২৬ অক্টোবর, ২০১৫

অন্যরকম ভালোবাসা



রাত পৌনে একটা। জীর্ণ একটি টিনশেড আধাপাকা ঘর। একটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। চালক কয়েকটি পানির বোতল নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। বাড়ির সামনে পাঁচটি ছোট কবর। সেই কবরগুলো ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো ফুলগাছ। চালক হাতের পানির বোতলগুলো থেকে প্রত্যেকটি গাছের গোড়ায় পানি দিতে লাগলেন। পানি দেয়া শেষে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকলেন। কখনো কখনো কবরগুলোতে হাত বুলাতে লাগলেন। এভাবে করতে করতে রাত শেষ হয়ে এলো। মুয়াজ্জিনের আযানে চালক সম্বিত ফিরে পেলেন। দ্রুত খালি বোতলগুলো নিয়ে আবার গাড়িতে উঠলেন। চলতে শুরু করলো গাড়ি। অন্ধকারে চিরে আসা গাড়ি আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 

সায়েমের বাগান করার খুব শখ। বাড়িতে তার বাগান ছিল। কিন্তু ভার্সিটির হলে সে বাগান কই পাবে? তার উপরে সে পড়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। যেখানে মানুষের জায়গা হওয়াই কঠিন, বাগান তো পরের কথা। তারপরও সায়েম বাগান করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। হোস্টেলের ছাদ তালা মারা। ছাদে যাওয়া ভীষন বারণ। কোনভাবেই সে ছাদে বাগান করার অনুমতি পেলনা। অবশেষে সে রুমের বারান্দায় কয়েকটি টব কিনে গাছ লাগায়। এতে তার বাকী রুমমেট দু’জন ভীষন বিরক্ত। তারা আগের মত বারান্দায় আরাম করে বসতে পারেনা। কাপড় শুকাতেও অসুবিধে হয়। মাঝে মাঝে সায়েম গাছগুলোতে পানি দিলে বারান্দা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এতসব অভিযোগের পরও নানানভাবে রুমমেটদের ম্যানেজ করে তার বাগান কার্যক্রম চালাতে থাকে। মাস দুয়েক পর যখন সবগুলো গাছে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটতে থাকে তখন অবশ্য রুমমেটদের অবস্থান পরিবর্তন হয়। সায়েম যখন মাঝে-মধ্যে দেখে তার কোন রুমমেট গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে তখন সায়েমের মন আনন্দে নেচে উঠে। 

ফুলগাছগুলো সায়েমের কাছে শুধুমাত্র গাছ ছিলনা। বরং বলা যেতে পারে সায়েমের বেস্টফ্রেন্ড। সায়েম তাদের সাথে বসে বসে গল্প করে। তাদের গান শোনায়, নিজেও তাদের কাছ থেকে গান শুনে। হুট করে কেউ দেখে ফেললে চমকে উঠে বলে কই আমি কারো সাথে কথা বলছিনা! আমি আপন মনে গান করছিলাম। অনেকে মনে করতো সায়েম বোধহয় মাথার তার দুটা ছিঁড়া। নইলে গাছের সাথে এত কিসের মাখামাখি। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যাপারটা ধোপে টিকতো না। কারণ বাস্তবে সায়েম ছিল অত্যন্ত মেধাবী, বুদ্ধিমান, মানুষের কাছে অতিপ্রিয় সদালাপী একজন মানুষ। 

সায়েম শুধুমাত্র ফুলগাছ নিয়ে পড়ে থাকতো ব্যাপারটি সেরকম কিছু নয়। সে রাজনীতিও করে। দেশ গড়ার রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। জালিম সরকারের কাছে জনপ্রিয় এই ছেলেটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। একদিন রাতে পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। থানায় ভীষণ অত্যাচার চালাতে থাকে সায়েমের উপর। সায়েম অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন। সে চিন্তা করে রেখেছিলো জালিম পুলিশদের কাছে কিছু চাইবেনা। উহ আহ ও করবেনা। দাঁতে দাঁত চেপে একের পর এক নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছিল। ঘন্টা দুয়েক মার খাওয়ার পর সায়েমের মনে হচ্ছে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো পানি... পানি... 

তাকে যে পুলিশটি বেশী মারছিলো তার নাম ঝন্টু। সায়েম অবাক হয়ে দেখলো ঝন্টুই পানি নিয়ে আসলো। ঝন্টু ধীরে ধীরে পানি গ্লাসে ঢাললো। তারপর তাকে পানি না দিয়ে সে নিজে একটু একটু করে চুমুক দিয়ে পানি খেতে লাগলো। এতে সায়েমের তৃষ্ণা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। উপুড় করে সায়েমকে ফেলে অল্প কিছু পানি মেঝে ছড়িয়ে বলে চেটে চেটে খা। সায়েম শুধু আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কিছু বলেনা। এরপর সায়েম একটি চেয়ারে বসানো হলো। হাত-পা চেয়ারের হাতল ও পায়ার সাথে বেঁধে দুই কানে চিমটি দিয়ে বৈদ্যুতিক তার সংযোগ করে বলে। তোকে এখন কারেন্ট শক দিয়ে মেরে ফেলবো। যদি বাঁচতে চাস তবে তোর সঙ্গীদের ঠিকানা দে। সায়েম কিছু বলেনা। কেবল চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। সুইচ অন করে ঝন্টু। ঝাড়া তিরিশ সেকেন্ড। সায়েম ফুসফুস যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম। পুরো মুখে সব রক্ত জমে গিয়েছে। সায়েম লক্ষ্য করে তার মুখ শুকনো খটখটে হয়ে গিয়েছে। আর টিকতে পারেনা। তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। 

হঠাত সায়েম লক্ষ্য করে তার বারান্দার প্রিয় সব ফুলগাছ। তার একান্ত বন্ধু। সবাই দৌড়ে আসছে। আলমান্ডা আর হাসনাহেনা ভীষন জোরে নড়ে নড়ে বাতাস করতে থাকে। শিউলি বেলী আর টগর মিলে কুড়ানো পাতা সব উড়িয়ে সায়েমের মুখের সামনে ধরে আর সেখান থেকে নিঃসৃত হতে থাকে পাতার রস। আহা! কি মধু কি মিষ্টি। সায়েমের সব যন্ত্রনা মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যায়। হুট করে আবার জ্ঞান ফেরে সায়েমের। অবাক হয়ে সায়েম লক্ষ্য করে সে ভীষন ঝরঝরে। যন্ত্রনা মোটেও নেই। মুখে এখনো সেই মিষ্টি পানির স্বাদ। কোন তৃষ্ণা নেই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মহান রবের আর ভালোবাসার আবেগে বুকটা ভরে উঠে গাছগুলোর জন্য। 

থানা হাজতে এভাবে নির্যাতন চলতে থাকে দুইদিন। আর সায়েমের সেবা করে যাচ্ছে গাছগুলো। অবশেষে পুলিশ নামের পাষন্ডরা তার থেকে কোন কথা বের করতে না পেরে তার দুই পায়ে গুলি করে। তাদের ইচ্ছে ছিল পঙ্গু করে দিবে সায়েমকে। গুলিবিদ্ধ সায়েমকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, ক্ষতস্থান কয়েকদিন আগের। ইনফেকশন হওয়ার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। যদি ইনফেকশন হয় তাহলে পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কাঁদতে থাকে সায়েমের বাবা মা ভাই বোন। ডাক্তার অনেকগুলো পরীক্ষা দেয়। রাতে সায়েম ঘুমিয়ে পড়লে আবার সেই গাছগুলোর সাথে দেখা হয়। তারা সবাই কাঁদতে থাকে আর সান্তনা দিয়ে সায়েমকে বলে আমরা আমাদের মত চেষ্টা করছি। তোমার কোন ক্ষতি হবেনা। 

পরদিন সবগুলো টেস্ট রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সিদ্ধান্ত দেন অপারেশন করে বাম পাটা কেটে ফেলতে হবে। ওটায় মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। সায়েমের বাবা-মা রাজী না হয়ে উপায় থাকেনা। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য একটা পা কেটে ফেলতেই হবে। অপারেশন হবে আরো দুদিন পর। রাতে আবার ঘুমিয়ে পড়লে সায়েম দেখে তার প্রিয় গাছগুলো এসেছে। তারা অনেকগুলো গাছের পাতা একত্র করে লাগিয়ে দিচ্ছে। নানান ধরণের ঔষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। আর সবাই সমানে কাঁদছে। সান্তনা দিচ্ছে। মিষ্টি রস খাওয়াচ্ছে। যাওয়ার সময় বলে গেল, ডাক্তারকে যেন রিকোয়েস্ট করে টেস্টগুলো আবার করাতে। 

ঘুম থেকে উঠে সায়েম লক্ষ্য করে তার পায়ের যন্ত্রণা অনেক কমে গিয়েছে। সে তার বাবার কানে কানে বলে বাবা আমার মনে হয় পা না কাটলেও চলবে। আপনি ডাক্তারকে একটু বুঝিয়ে বলুন যেন টেস্টগুলো আবার একটু করতে বলে। বাবা বলেন, কেন তোর এমন মনে হচ্ছে? সে বিশদ না বলে বললো, এমনিই মনে হচ্ছে তাই বললাম। ডাক্তার আসলে সায়েমের বাবা আবার টেস্ট করানোর কথা বললে অবিশ্বাসের চোখে ক্ষতস্থান দেখতে দেখতে বললেন এক রাতের মধ্যে কি আর পরিবর্তন হবে? তবুও সায়েমের বাবার পীড়াপীড়িতে আবার টেস্ট করালেন। এবার সবগুলো টেস্টেই পজেটিভ রিপোর্ট আসলো। ডাক্তার কিছু না বুজতে পেরে বললেন আগের রিপোর্টটা মনে হয় ভুল ছিল। সায়েমের বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন আপনি না বললে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো। সায়েমের বাবা-মা খুশিতে বার বার আল্লাহকে সিজদাহ দিতে লাগলেন। সায়েমও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় আর গাছগুলোর কথা কাউকে বলেনা। কারণ তার এই কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা। 

প্রতি রাতেই গাছগুলো আসে সেবা করতে। মিষ্টি রস খাওয়াতে। সায়েম ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে গল্প করে। সায়েম হাসপাতালে গ্রেফতার অবস্থায় ছিল। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। একদিন পাহারাদার পুলিশগুলোর সাথে আরো অনেক পুলিশ আসলো। তারা সায়েমকে নিয়ে যাবে কারাগারে। সায়েমের বাবা-মা পুলিশগুলোর হাতে পায়ে ধরে বলতে থাকে ছেলেটা এখনো হাঁটতে পারেনা। এই অবস্থায় কারাগারে গেলে সে কিভাবে চিকিৎসা পাবে? কিন্তু কে শোনে কার কথা! জালিমরা হাসপাতাল থেকে সায়েমকে তুলে নিয়ে যায়। সায়েম হাত নেড়ে বিদায় জানায় সবাইকে। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! মা সায়েমকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন। পুলিশ হ্যাঁচকা টান দিয়ে সায়েমকে গাড়িতে তুলে। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে সায়েম। 

কারাগারের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ভালো আছে সায়েম। কারণ সারা রাত যখন সে ঘুমে থাকে তখন তার সাথে আড্ডা দিতে আসে গাছগুলো। সায়েমের যেসব বন্ধু তার সাথে দেখা করতে আসে সে সবাইকে বলে যেন তার গাছগুলোতে পানি দেয়া হয়। এভাবে কিছুদিন যায়। ইতিমধ্যে পুলিশ আবার সায়েমদের হলে যায়। জঙ্গী আস্তানার ভুয়া কথা বলে হল বন্ধ করে দেয়। এই খবর সায়েমের কানে পৌঁছায়। সে তার দুইজন সহকর্মীকে খবর পাঠিয়ে বলে যেন গাছগুলোর খবর নেয়। কিন্তু সবার অবস্থায়ই বেগতিক। কে কার খোঁজ নেয়! 

সায়েম এখন সুস্থ। আগের মতই হাঁটতে পারে। কিন্তু দুঃখের কথা গাছগুলো আর আগের মত স্বপ্নে দেখা দেয়না। গত এক সপ্তাহ একবারও আসেনি। সায়েম তার বন্ধু সহকর্মীদের খবর পাঠায়। তাদের মাধ্যমে জানতে পারে তার প্রিয় গাছবন্ধুগুলো আর নেই। পানির অভাবে সব মারা গিয়েছে। ভীষন শক খায়। এ যেন পুলিশের দেয়া বৈদ্যুতিক শকের চাইতেও বেশী। এখন পানিই খেতে পারেনা সায়েম। মনে হয় যেন গলায় কাঁটার মত বিঁধে পানিগুলো। 

দীর্ঘ সাত মাস পর কারাগার হতে মুক্তি পায় সায়েম। বের হয়েই প্রথমে হলে আসে। প্রহরীতো প্রথমে খুলতে চায়না, গাছের প্রতি সায়েমের ভালোবাসার কথা সে জানতো তাই আর বেশীক্ষন বাধা না দিয়ে দরজা খুলে দেয়। জনমানবহীন হলে সায়েম দৌড়ে দৌড়ে তার রুমে আসে। কঙ্কাল হয়ে আছে তার প্রিয় গাছগুলো। মানুষহীন হলের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয় সায়েমের আর্তনাদে। শুকিয়ে যাওয়া ফুলগাছগুলো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সে। প্রহরীরাও অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে।

সবগুলো গাছ টবসহ তুলে নিয়ে আসে হল থেকে। চলে আসে নিজেদের বাড়িতে। নিজের হাতে পাঁচটি কবর খুঁড়ে সমাহিত করে ফুলগাছগুলো। ছোট ছোট সাইনবোর্ড বানিয়ে কবরগুলোর সামনে লিখে দেয়। হাসনাহেনা, শিউলি, টগর, বেলী, আলমান্ডা। তারপর কিছুদিন পর সে বাড়িও ছাড়তে হয়। কারণ ফ্যাসিস্ট পুলিশ তার পিছু ছাড়েনা। এখন সে শহরে নাম গোপন করে বসবাস করে। এতদিনে সে সফল ব্যবসায়ীও হয়ে গিয়েছে। তবুও সে একমুহুর্ত ভুলে থাকতে পারেনা গাছগুলোকে। সেই গাছগুলো যে গাছগুলো নিজেদের রস নিংড়ে তাকে পানি খাইয়েছে। একদিন পানির অভাবেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাই এখনো সুযোগ পেলেই সায়েম তার গাড়ি নিয়ে রাতের আঁধারে বের হয়ে পড়ে। যেভাবে একসময় অনেকগুলো রাতে তাকে সময় দিয়েছে গাছগুলো। 

২২ অক্টোবর, ২০১৫

চিত্তরঞ্জন, কালীদাস আর স্বাধীন বঙ্গভূমি


ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার কোলকাতার ভবানীপুরে ১৯৬২ সালে চিত্তরঞ্জন সূতার ও কালিদাস বৈদ্যকে নিয়ে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়। আমার জানামতে আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতা নিয়ে এটিই সর্বপ্রথম কোন উদ্যোগ। এবার আসুন এই দুইজনকে নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক, 

চিত্তরঞ্জন সূতারঃ
১৯৫১ সালের শেষদিকে তিনি পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশ করেন। সাথে ছিলেন কালিদাস বৈদ্য ও নিরোধ মজুমদার। তিনি রিচার্স এন্ড এনালাইসিস উইং (R&AW) এর কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে ভবানীপুরের ২৬ নম্বর রাজেন্দ্র প্রসাদ সড়কে বাস করতেন। ভারতীয় পাসপোর্টে তার নাম ভুজঙ্গ ভূষন রায়। তাছাড়া তিনি বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলকে হিন্দু রাজ্যে পরিণত করার জন্য “স্বাধীন বঙ্গভূমি” নামে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এই আন্দোলনে তার নাম হচ্ছে পার্থ সামন্ত। ৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা তথা দেশ বিভাগের পর থেকে ২০০২ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৫৩ বছরের মধ্যে প্রায় ৩৯ বছর কাটিয়েছেন কলিকাতায়।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সময় নির্দলীয় ব্যানারে পূর্ববাংলার প্রাদেশিক পরিষদ এবং আওয়ামী লীগের টিকেটে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সনের ১১ আগস্ট তত্কালীন বাকশাল দলের এই এমপি ভারতে যাওয়ার পর আর কখনও বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। প্রায় এক যুগ আগে দিল্লীতে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কলিকাতার ভবানীপুরের বাসভবন সানি ভিলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। কখনো বামদল, কখনও নির্দল, কোন সময় নেপথ্যচারী এবং স্বাধীনতার পর দুই বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা গেছে তাঁকে। আবার ৭০ সালের নির্বাচনের সময় তফশিলী হিন্দু সম্প্রদায় ভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গণমুক্তি দলের রূপকার ছিলেন চিত্ত সুতার। ৭৫ সালে বাকশাল গঠনেও ছিল তাঁর বিশেষ ভূমিকা। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলে চিত্তরঞ্জন সুতার সে দলে যোগ দেন ।

কালিদাস বৈদ্যঃ
তিনি সূতারের সাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকেই তিনি পূর্বপাকিস্তানকে পূর্ববঙ্গ নামে মুক্তির জন্য তৎপর। যদিও তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার এজেন্ডা নিয়েই এদেশে প্রবেশ করেছেন তবুও তিনি প্রচার করতেন এদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হয় বলেই তিনি ভাংতে চেয়েছেন। তিনি বাংলা সেনা নামে একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। যেটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল। তিনি কোলকাতা হতে এই সংগঠন পরিচালনা করতেন। ১৯৮২ সালে চিত্তরঞ্জনের বঙ্গভূমি আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ঐ বছরের ২৫শে মার্চ ঘোষিত হয় স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র। তৈরী হয় ‘সৈন্য বাহিনী’ বঙ্গসেনা। সৈনাধ্যক্ষ ডাঃ কালিদাস বৈদ্য।

স্বাধীন বঙ্গভূমির ইতিকথাঃ
বাংলাদেশের দু’টুকরো করে হিন্দুদের জন্য আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য জোর তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ২০,০০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি গঠনের উদ্যোগ আয়োজন চলছে অনেকদিন ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে স্বাধীন বঙ্গভূমি সরকার। 

রাষ্ট্রপতিঃ পার্থ সামন্ত। 
রাজধানীঃ সামন্তনগর (মুক্তি ভবন)। 
সবুজ ও গৈরিক রঙের মাঝে সূর্যের ছবি নিয়ে নির্দিষ্ট হয়েছে জাতীয় পতাকা। 
জাতীয় সঙ্গীতঃ ধনধান্যে পুষ্পে ধরা, আমাদের এই বসুন্ধরা। 
সীমানাঃ উত্তরে পদ্মা, পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। প্রস্তাবিত সীমানার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের ছয়টি জেলাঃ খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এবং পটুয়াখালী। 

এই ছয়টি জেলা নিয়েই ২৫ মার্চ ১৯৮২ ঘোষিত হয়েছে তথাকথিত স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র। স্বাধীন বঙ্গভূমিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সমস্ত উদ্যোগই চলছে কিন্তু পশ্চিম বঙ্গ থেকে। নেপথ্য নায়করা সবাই জানেন এই রাজ্যেই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর বিভিন্ন জেলা - ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং উত্তর বাংলায় চলছে ব্যাপক তৎপরতা। সেসময় ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা কাদের (বাঘা) সিদ্দিকী এবং চিত্তরঞ্জন সূতার মদদ দিচ্ছেন হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে। প্রবক্তাদের যুক্তি বাংলাদেশে মুসলমানদের শাসন চলছে। হিন্দুদের জীবন ও সম্পত্তি তাদের হাতে নিরাপদ নয়। বিশেষত বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র ঘোষনার পর ঐ দেশের হিন্দুরা পরাধীন জীবন যাপন করছে। তাই প্রয়োজন হিন্দুদের জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র-বঙ্গভূমি।

বঙ্গভূমি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সংগঠক নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘ। ১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় এই সংগঠনকির জন্ম হয়। জন্ম উপলক্ষে ১৫৯ গরফা মেইন রোডের সভায় নাকি উপস্থিত ছিলেন একজন আইএএস অফিসার অমিতাভ ঘোষ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ কালিদাস বৈদ্য (এমবিবিএস ডাক্তার), সুব্রত চট্টোপাধ্যয় (বিলাত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার), নীহারেন্দ্র দত্ত মজুমদার (পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন আইনমন্ত্রী) এবং শরৎ চন্দ্র মজুমদার (বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী)। অন্য সূত্রের খবর চিত্তরঞ্জন সূতারও ঐ সভায় হাজির ছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সংস্থা গোলপার্কে সভা করে প্রথম প্রকাশ্যে হোমল্যাণ্ড দাবী করে। এরপর মাঝে মধ্যে সভা-সমাবেশ হত। এর মধ্যেই নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘে ভাঙন ধরে। ১৯৭৯ সালে হয় দু’টুকরো। ডাঃ কালিদাস বৈদ্যের নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ গরফা মেইন রোড। সুব্রত চ্যাটার্জির নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ ৮০ ধনদেবী মান্না রোড, নারকেলডাঙ্গা। এদের থেকে বেরিয়ে আর একটি অংশ তৈরী করে বঙ্গদেশ মুক্তিপরিষদ। ঠিকানা মছলন্দপুর। আরও একটি অংশ তৈরী করে সংখ্যালঘু কল্যাণ পরিষদ। চলে চিত্ত সুতারে ভবানীপুরের বাড়ী থেকে।

১৯৮২ সালে বঙ্গভূমি আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ঐ বছরের ২৫শে মার্চ ঘোষিত হয় স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র। তৈরী হয় সৈন্য বাহিনী “বঙ্গসেনা”। সৈনাধ্যক্ষ ডাঃ কালিদাস বৈদ্য। সুব্রত চ্যাটার্জীর গ্রুপ ঐ ঘোষণা না মানলেও বঙ্গভূমি দখলের জন্য ঐ বছরেই তৈরী করে অ্যাকশন ফোরাম বাংলা লিবারেশন অর্গানাইজেশন (বিএলও)। আরও পরে বঙ্গদেশ মুক্তি পরিষদ তৈরী করে সৈন্য বাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব বেঙ্গল (বিএলটি)। নেতা রামেশ্বর পাশোয়ান একজন বিহারী, থাকেন গরফার রামলাল বাজারে। এরপর বিভিন্ন সংগঠন মাঝে মাঝেই বঙ্গভূমি দখলের ডাক দেয়। সীমান্ত অভিযান করে। কিন্তু কখনই ব্যাপারটা এদেশের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। 

৮৮ এর জুলাই থেকে অবস্থাটা ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে। ঐ বছর ২২ জুলাই বঙ্গসেনা একটি সম্মেলন করে। এরপরই শুরু হয় একের পর এক কর্মসূচী। সীমান্ত জেলাগুলোতে চলতে থাকে একের পর এক সমাবেশ মিছিল মিটিং। ২৩ নভেম্বর বঙ্গভূমি দখলের জন্য বনগাঁ সীমান্ত অভিযানে ৮/১০ হাজার লোক হয়। ২২-২৩ জানুয়ারী বনগাঁ থেকে বঙ্গসেনার মহড়া হয়। ২৪ মার্চ ও ২৫ মার্চ হয় আবার বঙ্গভূমি অভিযান। ৭ এপ্রিল রাজীব গান্ধীর কলকাতা আগমন উপলক্ষে সিধু কান ডহরে বিএলও এক জমায়েতের ডাক দেয়। প্রত্যেকটা কর্মসূচীতে ভাল লোক জড়ো হয়। বাংলাদেশে গেল গেল রব উঠে। এপারের সংবাদ মাধ্যমগুলো এই প্রথম গুরুত্ব সহকারে মনোনিবেশ করে খবর প্রচার করে।

স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলনের নেপথ্য নায়কদের আসল পরিচয় কি? কি তাদের আসল উদ্দেশ্য? কে এই রাষ্ট্রপতি পার্থ সামন্ত? কি ভূমিকা নিচ্ছেন ভারত সরকার? দীর্ঘ অনুসন্ধানে এটা স্পষ্ট হয়েছে, স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্র তৈরীর চেষ্টা আজকের নয়। পঞ্চাশের দশকেই হয়েছিল এর ব্লুপ্রিন্ট। বঙ্গভূমি ও বঙ্গসেনা পুস্তিকায় ডাঃ কালিদাস বৈদ্য নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ১৯৫২-তে তাঁরা তিনজন যুবক কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যান এবং সংখ্যালঘুদের মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মতৎপরতা চালান। গোপনে স্বাধীনতা ও তার সঙ্গে স্বতন্ত্র বাসভূমির কথাও প্রচার করেন। ঐ তিন যুবক হলেন কালিদাস বৈদ্য, চিত্তরঞ্জন সুতার এবং নীরদ মজুমদার (মৃত)। আর এই প্রেসিডেন্ট পার্থ সামন্তই হলে চিত্তরঞ্জন সূতার।

বাংলাদেশে বেশ কিছু কাগজে লেখা হয়েছে বঙ্গভূমি আন্দোলন ভারতেরই তৈরী। ৭৮ সালের জুলাই থেকেই বঙ্গভূমি আন্দোলন ধীরে ধীরে দানা বাধতে শুরু করে। এটা কি নেহাৎই কাকতালীয়? ১৯৮২ সালে যখন “স্বাধীন বঙ্গভূমি সরকার” ঘোষণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের কাগজগুলিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মূল সুর ছিল, ইন্দিরার মদদেই এসব হচ্ছে।

প্রথম আন্দোলনের মূল হোতা ডাঃ কালিদাস বৈদ্য এবং রহস্যময় চরিত্র চিত্তরঞ্জন সূতার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে বহুকাল ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনেও ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বস্তুত ভারতীয় এজেন্ট হিসেবেই এই দু’জন এবং নীরদ মজুমদার তৎকালীন পূর্ববঙ্গে গিয়েছিলেন। চিত্তবাবু ওখানে রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন মূলত তার ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। সংসদের সদস্যও হয়েছিলেন।

ডাঃ বৈদ্য এতটা পারেননি। পরবর্তীকালে দুইজনের মধ্যে বিরোধও হয়। ডাঃ বৈদ্য ভারত সরকারের সমর্থন হারান। কিন্তু মুজিব সরকারের ওপর প্রভাব খাটাবার জন্য চিত্তরঞ্জন সূতারকে ভারত সরকার চিরকালই ব্যবহার করেছে। অনেকেই বলে, তাঁর সোভিয়েত কানেকশন নাকি প্রবল। চিত্তবাবু ভবানীপুরের রাজেন্দ্র রোডের বিশাল বাড়িতে সপরিবারে অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কোথা থেকে আসে ঐ টাকা? ভারত সরকার কেন তাকে জামাই আদরে পুষছেন? তার বসতবাড়িটাও দুর্ভেদ্যও। পাহারা দেন বেশকিছু শক্ত সমর্থ যুবক। যারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ করত। বনগাঁ লাইনে বঙ্গভূমি সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার যে, ঐ বাড়িটাই বঙ্গসেনার ঘাঁটি। ভারত সরকারের মদদের আরও প্রমাণ, রাজীব গান্ধীর বিবৃতি। তিনি একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাড়ছে অনুপ্রবেশ। আকাশবাণী থেকেও একাধিকবার প্রচার হয়েছে। 

ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের কথা ডাঃ বৈদ্যও অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, মদদ নয় প্রশ্রয় দিচ্ছে বলতে পারেন। তবে মদদ দিতেই হবে। আমরা জমি প্রস্তুত করছি। তিনি বলেন, আমি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিভাবে রাখছি, কার মাধ্যমে রাখছি বলব না। আমার বক্তব্য ক্রমাগতই তাদের বোঝাবার চেষ্টা করছি। সত্যিই যদি যথেষ্ট লোকজন জড় করতে পারি, তবে ভারত সরকারকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেই হবে। আমার একটা সরকার আছে। সৈন্যবাহিনী আছে। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী বঙ্গসেনা নামেই ঢুকবে বাংলাদেশে। আমরা সেই পরিস্থিতি তৈরী করার চেষ্টা করছি। 

বঙ্গভূমি পন্থীরা চান বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক অত্যাচার চালাক। যাতে তারা দলে দলে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। শরণার্থীদের বোঝা বইতে হবে ভারত সরকারকে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে কিছু অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের আরও একটা ইচ্ছা, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগুক, ব্যাপক হিন্দু নিধন হোক, যাতে এদেশের সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সেন্টিমেন্টকে খুশী করার জন্য ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

বঙ্গভূমির ফেরিওয়ালাদের স্পষ্ট বক্তব্যঃ ভারত সরকারকে বেছে নিতে হবে দু’টোর একটা। তারা দেড় কোটি হিন্দু শরণার্থীর দায়িত্ব নেবেন, নাকি স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্র “বঙ্গভূমি” তৈরী করে দেবেন, যে বঙ্গভূমি একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সিকিমের মত ভারতের অঙ্গরাজ্যে রূপান্তরিত হবে?"

তথ্যসূত্রঃ 
১- বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধঃ বহুমাত্রিক বিশ্লেষন / এম আই হোসেন 
২- Sheikh Mujib Triumph and Tragedy / Sayyid A. Karim
৩- একশ বছরের রাজনীতি/ আবুল আসাদ 
৪- দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ জুন ২০১৩

২০ অক্টোবর, ২০১৫

নিখিল বোমার উপাখ্যান


মুজিবের আমলে বিরোধী দলে থাকা জাসদ মুজিবের রক্ষীবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীরকে প্রতিরোধ করার জন্য ব্যবহার করে নিখিল বোমার। আবিষ্কারক নিখিলের নামেই এর এমন নামকরণ হয়।

২৪ নভেম্বর যাত্রাবাড়ি ১৯৭৪, ভয়ানক বিস্ফোরন হয় নিখিল নামে আলোচিত বোমার। সে বোমার জনক নিখিল রঞ্জন সাহা। বুয়েটের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের তরুণ লেকচারার। জাসদ করতেন। ২৬ নভেম্বর হরতালকে কেন্দ্র করে দেশকে ব্যাপক অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা গ্রহন করে জাসদ। প্রচুর বোমা দরকার। কিন্তু বোমা বানাবে কে?

সেই গুরুদায়িত্ব গ্রহন করে নিখিল। নিখিল আগে থেকেই বোমা বানায়। পদ্ধতিও ছিল স্থুল। পাতলা এক টুকরো মার্কিন কাপড় চিনি দিয়ে ভিজিয়ে এবং পরে শুকিয়ে মাড় দেয়া কাপড়ের মত করে শক্ত করা হতো। এর ভেতর ধাতব স্প্রিন্টার ঢুকিয়ে দেয়া হতো। তারপর মেশানো হতো পটাশিয়াম ক্লোরেট। জ্যাকেটের মধ্যে কয়েকটা ফোকর রাখা হতো। প্রতিটি ফোকরে অ্যম্পুলের ভেতর থাকতো সালফিউরিক এসিড। এটা ডেটোনেটরের কাজ করতো।

সলতের মধ্যে আগুন লাগিয়ে ছূড়ে দিলে তৎক্ষণাৎ কাজ করতো। আর যদি টাইম বোমা বানানোর প্রয়োজন পড়তো তবে বেলুন বা কনডম ব্যবহার করা হতো। সেক্ষেত্রে অ্যম্পুলগুলো বেলুনে রাখা হতো। হিসেব করে দেখা গেল বেলুন থেকে গড়িয়ে এসিড বেরিয়ে আসতে দু'মিনিট সময় লাগে। যদি মনে করা হতো দু'মিনিট পর বিস্ফোরন করা লাগবে তাহলে একটা বেলুন যদি চার মিনিট তাহলে দুটো বেলুন ব্যবহার করা হতো।

নিখিল তার দুই সহযোগী কাইয়ুম আর নয়নকে নিয়ে বোমা তৈরী করে যাচ্ছিল। হঠাৎ ভুলবশত একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এরপর তৈরী হয়ে যাওয়া একে একে অনেকগুলো। কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে। মারাত্মক আহত হয় নিখিল। নয়ন নিখিলকে নিয়ে হাসপাতালে যায়।

মাইনুদ্দিন খান বাদল পরদিন তাকে দেখতে যায়। নিখিল জানায় পুলিশের তার ডায়েরী পেয়েছে। তাই বাদলকে সরে থাকতে বলেছেন। এর পরদিন নিখিল মৃত্যুবরণ করে। নিখিল হতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা পুলিশের কাছে চলে যাবে তাই জাসদই তাকে হাসপাতালে খুন করায় বিষ প্রয়োগ করে।

নিখিলের আলোচিত সৃষ্টি এবং যাদের জন্য সৃষ্টি তারাই হত্যা করে নিখিলকে। এভাবেই মৃত্যুবরণ করে নিখিল ও নিখিলের হতদরিদ্র খেতমজুর বাবার পরিবারের স্বপ্ন। নিখিলদের বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জিলার নবীনগর থানার বিটনগর গ্রামে। 

আরেক সহকর্মী কাইয়ুম পলাশী কলোনীতে থাকতেন। রেডিওতে খবর শুনে তার মা যাত্রাবাড়ির গফুর মেম্বারের বাড়ির কাছে যান। কাইয়ুমের বাবা সরকারি চাকুরী করতেন, থাকতেনও সরকারি কোয়ার্টারে। কাইয়ুমের মা মানুষের জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার ছেলেকে দেখেছিলেন। কিন্তু কাইয়ুমের বাবার চাকরী ও কোয়ার্টার নিয়ে ঝামেলা হতে পারে এজন্য নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেয়ার সাহস পাননি। জাসদের পক্ষ থেকেও কেউ যে এগিয়ে আসবে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। 

অতঃপর আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তার লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এভাবেই শেষ হয় সে সময়ের স্বৈরাচারী মুজিব সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়া নিখিল বোমার উপাখ্যান। 

তথ্যসূত্রঃ-
১-জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি/ মহিউদ্দিন আহমদ 
২- দৈনিক ইত্তেফাক ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর।

১৮ অক্টোবর, ২০১৫

তাজউদ্দিন নামা


বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত ধর্মপ্রিয়। এখানে তাই বামদের ভালো অবস্থান কখনোই হয়নি। তারা তাই ছলে বলে কৌশলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানী সামরিক জান্তাদের স্বৈরাচারীর কারনে সৃষ্টি হওয়া দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নে বিভোর ছিল। তাদের এই স্বপ্নকে কাজে লাগিয়েছে ভারত। ভারত ৭১ এর আগে পরাজিত হওয়া যুদ্ধের শোধ নিতে মরিয়া ছিল। আর তাছাড়া আজন্মশত্রু দেশকে বিপদে ফেলা তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট ছিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” এর প্রথম প্রজেক্ট ছিল পাকিস্তান ভাগ। 

ভারত এদেশীয় রুশপন্থী বামদের কাজে লাগিয়ে তাদের সেই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। আওয়ামীলীগে লুকিয়ে থাকা সিরাজুল আলম খান ছিলেন এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মূল হোতা। তিনি একেক পর এক ছাত্রলীগের নানান কর্মকান্ড দিয়ে পাকিস্তান ভাগের জন্য মুজিবকে প্ররোচিত করতে থাকেন। কিন্তু মুজিব পাকিস্তান ভাগের ব্যাপারে একেবারেই অমত করেছিলেন। 

অমত না করার কোন কারণও নেই। কারণ সত্তরের নির্বাচনে “ভোটের বাক্সে লাথি মার/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো” বলে শ্লোগান তুলে চীনপন্থী বাম নেতা ভাসানী তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ার, জনগণের আস্থা সবই নষ্ট করেছেন। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুজিবের ব্যাপক জনসমর্থন বাড়ে। মুজিব জনগণের পালস বুজতে পেরেছেন। তাই বামদের ফাঁদে পা দেননি। আর তাছাড়া গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে মুজিবের জন্যই লাভ, তার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানে যে অল্পকয়দিন গনতন্ত্র ছিল তার বেশিরভাগ সময়ে ক্ষমতায় ছিল বাঙ্গালীরাই।

এবার আসি তাজউদ্দিন প্রসঙ্গে। বেসিক্যলি তাজউদ্দিন সাহেব রুশপন্থী বাম ছিলেন। এই ব্যাপারে কমরেড তোয়াহা বলেন, এছাড়া তাজউদ্দীন পূর্বাপর কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যদিও তাজউদ্দীন বাহ্যত: আওয়ামী লীগ করতেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সাথেই জড়িত ছিলেন। পার্টির সিদ্ধান্তেই তাকে আওয়ামী লীগে রাখা হয়। একবার সম্ভবত: '৬২ সালের দিকে তিনি জেল থেকে বের হয়ে আমাদের বললেন 'আর ছদ্মনামে (অর্থাৎ আওয়ামী লীগে) কাজ করতে আমার ভালো লাগছে না। আমি নিজ পার্টিতেই কাজ করবো।' তখন কেউ কেউ মনে করলো, 'থাক না আমাদের একজন আওয়ামী লীগে আছে, সেখানেই কাজ করুক না।' পরে অবশ্য পার্টিতে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল কিন্তু তাজউদ্দীনকে প্রত্যক্ষভাবে পার্টিতে নেয়া হয়নি। আমার মতে সেটা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তবে তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগে থেকেও আমাদের জন্য কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগের সব তথ্য আমাদের সরবরাহ করেছেন। ইন্ডিয়াতে গিয়ে অসম-চুক্তি করার পরই তার মাঝে একটা বিক্ষিপ্তভাব এসে যায়। এরপর তিনি কিছুটা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তবে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যখন আমরা তাকে তাঁবেদার সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনে করতাম, তখনও তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। (বারান্দার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে একবার এ বারান্দায় বসে আমার সাথে আলাপ করে গেছেন। ভুল-শুদ্ধ যখন যা করেছেন সবই এসে আমাদের কাছে অকপটে বলেছেন।
তথ্যসূত্রঃ ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন / মোস্তফা কামাল

১৯৭১ সালে তার কাজ ছিল কেবল ইন্ডিয়ান এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। উপপ্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলামকে দিয়ে অসম ৭ দফা চুক্তি করে বাংলাদেশ বিক্রীর ব্যবস্থা করে ভারতে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করেছেন। এই বিষয়ে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল বলেছেন দেশের শান্তিপ্রিয় জনগনকে হিংস্র দানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কোলকাতার বালিগঞ্জে একটি আবাসিক এলাকার দোতলা বাসায় প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা সহকারে নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি শুধুই বিস্মিত হইনি, মনে মনে বলেছিলাম ধরনী দ্বিধা হও। 
তথ্যসূত্রঃ অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা/ মেজর জলিল, পৃঃ ৪৪

১৭ই এপ্রিল নতুন প্রবাসী সরকার গঠনের ঘোষনা দিয়ে দেশের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি কিভাবে নিশ্চিন্ত ছিলেন তা আমরা বুঝতে পারবো যদি ভারত সরকারের সাথে তার চুক্তিগুলো একটু পড়ি। 

১- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা যুদ্ধ করেছে তারাই দেশ স্বাধীন হলে প্রশাসনে নিয়োগ পাবে। বাকীরা চাকরীচ্যুত হবে। যে শূন্যপদ সৃষ্টি হবে তা ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা দ্বারা পূরণ করা হবে।

২- বাংলাদেশ ও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী মিলে যৌথ কমান্ড গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হবে। ভারতের সেনাপ্রধান উক্ত যৌথ কমান্ডের প্রধান হবেন। তার কমান্ড অনুসারেই যুদ্ধে শামিল হওয়া বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

৩- স্বাধীন বাংলাদেশের কোন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী থাকবেনা।

৪- আভ্যন্তরীন আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে প্যারামিলিটারি বাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৫- দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু সময়ে সময়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বানিজ্য নীতি নির্ধারণ করা হবে।

৬- বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী অনির্ধারিত সময়ের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করা হবে।

৭- বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ আলোচনা করে একই ধরণের পররাষ্ট্র নীতি ঠিক করবে।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে "র" এবং "সি আই এ"/ মাসুদুল হক, পৃঃ ৮১

তাজউদ্দিন আহমদ এ চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দিতে থাকেন সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। নজরুল ইসলাম সাহেব নিরুপায় হয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশে 'র'/ আবু রুশদ
দুঃসময়ের কথাচিত্র সরাসরি/ ড. মাহবুবুল্লাহ ও আফতাব আহমেদ।

ভারতপ্রীতি তাজউদ্দিনকে প্রায় অন্ধ করে ফেলেছিল। সে কি আসলে আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছিল নাকি ভারতের তত্ত্বাবধানে কোন অঙ্গরাজ্য চেয়েছিল এটা সহজেই অনুমান করা যায় তার কার্যক্রম দেখে। ১৯৭২ সালের ১লা জানুয়ারি এক আদেশবলে বাংলাদেশের মুদ্রামান ৬৬ ভাগ হ্রাস করা হয়। অথচ সে সময় বাংলাদেশের মুদ্রামান ছিল ভারত থেকে বেশি। তাজউদ্দীন দু'দেশের মুদ্রামানের বিনিময় হারের সমতা চেয়েছিলেন। লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গিয়েছিল হু হু করে। অর্থনীতির ওপরও প্রভাব পড়েছিল। ৭৩- ৭৪এ দূর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যদিও দূর্ভিক্ষের পারিপার্শ্বিক অনেক কারণ ছিল, তবে এটাও বড় একটি কারণ। 
তথ্যসূত্রঃ
ভয় পেয়ে রিপোর্ট করা থেকে বিরত থাকলাম/২২ মার্চ ২০১৬ মতিউর রহমান চৌধুরী/ দৈনিক মানবজমিন

৭১ এর পুরো বিষয়টা অনুধাবন করতে শেখ মুজিবের সময় লাগেনি। দেশে এসে ক্ষমতা গ্রহন করেই উপরোক্ত চুক্তি ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন তাজউদ্দিনের প্রতি। যে কয়টা দিন মুজিব ক্ষমতায় ছিলেন সে কয়টা বছর তাজউদ্দিন শেখ মুজিবের কাছে ঘেঁষতে পারেনি। তাজউদ্দিনের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে রুশপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও। আওয়ামীলীগে ঘাপটি মেরে থাকা বামরা মুজিবের অপশাসনে ও অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে আরেকটি সংগঠন জাসদ গঠন করার সময় তাজউদ্দিনের বাড়িতে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গোপন আলোচনায় বসেন। সেখানে তাজউদ্দিন মুজিবের বিরুদ্ধে যেতে সাহস করেনি। বলেছিল আমি মুজিবের বিরুদ্ধে যেতে পারবোনা, আমার সেই সাহস নেই। তবে তোমাদের আমি সর্বাত্মক সাহায্য করবো। 

এরপর জাসদ গঠন হলো। জাসদের উপর মুজিবের নির্যাতন ক্রমেই সকল সীমা অতিক্রম করছিলো। এছাড়া রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, জুলুম, সন্ত্রাসী জনগণকে মুজিবের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। তাই একমাত্র বিরোধী হিসেবে জাসদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। জাসদের উত্থানে আরো ভয়ানকভাবে ক্ষেপে গিয়ে মুজিব জাসদের উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার চালাতে থাকেন। জাসদ এসব কিছুর পেছনে তাজউদ্দিনকে সন্দেহ করে। সেনাবাহিনী, জনতা, জাসদ এই ত্রিপক্ষীয় জনরোষে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র দানা বাঁধতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে ৭৫ সালে খুন হন মুজিব। সেই সাথে নির্মমভাবে খুন হন তাজউদ্দিনসহ চার নেতা। বামপন্থী সেনা অফিসাররাই খুন করে বাম চিরজীবন আদর্শ লালন করা তাজউদ্দিনকে। 
তথ্যসূত্রঃ জাসদের উত্থানপতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি / মহিউদ্দিন আহমদ।

১১ অক্টোবর, ২০১৫

রুপকথা নয় সত্যকথাঃ ০১


দানশীলতার জন্য তাঁর ছিল বেশ সুনাম। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন একস্থানে উটের দুধ আর অন্যস্থানে বিষ্ঠা। এর মাঝামাঝি স্থানে কে যেন কোদাল দিয়ে খনন করছে। তাতে একটা কূপ দেখা গেল। সেখানে কেবল পানি আর পানি। তিনি ঘুম থেকে উঠলেন কিন্তু স্বপ্নের আগাগোড়া কিছুই বুঝলেন না। একই ভাবে তিনদিন স্বপ্নে দেখলেন।
তারপর তিনি এক গণকের কাছে গেলেন। গণক বললেন তোমার জন্য সম্মান অপেক্ষা করছে। তুমি সম্মানিত হবে। এর কিছুদিন পর তিনি উটের পাল নিয়ে বরাবরের মত মাঠে গেলেন। হঠাৎ একটা তীর কোথা থেকে এসে একটা উটের ওলানে গিয়ে পড়লো। দুধে ভেসে গেলো ঐ স্থান। কে তীর মারলো তিনি আর সেই চিন্তা করতে গেলেন না। তার মনে পড়ে গেলো স্বপ্নের কথা।
তিনি খেয়াল করলেন কিছুদূরে বিষ্ঠা রয়েছে। যা ঐ উট একটু আগে ত্যাগ করেছে। তিনি বুঝলেন স্বপ্নই সত্য। এখানেই পানি পাওয়া যাবে। তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে স্থানটি চিহ্নিত করে তিনি ছুটলেন বাড়ির দিকে। কোদাল নিয়ে এসে খনন করতে লাগলেন। অল্প কিছু খনন করার পরই পাওয়া গেলো কূপটি। তিনি চিৎকার করে জানিয়ে দিলেন সবাইকে। তোমাদের আর চিন্তার কিছু নেই। আমাদের পানি সমস্যা দূর হয়ে গেলো।
এই সম্মানিত ব্যাক্তির নাম আব্দুল মুত্তালিব। আর কূপটি ইসমাইল আঃ এর জমজম কূপ। যা এতদিন পাথর দ্বারা ঢাকা পড়ে ছিল। আব্দুল মুত্তালিব কূপটিকে সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিলেন। কূপটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন যাতে সবাই পানি নিতে পারে।
এদিকে কিছু স্বার্থবাদী কুরাইশ নেতা কূপের মালিকানা দাবী করে বসলো। এই নিয়ে অনেক ঝগড়া-বাকবিতন্ডা শুরু হলো। পরে সবাই সিদ্ধান্ত নিলো ইরাকের বনু সা’দ গোত্রের এক মহিলা জ্যোতিষীর কাছে যাবে। তিনি যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই সবাই মেনে নিবেন।
আব্দুল মুত্তালিব সহ মালিকানা দাবীদাররা রওনা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা মুরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেললো। তাদের কাছে ছয় দিনের খাবার ছিল। দশ দিনে সব খাবার শেষ হলো। এরপর একজন প্রস্তাব করলো আমাদের তো মৃত্যু ছাড়া অন্যকোন গতি নেই। আসো সবাই কবর খুঁড়ে শুয়ে পড়ি। সবাই কবর খুঁড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।
আব্দুল মুত্তালিব তাদের বোঝালো, এভাবে শেষ হওয়া যাবেনা। আমাদের যতক্ষন পর্যন্ত শক্তি থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করবো। তাছাড়া আমাদের কাছে তো উট রয়েছেই। আমরা তো সেগুলো খেয়েও বাঁচতে পারবো। তারপর তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করে প্রত্যেকে আলাদাভাবে পানি খুঁজতে লাগলো। এভাবে দুদিন যাওয়ার পর আব্দুল মুত্তালিব একটি পরিত্যাক্ত কূপের সন্ধান পায়।
তাদের প্রত্যেকটি উটই ছিল মৃতপ্রায়। উটগুলো ও তারা পানি পেয়ে আবার কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। নতুন করে বাঁচার আশা দেখতে পায়। এই সময় সব কুরাইশ নেতা জমজম কূপের ব্যাপারে নিজেদের দাবী ছেড়ে দেয়। তারা বলে হে আবদুল মুত্তালিব, খোদাই আমাদের বিরুদ্ধে এবং তোমার স্বপক্ষে ফয়সালা দিয়েছেন। খোদার কসম এখন আর জমজম নিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করবোনা। যে খোদা এই মুরুভূমিতে তোমাকে পানি দিয়েছেন, সেই খোদাই তোমাকে জমজম দিয়ছেন।
এরপর তারা এক বানিজ্য কাফেলার সন্ধান পায় ও মক্কায় ফিরে আসে। এই ঘটনার পর আব্দুল মুত্তালিব আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের এক ছেলেকে কোরবানী করার মানত করেন। তিনি তার দশ ছেলের সবাইকে কথাটা জানালেন। সবাই মেনে নিলো। এরপর তিনি দশ জনের নাম লিখে হোবাল মুর্তির তত্ত্বাবধায়কের কাছে দিলেন। তিনি লটারী করলেন দেখলেন ৪র্থ ছেলে আবদুল্লাহর নাম উঠেছে। 
আবদুল্লাহ ছিলেন আব্দুল মুত্তালিবের ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, সজ্জন, পরোপকারী। মক্কাবাসীরা সবাই তাকে ভালোবাসতো। তারা ওর কোরবানী মেনে নিতে পারে নি। সবাই আবারো লটারী করতে বললো, ২য় এবং ৩য় বারেও আবদুল্লাহর নাম উঠলো। সবাই আবারো বাধা দিল। সবচেয়ে বেশী বাধা দিল সহোদর আবু তালিব।

এরপর আব্দুল মুত্তালিব এক খ্রীস্টান মহিলা সাধকের কাছে গেলেন এবং সব খুলে বললেন। তিনি তাকে বললেন তুমি আবদুল্লাহর নাম ও দশটি উট লিখে লটারী কর। যদি আবদুল্লাহর নাম না উঠে তাহলে দশটি উট উঠে তবে দশটি উট আবদুল্লাহর বদলে কোরবানী করবে। আর যদি আবদুল্লার নাম উঠে তবে দশটি করে উট বাড়াতে থাকবে। যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা খুশি হন।
দশটি উটে কাজ হলোনা। বিশটি কিংবা পঞ্চাশটিতেও না। যখন আবদুল্লাহর নামের সাথে একশো উট লিখে লটারী করা হলো তখনই কেবল লটারীতে একশ উট উঠলো। মক্কাবাসীরা খুশীতে উল্লাস করতে লাগলো। আবদুল্লাহ নিশ্চিত যবাইয়ের হাত হতে আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেলেন।
আব্দুল মুত্তালিব একশো উট জবাই করে সবার উদ্দেশ্যে রেখে দেন। সবাই যার যার ইচ্ছেমত নিয়ে যায়। তারপরও শেষ হয়নি। অন্যান্য মাংশাসী পশুরও ভুরিভোজের ব্যবস্থা হয়েছিল।
সেদিন হতে রক্তঋনের পরিমাণ হিসেবে একশো উট নির্ধারিত হলো। এর আগে ১০ টি উট ছিল। ইসলামেও এটি অব্যাহত আছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলতেন আমি দুই যবীহর (যবাইকৃত) সন্তান।
তথ্যসূত্রঃ 
১. ইবনে হিশাম
২. মুখতাছার সীরাতে রাসূল 
৩. আর রাহীকূল মাখতুম 
৪. সীরাতে সরওয়ারে আলম

সমাজে কিভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে?


আমাদের সমাজে ইসলামপন্থীদের মাঝে এক ধরণের অবাস্তব কল্পনা বিলাস আছে। আর তা হল শুধুমাত্র সব ইসলামপন্থিরা এক প্লাটফর্মে এলেই অথবা তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে।

কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। এরকম একটা ধারণা থেকে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়েছে। অথচ দেখুন সেখানে ইসলামের বিজয় হয় নি, বিজয় হয়েছে জাতীয়তাবাদের।

১ম বিষয় হচ্ছে যোগ্যতা। একটি ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য প্রথমত যেটা জরুরী তা হল ঐ রাষ্ট্র বা জনপদকে ইসলাম মোতাবেক চালানোর জন্য একদল সেক্টরভিত্তিক যোগ্য লোক তৈরী করা। যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র চালাতে পারবে। আল্লাহর রাসূল মক্কায় অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে এই ধরণের যোগ্যতা সম্পন্ন লোক তৈরী করেছেন। 

২য় বিষয় হল বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানসিকতা পরিবর্তন করা। যাতে তারা ইসলামের শাসন ও অনুশাসন মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ আল্লাহ ও তার রাসূলকে (সঃ) মনে প্রাণে বিশ্বাস করে ও মানে। তবে আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্ব মানতে তারা এখনো অভ্যস্ত হয় নি। এই ধরণের জনগোষ্ঠী মদিনায় তৈরী হয়েছিল। 

৩য় বিষয় হল নেতা হবেন আদর্শের মডেল। অর্থাৎ যাদের নেতৃত্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে তারা হতে হবে ইসলামের মডেল। তাদের দেখে জনগণ ইসলাম শিখবে। তাদের জীবনাচরণের সাথে যদি ইসলামের সামান্যতম প্রার্থ্যক্যও থাকে তাহলে তা জনগণের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অনেকখানি। আল্লাহর রাসূল সঃ স্বয়ং নিজেই মডেল হিসেবে উপস্থাপিতহয়েছেন। সেই সাথে ছিল সাহাবাদের উন্নত চরিত্র। 

এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত হলে তবেই আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইসলামী রাষ্ট্র দিবেন। মক্কায় ২য় বিষয়টি অর্জিত হয়নি বিধায় প্রথমেই মক্কায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। আল্লাহর রাসূল সঃ মক্কা থেকে যোগ্য নেতৃত্ব সহ মদিনায় গিয়ে তিনটি বিষয়ের সমন্বয় করাতেই সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। 

এখানে শর্টকাট কোন ওয়ে নেই যে আপনি হুট করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করবেন। জিন্নাহ যখন দ্বিজাতিতত্ত্ব ঘোষনা করেছিলেন তখন এক সেমিনারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো পাকিস্তানের সংবিধান কি হবে। সে দ্রুত পকেট হতে একটি ছোট কুরআন শরীফ বের করে অত্যন্ত আবেগ মেখে বলেছিলো এটিই হবে পাকিস্তানের সংবিধান। অথচ দেখুন আজও কি হয়েছে সেখানে কুরআনের সংবিধান? হয় নি। কারণ কুরআনকে সংবিধানে রূপ দেয়ার মত যোগ্যতা তার বা তার মন্ত্রীসভার কারো ছিল না।

ইসলামপন্থীদের জন্যতো বটেই, সবার জন্যই ঐক্য একটা বড় শক্তি। ঐক্য থাকলে আমাদের অনেক কাজ সহজ হয়ে যায়। তবে ঐক্য হওয়া উচিত আল্লাহর জন্য। দ্বীনের জন্য। জাতীয়তাবাদের ঐক্য নয়। সঠিক পন্থায় ঐক্যের জন্য যোগ্যতা দরকার। আমাদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য থাকে। আমরা যদি একটু ধৈর্য্য ধরে অপরের কথা শুনি, অপরের মতামত শুনি, খুব শালীন ভাষায় দ্বিমত করি বা নিজের মতামত উপস্থাপন করি তাহলেই নিজেদের সমস্যাগুলো কেটে যায়। কোন সম্প্রদায়কে ম্যনশন দোষারোপ করা ঐক্যের জন্য ভয়ানক হুমকি।

আসুন যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করি। নিজ নিজ সেক্টরে অথবা আমাদের ইন্টারেস্টের জায়গাগুলোতে আমরাই যাতে নেতৃত্ব দিতে পারি সেই ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। এভাবেই একদিন ইসলাম নেতৃত্বের আসনে আসীন হবে ইনশাআল্লাহ। 

আর সেই সাথে আমাদের সবার কমন দায়িত্ব, আমরা আমাদের যার যার অবস্থান হতে আমাদের দাওয়াতকে আরো গতিশীল করবো। মানুষকে আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান করবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সমগ্র প্রচেষ্টা কে কবুল করে নিন। আমিন।


৮ অক্টোবর, ২০১৫

সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু ঘটনাঃ আমাদের প্রেরণা


দাদাজান মৃত্যুবরণ করলেন। তখন আমার মিডটার্ম পরিক্ষা চলছিলো। দ্রুত বিভাগীয় প্রধানকে জানালাম। তিনি আমকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন যাও, বাড়ি যাও। তোমার পরীক্ষা আমি দেখবো। দাদাজানের পাশে আসলাম। অনেক চেষ্টা করেও কাঁদতে পারলাম না। কেমন যেন সব স্বাভাবিক মনে হয়।
নিজেকে আগে থেকেই কাঠখোট্টা বলে জানতাম। কিন্তু তাই বলে এতটা!! এই ঘটনার পর নিজেকে পাষান মনে হতে থাকে। অনেকের নাটক সিনেমা দেখেও চোখ ভিজে। আমার তো সেরকম হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু আমি সাক্ষী হয়ে গিয়েছি এমন সব ঘটনার যেগুলো মনে হলে এখনো কাঁদি। চোখ থেকে অবিরল পানি পড়ে।
পাঁচলাইশ থানায় এক মধ্যবয়সী মা পা জড়িয়ে আছে ওসির। স্যার, স্যার, স্যারগো, আমার পোলাটারে আর মারিয়েন না। আপনার পায়ে পড়ি। স্যার আপনি যেমনে বলেন সেভাবে হবে আমি পোলারে আর শহরে রাখুম না। স্যার, স্যারগো আর মারবেন না। আমারে মারেন, আমারে মারেন। পোলাটারে ছাড়ি দেন।
বিরক্ত পুলিশ পা ঝাড়া দেয়, মা ছুটে পড়ে তিন হাত দূরে। মায়ের দেরী হয় না। আবার উঠে দৌড়ে যায়। লক্ষ্য পুলিশের পা। স্যারগো আপনে আমার পোলারে বাঁচান। ওরা মেরে ফেলতেছে। মা কান্না করছে নিচতলায়। তিনতলায় ছেলের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলছে। মা – ছেলের কান্নায় জাহান্নাম হয়ে গেলো সব।
..................
আব্বু, তুমি আমাকে বলতা, মিথ্যা বলা খুব খারাপ, আল্লাহ শাস্তি দেন। আর তুমি সমানে মিথ্যা বলছো। তুমি বলেছো আমার পরীক্ষার সময় বাসায় আসবে, আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে। তুমি আসোনি। এরপর বলেছো, রোযায় আসবে, আসোনি। তারপর বলেছো ঈদে আসবে, তুমি এতটাই খারাপ হয়েছো, তুমি ঈদেও আসোনি। আমরা সবাই খুব কান্না করেছি...।
তুমি এখানে কি কর? আমাদের কথা মনে পড়ে না?
ছোট্ট মেয়ে বাবাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে, দুজনের মাঝখানে হাসিনার জিন্দানখানার লোহার মোটা মোটা শিক।
বাবা বলছে, আম্মু তুমি আমাকে মাফ করে দাও, আমি আর মিথ্যা বলবো না। ছোট্ট মেয়েটির মা কোন কথা বলেন না। শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। এক সময় বাবা মেয়ের কথাগুলো কান্নায় রূপান্তরিত হয়। তিনজনেই কাঁদছেন। কে কাকে সান্ত্বনা দিবে? সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই।
..................
ছেলেকে কোর্টে তুলেছে তাই মা বাসা থেকে খাবার নিয়ে এলেন ছেলেকে একটু নিজ হাতে খাইয়ে দিবেন বলে। কিন্তু পুলিশ কিছুতেই তা হতে দিচ্ছে না। মা পুলিশের পিছ পিছ দৌড়াচ্ছেন। ছেলেকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছেলে মায়ের দূর্দশা দেখে বললো, মা আমার পেট জ্যাম। খেতে পারবো না। জেলখানা থেকে আসার সময় অনেক খেয়ে এসেছি।
মা হাল ছাড়েন না। দৌড়াতেই থাকেন। একবার এর কাছে একবার ওর কাছে। ছেলে দূর থেকে মাকে বারণ করে। মা বলেন, বাবা তোর পছন্দের কাচ্চি নিয়ে আসছি। ছেলে মাকে থামানোর জন্য বলে কাচ্চি খাবো না, গ্যাষ্ট্রিক হবে। মা আর্তনাদ করে উঠেন, বাবা তোরে ওরা খেতে দেয় না? তোর তো গ্যাষ্ট্রিকের সমস্যা ছিল না। ছেলে কি বলবে, বুঝে উঠতে পারে না।
মায়ের ক্রমাগত বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে কয়েকজন পুলিশ। গালি দিয়ে তারা মায়ের হাত থেকে কেড়ে নেয় খাবার। দূরে নিক্ষেপ করে। সব বিরিয়ানি ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। কয়েকটা কুকুর দৌড়ে এসে খাবার খাওয়া শুরু করে। মা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যান। একবার কুকুরগুলোর দিকে আরেকবার ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর কাঁদতে থাকেন।
ছেলে লজ্জায় অপমানে ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে থাকে। চিৎকার করে বলতে থাকে, মা তুমি আর কোনদিন কোর্টে আসবা না। কোনদিন না। কখনো না।
...........................
কোর্ট থেকে ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে জেলখানায়। মা ছেলের বিদায় হল। ছেলে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু মায়ের মন কিছুই মানছে না। কাঁদতে থাকেন, আর বলতে থাকেন, আমার ছেলে কোন অপরাধ করে নি। সে চোর ও না ডাকাতও না, তবে কেন তাকে বন্দি করা হল?
হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রিজন ভ্যানে তোলা হল। মা-ছেলের কথা তবু শেষ হয় না। এক পর্যায়ে গাড়ি চলতে শুরু করে। মাও দৌড়াতে থাকেন। ছেলে মা কে বারণ করে কিন্তু কে শোনে কার কথা!!
মা দৌড়াতে থাকেন। হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়েন রাস্তায়। উঠে আবার দৌড়াতে থাকেন কিছুদূর গিয়ে আবার আছড়ে পড়েন। আর উঠতে পারেন না। ততক্ষনে গাড়ি অনেকদূর। মা তাকিয়ে থাকেন। রাস্তায় বসে কাঁদতে থাকেন মা। আর প্রিজন ভ্যানে কাঁদতে থাকেন ছেলে।
.........................
এইরকম দুই চারটা নয়, শত শত ঘটনা আছে। তবে আমরা হতাশ নই। জানি একদিন জুলুমের অবসান হবে। ইনশাল্লাহ। আসুন আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ দিয়ে চেষ্টা করি। বাংলাদেশের মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার আহবান করি। বিজয় আমাদেরই। মুমিনদের কোন পরাজয় নেই।

এরশাদ কাহিনী


লে. জে. হু. মু. এরশাদ ১৯৫২ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। দীর্ঘ তেরো বছর চাকুরীর পর ১৯৬৫ তে পান মেজর পদ। একাত্তরের পুরো সময় জুড়ে ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। মাঝখানে ছুটি নিয়ে পূর্বপাকিস্তান এসেছিলেন। যুদ্ধে যোগ না দিয়ে আবার ফিরে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। তিনি সেসময় দায়িত্ব পালন করেন কোর্ট মার্শালে।

স্বাধীনতার পরপরই তিনি ফিরে আসেন নি। তিনি এসেছেন ৭৩ সালে। সেই বছরই যোগ দেন বাংলাদেশ আর্মিতে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পাকিস্তানের প্রতি একান্ত অনুগত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী কিভাবে এতদিন পরে এসে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে? এর উত্তর অনেক হতে পারে, তবে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য মনে হয় তাহলো মুজিব ফ্রিডম ফাইটার সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিশ্বাস করতোনা। তাই সে সেনাবাহিনীতে কিছু লোককে চাচ্ছিল যারা একান্তই তার হয়ে কাজ করবেন। এইরকম অনেক লোককে রিক্রুটমেন্ট করেছেন মুজিব। তার মধ্যে অন্যতম এরশাদ।

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অন্যরকম সাহস নিয়ে আসছিল। তারা এখন ক্যু করতে ভয় পায়না। তাই ৭৫ এ কয়েকটি ক্যু করে ফ্রিডম ফাইটাররা। এই বিষয়টা মুজিবের মত জিয়াও তার বিবেচনায় এনেছেন। ক্ষমতা অধিগ্রহন করার পর জিয়া কর্ণেল তাহের সহ চারশত ছয়জন ফ্রিডম ফাইটারকে হত্যা করেছেন যৌক্তিক কারনেই। যার ফলে ক্যু এর ভয় জিয়াকে তাড়া করে ফিরতো।

মুজিব হত্যাকান্ডের সময় এরশাদ এক প্রশিক্ষনে ভারতে ছিলেন। জিয়া ক্ষমতা গ্রহনের পর তাকে ভারত থেকে নিয়ে আসেন। তাকে রাতারাতি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে উপ-সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত করেন। অথচ সব দিক দিয়ে এই বিবেচনায় এগিয়ে ছিলেন মেজর মঞ্জুর। জিয়ার সাথে কোন দন্ধই ছিলনা মঞ্জুরের। হয়তো ফ্রিডম ফাইটার বলেই জিয়া রিস্ক নিতে চাননি।

ইহাই বাংলাদেশের ফ্রিডম ফাইটার। কেউ কাউরে বিশ্বাস করেনা। কিভাবে করবে? তারা সবাইতো বিশ্বাস ভঙ্গকারী। সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে খারাপ। যোগ্য লোককে বঞ্চিত করে এরশাদের মত অযোগ্য, চরিত্রহীন ও করাপ্ট লোককে দায়িত্ব প্রদান কোনভাবেই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারেনা। এর চরম মূল্য দিতে হয়েছে জিয়াকে। বিপুল জনপ্রিয়তাও তাকে সেইভ করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার লোভ এরশাদকে প্রায় পাগল করে দিয়েছিল। সেই সাথে আছে মাথা গরম ফ্রিডম ফাইটাররা।

জিয়ার এক ভুলে দেশ ধূর্ত স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে ৯ বছর। তার ছেলে তারেকের প্রায় সেরকম ভুলে দেশ ভয়ংকর ড্রাকুলার কবলে পড়ে আছে। কবে উদ্ধার হবে আল্লাহ জানে।

বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকান ষড়যন্ত্র


অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে খেলতে আসেনি, এটা অস্ট্রেলিয়ার জন্য যতটা ভালো হয়েছে তার চাইতে বেশী ভালো হয়েছে বাংলাদেশের জন্য। আমার এখন স্পষ্ট মনে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের উপর হামলা করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছিল। যেভাবেই হোক অস্ট্রেলিয়া সেটা টের পেয়ে তাদের ক্রিকেট দলকে পাঠায়নি।
আমেরিকা যেহেতু উল্লফনটা বেশী করছে সেহেতু আমেরিকা যুক্ত আছে এই ষড়যন্ত্রের সাথে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই বিষয়টা আমার মনে হয়েছে যেদিন ইতালির নাগরিক নিহত হয়েছে। প্রথম আলোসহ অনেক পত্রিকায় নিউজ হয়েছে আমেরিকান নাগরিক নিহত। তারমানে একটা পক্ষ জানে একজন আমেরিকান খুন হবে। পরে দেখা গেল এটা ইতালির নাগরিক। সম্ভবত খুনিদের ভুলে বা ছক ঠিক করতে পারেনি বলে আমেরিকানের স্থলে ঐ ইতালিয় নিহত হয়েছেন।
এখানে আই এস জড়িত এটা আমেরিকার এক থার্ড ক্লাস নিউজ পোর্টাল বলেছে। ব্যাস সারাবিশ্বে এটা রটে গেলো। দেখা গেলো একজন ইতালীয় হত্যা দিয়ে পরিস্থিতি তাদের পক্ষে আনা যাবেনা। তাই আরেকজন বিদেশী খুন করা হয়েছে। ওরা বেচে বেচে এমন লোককে খুন করলো যিনি ইতিমধ্যে মুসলিম হয়েছেন।
একজন মুসলিম খুন করা হলো, আবার ঐ খুনের দায়ে মুসলিমদেরও ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। ঐ খুনের স্বীকার করা টুইটার বার্তাও রয়টার্স আবিষ্কার করে। গতকাল আবার জাপান বললো, আই এস'র অনলাইন রেডিও নাকি স্বীকার করেছে তারা হোসিও কুনিকে হত্যা করেছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, জাপান আই এস বিরোধী জোটে অংশগ্রহন করেছে তাই তারা এই মুসলিম লোকটিকে হত্যা করেছে। কোথায় সিরিয়া, ইরাক আর কোথায় বাংলাদেশে অবস্থান করা হোসি কুনি !!
বাংলাদেশে আমেরিকা-ইসরাঈল পরিচালিত আই এস নামক সন্ত্রাসীদের কোন স্থান হবেনা যেমনিভাবে হয়নি ভারত পরিচালিত জেএমবি'র স্থান, ইনশাআল্লাহ্‌। এদেশের বেশীরভাগ মানুষ প্র্যাক্টিসিং মুসলিম না হলেও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান তাদের মধ্যে আছে। তাই এদেশে কিছু দুষ্কৃতিকারী ইসলামের নামে সন্ত্রাসী করে ইসলামের অপমান করে পার পাবেনা।
আমরা ২০০৫ সালে দেশের সবক'টি মসজিদ থেকে যেভাবে এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছি আবারো সেভাবে আমরা এসব সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করবো, ইনশাআল্লাহ্‌।

৬ অক্টোবর, ২০১৫

পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন ষড়যন্ত্রের নাম “আদিবাসী”


পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের অসাধারণ সুন্দর একটি অংশ। সমগ্র দেশের একমাত্র পাহাড় বিধৌত অঞ্চলটির আয়তন দেশের মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি আয়তনের দিক দিয়ে গোটা দেশের মধ্যে বৃহত্তম জেলা। শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, অফুরন্ত বনজ সম্পদ সমৃদ্ধ এই অঞ্চল খনিজ সম্পদেরও আধার। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনেও এই অঞ্চল যথেষ্ঠ গুরুত্বের দাবী রাখে। এই এলাকার অশান্ত পরিস্থতির কথা কারও অজানা নয়, আজও চলছে সেসব।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ 
একটি সাম্প্রতিক জরিপ হতে দেখা যায়, এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৭%-৪৯% বাঙালি, বাকি ৫৩%-৫১% উপজাতি। উপজাতিদের মধ্যে ‘চাকমা’ গোষ্ঠিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মোট জনসংখ্যার ৩৩% (প্রায়) হচ্ছে চাকমা জনগোষ্ঠি। এছাড়া অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে মারমা, ত্রিপুরা, তংচংগ্যা, পাংখো, মুরং, বোম, কুকি, গারো, খিয়াং, চাক, লুসাই, খুমি ইত্যাদি উল্ল্যেখযোগ্য। ব্রহ্মযুদ্ধের সময় চাকমাদের আরাকান থেকে বিতাড়িত করে মগরা। আসামের নৃতাত্ত্বিক তথ্যের পরিচালক মি.জে পি মিলস-এর মতে চাকমারা সেখান থেকে আশ্রয় নেয় কক্সবাজার এলাকায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে ১৮ শতাব্দীতে।

উপজাতীয় রাজাদের বংশক্রম থেকে দেখা যায়, চাকমাদের মধ্যে অনেক রাজাই মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। তাঁরা মুসলিম নাম ও পদবি গ্রহন করতেন। এছাড়া তাঁদের সাথে মুসলিম বিবাহ-রীতির হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া গেছে অপর একটি গবেষনায়। চাকমাদের ধর্ম বৌদ্ধ হলেও, ধর্মগত আচারে বৌদ্ধত্বের বিশেষ প্রমান পাওয়া যায় না। ১৮ শতকে বহু চাকমার মুসলিম হবার প্রমান রয়েছে। পরে আবার হিন্দুত্বের অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলে। 

সর্বপ্রথম ব্রিটিশ আমলেই কালিন্দি রানী নামের তাঁদের এক রানী সকলকে বৌদ্ধ হবার নির্দেশ দেন। ১৮ শতাব্দীতে তাঁদের মধ্যে এতটাই বাঙালিয়ানা ভর করে যে, জে পি মিলস বলেন, 'এরা আচারে-ব্যাবহারে ও সংস্কৃতিগত বিষয়ে খুবই বাঙালি হয়ে গেছে (Most Bangalaised tribes)'। আরেকটি গবেষনায় দেখা গেছে, চাকমা ভাষা বাংলা ভাষার একটি উপভাষা। এমনকি হুমায়ুন আজাদের মতে চাকমা রাজা মোআন তসনি ব্রহ্মদেশ হতে তাড়া খেয়ে ১৪১৮ সালে কক্সবাজারের টেকনাফ ও রামুতে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে।......। তারপর, পালাক্রমে মারমারা আসতে শুরু করে এবং একটা সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যাপী বসতি ছড়িয়ে পড়ে। জে পি মিলসের মতে, এই ‘একটা সময়’ হচ্ছে ১৮ শতাব্দী (সুবোধ ঘোষ)। সুতরাং, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা সহ অধিকাংশ উপজাতিদের বসবাসের ইতিহাস বড়জোর ২০০-৩০০ বছর। বাঙালি ও মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ও বসবাসের ইতিহাসের দিক থেকে বলা যায় উপজাতিরা আদিবাসী নয়। কিন্তু কেন ইদানিং আদিবাসী বনে যাবার জন্য তাঁদের এত দৌড়ঝাঁপ? কেন এখন ‘উপজাতি’ শব্দটায় তাঁদের এত এলার্জি, কেন তাঁরা এই শব্দটির দরুন 'অপমানিত' বোধ করেন, যেখানে তাঁরা এমনকি ‘৯৭ সালে করা শান্তিচুক্তিতেও নিজেদের উপজাতি হিসেবেই নিজেদের উপস্থাপন করেছেন?

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমিয়াদের সংগ্রামের সূচনাঃ
পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন হিসেবে শান্তিবাহিনীর উদ্ভবের পটভূমি রচিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ পাহাড়ি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। মূলত ১৯৫৭ সালে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধের কার্যক্রম শুরু হয়। এর কারণে বিশাল এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। হাজার হাজার লোক ঘরবাড়ি, আবাদি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্থ জনগণ অবশ্য এসকল জমির প্রকৃত মালিক ছিল না, কারণ তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েল অনুসারে এলাকার সব জমিই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। তথাপি মানবিক কারণে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্থদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। লেকের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ৩৩.২২ মিটার উঁচু পর্যন্ত এলাকাসমুহ নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। মূল লেকটির আয়তন প্রায় ১৭২২ বর্গ কিমি, তবে আশপাশের আরও প্রায় ৭৭৭ বর্গ কিমি এলাকাও প্লাবিত হয়। কাপ্তাই বাঁধের কারণে আনুমানিক ১৮,০০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং প্রায় ৬৯০ বর্গ কিমি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সেসময় ৪ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছিল। তারপরও অসন্তোষ থেকে যায়। 

ওই অসন্তোষেরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির। এর আশু কারণ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের উদ্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা নিজেদের জুমিয়া জাতি হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে এর স্বীকৃতি দাবি করে। স্বীকৃতিলাভে ব্যর্থ হয়ে জুমিয়া জাতি আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত ৪ দফা দাবিনামা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নিকট পেশ করে: 
(ক) নিজস্ব আইন পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা।
(খ) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম অধ্যাদেশের ‘হিল ম্যানুয়েল অ্যাক্ট’ বাংলাদেশের সংবিধানে বিধিবদ্ধ করা। 
(গ) উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ করা এবং 
(ঘ) সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষিত রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।

এই দাবিসমূহের আলোকে ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা লিখিতভাবে সরকারের নিকট পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদার দাবি জানান। কিন্তু নতুন সংবিধান পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা দেয় নি। এরূপে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়।

কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে শান্তিবাহিনী তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে উত্তর ও দক্ষিণ দুটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে। প্রতিটি অঞ্চলকে আবার ৩টি সেক্টরে এবং সেক্টরগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করা হয়। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম অরণ্যে। ১৯৭৪ সাল নাগাদ বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শান্তিবাহিনীভুক্ত করা হয়। নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের নিয়ে মিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হয়। শান্তিবাহিনী ও মিলিশিয়া বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং বহুসংখ্যক যুব সমিতি ও মহিলা সমিতি গড়ে তোলা হয়। সামগ্রিক প্রস্ত্ততি গ্রহণ শেষে শান্তিবাহিনী ১৯৭৬ সালের প্রথমদিকে সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে। শান্তিবাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিদের আক্রমণ ও হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনীকে আক্রমণ, তাদের মতাদর্শ বিরোধী উপজাতীয়দের হত্যা, সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন, অপহরণ ও বলপূর্বক চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ জোরদার করে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর অন্তর্দলীয় কোন্দলে নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। 

মানবেন্দ্র লারমার হত্যাকান্ডের পর শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে (লারমা ও প্রীতি গ্রুপ) আত্মঘাতি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দিয়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় এবং তাদের প্রতি অস্ত্র সমর্পণ ও বিদ্রোহ সংঘাত বন্ধ করার আহবান জানায়। প্রীতি গ্রুপের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু লারমা গ্রুপ নাশকতামূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে। ইতোমধ্যে শান্তিবাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার বোধিপ্রিয় লারমা জনসংহতি সমিতির সভাপতি নিযুক্ত হন (১৯৮৫)। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত সরকার পূর্ববর্তী সকল সরকারের নেয়া শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। অবশেষে পরবর্তী মেয়াদের (১৯৯৬-৯৭) জন্য নির্ধারিত সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৯৯ সালে জনসংহতি সমিতির ষষ্ঠ মহাসম্মেলনে শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।

শান্তিবাহিনীর নৃশংসতাঃ
হুমায়ুন আজাদ শান্তিবাহিনীর নৃশংসতা ও বর্বরতার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তাদের ভয়াল আক্রমনের শিকার হন নীরিহ বাঙালিরা। এ ছাড়াও তাঁরা হত্যা করে সেনাবাহিনীর সহযোগী পাহাড়িদের, অপহরন করে বাঙালি, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যাবসায়ীদের। ১৯৮৪ সালের ১৮ জানুয়ারী তাঁর অপহরন করে শেল তেল কোম্পানির কাজে নিয়োজিত ৫ জন বিদেশী বিশেষজ্ঞকে। বিপুল মুক্তিপণ দিয়ে তাদেরকে পরে ছাড়িয়ে আনা হয়। '৯৭ সালে থানচির থানা নির্বাহীকে অপহরণ করে মুক্তিপন দাবী করে তাঁরা। সেনাবাহিনী মুক্তিপন ছাড়াই উদ্ধার করে তাকে। সেতু ধ্বংস করে, বিদ্যুতের তার বিচ্ছিন্ন করে এবং সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গা বাঁধিয়ে উপজাতিদের শরণার্থীরূপে ভারত যেতে বাধ্য করে শান্তিবাহিনী। এ সময় উল্লেখযোগ্য সহিংসতার মধ্যে ছিল '৯৬ সালে ২৯ কাঠুরিয়াকে হত্যা, ভূবনছড়া গনহত্যা, ইত্যাদি। ১৯৮০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত শান্তিবাহিনী ৯৫২ জন বাঙালি ও ১৮৮ জন পাহাড়িকে হত্যা, ৬২৬ জন বাঙালি ও ১৫২ জন পাহাড়িকে জখম এবং ৪১১ জন বাঙালি ও ২০৫ জন পাহাড়িকে অপহরণ করে। এই তথ্য জানিয়েছেন, M R Shelly ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh : An Untold Story’ বইতে। হুমায়ুন আজাদ কতৃক প্রদত্ত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী '৯৭ সাল পর্যন্ত এই হতাহতের সংখ্যা দাঁড়ায় নিম্নরূপ- ১৭ জন সৈনিক, ৯৬ জন বিডিআর, ৪১ জন পুলিশ, অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ জন। আহত হয়েছে মোট ৩৭৩ জন, ম্যালেরিয়ায় মারা গেছে ১৫৬ জন। অসামরিক ব্যাক্তিরাই মরেছে বেশি- বাঙালি ১০৫৪ জন, উপজাতীয় ২৭৩ জন। আহত হয়েছে- ৫৮৭ জন বাঙালি, ১৮১ জন পাহাড়ি। অপহৃত হয়েছে- ৪৬১ জন বাঙালি আর ২৮০ জন উপজাতীয়।

শান্তিচুক্তির ব্যবচ্ছেদ
অশান্ত পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী সরকার শান্তিচুক্তির আয়োজন করে। মূলত দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রায় কোণঠাসা করে ফেলার পর বিদেশীদের চাপে এদের নির্মূল না করে শান্তিচুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তির বেসিক বিষয় ছিল সন্তু লারমা নেতৃত্বে শান্তি বাহিনী অস্ত্রসমর্পন করবে। বিনিময়ে সরকার তাদের ক্ষমা করে দিবে এবং তারা যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে সেজন্য তাদের টাকা ও সম্পদ দিয়ে পূনর্বাসন করা হবে। চুক্তিটি উপজাতি বা জুমিয়াদের পক্ষেই গিয়েছে। অউপজাতি তথা বাঙ্গালীদের অধিকার ক্ষণ্ণ করা হয়েছে। তাছাড়া এমন কিছু ধারা সেখানে সংযুক্ত হয়েছে যা বাংলাদেশ সংবিধান পরিপন্থী ও রাষ্ট্রের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
শান্তি চুক্তিতে আপাত স্থিতিশীলতা আসলেও, এর অসারতা এখন বোঝা যাচ্ছে। এখনও পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়। প্রায় প্রতি সপ্তাহে জনসংহতি ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ এর মধ্যে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বন্দুক যুদ্ধ ঘটে। সেখানকার পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ই রয়েছে আতংকে। প্রায়ই বাঙালি-পাহাড়ি দাঙ্গায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়। চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, সন্ত্রাস আগের চেয়ে তো কমেইনি, বরং তিনগুণ বেড়েছে। কারণ জেএসএস(জনসংহতি), ইউপিডিএফ ছাড়াও জেএসএস থেকে ‘সংস্কারপন্থী’ বলে পরিচিত নতুন আরেক সংগঠনের আবির্ভাব ঘটেছে। এবার সমপরিমাণ চাঁদা তিন দলকেই দিতে হয় পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে। এ ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নের পরপরই বাঙালিরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা তীব্রভাবে তুলে ধরে। সে গুলো সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হল-


১- চুক্তির খ-খণ্ডের ৩০-এর ঘ- ধারা মোতাবেক বাঙালিদের নাগরিকত্ব সনদ দিবেন উপজাতীয় রাজা এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলেও, যা সংবিধানসম্মত নয়।
২- চুক্তির খ- খণ্ডের ২৬ ধারা অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুমতি ব্যাতীত জমি-ভূমি ক্রয়বিক্রয়য়, হস্তান্তর এমনকি ইজারা পর্যন্ত দিতে পারবে না কেউ, স্বয়ং সরকারও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে নাগরিক হিসেবে বঞ্চিত করা হয়েছে বাঙালিদের।
৩- পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যপদ সহ গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্ব উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে, অথচ সেখানে বাঙালিদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকেরও বেশী।
৪- চুক্তির খ-খন্ডের ১৬ ধারায়, যে শান্তি বাহিনী দীর্ঘ এত ২৪ বছর ধরে দেশপ্রেমিক বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে আসছে, তাদেরকে ৫০,০০০ টাকা পুরস্কার সহ পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। অথচ দেশমাতৃকার জন্য শান্তি বাহিনীর হাতে যারা নির্মমভাবে আহত/নিহত হয়েছে, তাঁদেরকে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করা হয়নি।
৫- চুক্তির গ-খন্ডের ৭ নং ধারা মোতাবেক পরিষদ সমূহের তিনটি উপসচিব ও একটি যুগ্ন-সচিব সহ চারটি পদে বাঙালি হওয়ার অপরাধে বাঙালি কর্মকর্তাদের বদলে পাহাড়িদের নিয়োগ দেয়া হবে, এর ফলে বাঙালিদের ন্যায্য প্রাপ্তির জন্য আর কোনও প্রশাসনিক স্তর রইলো না। 
৬- চুক্তির খ-খণ্ডের ৩২ ধারায় পরিষদসমূহের ধারায় মহান জাতীয় সংসদে পাশকৃত আইনের বিরুদ্ধে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদকে দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধানসম্মত হতে পারে না। এ যেন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থার ভেতর আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র।
৭- চুক্তির খ- খণ্ডের ২৪ ধারায় সিপাই থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদে শান্তি বাহিনী প্রত্যাগতদের নিয়োগের ক্ষমতা পরিষদকে দেওয়া হয়েছে। যারা কিছুদিন আগেও আনসার, বিডিআর, পুলিশ, সেনাবাহিনী সহ সাধারণ বাঙালিদের দেখা মাত্র গুলি করতো, তাঁরা এবার বৈধ অস্ত্র দিয়ে তা করতে যে দ্বিধা করবে না, তাঁর নিশ্চয়তা কি? 
৮- চুক্তির খ-খন্ডের ১৪ ধারা অনুযায়ী পরিষদকে সরকারী কর্মচারী উপজাতীয় থেকে নিয়োগ, বদলি ও শাস্তি প্রদান ইত্যাদি ক্ষমতা পরিষদকে দেওয়া হয়েছে। 
৯- চুক্তির খ খণ্ডের ২৬ ধারায় (গ) অনুযায়ী চেইনম্যান, আমিন, সারভেয়ার, কানুনগো, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সন্তু লারমা কতৃক নিয়ন্ত্রিত (এখন পর্যন্ত সন্তু লারমাই সেটার চেয়ারম্যান, অজ্ঞাত কারণে নির্বাচন হয়নি একবারও) আঞ্চলিক পরিষদকেই দেয়া হয়েছে। এর কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা নিজেদের ভূমির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
১০- চুক্তির গ-খন্ডের ৮ ধারায় পৌরসভা, স্থানীয় বিভিন্ন পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলার প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্ব পরিষদকে দেওয়া হয়েছে, যা প্রজাতন্ত্রের ভেতর আরেকটি প্রজাতন্ত্র ও ইউনিটারি বাংলাদেশ কনসেপ্টের সাথে সাংঘর্ষিক।
১১- চুক্তির ৭ ধারা ও ১৬ ধারার (ঘ) অনুযায়ী শান্তি বাহিনী ও উপজাতিরা এ যাবতকাল যত ব্যাংক ঋণ নিয়েছে, তা সুদ সমেত মওকুফ করা হয়েছে। অথচ, যে সকল বাঙালি শান্তি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কারণে ঋণ নিয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি, পারলেও শান্তি বাহিনী তা ধ্বংস করে দিয়েছে, তাঁদের ঋণ মওকুফ করা হয়নি, বরং সার্টিফিকেট মামলায় তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
১২- বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদের এবং ২৮ (১, ২, ৩) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে ও পশ্চাৎপদ জনগণের (পাহাড়ি) ধোঁয়া তুলে চুক্তির বৈধতার সাফাই দেওয়া হচ্ছে। যদি ঐ ধারার প্রয়োগ করতেই হয়, তাহলে সেটির সুযোগ তো চাকমারা পেতে পারে না। কেননা, চাকমাদের মধ্যে ৭০% শিক্ষিত, বাঙালিরা ১০%, অন্যান্য উপজাতিরা ১০%-১২% এর বেশি নয়। চাকরি, ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ আর্থ-সামাজিকভাবে চাকমারা এগিয়ে। সে ক্ষেত্রে ‘পশ্চাৎপদ অংশ’ তো বাঙালি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিরা। তাছাড়া একই পাহাড়ে, একই আবহাওয়ায়, একই প্রতিকূল অবস্থায় বাঙালিরাও তো বাস করছে। সুতরাং, পশ্চাৎপদ অংশের উন্নয়নের নামে চাকমাদের উন্নয়ন নয়, বরং পার্বত্য বাঙালি ও ক্ষুদে উপজাতিদের উন্নয়নে সংবিধানে উল্লেখিত ধারা প্রয়োগ ও চুক্তি করা উচিত ছিল।

দিন দিন বাঙ্গালীদের বঞ্চনা ও উপজাতীদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি একই রাষ্ট্রের দুই নীতিকে প্রকট করে তুলছে। যা সামাজিক ভারসাম্যে নিদারুন ক্ষতি করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা শান্তি চুক্তিকে নিজেদের প্রতিকূলে ভেবে নিয়েছে। সেই বিষয়টি ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে আসা কি যৌক্তিক নয় যে, শান্তি চুক্তি নতুন এক অশান্তির বীজ বপন করেছে? আহমদ ছফা শান্তি চুক্তি নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে এমন কিছু বিস্ফোরক উপাদান আছে, যা উপজাতি-অউপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অশান্তির পরিমাণ বাড়াবে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এবং নানা অংশে ছড়িয়ে দেবে অশান্তির আগুন’। আজ আমরা তাঁর কথার আক্ষরিক ফলে যাওয়া দেখতে পাই। 

উপজাতিদের রাতারাতি আদিবাসী হয়ে যাওয়াঃ
চাকমা-মারমারা নিজেদের উপজাতি হিসেবেই প্রকাশ করতো। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও সন্তু লারমা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার বেসিক পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে বিতর্কটি জমে উঠেছে। বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব বেশী হলে এক দশকের। বিষয়টি নতুন হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সচেতন মহলকে বেশ আন্দোলিত করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যে এ বিতর্কের সমাধান অবিশ্যম্ভাবী। 

২০১৪ সালের ৭ আগস্ট জারী করা সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে 'আদিবাসী' শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

কিন্তু বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে আগের মতই দেদারছে 'আদিবাসী' শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থপুষ্ট ও মদদপুষ্ট বিতর্কিত সিএইচটি কমিশন উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে চালিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বহু বছর জুড়ে। সাম্প্রতিক কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনায় এই কমিশনের প্রত্যক্ষ্য ভূমিকা লক্ষ্য করা গিয়েছে। শান্তিবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতেই মূলত সিএইচটি কমিশন কাজ করে গেছে। শান্তিচুক্তি হবার পর, হঠাত বেকার হয়ে পড়ে এই কমিশন। অনেকেই বলে থাকেন ফান্ডিং-এর অভাবই ছিল এর মূল কারণ। এরপর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না – এই মর্মে আবার গঠিত হয় এই কমিশন। এবার সুলতানা কামাল, ইফতিখারুজ্জামান, জাফর ইকবাল, কামাল হোসেন সহ অনেক বাংলাদেশী এই কমিশনে অন্তর্ভুক্ত হন। এর প্রধান হিসেবে অবশ্য একজন বৃটিশ সংসদ সদস্য দায়িত্ব লাভ করেন, তিনি খৃষ্টান পাদ্রি লর্ড এরিক অ্যামভুরি। এটা খুব সাধারণ কথা এই কমিশন যতটা না বাংলাদেশ বা উপজাতিদের স্বার্থ দেখবে তার চাইতে বেশী দেখবে আমেরিকার স্বার্থ। এবং সেটাই তারা করে যাচ্ছে সফলভাবে। ইতিমধ্যে তারা উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে প্রচার করার যাবতীয় পন্থা ব্যবহার করেছে। এই বিষয়ে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখছে ডেইলী স্টার, প্রথম আলো গং। যেখানে এই কমিশনের কাজ হচ্ছে মানবাধিকার রক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক বিষয় নিয়ে কাজ করা সেখানে তারা কিভাবে পাহাড়ী বাঙ্গালীদের অধিকার হরণ করা যায়, সেই চেষ্টায় লিপ্ত। বাঙ্গালী উচ্ছেদ ও বাঙ্গালীদের সুযোগ সুবিধা বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করে তারা রিপোর্ট দিচ্ছে। 

তারা হঠাৎ উপজাতিদের আদিবাসী বানাতে চাচ্ছে কারণ বাংলাদেশ সরকার যদি কোনভাবে উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি দেয় তাহলে জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের স্বায়ত্বশাসনের নাম করে খুব সহজেই স্বাধীন করে দিতে পারবে। যে ধারার ওপর নির্ভর করে জাতিসংঘ ও আমেরিকা 'আদিবাসী' পরিচিতি আদায়ের জোর চেষ্টা করছে। সেটি নিন্মরুপ-
আদিবাসীদের অধিকারের উপর জাতিসঙ্ঘের ঘোষণাপত্র : ধারা ৩

"United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples: 
Article 3 -- Right to Self-determination
Article 3 -- Right to Self-determination Indigenous peoples have the right of self determination. By virtue of that right they freely determine their political status and freely pursue their economic, social and cultural development."

ধারা ৩ -- আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার
আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আছে। এই অধিকারের বলে তারা স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে (অর্থাৎ তারা কি কোন দেশের মধ্যে থাকবে, না সেই দেশ থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন দেশ গঠন করবে -- সেটা তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে, যেমন জুমিয়ারা কি বাংলাদেশের মধ্যে থাকবে, না বাংলাদেশ থেকে আলাদা হয়ে পার্বত্য এলাকাকে নিয়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠন করবে তা জুমিয়াদের রাজনৈতিক ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে) এবং স্বাধীনভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন অনুসরণ করবে।

এই ধারার আলোকেই বিনা রক্তপাতে পশ্চিমা দেশগুলো ও জাতীসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সম্প্রতি সময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে পূর্বতীমুর। যা অখন্ড ইন্দোনেশিয়ার অঞ্চল ছিলো। 'আদিবাসী' শব্দ চর্চার বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করেই এক শ্রেনীর মানুষ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের দক্ষিণ এশীয় এজেন্ট হিসেবে এদেশে সক্রিয় বলে ব্যাপক সন্দেহের আর কোন অবকাশ নাই।

আমেরিকার স্বার্থ কি? 
সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর চীন ধীরে ধীরে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজকে প্রস্তুত করছে। এমতাবস্থায় চীনকে যদি ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে সবচেয়ে যোগ্যতম স্থান হচ্ছে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকা কেননা এখানে চীনের সাথে আছে জনসংখ্যার মধ্যে জাতিতাত্ত্বিক মিল এবং কম দূরত্ব। এমতাবস্থায় চীন এই এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এটা কোন দিক থেকে গ্রহণ করবে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশের সরকারযন্ত্রের, সামান্য ভুলে কারণে হয়তো এই সম্ভাব্য এলাকাটি এক সময় সমগ্র জাতির দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কেন আমেরিকা উপজাতিদের স্বাধীন করতে ভূমিকা রাখবে, এই প্রশ্নের উত্তর খুব সুন্দরভাবে দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল বিভাগের গবেষক জনাব কাজী বরকত আলী। তিনি বলেন একটা প্রমাণ সাইজের বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে তার মধ্যে দুই ইঞ্চি ব্যসের অনেকগুলো বৃত্ত একটা আরেকটাকে স্পর্শ করে যদি আঁকেন তাহলে আপনি দেখতে পাবেন, প্রতিটা বৃত্তের মধ্যেই আমেরিকান ঘাঁটি রয়েছে। শুধু ব্যতিক্রম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃত্তদ্বয়। আর এই বৃত্তের মধ্যেই রয়েছে দু'দুটো পরাশক্তি ভারত ও চীন। এদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এখানে একটা ঘাঁটি খুব প্রয়োজন আমেরিকার। 

এখানে দুটো পরিকল্পনাকে আবর্তিত হচ্ছে তাদের কার্যক্রম। প্রথমত উপজাতি জুমিয়াদের আদিবাসী স্বীকৃতি আদায় করে সেখানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আলাদা স্বায়ত্বশাসন বা আলাদা রাষ্ট্র করার মাধ্যমে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি প্রস্তুত করা। দ্বিতীয়ত কোন কারণে সেটি সম্ভব না হলে এই অঞ্চলের অধিকাংশ গরিব উপজাতিদের সচ্চল জীবনের লোভ দেখিয়ে খ্রীস্টান বানিয়ে তাদের মাধ্যেমে আলাদা রাষ্ট্রের দাবী উত্থাপন করা। সেই লক্ষ্যে এখন অনেকদূর তারা পৌঁছে গিয়েছে। 

যে উপজাতিরা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে ওদের নিয়ন্ত্রনে একটা রাষ্ট্র গঠনের স্বপন দেখছে যদি আমেরিকার কূটচাল বাস্তবায়িত হয় তাহলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখিন হবে উপজাতিরাই। আর আমাদের দেশ হবে খন্ডিত। সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা হবে লঙ্গিত। আরো জঘন্য ব্যাপার হল, আল্লাহ না করুন যদি আমেরিকার কূটচাল বাস্তবায়িত হয় তাহলে বিষয়টা মোটেই ভালোভাবে নিবেনা চীন ও ভারত। সেক্ষেত্রে তারা (ভারত ও চীন) প্রতিহত করার জন্য যেকোন সামরিক পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না। তখন বাংলাদেশ হবে যুদ্ধক্ষেত্র। যারা যুদ্ধ করবে তারা এখানে যুদ্ধ করতে মোটেই দ্বিধা করবে না কারণ এখানে তাদের জনগণ নেই। 

তাই সকলে সচেতন থাকুন। দেশদ্রোহী সুলতানা কামালের সিএইচটি কমিশন ও প্রথম আলো গংদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এখনই সময় প্রতিরোধের। এদেশে আমরাই আদিবাসী। আমাদের রয়েছে সুদীর্ঘ চার হাজারেরও বেশী বছরের ইতিহাস। এই অঞ্চলে বাঙ্গালীদের আগে আর কোন জাতি ছিল বলে কোন ইতিহাস নেই। আমরাই এই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠাকালীন সভ্যতার ধারক ও বাহক। তাই আমাদের দেশকে আমরাই রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আবার এর মানে এই নয় যে আমরা উপজাতিদের উচ্ছেদ করতে চাই। উপজাতিরা যেভাবেই হোক আমাদের দেশে এসেছে। আমাদের দেশের নাগরিক। আমাদের এই পর্যায়ে এসে জাতিগত বিভেদ করে আমরা আমাদের দেশকে হুমকির সম্মুখিন করতে চাই না। আমাদের বাঙ্গালী, চাকমা, মারমা, উপজাতি-অউপজাতি এসব পরিচয়ের চাইতে বড় পরিচয় হলো আমরা বাংলাদেশী। আমরা সবাই মিলে এদেশের জন্য কাজ করবো, এখানে সবার অধিকার সমান হবে। মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা আমদের সহায় হোন। 

৫ অক্টোবর, ২০১৫

প্রতিশোধ



১.
পুলিশ অফিসার হিসেবে বেশ নাম-ডাক ওসি নিজাম উদ্দিনের। সরকারের নেক নজরে আছেন তিনি। কারণ সরকারের যে কোন নির্দেশ পালনে তিনি বেশ পটু। তার চাইতেও বেশী পটু তিনি শিবির পেটানোতে। তিনি সব সময় নিজেকে বলেন শিবিরের যম। মেজাজ সবসময় খিটখিটে থাকলেও আজ তিনি বেশ খুশি। কারন তার ছোট ছেলে SSC তে A+ পেয়েছে। সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন তিনি।

শামীম আহমেদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। সরকারি কলেজের ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারী। পালিয়ে কলেজে ঢুকতে ও বের হতে হয়। কারন ওসি নিজাম। যে কোন মূল্যে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। শামীম রাতে নিজের মেসে তো থাকতেই পারে না, আত্মীয় স্বজন কারো বাড়িতেই থাকতে পারে না। আজ এই কর্মীর বাসায় তো কাল ঐ কর্মীর বাসায়।

কলেজের দুজন সাধারণ কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্দেশ্য শামীমের অবস্থান জানা। প্রচন্ড নির্যাতন করে। প্রথমে লাঠিপেটা, তারপর বাঁশডলা। বাঁশডলা মানে হচ্ছে হাত দুটো উপরে তুলে হাতকড়া পরিয়ে চিৎ করে শোয়ানো হয়। তারপর ঘাড়ের নিচে হাতের উপরে একটা লাঠি রেখে চারজন পুলিশ এর উপর দাঁড়ায়। এতে কর্মী দুজনের হাতের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। প্রচন্ড নির্যাতনে তারা বারবার রক্তবমি করছে ও বেহুঁশ হয়ে পড়ছে।

এভাবে নিজাম আরো দশ বারোজন শিবির কর্মীকে আটক করে। হতাশ নিজাম উদ্দিন। সে কারো মুখ থেকে কোন তথ্য বের করতে পারলো না। ক্রোধান্বিত হয়ে সর্বশেষ সে আটককৃত দুজন কে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়।

২.
অঝোরে কাঁদতে থাকে শামীম। অপরাধ বোধ তাকে গ্রাস করে। তার জন্য তার একের পর এক সহকর্মীদের নির্যাতন সইতে হচ্ছে। পঙ্গু হয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে যায় সে মায়েদের সান্তনা দিতে। কিসের সান্তনা দিবে সে নিজেই কেঁদে কূল পাচ্ছে না। উল্টো তারাই শামীমকে সান্তনা দিচ্ছে। শামীম তার উর্ধ্বতনকে বারবার বলে থানায় সে আত্মসমর্পন করবে। কিন্তু উর্ধ্বতনের কড়া নির্দেশ, এমনটি করা যাবে না।

হতাশ নিজাম নতুন চাল চালে। সোজা সে শামীমের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। এবার শামীমকে থানায় যেতে বলে তার দায়িত্বশীলেরা। ওসি নিজামের মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠে। তুই আমারে অনেক কষ্ট দিয়েছিস। এর মূল্য তোরে দিতে হবে। এত সহজে তোর মাকে ছাড়ছি না। পঞ্চাশ হাজার লাগবে। টাকা নিয়ে আয়, তোরে রেখে তোর মাকে ছেড়ে দেব। সন্ধ্যার মধ্যে আসবি। কোন চালাকি করবি না। বলে পকেট থেকে একটা পুটলিমত কিছু একটা বের করে বলে এই দেখ হেরোইন। তোর মাকে মাদক মামলা দিয়ে দেব। বুঝিস।

পৃথিবীতে শামীমের আছে ঐ কেবল মা। কোন ভাই বোন নেই। পিতা গত হয়েছেন শামীমের ছোটবেলায়। বাবার কোন স্মৃতিই তার মনে নেই। এই মা আজ বন্দি। কিছুই মাথায় আসছে না তার। খুব দ্রুত টাকা যোগাড় করে থানায় আসে। থানার বাইরে তার সহকর্মীরা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রানপ্রিয় শামীম ভাই হয়তো আর কোনদিন তাদের সাথে মিলিত হতে পারবে না। অজানা ভবিষ্যত কারোই জানা নেই। কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

শামীমের মা বের হলেই অন্যান্য সহকর্মীরা তার মাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। শামীম বলে গিয়েছে মা কে যেনো লুকিয়ে রাখা হয়। কারণ পাষন্ড নিজাম হয়তো তার থেকে কথা বলার অস্ত্র হিসেবে আবার মাকে ধরে নিয়ে আসতে পারে।

নির্যাতনের আর কোন পন্থা বাদ রাখেনি নিজাম। এক এক করে প্লাইয়ার্স দিয়ে সব নখ তুলে ফেলা, বাঁশডলা, পিঠে সিগারেটের আগুন, হাতুড়ি দিয়ে বাম হাত থেঁতলে দেয়া। দু কানে টানা কারেন্ট শক দেয়া চোখে লবণ মরিচ ইত্যাদি সব করে নিজামরা হাঁপিয়ে উঠেছে। তবুও বের করতে পারে নি অন্যান্য দায়িত্বশীলদের নাম বা ঠিকানা। বার বার হুমকি দিচ্ছে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলবে।

শামীমের মুখ থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কোন শব্দই বের হয় নি। উহ কিংবা আহও না। টানা পাঁচদিনের এই নির্যাতনে কেঁদেছে অনেক পুলিশ সদস্যও। অনেকে নিজামকে বলেছে, স্যার ছেড়ে দেন, মনে হয় কিছু জানে না। জানলে সব বলে দিত। আপনি যেভাবে পিটিয়েছেন সেভাবে কোন জানোয়ারকে পিটালে সেও এতক্ষনে কথা বলা শুরু করে দিত।

হাল ছাড়লেন না নিজাম। বললেন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। না বলে কই যাবে। অসুস্থ শামীমকে চেয়ারে বসিয়ে চেয়ারের সাথে বাঁধা হলো। চেয়ার উল্টে ফেলে দেয়া হল। নাক মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়া হল। তারপর তার মুখের উপর পানি ঢালা হল। যতক্ষন পানি দেয়া হয় ততক্ষন শামীমের মনে হয় সে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। ফুসফুস ফুলে ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। বেদনায় নীল হয়ে যাচ্ছে তার মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু সে বলতে থাকলো হাসবুন আল্লাহ ওয়া নে’মাল ওয়াকীল, নে’মাল মাওলা, ওয়া নে’মান নাসির।

ব্যর্থ হয়েছেন নিজাম সাহেব। শামীমের মুখ থেকে কোন কথা বের করতে পারেন নি। তাকে কয়েকটি বিস্ফোরক মামলা দিয়ে কোর্টে চালান করে দিচ্ছেন। এই সময় শামীম ইশারায় নিজামকে ডাকলো। কাছে আসলে বললো, জানিনা বাঁচবো কিনা। যদি বেঁচে থাকি আমি এর প্রতিশোধ নেব ইনশাল্লাহ। ক্রোধে আগুন হয়ে শামীমের বাম গালে কঠিন একটি চড় দিলেন।

৩.
নিজাম সাহেবের বড় দুই ছেলেই নেশাগ্রস্থ। কয়েকবার মাদক নিরাময় সেন্টারে দিয়েও উপকার পাননি। পড়াশোনা তারা ঠিকভাবে কোন সময়ই করে নি। ছোট ছেলে একটু আধটু পড়াশোনায় ছিল তবে এ প্লাস পাওয়ার মত নয়, অথচ সে ছেলে A+ পেয়ে বসলো। তাই তিনি অনেক খুশি। তার মনে খটকাও লাগে। কারন এই ছেলে হটাৎ পরীক্ষার ৬ মাস আগ থেকে ভালো হয়েছে। পড়াশোনা শুরু করেছে। তার আগে সে বইয়ের কাছেও ঘেঁষতো না। তার বড় দুই সন্তানও গত কয়েক মাসে ধীরে ধীরে প্রকৃতস্থ হয়ে উঠছে। আচরণ ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। নিজাম সাহেব তার তিন ছেলেকে নিয়ে নতুন করে আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। আর ছোট ছেলের ব্যাপারে তার চিন্তা তাকে ব্যারিস্টার বানাবেন। 

হঠাৎ ছোট ছেলের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে। বাবা তুমি না বলেছিলে যিনি আমার ভালো রেজাল্টের জন্য সবচেয়ে বেশী কষ্ট করেছেন তাকে নিয়ে আসতে। তিনি এসেছেন। নিজাম সাহেব ব্যস্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ চল।

থমকে গেলেন নিজাম সাহেব। আরে! এ যে শামীম।
--শামীম তুমি?
-- জ্বি নিজাম সাহেব আমি। কথা দিয়েছিলাম প্রতিশোধ নেব। নিলাম। আপনার তিন ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। তারা আর আপনার মত অমানুষ না।

অন্য দুই ছেলে একসাথে বলে উঠলো, বাবা আমাদের ক্ষমা কর। আমরা এতদিন নানা অন্যায় করেছি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমরা ভুলের মধ্যে ছিলাম। শামীম ভাই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন।

কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো হতবিহ্বল নিজাম সাহেবের চোখ থেকে।

৪ অক্টোবর, ২০১৫

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কিছু বিরোধীতা


“অন্যান্য ব্যাংক সরাসরি খায় আর ইসলামী ব্যাংক একটু ঘুরায়া খায়। সবি এক জিনিস”। এটি বাজারে সর্বাধিক প্রচলিত কথা। আজ এই বিষয়ে কিছু কথা বলবো। 

সুদ কিঃ

সুদের সংজ্ঞা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে ইসলামী অর্থনীতিতে মুদ্রার ধারণা। ইসলামী অর্থনীতিতে টাকা বা মুদ্রা কোন পণ্য নয়, কারণ তা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। একটি পণ্য (ধরি মোটরবাইক) এর সাথে টাকার পার্থক্য হল টাকা আপনি সরাসরি খেয়ে ফেলতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না। একে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কোন পণ্যে পরিণত করে তবেই ব্যবহার করতে পারবেন।( টাকা দিয়ে এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে তারপর খেয়ে ফেললেন) আর যেহেতু মুদ্রা কোন পন্য নয়, তাই এটা আপনি বেচতে পারবেন না, বেচে কোন লাভও করতে পারবেন না। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ইসলাম প্রচলিত অর্থনীতিতে সুদের যে সংজ্ঞা- Price of credit- তার মূলে আঘাত করেছে কারণ টাকা ধার দেয়া কোন পণ্য নয় যে তার দাম নিবেন।

টাকা বাড়ানোর একমাত্র এবং একমাত্র বৈধ উপায় হল একে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। নিচে এটা চিত্রের সাহায্যে দেখানো হল-

(১) টাকা-----পণ্য-----বিক্রি----টাকা

(২) টাকা-----পণ্য-----ভাড়া-----টাকা

এভাবে টাকাকে একটি চক্রের মাধ্যমে প্রবাহিত করে আপনি তাকে বাড়াতে কমাতে পারেন। তা না করে যদি আপনি সরাসরি টাকার লেনদেনে কম বেশি করেন, তবে তা হবে সুদ।

আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ কিংবা রুপার বিনিময়ে রুপা পরিবর্তন করলে অবশ্যই তা যেন সমান সমান হয়। বেশী দিলে কিংবা বেশী নিলে হবে সুদের কারবার। যে দিবে এবং যে নিবে উভয়ই অপরাধী হবে। (সহীহ মুসলিম)

যখনই কোন মানুষকে প্রশ্ন করা হয় সুদ কি? তখনই তারা বলেন মাসে মাসে নির্ধারিত একটা পরিমাণ দেয়াই হল সুদ। প্রতিউত্তরে যদি প্রশ্ন করা হয় তাহলে বাড়িভাড়ার পরিমাণতো নির্ধারিত, সেটা কেন সুদ নয়? তখন যে বাক্যাংশটি যোগ করা হয় তা হল লাভ ক্ষতি যাই হোক, তারপরও যদি দিতে হয়, তবে তা সুদ। এগুলো আসলে সুদের কোন সংজ্ঞা নয়। এগুলো মনগড়া চিন্তা ভাবনা। 

ইসলামী ব্যাংকগুলো কিভাবে টাকা বৃদ্ধি করে?ইসলামী ব্যাংকগুলো টাকা বৃদ্ধি করে মূলত তিনটি উপায়ে-১) কেনা বেচা২) ভাড়া৩) অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা

১) কেনাবেচাঃ কোন পণ্য কিনে তা লভ্যাংশ রেখে বিক্রয় করা।

২) ভাড়াঃএক্ষেত্রে ব্যাংক কোন মেশিনারীস বা অন্য কোন ভাড়া দেয়ার যোগ্য পণ্য কিনে তা গ্রাহকের কাছে ভাড়া দেয়।

৩) অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসাঃইসলামী ব্যাংক মুদারাবা বা মুশারাকা পদ্ধতিতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গ্রাহকের সাথে ব্যবসা করে থাকে। এই দুই পদ্ধতির সারমর্ম নিচে চিত্রের সাহায্যে নিচে দেখান হল-
ক্রয়ের চুক্তিতে ভাড়াঃঋণ দিয়ে যেহেতু অতিরিক্ত কিছু নেয়া যাবে না, তাই ইসলামী ব্যাংকগুলোর পক্ষে কার লোন, হোম লোন এগুলো দেয়া সম্ভব নয়। তারা যেটা করে সেটা হল ক্রয়ের চুক্তিতে ভাড়া। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক ও গ্রাহক অংশীদারী ভিত্তিতে কোন পণ্য কেনে। ধরুন একটি মোটর সাইকেলের দাম ২০০০০ টাকা। আপনি ১০০০০ টাকা দিলেন, ব্যাংক দিল ১০০০০ টাকা। মোটর সাইকেলটির মালিকানা ৫০% আপনার , আর বাকিটা গ্রাহকের। পুরো মোটর সাইকেলটা এখন আপনি যদি বাজার দরে কাউকে ভাড়া দেন, তাহলে এটার মাসিক ভাড়া হবে ধরুন ১০০০০ টাকা। ব্যাংক পুরো মোটর সাইকেলটি আপনাকেই ভাড়া দিবে। যেহেতু ব্যাংক এর ৫০% র মালিক সেহেতু আপনি তাকে ভাড়া দিবেন ৫০০০ টাকা। আর সাথে মাসে মাসে ব্যাংকের অংশের কিছু টাকা শোধ করবেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে আপনার মালিকানার অনুপাত বাড়তে থাকবে, ফলে প্রদেয় ভাড়ার পরিমাণও কমতে থাকবে। আরেকটি ভিন্ন চুক্তিতে ব্যাংক এই মর্মে গ্রাহকের সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে যে গ্রাহক যদি তার দায় নির্ধারিত সময়ের মাঝে পরিশোধ করে দেয়, তবে ব্যাংক বস্তুটির মালিকানা তাকে দিয়ে দেবে। অনেকের মনে হতে পারে যে এখানে শর্তযুক্তভাবে একাধিক চুক্তি একটি চুক্তির মাঝে করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তা নয়, এটি একই চুক্তির বিভিন্ন অংশ।

(১) আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের পোর্টফোলিওর প্রায় পুরোটাই বাই মোড দ্বারা পূর্ণ। লাভ ক্ষতির ভিত্তিতে এই অংশীদারিত্বের ব্যবসার মাঝেই ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রাণশক্তি ও স্বাতন্ত্র্য নিহিত। কিন্তু তা খুব কম করাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে মানুষকে বিভ্রান্ত বা সন্দিহান করা খুব সহজ হয়।

(২) মাল যে গ্রাহককেই ভাড়া দিতে হবে এমন নয়, তৃতীয় পক্ষকেও দেয়া যেতে পারে।

সঞ্চয়কারীদের সাথে ইসলামী ব্যাংকের সম্পর্কঃ
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দ্বিধা সংশয়ের অন্যতম মূল উৎস হল বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের ব্যাংকের বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকা। সঞ্চয়কারীদের মূল অভিযোগ যে ইসলামী ব্যাংকও লাখে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ দেয়, প্রচলিত ব্যাংকও তাই করে। তাহলে পার্থক্যটা কোথায় থাকল?ইসলামী ব্যাংকের সাথে অন্যান্য ব্যাংকের পার্থক্যটা নির্ধারিত পরিমাণ দেয়াতে নয়, বরং টাকাটা নিয়ে ব্যাংকগুলো কি করে, টাকার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি সেটাতে। আর কিসের নির্ধারিত পরিমাণ সেটা হল বিবেচ্য। যদি লাভের নির্ধারিত অংশ হয় এবং মূলধন সুরক্ষার নিশ্চয়তা না দেয়া হয় তবে সমস্যা নেই। কারণ লাভ অনির্ধারিত, তাই তার নির্ধারিত অংশও অনির্ধারিত।

ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের সাথে সম্পর্ক হচ্ছে মুদারাবা চুক্তি, অর্থ্যাৎ এখানে গ্রাহকরা পুঁজি সরবরাহ করেন, ব্যাংক সেটা বিনিয়োগের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে খাটিয়ে যে লাভ করে তা পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ করে নেয়। ব্যবসায়ে অভিজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা থেকে তারা একটি অনুমিত পরিমাণ গ্রাহকদের বলে দেয়। এখানে একটি বিষয় স্মর্তব্য যে গ্রাহকদের কাছে উল্লেখিত শতকরা অংশ একটি অনুমিত মান, যা বছর শেষে সমন্ব্য় সাধন করা হয়। এখন এই পরিমাণ যখন বছর বছর হেরফের হয়, তখন পার্থক্যটা এত সামান্য হয় যে তা অনেকসময় চোখেই পড়ে না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে একজন গ্রাহকের একাউন্ট ১০-১৫ টাকার কমবেশি আসলে বিপুল অংকের লাভ-ক্ষতির ফলাফল যা লাখ লাখ গ্রাহকের মাঝে ছড়িয়ে গিয়ে সামান্য আকার ধারণ করেছে।

**ইসলামী ব্যাংকগুলো কি সম্পূর্ণ সুদমুক্ত হতে পেরেছে?

এই জনপ্রিয় প্রশ্নের উত্তর হল, "না"। 
ইসলামী ব্যাংকগুলো সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাঝে কার্যক্রম পরিচালনা করে বিধায় তারা দুটি ক্ষেত্রে সুদমুক্ত লেনদেন করতে পারে না-

১) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে যে বাধ্যতামূলক সঞ্চিতি (SRR) এবং Foreign Currency Clearing Account এ জমাকৃত বৈদেশিক মুদ্রার উপরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ দেয়।

২) বিদেশী ব্যাংকগুলোর সাথে ইসলামী ব্যাংকের যে Nostro Account থাকে, সেটা চলতি হিসাব হলেও Overnight lending থেকে তারা সেখান থেকে সুদ পায়।

তবে ইসলামী ব্যাংকগুলো কল মানি মার্কেটে অংশগ্রহণ করে না, দেশীয় সুদী ব্যাংকে একান্ত প্রয়োজনে আকাউন্ট খুলতে হলে চলতি হিসাবে লেনদেন করে, যথেষ্ট পরিমাণ তারল্য বজায় রাখার চেষ্টা করে যেন আন্তঃব্যাংক ঋণ না করতে হয়। আর নিতান্ত অপরিহার্য হলে আন্তঃব্যাংকে লেনদেন করে অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকের সাথে, মুদারাবা পদ্ধতিতে।

**ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপারে আরেকটি অভিযোগ হল যে তারা খেলাপী গ্রাহকের উপর ক্ষতিপূরণ আদায় করে। 

এক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিবেচ্য যে গ্রাহক কি আসলেই অসমর্থ নাকি এটা তার স্বভাবগত সমস্যা। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয়টি হবার সম্ভাবনা প্রবল। খেলাপী গ্রাহক, যারা গড়িমসি করে দেনা শোধ করছেন না, তাদের কাছ থেকে দ্রুত টাকা আদায়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক অস্থায়ীভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে। এটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার একটি প্রকার। শরীয়াহ বিশেষজ্ঞরা বা বিচারপতিরা পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য ব্যবস্থাও নিতে পারেন। তবে এধরণের ক্ষতিপূরণ আদায় করার এখতিয়ার ব্যাংকের হাতে না থেকে তৃতীয় পক্ষের হাতে থাকে যারা ঠিক করেন যে কে সঙ্গত কারণে দেন শোধে দেরী করেছে আর কে গড়িমসির কারণে করেছে।

কিন্তু এইসব উৎসের কোনটি থেকে আসা অর্থ ব্যাংক কখনো তার মূল আয়ের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করে না। ফলে তা গ্রাহকদের বা শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বণ্টিত হয় না। এই আয় ব্যাংক শরীয়াহ কাউন্সিলের নির্দেশিত পন্থায় ব্যয় করে।

এ সংক্রান্ত একটি জরিপে আমি দেখেছি যে গ্রাহকদের ইসলামী ব্যাংকের স্বাতন্ত্র্য জিজ্ঞেস করা হলে সাধারণ গ্রাহকরা সঠিক উত্তর দিতে পারেন না কিন্তু বিনিয়োগ গ্রাহকরা এ ব্যাপারে খুব স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করেন। এর একটি কারণ হল তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের সাথে সুপরিচিত।

আপনারা যারা ইসলামী ব্যাংকিং এর বিরোধীতা করেন তাদের উদ্দেশ্য... 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লা’নত করেছেন, সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও উহার সাক্ষীদ্বয়ের উপর এবং বলেছেন এরা সকলেই সমান । (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি)

১)কোন স্কলাররা এমনটা অনুমোদন করেন কিনা আমার জানা নেই। সুদী ব্যাংকের দারোয়ানের চাকরিও যেখানে হারাম সেখানে তাদের সাথে লেনদেন কিভাবে বৈধ হতে পারে?

২) আপনি যদি ইসলামী ব্যাংকগুলো পরিহার করে সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন চালিয়ে যান, তাহলে আগামী ৫০ বছরেও সুদভিত্তিক ব্যবস্থার অবসান হবে না।কিন্তু আমরা সবাই যদি ইসলামী ব্যাংকের সাথে লেনদেন করার ব্যাপারে উদ্যোগী হই তাহলে পরিস্থিতির অভূতপূর্ব পরিবর্তন সম্ভব। সেক্ষেত্রে গ্রাহক চাহিদার চাপে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সেইসাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো ইসলামী ব্যাংকের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ম বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে।

৩) প্রচলিত ব্যাংকের চলতি হিসাবের(যাতে সুদের ব্যাপার নাই) সাথে লেনদেন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশের জন্য গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে (যারা ব্যবসা করেন না)। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির কল্যাণে এটা কোন সমাধান নয়।

৪) আল্লাহ মুসলিমদের এমন একটি সময়ে রেখেছেন যখন মায়ের সাথে ব্যভিচার করার সমতুল্য পাপ থেকে বাঁচার কোন উপায় রাখেন নি, এটা আল্লাহ নাম ও গুণাবলীর পরিপন্থী। কারণ আল্লাহ কাউকে সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা দেন না।

৫)আমরা অবশ্যই এমন পন্থা অনুসরণ করব যাতে আল্লাহকে পরকালে বলতে পারি যে আল্লাহ আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম। ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম অনুধাবন, তাদের শরীয়াহ প্রতিপালনের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের চাপ প্রয়োগ, অন্যদের ইসলামী ব্যাংকের সাথে লেনদেন করতে উৎসাহিত করা——এগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টার উদাহরণ নাকি ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় না করে ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে সন্দিহান হয়ে সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন করা সর্বোচ্চ চেষ্টা—-তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর রইল।

৬) যারা হালাল হারামের কোন বাছ বিচার না করে অর্থ উপার্জনের নেশায় উন্মত্ত এবং আর যারা সুদী ব্যাংকের হাই প্রোফাইল চাকরি, শেয়ার বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ- সব কিছু থেকে বিরত থেকে নিজের অত্যন্ত কষ্টে উপার্জিত টাকা ইসলামী ব্যাংকে রাখছেন সুদ থেকে বাঁচার আশায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেনকে হারাম হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে যে একই কাতারে ফেলা হচ্ছে, আর বিশাল একটি জনগোষ্ঠী যারা অর্থনীতির এত ঘোরপ্যাঁচ বুঝেন না, কিন্তু হারাম থেকে বেঁচে থাকতে চান, তাদেরকে গোলকধাঁধার মাঝে ফেলা হচ্ছে, তার দায় কে নিবে?

বঙ্গসমাজে কিছু পন্ডিত ব্যাক্তি রয়েছেন যারা মনে করেন ব্যাংক ব্যবস্থা একটি কাফির / তাগূতী সিস্টেম, যা ইসলামীকরণই শরীয়াহসম্মত নয়। 

ইসলামী ব্যাংকের বিরোধিতাকারীদের মাঝে আরেকটি দল আছেন যারা মত পোষণ করেন যে “আংশিক তহবিল ব্যাংকিং” এর উপস্থিতি কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থাই একটি তাগূতী সিস্টেম, কেউ কেউ একে দাজ্জালের সিস্টেমের সাথে তুলনা করেন। 

কাগুজে মুদ্রার ধারণাকেই তারা সুদের একটি প্রকার বলে মনে করেন। শেষোক্ত এই মতটি (কাগুজে মুদ্রার ব্যবহার নিজেই সুদ) ইসলামী অর্থনীতির আলোকে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে যদি কেউ কাগুজে মুদ্রা প্রচলনের ইতিহাস পড়েন। 

ইসলামী অর্থনীতিতে মুদ্রার অন্তর্নিহিত মূল্য থাকা উচিৎ (যেমন সোনা, রূপা ইত্যাদি) এবং বাস্তব সম্পদ হওয়া উচিৎ। আজকের টাকার মত নয়, যার পুরো মূল্যটাই আরোপিত (সরকার বলছে এটি ১০০ টাকা তখনই ঐ কাগজের মূল্য ১০০ টাকা হয়ে যায়) ও তা একটি আর্থিক সম্পদ।

কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে যে কাগুজে মুদ্রা ব্যবহারের মাঝে যে প্রচ্ছন্ন সুদ রয়েছে তা থেকে বাঁচার উপায় কি? ইসলামিক খিলাফাহকে যেমন আমরা শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে বিশ্বাস করি, তেমনি সোনা রূপাকেই আমরা আসল মুদ্রা হিসেবে মনে করি। 

কিন্তু এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কি আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব? যেসব রাজনৈতিক দল ইসলামী ব্যাংককে তাগূতী সিস্টেম বলে তার সাথে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকেন, তারাও সুদী ব্যাংকের চলতি হিসাবের সাথে লেনদেন করার চাইতে উন্নততর কোন বিকল্প বা সমাধান দিতে পারেন নাই। 

অথচ “আংশিক তহবিল ব্যাংকিং” সম্পর্কে পড়াশোনা আমাকে এই ধারণাই দেয় যে বাজারে অর্থের (Fiat money) যোগান দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম নিয়ামক হল Current Account.

** আংশিক তহবিল ব্যাংকিং (Fractional-reserve banking) এক ধরনের ব্যাংকিং যাতে ব্যাংকসমূহ তাদের ডিপোজিটের অংশবিশেষ তহবিলে বা রিজার্ভে রাখে এবং বাকীটুকু ধার দিয়ে দেয়। তবে চাহিদার সময় ব্যাংককে সমস্ত ডিপোজিট ফেরত দিতে হয়। এই পদ্ধতিটি সারা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত এবং এটিই প্রামাণ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।

আমাদের করণীয়ঃ
এত লম্বা আলোচনা থেকে আমাদের করণীয় পরিষ্কার- ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেন করা এবং শরীয়াহ প্রতিপালনের ব্যাপারে তাদের মাঝে চাপ প্রয়োগ করা। একটি ইসলামী ব্যাংকের মান যাচাই এর ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত চলকগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে-

১) শরীয়াহ বোর্ডের সদস্য কারা এবং শরীয়াহ প্রতিপালনের ব্যাপারে তারা কতটুকু কঠোর?

২) ব্যাংকের কর্মচারীরা কতটুকু ইসলামিক। তারা নিয়মিত সালাত আদায় করে নাকি, মহিলা কর্মচারীরা পর্দা মেনে চলেন নাকি, নারী পুরুষের অবাধ এবং অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা হয় নাকি এবং সবচেয়ে বড় কথা হল তারা সুদের পাপের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নাকি! সুদের প্রতি ঘৃণা একজন ইসলামী ব্যাংকারের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিৎ। 

৩)ব্যাংকের কর্মচারীরা ইসলামী অর্থনীতির স্বাতন্ত্র্য ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াবলী সম্পর্কে সম্যকরূপে অবগত কিনা এবং এটাকেই শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি মনে করেন কি না।

৪) ব্যাংকের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে কি না।

উপসংহারে বলা যায় ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত ইসলামী ব্যক্তিত্ব। আর সেটার চরম অভাব আমাদের দেশে রয়েছে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে বিশাল অজ্ঞতার কারণে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে সচেতনতা ব্যাংকগুলোকে সেবার মান বৃদ্ধি করতে বাধ্য করবে। 

আল্লাহ আমাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামী অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার তৌফিক দান করুন, আর সেই সাথে অন্যের প্রচেষ্টাকে সমালোচনা না করে উদ্যোগী মুসলিম হবার মত মানসিকতা দান করুন। আমীন।