৩০ ডিসে, ২০২১

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও ঢাকার ভাগ্য


আজ ৩০ ডিসেম্বর। উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনীতির জন্য আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯০৬ সালের এই দিনে ঢাকায় উপমহাদেশের মুসলিমরা ফুলস্কেলে রাজনীতি শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এদেশের মুসলিমরা খ্রিস্টান ও মুশরিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
 
আজ মুসলিম লীগের ১১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে মুশরিকদের চরম মুসলিম বিদ্বেষের প্রেক্ষিতে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর বাসভবন 'আহসান মঞ্জিলে' সারা ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ (প্রায় তিন হাজার) একত্রিত হন। তিন দিনের সম্মেলনের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন সুলতান মাহমুদ শাহ (আগা খান ৩)।
 
বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহ্দিু সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের যে দ্বন্দ্ব, তার পটভূমিতে গঠিত হয় মুসলিম লীগ, বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বর্ণহিন্দুদের সাথে যে মানসিক বিচ্ছেদ তা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদারের ভাষায়, “যদিও তারা একই দেশের মানুষ ছিল, তবুও এক ভাষা ছাড়া অন্য সব ব্যাপারে তারা বিভিন্ন ছিল। ধর্মে, শিক্ষায়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে আটশ’ বছর ধরে তারা বাস করেছে যেন দু’টি ভিন্ন পৃথিবীতে”। 

মুসলিম শাসনের শুরু থেকে কয়েক শতাব্দী বাংলাদেশের মুসলমান ও হিন্দুগণ, অভিন্ন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনাচরণ পদ্ধতি নিয়ে ধর্মীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য-চেতনা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে আপাতদৃষ্টিতে বড় রকমের কোন দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করেনি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দুরা নিছক শাসক-বদলের ঘটনারূপে গ্রহণ করে। ইংরেজদের আস্থা ও অনুগ্রহ লাভের জন্য তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। রাতারাতি তাদের একটি শ্রেণী বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়। অন্যদিকে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। তারা এই শাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে ‘রানীর বিদ্রোহী প্রজা’ রূপে অভিহিত হয়। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুসলমানরা দরিদ্র হয়ে পড়ে। হিন্দুরা ইংরেজদের সমর্থনে পুষ্ট হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালনা করে। মুসলমানদের সংগ্রামে হিন্দুদের কোন সহানুভূতি ছিল না।

বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষপটে হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রয়াদিক স্বাতন্ত্র্যবোধ তীব্র হয়। মুসলমানদের শক্ররূপে চিহ্নিত করে তাদের ওপর তারা নানামুখী হামলা পরিচালনা করে। গত শতাব্দির শুরুতে প্রশাসনিক কারণে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের অবস্থার উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার বিরুদ্ধে হিন্দুদের মারমুখী সংগ্রাম হিন্দু-মুসলিত জাতি-স্বাতন্ত্র্যের দিকটিকে আরো প্রকটভাবে উপস্থিত করে।

মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন নিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ একটি পরিকল্পনা নিয়ে সিমলায় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে আলোচনা করেন। তাঁরা ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য শিক্ষা সম্মেলনে কনফেডারেসী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রবল আন্দোলনের পটভূমিতে ঢাকায় ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন শেষে সর্বভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিদের এক বিশেষ সভায় নওয়াব সলীমুল্লাহর প্রস্তাবক্রমে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর রবিবার ঢাকার শাহবাগে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বহু প্রতিনিধির এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করা হয় এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের নিন্দা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এভাবেই ভারতীয় মুসলমানগণ একটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেন। এ রাজনৈতির ভিত্তি হলো জাতিস্বাতন্ত্রভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ।

সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের উদ্দেশ্যাবলি ছিল মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য রেখে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করা, ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তোলা। একটি মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহর পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দুদের শক্তিশালী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এটাই ছিল মূল এবং প্রধান কারণ। 

ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহ একটি দুর্বল সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে আখ্যায়িত করে। এসব সংবাদপত্র দ্রুত মুসলিম লীগের বিলুপ্তি ঘটবে বলে প্রচার চালায়। এটা সত্য যে প্রথম দিকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে লীগের গতিশীলতার অভাব ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় থেকে আসা এবং বৈপ্লবিক চিন্তাধারার তরুণ প্রজন্মের মুসলমানগণ মুসলিম লীগের রাজনীতিতে এগিয়ে আসেন। তারা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বিরোধিতা তো করেনই, অধিকন্তু ভারতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠারও দাবি করতে থাকেন।

১৯১০-এর দশকে মুসলিম লীগ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আদলে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করে। লক্ষ্ণৌ চুক্তি (১৯১৬) এবং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে মুসলিম লীগ জড় ও স্থবির অবস্থায় পড়ে। ১৯২০-এর পর থেকে কয়েক বছর খেলাফত সংগঠনই মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার সকল কাজ পরিচালনা করে।

১৯৩৫ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নেতৃত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংগঠনটি রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি সফলতা পায়নি। অনেক মুসলমান নেতার অনুরোধের প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডন হতে ভারতে ফিরে আসেন এবং মুসলিম লীগের সভাপতির পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে জিন্নাহ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখাসমূহ পুনর্গঠিত করে নতুন কাঠামো প্রদান করেন। নতুন কমিটিসমূহকে জনসংযোগ এবং আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।


মুসলিম লীগের ১ম সাফল্য ছিল আলাদা মুসলিম আসনের দাবি আদায় করা। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু মোটের ওপর ভালো সাফল্য পায়নি। মোট নয়টি প্রদেশে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ৪৮২টি আসনের মধ্যে লীগ ১০৪টি আসন লাভ করে। মোট প্রাপ্ত আসনের এক তৃতীয়াংশেরও অধিক (৩৬টি) শুধু বাংলাতেই অর্জিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ আইন সভায় কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ধারণা করা হয় যে, বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান পেশাদার ও মুসলমান ভূমি মালিক সম্প্রদায়ের যৌথ সমর্থনের ফল। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো তা হলো আলেম শ্রেণি বিশেষত দেওবন্দি ধারার আলেমরা মুসলিম লীগের কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকাতেই আগ্রহী ছিল।

১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং এর ফলে তার মন্ত্রিসভা কার্যত মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় পরিণত হয়। শেরে বাংলা ফজলুল হকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে বাংলাকে মুসলিম লীগের দুর্গে পরিণত করা হয়। বাংলার মুসলমানদের নেতা হিসেবে ফজলুল হক মুসলিম লীগের মঞ্চ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভুমি দাবি করে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

গর্ভনর জন হার্বাট-এর পরামর্শে ফজলুল হক পদত্যাগ করলে খাজা নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬-এর মধ্যে মুসলিম লীগ একটি যথার্থ জাতীয় সংগঠনে পরিণত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম এর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে দল ১১০টি আসন অর্জন করে। ফলে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, মুসলিম লীগই বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের একক সংগঠন। 

তখন পর্যন্ত কংগ্রেস প্রভাবাধীন একমাত্র উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়া ভারতের অন্যান্য মুসলমানপ্রধান প্রদেশসমূহে লীগের সাফল্য সমভাবে উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সাফল্যের নায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ভারতীয় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। ব্রিটিশ কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ক সকল আলোচনা ও চুক্তিতে মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কিত সকল বিষয়ে জিন্নাহর মতামত গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। লাহোর প্রস্তাবের ছয় বছর পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইন সভায় মুসলমান সদস্যদের দিল্লি কনভেনশনে ‘একটি মুসলমান’ রাষ্ট্রের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা অর্জিত হলে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের প্রায় সকলের সংগঠনে পরিণত হয়।  

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, যে ঢাকা থেকে মুসলিমদের রাজনীতির সূচনা সেই ঢাকা রাজনৈতিকভাবে মুশরিকদের কাছে হেরে গেছে। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী! হেরে যাওয়া শহর থেকেই গাজওয়ায়ে হিন্দের স্বপ্ন দেখি। কল্পনাবিলাস ভাবতে পারেন আপনারা কেউ কেউ। তবে জেনে রাখুন আমার নেতারা এজন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আমিও জীবন দিতে প্রস্তুত! এবং প্রস্তুত আমার মতো অনেকে। ইনশাআল্লাহ!


২৫ ডিসে, ২০২১

কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ




আজ ২৫ ডিসেম্বর। ১৪৫ বছর পূর্বে আজকের এই দিনে জন্ম হয় উপমাহদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর। তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। ব্রিটিশ ও হিন্দুদের নিষ্ঠুর আগ্রাসন থেকে উপমহাদেশের মুসলিমদের রক্ষার সংগ্রামে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। উপমহাদেশের মুসলিমদের অন্তরে তিনি কায়েদে আযম (মহান নেতা) হিসেবে সম্মানের স্থান দখল করে আছেন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আইনজীবী, রাজনীতিক ও পাকিস্তানের স্থপতি। তিনি ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামাতা ভারতের গুজরাট থেকে করাচিতে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। জিন্নাহ করাচির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোম্বের গোকুলদাস তেজ প্রাইমারি স্কুল এবং করাচির সিন্ধু মাদ্রাসা হাইস্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে খ্রিস্টান মিশনারি সোসাইটি হাইস্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৮৯২ সালে মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি লন্ডন যান এবং আইন পড়ার জন্য লিংকন’স ইনে ভর্তি হন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৯৬ সালে করাচিতে ফিরে আসেন। ১৮৯৭ সালে তিনি আইন ব্যবসায়ের জন্য বোম্বাই যান, কিন্তু প্রথম তিন বছর তাঁকে কঠিন অর্থকষ্টে ভুগতে হয়। শতাব্দীর মোড় ঘুরতেই তাঁর ভাগ্যের পরিবর্তন হতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আয়ের দিক থেকে তিনি বোম্বাইর সব আইনজীবীকে ছাড়িয়ে যান। জিন্নাহ রাজনীতিতে আসেন ১৯০৬ সালে। সেসময় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুসমাজের তীব্র প্রতিবাদমুখর পরিস্থিতিতে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন চলছিল। দাদাভাই নওরোজীর কংগ্রেসের নতুন ব্যানারে তখন ‘স্বরাজ’-এর স্লোগান যুক্ত হয়, জিন্নাহও তাতে সামিল হন।

২০ বছর বয়সে জিন্নাহ বোম্বেতে তার আইনপেশা শুরু করেন। বোম্বেতে তখন তিনি ছিলেন শহরের একমাত্র মুসলিম ব্যারিস্টার। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট পাশ হলে রাজনীতিতে জিন্নাহর উত্থান শুরু হয়। এ আইনের মাধ্যমে ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলকে ইম্পেরিয়েল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে রূপান্তরিত করা হয় এবং এতে নতুন ৩৫ জন মনোনীত সদস্য এবং ২৫ জন নির্বাচিত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে এর কলেবর বৃদ্ধি করা হয়। এতে মুসলমানদের এবং জমিদারশ্রেণীর জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকে। 

জিন্নাহ বোম্বাইয়ের একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম সংহতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি মুসলিম লীগে যোগ না দিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর মুসলিম লীগের সঙ্গে জিন্নাহর যোগাযোগ শুরু হয়। জিন্নাহ পরের বছর ডিসেম্বর মাসে মুসলিম লীগের অধিবেশনে যোগ দেন। এ অধিবেশনে কংগ্রেসের সঙ্গে একই সুরে ‘স্বরাজ’ দাবি করার লক্ষ্যে মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। মওলানা মোহাম্মদ আলী ও সৈয়দ ওয়াজির হাসানের অনুরোধে জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেস বোম্বাইতে তাদের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রস্ত্ততি নেয়। বোম্বাইর মুসলিম নেতাদের সম্মতি নিয়ে জিন্নাহ একটি পত্রের মাধ্যমে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে কংগ্রেসের সঙ্গে একই স্থানে এবং একই সময়ে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগকে তার বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠানের আহবান জানান। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করে। 

১৯১৬ সালের শরৎকালে জিন্নাহ পুনর্বার ইম্পেরিয়েল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগকে লক্ষ্ণৌতে একই স্থানে একই সময়ে বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠানে রাজী করান। জিন্নাহ লীগের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। দুটি দলের অধিবেশনেই তাদের যৌথ কমিটির তৈরি করা ন্যূনতম সংস্কারের দাবি অনুমোদন লাভ করে এবং ভারত সরকারের কাছে তা পেশ করা হয়। যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ সেখানে আইন পরিষদে তাদের প্রতিনিধিত্বে অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়া হবে এই মর্মে কংগ্রেস জিন্নাহর সঙ্গে একমত হলে পৃথক নির্বাচনী এলাকা সংক্রান্ত ভারতীয় রাজনীতির প্রধান অভ্যন্তরীণ সমস্যার সুরাহা হয়। এই ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ চুক্তির পর জিন্নাহ মুসলমানদের সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভাব হন।

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে রাউল্যাট আইন পাস করে ভারত সরকার রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য প্রচুর ক্ষমতা হাতে নেয়। এর প্রতিবাদে জিন্নাহ ইম্পেরিয়েল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন এবং গান্ধী অহিংস  অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। এপ্রিলের প্রথমদিকে গান্ধীর অনুসারীরা অমৃতসরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে তিনজন ইউরোপীয় ব্যাংক ম্যানেজারকে হত্যা করে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালা বাগে সংঘটিত হয় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করেন। 

১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে এই দল সম্পর্কে জিন্নাহর ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখান থেকেই তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছেদ করেন। ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে কংগ্রেস যেসব অঙ্গীকার করেছিল, দলটি তা কখনও পালন করে নি। ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই থাকে। কংগ্রেস মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। কয়েকবার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা করতে যেয়ে ব্যর্থ হন জিন্নাহ। তিনি নিজেকে ব্যর্থ মনে করে ইংল্যান্ড চলে যান।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাস হয়। এর মাধ্যমে আইন পরিষদে মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্ব রাখার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ আইন মধ্যবিত্ত রাজনীতিকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে। মুসলিম নেতৃবৃন্দের আহবানে জিন্নাহ ভারতে ফিরে এসে মুসলমানদের নেতৃত্ব গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নতুন ভারত শাসন আইনের অধীনে ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন হলো। মুসলিমরা বিভিন্ন জাতিগত দলে বিভক্ত ছিল। 

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলমান হলেও সেখানে কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগ একটি আসনও পেল না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবে মুসলমানরা নানা পুরনো দলের পতাকাতলে সংঘবদ্ধ ছিল এবং জিন্নাহর পুনরুজ্জীবিত মুসলিম লীগের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। সিন্ধু প্রদেশেও মুসলমানরা লীগকে পাত্তা না দিয়ে ভারত বিভক্তি নীতির বিরোধিতা করে কংগ্রেসের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে। নির্বাচনে মুসলিম লীগ শুধু বাংলায় জয়লাভ করে এবং কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করে।

১৯৩৮ সালে জিন্নাহ হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী প্রচারণার মোকাবেলা করার জন্য দিল্লিতে Dawn নামে একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। ১৯৪০ সালে জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্বের প্রচারণা শুরু করেন এবং ওই  বছর ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এ অধিবেশনে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ করা হয়।

জিন্নাহ একইসাথে কংগ্রেসের হিন্দু ও দেওবন্দী আলেমদের বিরোধীতার মুখোমুখী হন। তিনি নিশ্চিত বুঝতে পেরেছেন মুসলিমরা ব্রিটিশ শাসিত ভারতের চাইতে বহুগুণে বিপদে পড়বে কংগ্রেস শাসিত ভারতে। তাই পাকিস্তানের কোনো বিকল্প ছিল না। দেওবন্দী নেতা হুসাইন আহমদ মাদানীর বিরুদ্ধে জিন্নাহর এই সংগ্রামকে সহযোগিতা করেছেন আরেক দেওবন্দী নেতা শাব্বির আহমদ ওসমানী এবং সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী। 

কংগ্রেসের সন্ত্রাসীরা বহুবার জিন্নাহকে খুন করার চেষ্টা করে। ১৯৪৩ সালের ২৬ জুলাই বোম্বাইয়ে জিন্নাহকে একজন খাকসার স্বেচ্ছাসেবক হত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু জিন্নাহ অল্পের জন্য বেঁচে যান। তবে আহত হন। 

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ব্যর্থ হলেও ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিমলীগ মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। মুসলিমরা কংগ্রেসপক্ষীয় মুসলিম নেতা আবুল কালাম আযাদ ও হুসাইন আহমদ মাদানীকে পরিত্যাগ করে। মুসলিমরা আলাদা রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। জিন্নাহর ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের মুসলিমরা নিজেদের জন্য এক স্বাধীন ভূমি লাভ করে।   

জিন্নাহর আশঙ্কা ছিল যে ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যাওয়ার পর কংগ্রেস প্রধান আইনসভায় মুসলিমরা তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি দাবি করেন যে স্বাধীনতার পূর্বেই সেনাবাহিনীকে ভাগ করতে হবে। এজন্য এক বছরের মত সময় দরকার ছিল। মাউন্টব্যাটেন আশা করেছিলেন যে স্বাধীনতার পর একটি যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে কিন্তু জিন্নাহ চাইছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্রের আলাদা সেনাবাহিনী থাকুক। সেনাবাহিনী ভাগ হয়ে আগে পাকিস্তান স্বাধীন হলো। হায়দরাবাদ স্বাধীন হলো, কাশ্মীর স্বাধীন হলো। তারপর ভারত স্বাধীন হলো। 

জিন্নাহর আশংকাই সত্য হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীর দখল করলো, হায়দরাবাদ দখল করলো। পাকিস্তানের পাঞ্জাবের কিছু অংশ ও পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার খুলনা, সাতক্ষীরা ও  যশোর দখল করে ফেললো। পাকিস্তান তাদের ভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারলেও হায়দরাবাদ ও কাশ্মীর এখনো বন্দী হয়ে রইলো। 

কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিমদের জন্য চিন্তা করতেন। তাদের অধিকার তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। মহান রাব্বুল আলামিন তাঁকে মাগফিরাত দান করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করুন। সালাম, ইয়া কায়েদ, ইয়া কায়েদে আযম।

২১ ডিসে, ২০২১

খিলাফত পর্ব-১২ : উমার রা.-এর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের গভর্নরগণ



খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর আবু বকর রা. ইসলামী রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করে শাসন করেছিলেন। উমার রা.-ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। উমার রা. তাঁর ১০ বছরের শাসনামলে প্রশাসকদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। প্রয়োজনে তাদেরকে দায়িত্ব থেকে অপসারণও করেছিলেন। 

মক্কা : মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা.-এর শাসনামলে মক্কার গভর্নর ছিলেন আত্তাব ইবনে আসিদ রা.। তাঁর মৃত্যুর পর উমার রা. মুহরাজ ইবনে হারিসাকে মক্কার দায়িত্বশীল হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর ফুনকুজ ইবনে উমায়েরকে দায়িত্ব দেন। তারপর নাফি ইবনু হারিসকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন উমার রা.। 

মদিনা : মদিনা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী। এখানে আলাদা কোনো প্রশাসক ছিলেন না। খলিফা নিজেই মদিনার তত্ত্বাবধান করতেন। তবে কোনো কারণে মদিনা থেকে বের হলে তিনি জায়িদ বিন সাবিত রা.-কে মদিনার তত্ত্বাবধায়ক করে যেতেন। কোনো সময় আলী রা.-কেও এই দায়িত্ব দিতেন। 

তায়িফ : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন উসমান ইবনু আবুল আস রা.। তিনিও রাসূল সা. কর্তৃক নিযুক্ত ছিলেন। উমার রা. সময়ে তিনি জিহাদে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় সুফিয়ান ইবনু আব্দুল্লাহ আস সাকাফিকে। 

ইয়েমেন : আবু বকর রা.-এর সময়ে ইয়েমেনে বিদ্রোহীরা অস্থিরতা শুরু করে দিয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে ইয়েমেনে অনেকজন প্রশাসক ছিল। যেমন মুহাজির ইবনে আবু উমাইয়া রা., আবু মুসা আশয়ারি রা., যিয়াদ ইবনু লাবীদ রা. ও আলা ইবনু আবি উমাইয়া রা.। উমার রা.-এর সময়ে ইয়েমেন ছিল স্থিতিশীল। উপরন্তু ইয়েমেনের যোদ্ধারা সিরিয়া ও ইরাক অভিযানে অংশ নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করছিল। তাই উমার রা. সমগ্র ইয়েমেনে একজন প্রশাসক রাখেন আর তিনি হলেন আলা ইবনু আবি উমাইয়া রা.। 

বাহরাইন : আবু বকর রা.-এর সময় থেকে এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আলা ইবনুল হাদরামী রা.। বসরা ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীনে আসলে উমার রা. আলা ইবনু হাদরামী রা.-কে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর এই অপসারণের কারণ ছিল তিনি খলিফার অনুমতি ছাড়াই পারসিকদের সাথে নৌ-পথে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। তবে তিনি বসরার দায়িত্ব  উমার রা. তাঁর স্থলে বাহরাইনের প্রশাসক নিযুক্ত করেন তায়িফের সাবেক শাসক উসমান ইবনু আবুল আস রা.-কে। তিনি উমার রা.-এর নির্দেশে পারসিকদের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন বাহরাইনে প্রশাসক নিযুক্ত হন আইয়াশ ইবনু আবু সাওর। এরপর কুদামা ইবনে মাজউন প্রশাসক হন। কুদামার বিরুদ্ধে মদ্যপানের অভিযোগ আসে। উমার রা. তদন্ত করে এর সত্যতা পান। তিনি তাকে প্রশাসক থেকে অপসারণ করে আবু হুরাইরা রা.-কে বাহরাইনের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। তিনি এর আগে বাহরাইনের বিচারক ছিলেন। উসমান বিন আবুল আস রা. যুদ্ধ শেষে ফিরে আসলে তিনি পুনরায় বাহরাইনের প্রশাসক হন। বাহরাইনের সাথে ওমান ও ইয়ামামাও যুক্ত ছিল। 

ইরাক : ইরাক অধিকারে আসে আবু বকর রা.-এর সময়ে। তখন খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। এরপর সিরিয়া অভিযানের সময় রোমানদের বিরুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদের সহায়তার প্রয়োজন হলে আবু বকর রা. খালিদ রা.-কে সিরিয়াতে সেনানায়ক করে পাঠান। আর ইরাকের দায়িত্ব দেন মুসান্না রা.-কে। মুসান্না রা.-ই প্রথম পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। উমার রা. খলিফা হওয়ার পর একইসাথে মুসান্না রা. ও খালিদ রা.-কে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন। এই প্রসঙ্গে উমার রা. বলেন, আমি তাদেরকে তাদের কোনো অপরাধের জন্য পদচ্যুত করিনি। তাদের পদচ্যুত করার কারণ মুসলিমরা তাদেরকে যুদ্ধজয়ের জন্য ভরসা করা শুরু করেছিল। যুদ্ধজয় খালিদ বা মুসান্নার জন্য হয় না বরং আল্লাহর সাহায্যে হয়। মুসান্না রা.-কে সরিয়ে ইরাকের প্রশাসক নিযুক্ত করা হয় আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ রা.-কে। পদচ্যুত হয়ে মুসান্না রা. নিষ্ঠার সাথে আবু উবাইদ রা.-এর অধীনে যুদ্ধ করেছেন। আবু উবাইদ রা. শাহদাতবরণ করলে পুনরায় মুসান্না রা. প্রশাসকের দায়িত্ব পান।  

সিরিয়া : সিরিয়াতে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.কে মুসলিম বাহিনীর সেনানায়ক হিসেবে পাঠান আবু বকর রা.। ইয়ারমুকের যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি আবু উবাইদা রা.-কে সরিয়ে যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ খালিদ রা.-কে সেনানায়ক করেন। যুদ্ধ চলাকালে আবু বকর রা. ইন্তেকাল করেন। ইয়ারমুকে রোমানদের পরাজিত করার পর উমার রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে পদচ্যুত করে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করেন আবু উবাইদা অবনুল জাররাজ রা.-কে। তিনি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে শাহদাতবরণ করলে মুয়াজ বিন জাবাল রা.-কে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। আবু উবাইদা সফরে ও জিহাদে গেলে মুয়াজ রা.-কে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। মুয়াজ রা.-ও প্লেগ মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে শাহদাতবরণ করলে ইয়াজিদ ইবনু আবু সুফিয়ানকে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করেন উমার রা.। ইয়াজিদ ইবনু আবু সুফিয়ানকে আবু বকর রা. সিরিয়া অভিযানের সময় কমান্ডার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সেই থেকে তিনি সেখানে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ ও জিহাদে লিপ্ত ছিলেন। এক বছরের মতো দায়িত্ব পালন করে তিনিও প্লেগ রোগে শাহদাতবরণ করেন। ইয়াজিদ রা. মৃত্যুর আগে তার ভাই মুয়াবিয়া রা.-কে দায়িত্ব দিয়ে যান। খলিফা উমার রা. এই দায়িত্বকে অনুমোদন করেন।       

মিসর : মিসর বিজয়ের নেতৃত্ব দেন আমর ইবনুল আস রা.। সেই থেকে আমর ইবনুল আস রা.-কে মিসরের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন উমার রা.। 

বসরা : বসরার ১ম শাসক নিযুক্ত হন শুরাইহ বিন আমর রা.। কিছুদিন পর তিনি জিহাদের সময় শাহদাতবরণ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন উতবা বিন গাজওয়ান। উতবা বিন গাজওয়ান ইন্তেকাল করলে খলিফা উমার রা. প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন মুগিরা বিন শুবা রা.-কে। ১৭ হিজরিতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের অভিযোগ আসে। অভিযোগের কারণে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়। এই নিয়ে বিচার ও তদন্ত হয়। তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। উমার রা. তাঁকে পুনরায় একই পদে বহাল রাখেন নি, কুফায় পাঠিয়ে দেন। মিথ্যা সাক্ষ্যের অভিযোগে তিনজনের শাস্তি হয়। মুগিরা রা.-এর পর বসরার প্রশাসক হন আবু মুসা আশাআরি রা.। বসরার মানুষ আবু মুসা রা.-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। 

কুফা : কুফা ইসলামের অধীনে আসার পর সেখানে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.। জনগণদের মধ্যে কয়েকজন সা'দ রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে উমার রা. তাঁকে সরিয়ে দেন। তার স্থলে আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে নিযুক্ত করেন। তার বিরুদ্ধেও জনগণ অভিযোগ আনলে তাকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। অতঃপর কুফার গভর্নর করা হয় মুগিরা বিন শুবা রা.-কে। 

মাদায়েন : মাদায়েন ছিল পারস্য সম্রাট খসরুর রাজধানী। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.-এর নেতৃত্বে মাদায়েন বিজয় করে মুসলিমরা। এই যুদ্ধে সা'দ রা.-এর অন্যতম সহযোগী ছিলেন সালমান ফারসি রা.। সা'দ রা.-কে কুফায় ও সালমান রা.-কে মাদায়েনের প্রশাসক নিযুক্ত করেন উমার রা.। সালমান রা. জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। কিন্তু তিনি এই দায়িত্বের ব্যাপারে সবসময় অব্যাহতি চাইতেন। অবশেষে উমার রা. তাঁর আবেদন কবুল করে তার স্থলে হুজাইফা ইবনে ইয়ামান রা.-কে প্রশাসক নিযুক্ত করেন। 

আজারবাইজান : আজারবাইজান অভিযানে নেতৃত্ব দেন হুজাইফা ইবনে ইয়ামান রা.। আজারবাইজান ইসলামের অধীনে আসলে তিনিই হন প্রথম প্রশাসক। পরে তাঁকে মাদায়েনে পোস্টিং করা হলে উতবা ইবনে ফারকাদ রা.-কে আজারবাইজানের প্রশাসক হিসেব নিযুক্ত করেন উমার রা.। 


১৯ ডিসে, ২০২১

খিলাফত পর্ব-১১ : আবু বকর রা.-এর ইন্তেকালে আলী রা.-এর প্রতিক্রিয়া


আবু বকর রা.-এর ইন্তেকালে মুষড়ে পড়েছে মদিনাবাসী। আনসার মুহাজির নির্বিশেষে সবাই শোক প্রকাশ করলেন। যদিও অনুমিত ছিল কিছুদিনের মধ্যেই খলিফাতুর রাসূল ইন্তেকাল করবেন। তবুও তাঁর ইন্তেকালে মুসলিমেরা ভেঙে পড়েছিল। মুহাম্মদ সা. একান্ত অনুসারীকে মুসলিমরা পেয়েছিলো পরম অভিভাবকরূপে। 

আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর খবর শুনে আলী রা. ইন্নালিল্লাহ বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আবু বকর রা.-এর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটি বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন,   

“হে আবু বকর!  আল্লাহ আপনার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আপনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু, বিপদের সহায়, সমবেদনা জ্ঞাপনকারী, রহস্যের আধার, বিশ্বস্ত সাথী ও সকল কাজের পরামর্শদাতা। আপনি হলেন সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এবং সর্বাপেক্ষা সাচ্চা ও সুদৃঢ় ঈমানদার। আপনি হলেন সর্বাধিক মুত্তাকি। আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে আপনি ছিলেন সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ চিন্তার অধিকারী । আপনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহচর্যের প্রকৃত হক আদায়কারী, রাসূলুল্লাহ সা.-এর দরবারে সর্বাপেক্ষা অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত, আপনার গুণাবলি অসংখ্য ও অসীম, আপনার মর্যাদা অতি উচ্চ, রাসূলুল্লাহ সা.-এর একান্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি, মহান মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ইসলামের পক্ষ থেকে এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন! 

আপনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর পাশে কান ও চোখের মতো ছিলেন। হে আবু বকর, আপনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর এমন সময় বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন, যখন দুনিয়ার সমস্ত লোক তার প্রতি অবিশ্বাস করেছিল। আল্লাহ তা'আলা আপনার নাম রেখেছেন আস সিদ্দীক। আপনি ইসলামের জন্য আপনার ধন-সম্পদ এমন সময়ে অকাতরে ব্যয় করেছেন, যখন সকল মানুষই কৃপনতা করেছে। 

আপনাকেই রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাওর গুহার সাথী এবং দু'জনের একজন বলা হয়েছে। গুহার মুখে শত্রুর আভাস পেয়ে আপনি রাসূলুলাহ সা.-এর জন্য অস্থির হয়ে পড়লে আপনাকে আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে সান্ত্বনা প্রদান করা হয়েছিল। আপনি খিলাফতের যাবতীয় কর্তব্য অতীব সুন্দরভাবে পালন করেছেন। লোকজন যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন আপনি ছিলেন পূর্ণ কর্মতৎপর। যখন তারা অক্ষম হয়ে পড়েছিল তখন আপনি পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রকাশ পেয়েছিলেন। আপনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শকে সে সময় আঁকড়ে ধরেছিলেন, যখন তারা তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল। 

আপনি কোনোরূপ বিতর্ক ও অনৈক্য ছাড়াই খলিফা নির্বাচিত হয়েছিলেন, যদিও এ নির্বাচন মুনাফিকদের ক্রোধ ও কাফিরদের মনোবেদনা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিদ্রোহীদের হিংসার কারণে পরিণত হয়েছিল। যখন লোকজন দুর্বল হয়ে পড়েলি, তখন আপনি সত্যের ওপর অবিচল ছিলেন। যখন তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন আপনি অনড় ছিলেন। যখন তারা বিচলিত হয়ে যায়, তখন আপনি আল্লাহর নূর নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছেন। অবশেষে তারা আপনাকে অনুসরণ করেছে এবং হিদায়াত লাভ করেছে। তাদের তুলনায় আপনার আওয়াজ ক্ষীণ ছিল; কিন্তু সবার চেয়ে আপনার মর্যাদা অধিক, আপনার কথোপকথন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সঠিক ছিল। আপনি ছিলেন স্বল্পভাষী। 

আপনার বক্তব্য সবচেয়ে অলঙ্কারপূর্ণ ছিল। বীরত্বের দিক দিয়ে আপনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। আপনি বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট বিজ্ঞ ছিলেন। সঠিক আমলের দিক দিয়ে আপনি সবার চেয়ে উত্তম ছিলেন। আপনি দ্বীনের প্রথম নেতা ছিলেন। যখন লোকেরা দ্বীন ছেড়ে চলে যায়, তখন আপনি ছিলেন কঠোর। যখন তারা পুনরায় দীনের দিকে ফিরে আসে, তখন আপনি ছিলেন মুমিনদের জন্য অত্যন্ত দয়ালু নেতা। 

যে ভারী বোঝা তারা ওঠাতে সক্ষম হয়নি, তা আপনি উঠিয়েছেন। লোকেরা যে সকল বস্তু ছেড়ে রেখেছে, তা আপনি হিফাজত করেছেন। যা কিছু তারা হারিয়েছে আপনি তা সংরক্ষণ করেছেন। তারা যা জানতো না, তা আপনি তাদেরকে শিখিয়েছেন। যখন তারা ক্লান্ত ও অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন আপনি পূর্ণ কার্যক্ষম ছিলেন। যখন তারা ভীত হয়ে পড়ে, তখন আপনি সহনশীলতার সাথে কাজ করেন। 

যখন তারা হিদায়াতের জন্য আপনার আদর্শ গ্রহণ করে তখন তারা সফলতা অর্জন করে এবং তারা এমন কিছু লাভ করে যা তারা কল্পনাও করে না। আপনি কাফিরদের জন্য আযাবের বৃষ্টি এবং অগ্নির গলিত শিখা ছিলেন এবং মু'মিনদের জন্য ছিলেন রহমত ও আশ্রয়স্থল। আপনি বিভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিলেন। আপনাকে যেগুলো প্রদান করা হয়েছিল, আপনি তার উত্তমগুলোই অর্জন করেছিলেন। 

আপনার যুক্তি পরাভূত হয়নি, আপনার দৃষ্টি ক্ষীণ হয়নি, আপনার মন দুর্বল হয়নি। আপনার অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়নি এবং তা কখনো দুর্বল হয়ে যায় নি। আপনি ছিলেন ঐ পাহাড়ের মতো, যেটাকে কোনো ঝড়ও নাড়াতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ সা.-এর বক্তব্য অনুযায়ী আপনি বন্ধুত্ব ও সম্পদ দ্বারা সবচেয়ে উত্তম খিদমত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা.-এর বক্তব্য অনুযায়ী দৈহিক নিয়ে যদিও আপনি জীর্ণ ছিলেন; কিন্তু আল্লাহর বিধি-বিধানের ব্যাপারে ছিলেন খুবই শক্তিশালী। 

আপনি মনের দিক দিয়ে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, আল্লাহর নিকট মর্যাদাশীল এবং লোকদের চোখে অত্যন্ত সম্মানিত। আপনার প্রতি কেউ বিদ্রুপ করতে পারেনি এবং আপনার সামনে কেউ বাকচাতুরী করতে সাহস পায়নি। আপনার প্রতি কারো বিদ্বেষ ছিল না, আপনি কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেননি। দুর্বল ও নীচ ব্যক্তি আপনার নিকট ছিল শক্তিশালী। কেননা আপনি তার অধিকার বা দাবি আদায় করে দিতেন। অপরদিকে শক্তিশালী ব্যক্তিও আপনার নিকট দুর্বল ছিল। কেননা আপনি তাদের নিকট থেকে অন্যের দাবি আদায় করে দিতেন। 

দূরবর্তী-নিকটবর্তী উভয় প্রকার লোকই আপনার নিকট সম্মানিত ছিল। যে ব্যক্তি আল্লাহকে বেশি ভয় করে চলতেন, তিনিই আপনার নিকট অধিক প্রিয় ছিলেন। সততা ও বিনয় ছিল আপনার ভূষণ, আপনার কথা ছিল অকাট্য, কার্যক্রম ছিল সহনশীলতা ও দূরদর্শিতাপূর্ণ। আপনার মতামত ছিল জ্ঞানগর্ভ ও দৃঢ়তাপূর্ণ। আপনি এ অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করে যাচ্ছেন, যখন পথ নিষ্কন্টক হয়েছে, বিপদাপদ সহজ হয়ে গেছে। আগুন নির্বাপিত হয়ে গেছে, দ্বীন সঠিক পথে এসে পৌঁছেছে। ঈমান শক্তিশালী হয়েছে, ইসলাম ও মুসলিমদের অবস্থা দৃঢ় ও স্থায়ী হয়েছে, আল্লাহর বিধান সফলতা অর্জন করেছে, যদিও এতে কাফিরদের বিরোধিতা ছিল। 

আল্লাহর কসম, আপনি এমন দ্রুত গ্রসর হয়েছেন যে, আপনার পরবর্তীদেরকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আপনি কল্যাণ অর্জন করার ক্ষেত্রে মহাসাফল্য অর্জন করেছেন। আপনার ওপর আক্ষেপ করা হবে- এমন কিছু থেকে আপনি অনেক উর্ধ্বে। আপনার মৃত্যুর বেদনা আকাশে অত্যন্ত দুঃখের সাথে অনুভূত হচ্ছে। আপনার বিচ্ছেদ সমস্ত পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। আল্লাহ প্রদত্ত ভাগ্যের ওপর আমরা সন্তুষ্ট আছি এবং আমাদের সকল বিষয় তাঁর কাছে সোপর্দ করে দিয়েছি। 

আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের পর আপনার মৃত্যুর মতো এমন বিপদ মুসলিমদের ওপর পতিত হয়নি। আপনি ছিলেন দ্বীনের গৌরব ও আশ্রয়স্থল। আপনি মুসলিমদের জন্য ছিলেন দুর্গ ও দয়ার ঝরণা এবং মুনাফিকদের জন্য কঠোর । আল্লাহ আপনাকে আপনার নবীর সাথে মিলিত করুন! তিনি যেন আমাদেরকে আপনার পরে আপনার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত না করেন অথবা আপনার পথ থেকে পথভ্রষ্ট না কৱেন- এ কামনাই পোষণ করি।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। 

উপস্থিত মদিনাবাসী নীরবে আলী রা.-এর এই ভাষণ শুনলেন এবং কাঁদলেন। অতঃপর সবাই বললেন, হে রাসূলের জামাতা! আপনি সঠিক বলেছেন।  


১৭ ডিসে, ২০২১

খিলাফত পর্ব-১০ : উমার রা.-যেভাবে মুসলিমদের নেতা হলেন


সিরিয়ায় যখন মুসলিম বাহিনী সর্বাত্মক জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা. অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আবু বাকর রা. প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায়ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলি ও খিলাফাতের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁর মৃত্যু হতে যাচ্ছে। 

তিনি আশংকা করলেন, এ সময় যদি তার মৃত্যু হয় এবং তার পরে মুসলিমদের মধ্যে আগের মতো খিলাফত নিয়ে মতবিরোধ শুরু হয় এবং তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তবে এ দুর্বলতার সুযোগ নিবে দুই পরাশক্তি রোমান ও পারসিকরা। তারা ইসলামের নাম মুছে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তাই তিনি পরিকল্পনা করলেন, যদি সকলের মতামত নিয়ে কাউকে খলিফা হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারেন, তা হলে তার পরে খিলাফাত নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধ হবে না এবং তাদের ঐক্য ও সংহতি অটুট থাকবে। অবশেষে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তিনি জীবিত থাকতেই পরবর্তী খালীফা নির্বাচিত করে যাবেন। 

আবু বকর রা. তাঁর ঘরে মজলিশে শুরার অধিবেশন আহবান করলেন। সিনিয়র সাহাবীরা উপস্থিত হলে তিনি বলেন, “তোমরা তো আমার অবস্থা দেখতে পাচ্ছো! আমার মনে হয় না যে, আর বাঁচবো! আল্লাহ তা'আলা আমার বাই'আত থেকে তোমাদের মুক্ত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের দায়িত্ব থেকে আমাকেও রেহাই দান করেছেন। উপরন্তু তোমাদের নেতৃত্বভার তোমাদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হলো। এখন তোমরা তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী তোমাদের আমীর নিযুক্ত করো। যদি তোমরা আমার জীবদ্দশায় আমীর নিযুক্ত করতে পারো, তবে তা-ই সবচেয়ে ভালো হবে। তা হলে আমার পরে তোমাদের মতবিরোধে জড়িয়ে পড়তে হবে না।

সবাই সানন্দে তাঁর কথায় রাজি হলেন। আবু বকর রা. প্রত্যেকের কাছে জানতে চাইলেন উপস্থিত কেউ খিলাফতের দায়িত্ব নিতে রাজি কিনা? দেখা গেলো, কেউ নিজে দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি হলো না বরং প্রত্যেকেই নিজের চেয়ে অন্যকে অধিকতর সং ও যোগ্য মনে করছেন। সর্বশেষ মজলিশে শুরার সকলেই মিলে খালিফা বাছাইয়ের দায়িত্ব আবু বকর রা.-এর হাতে অর্পণ করে বললেন, “হে খলিফাতুর রাসূল! আপনার রায়ই হলো আমাদের রায়। আপনিই নির্ধারণ করে দেন”

আবু বকর রা. বললেন, “পরে তোমরা কি মতবিরোধ করবে? তারা বললেন, না। আবু বকর রা. বললেন, “তা হলে কি আল্লাহর নামে অঙ্গীকার রইলো যে, তোমরা আমার মতের ওপর সন্তুষ্ট থাকবে?" তারা বললো, হ্যাঁ। এরপর আবু বাকর রা. বললেন, "তা হলে আমাকে একটু ভাবার সুযোগ দাও। আমি দেখি, কে আল্লাহ তাঁর দ্বীন ও বান্দাহদের জন্য অধিকতর উপযুক্ত হন।

সভা শেষ হয়ে আবু বকর রা. প্রথমে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা.-কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার পরবর্তী খালিফা উমার হলে তুমি কেমন মনে করো? আবদুর রাহমান ইবনু আওফ রা. জবাব দিলেন, “আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে প্রশ্ন করলেন, যে সম্পর্কে আপনি আমার চেয়ে ভালো জানেন।” আবু বকর রা. বললেন, “তবুও তোমার মতামত চাই। আবদুর রাহমান রা. বললেন, “আল্লাহর কসম, তিনি তো অনেক ভালো লোক।" এরপর আবু বাকর রা. আবদুর রাহমান রা.-কে বললেন, “আমি তোমার সাথে যে বিষয়ে আলাপ করলাম, এ ব্যাপারে তুমি অন্য কাউকে কিছু বলো না। 

একইভাবে আবু বকর রা. উসমান রা., আলী রা. উসাইদ বিন হুদাইর, সাঈদ ইবনু জায়েদ রা. সহ বহু মুহাজির ও আনসার নেতাদের সাথে উমার রা.-এর ব্যাপারে আলাপ করলেন। সকলের তাঁর ব্যাপারে পজেটিভ মতামত দিল। এভাবে পরামর্শ করতে গিয়ে মোটামুটি মদিনায় জানাজানি হয়ে গেল উমার রা.-ই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী খলিফা। এই খবরে শুধু একজন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি হলেন তালহা রা. 

তিনি শুয়ে থাকা আবু বকর রা.-এর পাশে বসে বললেন, হে খিলিফাতুর রাসূল! আপনি অবগত আছেন যে, উমার রা.-এর মেজাজ অত্যন্ত কঠোর। তা সত্ত্বেও যদি আপনি তাকে খলিফা নিযুক্ত করে যান তবে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলে কী উত্তর দিবেন? 
  
খলিফা এই ধরণের কথায় কষ্ট পেলেন। তিনি উঠে বসতে গেলেন কিন্তু পারলেন না। পরে বললেন, আমাকে উঠাও। তিনি আর শুয়ে থাকতে পারলেন না। লোকজন বসিয়ে দিলে তিনি বললেন, আমাকে আল্লাহর ভয় দেখাচ্ছো! অন্যায়ভাবে যে কেউ তোমাদের নেতৃত্ব লাভ করলে সে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আমি যখন রবের সাথে মিলিত হবো তখন তিনি এই বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলবো, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার বান্দাদের জন্য একজন সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই খলিফা নিযুক্ত করেছি। 

এরপর তিনি বললেন, আমার নম্র ব্যবহার দেখেই উমার রা. কঠোরতা দেখাতেন। খিলাফতের দায়িত্ব মাথায় আসলে তাঁর কঠোর প্রকৃতি অনেকাংশে কমে যাবে। আমি নিজে লক্ষ্য করেছি আমি যেখানে নম্র ও কোমল ব্যবহার করেছি সেখানে তিনি কঠোর হয়েছেন। আবার আমি যেখানে কঠোর হয়েছি তিনি সেখানে কোমলতা দেখিয়েছেন। 

এরপর তালহা রা. লজ্জিত হয়ে চলে গেলেন। 

আবু বকর রা. এবার উমার রা.-কে ডেকে খলিফার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বললেন। তিনি রাজি হলেন না বরং অন্য কারো পরামর্শক হয়ে থাকতে চেয়েছেন। আবু বকর রা. তাঁকে ধমক দিয়ে দায়িত্ব নিতে বললেন। অবশেষে আবু বকর রা.-এর চাপে নতি স্বীকার করে দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। 

পরদিন আবু বকর রা. উসমান রা.-কে ডেকে খলিফা নিযুক্তির গেজেট লিখতে বললেন। আবু বকর রা. বলে দিচ্ছিলেন ও উসমান রা. লিখে যাচ্ছিলেন।   

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  
এটি ইহলোক ত্যাগ করে পরপারের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়ার সময় আবু বকর ইবনু কুহাফার ওসিয়্যাত। এ অন্তিম মুহূর্তটি এমন কঠিন যে, এ সময় কাফিরও স্বেচ্ছায় ঈমান আনয়ন করে, পাপিষ্ঠ লোকও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মিথ্যুক ব্যক্তিও সত্য কথা বলে। আমার পরে আমি উমার ইবনুল খাত্তাবকেই তোমাদের খলিফা মনোনীত করে যাচ্ছি। অতএব, তোমরা সকলেই তার কথা শুনবে ও মেনে চলবে। আল্লাহ, তাঁর রাসূল, দ্বীন এবং নিজের ও তোমাদের কল্যাণ কামনা করতে আমি কোনোরূপ ত্রুটি করিনি। আমার ধারণা ও বিশ্বাস, সে ন্যায়বিচার করবে। যদি সে অন্যায় করে, তবে প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আমি আমার বিবেক অনুযায়ী তোমাদের কল্যাণ সাধন করতে চেষ্টা করেছি। তবে আমি গায়েব জানি না। অচিরেই জালিমরা জানতে পারবে তাদের পরিণাম কিরূপ! 
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। 

এরপর উসমান রা.-কে বললেন এতে মোহর মারতে এবং জনগণের সামনে তা ঘোষণা করে দিতে। মসজিদে নববীর সামনে জমায়েত হাজারো মানুষের সামনে উসমান রা. এই ওসিয়ত ঘোষণা করলেন। জনগণ সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলো এবং উমার রা.-এর কাছে বাইয়্যাত নিতে শুরু করলো। 

এসময় খলিফা আবু বকর তাঁর স্ত্রীর সহায়তায় বহু কষ্টে মসজিদের সামনে আসলেন। তিনি বললেন, আমি যাকে তোমাদের জন্য খলিফা নিযুক্ত করেছি, তোমরা কি তাকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছো? আমি তো আমার কোনো আত্মীয়কে খলিফা নির্বাচিত করিনি। আমি উমারকেই খলিফা নিযুক্ত করেছি। তোমরা তার কথা শুনবে ও মেনে চলবে। আল্লাহর কসম! আমি আমার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করিনি। 

জনগণ সমস্বরে বলে উঠলো, আমরা আপনার শুনলাম এবং আপনার কথা মেনে নিলাম। 

এরপর আবু বকর রা. এবার উমার রা.-কে একান্তে ডেকে নিয়ে পরামর্শ দিতে লাগলেন, 
//হে ‘উমার!, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করো। জেনে রেখো যে, দিনের বেলা আল্লাহর প্রতি বান্দাহর যে কর্তব্য রয়েছে, তা তিনি রাতে কবুল করেন না, অনুরূপভাবে রাতের বেলা যে কর্তব্য রয়েছে, তা তিনি দিনের বেলা কবুল করেন না। (অর্থাৎ প্রত্যেকটি দায়িত্ব সময়মতো সম্পন্ন করা উচিত)। তিনি কোনো নফল কাজ কবুল করেন না, যতক্ষণ না ফরজ আদায় করা হয়। 
উমার, তুমি কি মনে করো না যে, সুখ-শান্তি ও বিপদ-আপদ- দু'ধরনের আয়াতই অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে মু'মিনদের মধ্যে ভয় ও আশা দুটিই বিদ্যমান থাকে। কিন্তু আল্লাহর নিকট কোনো মুমিনের এমন কোনো কিছুই আশা করা উচিত নয় যে, যাতে তার কোনো অধিকার নেই। অনুরূপভাবে তার এমন কোনো কিছুকে ভয় করাও উচিত নয় যে, যাতে সে নিজেই পতিত হয়। (অর্থাৎ কেউ যদি কোনো বিষয়কে ভয় করে, তা হলে তার সে বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত।) 

উমার, তুমি কি মনে করো না যে, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের উল্লেখ তাদের উত্তম কার্যাবলির সাথে করেছেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাদের যে অন্যায় কাজগুলো ছিল তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতএব যখন তুমি তাদেরকে স্মরণ করবে তখন বলবে, তাদের মতো আমাদের আমল কোথায়? অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামবাসীদের উল্লেখ তাদের অন্যায় ও অবৈধ কার্যাবলির সাথে করেছেন। যখন তোমরা তাদেরকে স্মরণ করবে তখন বলবে, আমি একান্তই আশা পোষণ করি, যেন তাদের মতো না হই। এভাবে বর্ণনা করার কারণ হলো, যাতে বান্দাহদের মধ্যে আশা ও ভয়- দুটিই বিদ্যমান থাকে। ফলে কেউ আল্লাহর প্রতি অতি আশাবাদী হবে না, আবার কেউ আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হবে না। 

যদি তুমি আমার উপদেশ মনে রাখো, তা হলে এমন কোনো অদৃশ্য বস্তু নেই, যা তোমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে বেশি প্রিয় হবে। আর এ মৃত্যু তোমার কাছে আসবেই। আর যদি আমার উপদেশ মনে না রাখো, তা হলে এমন কোনো অদৃশ্য বস্তু নেই, যা তোমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে বেশি অপ্রিয় হবে। আর এ মৃত্যুকে তুমি ফিরিয়েও রাখতে পারবে না। // 

উমার রা.-কে কঠোরভাবে মৃত্যর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন খলিফা। উমার রা.-কে বিদায় দিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে উমার রা.-এর জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়া করলেন আল্লাহর কাছে। খলিফা আবু বকর রা.-এর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা. ইন্তেকাল করলেন। নতুন নেতা হিসেবে মিম্বরে বসলেন উমার ইবনুল খাত্তাব রা.। ইয়ারমুক নদীর তীরে যুদ্ধরত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. যুদ্ধের চলাকালীন মদিনা থেকে আসা গোয়েন্দা মারফত খবর পেলেন আবু বকর রা. ইন্তেকাল করেছেন। নতুন খলিফা উমার রা.। যুদ্ধ জয়ের আগে তিনি এই খবর কাউকে জানান নি।   

১৫ ডিসে, ২০২১

খিলাফত পর্ব-০৯ : আবু বকর রা.-এর সিরিয়া অভিযান


যখন মুসলিমরা পারসিকদের পর্যদস্তু করে ইরাকে একের পর এক শহর দখল করছিলেন তখন রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত অনুমান করেছিলেন ইরাকের পরই মুসলিমরা সিরিয়া আক্রমণ করবে। এদিকে খালিদ রা.-কে মুসলিমরা 'সাইফুল্লাহ' বা আল্লাহর তরবারি হিসেবে বিখ্যাত করে তুলেছিল। সাইফুল্লাহর ব্যাপারে মুশরিকদের ভয় না থাকলেও খ্রিস্টানরা ভয় পেতে শুরু করে। তারা ভেবেছিল মুহাম্মদ সা. আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো তরবারি পেয়েছেন। 

আবু বকর রা.-এর বিশ্রামবিহীন জয়যাত্রা অব্যাহত রাখায় রোমানরা সিরিয়া সীমান্তে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে পরিখা খনন করে। ব্যাপক গোয়েন্দা নিযুক্ত করে। সৈন্য সমাবেশ করে। সৈন্যদের উৎসাহ দিতে হেরাক্লিয়াস নিজেই রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) থেকে সিরিয়ার হিমসে অবস্থান করেন। রোমানদের মূল শক্তি নিয়ে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করেন। 

মুসলিমদের মূল শক্তি ইরাকে থাকায় আবু বকর রা. সিরিয়ায় এগুতে পারছিলেন না। তাই তিনি খালিদ বিন সাঈদ রা. নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিরিয়া সীমান্তে প্রেরণ করেন যাতে রোমানরা আগ্রাসী হয়ে এগুতে না পারে। তবে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন মদিনা থেকে নির্দেশ আসার আগে যেন তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে না পড়ে। এদিকে খালিদ বিন সাঈদ রা. তাঁর গোয়েন্দা মারফত খবর পেলেন রোমানরা যুদ্ধের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। খালিদ ইবনে সাঈদ রা. চিঠি লিখে আবু বকর রা.-কে জানান রোমানরা প্রস্তুত, এমতাবস্থায় আমরা আগে আক্রমণ না করলে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা. তৎক্ষণাৎ ইকরিমা বিন আবু জাহলের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। কিন্তু তিনি এতে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। কারণ রোমানরা বীর যোদ্ধা, তারা পারসিকদের মতো অল্পতে মনোবল হারায় না। তদুপরি তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগামী। কিছুদিন আগে তারা পারসিকদের এক বিশাল বাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে পরাস্ত করেছিল। রোমানদের সাথে যুদ্ধ মোটেই সহজ ছিল না। আবু বকর রা. মজলিশে শুরা আহবান করলেন। সেখানে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। বেশিরভাগ সাহাবী যুদ্ধের পক্ষে রায় দিলেন। যদিও এটা কঠিন সিদ্ধান্ত তবে এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। অবশেষে সবার মতামত নিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন খলিফা আবু বকর রা.।

আবু বকর রা. মদিনায় থাকা মুসলিম বাহিনীকে চারটি ইউনিটে ভাগ করেন। 

১ম ইউনিট : এর নেতা ছিলেন ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রা.। তাঁর দায়িত্ব ছিল সিরিয়ার দামেশক শহর অধিকার করা। 
২য় ইউনিট : এর নেতা ছিলেন শুরাহবিল বিন হাসানাহ রা.। তাঁর দায়িত্ব ছিল বসরা নিয়ন্ত্রণে আনা। 
৩য় ইউনিট : এর নেতা ছিলেন আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ রা.। তাঁর দায়িত্ব ছিল হিমস দখল করা। যেখানে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস অবস্থান করছেন। 
৪র্থ ইউনিট : এর নেতা ছিলেন আমর ইবনুল আস রা.। তাঁর দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিন দখল করা। ঐ সময় ফিলিস্তিন সিরিয়ার অংশ ছিল। 

এর চার বাহিনীকে সিরিয়ায় পাঠানোর সময় আবু বকর রা. সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন। তাদের উজ্জীবিত করেছেন। যুদ্ধের সময় বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর বিধান সবসময় মনে রাখার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। 

মদিনা থেকে সব বাহিনী প্রেরণের পর এবার আবু বকর রা. সিরিয়া সীমান্তে থাকা খালিদ ইবনে সাঈদ রা.-কে যুদ্ধের জন্য অনুমতি দিলেন। সাথে সতর্ক করে দিলেন রাজ্যের আভ্যন্তরীণ পথ দিয়ে না এগুতে। তাহলে অতিক্রম করার পর রোমান জনগণ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। 

অনুমতি পেয়ে খালিদ ইবনে সাঈদ রা.-এর ছোট বাহিনী সিরিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। রোমান সীমান্তরক্ষীরা তাদের আগমনে পালাতে লাগলো। কামতান নামক স্থানে রোমানরা বাধা দিল। কিন্তু পরক্ষণেই পরাজিত হয়ে পিছু হটলো। রোমান সেনানায়ক বাহান ছিল অভিজ্ঞ। সে দামেশকের দিকে পিছু হটছিল। খালিদ বিন সাঈদ রা. ভেবেছিল তারা পালিয়ে যাচ্ছে। আসলে রোমানরা মুসলিমদের তাদের জনপদের ভেতরে নিয়ে ঘিরে ফেলছিল। এই ব্যাপারে আবু বকর রা. তাঁকে সাবধান করেছিলেন। খালিদ বিন সাঈদ রা. চতুর্দিক থেকে আক্রমনের শিকার হলেন। তাঁর ছেলে শাহদাতবরণ করেন। এসময় মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে ইকরিমা রা. পৌঁছে গেলেন। তিনি রোমানদের বেষ্টনী থেকে মুসলিমদের মুক্ত করে পিছু হটে পুনরায় সিরিয়া সীমান্তে চলে এলেন। 

এদিকে রোমানরা মুসলিমদের চার বাহিনীর জন্য চারটি বিশাল বাহিনী তৈরি করেছে। ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রা.-এর জন্য সারজিশের নেতৃত্বে ৪০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী দামেশকে প্রস্তুত হয়েছে। ইয়াজিদ রা.-এর ছিল চার হাজার সৈন্য। ৫০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী হেরাক্লিয়াস নিযুক্ত করেছে শুরাহবিল রা.-কে ঠেকানোর জন্য। বিনিময়ে মুজাহিদ আছে ৪ হাজার। এই দলের নেতৃত্বে ছিল রোমান বীর দারাকুস। পিটারের নেতৃত্বে ৬০ হাজার সৈন্যের আরেকটি বাহিনী নিযুক্ত করা হয়েছে হিমসে আবু উবাইদাহ রা.-কে ঠেকানোর জন্য। আবু উবাইদাহ রা.-এর কাছে সৈন্য ছিল মাত্র ৪ হাজার। আমর ইবনুল আস রা.-কে ঠেকানোর জন্য ৯০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী পাঠানো হয়েছে জেরুজালেমে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডর। বিনিময়ে আমর রা.-এর কাছে ছিল ৮ হাজার সৈন্য। 

মুসলিম সেনাপতিরা যুদ্ধের ভয়াবহতা আঁচ করে আবু বকর রা.-কে খবর পাঠালেন। আবু বকর রা. নতুনভাবে যুদ্ধের পরিকল্পনা করলেন। তিনি সব বাহিনীকে একত্রিত হতে বললেন। ইকরিমা রা. নিজের বাহিনী ও খালিদ বিন সাঈদ রা.-এর বাহিনী নিয়ে সিরিয়ার এক প্রান্তরে ব্যাকআপ বাহিনী হিসেবে অপেক্ষায় ছিলেন। তাকেও চলে আসতে বললেন। আবু বকর রা. সব বাহিনীকে আবু উবাইদাহ রা.-এর কাছে জমায়েত হতে নির্দেশ দিলেন। মুসলিমরা সবাই এক্ত্র হয়ে ইয়ারমুকের তীরে তাঁবু তৈরি করলো। মুসলিমরা একত্রিত হলে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসও সব দলকে একত্রিত হতে বললেন। থিয়োডর সম্মিলিত রোমান বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। 

আবু বকর রা. দেরি না করে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে নির্দেশ দিলেন অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুত ইরাক থেকে যেন সিরিয়ার দিকে রওনা হয়। রোমানদের মোকাবেলা তাকেই করতে হবে। একইসাথে তাকে সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। খালিদ রা. মুসান্না রা.-কে ইরাকের দায়িত্ব দিয়ে দ্রুতগতিতে সিরিয়ায় যুদ্ধের প্রস্তুতিরত মুজাহিদদের সাথে মিলিত হলেন। তাঁর আসতে পাঁচদিন সময় লেগেছিল। মুসলিমরা তাঁর আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ঐদিকে হেরাক্লিয়াসের নির্দেশে থিয়োডরও নিজেকে সংযত রাখছে। হেরাক্লিয়াস পূর্বেই মুহাম্মদ সা. নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে। তাই সে যুদ্ধ করতে সবসময় উদ্যত ছিল না। 

খালিদ সাইফুল্লাহ রা. এসে বাহিনী পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি দেখলেন মুসলিমরা চার সেনাপতির অধীনে চারভাগে বিভক্ত। তিনি এটা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। তাঁর আগে তিনি খলিফার পত্র মুসলিম সেনাপতিদের দেখালেন। তারা সবাই তাঁকে আমির মেনে নিয়ে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে মজলিশে শুরায় মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে কমান্ড প্রদান করেন। এরপর খালিদ রা. সেনাবাহিনীকে ৩৬টি পদাতিক রেজিমেন্ট ও ৪টি অশ্বারোহী রেজিমেন্টে বিভক্ত করেন এবং তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে ভ্রাম্যমান বাহিনী হিসেবে রিজার্ভ হিসেবে রাখা হয়। 

যুদ্ধক্ষেত্রের বাম অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইয়াজিদ বি আবু সুফিয়ান রা.-কে। ডান অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমর ইবনুল আস রা.-কে। মাঝখানের ডান দায়িত্ব দেওয়া হয় আবু উবাইদা রা. ও শুরাহবিল রা.। খালিদ রা. কা'কা বিন আমর রা. এবং ইকরামা রা.-এর নেতৃত্বে একটি ছোট অগ্রবর্তী দল তৈরি করলেন। তারা খালিদ রা.-এর নির্দেশে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। এসময় হঠাৎ রোমানদের অগ্রবর্তী বাহিনীর কমান্ডার জর্জ যুদ্ধ থামাতে ইশারা করে বললেন তার কথা আছে। তিনি খালিদ রা.-এর সাথে কথা বলতে চান। জর্জ ছিলেন থিয়োডরের পুত্র এবং সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ভাতিজা। 

খালিদ রা. মুসলিমদের যুদ্ধ থামাতে বলেন। জর্জ খালিদ রা.-কে বললো, 
- আমাকে সত্য কথা বলবেন। মিথ্যা বলবেন না। আপনাদের নবী কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো তরবারি পেয়েছে? যার দ্বারা আপনারা একের পর এক বিজয় অর্জন করছেন?   
- না 
- তাহলে আপনাকে কেন সাইফুল্লাহ বলা হয়? 
- আমার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মুহাম্মদ সা. আমাকে এই উপাধি দিয়েছেন। সেই থেকে আমি সাইফুল্লাহ।
- আপনি সত্য বলেছেন। এখন বলুন, ইসলামের মূল শিক্ষা কী? 
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ 
- কেউ যদি এই কথা না মানে? 
- তাহলে তাকে জিজিয়া দিয়ে অনুগত থাকতে হবে। 
- যদি কেউ জিজিয়া দিতে অস্বীকার করি? 
- তবে তাদের সাথে আমরা লড়াই করবো। 
- কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাকে সমাজে কীরূপ স্থান দেওয়া হবে? 
- ইসলামে সবাই ভাই ভাই। কেউ আজ ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে অন্যান্য মুসলিমের মতোই অধিকার দেওয়া হবে। 
- আপনি শপথ করে বলুন, আপনি কোনো মিথ্যা বলেন নি। 
- আল্লাহর শপথ আমি কোনো মিথ্যা বলিনি। 
- আমি বিশ্বাস করেছি, আপনি সত্য কথাই বলেছেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। 

এই বলে জর্জ মুসলিম হয়ে গেল। মুজাহিদরা আল্লাহু আকবার বলে আনন্দ প্রকাশ করতে শুরু করলো। অন্যদিকে রোমান বাহিনী এই ঘটনায় বিস্মিত ও ক্রোধান্বিত হয়ে আক্রমণ শুরু করে দিন। খালিদ রা. ও জর্জ বীরবিক্রমে যুদ্ধে শামিল হলেন। এর কিছুক্ষণ পর জর্জ শাহদাতবরণ করেন। 

মুসলিমরা বিশাল বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গেল। কোনো স্থানে মুজাহিদরা বিপদে পড়লে ভ্রাম্যমান অশ্বারোহীরা তাদের উদ্ধারে নিয়োজিত ছিল। মুজাহিদদের প্রবল আক্রমণে রোমানরা দিশেহারা হয়ে পড়লো। কিন্তু তারা পালাতে পারছিল না। খালিদ রা. এই অবস্থার সুযোগ নিলেন। তিনি একপাশ থেকে মুসলিম সৈন্যদের সরিয়ে রাস্তা উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে বহু সৈন্য পালিয়ে গেল। ধীরে ধীরে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে চলে এলো। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা বিজয় দান করলেন। প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র ৩০ হাজারের বাহিনীকে আল্লাহ বিজয়ী করলেন। 

এই যুদ্ধে বিজয় আসলেও বহু মুসলিম শাহদাতবরণ করেন। প্রায় তিনহাজার মুসলিম শাহদাতবরণ করেন। এই যুদ্ধেই মুসলিমরা ভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির স্থাপন করেন। এক সাহাবী পানি পানি বলে চিৎকার করলে যখন তাঁর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয় তখন আরেক সাহাবি পানি বলে চিৎকার করেন। ১ম জন ২য় জনের কাছে পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। এসময় আরেক পানি বলে ডাক দেয়। ২য় জন ৩য় জনের কাছে পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে। এভাবে চলতে থাকে ৬ষ্ঠ জন পর্যন্ত। সাহাবারা একজন আরেক জনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয়। শেষ জনের কাছে পানি নিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল তিনি শাহদাত বরণ করেছেন। এভাবে সবাই পানি খাওয়া ছাড়াই শাহদাত বরণ করেছেন।  

এই যুদ্ধ শেষে মুজাহিদরা আরেকটি খবর পেল। আর তা হলো খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা. ইন্তেকাল করেছেন।

১৪ ডিসে, ২০২১

খিলাফত পর্ব-০৮ : আবু বকর রা.-এর ইরাক অভিযান


সেসময় পৃথিবীতে দুটি বড় সাম্রাজ্য ছিল। একটির নাম বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্য। এদের অবস্থান আরবের উত্তরে সিরিয়া ও উত্তর পশ্চিমে ফিলিস্তিনে। এরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বি ছিল। অন্যদিকে আরেকটি সাম্রাজ্য ছিল পারসিক সাম্রাজ্য। এদের অবস্থান ছিল আরবের পূর্বে ইরাকে। পারসিকরা মুশরিক ছিল। তারা বিভিন্ন দেবতার পূজা করতো। তবে অগ্নিপূজকরা শক্তিশালী ছিল। সেসময় পারসিক ও রোমানরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। আবু বকর রা.-এর সময়ে রোমানরা যুদ্ধে এগিয়ে ছিল। 

মুসলিমদের সাথে দুইবার রোমানরা যুদ্ধ করেছে। কিন্তু পারসিকদের সাথে মুসলিমদের কোনো মোকাবেলা হয়নি। আবু বকর রা. ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার পর একটুও দেরি করেন নি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বাড়ানোর জন্যে। এই ব্যাপারে আবু বকর রা.-এর পরিকল্পনা ছিল অফেন্সিভ। তিনি মনে করতেন শত্রু সাম্রাজ্যগুলোর ওপর চড়াও না হলে নিজের রাষ্ট্র নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। তাই তিনি প্রথমে ইরাক তথা পারসিকদের শহরগুলো নিজের অধিকারে আনার চেষ্টা করেছেন। ইরাকে বিজয় লাভ করার পরই তিনি সিরিয়া দখলের দিকে মনোনিবেশ করেন। মাত্র আড়াই বছরের শাসনে আবু বকর রা. এতো বেশি কাজ করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর সব কাজ সহজ করে দিয়েছেন। তিনি শুধু নিজে কাজ করেন নি বরং পুরো মুসলিম জাতিকে রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত করেছেন। 

মুসান্না রা. বাহরাইনে মুসলিমদের নেতা ছিলেন। বাহরাইনে বিদ্রোহীদের দমনের পর মুসান্না রা. ইরাক সীমান্তে যেসব মুশরিক গোত্র মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করেছিল তাদের শায়েস্তা করছিলেন। এসময় তিনি পারসিক বাহিনীর তৎপরতা টের পান। পারসিকরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই খবর তিনি আবু বকর রা.-নিকট পাঠান। মুসান্না রা.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে আবু বকর রা. খবর পেয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে ইরাকে পাঠান। তিনি তখন মাত্র ইয়ামামার ভয়াবহ যুদ্ধ শেষ করেছেন। [১] 

আবু বকর রা.-এর নির্দেশে খালিদ রা. ২০০০ সেনা নিয়ে ইরাকের দিকে রওনা হলেন। খলিফা তাঁকে আরো কিছু নির্দেশনা দিলেন 
১. ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত উবুল্লাহ থেকে যুদ্ধ শুরু করবে। 
২. উঁচু ভূমি দিয়ে ইরাকে প্রবেশ করবে। 
৩. ইরাকে জনগণের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তাদের মন জয়ের চেষ্টা করবে। তাদের আল্লাহর দিকে আহবান জানাবে। তারা দাওয়াত গ্রহণ করলে ভাই হিসেবে গ্রহণ করবে। নতুবা জিজিয়া দেওয়ার জন্য বলবে। সেটাতেও অস্বীকার করলে তবেই যুদ্ধের দিকে যাবে। 
৪. তোমার সাথে কোনো মুসলিম সৈন্য যুদ্ধে যেতে না চাইলে বাধ্য করবে না।
৫. যেসকল মুসলিম ধর্মত্যাগ করে আবার মুসলিম হয়েছে তাদেরকে তোমার সাথে নিবে না। 
৬. কোনো মুসলিম তোমাদের পাশে থাকলে তোমাদের সাথে নিয়ে নিবে। [২] 

খালিদ রা. রওনা হওয়ার পর আবু বকর রা. ইরাক যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহতা অনুধাবন করে ইয়াদ ইবনু গানাম রা.-কে তার বাহিনীসহ ইরাকে পাঠান খালিদ রা.-কে সহায়তা করার জন্য। একইসাথে মুসান্না রা.-কে পত্র পাঠান যাতে খালিদ রা.-এর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে তাদের উপযুক্ত সমাদর করে। খালিদ রা. মাত্র দুই হাজার সৈন্য নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। পথিমধ্যে রাবিয়াহ গোত্র থেকে জিহাদে উজ্জীবিত ৮০০০ সেনা সাথে নেন। ইরাকের তিনজন প্রখ্যাত আমীর মাজউর ইবনে আদি, সুলমা ইবনে কায়ন এবং হারমালাহ ইবনে মুরায়তাহকে সৈন্য প্রস্তুত রাখার জন্য চিঠি লেখেন। তারা প্রায় ৮০০০ সেনার সমাবেশ করেন। ফলে খালিদ রা.-এর সৈন্যসংখ্যা আঠারো হাজারে দাঁড়ালো [৩]

হুদাইরের যুদ্ধ : 
ইরাকে খালিদ রা. প্রথমে যে যুদ্ধের মুখোমুখি হলেন তা হলো হুদাইরের যুদ্ধ। হুদাইর বসরার পূর্বে পারস্য উপসাগরের নিকটে অবস্থিত। এর শাসক ছিল হুরমুজ। হুরমুজ ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের একজন গভর্নর। হুরমুজ একজন অত্যাচারী ও দাম্ভিক শাসক ছিল। খালিদ রা. তার কাছে পত্র লিখেন। পত্রে উল্লেখ করেন, 
ইসলাম গ্রহণ করো, তবেই তুমি নিরাপদ থাকবে। নতুবা তোমাকে ও তোমার জাতিকে জিজিয়া দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। অন্যথায় যা কিছু ঘটবে তার জন্য তুমি নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে দায়ি করতে পারবে না। আমি তোমার নিকট এমন সকল লোককে নিয়ে এসেছি তারা মৃত্যুকে ঠিক সেরূপ ভালোবাসে তোমরা যেরূপ জীবনকে ভালোবাসো। [৪]   

হুরমুজ এই পত্র পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে হুরমুজ মৃত্যুবরণ করে ও পারসিক বাহিনীর পরাজয় হয়। খালিদ রা. বিশাল গণিমত লাভ করেন। এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ তিনি মদিনায় পাঠিয়ে দেন।

উবুল্লাহ বিজয় : 
হুদাইরের যুদ্ধ শেষে খালিদ রা. নিজে হুদাইরে অবস্থান করেন। আর মাকিল ইবনে মুকাররিন রা.-কে উবুল্লায় পাঠান। উবুল্লাবাসী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সৈন্য সমাবেশ করে। তাদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের পরাজয় হয়। 

মুজারের যুদ্ধ : 
হুদাইরের যুদ্ধের পর পারসিক সৈন্যরা তাদের রাজধানীর দিকে পালাতে থাকে। খালিদ রা.-এর নির্দেশে মুসান্না রা.-এর বাহিনী তাদের ধাওয়া করে। কিছুদূর যাওয়ার পর মুসান্না রা. খবর পেলেন পারস্যের সম্রাট মুশরিকদের প্রখ্যাত বীর কারিনকে হুদাইরের দিকে পাঠাচ্ছেন বিশাল সেনাবাহিনীসহ। খবর পেয়ে তিনি আর এগুলেন না। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস (দজলা ও ফোরাত) নদীর মোহনায় তিনি মুজার নামক স্থানে ক্যাম্প তৈরি করে করেন। খালিদ রা. দ্রুত মুজারে চলে আসেন। প্রাথমিক দ্বন্দ্বযুদ্ধেই বীর কারিন মারা যায়। ফলে বিশাল পারসিক বাহিনী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মুসলিমরা সহজে এই যুদ্ধে জয়ী হয়। 

ওয়ালাজাহর যুদ্ধ :
পারসিকরা পর পর দু'বার পর্যদস্তু হবার পর নতুন কৌশল গ্রহণ করলো। তাদের অধীনস্ত খ্রিস্টানদের ক্ষেপাতে লাগলো। খ্রিস্টানরা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের স্বাধীনতার লোভ দেখানো হয়। বলা হয় যদি তারা পারসিকদের সহায়তা করে মুসলিমদের তাড়িয়ে দিতে পারে তবে তাদের স্বাধীন  করে দেওয়া হবে। এই ফাঁদে পা দেয় ইরাকের খ্রিস্টানরা। তারা ওয়ালাজাহতে একত্রিত হয়। মুসলিমরা তাদের প্রতিরোধ করে ও পরাজিত করে। 

উল্লায়সের যুদ্ধ : 
খালিদ রা. খ্রিস্টান নেতাদের বুঝানোর চেষ্টা করলেন পারসিকদের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা বুঝলো না। খ্রিস্টান সৈন্যরাও জান্নাতের জন্য লড়ে। তাই তাদের মনোবল সবসময় অটুট থাকে। তাদের সাথে যুদ্ধ কঠিন হয়ে থাকে মুশরিকদের তুলনায়। খ্রিস্টান নেতা অল্প সময়ের মধ্যে আবারো বিশাল বাহিনী গড়ে তুললো। যাদের ওয়ালাজহর যুদ্ধে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে তারা আবারো মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। খালিদ রা. এবার তাদের প্রতি কঠোর আচরণ করলেন। তিনি মুজাহিদদের নির্দেশ দিলেন যারা আত্মসমর্পন করবে তাদের শুধু হত্যা না করে গ্রেপ্তার করা হবে। আর যারা পালাচ্ছে তাদের ধাওয়া দিয়ে হত্যা করতে। এই যুদ্ধে একটা বিশাল পারসিক শক্তি ও খ্রিস্টান সৈন্য খুন হয়। এই খবরে অসুস্থ থাকা পারস্য সম্রাট আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন।

হীরা বিজয় : 
হীরা তৎকালীন ইরাকের একটি সমৃদ্ধ শহর ছিল। এটি পারসিকদের শহর ছিল যদিও হীরাবাসী ছিল খ্রিস্টান। হীরা ছিল বর্তমানে কুফার অন্তর্গত। খ্রিস্টানদের বড় পরাজয় হওয়া সত্ত্বেও হীরার খ্রিস্টানরা মনোবল হারায়নি। তারা মনে করেছিল তাদের শক্তিশালী দুর্গ রয়েছে যার দ্বারা তারা মুসলিমদের মুকাবিলা করতে পারবে। আর তারা ছিল ফোরাত নদীর ওপারে। হীরার শাসক আজাজিবাহ উজানে বাঁধ দিয়ে ফোরাতের পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে নৌযান চলা বন্ধ হয়ে গেছে। আর কাদার মধ্যে দিয়ে ঘোড়া নিয়ে পার হওয়া সম্ভব না। মুসলিমরা খবর নিয়ে বাঁধের খবর পেল। 

খালিদ রা. বাঁধের কাছে গিয়ে সেখানের নিরাপত্তায় থাকা সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেলে মুসলিমরা বাঁধ নষ্ট করে দেন। নৌযানে করে তারা নদী পার হন। মুসলিমরা তাদের চারটি দূর্গ অবরোধ করলো। দুর্গ থেকে তারা পাথর ও তীর নিক্ষেপ করলে মুসলিমরা তীরের মাধ্যমে সেই আক্রমণের জবাব দেয়। পরিস্থিতি কঠিন হবে বুঝতে পেরে আজাজিবাহ সন্ধির প্রস্তাব করলেন ও জিজিয়া দিতে সম্মত হলেন। এই বিজয়ের ফলে ইরাকে আর কেউ প্রভাবশালী হয়ে মুসলিমদের রুখতে আসেনি। আরো কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে খালিদ রা. পুরো ইরাক মুসলিমদের আয়ত্বে নিয়ে আসলেন। 

হীরার সন্ধিপত্র : 
যুদ্ধের সেনাপতি খালিদ রা. হলেও বহুদূর থেকে যুদ্ধের ময়দানের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা.। হীরাবাসী সন্ধি করতে চাইলে খালিদ রা.-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।[৬]  

১. তাদের গীর্জা ও ইবাদতের স্থান নষ্ট ও দখল করা যাবে না। 
২. নাকূস বাজনা (ধর্মীয় বাজনা) থেকে তাদের বিরত রাখা যাবে না। 
৩. ক্রুশের মিছিলে বাধা দেওয়া যাবে না। 
৪. জিজিয়া আদায় করলে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে এবং তাদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। 
৫. গীর্জার পাদ্রীদের জিজিয়ার আওতামুক্ত রাখতে হবে। 
৬. তাদের মধ্যেকার বৃদ্ধ, অসুস্থ ও পঙ্গু লোকদের ব্যয়ভার বাইতুলমাল থেকে বহন করা হবে। 
৭. তারা যে কোনো পোষাক পরিধান করার স্বাধীনতা পাবে। 
৮. তাদের মধ্যেকার কোনো গোলাম ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে সর্বোচ্চ মূল্যে কিনে আযাদ করে দেওয়া হবে। মূল্য মালিককে পরিশোধ করা হবে। 
৯. যদি তারা কেউ আর্থিক সাহায্য চায় তবে বাইতুলমাল থেকে সাহায্য করা হবে। 

তথ্যসূত্র :
১. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৫৫৭-৫৫৮
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া / ইবনে কাসীর / ইসলামিক ফাউন্ডেশন / ৬ষ্ঠ খন্ড / পৃ. ৫১৬
৩. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৫৬০-৫৬১  
৪. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৫৬৩
৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া / ইবনে কাসীর / ইসলামিক ফাউন্ডেশন / ৬ষ্ঠ খন্ড / পৃ. ৫১৭- ৫২৫
৬. আবূ বাকর আছছিদ্দীক / ড. আহমদ আলী / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার / পৃ. ৬৫২ 


১০ ডিসে, ২০২১

কাতিবে ওহি কারা ছিলেন?


আমাদের প্রিয় নবী সা.-এর কোনো শিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তিনি ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন। এটা আল্লাহ তায়ালার একটি কুদরত। এরকম একজন মানুষ যখন হুট করে জ্ঞানের চর্চা ও নসিহত দিচ্ছিলেন তখন আরবের লোকজন একথা মানতে বাধ্য হয়েছে যে, মুহাম্মদ সা. কাছে ফেরেশতা আসে এবং এগুলো তাঁকে শেখানো হয়।

যাই হোক, মুহাম্মদ সা. অক্ষরজ্ঞানহীন হওয়ায় নবুয়্যতের শুরু থেকেই কাতিবে ওহির প্রয়োজন হয়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে ওহি নাজিল হয় ২৩ বছর। এই ২৩ বছরে প্রায় ২২ জন কাতিবে ওহির সাহায্য নেন মুহাম্মদ সা.। এর মধ্যে কেউ ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর কেউ নিজ থেকে কাজটা করেছেন। আর কেউ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কাতিবে ওহির দায়িত্ব পালন করেছেন। আর একজন সুপারিশের ভিত্তিতে এই দায়িত্ব পেয়েছেন। 

আল্লাহর রাসূল সা.-এর মাক্কী জীবনে সর্বপ্রথম কাতিবে ওহির দায়িত্ব পালন করেছেন আবু বকর রা.। তার সাথে ছিলেন আলী রা. ও উসমান রা.। তারা চামড়ার টুকরো ও খেজুরের ডালে ওহি লিখে সংরক্ষণ করতেন। এরপর দারুল আরকামে ইসলামের গোপন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হলে আরকাম ইবনে আবুল আরকাম রা. ওহি লিখে রাখতেন যাতে নতুন মুসলিমদের শিক্ষা দেওয়া যায়। উমার রা. ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কুরআন সংরক্ষণ করা শুরু করেন। একইসাথে তিনি কুরআন মুখস্ত করতে থাকেন। যতদূর জানা যায় তিনি প্রথম কুরআনে হাফেজ। 

মাক্কী জীবনের ১৩ বছরে আরো কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন, খালিদ ইবনে সাঈদ রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা., আমির ইবনে ফুহাইরা রা. এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দ রা.।    

যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. আবিসিনিয়ায় হিজরত করার সময় ওহি লিখে নিয়ে যান যাতে সেখানে দাওয়াতের কাজ করা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দ রা. ছিলেন উসমান রা.-এর দুধভাই। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান। ইসলামের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সা. যাদের হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। পরে উসমান রা.-এর সুপারিশে তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পান ও পুনরায় ইসলামে দাখিল হন।  

আল্লাহর রাসূল সা. যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন যায়িদ বিন সাবিত রা. ছিলেন ১১-১২ বছরের কিশোর। তিনি লেখাপড়া জানতেন। মুহাম্মদ সা. তাঁকে কাতিব বা লেখক হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল মুহাম্মদ সা. ও ইসলামী রাষ্ট্রের সব ডকুমেন্ট লেখা ও সংরক্ষণ। সেই হিসেবে তিনি কাতিবে ওহিও ছিলেন। তিনি কুরআনের সব অংশ সংগ্রহ করেন ও লিখে রাখেন। এটা তাঁর অফিসিয়াল দায়িত্ব ছিল। 

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তাঁর অনুপস্থিতে বহু সাহাবি কাতিব ও কাতিবে ওহি ছিলেন। যারা কাতিব ছিলেন তারা বিভিন্ন চুক্তিপত্র ও নির্দেশনামা লিখেছেন যেমন খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এবং হানজালা রা. (শহীদ হানজালা নয়)। এছাড়াও মাদানী জীবনে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন উবাই ইবনে কা'ব রা., আবান ইবনে সাঈদ রা. আব্দুল্লাহ বিন যায়দ রা., সাবিত ইবনে কায়স রা., আব্দুল্লাহ ইবনুল আরকাম রা., আলা ইবনুল হাদরামি রা., মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা., আলা ইবনুল উকবা রা., মুগিরা বিন শু'বা রা. এবং মু'আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রা.।

এর মধ্যে মুগিরা বিন শু'বা রা. ছিলেন মুহাম্মদ সা. দেহরক্ষীর মতো। তিনি সবসময় রাসূল সা.-এর নিরাপত্তায় নিজেকে উতসর্গ করেছিলেন। তাই তিনি নানান সময়ে ওহি নাজিলের সাক্ষী ছিলেন এবং বিভিন্ন পত্রাদি ও চুক্তি লিখেছেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর বিশাল কাতিব বাহিনীর সর্বশেষ সংযোজন ছিল মু'আবিয়া রা.। 

তিনি ও তাঁর বাবা মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয় ও আরো কিছু অভিযান শেষ করে রাসূল সা. মদিনায় পৌঁছলে তাঁর কাছে আবু সুফিয়ান তিনটি আবেদন করেন, 
১. আমাকে সেনাধিনায়ক করে দিন আমি ইসলামের বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধ করেছি এখন ইসলামের পক্ষে সেভাবে যুদ্ধ করবো। 
২. আমার ছেলে মু'আবিয়াকে আপনার কাতিবদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিন। 
৩. আমার একটি মেয়েকে আপনি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করুন। 

আল্লাহর রাসূল সা. আবেদনগুলো কবুল করেন ৩য় টি ছাড়া। কারণ ইতোমধ্যে আবু সুফিয়ানের একটি মেয়ে (উম্মে হাবিবা রা.) রাসূল সা.-স্ত্রী ছিলেন।

ইয়ামামার যুদ্ধে যখন বহু হাফিজ সাহাবি শাহদাতবরণ করে তখন আবু বকর রা.  কুরআন সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেক্ষেত্রে তিনি উমার রা. ও যায়িদ বিন সাবিত রা.-কে দায়িত্ব দেন যেন কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ কপি তৈরি করা হয়। তারা কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ সংকলন করে উম্মুল মু'মিনিন হাফসা রা.-এর কাছে সংরক্ষণ করেন।