেই সংবিধানে পাকাপোক্ত করা হয়, যা আজ পর্যন্ত বহাল আছে। এখানে মজার বিষয় হলো, হাসিনা ৭২ এর সংবিধানে ফিরতে চায় কিন্তু সেই সংবিধানের 'বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে' এটা মানতে চায় না। এক্ষেত্রে সেনাশাসক জিয়ার পদ্ধতিই তার বেশ পছন্দ। 

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির সম্পূর্ণ ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি পৃথক 'জুডিশিয়াল সেক্রেটারিয়েট' বা বিচারিক সচিবালয় গঠন করতে হবে এই দাবি উঠেছে। খালেদা জিয়া নিজেই আবার এই দাবি তুলেছে। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের নিয়ন্ত্রণ নেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ড. মুহাম্মদ ইউনুস মাসদার হোসেন মামলার রায় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য কমিটেড ছিলেন। ২৪ সালের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগ আলাদা করার উদ্দেশ্যে বহুল আকাঙ্খিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এটার জন্য দীর্ঘদিন খালেদা জিয়া আন্দোলন করেছিলেন। 

২০২৬ সালের ১৯ মে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান (হতে চাওয়া স্বৈরাচার) খালেদা জিয়ার দাবির ফসল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে আইন মন্ত্রনালয়ের অধীনে নিয়ে আসেন। ১৯ মে বিচার ব্যবস্থার ওপর কালো দিন নেমে এলো। যেভাবে ১৯৭৪ সালে ফ্যসিস্ট মুজিব বিচার বিভাগকে গ্রাস করেছিলে তারেক রহমান তারই অনুসরণ করেছে। 


৮ মে, ২০২৬

শাপলা গণহত্যার আদ্যোপান্ত, পর্ব ০৪


 মাহমুদুর রহমান গ্রেপ্তার হলেন সেদিনই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভুজপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের একাংশের মিছিলে অন্য অংশের লোকেরা হামলা চালায়। ৪/৫ খুন হয়। অনেক মোটরসাইকেল গাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। স্বভাবতই এর দায়ও এসে পড়ে জামায়াতের ওপর।


ভুজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন জামায়াতের। নাম তার শফিউল আলম নূরী। ঘটনা ঘটার পর নূরী ভাই সারাক্ষণ পুলিশের সাথে ছিলেন। উদ্ধারকাজে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ আসে নূরী ভাইকে এরেস্ট করার জন্য। ঠিক তখন নূরী ভাই ওসির সাথে বসে ছিলেন। সারা রাত ওসির রুমে আটকে রাখা হয়। পরদিন কোর্টে চালান করে ও কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

কারাগারে শফিউল আলম নূরী ভাইয়ের সিট বরাদ্দ হয় আমার ওয়ার্ডে অর্থাৎ হালদা ১৮ তে। আহ! হাসি খুশি নূরী ভাই। কয়েকদিন পর রিমান্ডের কল আসলো। ভুজপুরের ঘটনার জন্য নূরী ভাইকে কারাগার থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি অফিসে নিয়ে গেলো। আমরা সবাই আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে গেলাম। ভাইকে যাতে ফেরত পাই। এটা সে সময় যখন রিমান্ডে গেলে অনেকে আর ফেরত আসতো না। ক্রসফায়ারের শিকার হয়ে শাহদাতবরণ করতো। মোশাররফ ভাই নামে সীতাকুন্ডণ্ডের আমার এক জেলমেটকে পুলিশ এভাবে খুন করে।

যাই হোক, ৩ দিন পর আমরা আবার নূরী ভাইকে ফেরত পেলাম। কিন্তু নূরী ভাই শেষ। এমন কোনো অত্যাচার নেই যা তার ওপর চালানো হয় নাই। যেন আবু গারিব কারাগারের টর্চার শেলে ছিলেন নূরী ভাই। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নূরী ভাই যেন স্বীকারোক্তি দেয়, তার নেতৃত্বেই লীগের মিছিলে হামলা হয়েছে। শত নির্যাতনেও নূরী ভাই মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেন নি।

৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ সফল হওয়ায় ডাইনী হাসিনা সরকার বুঝেছে গণজাগরণ মঞ্চ এখন আর তার জন্য সুবিধার কিছু না। ধীরে ধীরে গণজাগরণ মঞ্চ ছোট হয়ে আসছে। তাদের মিটিং-এ এখন জনসাধারণের চাইতে সাংবাদিক বেশি।

এদিকে হেফাজতে ইসলাম সারাদেশে সমাবেশ করে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই বিশাল বিশাল সমাবেশ করে যাচ্ছে। সব বিভাগীয় সমাবেশ ও বড় সমাবেশে আল্লামা শাহ আহমদ শফি যোগ দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি হেলিকপ্টারে করে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটেছেন ১৩ দফার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য।

সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল। আল্লামা শাহ আহমদ শফি জোর দাবি জানাচ্ছেন চলমান সংসদেই ১৩ দফা পাশ করাতে হবে। নইলে ৫ মে ঢাকা অবরোধ করা হবে। আর সেই অবরোধ কঠিন অবরোধ হবে।

হাসিনা সরকার ইসলামপন্থীদের মধ্যে আস্থা আনার ট্রাই করলো। আসিফ মহিউদ্দিনসহ কয়েকজন ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারকে আটক করেছে। গণজাগরণ মঞ্চ তাদের মুক্তির জন্য কর্মসুচি দিয়েছে কিন্তু তাতে মানুষ আসে নি।

যেসব ইসলামপন্থীরা এতোদিন গণজাগরণ মঞ্চ-এর সাথে একাত্মতা করেছিলো তারাই এখন গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে বড় বড় সমাবেশ করা শুরু করলো। চট্টগ্রামের মাজারপন্থী সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তারাও চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের ফাঁসীর দাবিতে সমাবেশ করেছে। এদের মাঠে নামিয়ে সরকার মূলত হেফাজত থেকে সাধারণ মানুষকে আলাদা করতে চেয়েছে।

আর কওমিদের মধ্যে হাসিনা সরকারের গুটি হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তো ছিলই। সারাদেশের জনসাধারণ তাদের ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের দালাল হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। তবে হেফাজতের নেতৃত্ব পর্যায় থেকে চরমোনাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বরিশালে চরমোনাই হেফাজতের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে। সেখান থেকে পীর রেজাউল করিম বলেন, যারা আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে, তারা বিএনপি - জামায়াতের দালাল।

চরমোনাইয়ের এক নেতা নাম আতিকুর রহমান নান্নু, তিনি একটি পুস্তিকা লিখেন। নাম 'হে আল্লাহ, পীর সাহেব চরমোনাইকে কবুল করো'। এই বইয়ে হেফাজতের বিরুদ্ধে বিষোধগার করা হয়েছে। চরমোনাই কর্মীরা সব হেফাজতের সমাবেশে এই পুস্তিকা বিতরণ করেছে যাতে সাধারণ মানুষ হেফাজতের মিটিং-এ না আসে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিতে থাকলো। মির্জা ফখরুলসহ বেশ ক'জন নেতাকর্মীকে আটক করে হাসিনা। প্রতিবাদে দুদিনের হরতাল করে জোট। আর জামায়াতের সাথে প্রতিদিনই কোন না কোনো জেলায় সংঘর্ষ লেগেই ছিলো। জেলাভিত্তিক হরতাল দিতে থাকে জামায়াত।

সেই দিনগুলোতে প্রথম আলোসহ সব পত্রিকা হরতাল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে থাকে। বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছে তাদের একটা কমন প্যাটার্ন আছে। তারা তাদের বইয়ের এক পৃষ্ঠায় লিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মতো অসহায়, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর পরের পৃষ্ঠায় লেখে বাংলাদেশ স্বাধীন একদিনে হয় নাই। আমরা ১৯৬৫ সাল থেকেই এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। অস্ত্রের ট্রেনিং নিয়েছি। বোমা বানানো শিখেছি। ভারতে গিয়ে রক্ত শপথ করেছি। হাইস্যকর!!

তো বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোও একই কাজ করতো হরতাল নিয়ে। প্রথম আলো বেশ ক'দিন ১ম পৃষ্ঠায় লিখেছে, হরতালের কোনো প্রভাব নেই। রাজধানীতে তীব্র যানজট, শেয়ারবাজার চাঙ্গা, অর্থনীতি চাকা সচল ইত্যাদি। আবার ভেতরের পৃষ্ঠায় লিখতো, হরতালে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে দিচ্ছে বিএনপি জামায়াত। দেশ আগাতে পারছে না হরতালের কারনে। কোনটা ঠিক?

২৪ তারিখ রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ে। শত শত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এতে রাজনৈতিক উত্তাপ কিছুটা কমে। গণজাগরণ মঞ্চ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যায়। হেফাজতের সমাবেশ চলতে থাকে। হেফাজতকে নিউট্রাল করার জন্য ২৮ এপ্রিল হাসিনা বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপের প্রস্তাব দেয়। খালেদা জিয়া সংলাপের শর্ত দেন কেয়ারটেকার সরকার। হাসিনা বলে, এটা আদালতের বিষয়, তার নাকি কিছু করার নেই। কয়েকদিন সংলাপ নিয়ে আলোচনা হয়ে এর অবসান হয়।

হেফাজতের ঢাকা অবরোধ ছিল ৫ মে। ৫ মে তাদের কর্মসূচি ছিলো ভোর থেকে ঢাকার ৬ টি প্রবেশমুখ অবরোধ করবে। বিকেলে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করবে। তাদের কর্মসূচি সফল করতে তার আগের দিন ৪ মে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিলো ১৮ দলীয় জোট। বিশাল সেই সমাবেশে সারাদেশ থেকে লোক জড়ো করে জামায়াত। বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্যে ঘোষণা করেন, আমরা ৪৮ ঘন্টার সময় দিলাম। যদি এর মধ্যে কেয়ারটেকার সরকারের দাবি না মানা হয়, তবে আমরা রাজধানীর যে কোনো স্থানে বসে পড়বো।

৫ মে অবরোধ শুরু হলো। বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশ ও যুবলীগের সাথে হেফাজতের সাথে সংঘর্ষ হয়। বেলা ১২ টা পর্যন্ত প্রায় ৬ জন শাহদাতবরণ করে। শাপলায় হেফাজত নেতাদের আসতে বাধা দেয় ডিজিএফআই। আল্লামা শফি লালবাগ মাদ্রাসা থেকে বের হয়েও আবার ফিরে গেলেন। লাখো মানুষ অপেক্ষা করছিলো শাপলা চত্বরে। তাদের দাবি ছিলো, আল্লামা শফি যদি শাপলায় না আসেন তবে তারা রাস্তা ছাড়বেন না।

এদিকে বিএনপি অপেক্ষা করছিলো ৬ তারিখের। যদি ৫ তারিখ হেফাজত কাম জামায়াত শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসুচি চালিয়ে নিতে পারে তবে তারা নয়া পল্টনে অবস্থান কর্মসূচি নিবে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেলো লোমহর্ষক গণহত্যা। রাত ১২ টার পর পুলিশ শাপলা চত্বর ঘিরে শুয়ে বসা থাকা হাজার হাজার মানুষের ওপর ব্রাশফায়ার করে। তার আগে মতিঝিল এলাকার বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। সমস্ত সাংবাদিকদের সরিয়ে দেয়। তারপরও গণহত্যার বেশকিছু ফুটেজ প্রচার করে দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি। ভোর ৪ টার দিকে সেই দুইটি টিভি বন্ধ করে দেয় হাসিনার সন্ত্রাসীরা।

গণহত্যায় অংশ নেয় ৫৭১২ জন পুলিশ সদস্য, ১৩০০ র‍্যাব সদস্য এবং ৫৭৬ বিজিবি সদস্য। দেড় লক্ষ রাউন্ড গুলি করা হয়। ৮০ হাজার টিয়ার শেল ছোঁড়া হয়। ১৫ হাজার রাউন্ড শটগানের গুলি করা হয়। ১২ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। রাবার বুলেট ছোঁড়া হয় ৬০ হাজার রাউন্ড। ৩৫০ রাউন্ড রিভলভারের গুলি করা হয়। মাদ্রাসা ছাত্র, সাধারণ মানুষ, জামায়াত-শিবির কর্মীরা প্রায় ৩০০ জনের বেশি শহীদ হন। আহত হন প্রায় ১০ হাজার। শহীদদের মধ্যে ৯৩ জনের নাম পাওয়া গেছে, বেওয়ারিশ দাফন হয়েছে ২২৯ জন।

আমি তো ছিলাম চট্টগ্রাম কারাগারে। 'হালদা বিল্ডিং' ছিল একেবারে সীমানা প্রাচীরের সাথে। আমরা ছিলাম ৫ম তলায়। তাই আমাদের ওয়ার্ডের টেলিভিশনে ডিস কানেক্ট হয়ে যেত। আমরা এন্টেনার সাথে এক্সট্রা কেবল লাগিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দিতাম। ফলে মোটামোটি সব চ্যানেল ধরা পড়তো। অন্যান্য ওয়ার্ড বিটিভি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো।

আমরা সারাদিন দিগন্ত টিভি চালিয়ে বসে ছিলাম। রাত ৯ টার পর থেকে জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের টিভি বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলো। ফজরের সময় উঠে দেখি দিগন্ত টিভিতে সরকারি লোক এসেছে বন্ধ করতে। চোখের সামনে দিগন্ত টিভি হারিয়ে গেলো।

৬ মে, ২০২৬

শাপলা গণহত্যার আদ্যোপান্ত, পর্ব ০৩


২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি দারুণ কাজ করতে সক্ষম হয়। 

হেফাজতের উত্থানের সাথে সাথে জামায়াত বিপদ থেকে বেঁচে যাচ্ছে এটা তারা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এদিকে আওয়ামী লীগও বুঝেছে শাহবাগীরা মিডিয়ায় স্ট্রং হলেও আপামর জনগণ তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। অতএব ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোকে হাতে রাখতে হবে। 

২২ তারিখের হেফাজতের কর্মসূচিতে দেশের মানুষের ঢল দেখে চরমোনাই এর বিহিত করতে চেয়েছে। তারা কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে জামায়াতবিরোধী জোট গঠন করার চেষ্টা শুরু করে। সেই চেষ্টা সফল হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি। জামায়াত ও হেফাজতকে সাইড করে 'ঈমান ও দেশরক্ষা আন্দোলন' নামে নতুন এক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। 

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন করে এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহসভাপতি ও ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমির মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী এ জোটের আহ্বায়ক। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, 'আমরা সম্পূর্ণ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শবিরোধী।' তিনি জানান, আজ বৃহস্পতিবার জামায়াতের ডাকা হরতালেও তাঁদের জোটের সমর্থন নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস (ইসহাক), খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান), নেজামে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলন ও খেলাফতে ইসলামী এই জোটের অংশ হয়। মোটকথা তারাও শাহবাগবিরোধী তবে তারা এক ছাতার নিচে থাকবে না, কারণ তাতে জামায়াতের উপকার হয়ে যাবে। 

যদিও এই জোট সুবিধা করতে পারে নি, তবে এই জোটের উদ্যোগ নেওয়ায় পুরো আওয়ামী শাসনামলে চরমোনাই পীর সুবিধা পেয়ে এসেছেন এবং তারা বাংলাদেশে মোটামোটি প্রভাব রাখার মতো বড় দলে পরিণত হতে পেরেছে। এই সুযোগ নিয়ে যখন তারা তাদের প্রশ্রয়দাতা আওয়ামী লীগের সাথেই ক্ষমতার চ্যালেঞ্জে গিয়েছে আওয়ামী লীগ ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে।      

যাই হোক, ২২ ফেব্রুয়ারি হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভের পর সারাদেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। পুলিশের গুলিতে প্রতিদনই জামায়াত-শিবিরের কেউ না কেউ শহীদ হচ্ছিলেন। 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আল্লামা সাঈদীকে ফাঁসীর রায় দেওয়া হয়। রাজধানী ছাড়া দেশ পুরোটাই কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাওহীদবাদী লক্ষ লক্ষ মানুষ সারাদেশে নেমে পড়ে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে খুন করে। এটা এতবড় ঘটনা ছিল যে, চরমোনাই জোট অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। 

জামায়াত চেয়েছিলো, বিএনপি এই অবৈধ ও প্রহসনমূলক রায়ের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেবে। এজন্য জামায়াত বেগম জিয়াকে অনুরোধও করেছে। আল্লামা সাঈদীর রায়ের ব্যাপারে বিএনপি মন্তব্য করতে রাজি হয় নি, রিজভী আহমেদ বলেছেন, আমরা রায়ের বিষয়ে কোনো কথা বলবো না, এটা আদালতের বিষয়। তবে বিএনপি সারাদেশে পুলিশী গণহত্যার বিরুদ্ধে বোল্ড স্টেটমেন্ট দিয়েছে।

১ মার্চ ২০১৩ তারিখে বেগম জিয়া সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগকে হুঁশিয়ার করে বলেন, গণহত্যা চালালে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই সংবাদ সম্মেলনে ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়া আর সব কথা বলেছেন বেগম জিয়া। তিনি শাহবাগের মব কালচারের বিরুদ্ধে, ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে, আল্লাহ তায়ালা ও নবী সা.এর অবমাননার বিরুদ্ধে শক্ত কথা বলেছেন। জামায়াত বিরুদ্ধে চলা হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে হরতালের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু গণহত্যা বন্ধ করেনি শেখ হাসিনা। এই গণহত্যা চলে ৬ মার্চ পর্যন্ত।   

আমি তখন ছিলাম চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরের হাসপাতালে। মার্চের ১ম সপ্তাহে প্রতিদনই অনেক ভাই গুরুতর আহত অবস্থায় কারাগারে এসেছেন। কার হাত ভাঙ্গা, কারো পা, বেশিরভাগ ভাইয়ের মাথা ফাটা। কোনো কোনো ভাই এতো ভয়ানকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যে, তাদের চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজেই ছিলাম অসুস্থ। শুধু দোয়া করা ছাড়া কোনো কিছুই করার সামর্থ ছিল না।  

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী নেতা রফিউর রাব্বির ছেলে ত্বকীকে কেউ খুন করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই নিয়ে শুরু হয় মিডিয়া ট্রায়াল। জামায়াত শিবিরের ডজন খানেক নেতাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় এই মামলায়। পরে আওয়ামী আমলেই প্রমাণ হয়, এই খুনে শামীম ওসমানের সন্ত্রাসীরা জড়িত। এভাবে সংঘর্ষময় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিজেদের কোন্দলের হিসাব নিকেশ করে জামায়াতের ওপর দায় দিয়ে দিত।   

আল্লামা সাঈদীর রায়ের পর হেফাজতে ইসলাম ১১ মার্চ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ৬ এপ্রিলের ঢাকামুখী লংমার্চ।   

এই লংমার্চ ঘিরে চলেছে নতুন উত্তেজনা। প্রতিদিনই সংঘর্ষ হচ্ছিলো। গণজাগরণ মঞ্চের কেন্দ্র ছিল শাহবাগ। আর হেফাজতের কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। হেফাজত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা মানে গণজাগরণ মঞ্চ দখল করতে আসা। এমন সিনারিও তৈরি হয়েছিলো। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ২২ ঘন্টার অবরোধ দিয়েছে। বাম দলগুলো হরতাল আহবান করেছে। সকল পরিবহন আওয়ামী চাপে হরতালের সমর্থনে গাড়ি বন্ধ রেখেছে। 

স্থানে স্থানে আওয়ামী গুন্ডাদের সাথে হেফাজতের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছিলো। সব বাধা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, গুলি উপেক্ষা করে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল মতিঝিল শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নানান বাধার পরও মুফতি আহমদ শফি মহাসমাবেশে উপস্থিত হন এবং লাখো মানুষের সামনে ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করেন। এটাই ছিল হেফাজতের ঐতিহাসিক ১৩ দফা।   

১৩ দফাতে যা ছিলো, 
১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা।
২. আল্লাহ্, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস।
৩. কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।
৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
৬. সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৭. মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।
৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।
৯. রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
১১. রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা।
১২. সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।
১৩. অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।  

এই ১৩ দফা ঘোষিত হওয়া, লং মার্চ সফল হওয়া ইত্যাদি কর্মকান্ডে পাগল হয়ে গেছে সেক্যুলার সমাজ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, এতোটাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়েছে তারা ঢাবি ভিসি আআমস আরেফিন সিদ্দিকী সাংবাদিকদের স্টেটমেন্ট দিচ্ছে, ১৩ দফা দাবি মেনে নেওয়া হবে না। মনে হচ্ছে যেন এটা তার দায়িত্ব! 

যাই হোক, পুরো বিষয়ের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা মাহমুদুর রহমানকে দায়ি করে। নানান নাটক করে ১১ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ও ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়। তার ওপর চলতে থাকে ভয়াবহ নির্যাতন... 

৫ মে, ২০২৬

শাপলা গণহত্যার আদ্যোপান্ত, পর্ব ০২

 

এদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে আমাদের ওপর নতুন জুলুম শুরু হয়েছে। ডাক্তার নামের আওয়ামী লীগের কিছু পান্ডা, তারা চাইছিলো না আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। আমরা ৪/৫ জন গুরুতর আহতরা চিকিৎসাধীন ছিলাম। ডা. সৌম্য বিশ্বাস নামে এক পান্ডা আমাদের হাসপাতাল থেকে বের করে কারাগারে পাঠিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিলো।

একদিকে শরীরের যন্ত্রণা, অন্যদিকে এইসব জুলুমে রাজনীতির দিকে নজর দিতে পেরেছি কম। আসন্ন কারাগার কেমন হবে তা তো কিছুই জানি না। অজানা ভয় কাজ করছিলো। কারাগারের অভিজ্ঞতা নিয়ে আতাউর রহমান সরকার ভাইয়ের লেখা একটি বই ছিলো। আম্মু সেখান থেকে পড়ে পড়ে আমাকে কারগারের বিভিন্ন বিষয় অবহিত করছিলেন। অবশেষে ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা হাসপাতাল ছেড়ে কারাগারে যেতে বাধ্য হই।

কারাগারে যাওয়ার পর আমি হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফি'র লেখা সেই খোলা চিঠি পড়ার সুযোগ পাই।

শাহ আহমদ শফী তার খোলা চিঠিতে বলেন,

"জাতির আবেগ-অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নাস্তিক ও ইসলামের দুশমনরা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করে ইসলামের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। দেশব্যাপী বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, ব্যভিচার ছড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের ঈমান-আমল ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংসে নতুন আরেক ষড়যন্ত্র শুরু করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হাজারবার হোক, তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে আলেমসমাজ, মাদ্রাসা, দাড়ি-টুপি, পর্দা তথা দ্বীন-ইসলামের বিরুদ্ধে যে কোন ষড়যন্ত্রে এদেশের আলেমসমাজ ও তৌহিদী জনতা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে ইসলাম, মুসলমান, নামাযী, দাড়ি-টুপিধারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সকল অপতৎপরতা বন্ধের আহবান জানান।"

খোলা চিঠির শুরুতে শাহবাগ আন্দোলনে ১৪ টি ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। যথা:

১. শাহবাগে অগ্নিপূজক ও পৌত্তলিকদের অনুকরণে মুসলমানদের সন্তান সন্ততিদের দ্বারা মোমবাতি প্রজ্বলন।
২. নামাজের সময়সহ দিনরাত অনবরত মাইকে গান বাজনা।
৩. জাগরণ মঞ্চের মূল উদ্যোক্তা আসিফ মহিউদ্দীনসহ স্বঘোষিত নাস্তিকদের ব্লগে আল্লাহ ও রাসূল স. তথা ইসলাম সম্পর্কে চরম অবমাননাকার ব্লগ লেখা ও জঘন্য মন্তব্য।
৪. নারী-পুরুষের উদ্দাম নৃত্য, অবাধ যৌনাচার, অশ্লীলতা, মদ, গাজা সেবন ইত্যাদি অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
৫. মক্কা মদিনার ইমাম ও খতিবদের বিশেষ পোশাক কোবা পরিয়ে ফাঁসির অভিনয়।
৬. শাহবাগ চত্বরের মঞ্চ থেকে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও দেশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে হত্যার হুমকি ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ।
৭. দাড়ি-টুপি পরিহিত ব্যক্তির গলায় রশি বেঁধে রাসূলের সুন্নাত ও ইসলামের প্রতীকসমূহের অবমাননা।
৮. কোমলমতি শিশুদের দিয়ে অপরাধ প্রবণতামূলক স্লোগান শিক্ষা দেয়া।
৯. বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশের আবহমান ইসলামি সংস্কৃতির বিপরীতে ভারতীয় সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রদর্শনী।
১০. সব ধরনের ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের উস্কানি দিয়ে দেশকে অনিবার্য সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়া।
১১. গভীর রাত পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থানকারী তরুণ-তরুণীদের অবাধ মিলামিশা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে।
১২. সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি দেয়া সত্ত্বেও শাহবাগ চত্বর নিয়ে এক শ্রেণীর গণমাধ্যমে দৃষ্টিকটু ও সীমা ছাড়ানো মাতামাতি।
১৩. রাজধানীর বারডেম ও বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও রাস্তা বন্ধ করা অমানবিক পদক্ষেপ।
১৪. স্বঘোষিত নাস্তিক ব্লগারদের ইসলাম অবমাননার প্রমাণ/প্রতিবেদন তুলে ধরে দেয়া পোস্ট/লেখা প্রকাশ করার কারণে সম্প্রতি নিরপেক্ষ অনেক ইসলামী ব্লগ সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে কাদিয়ানী উত্থানের অভিযোগ এনে আল্লামা শফি বলেন,
"যুদ্ধাপরাধের বিচার মূলত রাজনৈতিক ইস্যু হওয়ায় আমরা সে সম্পর্কে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দিই নাই। কিন্তু অনুসন্ধানে আমরা খুঁজে পেয়েছি। একই মঞ্চে ঘাদানিক নেতা, নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী শাহরিয়ার কবীর এবং আহমদিয়া মুসলিম জামায়েত (কাদিয়ানী) নায়েবে আমীর আব্দুল আওয়াল খান পাশাপাশি বসে অনুষ্ঠান করেছে। বর্তমান যুদ্ধাপরাধের বিচারের পেছনে কাদিয়ানীরাও পরোক্ষভাবে বামপন্থী ও সরকারি সমর্থনে সক্রিয় রয়েছে। বামপন্থী শাহরিয়ার কবীরের মতো মুশরিক ও মুরতাদরা একদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, আর অন্যদিকে কাদিয়ানীদের মতো মুরতাদ সংগঠনকে সাথে নিয়ে ইসলাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তাদের এ অবস্থান সম্পূর্ণ স্ববিরোধী।"

খোলা চিঠিতে ইসলাম অবমাননাকারী অনলাইন চক্রের উল্লেখ করে বলা হয়েছে,
"মুক্তমনা একটি চরম ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকদের ওয়েবসাইট। এ ওয়েবসাইটে ইসলাম ও মহানবী (স.) সম্পর্কে কটূক্তি ও নানা ধরনের অবমাননাকর পোস্ট দেওয়া হয়। শাহবাগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ ওয়েবসাইটটি এখন আরো বেপারোয়া হয়ে উঠেছে। মুক্তমনার বিভিন্ন পেইজে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। মুক্তমনা “আগামী নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলের অংশগ্রহণ বাতিল কর- মুক্তমনা” এ ধরনের ইসলাম বিরোধী নানা স্লোগান বড় করে লেখা রয়েছে। আর মুক্তমনাকে যাবতীয় সাহায্য ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

এই পতিত সংগঠনটি মুক্তমনা ওয়েবসাইটকে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের কারণে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক-২০০৭’ পুরস্কার প্রদান করেছিল। মুক্তমন ই-বুকে অবিশ্বাসের দর্শন, বিবর্তনের পথ ধরে, সমকামিতা, যে সত্য বলা হয়নি, ইসলাম ও শরিয়া প্রভৃতি বই পাওয়া যায় যেগুলো ইসলাম কোরআন ও মহানবী (স) -এর চরিত্র সম্পর্কে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ও অশ্লীল কটূক্তিতে ভরা। সেই মুক্তমনার সাথে সংশ্লিষ্ট মুরতাদ নাস্তিকরাই বর্তমান শাহবাগ নাটকের মূল কেন্দ্রে রয়েছে। শাহবাগের পেছনে যেসব ব্লগার ও অ্যাক্টিভিটিস্ট রয়েছে তাদের মধ্যে রাজীব আহমেদ একজন। ব্লগার ‘থাবা বাবা’ ছদ্মনামে থাকা তার পোস্টগুলোতে সে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে ‘মোহাম্মক’ বলে ব্যঙ্গ করেছে। মোহাম্মকের সফেদ লুঙ্গী, ঢিলা ও কুলুখ, সিজদা, মদ ও মোহাম্মকসহ অসংখ্য এমন সব অশ্লীল পোস্ট পাওয়া যায় যেগুলো মহানবী (স.)-এর বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইউরোপীয় ব্যঙ্গচিত্রকেও হার মানায়।

ব্লগার আরিফুর রহমান ইংল্যান্ডে থাকেন, বর্তমানে লিখেছেন ওস্কার ও বিভিন্ন ‘নিক' নামে (সামহোয়্যার ইন ব্লগ)। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম স্ট্রাটেজি ফোরামের নেতা। আরেকজন নাস্তিক ব্লগার নিঝুম মজুমদারের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দেন। শাহবাগ আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা আসিফ মহীউদ্দিন এখন বাংলাদেশের উদীয়মান নাস্তিক হুমায়ুন আজাদ। শাহবাগ নাটকের অন্তরালে তৎপর তথাকথিত অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস্টদের মধ্যে অন্যতম হলো চরম ইসলাম বিদ্বেষী প্রসিদ্ধ ব্লগ সামহোয়্যার ইন-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্লগাররা।"

শাহবাগ আন্দোলনে নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে আল্লামা শফি বলেন,
"শাহবাগের তথাকথিত জাগরণ মঞ্চে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন ইসলাম ও দেশবিরোধী অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবীর, বিশিষ্ট বাম বুদ্ধিজীবী মুনতাসীর মামুন, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মূর্তি স্থাপনের নেপথ্য নায়ক জাফর ইকবাল, ফতোয়া নিষিদ্ধের রায় প্রদানকারী সাবেক বিচারপতি গোলাম রব্বানী, হিন্দু নাস্তিক অজয় রায়, বাম ঘরানার চিহ্নিত কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ, ইসলামবিরোধী নারীনীতি প্রণয়ন ও সংবিধান থেকে 'আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' বাক্যটি বাদ দেয়ার নেপথ্যে সক্রিয় ব্যক্তিরাই শাহবাগ নাটকের পৃষ্ঠপোষক ও মূল কুশীলব।"

এই চিঠিতে সরকারের প্রতি ৪টি দাবি জানানো হয়। যথা:
১. সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান সব আন্দোলনের প্রতি যেভাবে ব্যাপক সহানুভূতি প্রদর্শন করছে অনুরূপভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে ইসলাম অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, দাড়ি-টুপি, পর্দা-হিজাব প্রভৃতি ইসলাম প্রতীক অবমাননার মাধ্যমে বিরাজিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. প্রকাশ্য রাজপথে দাড়ি-টুপিধারী পথচারীকে অপমান করার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারপূর্বক অবিলম্বে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় তাওহীদি জনতার গণজমায়েত, সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং ও গণঅবস্থানের গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির যেকোনো কর্মসূচীতে কোনো বাধা দেয়া যাবে না। অন্যথায় দেশের লাখো মুসলিম জনতা সকল বাধা অতিক্রম করে ঈমান-আক্বীদা ও ধর্মীয় প্রতীকসমূহের মর্যাদা রক্ষায় সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

চিঠির শেষে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল্লামা শফি বলেন,
"দেশের সর্বস্তরের মুমিন - মুসলমান জনগণের উদ্দেশে আমরা বলতে চাই শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বিচার না করে; বিশেষ কোনো দল / গোষ্ঠীর পক্ষে - বিপক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সরলীকরণে না গিয়ে, এর অর্ন্তর্নিহিত রূপ ও চরিত্র অনুধাবন করুন। শাহবাগ চত্বরের কথিত জাগরণ মঞ্চের বিগত দুই সপ্তাহের কার্যক্রমকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেছে-এটা মোটেও স্বাধীনতার স্বপক্ষ - বিপক্ষের লড়াই নয়। এবং দলমতের উর্ধ্বে উঠে নিজের ঈমান, আক্বীদা-বিশ্বাস ও ইসলামের প্রতীকসমূহের হেফাজতের পক্ষে সোচ্চার ও জোরালো ভূমিকা রাখুন। নাস্তিক, মুরতাদ ও ইসলামবিরোধী অপশক্তির আস্ফালনের বিরুদ্ধে সারা দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলুন।"

আল্লামা শাহ আহমদ শফির এক চিঠিতে সারাদেশে ইসলামপন্থীদের ঐক্য তৈরি হলো। তারা ইসলাম রক্ষায় আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। ব্যাতিক্রম ছিল ফরিদ উদ্দিন মাসুদ এবং চরমোনাই। শোলাকিয়ার ইমাম ফরিদ উদ্দিন মাসুদ লজ্জাহীনভাবে শাহবাগী নাস্তিকদের সাথে সম্পৃক্ত হলেন।

চরমোনাই-এর পীর রেজাউল করিম রাজনৈতিক মানুষ। তিনি বুঝতে পেরেছেন হেফাজতের এই তৎপরতায় ইসলামের সাথে সাথে জামায়াতও বিপদ বেঁচে যাবে। তাই তারা হেফাজতে ইসলামের সাথে একাত্মতা করেন নি। তবে তাদের অবস্থান শাহবাগ বিরোধীই ছিলো। কিন্তু চরমোনাইয়ের বেশ কিছু নেতা কর্মী ফউ মাসুদের সাথে গিয়ে শাহবাগে নাস্তিকদের সাথে একাত্ম হয়েছে। সেখানে থেকেছে। নাচ-গান ও অশ্লীলতার মধ্যে গিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে, আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে শ্লোগান তুলেছে।

হেফাজতে ইসলামের এই উত্থানে হালে পানি পায় জামায়াত। জামায়াতের কর্মীরা তখন হেফাজতের কর্মীতে পরিণত হয়। দলমত নির্বিশেষে আল্লামা শফি ইসলামপন্থীদের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন।

হেফাজতে ইসলামের উত্থানের পর জনমত ঘুরে যেতে থাকে। ফলে বিএনপিও কথা বলার মওকা পায়। ২০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি'র মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শাহবাগের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতে কথা বলেন। তিনি বলেন, সরকার শাহবাগে ভেলকিবাজী শুরু করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপি'র আরেক সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ বলেন, জোর করে বিচার আদায় করা যায় না।

হেফাজতের ১ম কর্মসূচি ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার। আর সেদিন জুমআর নামাজের পর শাহবাগে আল্লাহর রাসূলের অবমাননার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ছিল। চট্টগ্রাম বাদে বাইতুল মোকাররমসহ বাংলাদেশের সব স্থানে হেফাজতে ইসলামের মিছিলে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। বেশ কয়েকজন শাহদাতবরণ করেন। বাইতুল মোকাররম পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।

হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া দেখে বিএনপি তার দোদুল্যমনতা পরিহার করে। তারা সরাসরি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২২ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশি হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি'র আরেক সিনিয়র নেতা মরহুম মওদুদ আহমেদ বলেন, বিএনপি সারাদেশে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে 'গণতন্ত্র মঞ্চ' প্রতিষ্ঠা করবেন।

২২ ফেব্রুয়ারি যদিও জামায়াতের বেশ ক'জন শাহদাতবরণ করে, শত শত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়, হাজার হাজার এরেস্ট হয় তারপরেও জামায়াত হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। জামায়াত তার মিত্রদের কাছে পায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, জামায়াতের বিরুদ্ধে টানা পনের দিনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির পর জামায়াতের পক্ষে দেশের মানুষ কথা বলতে শুরু করে। শাহবাগের আন্দোলনকারীদের জামায়াত ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা বিভিন্ন ব্লগে আল্লাহ তায়ালা ও নবী রাসূলদের বিরুদ্ধে অশ্লীল কথা বলায় শাহবাগ আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষ।

শাপলা গণহত্যার আদ্যোপান্ত, পর্ব ০১


২০১৩ সালে যখন শাপলা চত্বরে গণহত্যা হয় তখন আমি চট্টগ্রাম জেলে। কারাগারে থাকলেও হেফাজতের ঘটনা প্রবাহ একেবারেই আমাদের চোখের সামনে ছিলো। হেফাজতে ইসলামের এই ঘটনাক্রমের সাথে জামায়াতে ইসলামী ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মূলত মহান মনিব জামায়াতকে বিপদমুক্ত করতেই হেফাজতে ইসলামকে দৃশ্যপটে হাজির করেছিলেন। এটা ছিল মহামহিম আল্লাহ তায়ালার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলাম প্রাসঙ্গিকতার শুরু ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখ। সেদিন শহীদ কাদের মোল্লা রহ.এর যাবজ্জীবন রায় দেয় তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আমি তখন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম-এর ছাত্র। সেদিন আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করি। বিক্ষোভে আবিদ ভাই, ইমরান ভাইসহ শত শত ভাই গুলিবিদ্ধ হয়। আবিদ ভাই ও ইমরান ভাই শহীদ হয়ে যান। আমিসহ অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এরেস্ট হই।

মুরাদপুরে পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস আমাকে এরেস্ট করে দুই পায়ে গুলি করে। সম্ভবত চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় মারাত্মক সংঘর্ষ হয়। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে বিকেল থেকে জমায়েত হতে থাকে রাম ও বামপন্থীরা। মূলত কমিউনিটি ব্লগগুলোতে ইমরান এইচ সরকার সবাইকে শাহবাগে আসার জন্য আহবান করে। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগাররা জমায়েত হতে থাকে। তাদের দাবি ছিলো, যেভাবেই হোক কাদের মোল্লা রহ.-কে ফাঁসী দিতে হবে।

মূলত এটি ভারতের একটি পরিকল্পনা। ভারত যখন দেখেছে মিথ্যা অভিযোগ এনে জামায়াত নেতাদের ফাঁসী দেওয়া যাবে না, তখন তারা আওয়ামী এক্টিভিস্ট দিয়ে এই আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটিয়েছে। তাদের দাবি ছিলো, বিচার চাই না, ফাঁসী চাই। আওয়ামী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যে জমে ওঠে। অন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য 'গণজাগরণ মঞ্চ' নামে কমিটি গঠিত হয়।

শাহবাগে হাজার হাজার মানুষ রাতদিন অবস্থান করতে থাকে কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবিতে। অল্প সময়ের মধ্যে জামায়াত রাজনীতিতে মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সকল মিডিয়া ও সরকারের প্রচারের কারণে জামায়াত গণমানুষের রোষানলে পতিত হয়। আমাদের প্রধান জোট সঙ্গী বিএনপি আমাদের পক্ষে ভূমিকা রাখা তো দূরের কথা, একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি আমাদের পক্ষে। আমরা সত্যিকারভাবে একা হয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল আমরা আর এদেশে রাজনীতি করতে পারবো না।

গণজাগরণ মঞ্চের কুশীলবরা সবাই ইসলামবিদ্বেষী। ফলে তারা সমানভাবে জামায়াত ও ইসলামকে অপমান করতে শুরু করলো। এতে সুবিধা হলো আমাদের। কওমি মাদরাসাগুলোতে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হতে থাকলো।

এদিকে ভারত ভেবেছিলো গণজাগরণ মঞ্চের সাথে জামায়াতের নিয়মিত সংঘর্ষ হবে। কিন্তু তা হয়নি। আসলে জামায়াত ঘটনা প্রবাহের আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গিয়েছে। হুট করে জামায়াতের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া জনমত কীভাবে মোকাবেলা করবে তার কোনো তাল খুঁজে পায় না জামায়াত। তারা নিজেদের পরিণতি নিয়ে আল্লাহর কাছে সমর্পন করে।

আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন ছিলাম। প্রথমত দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছি হাসপাতালে। শুধু পা নয়, পুলিশের এলোপাথাড়ি পিটুনিতে সারা শরীর একটা বিষের টুকরা। দ্বিতীয়ত অপপ্রচারের ও মিথ্যার মাধ্যমে আমাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়ে গেছে। এই দুই কষ্টে বুকটা খাঁ খাঁ করতো। হাসপাতালের বেডে পড়ে পড়ে আল্লাহর কাছে শুধু এই দোয়াই করতাম, আল্লাহ তুমি মুজিজা দিয়ে আমাদের উদ্ধার করো। তোমার কুদরত দেখাও।

আমি আমার আগের অনেক লেখায় জানিয়েছি এদেশের জঙ্গী কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত। ভারত ভেবেছিলো শিবির বনাম গণজাগরণ মঞ্চ সংঘর্ষ হবে, আর সেই সংঘর্ষ কেন্দ্র করে যদি গণজাগরণ মঞ্চের কেউ মারা যায় তবেই তাদের আন্দোলন আরো জনপ্রিয় হবে। কিন্তু কিংকর্তব্যবিমুঢ় জামায়াত তেমন কিছুই করে না। অতঃপর তারা তাদের পরিচালিত জঙ্গীদের কাজে লাগিয়ে এক অখ্যাত ব্লগার রাজিব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করে। এখানে একটা কথা গুরুত্বপূর্ণ যে, চরমপন্থী কার্যক্রমের সাথে রুট লেভেলে যারা যুক্ত তারা ইসলামকে ভালোবেসেই কাজ করে। কিন্তু তাদের যারা পরিচালনা করে তারাই মূল সন্ত্রাস। যাই হোক, এই ঘটনা ঘটেছে ১৫ ফেব্রুয়ারি।

লাশ নিয়ে মিছিল সমাবেশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন আরো বেগবান হয়। আমরা ভয় পেতে থাকি, সিনিয়র নেতাদের হত্যা করবে ৭১ এর বানোয়াট ইস্যু দিয়ে। তরুণ নেতাদের এখন রাজিব হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে হত্যা করা হবে। বেগম খালেদা জিয়া তো আগে থেকেই চুপ। ইসলামপন্থীদের মধ্যে যারা আমাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো তারাও রাজিব হত্যার পর সেইফ সাইডে চলে গেছে। আমরা আরো কোণঠাসা হয়ে গেলাম। আগে তো ছিলাম একাত্তরের খুনী। এখন রানিং খুনীতে পরিণত হলাম।

কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ভিন্ন। নিহত ব্লগার রাজিবের আল্লাহ তায়ালা, নবী সা. ও ইসলাম নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল লেখা ফাঁস হয়ে গেলো। বিভিন্ন ব্লগে ও ফেসবুকে ইসলামপন্থীরা প্রচার করতে লাগলো। দৈনিক আমার দেশ ও নয়া দিগন্ত রাজিবের সেই অশ্লীল লেখা ফাঁস করে জনগণকে জানিয়ে দিলো। আল্লাহ তায়ালা শাহবাগীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে দিলেন। আস্তে আস্তে শাহবাগের উপস্থিতি কমতে থাকে।

আমার দেশ পত্রিকা ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমান দারুণ ভূমিকা রাখে আমাদের পক্ষে জনমত তৈরিতে। মাহমুদুর রহমান বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় সফর করে তাদেরকে ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হতে অনুরোধ করেন।

এরপর এলো ১৯ ফেব্রুয়ারি। হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী এক খোলা চিঠি লিখলেন গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে। আমার দেশ, নয়াদিগন্ত ফলাও করে ছাপলো সে চিঠি। সারাদেশে এর প্রভাব হলো ব্যাপক।

জামায়াত এই চিঠি লাখ লাখ কপি ছাপিয়ে সারাদেশে বিতরণ করলো। জনমত ঘুরে গেলো। হেফাজতে ইসলাম ও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ মুখোমুখী হয়ে গেলো। ইসলামপন্থী ও ইসলামবিরোধী এই দুই বাইনারিতে বিভক্ত হয়ে গেলো দেশ। আল্লাহ তায়ালা জামায়াতকে তার কঠিন অবস্থা থেকে বের করে আনলেন। দেশের মানুষ আবার জামায়াতের প্রতি সিম্পেথাইজড হয়ে গেলো।


৬ সেপ, ২০২৫

২৫ টি পয়েন্টে মুহাম্মদ সা.-এর জীবনী

 


১. রাসূল সা.-এর জন্ম ও শৈশব
তাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম। হাশেমের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে নবীজীর বংশ হাশেমি বংশ হিসেবে পরিচিত। মুহাম্মদ সা. এর জন্ম ৫৭০ সালে, হস্তী বাহিনী ধ্বংসের বছর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ৬ মাস পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সফররত অবস্থায় মদিনায় ইন্তেকাল করেন । সে সময়ের ঐতিহ্য অনযায়ী সম্ভান্ত আরব পরিবারের সন্তানদেরকে অন্য গোত্রে লালন-পালন করতে দেওয়া হত। সে হিসেবে নবী করীম সা. বনী সা‘দ গোত্রে লালিত- পালিত হন এবং চার অথবা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন।

২. জন্মের সময় কিছু অলৌকিক ঘটনা 
তাঁর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে বায়তুল্লাহ আক্রমণকারী ইয়ামানের শক্তিশালী বাদশাহ আবরাহা তার সৈন্যসহ সমূলে ধ্বংস হয়েছিল। মক্কায় তখন মহা দুর্ভিক্ষ চলছিলো, তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে আসার সাথেই দুর্ভিক্ষ অবসান হয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া যমযম কূপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর মা জননী আমেনা বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ তার পেটে অবস্থান নেয়ার সাথেই সারা বিশ্বে আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল, যার সাহায্যে তিনি সুদূর সিরিয়ার রাজ প্রাসাদসমূহ পরিস্কার দেখতে ছিলেন। এমনিভাবে আরো অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটতেছিল। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করলেন, মক্কায় তখন ভূ-কম্পনের দ্বারা মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জ্বিনদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে পারস্য সম্রাটের রাজমহলে ভূ-কম্পনের আঘাতে রাজমহলের ১৪ টি স্তম্ভ ধ্বসে পড়েছিলো।

৩. বক্ষ বিদীর্ণ হওয়া 
রাসূল সা.-এর যখন চার কি পাঁচ বছর তখন তাঁর কাছে জিবরাঈল আ. এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিন্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্হানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন তাঁর খেলার সাথী শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, "মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে"। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি"। এটি ছিলো তাঁর প্রথম বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা।

গবেষকদের মতে, মোট চার বার রাসূল সা. এর বক্ষ বিদারণ হয়।
ক। হালিমার গৃহে অবস্থান কালে চার বছর বয়সে।
খ। ১০ বছর বয়সে।
গ। হেরা পর্বতের গুহায় ১ম ওহী নাজিলের সময়
ঘ। মিরাজের রাতে।

৪. মায়ের মৃত্যু ও দাদা-চাচার তত্ত্বাবধান 
নবী করীম সা.-এর মা আমেনা মদিনা মুনাওয়ারায় নিজ স্বামী আব্দুল্লাহ এর কবর যিয়ারতের পর ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মাঝে অবসি'ত আবহাওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। তখন নবী মুহাম্মদ সা. এর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। মাতা-পিতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। দাদার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিলেন। দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তখন তার বয়স ছিল আট বছর। তিনি চাচাকে বকরি লালন-পালন ও শাম দেশের ব্যবসায়ে সহযোগিতা করতেন।

৫. বিয়ে এবং সন্তানাদি 
পঁচিশ বছর বয়সে খাদীজা রা.-কে বিবাহ করেন। একমাত্র ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর সব কয়টি সন্তান খাদীজার রা. এর গর্ভ থেকেই হয়েছে। কাসেম তাঁর প্রথম সন্তান। এর নামেই তাঁর উপনাম আবুল কাসেম। অতঃপর যয়নব, রূকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা ও আব্দুল্লাহর জন্ম হয়। তাঁর ছেলেরা সকলেই বাল্য বয়সে মারা যান। মেয়েদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে হিযরত করার সুযোগ পান। ফাতেমা রা. ব্যতীত তাদের সকলেই নবীজীর জীবদ্দশায় মারা যান। তিনি নবীজীর ইন্তেকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। খাদিজা রা. কে ছাড়াও নবীজি আরো দশজনকে বিবাহ করেন। তাঁরা হলেন, সওদা বিনতে যাম‘আহ, আয়েশা বিনতে আবুবকর, হাফসাহ বিনতে উমার, জয়নব বিনতে খুযায়মা, উম্মে সালামাহ, জয়নব বিনতে জাহশ, জুওয়াইরিয়া বিনতুল হারেছ, উম্মে হাবীবাহ রামলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান, সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখত্বাব, মায়মুনা বিনতুল হারেছ।

৬. ওহী নাযিলের সূচনা 
তিনি মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। জিবরাইল আ. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে অবতরণ করেন। সর্ব প্রথম সূরা ‘আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয় : যার অর্থ- পাঠ করূন, আপনার পালন কর্তার নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করূন, আপনার পালনকৃত মহা দয়ালু।যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক:১-৫) ওহী নাজিলের আগেও তিনি ছিলেন চিন্তায় সঠিক, সিদ্ধান্তে নির্ভুল, ব্যক্তিত্বে অনন্য, চরিত্রে শ্রেষ্ঠতর, প্রতিবেশী হিসেবে অতি মর্যাদাবান,সহনশীলতায় সুমহান, সত্যবাদিতায় মহত্ত্বর, সচ্চরিত্র, বদান্যতা, পুণ্যকর্মা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বিশ্বস্ততায় অনুপম আদর্শ। এসব গুণে মুগ্ধ হয়ে তার গোত্র তাঁকে আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত করে।

৭. গোপন দাওয়াত 
আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-কে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচারের আদেশ করেন। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন, হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! ওঠ এবং সতর্ক কর। (সুরা-মুদ্দাসির:১-২)। নবী করীম (সাঃ) স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ যথাযথ পালন করেন এবং গোপনে গোপনে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। যাতে করে কুরাইশদের বিরোধিতা প্রকট না হয়। তিনি সর্বপ্রথম আপন পরিবার- পরিজন ও বন্ধুদের ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম খাদীজা রা. তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক রা., ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে আবু তালিব রা. এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খাদিজা রা.-এর ক্রীতদাস ছিলেন। রাসূল সা. তিন বছর পর্যন্ত নিকটস্থ লোকদের মাঝে ইসলাম প্রচারে গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। তিনি দারূল আরকাম তথা কুরাইশ নেতা আরকাম ইবনে আবু আরকামের বাড়িটি মুসলমানদের সম্মেলনস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন।

৮. প্রকাশ্যে দাওয়াত 
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের আদেশ করলেন- ইরশাদ হচ্ছে, অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়েদিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” (সূরা হিজর : ৯৪), “আপনি নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন।” (সূরা শু‘আরা : ২১৪)। আল্লাহ তাআলার আদেশ পেয়ে নবী মুহাম্মদ সা. তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করেন। অতঃপর তাদেরকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ‘ইবাদত করতে আহ্বান করেন। সমবেত লোকদের মধ্য থেকে তাঁর চাচা আবু লাহাব বলে উঠলো, তোমার ধ্বংস হোক, এ জন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছে? এরপর আবু লাহাব ও তার পরিবার রাসূল সা.-এর উপর নির্যাতনের পূর্ন মাত্রা প্রয়োগ করে। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন, “আবু লাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সহসাই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খেজুরের পাকানো রশি নিয়ে।” (সূরা লাহাব : ১-৫)

৯. ঠাট্টা-বিদ্রূপ, অত্যাচার ও নির্যাতন 
মক্কার মুশরিকরা রাসূল সা.-কে বিভিন্ন উপায়ে উপহাস করত। কখনো কখনো তাকে পাগল ও যাদুকর বলত। আবার কখনো বলত কবি ও গণক। আগন্তুক লোকদেরকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে অথবা কথা শুনতে বাধা দিত। তাঁর চলাচলের রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখত এবং সালাতরত অবস্থায় তাঁর উপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করত। মুশরিকরা তাদের মুসলিম গোলামদের উপর কঠিন নির্যাতন চালাতো। তাদেরকে হাত-পা বেঁধে ভর দুপুরে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে দিত এবং ভারী পাথর দ্বারা তাদের বুক চাপা দিত এবং ছড়ি দ্বারা প্রহার করত ও আগুনের সেঁকা দিত। নির্যাতনের এমন কোন পদ্ধতি নেই যা তারা মুসলমানদের উপর প্রয়োগ করেনি। মুসলমানগণ মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও নিপীড়ন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতেন। কেননা নবী করীম সা. তাদেরকে সাওয়াব ও জান্নাত লাভের আশায় বিপদে ধৈর্য ধারণ ও অনড় থাকার পরামর্শ দেন। মুশরিকদের নির্যাতন ভোগ করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবী হলেন, বিলাল ইবনে রাবাহ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. প্রমূখ । তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন ইয়াসির ও সুমাইয়া রা.। ইসলামের ইতিহাসে এরাই সর্বপ্রথম শহীদ। আবু জাহেল তাদের খুন করে।

১০. হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) হিজরত 
রাসূল সা. কাফেরদের অনবরত নির্যাতনের কারণে সাহাবাগণের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে হাবশাতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন বলে হাবশাকেই হিজরতের জন্যে মনোনীত করা হল। নাজ্জাশী ঈসা আ.-এর অনুসারী ছিলেন। নবুয়্যাতের পঞ্চম বছর প্রথম মুহাজিরদের এ দলে ছিলেন দশ জন পুরূষ ও চার জন মহিলা। তারা কুরাইশদের অজান্তে চুপিসারে হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিছুদিন পর আরো একটি মুহাজির দল তাদের সাথে মিলিত হলেন। পুরুষ, মহিলা, শিশু সহ তাদের মোট সংখ্যাছিল প্রায় একশোজন। বাদশা নাজ্জাশী তাদের সম্মান এবং সুন্দর ব্যবহার করেন পাশাপাশি সেখানে নিরাপদে বসবাস করার অনুমতি দেন।

১১. শিয়াবে আবু তালিবে আটক
মুশরিকরা ভাবলো, বনু হাশিমের সহযোগিতাই মুহাম্মাদ সা. এর শক্তির উৎস। তাই বনু হাশিমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সকলে মিলে বনু হাশিমকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। বয়কট চুক্তি অনুযায়ী সবাই বনু হাশিমের সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। তাদের কিছু কেনা ও তাদের নিকট কিছু বেচা বন্ধ হয়ে যায়। খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বলা হলো, হত্যার জন্য মুহাম্মাদকে তাদের হাতে তুলে না দেয়া পর্যন্ত এই বয়কট চলতে থাকবে।

আবু তালিব বানু হাশিমের লোকদেরকে নিয়ে শিয়াবে আবু তালিব নামক গিরি খাদে আশ্রয় নেন। আবু লাহাব ছাড়া বানু হাশিমের মুসলিম-অমুসলিম সকল সদস্যই মুহাম্মাদ সা. এর সঙ্গী হন। আটক অবস্থায় তাঁদেরকে থাকতে হয় তিন বছর। এই তিন বছরে তাঁদেরেক দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। খাদ্যাভাবে অনেক সময় গাছের পাতা ও ছাল খেতে হয়েছে। শুকনো চামড়া চিবিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের চেষ্টা করতে হয়েছে। পানির অভাবে অবর্ণনীয় কষ্ট পেতে হয়েছে।

তিন বছর পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই বন্দীদশা থেকে তাঁদের মুক্তির পথ করে দেন। বনু হাশিম খান্দানের এই নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট দেখে একদল যুবকের মন বিগলিত হয়। তারা এই অমানুষিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে ছিলো মুতইম ইবনু আদি, আদি ইবনু কাইস, যামআহ ইবনুল আসওয়াদ, আবুল বুখতারী, জুহাইর এবং হিশাম ইবনু আমর। তারা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে আবু জাহালের নিষেধ অমান্য করে বানু হাশিমকে মুক্ত করে আনে। এটা ছিলো নবুয়াতের নবম সনের ঘটনা।

১২. তায়েফ গমন
রাসূল সা.-এর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবের মৃত্যুকে কুরাইশরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। তার উপর নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এ কঠিন পরিস্থিতিতে সহযোগিতা ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তিনি তায়েফ গমন করলেন। কিন্তু সেখানে উপহাস ও দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। তারা রাসূল সা.-কে পাথর নিক্ষেপ করে মারাত্মকভাবে আহত করে। বাধ্য হয়ে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন।

১৩. বিভিন্ন গোত্রের নিকট রাসূল সা.-এর দাওয়াত
রাসূল সা. হজ্বের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের নিকট দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হন। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষা ও দাওয়াতের নিরাপত্তা বিধানে সহযোগিতা কামনা করেন। তবে কোন গোত্রই এতে সাড়া দিল না। কারণ, কুরাইশরা তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে তার নিকট হতে দূরে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। ইতিমধ্যে মদিনার নেতৃস্থানীয় ছয়জন লোক রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুরাইশদের ভয়ে গোপনে তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে মানুষের সাথে ইসলাম সম্পর্কে এবং রাসূল সা.-এর চরিত্র ও দাওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং মদীনাবাসীদের মাঝে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন। ফলে মদিনার অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

১৪. মিরাজের ঘটনা
নবুয়্যাতের একাদশ বছরে মুহাম্মদ সা. প্রথমে কাবা শরিফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন এবং সেখানে তিনি নবীদের জামায়াতে ইমামতি করেন। অতঃপর তিনি বোরাক নামক বিশেষ বাহনে আসীন হয়ে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় তিনি আল্লাহ'র সাক্ষাৎ লাভ করেন। এই সফরে ফেরেশতা জিবরাইল তার সফরসঙ্গী ছিলেন। কুরআনের সুরা বনি ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

১৫. আকাবার শপথ
নবুয়্যাতের দ্বাদশ বছর হজ্জের মৌসুমে বারো জন লোক মদীনা হতে বের হয়ে মিনাতে আকাবার প্রথম বাইআতের সময় রাসূল সা. এর সাথে দেখা করে এবং বাইয়াতে অংশ গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল আকাবাতুল উলা’ প্রথম বাইয়াত বলা হয়। মদীনায় ফিরে যাবার সময় রাসূল সা. তাদের সাথে মুস‘আব ইবনে উমায়ের রা.-কে কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীন শিখানোর জন্য পাঠান।

আকাবার প্রথম বাইয়াতের পরবর্তী বছর নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ বছর হজের মৌসুমে সত্তর জন পুরুষ, দুই জন মহিলা মক্কার উদ্দেশ্যে হজ্জ পালনের লক্ষ্যে মদীনা হতে রওয়ানা হন এবং কুরাইশদের অগোচরে গোপনে মিনাতে রাসূল সা.-এর সাথে সাক্ষাত করেন। আর তারা সকলে রাসূলের চাচা আব্বাস, আবু বকর এবং আলী ইবনে আবু তালিবের উপস্থিতিতে রাসূল সা.-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-আকবাতুস সানীয়াহ’ বলা হয়। এতে তারা জান-মালের বিনিময়ে রাসূল সা.-কে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন। তারা তাঁকে এ মর্মে আশ্বস্ত করলেন যে, তিনি যদি তাদের দেশে তাদের নিরাপত্তায় হিজরত করেন তাহলে তারা স্বাগত জানাবেন।

১৬. হিজরত
কুরাইশরা রাসূল সা.-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তাআলাকে তাঁকে হেফাযত করেন। রাসূল সা. নিজের ঘর থেকে বের হন এবং আল্লাহ তাআলা কাফেরদের চোখ অন্ধ করে দেন যাতে তারা রাসূল সা.-কে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে বন্ধু আবু বকর সিদ্দীক রা. এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর তারা উভয়ে এক সাথেই পথ চলা আরম্ভ করেন। ‘সওর’ নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর রা. তাদের নিকট কুরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন এবং তার বোন আসমা রা. খাদ্য ও পানীয় পৌঁছাতেন। তারপর নবী করীম সা. ও তার সঙ্গী গুহা হতে বের হন এবং ইয়াসরিব (মদিনা) অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।

১৭. মদীনায় নতুন রাষ্ট্রের সূচনা 
রাসূল সা. মদীনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদীনা শরীফে এ মসজিদটি “মসজিদে কু’বা” নামে পরিচিত। মদীনাতে রাসূলুল্লাহ সা. সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হচ্ছে মসজিদে নববী নির্মাণ এবং মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন। এরপর তিনি মদিনার অপরাপর ইহুদী গোষ্ঠীদের সাথে মদিনা সনদের মাধ্যমে সার্বভৌম মদিনা রাষ্ট্র গঠন করেন। এটাই প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র। এখানে রাসূল সা. আল্লাহর আইন ও ইসলামের রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন।

১৮. বদর যুদ্ধ
কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দল সিরিয়া থেকে বিশাল যুদ্ধসামগ্রী কিনে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছে মর্মে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সা. এ ব্যাপারে অবগত হলে সেই কাফেলাকে বাধা দিতে চাইলেন। কারণ ইতিপূর্বে মক্কাবাসীরা মুহাজিরদের সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। ঐ দলনেতা আবু সুফিয়ান রাসূল সা. এর সংকল্পের কথা জানতে পেরে এক লোককে কুরাইশদের নিকট পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদদানের জন্য পাঠালেন। সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা বাণিজ্যিক কাফেলা রক্ষার্থে দ্রুত বের হয়ে আসলো। এদিকে আবু সুফিয়ান আগেই কাফেলাসহ পলায়ন করতে সক্ষম হয় এবং বেঁচে যায়। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যেতে চাইলো কিন্তু কুরাইশ নেতারা বিশেষত আবু জাহেল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং প্রায় এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল মদিনাভিমুখে পাঠায়। নবী সা. পরামর্শ করে মুহাজির ও আনসারগণের নিয়ে গঠিত প্রায় ৩১৩ জনের একটি সেনাদল নিয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে বের হলেন। হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ রামাদান বদর নামক স্থানে উভয় দল মুখোমুখি হয় এবং সেখানেই বদর যুদ্ধ সংঘটিতহয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা মহা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ অনেক গনিমতের সম্পদ লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের মাঝে সেগুলো বণ্টন করে দেন। এ যুদ্ধে মোট সত্তর জন মুশরিক নিহত হয় এবং সত্তর জন বন্দী হয় আর মুসলমানদের শহীদের সংখ্যা মাত্র চৌদ্দজন।

১৯. উহুদ যুদ্ধ 
বদর যুদ্ধে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় এবং নিজেদের বড় বড় নেতা হারিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার পর তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মুসলমানদের পক্ষ হতে হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করে। ফলে তারা পূর্ণ এক বছর যাবৎ সৈন্য ও সম্পদ সঞ্চয় এবং প্রতিবেশী গোত্রীয় মিত্রদেরকে সহায়তা প্রদানের আহ্বানসহ জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজারের অধিক একটি বিশাল সেনাদল গঠন করে।

রাসূল সা.-এর নিকট কুরাইশদের আগমন বার্তা পৌঁছোলে তিনি মুহাজির ও আনসার নিয়ে গঠিত এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য বের হন এবং উহুদ পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থান গ্রহণ করেন। পাহাড় পিছনে রেখে তিনি সৈন্যদের সুসংগঠিত ও বিন্যস্থ করেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে স্থান ত্যাগ না করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন। যুদ্ধের শুরুর দিকে মুসলমানদের জয় হলো এবং মুশরিকরা পিছু হটলো। কিন্তু মুসলিম তীরান্দাজগণ গনিমতের মাল সংগ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের স্থান ত্যাগ করে বসলেন। মুশরিকরা এ সুযোগে তীর নিক্ষেপের স্থানগুলো দখল করে নিলো এবং মুসলমানদের পিছন দিক থেকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। যার কারণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এতে অনেক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে শহীদগণের সরদার হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব রা. ছিলেন। এ যুদ্ধে রাসূল সা.-এর মুখমন্ডল এবং দাঁত মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী সনের তৃতীয় বছর শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ রোজ শনিবার।

২০. খন্দকের যুদ্ধ
মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আচরণের কারণে যে সব ইয়াহুদীদের রাসূল সা. মদীনা হতে তাড়িয়ে দেন তারা মক্কায় কুরাইশদের দলভুক্ত হয়। কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রেরণা জোগায় এবং তাদেরকে জনবল, টাকা-পয়সা ও অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। মদিনার ইয়াহুদীদের পরামর্শ অনুসারে মক্কাবাসী ধন-সম্পদ জোগাড় করতে আরম্ভ করল। কুরাইশরা ও ইয়াহুদীরা তাদের স্বীয় গোত্র ও মিত্রদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানাল। পঞ্চম হিজরিতে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দশহাজারেরও বেশি যোদ্ধা মদিনাভিমুখে রওয়ানা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করা।

রাসূল সা. কুরাইশদের প্রস্তুতি ও প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে সহাবাগণের সাথে পরামর্শ করেন। তারা সিদ্ধান্ত করেন মুসলমানগণ মদিনায় অবস্থান করে প্রতিরোধ করবে। মদিনার উত্তর পার্শ্বের সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় সালমান ফারসী রা. মদিনায় দুশমনদের প্রবেশে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে উত্তর পার্শ্বে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। রাসূল সা. সালমান ফারসী রা. এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মুসলমানগণ পরিখা খনন আরম্ভ করেন এবং রাসূল সা. নিজেই মুসলমানগণের সাথে কাজে অংশগ্রহণ করেন। পনেরো দিনের মধ্যে পরিখা খনন সম্পন্ন হয়। রাসূল সা. মহিলা ও শিশুদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দেন। মুশরিক সৈন্যরা পরিখার অদূরে মদিনার বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের অশ্বগুলো পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। তারা একমাস ধরে মদিনা অবরোধ করে রাখে। অতঃপর তাদের অশ্বারোহীরা নিহত হলে এবং আল্লাহর পাঠানো ঝড়ো বাতাসে তাদের তাঁবু ও সরঞ্জাম লণ্ডভণ্ড হলে তারা পলায়ন করে।

২১. হুদাইবিয়ার সন্ধি 
যষ্ঠ হিজরিতে রাসূল সা. উমরা করার লক্ষ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এ সফরে তাঁর যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা ছিল না। চৌদ্দশত আনসার ও মুহাজির সাহাবি তাঁর সফরের সাথী হন। যখন তারা হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন সকলে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। কুরাইশরা এ সংবাদ জানতে পেরে শপথ করল যে, তারা নবী করীম সা. ও তার সাথীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। রাসূল সা. উসমান রা.-কে কুরাইশদের নিকট এ খবর দিয়ে প্রেরণ করেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য মক্কার দিকে রওয়ানা হননি। বরং তারা শুধুমাত্র উমরার উদ্দেশ্যেই মক্কায় প্রবেশ করতে চান। তারপর তারা আলোচনায় বসার জন্য সম্মত হয়। আলোচনা আরম্ভ হলে তা সন্ধির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এ সন্ধিকেই হুদাইবিয়ার সন্ধি বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয় রাসূল সা. তার উমরা পালনকে এক বছর পিছিয়ে দেবেন এবং দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। আর যে কোন গোত্র তাদের ইচ্ছানুসারে যে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। এ চুক্তির ফলে খোযাআ’ গোত্র মুসলমানদের সাথে মিলিত হল এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিলিত হল। সন্ধি চুক্তিসম্পন্ন হওয়ার পর রাসূল সা. পশু জবেহ করেন এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলেন। মুসলমানগণ তাঁর অনুকরণ করেন। অতঃপর তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে মদিনায় ফেরত আসেন। আল্লাহ তায়ালা এই সন্ধিকে বড় বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

২২. মক্কা বিজয় 
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী সা. বিভিন্ন গোত্রে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেল। এরই মাঝে কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র কবিলায়ে খুযা‘আর উপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল করাইশ এবং তার মিত্ররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল। রাসূল সা. এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্ষুব্দ হন এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে দশহাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করেন।

তখন ছিল হিজরী অষ্টম বর্ষের রমাযান মাস। এদিকে কুরাইশরা রাসূল সা. এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নবী সা.-এর নিকট আসে। রাসূল সা. তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কেননা তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ ভিন্ন বাঁচার আর কোন উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেনাদল (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হয়ে মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করে।

এরপর সমবেত মক্কাবাসীর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমাদের ধারণা? তারা বললো, সহানুভূতিশীল, উদার ও ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ। আপনি মহৎ মহানুভবের ভ্রাতুষ্পুত্র। নবী করীম সা. তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন, তোমরা সকলেই মুক্ত। এরপর মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগলো।

২৩. বিদায় হজ্জ
দশম হিজরী সনে রাসূল সা. মুসলমানদেরকে তাঁর সাথে হজ্জ পালন ও হজ্জের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কা যাবার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে প্রায় এক লক্ষের মত লোক সাড়া দিল। তাঁরা যিলকদ মাসের পঁচিশ তারিখ তাঁর সাথে মক্কা পানে বের হন। বাইতুল্লাহতে পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফাহ অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসূল সা. সেখানে অবস্থান করেন এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করে শুনান- আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে একমাত্র দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

২৪. রাসূল সা.-এর জীবনে যুদ্ধ
রাসূল সা. সর্বমোট তেইশটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে মোট নয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বাকীগুলো শুধু অভিযান হয়েছে। যথা- (১) বদরের যুদ্ধ (২)উহুদের যুদ্ধ, (৩)আহযাবের যুদ্ধ (৪) বনী কুরাইযা যুদ্ধ (৫) মুত্তালিক যুদ্ধ (৬) খাইবার যুদ্ধ (৭) ফাতহে মক্কা যুদ্ধ (৮) হুনাইনের যুদ্ধ এবং (৯) তায়িফের যুদ্ধ। আর রাসূল সা. নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে অপর কাউকে সিপাহসালার নিযুক্ত করে সাহাবায়ে কেরামকে যে জিহাদ অভিযানে প্রেরণ করেছেন,তাকে 'সারিয়্যা' বলে। এ ধরনের যুদ্ধের সংখ্যা ৪৩টি। এসবগুলো যুদ্ধই সংঘটিত হয়েছে হিজরতের পরে দশ বছরে।

২৫. আল্লাহর সান্নিধ্যে 
বিদায় হজ্জ পরবর্তী বছর রাসূল সা. জ্বরাক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রিয় সহধর্মিণী আয়েশা রা. এর ঘরে শয্যাগ্রহণ করেন। রাসূল সা. ৬৩ বছর বয়সে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দুপুরের পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে গমন করেন। অতঃপর খলীফা নির্বাচনের কাজ সমাধা করে ১৪ রবিউল আউয়াল রাতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর গৃহে রাসূল সা.-কে সমাহিত করা হয়।

রাসূল সা.-এর ইন্তেকালে মুসলমানগণ একবারেই নিরাশ ও হতাশ হয়ে যান। এ পরিস্থিতিতে আবুবকর রা. ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করতো তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ সা. আজ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। এরপর নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন : “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরন করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরন করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবেনা। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করবেন।” 
(সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

২৩ জুল, ২০২৫

জুলাই ডায়েরি : ১৮ জুলাই

আজ ১৮ জুলাই।

২০২৪ সালের এই দিনে সারা দেশের আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ঢাবিতে ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সারাদেশের ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় ২৭ জন মানুষ শাহদাতবরণ করে। হাজার হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়।

# ঢাকায় ১৯ জন ও ঢাকার বাইরে ৮ জন শাহদাতবরণ করে। ২৭ জনের মধ্যে ১১ জন ছাত্র।
# রাজধানী সারাদেশ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। ঢাকার ১৯ জনের মধ্যে উত্তরায় ১১ জন শহীদ। উত্তরার একটি মসজিদ থেকে বিপ্লবীরা নামাজের আজানের সময় ঘোষণা দেয় 'হাইয়া আলাল জিহাদ'
# সারাদেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট
# বিক্ষুব্ধ জনতা বিটিভি-তে আগুন ধরিয়ে দেয়
# জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলনের সমর্থনে ৫ দফা দাবি উত্থাপন
# দেশজুড়ে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
# দীপ্ত দে, ফাইয়াজ, তাহমিদ ভুঁইয়া শাহদাতবরণ করে।
# ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ছাত্রদের ওপর হামলা করে।
# মেরুল বাড্ডায় হেলিকপ্টার দিয়ে পুলিশদের উদ্ধার
# জাবি থেকে ছাত্রলীগ ও পুলিশদের হটিয়েছে ছাত্ররা
# পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের বৈঠক।

১৮ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ সারা দেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় গতকাল দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৭ জন শহীদ হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার।

কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের, আবার কোথাও সরকার–সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর বুধবার রাতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। ‘শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও সোয়াটের ন্যক্কারজনক হামলা, খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে’ বৃহস্পতিবার কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচি ঘোষণা করেন তাঁরা। এর সমর্থনে গতকাল দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা।

কোটা সংস্কারের দাবিতে এবার আন্দোলন শুরু হয় গত ৫ জুন। বিরতি দিয়ে জুন মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর টানা আন্দোলন শুরু হয় ১ জুলাই। এটি চলে মূলত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ১৫ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। এদিন হামলা-সংঘর্ষে সারা দেশে নিহত হন ছয়জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। তবে বুধবার সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীরা মেনে নেননি। এর আগে মঙ্গলবার সব স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। বন্ধ করা হয় সিটি করপোরেশন এলাকার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।

গতকাল সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের সময় সংঘাত–সংঘর্ষে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে রাজধানীর মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, পরিবহনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। ঢাকার সড়কে সকালের দিকে কিছু পরিবহন থাকলেও দুপুরের পর ফাঁকা হতে থাকে সব সড়ক। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলছিল।

গতকাল সারা দেশে নিহতদের অনেকে শিক্ষার্থী। তাঁদের শরীরে গুলির চিহ্ন এবং কারও কারও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় মারা গেছেন একজন সাংবাদিক। একই এলাকায় মারা গেছেন আরও পাঁচজন। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী গুলির আঘাতে মারা গেছে ধানমন্ডি এলাকায়।

সকালে উত্তরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করতে গেলে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ, যা চলে দিনভর। এতে রাজধানীর উত্তরার তিনটি হাসপাতাল থেকে ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। রামপুরায় একজন ও আজিমপুরে একজন মারা গেছেন। এ ছাড়া গত বুধবার রাজধানীর দনিয়া এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন ইমরান বাবুর্চি (২৬)। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান তিনি। এদিকে গতকাল রাত ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপুরার ফরাজী হাসপাতালে আরও কয়েকজনের লাশ এসেছে। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।

আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সংঘাত-সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, পথচারী ও সরকার-সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ঢাকার বাইরে সংঘর্ষে সহস্রাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকায় এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

১০ জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ছয় জেলায় সরকারি কার্যালয়, থানা এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা-সংঘর্ষে ৩১ জেলায় পুলিশ-ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১ হাজার ১১১ জন আহত হয়েছেন। ২৭ জনের মধ্যে ছয় জেলায় নিহত হয়েছেন ৮ জন, আটক হয়েছেন ২৪৭ জন।

বিক্ষোভ দমাতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তুতি নিয়ে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। লাঠিসোঁটা, দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অনেক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। লাঠিসোঁটা নিয়ে নামেন আন্দোলনকারীরাও। দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বড় সংঘাতের খবর আসতে থাকে।

রাজধানীর উত্তরা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনভর এসব এলাকা ছিল রণক্ষেত্রের মতো। একপর্যায়ে মেরুল বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির মধ্যে আশ্রয় নেন পুলিশের সদস্যরা। বিকেলে তাঁদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়। সন্ধ্যার সময়ও বিভিন্ন জায়গায় ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।

কয়েক দফায় হামলা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভির কার্যালয়ে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে এখানে। সন্ধ্যা সাতটায় বন্ধ হয় বিটিভির সম্প্রচার। সেতু ভবন, দুর্যোগ ভবন, বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন মারা গেছেন। গতকাল সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আহত ১২০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় আরও অনেকে চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে।

রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করতে দেখা যায়।

চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লার শহরের কোটবাড়ী, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে চট্টগ্রামে ২ জন নিহত ও ৬৩ জন আহত হয়েছেন। কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাত জেলায় অন্তত ৩১০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ২০২ জনকে আটক করা হয়।

বরিশাল সদর, পটুয়াখালীর দুমকি ও বাউফল, জামালপুর সদর, নেত্রকোনার মদন, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী সদর ও সৈয়দপুর এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩২০ জন আহত হন।

রাজশাহীর বাগমারা, নাটোর সদর, পাবনা সদর, জয়পুরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ ও বগুড়ায় কয়েক ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন হামলা চালিয়েছেন। এতে পুলিশের ১৬ সদস্যসহ ৩৭৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়ায় ৩২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময় নাটোরে ১০, পাবনায় ১৫ ও মৌলভীবাজারে কয়েকজন আটক হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে অবরোধ ঘিরে সংঘর্ষের জেরে বিভিন্ন স্থাপনায় তাণ্ডব চালিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সাতক্ষীরা সদর, ময়মনসিংহের ফুলপুর, মাদারীপুর শহর, রংপুর, বগুড়া শহর ও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, থানা, সরকারি কার্যালয় এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

হবিগঞ্জ শহরে পুলিশের সঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রায় চার ঘণ্টার সংঘর্ষে পুলিশের ১৬ সদস্যসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চোখে গুলিবিদ্ধ একজনকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে পুলিশের ২ সদস্যসহ অন্তত ৪১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নায়েব আলী জোয়ারদারের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরায় থানা ঘেরাওয়ের সময় ১৫ জনকে আটক করে পুলিশ।

যশোরের কেশবপুরে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক, রাজবাড়ীতে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী-ফরিদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, ঝালকাঠির রাজাপুরে খুলনা-বরিশাল মহাসড়ক, গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, বরিশালে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক, পঞ্চগড় শহরে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক এবং কক্সবাজারে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক এবং রাঙামাটি ও লক্ষ্মীপুর শহরে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা।

#জুলাই_ডায়েরি