৩১ অক্টোবর, ২০২০

রঙ্গিলা রাসূল ও শহীদ ইলমুদ্দিন

 

১৯০৫ সালে ইংরেজ সরকার বাংলাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার নিমিত্তে বাংলাকে দুইভাগ করে, যা বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। পূর্ববাংলা (বাংলাদেশ) ও আসাম নিয়ে একটি প্রদেশ করে যার রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। ঢাকা রাজধানী হলে মুসলিমরা লাভবান হবে এই হিংসায় কোলকাতার হিন্দু মুশরিকরা এর সর্বাত্মক বিরোধীতা করে। এরপর থেকে হিন্দু-মুসলিম তিক্ততা কেবল বাড়তেই থাকে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। একইসাথে ভারতের রাজধানী কোলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে নেওয়া হয়। 

কোলকাতার এতো বড় ক্ষতি হওয়ার পরও কোলকাতার মুশরিকরা আনন্দ উল্লাস করতে থাকে। ব্রিটেনের রাজার উদ্দেশ্যে পূজো দেয়। এই উল্লাসের একটাই কারণ সেটা হলো মুসলিমদের সম্ভাব্য উন্নয়ন বা অগ্রগতি ঠেকানো গেছে। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করার মনে হয় সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ এটাই। ১৯০৫ সাল থেকে ছোট বড় সাম্প্রদায়িক দাঙা লেগেই থাকতো। হিন্দু মুশরিকদের একজন 'পণ্ডিত চামুপতি লাল' ছদ্মনামে একটি স্যাটায়ার বই লেখে। এর নাম দিয়েছিল “রঙ্গিলা রাসুল”। লাহোরের এক প্রকাশক রাজপাল ১৯২৩ সালে বইটি প্রকাশ করে। সারা ভারতের মুসলিমদের মধ্যে বইটি চাঞ্চল্য তৈরি করে। 

এই বইতে বেসিক্যালি আল্লাহর রাসূল সা.-কে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। ওনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নবুয়্যত, আল্লাহ এবং বিশেষ করে ওনার স্ত্রীদের নিয়ে তামাশা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমরা কষ্ট পেয়েছে। বিক্ষুব্দ হয়েছে। এই পুস্তিকার বিষয়াবলির উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে চারদিকে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এরপর এই ব্যাপারটিকে আদালতে নিয়ে যায় মুসলিমরা। আদালত রাজপালকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করে। পরবর্তীতে আপিল করা হলে জজকোর্ট এই বিচারকে সমর্থন করে। রাজপাল এরপর হাইকোর্টে যায়। হাইকোর্ট তাকে নির্দোষ ঘোষণা দেয়। মুহাম্মদ সা.-কে ব্যঙ্গ করাকে ইংরেজরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে উল্লেখ করে। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত মুসলিমদেরকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে।

ইলমুদ্দিন নামে এক ১৯ বছর বয়সী এক কাঠমিস্ত্রীর ছেলে তার বন্ধুদের সাথে লাহোরের মসজিদ ওয়াজির খানে নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ শেষে মসজিদে এই বিষয়ে ভাষণ শোনেন। যেখানে ইসলামের নবীকে অমর্যাদাকারী ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছিল। মহানবী সা.-এর অপমানে ও বিচার না পাওয়ায় অসহায়ভাবে কেঁদে ফেললেন খতিব সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারি। নবীপ্রেম আর আতাউল্লাহ শাহের অসহায়ত্ব ভীষণ নাড়া দেয় ইলমুদ্দিনকে। এরপর সে লাহোরের ঊর্দু বাজারে রাজপালের দোকানে যায় এবং রাজপালকে ছুড়িকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার পর ইলমুদ্দিন পালিয়ে যাবার কোনো চেষ্টাই করেনি। পুলিশ তাকে তৎক্ষনাৎ গ্রেফতার করে এবং মিয়ানওয়ালি কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

ইলমুদ্দিন রাজপালকে হত্যা করে বই প্রকাশের ছয় বছর পর। মুসলিমরা বহুদিন ধৈর্য ধরে বিচারের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু হিন্দুদের প্রভাবে সঠিক বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে ইংরেজ সরকার। বিচারে ইলমুদ্দিনের পক্ষের আইনজীবী ফারুক হুসাইন দাবী করেন, ইলমুদ্দিন দোষী নয়, তাকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। কিন্তু আদলত ইলমুদ্দিনের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর লাহোর হাইকোর্টে ইলমুদ্দিনের পক্ষ থেকে একটি আপিল করা হয় যেই আপিলের আইনজীবী ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। 

এখানে উল্লেখ্য ইলমুদ্দিন কোনো ধরনের আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়ার চিন্তা বা ইচ্ছা করে নাই। সে নবীর অবমাননাকারীকে হত্যা করার মাধ্যমে তার দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে। এমনটাই ছিল তার মনোভাব। কিন্তু মুসলিম আইনজীবীরা ও রাজনীতিবিদেরা তাঁকে বাঁচানোর সর্বশেষ চেষ্টাটুকু করেছেন। জিন্নাহ পুরো ঘটনার জন্য উত্যক্তকারীদের দায়ী করে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু জিন্নাহর কোনো যুক্তিই গ্রাহ্য করেনি ব্রিটিশ আদালত। এরপর পরিস্থিতি উল্লেখ করে জিন্নাহ এই বলে আবেদন করেন যে, ইলমুদ্দিন একজন ১৯, ২০ বছরের ব্যক্তি যিনি তার বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি ভালবাসার কারণে উত্ত্যক্ত হয়েছিলেন। তাই তার মৃত্যুদন্ডকে যাবজ্জীবন অথবা দ্বীপান্তরে বদলানো যেতে পারে। কিন্তু এই আবেদনও আদালতে গৃহীত হয়নি। 

রাজপালের বিচার ছয়বছরেও শেষ করা যায়নি সেখানে মাত্র ছয় মাসে ইলমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করার সমস্ত আয়োজন শেষ করে ফেলেছে। এই হলো ব্রিটিশদের সুবিচারের নমুনা। ১৯২৯ সালের ৩১ অক্টোবর শহীদ ইলমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মিয়ানওয়ালিতে ইলমুদ্দিনকে কবর দেয়া হয় যেখানে মুসলিমরা তার লাশকে লাহোরে দাফন করতে চেয়েছিল। ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল যে, এটা একধরণের উত্তেজনা তৈরি করবে যা হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা তৈরি করতে পারে। আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল এবং মিয়া আবদুল আজিজ লাশ লাহোরে নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। এরপর তার দেহ কবর থেকে ১৫ দিন পর তুলে আনা হয় এবং লাহোরে আবার কবর দেয়া হয়।

ইলমুদ্দিনের লাশ ১৯২৯ সালের ১৪ নভেম্বরে পুনরায় কবর থেকে তোলা হয়। দুই দিন পর লাস লাহোরে পৌঁছে। সমস্ত শহর এবং আশেপাশের অনেক অঞ্চল থেকে মুসলিমরা তার জানাজায় আসে। ইলমুদ্দিনের বাবা আল্লামা ইকবালকে জানাজার নামাজের ইমাম হতে বলেন। কিন্তু আল্লামা ইকবাল সেটা করতে চাননি। তিনি বলেন, “আমি একজন পাপী ব্যক্তি, ইসলামের এই বীরের জানাজার নামাজের ইমাম হবার যোগ্যতা আমার নেই”। 

প্রায় ছয় লক্ষ মুসলিম এই জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। জানাজা পড়িয়েছেন সৈয়দ দিদার আলী শাহ । কবি এবং সাংবাদিক মওলানা জাফর আলী সেখানে ছিলেন। তিনি বলেন, “হায়! যদি আমি এরকম এক আশীর্বাদপুষ্ট সম্মান অর্জন করতে পারতাম!” আল্লামা ইকবাল এই লাশ বহন করে নিয়ে যান। যখন আল্লামা ইকবাল এই লাশটিকে তার কবরে রাখতে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বলেন, “এই অশিক্ষিত তরুণটি আমাদের মত শিক্ষিতদেরকে ছাড়িয়ে গেছে।”

২৯ অক্টোবর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৬০ : বাংলার ইলুমিনাতি 'নিউক্লিয়াস' সম্পর্কে কিছু কথা


আপনারা তো ফ্রি-মেসন, ইলুমিনাতি ইত্যাদি গুপ্ত সংগঠনের সাথে পরিচিত। পৃথিবীর সকল ষড়যন্ত্র নাকি তাদের দ্বারাই হয়। আমরা আজকে জানবো বাংলার ইলুমিনাতি নিয়ে। বাংলার এই গোপন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান। নোয়াখালীর সন্তান এই সিরাজুল আলম খান পড়েছেন ঢাকা ভার্সিটিতে গণিত বিভাগে। গণিতে পড়লেও গণিতবিদ না হয়ে হয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক। কমিউনিস্ট আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের মতো করে রাষ্ট্র কল্পনা করেছেন। তাই তিনি সিপিবি বা ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেননি। যোগ দিয়েছেন ছাত্রলীগে। 

এর বেসিক কারণ ছাত্রলীগ জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন। তিনি এর মধ্যে থেকেই তার নিজস্ব কর্মী রিক্রুটমেন্ট করতে সুবিধে হবে। ১৯৬১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যেহেতু পাকিস্তান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ রাষ্ট্র। তাই তিনি এখানে নিজেদের মতো করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। তাই তিনি প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন পূর্ব পাকিস্তানকে পকিস্তান থেকে আলাদা করা। পাকিস্তান থেকে বাংলাকে আলাদা করতে পারলেই কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। 

আজকে যদি একটি রাষ্ট্রের কথা বলতে বলি যে রাষ্ট্রের মানুষ শরিয়াহ আইন চায় তাহলে সবার আগে যে নামটি আসবে সেটি হলো আফগানিস্তান। তবে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আমরা যেই সময়ের কথা আলোচনা করছি সেই সময়ে আফগানিস্তানের অধিকাংশই ছাত্র-যুবকরাই কম্যুনিস্ট হয়ে পড়েছে। আশির দশকে তো সেখানে কম্যুনিস্টরা বিপ্লবই করে ফেলেছে। এই উপমহাদেশে কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে ছিল হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের সব রাজনৈতিক গোষ্ঠী। তবে কেউই আদর্শিক ও কার্যকরভাবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে নি। তাদের দর্শনের তাত্ত্বিক মোকাবেলা করেছেন মাওলানা মওদূদী। তার লেখা ও বক্তব্য মুসলিম সমাজে বেশ ভালো প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। 

আফগানিস্তানে তার শিষ্য তৈরি হয়েছে কাবুল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বুরহান উদ্দিন রব্বানী। সেখানের মুসলিম যুবকদের বিপথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। বাংলায় তাঁর শিষ্য তৈরি হয়েছে মাওলানা আব্দুর রহীম, প্রফেসর গোলাম আযম, একেএম ইউসুফ, আব্বাস আলী খান প্রমুখ। আর পাকিস্তানে তো মাওলানা মওদূদী নিজেই ছিলেন। সাথে ছিলো নঈম সিদ্দিকী, মিয়া তুফায়েল মোহাম্মদ, খুররম জাহ মুরাদ ইত্যাদি। পাকিস্তান ও বাংলায় তাই কম্যুনিস্টরা বিপ্লব করতে পারে নি। আফগানিস্তানে বিপ্লব করলেও বুরহান উদ্দিন রব্বানী, আহমদ শাহ মাসউদ, গুলুবুদ্দিন হেকমতিয়ারের চেষ্টায় আবারো আফগানিস্তানের ছাত্র-যুবকরা ইসলামের পথে ফিরে এসেছে, রুশ কম্যুনিস্টদের সাথে যুদ্ধ করেছে, জীবন দিয়েছে এবং ১৯৯২ সালে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। 

আমরা আবার আমাদের মূল আলোচনায় ফিরি। সিরাজুল আলম খান প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ হলেও গোপনে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ লালন করতেন। কিন্তু বাংলায় অনেকে কম্যুনিজম আদর্শ লালন করলেও ধর্ম থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাই সিরাজুল আলম ছাত্রলীগ ও শেখ মুজিবের ওপর ভর করেই কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। 

বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক করার লক্ষ্যে তিনি দেশকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করার বিষয়টা তার প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছেন। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি হওয়ার পর তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে দেন। তার প্রাথমিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি অনেকের সাথে আলাপ করেন। এর মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথেও তার যোগাযোগ হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে তার সাথে যুক্ত হয়েছে চিত্তরঞ্জন সুতার এবং কালিদাস বৈদ্য। তারা তাকে ভারতের পক্ষ হয়ে পরামর্শ ও তাদের যথাসম্ভব সাহায্য করার অঙ্গীকার করেন। 

যদিও ভারতের মূল লক্ষ্য ও সিরাজের মূল লক্ষ্য এক নয়। ভারত কোনোভাবেই বাম আদর্শ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে চায় না। তবে ভারত ও সিরাজের প্রাথমিক লক্ষ্য মিলে যাওয়ায় তারা একে অপরের সাথে কাজ করার অঙ্গীকার করে। সিরাজ ছাত্রলীগের সেক্রেটারি হয়ে সারাদেশ সফর করেন এবং নিজের মতে যাদের আনা যাবে এমন লোক বাছাই করতে থাকেন। ১৯৬১ সালে সিরাজ পরীক্ষামূলকভাবে ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করেন। কয়েকজন সহযোগী নিয়ে এই সংস্থার নামে লিফলেট বিতরণ করেন। তার এই উদ্যোগ ছাত্রসমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তিনি এখান থেকে সরে আসেন। ছাত্রলীগের বহু নেতা তাকে পাতি বিপ্লবী কিংবা রোমান্টিক বিপ্লবী বলে অভিহিত করেছিলো। 

এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সিরাজুল আলম খান প্রকাশ্যে আর স্বাধীনতা বা দেশ ভাগ নিয়ে কাজ করেন নি। ১৯৬২ সালে তিনি তৈরি করেছেন ইলুমিতানিদের মতো অথবা হাল আমলের জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর মতো একটি গুপ্ত সংগঠন। যার নাম নিউক্লিয়াস। পুরো নাম স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের একেবারে শুরুর নেতা হলেন চারজন। সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ ও আবুল কালাম আযাদ। এই সংগঠনের মিটিং সাধারণত হতো কাজী আরেফের বাসায়। নিউক্লিয়াস প্রথমে ধীরে ধীরে ছাত্রলীগ দখল করলো। সিরাজ ছাত্রলীগ কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। সবার কাছে স্পষ্টত যেটা মনে হতো ছাত্রলীগে দুইটি উপদল। একটির সিরাজের প্রভাবাধীন। আরেকটি অংশের নেতা শেখ ফজলুল হক মনি। 

সিরাজরা চেষ্টা করতো ছাত্রলীগের শাখা পর্যায়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা নিক্লিয়াসের মধ্যে থেকে যেন আসে। সেই চেষ্টা করতো। এদিকে সিরাজে বাইরের অংশ শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তা করতো। ফলে দেখা গিয়েছে কয়েকবছরের মধ্যে নিউক্লিয়াস যেভাবে যাকে চায় সেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসীন হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল মুজাহিদী। তিনি সিরাজের বলয়ের বাইরে থেকে উঠে আসা নেতা ছিলেন। আর আওয়ামীলীগের মূল দলে সিরাজের লোক ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ। তিনিও কমিউনিস্ট ছিলেন। আদর্শ গোপন করে তিনি শেখ মুজিবের একেবারে কাছের লোকে পরিণত হন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সময় থেকে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের একক নেতায় পরিণত হন। 

সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতা নিয়ে বড় নেতাদের মধ্যে শুধু মাওলানা ভাসানীর সাথে যোগাযোগ করেন। মাওলানা ভাসানী চীনপন্থী বাম ছিলেন। সেসময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো ছিল। সেই সুবাদে ভাসানী পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার অনুমতি চীন থেকে পান নি। কারণ পাকিস্তান ভাগ ভারতের পক্ষে যাবে যা চীনের জন্য ক্ষতিকর। চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকায় ভাসানী সিরাজের সাথে কাজ করতে পারেননি। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশভাগ চাইতেন কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার জন্য। 

এরপর সিরাজুল আলম আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের সাথে যোগাযোগ করেন তার নেতৃত্বে কাজ করার জন্য। আতাউর রহমান খান সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন কিন্তু তার সাথে কথা বলে সিরাজ নিশ্চিত হয়েছে তিনি পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের কট্টর সমর্থক, একইসাথে কম্যুনিজমের বিরোধী। এই প্রসঙ্গে সিরাজ বলেন আতাউর রহমানের পেছনে তার বহু সময় অপচয় হয়েছে। তাই সিরাজ বাধ্য হয়ে শেখ মুজিবের পক্ষেই থাকেন। তাকে মূল নেতা বানানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তবে সিরাজের ভাষ্যমতে তিনি মুজিবের কাছে তাঁর মূল পরিকল্পনা কখনোই পরিষ্কার করেন নি। 

ছয় দফাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগে যখন ভাঙ্গন দেখা দেয় তখন শেখ মুজিবকে একনিষ্ঠ সাপোর্ট দিয়েছেন নিউক্লিয়াস। শেখ মুজিবকে আওয়ামী লীগের একক নেতায় পরিণত করে নিউক্লিয়াস। শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ আসলে নিউক্লিয়াস সদস্যরা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মূল নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতেন। সিরাজের নির্দেশ হলেই কেবল তা বাস্তবায়ন হতো। কারণ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ তখন ছিল সিরাজের কাছে। এদিকে মুজিবও ছিল অসহায়। ছয় দফাকে জনপ্রিয় করতে গিয়ে মুজিব সিরাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ১৯৬৬ সাল থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত সকল ঘটনা ও দুর্ঘটনার সাথে জড়িত থাকে নিউক্লিয়াস। তারা বাংলায় একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়। তাদের স্বার্থে আঘাত এলে বাইরের মানুষকে নির্ভিঘ্নে খুন তো করতোই। সময়ে সময়ে নিজেদের লোককে খুন করতে দ্বিধা করতো না।          

৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র, মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন, ১১-দফা আন্দোলন পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন করে এই ‘নিউক্লিয়াস’। আন্দোলনের এক পর্যায়ে গড়ে তোলা হয় ‘নিউক্লিয়াসে’র রাজনৈতিক উইং বি.এল.এফ এবং সামরিক ইউনিট ‘জয় বাংলা বাহিনী’। এর সম্পর্কে একেবারে জানতেন না মুজিব, বিষয়টা এমন ছিল না। মুজিব মনে করতো সে নিউক্লিয়াসকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে সিরাজ ভাবতো তারা মুজিবকে ব্যবহার করছে। অবশ্য মুজিবকে দিয়ে আগরতলায় ভারতের সাথে ষড়যন্ত্র করা প্রমাণ করে মুজিব নিউক্লিয়াস দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন। তবে স্বাধীনতার পর মুজিবকে দিশেহারা করে ফেলে নিউক্লিয়াস। মুজিবও তাদের প্রচুর সদস্যকে খুন করেছে। নিউক্লিয়াসকে পুরো কন্ট্রোলে নিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান।   

পাকিস্তানী প্রশাসন প্রায়ই নিউক্লিয়াস সদস্যকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করাকালে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপে, চোরাচালানে ও অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করতো। তবে এর দায় বেশিরভাগ বহন করতে হতো ছাত্রলীগকে। কারণ প্রতিটি নিউক্লিয়াস সদস্য ছাত্রলীগ নেতা বা কর্মী। আরেকটি বিষয় নিউক্লিয়াসকে রক্ষা করেছে সেটা হলো তাদের স্লিপার সেল সিস্টেম। একজন সদস্য শুধুমাত্র তার উর্ধ্বতন ও তার অধস্থনকে চিনতো। এর বাইরে ওপরে শুধু সিরাজ, রাজ্জাক ও কাজী আরেফকে চিনতো। কোনো টিম ওয়ার্কের প্রয়োজন হলে ঐ কাজ পর্যন্তই তাদের যোগাযোগ ছিল। এর বাইরে কেউ কাউকে চিনতো না। তাই পাকিস্তানী প্রশাসন তাদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারে নি।    

কম্যুনিস্ট বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে ‘জয় বাংলা’ সহ সকল স্লোগান নির্ধারণ এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে “...এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বাক্যসমূহের সংযোজনের কৃতিত্ব ‘নিউক্লিয়াসে’র। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিরাজুল আলম খানের ভুমিকাই ছিল মুখ্য। ১৯৬৯-’৭০ সনে গন-আন্দোলনের চাপে ভেঙে পড়া পাকিস্তানী শাসনের সমান্তরালে ‘নিউক্লিয়াস’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠন করা হয় ছাত্র-ব্রিগেড, যুব-ব্রিগেড, শ্রমিক-ব্রিগেড, নারী-ব্রিগেড, কৃষক-ব্রিগেড, সার্জেন্ট জহুর বাহিনী। এদের সদস্যরা ভেঙ্গে পড়া পাকিস্তানী শাসনের পরিবর্তে যানবাহন চলাচল, ট্রেন-স্টীমার চালু রাখা, শিল্প-কারখানা উৎপাদন আব্যাহত রাখা এবং থানা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খ্লা রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে। নিউক্লিয়াসের সদস্যদের দ্বারা এইসব দুরূহ কাজ সাম্পাদনের জন্য কৌশল ও পরিকল্পনাও ‘নিউক্লিয়াস’র।

১৯৬৯ সাল নাগাদ নিউক্লিয়াসের-এর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজারে। ঊনসত্তরের পর তারা আর সদস্য সংখ্যা বাড়ায়নি। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বহু মানুষকে কাজে লাগিয়েছে। ১৯৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবকে জয়ী করতে হেন কাজ বাকী ছিল না যা তারা করেনি। পাকিস্তানের বিগত নির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা ঘটে নি। ১৯৭০ এর নির্বাচনে প্রথম সিরাজের পরিকল্পনায় নিউক্লিয়াস সদস্যরা কেন্দ্র দখল করে প্রচুর জাল ভোট দেয়। ফলে ন্যাপ, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের বহু জনপ্রিয় নেতা হেরে যায়। নিউক্লিয়াসের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। গুপ্ত সংগঠন নিউক্লিয়াসের দেখানো কেন্দ্র দখলের প্রসেস থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন আর কখনো বের হতে পারেনি।   

১৯৭১ সালে পহেলা মার্চ থেকে সারা বাংলায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে নিউক্লিয়াস। সাত মার্চের আগে তারা বহু অবাঙালিকে হত্যা করে। অবাঙালি শিল্পপতিদের সম্পদ লুটপাট করে। তাদের এসব কাজের বড় উদ্দেশ্য ছিল যাতে রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়। রাজনৈতিক সমঝোতা না হলেই তাদের দেশভাগ করা সহজ হবে। আর এজন্যই তারা ঝামেলা তৈরি করে। সারা দেশে সেনাবাহিনীর ওপর বিনা কারণে হামলা করে। ২৫ মার্চের আগে যখন ইয়াহিয়া, মুজিব ও ভুট্টো ঢাকায় ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনারত তখন নিউক্লিয়াস বিহারীদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা চেয়েছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীও যাতে পাল্টা একশনে যায়। যাতে গণহত্যার অভিযোগ এনে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী পাঠাতে পারে।  

নিউক্লিয়াস সদস্যের প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় সেনবাহিনীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে উন্নত সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত হন এবং ‘মুজিব বাহিনী’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনস্ত ১১টি সেক্টরের পাশাপাশি ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করে বি.এল.এফ নামে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা ও কৌশল ছিল কেবল ভিন্ন ধরনের নয়, অনেক উন্নতমানের এবং বিজ্ঞানসম্মত। বিএলএফ এর চার প্রধান ছিলেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। তবে তারা সর্বাত্মক যুদ্ধে নামার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। নিউক্লিয়াস আরেকটি কাজ করেছে তা হলো ১৪ ডিসেম্বর বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। এসব বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগ ছিল মাওবাদী অর্থাৎ চীনের পক্ষে। আর চীনের পক্ষে মানেই তারা ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে। 

১৯৭১ সনের ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় উদ্বোধনী সভা স্থগিত ঘোষণার পরপরই ২রা মার্চ বাংলাদেশর প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণসহ ৩রা মার্চ ‘স্বাধীন বাংলার ইশতেহার’ ঘোষণার পরিকল্পনাও ‘নিউক্লিয়াসে’র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এই দুটি কাজ ছিলো প্রথম দিক নির্দেশনা। আর এই দুই গুরুদায়িত্ব পালন করেন নিউক্লিয়াসের আ.স.ম আবদুর রব এবং শাজাহান সিরাজ। নতুন দেশের নাম 'বাংলাদেশ' হবে এ সিদ্ধান্তও সিরাজুল আলম খানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ও নিউক্লিয়াসের শীর্ষ নেতাদের দ্বারা অনুমোদিত।

২৬ অক্টোবর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৫৯ : আইয়ুবের ছয় দফা ও বিস্ময়কর রাজনৈতিক দুর্নীতি


১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক ভারত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটি স্থায়ী ছিল ১৭ দিন। কাশ্মীরসহ নানা ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতের বন্ধু রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং একটা চুক্তি হয়, যা তাসখন্দের চুক্তি বলে অভিহিত। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো ও সাধারণ জনগণ এই চুক্তি মানে নি। এটা ছিল সূবর্ণ সুযোগ কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের। কিন্তু আইয়ুবের কূটনৈতিক ব্যর্থতায় তা হলো না। ক্ষেপে উঠে রাজনীতিবিদেরা ও পাকিস্তানী জেনারেলরা। আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো জোট গঠনের চেষ্টা করে। এতে নেতৃত্ব দেয় মুসলিম লীগ। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোরে সেই মিটিঙে আরো অংশগ্রহন করে আওয়ামীলীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামী। আওয়ামীলীগের পূর্ব পাকিস্তানের সেক্রেটারী মুজিবকে সেই সম্মেলনে এটেইন করার জন্য বলেন নিখিল আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান। 

মুজিব প্রথমে নিজে সেই সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে চান নি। কারণ তিনি কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে কনসার্ন ছিলেন না। তিনি শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলকে প্রস্তুত করেন। কিন্তু হঠাত কোনো কথাবার্তা ছাড়া শেখ মুজিব নিজেই যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেই। শাহ আজিজের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে নয়, নিজের ইচ্ছেমতো কয়েকজনকে নিয়ে যান লাহোরে তাসখন্দ চুক্তি ও কাশ্মীর নিয়ে পর্যালোচনার জন্য।   

সেই সম্মেলনের এজেন্ডায় মুজিব ৬ দফা ঘোষনার বিষয়টি যুক্ত করার আহ্বান জানান। কিন্তু অন্যান্য বিরোধী দল তা মেনে নেন নি। তারা বলেন, আমরা আজ একত্রিত হয়েছি কাশ্মীর, তাসখন্দ ও আইয়ুব খান কে নিয়ে। ফলে মিটিঙের কার্যসূচী থেকে ছয় দফা বাদ পড়ে। মুজিব সভাস্থল ত্যাগ করে। মজার বিষয় হল নিখিল পাকিস্তানের আ. লীগ প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান এতে বিস্মিত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এই ছয় দফা নিয়ে আ. লীগে ভাঙ্গন দেখা দেয়। শুধু তাই নয় যারা সেই মিটিঙে আ. লীগের অন্যান্য নেতা যারা মুজিবের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন তারাও আগে থেকে কিছুই জানতেন না ৬ দফার ব্যাপারে।

দুঃখজনক ও বিস্ময়কর হলেও সত্য মূলত এই ছয় দফার কারিগর ছিলেন আইয়ুব খান। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সেনা অফিসার ও রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি তাসখন্দ থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে। এবং ৬ দফার বিরোধী হয়ে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ প্রভাব বজায় রাখতে সবাই যেন তার হাতকেই শক্তিশালী করে। পরিশেষে কিন্তু তাই হয়েছিলো। আইয়ুব ৬ দফাকে হাতিয়ার করে বাঁচতে চেয়েছিলেন। আইয়ুব তথ্য সচিব আলতাফ গওহরকে দিয়ে ৬ দফা প্রনয়ন করেন। আলতাফ সাহেব কর্মসূচীটি রুহুল কুদ্দুসকে দেন। রুহুল কুদ্দুস ছিলেন মুজিবের ইনার সার্কেল। তিনি সেটা কৃষি ব্যংকের এম ডি খায়রুল বাশারকে দিয়ে টাইপ করিয়ে বিমানে উঠার আগ মুহুর্তে মুজিবের হাতে গুঁজে দেন।

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে এই কারণে যে, আলতাফ গওহর পাকিস্তানের সমস্ত পত্র-পত্রিকাকে নির্দেশ দেন এই মর্মে যেন তারা ৬ দফার বহুল প্রচার করে। এভাবেই ছয় দফা আলোচিত হয়। নতুবা বিরোধীদের মিটিঙে যেই ছয় দফা নিয়ে কোন আলোচনাই হয় নি সেই ছয় দফা নিয়ে মাতামাতি করার কোন কারণ নেই। লাহোরে ৫ তারিখ ৬ দফা উত্থাপন না করতে পেরে মুজিব ১০ ফেব্রুয়ারী সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে পত্রিকাগুলো আরো রসদ পায়। মানুষ ভুলে যায় তাসখন্দ কিংবা কাশ্মীর সমস্যা। রাজনীতিবিদ ও সামরিক অফিসারদের মাথা ব্যাথার কারণ হয় ৬ দফা। একবার আইয়ুব ভারত বিরোধীতাকে পুঁজি করে যুদ্ধ লাগিয়ে সবার সমর্থন নিজের দিকে নিতে চেয়েছিলেন। কূটনীতিক ব্যর্থতায় সবার সমর্থন হারিয়ে এবার ছয় দফাকে পুঁজি করে আবার পরিস্থিতি তার দিকে নিতে চেয়েছিলেন। 

এদিকে মুজিবের অবস্থাও ভালো নয়। আওয়ামী লীগের অধিকাংশই ৬ দফা মানে নি। দফা গুলোর সাথে তাদের বিরোধ না হলেও তাদের মূল বিরোধ মুজিবকে নিয়ে। মুজিবের কারো সাথে পরামর্শ না করে এরকম স্বৈরাচারী টাইপের ঘোষণা কেউ মেনে নিতে পারে নি। ১৯৬৬ সালের ১৮-১৯ মার্চ ঢাকায় পূর্ব-পাকিস্তানের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এতে অন্যান্য মেম্বার সহ লীগ সভাপতি আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের প্রবল আপত্তির মুখে মুজিব ছয় দফা পাশ করাতে ব্যর্থ হয়। এর মাধ্যমে ছয় দফার সাথে আ. লীগের আর কোন সম্পর্ক থাকে না। হতাশ মুজিব তার শেষ অস্ত্র ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেন।

এই প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রী ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন। দুঃখভরা মন নিয়ে শেখ মুজিব আমাদের(ছাত্রলীগ) ডাকলেন। বললেন, আমি তো বিপদে পড়ে গেছি। আমারে তোরা কি সাহায্য করবি না? ছয় দফা বলার পর থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে আমার অপর এটাক আসছে। আমার তো এখন ঘরে বাইরে শত্রু। আমরা তখন বললাম নিশ্চয়ই আপনার পাশে থাকবো। যাই হোক ফ্যসিবাদী মুজিব ছাত্রলীগের গুন্ডাদের সহযোগিতায় সভাপতি তর্কবাগীশকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এরপর মুজিব নিজের পক্ষের লোকদের নিয়ে কাউন্সিল করেন। এবারের কাউন্সিল সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয় শেখ মুজিবকে। এরপর শেখ মুজিব ছয় দফার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। অন্যদিকে আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আরেকটি ধারা চালু থাকে। তবে যেহেতু সেই আওয়ামী লীগের আলাদা কোনো কর্মসূচী ছিল না, তাই তারা তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় নি।  

এভাবেই আইয়ুব-মুজিব ষড়যন্ত্রে নষ্ট হয়ে যায় কাশ্মীরের মুসলমানদের ভাগ্য। হয়তো তখন পাকিস্তানী জেনারেলরা তাসখন্দ চুক্তিকে বাতিল করে ভারতকে চাপ দিয়ে কাশ্মীর নিয়ে আরেকটি সমাধানে পৌঁছাতে পারতো। কিন্তু ছয় দফাকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ করে তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ঐক্য বজায় রাখাকে জোর দেয়। পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে ইচ্ছেকৃত সমস্যা তৈরি করে বিরোধী দলগুলোর ঐক্য বিনষ্ট করার মাধ্যমে নিজের হাতকেই শক্তিশালী করে আইয়ুব। অন্যদিকে চোখের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে যায় কাশ্মীর ইস্যু। 

ড: আনিসুজ্জামান এই প্রসঙ্গে বলেন,

"ছয় দফার প্রণেতা কে, এই নিয়ে অনেক জল্পনা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন সিভিল সার্ভিসের কয়েকজন সদস্য এটা তৈরি করে শেখ মুজিবকে দিয়েছিলেন, কেউ কেউ সে কৃতিত্ব কিংবা দোষ দিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিককে। তাদের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছিল, সে বিচারও হয়েছিল। প্রথমে উঠেছিল ভারতের নাম। কিন্তু পাকিস্তান হওয়া অবধি তো দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ভারতের প্ররোচনা বলে। পরে বড়ো করে যে নাম উঠলো, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব এবং ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্টের বন্ধুত্বের কারণে পাকিস্তান ভাঙার উদযোগ নিচ্ছে মার্কিনরা, এমন একটা ধারণা খুব প্রচলিত হয়েছিল।

আমরা যারা একটু বামঘেঁষা ছিলাম, তারা এই ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছিলাম। ফলে, ফেডারেল পদ্ধতি ও স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষপাতী হলেও ছয় দফাকে আমরা তখন গ্রহণ করিনি। আমরা আরো শুনেছিলাম যে, পাকিস্তান ভাঙতে পারলে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করতে দেওয়া হবে; সুতরাং এ কাজে মার্কিনদের উৎসাহ তো থাকবেই। যদি প্রশ্ন উঠতো যে, পাকিস্তান তো সেনটো-সিয়াটোর সদস্য, তাহলে জবাব পাওয়া যেতো যে, পাক-ভারত যুদ্ধের পরপ্রেক্ষিতে ওসব জোটের অসারতা প্রমাণ হয়ে গেছে এবং পাকিস্তান যে কোন সময় তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান কখনোই এসব সামরিক জোট ছাড়েনি, তবে আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্সে’র প্রচারিত নীতি কিছুটা এ ধারণাকে পুষ্ট করেছিল।”

আওয়ামী লীগ নেতা ও শেখ মুজিবের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) ছয় দফা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বলেন। তার ভাষ্যমতে,

//(তাসখন্দে) কয়দিন আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও লালবাহাদুর শাস্ত্রী একটি যুক্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলেন। সিদ্বান্ত হল, শান্তিপূর্ণভাবে উভয় পক্ষ নিজেদের ছোট বড় সমস্যার সমাধান করবে। আশ্চর্যের কথা, যা নিয়ে যুদ্ধ, অর্থাৎ কাশ্মীর, তার নামগন্ধও এই ঘোষণাপত্রে উল্লেখ রইল না। এত কান্ড করে, এত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে, সারা পাকিস্তানকে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত হল, ওম্ শান্তি।

পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য শহর বাজার গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেরা সৈনিক নিহত হয়েছেন। পৃথিবীর কোন যুদ্ধে নাকি এত অল্প সময়ে এত অফিসার নিহত হয় নাই। তাদের স্থান পূরণ সম্ভব হবে না। তাই, পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরুপ ছিল। এত ক্ষয়ক্ষতির পর আয়ুব খাঁ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে অপমান-জনক একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করলেন। দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এই চুক্তি অপরাধ স্বীকৃতির শামিল বলে তারা মনে করে।

যে সব সৈনিক কর্মচারী শহীদ হয়েছেন তাদের বিধবা স্ত্রী ও পরিবারবর্গ এক মিছিল বার করল লাহোর শহরে। ধ্বনি তুলল, আমাদের স্বামী পুত্র ফেরত দাও। তারা শাহাদাত বরণ করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন নাই। অনর্থক আপনি তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছেন। অকারণে তাদের অমূল্য জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। যদি দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য হতো, তা হলে আপনি এমন চুক্তি কেন স্বাক্ষর করলেন? ইত্যাদি –

পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য ফেব্রুয়ারী মাসের পাঁচ-ছয় তারিখে নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স আহ্বান করলেন। এই উপলক্ষে চৌধুরী মহম্মদ আলি ও নবাবজাদা নসরুল্লাহ খাঁ ঢাকা এসে সব দলের সাথে আলাপ আলোচনা করে কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। বললেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক এই মূহুর্তে আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করা উচিত।

জামাত, নিজামে ইসলামীও কাউন্সিল লীগ যোগদানে সম্মতি দিল। আওয়ামী লীগেরও দোমনাভাব। শেখ মুজিবের মতামতই দলের মত। প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন অভিমত নাই। শেখ মুজিব কনফারেন্সে যোগদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। এন-ডি-এফ সভা করে মত প্রকাশ করল যে, কনফারেন্সের পক্ষে আমাদের নৈতিক সমর্থন রয়েছে, তবে বর্তমান অবস্থায় কোন সদস্য এতে যোগদান করতে পারছেনা। শেখ মুজিব আমাকে টেলিফোনে বললেন, আপনারা ঠিকই করেছেন। আমরাও যাবনা।

পরদিন সংবাদপত্রে দেখি, শেখ মুজিব সদলবলে লাহোর যাচ্ছেন। প্রায় চৌদ্দ পনেরো জন এক দলে। ব্যাপার কি? হঠাৎ মত পরিবর্তন। মতলবটা কি?

লাহোর কনফারেন্স শুরু হল গভীর উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে।

অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ একটি বোমা নিক্ষেপ করলেন – ‘ছয় দফা’। প্রস্তাব বা দাবীর আকারে একটা রচনা নকল করে সদস্যদের মধ্যে বিলি করা হল। কোন বক্তৃতা বা প্রস্তাব নাই, কোন উপলক্ষ নাই, শুধু কাগজ বিতরণ। পড়ে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। জাতীয় কনফারেন্সে এই দাবী নিক্ষেপ করার কি অর্থ হতে পারে? কনফারেন্স ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সম্মিলিত হয়েছে। এই দাবী যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, এই সম্মেলন ও এই সময় তার উপযোগী নয় – সম্পূর্ণ অবান্তর।

তারপর দলবলসহ শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে এসে মহাসমারোহে ‘ছয় দফা’ প্রচার করলেন সংবাদপত্রে। শেখ মুজিবের দাবী ও নিজস্ব প্রণীত বলে ছয়-দফার অভিযান শুরু হয়ে গেল।

ছয় দফার জন্মবৃত্তান্ত নিম্নরুপ : কিছুসংখ্যক চিন্তাশীল লোক দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরাবস্থার কথা আলাপ আলোচনা করেন। আমাদের ইঙ্গিত ও ইশারা পেয়ে তারা একটা খসড়া দাবী প্রস্তুত করলেন। তারা রাজনীতিক নয় এবং কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টও নয়। তারা ‘সাতদফার’ একটা খসড়া আমাদের দিলেন। উদ্দেশ্য, এটা স্মারকলিপি হিসাবে আয়ুব খাঁর হাতে দেওয়া, কিংবা জাতীয় পরিষদে প্রস্তাবাকারে পেশ করার ব্যবস্থা করা।

এই খসড়ার নকল বিরোধীদলীয় প্রত্যেক নেতাকেই দেওয়া হয়। শেখ মুজিবকেও দেয়া হয়। খসড়া রচনার শেষ বা সপ্তম দফা আমরাও সমর্থন করি নাই। শেখ মুজিব সেই দফা কেটে দিয়ে ছয়দফা তারই প্রণীত বলে চালায়ে দিল। তারপর বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা ছয় দফার দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক মর্ম ও তাৎপর্য লেখায়ে প্রকাশ করা হয়। ইংরেজী ও বাংলায় মুদ্রিত হয়ে পুস্ত্কাকারে প্রচারিত হয় সারা দেশব্যাপী।

লাহোর কনফারেন্স বানচাল হয়ে গেল। নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকেই এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেন। তারা অভিযোগ করেন, শেখ মুজিব সরকার পক্ষ থেকে প্ররোচিত হয়ে এই কর্ম করেছেন। লাহোরে পৌঁছার সাথে সাথে আয়ুব খাঁর একান্ত বশংবদ এক কর্মচারী শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে কি মন্ত্র তার কানে ঢেলে দেয় যার ফলেই শেখ মুজিব সব উলটপালট করে দেয়। তারা এও বলে যে আওয়ামী লীগের বিরাট বাহিনীর লাহোর যাতায়াতের ব্যয় সরকারের নির্দেশে কোন একটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বহন করে। আল্লাহ আলীমূল গায়েব।//

ছয় দফায় করা দাবিসমূহ নিম্নরূপ :

১. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষদ সার্বভৌম হবে;

২. ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে শুধু দুটি বিষয়, প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক, এবং অপর সব বিষয় ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত রাজ্যসমূহের হাতে ন্যস্ত থাকবে;

৩. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটিই মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে, একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও দুটি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থাকবে। তবে এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পুঁজি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে তার ব্যবস্থা সম্বলিত সুনির্দিষ্ট বিধি সংবিধানে সন্নিবিষ্ট করতে হবে;

৪. দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব থাকবে এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা রাজ্যের হাতে থাকবে। তবে ফেডারেল সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দুই অঞ্চল থেকে সমানভাবে কিংবা উভয়ের স্বীকৃত অন্য কোনো হারে আদায় করা হবে;

৫. দুই অংশের মধ্যে দেশিয় পণ্য বিনিময়ে কোনো শুল্ক ধার্য করা হবে না এবং রাজ্যগুলো যাতে যেকোন বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে সংবিধানে তার বিধান রাখতে হবে।

৬. প্রতিরক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে আধা-সামরিক রক্ষীবাহিনী গঠন, পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করতে হবে।

১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ ঢাকায় আইয়ুব খান ছয় দফাকে উদ্দেশ করে বলেন, দেশের অখণ্ডতাবিরোধী কোনো কিছু সহ্য করা হবে না। প্রয়োজনে অস্ত্রের মুখে তার জবাব দেওয়া হবে। এর মধ্যে আইয়ুব কয়েকবার শেখ মুজিবকে এরেস্ট করেন এবং ছেড়ে দেন। আইয়ুব ও শেখ মুজিবের মধ্যে পারস্পরিক হুমকি ও উত্তপ্ত কথাবার্তা ছয় দফাকে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে। এদিকে তর্কবাগীশের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামীলীগ দিন দিন জনপ্রিয়তা হারায়। অন্যান্য বিরোধীদলগুলোও কোনো ভালো কর্মসূচি দিতে পারে নি। 

এদিকে মুজিবের ছয় দফাকে কেন্দ্র করে নতুন করে স্বপ্ন দেখে আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকা গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াস ও বামপন্থী দলগুলো। ছয় দফাকে কেন্দ্র করে যতগুলো কর্মসূচি (হরতাল, বিক্ষোভ, জ্বালাও-পোড়াও, ও অবরোধ) হয়েছে তাতে নিউক্লিয়াস সদস্য ও কম্যুনিস্টদের খুবই একটিভ দেখা গিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকে আলাদা করে সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজম কায়েম করা। এক্ষেত্রে তারা মুজিবের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও ছয় দফাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলো। এভাবে আইয়ুব-মুজিব ষড়যন্ত্রে রাজনৈতিক দুর্নীতির মধ্যে দিয়ে জন্ম নেয়া ছয় দফার পক্ষে জনমত তৈরি হয়েছিল।    

লুকমান ও তাঁর উপদেশমালা


জাহেলি যুগে আরবরা এক জ্ঞানী ব্যক্তির নাম জানতেন। তাকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর নাম লুকমান। বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী হিসেবে আরবে লুকমান বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি আরবদের কাছে লুকমান হাকিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জাহিলী যুগের কবিরা যেমন ইমরাউল কায়েস, লবিদ, আ'শা, তারাফাহ প্রমুখ তাদের কবিতায় তার কথা বলা হয়েছে। আরবের অনেকের কাছে "সহিফা লুকমান" নামে তার উপদেশগুলোর একটি সংকলন পাওয়া যেতো। 

মদিনায় হিজরতের তিন বছর পূর্বে মদীনার সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি নবী সা.-এর দাওয়াতের প্রভাবিত হন তিনি ছিলেন সুওয়াইদ ইবনে সামেত। তিনি হজ্ব সম্পাদন করার জন্য মক্কায় যান। সেখানে নবী করীম সা. নিভৃতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত হাজীদের আবাসস্থলে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। সুওয়াইদ ইবনে সামেত যখন নবী সা.-এর বক্তৃতা শুনেন, তাকে বলেন, আপনি যে টাইপের কথা বলেছেন সে টাইপের একটি জিনিস আমার কাছেও আছে। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি? তিনি জবাব দেন সেটা লুকমানের পুস্তিকা। 

তারপর নবী করীমের সা.-এর অনুরোধে তিনি তার কিছু অংশ পাঠ করে তাকে শুনান। রাসূল সা. বলেন, এটা বড়ই চমৎকার কথা! তবে আমার কাছে এর চেয়েও বেশি চমৎকার কথা আছে। এরপর তিনি কুরআন থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শুনান। কুরআন শুনে সুওয়াইদ রা. স্বীকার করেন, নিসন্দেহে এটা লুকমানের পুস্তিকার চেয়ে ভালো। এই সুওয়াইদ ইবনে সামেত তার যোগ্যতা, বীরত্ব, সাহিত্য ও কাব্য মনীষা এবং বংশ মর্যাদার কারণে মদীনায় "কামেল" নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু নবী সা.-এর সাথে সাক্ষাতের পর যখন তিনি মদীনায় ফিরে যান তার কিছুদিন পর বুয়াসের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং তাতে তিনি মারা যান। তার গোত্রের লোকদের সাধারণভাবে এ ধারণা ছিল যে, নবী সা.-এর সাক্ষাতের পর তিনি মুসলমান হয়ে যান।

লুকমানের জন্মপরিচয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। লোকমুখে প্রচলিত কবিতা ও স্মৃতিকথা অনুসারে অনেকে হযরত লুকমানকে আদ জাতির অন্তর্ভুক্ত ইয়েমনের বাদশাহ মনে করতো। মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদবী এসব বর্ণনার ওপর নির্ভর করে তার "আরদুল কুরআন" গ্রন্থে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, আদ জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নাযিল হবার পর হযরত হুদ আ.-এর সাথে তাদের যে ঈমানদার অংশটি বেঁচে গিয়েছিল লুকমান ছিলেন তাদেরই বংশোদ্ভূত। ইয়েমেনে এ জাতির যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অন্যতম শাসক ও বাদশাহ। 

কিন্তু কতিপয় প্রবীণ সাহাবী ও তাবেঈদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্য বর্ণনাগুলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, লুকমান ছিলেন একজন হাবশি গোলাম। হযরত আবু হুরাইরা রা., মুজাহিদ, ইকরিমাহ এসব গবেষকরাও এই কথাই বলেন। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী রা. বলেন, তিনি ছিলেন নূবার অধিবাসী। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াবের উক্তি হচ্ছে, তিনি মিশরের কালো লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ তিনটি বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করছে। কারণ আরবের লোকেরা কালো বর্ণের মানুষদেরকে সেকালে প্রায়ই হাবশি বলতো। আর নূবা হচ্ছে মিসরের দক্ষিণে এবং সুদানের উত্তরে অবস্থিত একটি এলাকা। তাই তিনটি উক্তিতে একই ব্যক্তিকে নূবী, মিসরীয় ও হাবশী বলা কেবলমাত্র শাব্দিক বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থের দিক দিয়ে এখানে কোন বিরোধ নেই। 

লুকমান নবী ছিলেন না এই ব্যাপারে মোটামুটি সব গবেষকই একমত। তিনি ছিলেন একজন বিশ্বাসী, পরহেযগার, ওলী এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একজন হাবশি ক্রীতদাস ও ছুতার ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব বলেন, তাঁকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল, কিন্তু নবুয়্যত দেওয়া হয়নি। লুকমান সম্পর্কে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “তিনি ছিলেন বেঁটে, উঁচু নাক ও মোটা ঠোঁট বিশিষ্ট একজন জ্ঞানী ব্যক্তি।”

হযরত খালিদ রাবি রহ. বলেন, হযরত লুকমান ছিলেন একজন হাবশী ক্রীতদাস ও ছুতার। একদিন তার মনিব তাঁকে বলেন, “তুমি একটি বকরি যবেহ করো এবং ওর গোশতের উৎকৃষ্ট দু’টি টুকরা আমার কাছে নিয়ে এসো।” তিনি হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা নিয়ে আসলেন। কিছুদিন পর পুনরায় তাঁর মনিব তাঁকে এই আদেশই করলো এবং বকরির গোশতের নিকৃষ্ট দু’টি খণ্ড আনতে বললো। তিনি এবারও উক্ত দুটি জিনিসই নিয়ে আসলেন। তার মনিব তখন বললো: “ব্যাপার কী? এটা কী ধরনের কাজ হলো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এ দু’টি যখন ভালো থাকে তখন দেহের কোনো অঙ্গই এ দু’টির চেয়ে ভাল নয়। আবার এ দুটি জিনিস যখন খারাপ হয়ে যায় তখন সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস এ দু’টোই হয়ে থাকে।” 

একদা হযরত আবু দারদা রা. হযরত লুকমান হাকিমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, হযরত লুকমান কোনো বড় পরিবারের লোক ছিলেন না এবং ধনী ও সম্ভ্রান্ত বংশেরও ছিলেন না। তবে তাঁর মধ্যে বহু উত্তম গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি ছিলেন চরিত্রবান, স্বল্পভাষী, চিন্তাশীল ও দূরদর্শী। তিনি দিনে শয়ন করতেন না, লোকজনের সামনে থুথু ফেলতেন না, মানুষের সামনে প্রস্রাব, পায়খানা ও গোসল করতেন না, বাজে কাজ হতে দূরে থাকতেন। তিনি হাসতেন না এবং যে কথা বলতেন তা জ্ঞানপূর্ণ কথাই হতো। তাঁর ছেলে মারা গেলে তিনি ক্রন্দন করেননি। তিনি বাদশাহ ও আমীরদের দরবারে একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই গমন করতেন যে, যেন চিন্তা-গবেষণা এবং শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সুযোগ লাভ হয়। এ জন্যেই তিনি পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে লুকমানের কথা উল্লেখ করে আরবদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু তারা আগে থেকে লুকমানকে শ্রদ্ধা করতো তাই লুকমানের উপদেশগুলো তিনি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। লুকমানকে দেওয়া অনুগ্রহের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা লুকমানের ১২ নং আয়াতে বলেন, আমি অবশ্যই লুকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেতো তা করে নিজের জন্য এবং কেউ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহতো অভাবমুক্ত, চির প্রশংসিত।

মক্কার কাফেরদের আল্লাহ তায়ালা লুকমানের উপদেশমালা থেকে কিছু উপদেশ শুনিয়েছেন। যাতে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই উপদেশগুলো লুকমান তার ছেলের উদ্দেশে করেছেন।  

শিরক : 

আর স্মরণ করো, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয়ই শিরক হল বড় জুলুম। (লুকমান ১৪)

আল্লাহর পরিচয় : 

'হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয় তা (পাপ- পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থেকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা যমীনে, আল্লাহ্ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সুক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। (লুকমান ১৬)

সালাত : 

'হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ করো, আর তোমার উপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এটা অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (লুকমান ১৭)

অহংকার :

আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না, মুখ ফিরিয়ে নিও না। এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (লুকমান ১৮)

শিষ্টাচার :

‘আর তুমি তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো; নিশ্চয় শব্দের মধ্যে গর্দভের শব্দই সবচেয়ে অপ্রীতিকর। (লুকমান ১৯)

সর্বশেষ উপদেশের ক্ষেত্রে কোনো কোনো মুফাসসির এর এই অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, "দ্রুতও চলো না এবং ধীরেও চলো না বরং মাঝারি গতিতে চলো।" কিন্তু উস্তাদ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী লিখেছেন, এখানে ধীরে বা দ্রুত চলা আলোচ্য বিষয় নয়। ধীরে বা দ্রুত চলার মধ্যে কোন নৈতিক গুণ বা দোষ নেই এবং এ জন্য কোন নিয়মও বেঁধে দেয়া যায় না। কাউকে দ্রুত কোনো কাজ করতে হলে সে দ্রুত ও জোরে চলবে না কেন! আর যদি নিছক বেড়াবার জন্য চলতে থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে ধীরে চলায় ক্ষতি কি? মাঝারি চালে চলার যদি কোনো মানদণ্ড থেকেই থাকে, তাহলে প্রত্যেক অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাকে একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত কঠিন।

এখানে মূলত চাল-চলনের কথা বলা হয়েছে যার সাথে বেশভূষা, ভঙ্গিমা ইত্যাদি নির্ভর করে। যেমন এমনভাবে না চলা যাতে অহংকার বা অহমিকা প্রকাশ পায়। এমন চালচলনও না হওয়া যা দ্বারা দীনতা ও হীন মনোভাব ফুটে ওঠে। অনেকে কৃত্রিম বিনয় নিয়ে চলে তা থেকেও দূরে থাকা। লুকমানের উপদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজের মনের এসব অবস্থার পরিবর্তন করো এবং একজন সোজা-সরল- যুক্তিসঙ্গত ভদ্রলোকের মতো চলো। যেখানে নেই কোনো অহংকার ও দম্ভ এবং কোনো দুর্বলতা অথবা লোক দেখানো বিনয় ও ত্যাগ। 

উস্তাদ মওদূদী একটি ঘটনা উল্লেখ করেন, হযরত উমর রা. একবার এক ব্যক্তিকে মাথা হেঁট করে চলতে দেখলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন, "মাথা উঁচু করে চলো। ইসলাম রোগী নয়।" আর একজনকে তিনি দেখলেন যে কুঁকড়ে চলছে। তিনি বললেন, "ওহে জালেম! আমাদের দ্বীনকে মেরে ফেলছো কেন? 

এ দুটি ঘটনা থেকে জানা যায় , হযরত উমরের কাছে দীনদারীর অর্থ মোটেই এটা ছিল না যে, পথ চলার সময় রোগীর মতো আচরণ করবে এবং অযথা নিজেকে দীনহীন করে মানুষের সামনে পেশ করবে। বরং কোনো মুসলমানকে এভাবে চলতে দেখে তার ভয় হতো, এভাবে চললে অন্যদের সামনে ইসলামের ভুল প্রতিনিধিত্ব করা হবে এবং মুসলমানদের মধ্যেই নিস্তেজ ভাব সৃষ্টি হয়ে যাবে।

২১ অক্টোবর, ২০২০

শরয়ী দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ


ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বেসিক্যালি দুই প্রকার। দারুল ইসলাম ও দারুল হারব।  ফিকহবিদেরা দারুল হারবকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। দারুল আমান ও দারুল হারব। 

তাহলে রাষ্ট্রের তিনটি প্রকার পাওয়া গেল। 

১- দারুল ইসলাম 

২- দারুল আমান 

৩- দারুল হারব 

দারুল ইসলাম

দারুল ইসলাম হলো সেই রাষ্ট্র যেই রাষ্ট্রের মূলনীতি হলো ইসলাম। সেই রাষ্ট্র আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রের সকল বিচার-ফয়সালা ইসলাম অনুযায়ী হয়ে থাকে। এই রাষ্ট্রের প্রকৃত উদাহরণ হলো মদিনাতুন্নবি। এরপর খুলাফায়ে রাশেদার সময়কাল। দারুল ইসলামের অনুত্তম উদাহরণ হলো আব্বাসীয় খিলাফত, উমাইয়া খিলাফত, তুর্কি খিলাফত ইত্যাদি। বর্তমানে দারুল ইসলামের অধম উদাহরণ সৌদি আরবসহ কিছু রাষ্ট্র, যেখানে মূলনীতি ইসলাম কিন্তু শাসক জালিম ও ক্ষেত্রবিশেষে ইসলামকে অনুসরণ করে না। 

দারুল আমান

দারুল আমান হলো সেই রাষ্ট্র যেখানে ইসলাম ও মুসলিমরা নিরাপত্তা পায়। ইসলাম প্রচারের সুযোগ পায়। কিন্তু রাষ্ট্রের বিধিবিধান ইসলামসম্মত নয়। রাষ্ট্রের মূলনীতিও ইসলাম নয়। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সেখানে প্রতিষ্ঠিত নয়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সময়ে এরকম রাষ্ট্রের উদাহরণ হলো আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া)। বর্তমানে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা এই জাতীয় রাষ্ট্র। 

দারুল হারব    

দারুল হারব সেইসব রাষ্ট্র যেখানে মুসলিমরা নির্যাতিত হয়। তাদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়। মুসলিম হওয়ায় তারা নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সময়ে এর উদাহরণ হলো মক্কা নগরী। বর্তমানে আরাকান, ভারত, ফিলিস্তিন, সিংকিয়াং ইত্যাদি। 

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামো দারুল ইসলামের দিকে পরিবর্তিত করা। আমরা যদি দারুল ইসলামে থাকি তবে তা রক্ষা করা আমাদের ওপর ফরজ। যদি দারুল আমানে থাকি তবে তাও রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কাঠামো দারুল ইসলাম থেকে দারুল আমানের দিকে অথবা দারুল হারবের দিকে পরিবর্তিত করা কুফরি ও আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। 

যদি কখনো দারুল ইসলামে ও দারুল আমানে জালিম শাসক প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে শাসকের সমালোচনা করাও জরুরি। একজন মুসলিমের দায়িত্ব সে জালিম শাসকের সামনে হক কথা বলবে। কিন্তু জালিম শাসক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে দারুল হারবের সহায়তা নিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তন করে দারুল হারবে চলে যাওয়া কুফরি। 

১৯৪৭-১৯৭১ সালের পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম আমি বলবো না। তবে নিঃসন্দেহে দারুল আমান বলা যায়। এই অঞ্চলের মুসলিমদের নিরাপত্তায় এই রাষ্ট্রের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা নেই। গত শতাব্দিতে যখন সারা পৃথিবীতে মুসলিমরা পরাজিত হচ্ছিল সেই সময়ে ইসলামের নাম নিয়ে এই রাষ্ট্র কুফরি শক্তিগুলোর চক্ষুশূল হয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর এর জন্য অকাতরে রক্ত দিয়েছে মুসলিমরা। ভারতের মুশরিকরা লক্ষাধিক মুসলিমকে খুন করেছে।  

যদিও এই রাষ্ট্র ইসলামের নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে পরে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠা করতে রাজি হয় নি সেক্যুলাররা। এর জন্য আলেমদের আন্দোলন করতে হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আলেমরা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন করে। ফলশ্রুতিতে এই রাষ্ট্রের মূলনীতিতে ইসলাম নির্ধারিত হয়। ৪৭-৭১ এই সময়ে পাকিস্তানের শাসকদের মধ্যে যারা স্বৈরাচারী ও ইসলামবিরোধী আচরণ করেছে তাদের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল জামায়াতে ইসলামী। এই কারণে জামায়াত দুইবার নিষিদ্ধ হয়। একবার সরকার প্রধান ছিল বাঙালি মোহাম্মদ আলী বগুড়া অন্যবার সরকার প্রধান ছিল পশতুন আইয়ুব খান।  

যখন ইয়াহিয়া, জুলফিকার ও মুজিব সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করছে তখন মুক্তিযোদ্ধারা সারাদেশে নির্দোষ ও অরাজনৈতিক বিহারীদের ওপর গণহত্যা চালায়। এর ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে দারুল হারব ভারতের সহায়তা নিয়ে। ভারতের এই সহায়তা হুট করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেয়া হয়নি। বরং ভারতের সহায়তায় ১৯৬২ সাল থেকে পাকিস্তানে এই পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালানো হয়েছে। 

দারুল আমান পাকিস্তান ভেঙে দারুল হারব ভারতের করদ রাজ্য বানানো এদেশের মানুষ কখনোই ভালো চোখে দেখে নি। আর এদেশের আলেম সমাজ তো এটিকে ভালো চোখে দেখার, একে সমর্থন করার অথবা এর প্রতি ভালোবাসা দেখানোর প্রশ্নই আসে না। আলেম সমাজ এমন কাজ করেননি, দু'একজন বাদে। 

ভারতের সহায়তায় যাদের নেতৃত্বে দেশ ভাগ হয়েছে তারা বিজয়ের পর এদেশ থেকে ইসলামকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। দেশের মূলনীতিসহ সমস্ত স্থান থেকে ইসলাম বাদ দিয়েছে। দেশের মূলনীতি গ্রহণ করেছে কম্যুনিজম ও সেক্যুরালিজমকে। সারা দেশে ইসলামপন্থীরা গুম খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ দারুল হারবে পরিণত হয়েছে। 

১৯৭৫ এর পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দারুল আমানের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। আজও যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বাসী তারা এদেশের মানুষের মধ্যে ইসলামের প্র্যাকটিস দেখে আতংকিত হয় এবং ইসলামের চেতনাকে রুখে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর এতো বেশি উদাহরণ আছে যে, সেটার তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নেই। 

দুঃখজনক ব্যাপার হলো আজকে কিছু মানুষ সেসময়ের আলেমদের চরিত্র হনন করছে। তারা বলতে চায় সেসময় বাংলাদেশকে দারুল আমান থেকে দারুল হারবে পরিণত করার পেছনে কিছু প্রখ্যাত আলেমের ভূমিকা রয়েছে। যা নিতান্তই মিথ্যা ও বানোয়াট। কোনো আলেম আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণার মতো কাজ করতে পারে না। তবে তাই বলে ব্যাতিক্রম থাকবে না তা তো নয়। ব্যাতিক্রম হয়তো ছিল শাহবাগী মাওলানা ফউ মাসুদের মতো। তবে সেটা নিতান্তই হাতে গোণা।

বঙ্গকথা পর্ব-৫৮ : তাসখন্দ চুক্তি ও পাকিস্তানের পরাজয়


১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে তিনটি রণাঙ্গনে যুদ্ধ বাধে। এর ১৭ দিন পরে যুদ্ধ বিরতি কার্যকরী হয়। জাতিসংঘ দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ১৯৬৫ সালের ৫ আগস্টের অবস্থানে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। যুদ্ধবিরতির পরেও সৈন্য অপসারণসহ বেশ কিছু প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়। এই বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান, সোভিয়েত ইউনিয়ন এর প্রধানমন্ত্রী নিকলাই কোসিগিনের উদ্যোগে তাশখন্দ শহরে মিলিত হয়ে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন, যা তাশখন্দ চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী ছিল ভারতের বন্ধু রাশিয়া। ১৯৬৬ সালের ৯ ও ১০ জানুয়ারি তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি সাক্ষরের মাধ্যমে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের অবসান হয়।


দুই দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন এবং জনগণের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি তাসখন্দ চুক্তির মূলকথা ছিল। যে বিষয় নিয়ে বিরোধ সেই কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছে ও তাদের সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। দুই পক্ষ নিজেদের বিরোধ মীমাংসার জন্য পরস্পরের মধ্যে শক্তি প্রয়োগ না করে জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ উপায় গ্রহণ করবেন বলে একমত হন। পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, কোনো বিরুদ্ধ প্ররোচনায় উৎসাহ না দেওয়া এবং ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন মেনে চলার ব্যাপারে দুই পক্ষ একমত হন। কাশ্মীরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ইতোপূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো কার্যকরী করার ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে বিবেচনা করবেন বলেও একমত হন তারা। যুদ্ধবন্দিদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তও গৃহীত হয় এই চুক্তিতে। যুদ্ধের সময় এক দেশ অন্য দেশের যে সম্পদ দখল করেছে তা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারেও সম্মত হন দুই পক্ষ। 


১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তানে আইয়ুব খানের ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বেশ জোরেশোরে প্রচার হতে শুরু করে পাকিস্তান যুদ্ধে জিতেছে। ভারতকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে ইত্যাদি। আইয়ুব খান যুদ্ধে যারা ভালো পরদর্শিতা করেছে এমন সৈন্যদের রাষ্ট্রীয় পদক দিতে থাকেন। চারদিকে একেবারে জয় জয়কার। এর মধ্যে পাকিস্তানী জনগণ ভুলে যায় তাদের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। এখনো কাশ্মীরের দখল ভারতীয়দের কাছে। কাশ্মীরের মুসলিমরা মুশরিকদের কাছে জিম্মী হয়ে আছে। আইয়ুব খানের প্রোপাগান্ডার ফলে পাকিস্তানী জনগণ ভেবেছে পাকিস্তান যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। কাশ্মীর পাকিস্তানের অধিকারে চলে আসবে। 


কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো তাসখন্দ চুক্তির ঘোষণাগুলো যখন প্রকাশ হলো তখন জনগণের মোহভঙ্গ হয়ে পড়ে। তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কারণ যে ইস্যুতে এত রক্তক্ষয় সেই কাশ্মীরের ওপর পাকিস্তানের সামান্যতম অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো কাশ্মির ইস্যুকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সারা পাকিস্তানের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। জনগণ তাসখন্দ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। আইয়ুবের মূল শত্রু জামায়াতে ইসলামী সবার আগে বিবৃতি দিয়ে তাসখন্দ চুক্তি ও ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ১৬ জানুয়ারী আইয়ুববিরোধী দলগুলো মিলিত হয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখান থেকে তারা যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে তাসখন্দ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। তারা এই ব্যাপারে আইয়ুবের মিথ্যা প্রচারণা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে। কাশ্মীরের মুসলিমদের ভাগ্য নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। 


তাসখন্দ চুক্তির ঘোষণায় যা ছিল 


১) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে, উভয়পক্ষই জাতিসংঘের সনদ মেনে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। চার্টারের অধীনে তারা বল প্রয়োগের পন্থা অবলম্বন না করা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি করার চুক্তি পুনর্নিশ্চিত করে। তারা বিবেচনা করে যে দু'দেশের মধ্যে উত্তেজনার ধারাবাহিকতার কারণে তাদের অঞ্চলে এবং বিশেষত ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশের শান্তির স্বার্থ এবং প্রকৃতপক্ষে, ভারত ও পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থ বাস্তবায়িত হয় নি। এটা সেই পটভূমির বিরোধী যেখানে জম্মু ও কাশ্মীর আলোচনা হয়েছিল এবং প্রত্যেক পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান নির্ধারণ করেছিল।


২) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ এর মধ্যে উভয় দেশের সকল সশস্ত্র সদস্যকে তাদের ৫ আগস্ট, ১৯৬৫ এর পূর্বের অবস্থানে সরিয়ে নেয়া হবে। এবং উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি সীমায় যুদ্ধবিরতি শর্তাবলী পালন করবে।


৩) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক হবে একে অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে।


৪) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে উভয় পক্ষই অপর দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত যে কোন প্রচারণাকে নিরুৎসাহিত করবে এবং এমন প্রচারনাকে উত্সাহিত করবে যা দু'দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে।


৫) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে পাকিস্তানে ভারতের হাই কমিশনার এবং ভারতে পাকিস্তানের হাই কমিশনার তাদের পদে ফিরে আসবেন এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক মিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। উভয় সরকারই কূটনীতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে  ১৯৬১ সালের 'ভিয়েনা সমঝোতা চুক্তি' পালন করবে।


৬) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহন এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তিগুলি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয় বিবেচনা করার ব্যপারে একমত হয়েছেন।


৭) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে তারা যুদ্ধাবন্দীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য স্ব স্ব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিবেন।


৮) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে উভয়পক্ষ শরণার্থীদের সমস্যা এবং উচ্ছেদ / অবৈধ অভিবাসন সম্পর্কিত সমস্যাগুলির আলোচনা চালিয়ে যাবে। তারা আরোও একমত হয়েছেন যে উভয় পক্ষই এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে যা জনসাধারণের সীমান্ত অতিক্রম রোধ করবে। সংঘর্ষের জেরে উভয় পক্ষের দখলে নেওয়া সম্পত্তি ও সম্পদের ফেরত নিয়ে আলোচনা করতেও তারা রাজি হয়েছেন।


৯) ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি একমত হয়েছেন যে উভয় দেশের প্রত্যক্ষ উদ্বেগের বিষয়ে উভয় পক্ষই সর্বোচ্চ ও অন্যান্য পর্যায়ে বৈঠক চালিয়ে যাবে। উভয় পক্ষই ভারত-পাকিস্তান যৌথ সংস্থাগুলি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে যা সরকারের আরোও কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত এর সিদ্ধান্ত গ্রহনের ব্যাপারে সরকারগুলিকে অবগত করবে।


ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পারস্পরিক সন্তসজনক ফলাফল আনয়নকারী উক্ত বৈঠিক সংঘটিত করতে গঠনমূলক, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মহৎ অংশগ্রহনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত সরকার এবং ইউএসএসআর মন্ত্রিপরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গভীর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ব্যাক্ত করেছেন। তারা উজবেকিস্তানের সরকার ও বন্ধুপ্রতিম জনগণের প্রতি তাদের বিমুগ্ধকারী সংবর্ধনা ও সহৃদয় আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে।



তাসখন্দ চুক্তি ঘোষিত হলে ক্ষেপে উঠে রাজনীতিবিদেরা ও পাকিস্তানী জেনারেলরা। আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো জোট গঠনের চেষ্টা করে। এতে নেতৃত্ব দেয় মুসলিম লীগ। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোরে আইয়ুববিরোধী দলগুলোর একটি মিটিং আহ্বান করা হয় কাউন্সিল মুসলিম লীগের উদ্যোগে। মিটিং-এর উদ্দেশ্য ছিল তাসখন্দ চুক্তি পর্যালোচনা ও কাশ্মীরের মুসলিমদের জন্য কোনো প্রস্তাবনা দেওয়া। এই আলোচনায় মুসলিম লীগের সাথে ছিল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি। এই আলোচনায় আইয়ুবের গোয়েন্দা হিসেবে থাকা ভাসানী ও তার দলকে বাদ দেওয়া হয়। 


নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়ে জয়েন করার জন্য বলেন। কিন্তু মুজিব আগ্রহ দেখায় নি। কাশ্মীর বিষয়ে সে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তাই তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের পরামর্শক্রমে শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দলকে প্রস্তুত করেন লাহোরে পাঠানোর জন্য। কিন্তু হঠাৎ করেই বাঙালি সিএসপি কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস মুজিবের বাসায় এলেন। তিনি মুজিবকে কিছু একটা বুঝিয়েছেন। ব্যাস অমনি মুজিব নিজেই লাহোরে বিরোধী দলগুলোর কাশ্মীর বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে প্রস্তুত হন। ৪ ফেব্রুয়ারি তাজউদ্দিনসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে লাহোর রওনা হন।     


৫ ফেব্রুয়ারি চৌধুরি মুহাম্মদ আলীর বাসায় মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে সম্মেলন শুরু হয়। সেই মিটিং-এ শেখ মুজিব হঠাৎ করে ৬ দফা ঘোষণা করার আবদার করেন। তিনি সম্মেলনের এজেন্ডায় তার ৬ দফাকে এজেন্ডাভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু অন্যান্য বিরোধী দল তা মেনে নেন নি। তারা বলেন, আমরা আজ একত্রিত হয়েছি কাশ্মীর, তাসখন্দ ও আইয়ুব খানকে নিয়ে। ফলে সম্মেলনের এজেন্ডা থেকে ছয় দফা বাদ পড়ে। মুজিব কিছুক্ষণ হট্টগোল করে সভাস্থল ত্যাগ করে। নিখিল পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান এতে বিস্মিত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। শুধু তাই নয় আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা যারা মুজিবের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন তারাও আগে থেকে কিছুই জানতেন না ৬ দফার ব্যাপারে।


মুজিব সম্মেলনস্থল ত্যাগ করে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি ঘটা করে ৬ দফা উপস্থাপন করেন। আইয়ুবপন্থী সংবাদ মিডিয়া ৬ দফা ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। একইসাথে তারা সারাদেশে প্রচার করতে থাকে দেশ ভাঙার এজেন্ডা নিয়েছে বিরোধীদল। তাদের প্রচারণায় অনেকটা চাপা পড়ে যায় কাশ্মির ইস্যুতে করা সম্মেলনের খবর। কাশ্মীর ইস্যু তখনো যে সমাধান হয় নি আজো তা আলোর মুখ দেখেনি।  

১৯ অক্টোবর, ২০২০

মানুষের আবাদ নেই অথচ নান্দনিক মসজিদের আবাদ

 

সময়ের সাথে সাথে ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। সাংগঠনিক, পারিবারিক ও পেশাগত ব্যস্ততা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই শখের কাজগুলো কমে যাচ্ছে। আগে প্রায়ই চেষ্টা করতাম নতুন নতুন মসজিদ ভ্রমণ করতে। অনেকদিন সেই ভ্রমণ করা সম্ভব হয়নি। তবে রিসেন্টলি একটি দারুণ মসজিদে গেলাম। প্রাণ জুড়িয়ে গেল।


অফিসের এক কলিগ বললেন, একটা সুন্দর মসজিদের সন্ধান পেয়েছি। চলুন। হুটহাট বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয়। এটা কেরানিগঞ্জে। বুড়িগঙ্গার ওপারে। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল রাস্তার পাশে। বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর জন্য একটি কানেক্টিং রোড তৈরি করেছে মাওয়া পর্যন্ত, যা ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেস হাইওয়ে নামে পরিচিত। আর এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাস্তা। প্রতি কিলোমিটারে ১১৫ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। রাস্তাটা দারুণ, কোনো সন্দেহ নাই। তবে ব্যয়বহুল হবার পেছনে যতটা দায়ী এর অবকাঠামো তার চাইতে বেশি দায়ী দুর্নীতি।


যাই হোক আজকে এটা আমাদের আলোচিত বিষয় নয়। মসজিদটির অবস্থান হলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টো পাশে। সেখানে কেরানিগঞ্জ সাউথ টাউন নামে একটি আবাসিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এক ব্যবসায়ি। ভবিষ্যতে ঢাকা এদিকে সম্প্রসারিত হবে এই আশায় এমন বড় আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। কারাগার ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এর চাহিদা বাড়বেই।


মসজিদটির একটি আলাদা বিশেষত্ব আছে। সাধারণত মসজিদ নির্মিত হয় মুসল্লিদের প্রয়োজনের আলোকে। অর্থাৎ আগে মানুষের আবাদ হয়, পরে মসজিদের আবাদ। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। কেরানিগঞ্জ সাউথ টাউনে মানুষের আবাদ এখনো হয়নি, তবে মসজিদের আবাদ হয়ে গেছে। আবাসন প্রকল্পটির মালিক মোস্তফা কামাল মঈনুদ্দিন বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আগেই পরিকল্পনা অনুসারে সুন্দর একটি মসজিদ স্থাপন করেছেন। ফলে অসাধারণ মসজিদটির উসিলায় তার আবাসন প্রকল্পটি পরিচিত হয়ে উঠছে।


কেরানিগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর সাউথ টাউন জামে মসজিদ। এর মাধ্যমে নয়াভিরাম সুদৃশ্য এক মসজিদ যোগ হলো আমাদের দেশে। সাউথ টাউনের এই মসজিদটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। আধ বিঘা জমির ওপর মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। চারপাশে খোলামেলা জায়গার মাঝে মসজিদটি তার সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। তাই মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজির সংখ্যা নাই বললেই চলে। তবে মসজিদের নান্দনিকতার খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই এটি দেখতে আসেন এবং নামাজ পড়েন।


একতলা মসজিদটির স্থাপত্যকলা নকল করা হয়েছে ঢাকা ভার্সিটির কার্জন হল থেকে। মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে ৬০০ লোক জামাতে নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদটি তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এতে প্রধান ফটক আছে তিনটি। দুই পাশে আছে আরও দুটি দরজা। চারপাশে প্রচুর জানালা তৈরি করে আলো ঢোকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই স্তরের জানালার ফাঁক গলে আসা প্রকৃতির আলোয় ভেতরে চমৎকার এক পরিবেশ তৈরি হয়। জুড়িয়ে যায় চোখ। স্থপতির নন্দনভাবনার শৈলী ফুটে আছে গম্বুজের ভেতরের অংশেও। দিনের আলো ঢোকার ব্যবস্থা আছে সেখানেও।


এর পাশেই মসজিদের ইমাম ও খাদেমদের থাকার জন্যে আলাদা একটি ভবন করা হয়েছে। এই এলাকায় এলে প্রকল্পের ভেতরে মিলবে কাশবন। বিকেলে দেখা যাবে সূর্যাস্ত। ঢাকার অদূরেই এতো সুন্দর মনোরম পরিবেশ রয়েছে তা সেখানে না গেলে বোঝা যাবে না। সন্ধ্যার দিকে মসজিদের চারপাশের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়, তখন আরেক নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মনে তখন মসজিদটি তার রূপ আরো মেলে ধরে।


কীভাবে যাবেন?

১. যদি আপনার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা থাকে, তবে গুগল ম্যাপে যাবেন। মসজিদের নাম লিখে সার্চ করবেন। ম্যাপের পথ ধরে চলে যাবেন।

অথবা,

২. যারা কেন্দ্রীয় কারাগার চিনেন তারা সেখানে যাবেন। রাস্তা পার হয়ে দশ-পনের মিনিট হাঁটার পথ। কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দিবে। অটোরিকশা ব্যবহার করেও যেতে পারেন।

অথবা,

৩. ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে পোস্তগোলা ব্রিজ আসবেন। পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে সিএনজি নিয়ে সাউথ টাউন মসিজিদে চলে যেতে পারবেন। সর্বোচ্চ ভাড়া নিবে ১৫০ টাকা। এটা ঢাকা সিটির বাইরে ঢাকা জেলায়। তাই সিটির সিএনজিগুলো পোস্তগোলা ব্রিজ পার হতে পারে না।

১৮ অক্টোবর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৫৭ : যেমন ছিল ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ


১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পাক-ভারত যুদ্ধ ছিল দুটি দেশের মধ্যে এক বছরে সংঘটিত তিনটি বিবাদমান ঘটনার ধারাবাহিক পরিণতি। এগুলো হলো: এপ্রিল মাসে কুচের রান অঞ্চলে সীমিত আকারের পরীক্ষামূলক যুদ্ধ, আগস্ট মাসে ছদ্মবেশে পাকিস্তানিদের কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ, এবং পরিশেষে সেপ্টেম্বর মাসে পরস্পরের আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রমণ। তাছাড়া ১৯৪৮ সালের কাশ্মির যুদ্ধ, পরবর্তীকালে কাশ্মিরের একাংশে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ, জম্মু ও কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি, জাতিসংঘের ভেতরে ও বাইরে প্রতিপক্ষের কূটনেতিক আলোচনা ইত্যাদি ঘটনাবলি পাকিস্তানকে তার পছন্দ অনুযায়ী কাশ্মির সমস্যার একটি সমাধান অর্থাৎ কাশ্মিরকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা ব্যাহত হয়।

কুচের রান অঞ্চলের ঘটনা : 
কুচের রান অঞ্চল হচ্ছে ভারতের গুজরাট রাজ্য এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ৩২০ মাইল দীর্ঘ এবং ৫০ মাইল প্রশস্ত এক মরুময় অঞ্চল এবং জলাভূমি। দেশ বিভাগের সময় এবং রান অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে বাউন্ডারি কমিশনের ব্যর্থতার কারণে প্রায় ৩৫০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে দুটি নতুন দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ১৯৬৫ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এই এলাকায় প্রবেশ করে এবং দাবি করে যে ভারতীয় সেনাবাহিনী কাঞ্জারকোটের নিকট একটি পাকিস্তানি চৌকিতে আক্রমণ করেছে। এই যুদ্ধ অতি দ্রুত তীব্রতর হয় এবং পাকিস্তান আমেরিকা থেকে সংগৃহীত নতুন প্যাটন ট্যাংক এই যুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করে। পরিশেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের মধ্যস্থতায় ১৯৬৫ সালের ১ জুলাই থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

কাশ্মিরে জিব্রাল্টার অভিযান :
আইয়ুব খান তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক গণঅসন্তোষকে ধীরে ধীরে এই মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন যে, ‘বহি:শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম ও ঐক্য সৃষ্টি করে’। আইয়ুব খানের উপদেষ্টামন্ডলি তাঁকে ঘিরে একটি ছোট বলয় গড়ে তোলে। এই গোষ্ঠী আজাদ কাশ্মির গেরিলা দ্বারা গুপ্তভাবে এবং নিয়মিত সৈন্য দ্বারা প্রকাশ্যে কাশ্মির আক্রমণের পরিকল্পনা করে। ‘জিব্রাল্টার অভিযান’ নামে খ্যাত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র কাশ্মির অঞ্চলে ভারতের সঙ্গে স্থানীয় যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। কিন্তু পরবর্তীকালে তা ভিন্ন রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে একটি বড় রকমের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথমদিকে পাকিস্তান ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক গোপন অভিযান শুরু করে। এর সাংকেতিক নাম ছিল 'অপারেশন জিব্রাল্টার'। এর লক্ষ্য ছিল ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা বাড়ানো। পাকিস্তান এজন্য 'সাদা-ই-কাশ্মীর' নামে একটি রেডিও স্টেশনও চালু করে। পাকিস্তানের নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেছিল, এর মাধ্যমে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠবে; কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কিছু ঘটেনি। বরং অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশই আটক হয়েছিল বা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছিল। আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ 'অপারেশন জিব্রাল্টার' ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল। আর তথাকথিত মুজাহিদদের সামান্য যে কয়জন টিকে ছিল, তারা জীবন বাঁচাতে পাকিস্তানে ফিরে গিয়েছিল।

অপারেশন জিব্রাল্টার ব্যর্থ হলেও আইয়ুব খান তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। ওই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরের প্রথম দিন ১৯৬৫ সাল পাকিস্তান শুরু করে 'অপারেশন গ্র্যান্ড স্লাম'। এর আওতায় পাকিস্তানী নিয়মিত সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতি রেখা বা সিএফএল (সিজফায়ার লাইন) অতিক্রম করে এবং জম্মুর দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তী কয়েক দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে এবং জম্মু-শ্রীনগর মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলার হুমকি তৈরি করে। ওই দিন থেকেই যুদ্ধে যোগ দেয় দুই দেশের বিমানবাহিনীও। প্রথম মুখোমুখি হওয়ার সময়ই পাকিস্তান এয়ারফোর্সের (পিএএফ) ফাইটারগুলো ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) দুটি ভ্যাম্পেয়ার ফাইটারকে ভূপাতিত করে ফেলে।

সেপ্টেম্বর যুদ্ধ :
১৯৬৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাতে সমগ্র চম্ব অঞ্চলের ওপর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ব্যাপকহারে গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে। পাকিস্তান পরিচালিত এই অভিযানে ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। প্রচুর সৈন্য ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ট্যাঙ্কবহর ব্যবহার করে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী অগ্রসর হয় এবং হতচকিত ও অপ্রস্তুত ভারতীয় সৈন্যরা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ভারতীয় সরকার ভারতীয় বিমানবাহিনীকে নিযুক্ত করে। পরবর্তী দিন থেকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। 

নাজেহাল ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত করতে আন্তর্জাতিক সীমানারেখা অতিক্রম দুটি আক্রমণ পরিচালনা করে। প্রথমটি ছিল ৬ সেপ্টেম্বর লাহোর অভিমুখে। অন্যটি ছিল পরদিন শিয়ালকোট শহর অভিমুখে। পাকিস্তান এই শিয়ালকোট শহরকেই কাশ্মিরের চাম্ব সেক্টরে সেনাবাহিনী পাঠানোর জন্য ব্যবহার করে আসছিল। ভারতীয় বাহিনী লাহোর আক্রমণ কিছু প্রাথমিক সাফল্য লাভ করে। তারা একেবারে লাহোর বিমান বন্দরের সন্নিকটে পৌঁছে যায়। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী লাহোরের আশে পাশে খালের উপর নির্মিত প্রায় ৭০টি সেতু বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে সেখানে পরিখার সৃষ্টি করে ভারতীয় বাহিনীকে আটকে ফেলে।

এদিকে পাঞ্জাব অঞ্চলে পাকিস্তান ভারত অধিকৃত খেমখারান নামক একটি শহরে পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করে। খেমখারান পাকিস্তানের দখলে চলে আসে। অন্যদিকে শিয়ালকোট রণক্ষেত্রে উভয়পক্ষের ৪০০ থেকে ৬০০টি ট্যাংক বহর নিয়ে সর্ববৃহৎ ট্যাংক যুদ্ধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে পাকিস্তান সাফল্যলাভ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী শিয়ালকোট অভিমুখে অভিযান বন্ধ করে পিছু হটতে থাকে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের (ইবিআর) প্রথম ব্যাটালিয়নকে মোতায়েন করা হয় লাহোর শহর ও বামবাওয়ালি-রাভি-বেদাইন ক্যানেল (বিআরবি ক্যানেল) প্রতিরক্ষার জন্য। ভারতীয় বাহিনীর দফায় দফায় হামলা সত্ত্বেও এই রেজিমেন্ট তাদের প্রতিরক্ষা দেয়াল টিকিয়ে রেখেছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তারা কেবল সুরক্ষাই দেয়নি, পাল্টা জবাব দিয়ে হামলাকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতেও সক্ষম হয়েছিল। এই রেজিমেন্টের ধ্বংস করা একটি ভারতীয় ট্যাঙ্ক এখনও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে প্রদর্শনীর জন্য রয়েছে। 

১৯৬৫ সালের যুদ্ধের আকাশপথের লড়াইয়ে পাকিস্তান এয়ারফোর্স (পিএএফ) পাইলট ও বিমানের গুণগত মানের দিক থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) তুলনায় বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল। যদিও ভারতের বিমানবাহিনী সংখ্যাগত দিক থেকে বৃহত্তর ছিল, শেষ পর্যন্ত গুণগতভাবে এগিয়ে থাকার সুবিধা পেয়েছিল পাকিস্তান। ওই সময় ভারত পূর্ব পাকিস্তানে কোনো স্থল হামলা চালায়নি। তবে ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড কুর্মিটোলা ও লালমনিরহাটের অব্যবহৃত বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের বেসামরিক বিমানবন্দরে দফায় দফায় হামলা চালায়। তেজগাঁওয়ের সামরিক বিমানঘাঁটিটি যদিও হামলার বাইরেই রয়ে যায়। এ ধরনের নিষ্ফল হামলা ছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা ও সামরিক অপারেশনের গুরুতর ব্যর্থতা।

এর পাল্টা জবাব হিসেবে তেজগাঁও ঘাটি থেকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমানবাহিনীর কালাইকুন্ডা ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং সেখানে মজুদ থাকা বেশ কিছু ক্যানবেরা বোমারু বিমান ধ্বংস করে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি পাইলটরা এ সময় ব্যতিক্রমী পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও অসম সাহস দেখাতে সক্ষম হয়। মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের ২য় সর্বোচ্চ খেতাব হিলাল-ই-জুরাত লাভ করেন, উইং কমান্ডার তোয়াব, স্কোয়াড্রন লিডার আলাউদ্দিন (মরণোত্তর), ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম ও ফ্লাইং অফিসার হাসান সিরাত-ই-জুরাত খেতাব লাভ করেন। 

লিডিং এয়ারক্রাফটসম্যান আনোয়ার হোসাইন পান তমঘা-ই-জুরাত (মরণোত্তর)। স্কোয়াড্রন লিডার এম কে বাশার, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার হয়েছিলেন এবং পরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন, তিনি লাভ করেন 'তমঘা-ই-বাসালাত'। এই উচ্চ সামরিক খেতাব তাকে ভারতের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক বোমারু বিমান পরিচালনার জন্য দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব রেজিমেন্টের মধ্যে সাহসিকতার জন্য সবচেয়ে বেশি সংখ্যক খেতাব ও পদক পেয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তারা ভারতীয় বাহিনী থেকে লাহোরকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। এই রেজিমেন্ট পেয়েছিল তিনটি 'সিতারা-ই-জুরাত (বাংলাদেশের বীরবিক্রম সমতুল্য), আটটি 'তমঘা-ই-জুরাত' (বাংলাদেশের বীরপ্রতীক সমতুল্য) এবং আরও বেশ কিছু পদক ও প্রশংসাপত্র। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট আবির্ভূত হয়েছিল লাহোর শহরের রক্ষাকর্তা হিসেবে।

যুদ্ধে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত এগিয়ে থাকলেও এরপর তারা আক্রান্ত হতে থাকে। ওদের সর্বোচ্চ সাফল্যের বিষয় ছিল লাহোর আক্রমণ। কিন্তু লাহোরে বিশাল ভারতীয় বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কাছে। এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করে ভারত। অন্যদিকে পাকিস্তানও সুবিধে করতে পারছিল না। কারণ আইয়ুব খান চেয়েছিল যুদ্ধ শুধু কাশ্মীর ফ্রন্টে রাখতে। কিন্তু যুদ্ধ কাশ্মীর, শিয়ালকোট, পাঞ্জাব ও লাহোর ইত্যাদি নানা ফ্রন্টে চালু হওয়ায় বিপাকে পড়ে পাকিস্তান। আর্থিক ক্ষতি ও রশদে সমস্যায় পড়ে পাকিস্তান। এছাড়াও আরো দুটি বড় সমস্যা ছিল পাকিস্তানের। এক. যুদ্ধে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে অবস্থান নেয়। দুই. ভারত যুদ্ধক্ষেত্র কাশ্মীর থেকে সরিয়ে এনে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে প্রতিস্থাপন করে। তাই পাকিস্তানের সম্পদ পাকিস্তানের হাতেই নষ্ট হচ্ছে। 

শুধু যুদ্ধে সৈনিকদের পারদর্শিতা ছাড়া আর কোনো লজিস্টিক সুবিধা পাকিস্তানের ছিল না। অন্যদিকে সকল সুবিধা থাকলেও ভারত যুদ্ধে পারদর্শিতা না দেখানোর ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এরূপ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব ২০ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত কঠোর ভাষায় যুদ্ধবিরতির জন্য সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করলে পাকিস্তান প্রথমে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু ভারত ২১ সেপ্টেম্বর যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করলে পরের দিন ২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান তা গ্রহণ করে। 

যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতিই বেশি হয়েছে। পাকিস্তানের ৩৮০০ সৈন্য নিহত হয় অন্যদিকে ভারতের ৩০০০ সৈন্য নিহত হয়। পাকিস্তানের ২৫০ ট্যাংক নষ্ট হয় অন্যদিকে ভারতের ২০০ ট্যাংক নষ্ট হয়। ভারতের ৭৫ টি জঙ্গী বিমান ধ্বংস হয় অন্যদিকে পাকিস্তানের ২০ টি বিমান ধ্বংস হয়। ভারত ভূমি হারায় ৫৪০ বর্গ কিমি এলাকা আর অন্যদিকে পাকিস্তান হারায় ১৭৩৫ বর্গ কিমি এলাকা। এই ডাটাগুলো পরে বিভিন্ন নিরপেক্ষ পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। কিন্তু যুদ্ধকালীন আইয়ুব খান দেশে পাকিস্তানের বিরাট বিজয় হয়েছে বলে প্রচার করতে থাকে। এতে তার প্রতি মানুষের ভক্তি বাড়ে। 

আরেকটি বিষয় সে যেটি চেয়েছিলো তা হলো সমগ্র বিরোধী দলকে তার মুখী করে ফেলা। অর্থাৎ সবাই যাতে তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। তার এই প্রচেষ্টাও সাময়িক সফল হয়। যুদ্ধবিরতি থেকে যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে। তাসখন্দ চুক্তি হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল আইয়ুব খানের। পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সবচেয়ে সক্রিয় ও কার্যকর বিরোধী ছিলেন জামায়াতের আমীর মাওলানা মওদূদী। সেই মওদূদীকেই কাজে লাগান আইয়ুব খান। 

১৯৬৫ সালে ৬ সেপ্টেম্বর ভারত যখন লাহোর ও শিয়ালকোট আক্রমণ করে তখন আবুল আ'লা মওদূদী ছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে। তিনি সেখান থেকে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তিনি সরকারি সাহায্য পাবার জন্য বসে থাকেন নি। এর আগেই তিনি জাতিকে নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য লাহোরের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে সেনাবাহিনী আইয়ুব খান আপনার সাথে দেখা করতে চান বলে আইয়ুব খানের কাছে যেতে অনুরোধ করেন। মাওলানা মওদূদী আইয়ুবের ডাকে সাড়া দেন। 

আইয়ুব খান এই সংকট মুহূর্তে মাওলানা মওদূদীর সাহায্য চান। মাওলানাকে তিনি অনুরোধ করেন, রেডিওতে ভাষণ দিয়ে বলতে যাতে জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকে ও সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে। মাওলানা রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেসময় মাওলানার ওপর ইসলামপন্থীদের ব্যাপক সমর্থন ছিল কারণ মাওলানা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন করেছিলেন। 

এছাড়াও ১৪, ১৬ ও ১৮ সেপ্টেম্বর যুদ্ধকালীন আহত, মুহাজিরদের সাহায্য ও পুনর্বাসনের জন্য জাতির উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান ও জামায়াত কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। পাকিস্তান রেডিও তার এই বক্তব্য ও কর্মপন্থা ব্যাপকভাবে প্রচার করে।

১৭ অক্টোবর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৫৬ : ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ভাসানীর বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৬৪ সাল। পাকিস্তানের ১ম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল একাট্টা। রাজনীতি থেকে অভিমান করে বিদায় নেয়া বাংলার অন্যতম প্রধান নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন কাছে হাজির হয়েছে সমসাময়িক অনেক নেতা। এর মধ্যে আওয়ামীলীগ সভাপতি আ. রশিদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবসহ রয়েছেন অনেকে। 


তাদের দাবি পাকিস্তানকে রক্ষায় নাজিমুদ্দিন যেন আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন। আইয়ুবের বিরুদ্ধে যেন প্রেসিডেন্ট ইলেকশন করেন। বৃদ্ধ নাজিমুদ্দিন রাজি হননি। তবে তিনি আইয়ুব বিরোধী জোট গঠনে মধ্যস্থতা করতে রাজি হন। তিনি তার বাসায় কাউন্সিল মুসলিম লীগ, আওয়ামীলীগ, ন্যাপ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী এই দলগুলোর নেতাদের ডাকেন। 


সব দল মিলে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টিজ নামে একটি জোট করেন। জোটের নেতা হিসেবে থাকেন নাজিমুদ্দিন। ন্যাপের ভাসানী ওপরে আইয়ুব বিরোধী হলেও তিনি আইয়ুবের সমর্থক। কারণ আইয়ুব চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে যা আর কেউ করে নি। কম্বাইন্ড অপজিশনের সিদ্ধান্তগুলো আইয়ুবের কাছে মশিউর রহমান জাদু মিয়ার মাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়া ছিল ভাসানীর অন্যতম কাজ। 


নাজিমুদ্দিন একটি গোপন পরিকল্পনা করেন। যেহেতু আইয়ুব সেনা অফিসার হিসেবে বেতন নেয় তাই প্রার্থীতা ঘোষণা করার পর তার প্রার্থীতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করা হবে। এতে তার প্রার্থীতা বাতিল হবে। এই তথ্য পৌঁছে যায় আইয়ুবের কাছে। ব্যাস! আইয়ুব আগেই বেতন নেয়া বন্ধ করে দেয় এবং পেছনের তারিখ দিয়ে বেতন বন্ধের কার্যকারিতা অনুমোদন করে নিজেকে বাধামুক্ত করেন। 


এরপর আসলো বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের পালা। আইয়ুবের এজেন্সির পরামর্শক্রমে ভাসানী নাম প্রস্তাব করলেন ফাতিমা জিন্নাহ। এর কারণ ছিল ফাতিমা জিন্নাহর নাম শুনলে কেউ প্রস্তাব ফেলতে পারবে না তার ব্যাক্তিত্বের কারণে। তবে তিনি রাজনৈতিক নেতা নন। ক্যারিশমাটিক নেতাও নন। আবার সম্মানের কারণে তার প্রতি রাজি হলেও আদর্শিক কারণে জামায়াত ও নেজামে ইসলাম রাজি হবে না। 


ভাসানীর প্রস্তাবে তার দল ন্যাপ, মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ রাজি হলো। নেজামে ইসলামও এক পর্যায়ে রাজি হলো। জামায়াতের গোলাম আযম রাজি হননি। তিনি সময় চেয়ে নেন। সেসময় মাওলানা মওদূদী কারাগারে ছিলেন বলে অধ্যাপক গোলাম আযমই জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। 


গোলাম আযম পাকিস্তানের তৎকালীন বিখ্যাত আলেম মাআরেফুল কুরআনের লেখক মুফতি শফির কাছে এই বিষয়ে জানতে চান। তিনি সংকটকালীন মুহুর্ত উত্তরণের জন্য কিছু সময়ের জন্য এই নেতৃত্ব মেনে নেওয়া জায়িজ বলে ফতোয়া দেন। উল্লেখ্য, ফাতিমা জিন্নাহ শর্তারোপ করেন, যদি তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তবে এক বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করবেন না। এক বছরের মধ্যেই সকলের ভোটাধিকার ফেরত এনে তিনি নতুন নির্বাচন দিবেন। তাই মুফতি শফি এই ফতোয়া দেন।


তারপর গোলাম আযম যান জেলখানায় মাওলান মওদূদীর কাছে। মাওলানা মওদূদী উত্তর করেন, জামায়াত ছাড়া যদি সবাই ঐক্যমত পোষণ করে তবে আমরাও ফাতিমা জিন্নাহর প্রতি সমর্থন দিতে পারি। কারণ, আইয়ুবের পুরুষ হওয়া কোনো গুণ নেই অন্যদিকে ফাতিমা জিন্নাহর মহিলা হওয়া ছাড়া কোনো দোষ নেই। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো ফাতিমা জিন্নাহ ছাড়া আইয়ুবের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো অন্য কোনো সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিকল্প ইসলাপন্থীদের কাছে ছিল না। 


রাজনীতিবিদদের একটি সংকট তৈরি করেছে আইয়ুব ক্ষমতায় এসেই। ১৯৫৯ সালের ৭ আগস্ট প্রেসিডেন্ট আইয়ুব দুটি অধ্যাদেশ জারি করেন। একটি হলো PODO, অন্যটি EBDO. পোডো মানে হলো পাবলিক অফিস ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার। আর এবডো মানে হলো ইলেক্টিব বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার। পোডো আইন প্রয়োগ করে অনেক রাজনীতিবিদের প্রতি অভিযোগ আনে আইয়ুব। সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয় রাজনীতিবিদদের। 


বিগত আমলে ঘটে যাওয়া কিছু দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে ফেলা আগে ক্ষমতায় থাকা অনেক রাজনীতিবিদদের। একতরফা সামরিক বিচারে অনেকেই হেনস্তা হন। যারা পোডো আইনে অভিযুক্ত হবে তারা এবডো আইনে ১৯৬৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে ও সরকারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এভাবে পুর্ব পাকিস্তানের ৪২ জন বাঙালি নেতা রাজনীতিতে অযোগ্য হয়ে পড়েন। 


তবে দুঃখজনক হলেও সত্য পোডো এবং এবডোর মুখোমুখি হতে চাননি ক্ষমতার শীর্ষে  থাকা তিন বাঙ্গালি নেতা। তারা হলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এবং ফরিদপুরের মুসলিম লীগ নেতা মৌলভি তমিজুদ্দিন। মৌলভি তমিজুদ্দিন দীর্ঘদিন পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার ছিলেন। তারা নিজেদের আত্মসমর্পন করে রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ফজলুল হক আর রাজনীতিতে ফিরতে পারেন নি। সোহরাওয়ার্দি রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও আইয়ুব বিরোধী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। 


এই অপরাধে তার বিরুদ্ধে পোডো প্রয়োগ হয়। সরকার দুর্নীতি প্রমাণ করে এবং এরপর এবডো প্রয়োগ হয়। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ম্যাসিভ দুর্নীতি প্রমাণ হয় এবং দুর্নীতির কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন। এভাবে আইয়ুব সারা পাকিস্তানে রাজনীতি শূন্য করে ফেলেন। এক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান আলাদা থাকে না। তবে পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা অন্যান্য প্রদেশের চাইতে অধিক ক্ষমতায় ছিলেন বলে তারাই বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।


আইয়ুব কোনোভাবেই জামায়াতকে আটকাতে পারে নি। রাজনীতি শূন্য অবস্থায় যখন মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগ চুপসে গেছে তখন আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে কন্ঠ উচ্চকিত রেখেছেন মাওলানা মওদূদী। তাকে কোনো আইনের মাধ্যমে ধরতে না পেরে জামায়াতের বিরুদ্ধে আইয়ুব রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ আনে। তার দাবি জামায়াত পাকিস্তানে বিশ্বাসী না। তাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে। 


উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে বাকী থাকে ভাসানী ও খাজা নাজিমুদ্দিন। খাজা নাজিমুদ্দিন অনেক আগেই রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বলে আইয়ুবের আক্রমণের শিকার হন নি। আর তাছাড়া তিনি বৃদ্ধও হয়ে পড়েছিলেন। অন্যদিকে ভাসানী আর আইয়ুবের সম্পর্ক তো ছিল অন্যমাত্রায়। সেখানে ভাসানী তার আক্রমণের শিকার হওয়ার কথা না।    


তাই অন্য কোনো ভালো বিকল্প না থাকায় সর্বসম্মতিক্রমে ফাতিমা জিন্নাহ কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টিজের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন ফাতিমা জিন্নাহ। আইয়ুবের চিন্তা তাকে ভালো ফল এনে দিল।  আইয়ুব তার পক্ষের আলেমদের দিয়ে প্রচার করতে লাগলেন ইসলামী দলগুলো ইসলামবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত হয়েছে। তারা নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। পাকিস্তানের ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীই কেবল ভোটার। তাদের মধ্যে অনেকেই এই প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়েছিলো। 


১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আইয়ুব নির্বাচনে জিতে যান। অবশ্য নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এমন অভিযোগ করতে পারেনি বিরোধী দলগুলো। ইত্তেফাক পত্রিকা রিপোর্ট করেছিলো দশ কোটি মানুষের পরাজয়। 


আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে ৫৩.১২ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ৭৩.৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ বাঙ্গালি সব দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টিও বাঙালি মৌলিক গণতন্ত্রীদের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। ফাতিমা জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে ৪৬.৬০ শতাংশ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ২৬.০৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। তিনটি বিভাগে ফাতিমা আইয়ুবের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। সেগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং করাচি। 


ফাতিমা হেরে যাওয়ার কারণ দুটি। এক. ইসলামপন্থীরা ফাতিমা জিন্নাহর প্রতি একমত হতে পারে নি। দুই. ন্যাপের মৌলিক গণতন্ত্রীরা আইয়ুবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ইসলামপন্থীরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রের শুরুতে জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সময় ২২ দফা মূলনীতি তৈরি করেছিলো। সেখানে নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার কথা বলেছিল। সেই জামায়াত ও নেজামে ইসলাম যখন ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষে সমর্থন দেয় তখন মৌলিক গণতন্ত্রীদের কাছে ইসলামপন্থীদের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আর ন্যাপ ও আওয়ামীলীগের চীনপন্থীরা তাদের নেতা মূল নেতা মাও সে তুং এবং এদেশীয় নেতা ভাসানীর ইশারায় আইয়ুবকেই ভোট দিয়েছে। কম্বাইন্ড অপজিশনে একটি শক্তিশালী দল ছিল ন্যাপ। আর তারাই ছিল বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায়। 


ভাসানীর সহায়তায় ও ইসলামপন্থীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে পাকিস্তানে আরো বেশি জেঁকে বসেছে স্বৈরাচারী সেনাশাসন।     

১৬ অক্টোবর, ২০২০

২০০১ সালে পূর্ণিমা ধর্ষণের নেপথ্য ঘটনা






সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমা রাণী শীল। একটি বহুল আলোচিত নাম। ২০০১ সালে ৮ অক্টোবর পূর্ণিমার পরিবারের সাথে প্রতিবেশীদের মারামারি হয়। সেসময় পূর্ণিমা বা তার পরিবারের কেউ আওয়ামীলীগ করে বলে জানা যায় না। 

এই মারামারির খবর পত্রিকায় আসতেই বেবি মওদুদ ও শাহরিয়ার কবিররা ছুটে যায় পূর্ণিমাদের বাড়ি। প্রথমে প্রতিবেশীর সাথে মারামারির ঘটনাকে চাউর করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে। কারণ এর অল্প ক'দিন আগেই ১ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়। 

তারা দাবি করে নতুন নির্বাচিত জোট দেশে কোনো হিন্দু রাখবে না। তাই পূর্ণিমাদের ওপর এই আক্রমণ। অথচ ঐ গ্রামে পূর্ণিমারা একাই হিন্দু নয়। আরো হিন্দু আছে। তাদের ওপর আক্রমণ হলো না কেন? 

যাই হোক এর কয়েকদিন পর তারা এই বিষয়টাকে নিয়ে আরো খেলতে চায়। ঘটনার চারদিন পর তারা পূর্ণিমাকে গণধর্ষণ করেছে অভিযোগ আনে ও মামলা করে। যাদের সাথে মারামারি হয়েছে তাদের নামেই মামলা করে। 

সারাদেশে বামাতি ও আওয়ামী মিডিয়াগুলো প্রচার করে যাদের সাথে পূর্ণিমাদের মারামারি হয়েছে তারা বিএনপি কর্মী। মূল কথা হলো পূর্ণিমারাও রাজনীতি করে না। অন্যদিকে পূর্ণিমাদের সাথে মারামারি করা প্রতিবেশীরাও রাজনীতি করে না। 


কিন্তু দোষটা বিএনপির ওপর দিতে পূর্ণিমাদের আওয়ামীলীগ বানানো হলো আর প্রতিবেশীদের বানানো হলো বিএনপি। কাউকে তো আর যেন তেন ভাবে জামায়াত বানানো যায় না তবে বিএনপি বানানো যায়। তবে বছর খানেক পরে পূর্ণিমাদের ওপর হামলাকারীদের পরিচয় আর বিএনপি থাকে না। হয়ে যায় বিএনপি জামায়াতের কর্মী। 

পূর্ণিমাকে আওয়ামী লীগ সাজাতে একটি অভিনব ঘটনার অবতারণা হয়। শাহরিয়ার কবিররা প্রথমে জানিয়েছেন,

//সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার দেলুয়া গ্রামের অনিল কুমার শীলের কিশোরী কন্যা পূর্ণিমা রানী শীল। অষ্টম সংসদ নির্বাচনের সময়টাতে ছিলেন হামিদা পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। নির্বাচনের দিন দেলুয়া হাইস্কুল কেন্দ্রে যান তিনি। 

সেখানে তাঁর গৃহশিক্ষক সাধন পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। পূর্ণিমাকে দেখে সাধন অনুরোধ করেন বলেন, তিনি বাসায় খেতে যাবেন। তাই তিনি ফিরে আসার আগ পর্যন্ত যেন পূর্ণিমা একটু বসেন। পরে সাধন ফিরে আসলে পূর্ণিমা বাড়ির দিকে রওয়ানা দেন। পথে বিএনপির কর্মী ও সমর্থকরা তাকে শাসায়। সপ্তাহখানেক যেতে না যেতেই সেই শাসানোকে বাস্তবে রূপ দেয় বিএনপির সন্ত্রাসীরা। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ রাতে পূর্ণিমার ওপর চালানো হয় বর্বরতম অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন। 

রাতে জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে পুরো পরিবারের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের চালায় বিএনপির সন্ত্রাসীরা। এক পর্যায়ে অনিল শীলের ছোট মেয়ে পূর্ণিমাকে নিপীড়ন করে তাঁরা। এত মানুষ দেখে পূর্নিমার মা সেদিন বলেছিলো, বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে ঘরে এসো, নয়তো মেয়েটি মরে যাবে।// 


এখানে কিছু ভয়ংকর অসঙ্গতি আছে। 

প্রথমত, পূর্ণিমা ভোটার নয়, তবে কেন সে ভোট কেন্দ্রে যাবে? 

দ্বিতীয়ত, সে ভোট দেয়নি, তার জাল ভোট দেওয়ার ঘটনাও জানা যায় না। 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ভোটের পরিস্থিতি কী এতই স্বাভাবিক ও ছেলে খেলার বিষয় যে, সাধন একজন নাবালিকাকে পোলিং এজেন্ট বানাবে? 

চতুর্থত, সাধনের খাবার বিরতিতে কিছুক্ষণের জন্য বসা পূর্ণিমা কী এমন কাজ করেছে যে, সাধনের প্রতি বিএনপির অভিযোগ নেই, সব অভিযোগ পূর্ণিমার বিরুদ্ধে? 

পঞ্চমত, পূর্ণিমা বিভিন্ন স্থানে সাক্ষাতকারে বলেছে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে শ্মশানঘাটের পাশে একটি ক্ষেতে। তাহলে তার মায়ের এই কথার কী ব্যাখ্যা হবে? 

মূলত কোন কিছু না ভেবে শাহরিয়ার কবির ও বেবি মওদুদ গং এই কাহিনী সাজায়। পরে যখন ঘরের মধ্যে হামলার প্রমাণ দেখাতে পারবে না তাই পরে শ্মশানঘাটের কাহিনী আসে। প্রতিবেশীদের মারামারি হয়েছে ঘরের বাইরে। তাদের ঘর হামলার শিকার হয়নি। তাই কাহিনী চেইঞ্জ করতে হয়েছে। 

যাই হোক দুঃখজনক হলেও সত্য ১০ তারিখের পর থেকে পূর্ণিমা বেবি মওদূদের তত্ত্বাবধানে থাকে। তাকে নিয়ে ১৪ তারিখ হাসপাতালে গিয়ে ধর্ষণের ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে একটি দুঃখজনক রিপোর্ট আসে। তা ভিডিওতে উল্লেখ রয়েছে। ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য কী ভয়ংকর ষড়যন্ত্র ঘাদানিক করতে পারে তা আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। 

পূর্ণিমাকে নিয়ে অনেক খেলা খেলেছে আওয়ামীলীগ। তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে তার পরিবারকে সেই আমলে ২০০০০ টাকা দিয়েছে। এদেশে শত ধর্ষণে পূর্ণিমার কিছু আসে যায় না। অথচ নূরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ সহায়তার মিথ্যা অভিযোগে তাকে আবারো দেখতে পেলাম। 

তার বক্তব্য আমি আগ্রহ নিয়ে শুনলাম। তার অল্প সময়ের বক্তব্যে সে একবারও ফাতেমার অভিযুক্ত ধর্ষক মামুন ও সোহাগের নাম নেয় নি। সারাক্ষণ নূরের নাম নিয়েছে। সে নূরের ব্যাপারে খুবই অশ্লীলভাবে কিছু কথা বলেছে, অথচ নূর ধর্ষণ করেছে এমন অভিযোগ নেই। নূরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নূর বিচার করে নাই। এর দ্বারাই জাত চেনা যায়! বেজন্মারা এমনই হয়!

২০০২ সালের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখুন 


১৪ অক্টোবর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৫৫ : আইয়ুব খান ও তার মৌলিক গণতন্ত্র


আইয়ুব খানের জন্ম হয়েছিলো ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হরিপুর জেলায়। ১৯২৬ সালে তরুণ আইয়ুব ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা গড়ার কারিগর 'রয়েল মিলিটারি কলেজ' তে অধ্যায়ন করার সুযোগ পেয়ে যান যেটি ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের স্যান্ডহার্স্টে অবস্থিত ছিলো। ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আইয়ুব দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছিলেন; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইয়ুব কর্নেল ছিলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে আইয়ুব নবগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার হিসেবে, তার সার্ভিস নম্বর ছিলো পিএ-১০। 


স্বাধীন পাকিস্তানে আইয়ুব প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগ পেয়েছিলেন ১৪তম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক হিসেবে, এরপর খুব দ্রুত উপরে ওঠেন তিনি; ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন আইয়ুব। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; আইয়ুব এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইস্কান্দার মির্জার জারি করা সামরিক আইনের পক্ষে ছিলেন। ইস্কান্দার মির্জাই মূলত আইয়ুব খানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতিত্ব নিশ্চিত করেছিলেন।


আইয়ুব দেশের সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদে জেনারেল মুহাম্মদ মুসা খানকে নিযুক্ত করেছিলেন। আইয়ুব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার করা সহ প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে মনোযোগ দিয়েছিলেন। আইয়ুব তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি পেশোয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি বিমান ঘাঁটি গড়ে তুলেছিলেন যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনীর বৈমানিকেরা বিমান চালাতো এবং পাকিস্তান বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে তারা অনেক সাহায্য করেছিলো। ভারতকে রুখতে গিয়ে চীনের সঙ্গেও আইয়ুব সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক চরম বৈরিতার দিকে যায় যে বছরে ভারত চীনের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো। 


১৯৬৫ সালে আইয়ুব সরকার ভারতের সঙ্গে একটি বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেছিলো যেটি ঐতিহাসিকভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৯৬৫ নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির একজন গোঁড়া সমর্থক আইয়ুব পাকিস্তানেও যুক্তরাষ্ট্রর মত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন।


আইয়ুব খান জনগণের দাবির মুখে ক্ষমতা দখল করেন। স্বভাবতই তার ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল। তিনি পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করেছেন। এই কাঠামো প্রস্তুতের মূল কারণ হলো পকিস্তানের রাজনীতিবিদেরা শাসনতন্ত্র তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তিনি গণতন্ত্রের নতুন একটি সংস্করণ প্রস্তুত করালেন। এর নাম দিলেন বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র।  


পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ ১৯৫৯ জারি করেন। মৌলিক গণতন্ত্র ছিল একটি পাঁচ স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা। নিম্ন থেকে শুরু করে এ স্তরগুলো ছিল 

(১) ইউনিয়ন পরিষদ (পল্লী এলাকায়) এবং শহর ও ইউনিয়ন কমিটি (পৌর এলাকায়), 

(২) থানা পরিষদ 

(৩) জেলা পরিষদ 

(৪) বিভাগীয় পরিষদ 

(৫) প্রাদেশিক উন্নয়ন উপদেষ্টা পরিষদ


একজন চেয়ারম্যান এবং  ১৫ জন সদস্য নিয়ে একেকটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হতো। এতে নির্বাচিত এবং মনোনীত উভয় ধরনের সদস্যই থাকতেন। পরিষদের সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ছিলেন নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন মনোনীত সদস্য, যারা সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হতেন। তবে, ১৯৬২ সালের এক সংশোধনী দ্বারা মনোনয়ন প্রথা বিলোপ করা হয়। ফলে পরিষদের সদস্যবৃন্দ প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে স্ব স্ব ইউনিয়নের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে সদস্যদের দ্বারা তাদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হতেন। এক দিক দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ছিল পূর্বেকার ইউনিয়ন বোর্ডেরই অনুরূপ, তবে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বলা হতো মৌলিক গণতন্ত্রী। সারা পাকিস্তানে সর্বমোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ছিল ৭৩০০।


সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিনিধি নিয়ে দ্বিতীয় স্তরের থানা পরিষদ গঠিত হতো। বেসরকারি প্রতিনিধি নিজেরা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহর কমিটির চেয়ারম্যান। সরকারি সদস্যবৃন্দ দেশ গঠনমূলক কাজে থানার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং এদের সংখ্যা নির্ধারণ করতেন সংশ্লিষ্ট জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট। তবে সরকারি সদস্যদের সর্বমোট সংখ্যা কোনোক্রমেই  বেসরকারি সদস্যদের সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারত না। থানা পরিষদের প্রধান থাকতেন মহকুমা অফিসার (এসডিও), যিনি পদাধিকারবলে থানা পরিরষদের চেয়ারম্যান হতেন। মহকুমা অফিসারের অনুপস্থিতিতে সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) পদাধিকারবলে থানা পরিষদের সদস্য হিসেবে পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করতেন। পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে থানাকে তহসিল বলে অভিহিত করা হতো এবং তহসিলের সভায় সভাপতিত্ব করতেন তহশিলদার। তখন পাকিস্তানে মোট ৬৫৫টি থানা ও তহশিল ছিল।


তৃতীয় স্তরে ছিল জেলা পরিষদ। একজন চেয়ারম্যান এবং সরকারি ও বেসরকারি সদস্যদের নিয়ে এ পরিষদ গঠিত হতো। সদস্যদের সংখ্যা ৪০-এর বেশি হতো না। সকল থানা পরিষদের চেয়ারম্যানই সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের সদস্য থাকতেন এবং উন্নয়ন বিভাগের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অন্যান্য সরকারি সদস্য মনোনীত হতেন এবং সমান সংখ্যক সদস্য মনোনীত হতেন বেসরকারি সদস্যদের মধ্য থেকে। মনোনীত সদস্যদের অন্তত অর্ধাংশ মনোনীত হতেন ইউনিয়ন পরিষদ ও শহর কমিটির চেয়ারম্যানদের মধ্য থেকে। জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট পদাধিকারবলে এ পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন এবং পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যান কর্তৃক তাঁর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেন ভাইস-চেয়ারম্যান। পাকিস্তানে ৭৪টি জেলা পরিষদ ছিল। মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর ছিল জেলা পরিষদ। এটি ছিল ইংরেজ আমলের জেলা বোর্ডের উত্তরসূরী প্রতিষ্ঠান। 


চতুর্থ ও শীর্ষ স্তর ছিল বিভাগীয় পরিষদ। বিভাগীয় কমিশনার পদাধিকারবলে এ পরিষদের চেয়ারম্যান থাকতেন। এতে সরকারি ও বেসরকারি  উভয় ধরনের সদস্য ছিলেন। সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য ছিলেন ৪৫ জন। সরকারি সদস্য ছিলেন বিভাগের অন্তর্গত সকল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সরকারি উন্নয়ন বিভাগের প্রতিনিধিবর্গ। সর্বমোট বিভাগীয় পরিষদের সংখ্যা ছিল ১৬।


মৌলিক গণতন্ত্র আদেশবলে যে পাঁচটি পরিষদ সৃষ্টি করা হয় তাদের মধ্যে শুধু দু’টি পরিষদ অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বিভাগীয় পরিষদ এবং থানা পরিষদ প্রধানত সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করত। ইউনিয়ন পরিষদ বিভিন্ন ধরনের কার্যে নিয়োজিত থাকতো, যেমন  ইউনিয়নের কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, সমাজ উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সংক্রান্ত কার্যক্রম। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম পুলিশবাহিনীর দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতো এবং সেখানকার সালিসি কোর্টের মাধ্যমে ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি করতো। গ্রামের রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মাণ, জমিতে জলসেচ ব্যবস্থা, বাঁধ নির্মান প্রভৃতি কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বভারও ন্যস্ত ছিল ইউনিয়ন পরিষদের উপর। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদকে কর ধার্য ও আদায় এবং মূল্য, টোল ও ফি আদায়ের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। 


থানা পরিষদ পরিষদ মূলত একটি সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানমূলক সংগঠন। থানা পরিষদ তার আওতাধীন সকল ইউনিয়ন পরিষদ ও শহর কমিটির কার্যক্রমের সমন্বয় বিধান করত। থানা পরিষদই চলতি প্রকল্পসমূহ তত্ত্বসাধনসহ ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহর কমিটির প্রণীত সকল উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় বিধান করত। থানা/তহশিল পরিষদ জেলা পরিষদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতো এবং ঐ পরিষদের নিকট দায়ী থাকত। জেলা পরিষদ মূলত তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করতো : বাধ্যতামুলক দায়িত্ব, ঐচ্ছিক দায়িত্ব এবং সমন্বয়মূলক দায়িত্ব। 


বাধ্যতামূলক দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল সরকারি রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট ও ব্রীজ নির্মাণ, প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ, সরকারি ফেরি নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন। ঐচ্ছিক দায়িত্বগুলোর বিষয় ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক কল্যাণ এবং গণপূর্ত। এছাড়াও জেলা পরিষদের উপর কৃষি, শিল্প, সমাজ উন্নয়ন, জাতীয় পুনর্গঠনের প্রসার এবং সমবায় উন্নয়নের মত বিশাল কর্মকান্ডের দায়িত্বও অর্পিত হয়। জেলার মধ্যে স্থানীয় পরিষদসমূহের সকল কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধনও ছিল  জেলা পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব। 


১৯৬০ সালের হ্যাঁ/না ভোট 

দুই বছর সামরিক শাসনের পর আইয়ুব খান নিজের শাসন ব্যবস্থাকে মৌলিক গণতন্ত্রের আলোকে বেসামরিক শাসন বানিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। সেজন্য তিনি পুরো পাকিস্তান থেকে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী বা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচন করেন। এই মোলিক গণতন্ত্রীরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। নিজের ওপর মৌলিক গণতন্ত্রীদের আস্থা আছে কিনা তা যাচাই করার চেষ্টা করেছেন আইয়ুব খান। ১৯৬০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি হ্যাঁ না ভোটের আয়োজন করেন। শতকরা ৯৫% মৌলিক গণতন্ত্রী হ্যাঁ ভোট দিয়েছে বলে জানা যায়। এভাবে আইয়ুব খান পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। যদিও অনেক রাজনীতিবিদ এই ব্যবস্থা ও হ্যাঁ/না ভোটের বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। সর্বপ্রথম আপত্তি তুলেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মওদূদী।  


১৯৬২ সালে আইয়ুব খান নতুন সংবিধান তৈরি করেন। এতে সংসদীয় প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাই চূড়ান্ত বলে ঘোষিত হয়। মাওলান মওদূদীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী ও সোহরাওয়ার্দির নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। বাকীরা কেউ মৃদু প্রতিবাদ কেউ আইয়ুবকে সমর্থন দেন। মুসলিম লীগের একটি বড় অংশের নেতাদের নিয়ে আইয়ুব তার রাজনৈতিক দল ঘোষণা করে কনভেনশন মুসলিম লীগ। আর অন্যদিকে বাকীরা নামধারণ করে কাউন্সিল মুসলিম লীগ। কাউন্সিল মুসলিম লীগ যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। 


১৯৬২ সাল থেকে জামায়াত স্বৈরশাসনের বৈধতা দানকারী আইয়ুবের সংবিধান প্রত্যাখ্যান করে এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন শুরু করে। প্রতিটি প্রদেশে মিছিল মিটিং ও সমাবেশ করতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় মামলা হামলা ও নির্যাতন চলতে থাকে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। সবশেষ ১৯৬৪ সালে ৬ জানুয়ারি আইয়ুব খান জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেন। একইদিন মাওলানা মওদূদীসহ শীর্ষ ৬০ জন জামায়াত নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে অনেক বাঙালি নেতাও ছিলেন, যেমন : অধ্যাপক গোলাম আযম, মাস্টার শফিকুল্লাহ, মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ, আব্দুর রহমান ফকির, শামসুল হক ইত্যাদি। 


এদিকে ১৯৬২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে তার রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা আতাউর রহমানের বাসভবনে সরকার বিরোধী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী করাচি গেলে তাঁকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকায় আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ ও দাঙ্গা হাঙ্গামা করে। পুলিশ বাস, থানা পুড়িয়ে দেয়।  


৭-৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় ব্যাপক পুলিশী নির্যাতন চলতে থাকে এবং এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। মার্চ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ খুললে আবার আন্দোলন শুরু হয়। ১৫ মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে ধর্মঘট চলতে থাকে। এ সময় ডাকসুর সহ-সভাপতি রফিকুল হক ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা হায়দার আকবর খান প্রমুখ নেতাসহ বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়।


আইয়ুব খান হলেন ১ম পাকিস্তানী নেতা যিনি ভারতকে রুখতে গিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। যার ধারাবাহিকতা আজো বিদ্যমান। সেজন্য মাওলানা ভাসানী আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা থেকে বিরত থাকেন।।

৮ অক্টোবর, ২০২০

আল্লাহর রাসূল সা. কি গণহত্যা করেছেন?


আল্লাহর রাসূল সা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে কিছু নালায়েক। ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজাকে দেওয়া শাস্তিকে কেউ কেউ রাসূল সা. গণহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ আনে। আসলে কী ছিলো সেই ঘটনা তা জেনে নেয়া যাক।


খন্দকের যুদ্ধের সময় বহুদিন আবু সুফিয়ানের বাহিনী মদিনা অবরোধ করে রাখে। কিন্তু খন্দক থাকায় তা পেরিয়ে মদিনায় প্রবেশ করতে পারছিলো না। এমতাবস্থায় এক রাতে আল্লাহ তায়ালা তার সেনাবাহিনী পাঠালেন। ভীষণ ধুলি ঝড়ে উড়ে গেল মুশরিকদের সম্মিলিত বাহিনীর তাঁবু ও পশু। তারা হাল ছেড়ে দিল। এর আগের কিছু ঘটনা ও ধূলিঝড় তাদের মনোবল পুরো ভেঙে দিয়েছে। খন্দকের যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধের সময় মুসলিমদের ওপর ভয়াবহ বিপদ আপতিত হয়। একের পর এক বিপদে অনেক মুসলিম উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তারা আল্লাহর রাসূল সা. ও নিষ্ঠাবান মুসলিমদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে। এই ব্যাপারে সূরা আহযাবের ১২- ২০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত বলেছেন।


বিপদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বিপদ হলো ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজার চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা। তারা মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিমদের মিত্র শক্তি ছিল। যখন মুসলিমদের ওপর কুরাইশদের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ শুরু হলো তখন তারা মুসলিমদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল সা. তাদের দিক থেকে আক্রমণের আশংকা করেন নাই বিধায় পূর্ণ শক্তি কুরাইশের বিরুদ্ধে মজুদ রেখেছিলেন। এমনিতেই মুসলিমদের শক্তি ছিল অপ্রতুল এর মধ্যে বনু কুরাইজাকে ঠেকানোর জন্য তিনশত সাহাবীর একটি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। এরপর আল্লাহর রাসূল কূটনৈতিক চাল চাললেন। এতে মুশরিকদের ঐক্য নষ্ট হয়ে পড়ে। একইসাথে বনু কুরাইজার সাথেও তাদের চুক্তি নষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত বনু কুরাইজা আক্রমণের সাহস পায়নি। আর আল্লাহ তায়ালা ধূলিঝড় দিয়ে আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে লণ্ডভণ্ড করে দেন।   


পরদিন যোহরের সময় আল্লাহর রাসূল সা. বিজয়ীর বেশে মদিনায় প্রবেশ করলেন। তার শরীর ছিল ধূলোমলিন এবং এবং তিনি বেশ ক্লান্ত ছিলেন। তিনি অস্ত্র রেখে দিলেন ও পাক সাফ হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এমন সময় জিবরীল আ. রাসূল সা. কাছে মানুষের বেশে আসলেন। তার মাথায় ছিল রেশমের পাগড়ী। তিনি রেশমী কাপড়ে আবৃত একটি খচ্চরে আরোহণ করে ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বললেন, 

- হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি অস্ত্র ত্যাগ করেছেন? 

- হ্যাঁ

- কিন্তু ফেরেশতারা এখনও অস্ত্র ত্যাগ করেনি। আর আপনিও রণাঙ্গন থেকে মুসলমানদের দাবীতেই ফিরছেন! হে মুহাম্মাদ আল্লাহ আপনাকে বনু কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযান যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমিও সেখানে যাবো এবং তাদের তছনছ করে ছাড়বো।”


এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনকে এই মর্মে ঘোষণা করতে বললেন, “যেসব লোক আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কথা মানবে, তারা যেন বনু কুরাইযার এলাকায় গিয়ে আছরের নামায পড়ে।”


মুহাম্মদ সা. আলীকে রা.-কে পতাকা নিয়ে বনু কুরাইযার এলাকা অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানগণও তাঁর অনুসরণ করলেন। আলী রা. রওনা হয়ে তাদের দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছতেই রাসূলুল্লাহ সা.-এর বিরুদ্ধে একটা জঘন্য উক্তি শুনতে পেলেন। কিছুক্ষণ পর রাসূল সা. উপস্থিত হলে তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এসব জঘন্য লোকদের কাছে আপনার যাওয়া উচিত নয়।” রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, “কেন? মনে হয়, তুমি তাদের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে কোনো কটু ও অশ্রাব্য কথা শুনেছো।” আলী রা. বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, সত্যই তাই।” 


রাসূলুল্লাহ সা. বনু কুরাইযার ‘আত্তা’ নামক কূপের কাছে এসে তাঁবু স্থাপন করলেন। মুসলমানরা দলে দলে এসে তাঁর সাথে মিলিত হতে লাগলো। কেউ কেউ ইশার শেষ জামাতের পরেও এলেন। তারা তখনও আছর পড়েননি। কেননা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন বনু কুরাইযার এলাকায় গিয়ে আছরের নামায পড়তে। অনন্যোপায় হয়েই তাঁরা যুদ্ধের খাতিরে নামায বিলম্বিত করেছিলেন। তাই তাঁরা এশার পরে আছর পড়েন। এ জন্য তাঁদেরকে তিরস্কার করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে পঁচিশ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখলেন। ফলে তাদের নাভিশ্বাস উঠেছিলো। আর আল্লাহ তায়ালা তাদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিলেন।


এদিকে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের লোকজন স্বদেশ অভিমুখে রওনা হয়ে যাওয়ার পর বনু নাদিরের হুয়াই ইবনে আখাতাব বনু কুরাইযার সাথে তাদের দুর্গে অবস্থান করতে থাকে। বনু কুরাইযাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের উদ্দেশ্যেই সে সেখানে অবস্থান করতে থাকে। বনু কুরাইযা সুনিশ্চিতভাবে যখন বুঝতে পারলো যে, রাসূলুল্লাহ সা. তাদের সাথে যুদ্ধ না করে কিছুতেই ফিরে যাবেন না, তখন গোত্রপ্রধান কা’ব ইবনে আসাদ গোত্রের লোকদের ডেকে বললো, 

“হে ইহুদীগণ শোনো! তোমাদের ওপর কি মুসিবত এসেছে দেখতে পাচ্ছো, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমি তোমাদের কাছে তিনটি প্রস্তাব রাখছি। এর যেকোনো একটা গ্রহণ করতে পার।” তারা বললো, “সে প্রস্তাবগুলো কি?” সে বললো, 


প্রথমত; মুহাম্মাদকে আমরা সবাই অনুসরণ করি ও মেনে নেই। আল্লাহর কসম, তিনি যে নবী তা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট। আমাদের ধর্মগন্থেও তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। এভাবে আমরা আমাদের নিজের এবং স্ত্রী ও সন্তানদের জান ও মালের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ হতে পারবো।” 

তারা বললো, “আমরা কখনো তাওরাতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করবো না এবং তার বিকল্পও গ্রহণ করবো না।” 


দ্বিতীয়ত; এটা যদি না মানো তাহলে এসো আমরা আমাদের স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের সবাইকে হত্যা করি। তারপর তরবারি নিয়ে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়াই করি। তখন আমাদের পেছনে কোন ঝামেলা ও দায়দায়িত্ব থাকবে না। তারপর আল্লাহ আমাদের ও মুহাম্মাদের মধ্যে একটা চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে থাকবো। যদি আমরা নিহত হই তাহলে আমাদের বংশধরদের পরিণাম সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়েই মরতে পারবো। আর যদি জয়লাভ করি তাহলে নতুন করে স্ত্রী এবং সন্তানাদিও লাভ করতে পারবো।” 

সবাই বললো, “এই নিরীহ প্রিয়জনদেরকে মেরে ফেলবো এও কি সম্ভব? ওরাই যদি না থাকলো তাহলে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আমাদের বেঁচে থেকে লাভ কি?” 


তৃতীয়ত “এটাও যদি অস্বীকার করো তাহলে আর একটা উপায় অবশিষ্ট থাকে। আজ শনিবারের রাত। সম্ভবত, মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীরা আজকে আমাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকবে। তাই, এসো, আমরা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করি।” 

তারা বললো, “আমরা কি এভাবে শনিবারটার অমর্যাদা করবো? এ দিনে আমাদের পূর্ববর্তীরা যা করেনি, তাই করবো? অবশ্য কিছুসংখ্যক লোক করেছিলো। তার ফলে তাদের চেহারাও বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো তা তোমাদের অজানা নেই।” 


সর্বশেষ কা’ব বললো, “আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে একটি লোকও এমন জন্মেনি, যে সারাজীবনে একটি রাতের জন্যও স্থির ও অবিচল সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।”


তারপর কোন সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়ে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দূত পাঠিয়ে অনুরোধ করলো যে, আপনি আমাদের মিত্র আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযিরকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। তার সাথে আমরা কিছু পরামর্শ করবো।” রাসূলুল্লাহ সা. তাকে পাঠিয়ে দিলেন। আবু লাবাবা গেলে সমগ্র গোত্রের লোক তার পাশে জমায়েত হলো এবং নারী ও শিশুরা তার কাছে গিয়ে কাঁদতে লাগলো। সে দৃশ্য দেখে আবু লুবাবার হৃদয় বিগলিত হলো। তারা বললো, “হে আবু লুবাবা তুমি কি মনে করো, মুহাম্মাদের ফায়সালাই আমাদের মেনে নেয়া উচিত?” তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সেই সাথে নিজের গলায় হাত দিয়ে ইশারা করে বুঝালেন যে, সে ফায়সালা হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা ছিল ওনার ধারণাপ্রসূত। তাই তিনি বলেন, “আমি তৎক্ষনাৎ উপলব্ধি করলাম যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকরা করে বসেছি।”


ভুল বুঝতে পেরে আবু লুবাবা পরক্ষণেই কুরাইজার দূর্গ থেকে বের হয়ে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে না গিয়ে মসজিদে নববীতে চলে গেলেন এবং মসজিদের একটি খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে প্রতিজ্ঞা করলেন, “আমি যে ভুল করেছি তা আল্লাহ মাফ করে না দেওয়া পর্যন্ত আমি এই স্থান থেকে নড়বো না, যে মাটিতে আমি আল্লাহ ও আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, সেখানে আমি আর কখনো কাউকে মুখ দেখাবো না।” রাসূলুল্লাহ সা. অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন আবু লুবাবার জন্য। পরে সমস্ত ব্যাপার শুনে বললেন, “সে যদি আমার কাছে আসতো তাহলে আমি তার জন্য ক্ষমা চাইতাম। কিন্তু সে যখন এরূপ প্রতিজ্ঞা করেই ফেলেছে তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত তাকে মুক্ত করতে পারি না।”


প্রায় ছয় রাত আবু লুবাবা রা. নিজেকে বন্দি রাখলেন। কেবল নামাজের সময় হলে তার স্ত্রী বাঁধন খুলে দিতেন। এসময় তিনি ওজু করে নামাজ পড়তেন। সাত দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা আবু লুবাবা রা.-এর তওবা কবুল করলেন। এই প্রসঙ্গে সূরা তাওবার ১০২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, //আর অপর কতক লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। তারা এক সৎকর্মের সাথে অসৎকর্ম মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাক্ষমাশীল পরম দয়ালু।// 


এই আয়াত নাজিলের পর আম্মাজান উম্মে সালামা রা. বলেন, আবু লুবাবাকে ক্ষমা করা হলে আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি তাকে এ সুসংবাদ জানাবো?” রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, “জানাতে পার।” অতঃপর উম্মে সালামা তাঁর ঘরের দরজার ওপর দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আবু লুবাবা, সুসংবাদ! তোমাকে ক্ষমা করা হয়েছে।” এরপর তাকে মুক্ত করার জন্য মুসলমানগণ তার কাছে ছুটে গেল। কিন্তু আবু লুবাবা রা. বললেন, “ রাসূলুল্লাহ সা. নিজ হাতে মুক্ত করে না দিলে আমি নিজেকে মুক্ত করবো না।” একথা জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযরের নামাযে যাওয়ার সময় তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন।


এখনো বনু কুরাইজা নিজেদেরকে সমর্পন করতে রাজি হয়নি। আবু লুবাবা রা.-এর ক্ষমা ঘোষণা হওয়ার পরদিন তারা আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত নিল। কারণ ততদিনে তাদের রসদ ফুরিয়ে গেছে। তাছাড়া মদিনায় আল্লাহর রাসূল সা. আসার আগে মিত্র গোত্র আউস থেকে তারা এই নিশ্চয়তা পেয়েছে যে, আউসের নেতারা তাদের লঘু শাস্তির জন্য চেষ্টা করবে। বনু কুরাইযা রাসূলুল্লাহ সা.-এর ফায়সালা মেনে নিতে প্রস্তুত হলো। খবর শুনে আউস গোত্রের লোকরা যারা এই ইহুদী গোত্রের প্রতি দরদী ছিল তারা মুহাম্মদ সা.-এর নিকট ছুটে এলো। বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, বনু কুরাইযা আমাদের মিত্র। খাযরাজ গোত্রের মুকাবিলায় তারা আমাদের সহায়তা করতো। খাযরাজের মিত্রের (বনু কাইনুকার) ক্ষেত্রে আপনি কি আচরণ করেছেন তাতো আপনার জানাই আছে।” 


২য় হিজরিতে বদর যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ সা. বনু কাইনুকা গোত্রকে অবরোধ করেছিলেন। তারা খাযরাজ গোত্রের মিত্র ছিল। তারাও মুহাম্মদ সা.-এর ফায়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল তাদের প্রাণভিক্ষা চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রাণভিক্ষা মঞ্জুর করেছিলেন। আওস গোত্র রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট বনু কুরাইযার প্রাণরক্ষার অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, “হে আউস গোত্রের লোকজন, আমি তোমাদের একজনকে সালিশ নিয়োগ করি তবে তাতে তোমরা রাজী আছ তো?” তারা বললো, ‘হ্যাঁ।’ 


অতঃপর বনু আউসের অনুরোধে হযরত মুহাম্মদ সা. তাদের গোত্রের পণ্ডিত ব্যক্তি সাদ ইবনে মুয়াজ রা.-কে বনু কুরাইজার বিচারের জন্য নিযুক্ত করেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় সাদ রা. আহত হয়েছিলেন। এসময় তীরের আঘাতে তার হাতের শিরা কেটে যায়। যুদ্ধাহত অবস্থায় তাকে বিচারের জন্য নিয়ে আসা হয়। সা’দ রা. রাসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানদের কাছে পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, “তোমাদের নেতাকে স্বাগত জানাও।” এরপর সবাই তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো, “হে সা’দ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে আপনার মিত্রদের ব্যাপারে ফায়সালা করার দায়িত্ব দিয়েছেন।” 


সা’দ বললেন, “আমি যে ফায়সালা ঘোষণা করবো সেটাই ফায়সালা বলে স্বীকৃতি হবে। তোমরা সবাই আল্লাহর নামে তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ?” তাঁরা বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তারপর যে পার্শ্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সে দিকে ইশারা করে বললেন, “এখানে যারা আছেন তাঁরাও কি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?” সা’দ অবশ্য শ্রদ্ধাবশতঃ রাসূলুল্লাহ সা.-এর কথা উল্লেখ করলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বনু কুরাইজাকে জিজ্ঞাসা করেন তারা তার ব্যাপারে ও তাওরাতের ব্যাপারে আস্থাশীল কিনা। তারা তাতে সায় দিলো। সা'দ রা. সেসময় ঘোষণা দেন বনু কুরাইজার বিচার তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত অনুসারে হবে। সা'দ তাওরাত থেকে পাঠ করতে থাকেন। 


//যখন তোমরা কোনো শহর আক্রমণ করতে যাবে, তখন প্রথমে সেখানকার লোকদের শান্তির আবেদন জানাবে। যদি তারা তোমাদের প্রস্তাব স্বীকার করে এবং দরজা খুলে দেয়, তাহলে সেই শহরের সমস্ত লোকেরা তোমাদের ক্রীতদাসে পরিণত হবে এবং তোমাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু যদি শহরের লোকেরা তোমাদের শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসে তাহলে তোমরা অবশ্যই শহরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে। এবং যখন শহরটিকে অধিগ্রহণ করতে প্রভু তোমাদের ঈশ্বর তোমাদের সাহায্য করবেন, তখন তোমরা অবশ্যই সেখানকার সমস্ত পুরুষদের হত্যা করবে। কিন্তু তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য স্ত্রীলকদের, শিশুদের, গবাদিপশু ও শহরের যাবতীয় জিনিস নিতে পার। তোমরা এই সমস্ত জিনিসগুলি ব্যবহার করতে পার। প্রভু তোমাদের ঈশ্বর, তোমাদের এই জিনিসগুলি দিয়েছেন।//


এরপর সা’দ ঘোষণা করলেন, “আমার ফায়সালা এই যে, বনু কুরাইজার সব পুরুষকে হত্যা করা হোক, সমস্ত ধনসম্পদ বণ্টন করে দেয়া হোক এবং স্ত্রী ও সন্তানদের বন্দী করা হোক।”

মুহাম্মদ সা. সা’দ রা.-কে বললেন, “তোমার ফায়সালা সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহর যে ফায়সালা এসেছে তারই অনুরূপ।”


এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবের ২৬ ও ২৭ নং আয়াতে বলেন, //কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফেরদের পৃষ্টপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দূর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা একদলকে হত্যা করেছো এবং একদলকে বন্দী করেছো। তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘর-বাড়ীর, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খন্ডের মালিক করে দিয়েছেন, যেখানে তোমরা যুদ্ধ করোনি। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।//


সা'দের সিদ্ধান্ত সকলে মেনে নিতে বাধ্য হলো। বন্দীদেরকে বনু নাজ্জার গোত্রের নারী কাইস বিনতে হারিসার বাড়িতে রাখা হয়। এরপর মদিনার বাজারে গর্ত খুড়ে ৬০০ মতান্তরে ৭০০ বন্দীর শিরচ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইজাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ইতিপূর্বে বনু কুরাইজাকে দেয়া তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বনু কুরাইজার ভাগ্য বরণের জন্য হুয়াই তাদের সাথে অবস্থান করছিলেন। তার পোষাক যাতে কেউ নিতে না পারে সেজন্য তিনি তার বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র করে রেখেছিলেন। তাকে নিয়ে আসার পর তিনি হযরত মুহাম্মদ সা. কে উদ্দেশ করে বলেন, "আপনার সাথে শত্রুতার জন্য আমি নিজেকে নিন্দা করি না। কিন্তু যে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ সে পরাজিত হয়।" এরপর ইহুদী লোকেদের সম্বোধন করে বলেন, "লোকেরা, আল্লাহর ফয়সালায় কোনো অসুবিধা নেই। এটা ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি এমন হত্যাকাণ্ড যা বনী ইসরাইলের জন্য আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।" এরপর হুয়াই বসে পড়েন ও তার শিরচ্ছেদ করা হয়।


পুরুষদের সাথে এক নারীকেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। এই নারী কাল্লাদ বিন সুয়াইদের উপর যাতা ছুড়ে মেরে তাকে হত্যা করেছিল। তাকে হত্যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বন্দী নারী ও শিশুসহ যুদ্ধলব্ধ সব সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হয়। তবে মুসলিমদের অনুরোধে বেশ কয়েকজন ইহুদিকে ক্ষমা করা হয়। এছাড়াও বনু কুরাইজার কিছু লোক আত্মসমর্পনের পূর্বে দুর্গ ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করে। তাদেরকেও পরিবারসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার ধন-সম্পদ, স্ত্রী ও সন্তানদেরকে মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন। 


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইহুদীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য প্রায় ২৫ দিন পেয়েছিলো। কিন্তু তারা তা করেনি। এর মধ্যে যারা তাদের নেতার অনুসরণ করেছে তারাই সা'দের বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদিকে যারা তার আগে নিজ ইচ্ছায় দুর্গ ত্যাগ করে আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে ক্ষমা চেয়েছে তারা ক্ষমা পেয়েছে।